Categories
গল্প

লাল মাটির পথ।

শালবনের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা গ্রাম—নাম তার কুসুমডাঙা। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে লাল মাটির উঁচুনিচু পথ চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। বর্ষায় সেই পথ কাদায় ডুবে যায়, আর গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে হাঁটা কঠিন হয়ে ওঠে।

গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে একটা সমস্যায় ভুগছিল।

গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। বাজার যেতে হলে আরও তিন কিলোমিটার। কিন্তু কুসুমডাঙা থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত যাওয়ার কোনো ভালো পথ ছিল না।

বর্ষায় অসুস্থ মানুষকে বাঁশের খাটিয়ায় তুলে নিয়ে যেতে হতো।

কেউ কেউ মাঝপথেই ফিরে আসত।

গ্রামের সবাই সমস্যাটা জানত। কিন্তু সমস্যাটা যেন সবারই—তাই কারও একার দায়িত্ব ছিল না।

সেই গ্রামেই থাকত মাধবী।

বয়স তার তেইশ। বাবা নেই। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। মাধবী নিজে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে আর পড়তে পারেনি। সংসারের জন্য ছোটবেলা থেকেই কাজ করেছে।

কিন্তু একটা জিনিস সে খুব ভালোবাসত—রাস্তা।

অদ্ভুত শোনালেও সত্যি।

মাধবী প্রায়ই গ্রামের পথ ধরে হাঁটত। কোথায় গর্ত, কোথায় জল জমে, কোথায় রাস্তা সরু—সব তার মুখস্থ।

একদিন বর্ষার দুপুরে গ্রামের বৃদ্ধা কমলা পিসি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।

মাধবী ছুটে এল।

—“পিসি, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

দুজন যুবক বাঁশের খাটিয়া নিয়ে এল।

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি।

লাল মাটির পথ কাদায় পরিণত হয়েছে।

চারজন মিলে কমলা পিসিকে খাটিয়ায় তুলে রওনা দিল।

কিন্তু আধঘণ্টা পরেই সমস্যা হল।

একটা জায়গায় রাস্তার মাঝখানে এত বড় গর্ত তৈরি হয়েছে যে খাটিয়া নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল।

কমলা পিসি কষ্ট করে বললেন,

—“আমাকে আর নিয়ে যেও না। বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে চলো।”

মাধবী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখের সামনে যেন শুধু গর্তটা নয়—পুরো গ্রামের ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে ছিল।

সেদিন শেষ পর্যন্ত পাশের গ্রামের একটা ট্রাক্টর ডেকে কমলা পিসিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বেঁচে গেলেন।

কিন্তু মাধবী সেদিন একটা সিদ্ধান্ত নিল।

এই রাস্তা ঠিক করতেই হবে।

পরদিন সকালে সে একটা খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

প্রথমে গ্রামের সব রাস্তা মেপে নিল।

কোথায় গর্ত, কোথায় কালভার্ট ভাঙা, কোথায় জল জমে—সব লিখে রাখল।

তারপর গ্রামের মানুষজনের বাড়ি বাড়ি গেল।

—“আপনারা সবাই একটা করে সই করবেন?”

একজন হেসে বলল,

—“কী হবে সই করে?”

মাধবী বলল,

—“রাস্তার জন্য আবেদন করব।”

আরেকজন বলল,

—“আগেও তো অনেক আবেদন হয়েছে।”

মাধবী শান্তভাবে বলল,

—“হয়েছে। কিন্তু এবার আমরা রাস্তার সমস্যার পুরো হিসাব দেব।”

সে শুধু সই সংগ্রহ করল না।

প্রতিটি গর্তের ছবি তুলল।

বর্ষায় কোথায় জল জমে তার ছবি তুলল।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের সমস্যা লিখে রাখল।

অসুস্থ মানুষকে কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, তারও তথ্য সংগ্রহ করল।

তারপর সব কাগজ সুন্দর করে সাজিয়ে আবেদন করল।

কিন্তু উত্তর এল না।

এক মাস কেটে গেল।

দুই মাস।

তিন মাস।

গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।

একদিন চায়ের দোকানে বসে একজন বলল,

—“মাধবী, এত কাগজপত্র করে কী পেলি?”

মাধবী চা নামিয়ে রেখে বলল,

—“রাস্তা এখনও হয়নি। কিন্তু কাজটা শেষও হয়নি।”

—“তুই একা কী করতে পারবি?”

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

—“আমি একা নই। এই গ্রামের সবাই তো আমার সঙ্গে আছে।”

লোকটা চারদিকে তাকিয়ে বলল,

—“কোথায়?”

মাধবী বলল,

—“আজ নেই। কাল থাকবে।”

সেই কথাটা সত্যি হতে শুরু করল।

মাধবী গ্রামের স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে একটা ছোট দল তৈরি করল।

নাম দিল—‘আমাদের পথ’।

বাচ্চারা রাস্তার পাশে প্লাস্টিক পড়ে থাকলে তুলে ফেলত।

কেউ গর্তের পাশে বাঁশ পুঁতে দিত, যাতে রাতে মানুষ পড়ে না যায়।

কেউ রাস্তার জল বের করার জন্য ছোট নালা পরিষ্কার করত।

গ্রামের যুবকরাও ধীরে ধীরে যুক্ত হল।

একদিন পঞ্চাশ বছরের কৃষক হরিপদ এসে বললেন,

—“তুই যখন ছাড়ছিস না, আমরাও ছাড়ব না।”

তারপর শুরু হল গ্রামের মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ।

যেখানে বড় গর্ত, সেখানে ইট ফেলা হল।

যেখানে জল দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে নালা কাটা হল।

কেউ শ্রম দিল।

কেউ বাঁশ দিল।

কেউ পুরনো ইট দিল।

কেউ শুধু এক বোতল জল নিয়ে এসে কাজ করা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াল।

মাধবী বুঝতে পারল—একটা রাস্তা শুধু মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি হয় না।

মানুষের ইচ্ছা দিয়েও রাস্তা তৈরি হয়।

ছয় মাস পরে একদিন খবর এল—গ্রামের রাস্তা সংস্কারের জন্য সরকারি প্রকল্পে কাজ অনুমোদন হয়েছে।

কাজ শুরু হল।

বড় বড় মেশিন এল।

লাল মাটির পথ ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।

যে পথে বর্ষায় হাঁটা যেত না, সেখানে পাথর বিছানো হল।

নালা তৈরি হল।

কালভার্ট মেরামত হল।

কয়েক মাস পর রাস্তার চেহারা বদলে গেল।

সেদিন সকালে মাধবী একা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মা এসে বললেন,

—“কী দেখছিস?”

মাধবী বলল,

—“রাস্তা।”

মা হেসে বললেন,

—“রাস্তা তো প্রতিদিনই দেখিস।”

মাধবী মাথা নাড়ল।

—“আজ অন্যরকম লাগছে।”

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা অ্যাম্বুল্যান্স এল।

কুসুমডাঙার রাস্তা ধরে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে চলে গেল।

মাধবীর চোখে জল এসে গেল।

তার মনে পড়ল কমলা পিসির সেই দিনটার কথা।

কাদায় আটকে থাকা খাটিয়া।

অসহায় মানুষের মুখ।

আর নিজের সেই সিদ্ধান্ত—

এই রাস্তা ঠিক করতেই হবে।

কয়েকদিন পর গ্রামের স্কুলে একটা অনুষ্ঠান হল।

প্রধান শিক্ষক মাধবীকে সামনে ডেকে বললেন,

—“তুমি রাস্তা বানাওনি শুধু। তুমি আমাদের একটা শিক্ষা দিয়েছ।”

মাধবী অবাক হয়ে বলল,

—“কী শিক্ষা?”

প্রধান শিক্ষক বললেন,

—“সমস্যা বড় হলেই মানুষ অসহায় হয় না। মানুষ তখনই অসহায় হয়, যখন সে সমস্যাকে নিজের বলে মনে করা বন্ধ করে দেয়।”

সবাই হাততালি দিল।

মাধবী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

অনুষ্ঠান শেষে ছোট্ট এক ছাত্র তার কাছে এসে বলল,

—“দিদি, বড় হয়ে আমি কী করব জানো?”

মাধবী হাসল।

—“কী করবে?”

ছেলেটা বলল,

—“যেখানে রাস্তা নেই, সেখানে রাস্তা বানাব।”

মাধবী তার মাথায় হাত রেখে বলল,

—“রাস্তা বানানোর আগে একটা কথা মনে রাখবে।”

—“কী?”

—“রাস্তা শুধু গন্তব্যে নিয়ে যায় না। রাস্তা মানুষকে মানুষের কাছেও নিয়ে যায়।”

সন্ধ্যা নেমেছিল।

লাল মাটির পথের ওপর সূর্যের শেষ আলো পড়েছিল।

মাধবী ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।

পেছনে পড়ে রইল সেই পথ—

যে পথ একদিন ছিল গ্রামের দুঃখের কারণ,

আর আজ হয়ে উঠেছে

গ্রামের স্বপ্নের পথ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

স্টেশনের লকার নম্বর ১৭।

প্রতিদিন সকালে স্টেশনে এসে একই কাজ করত বিজয়।

প্ল্যাটফর্মে চা বিক্রি করত সে।

চা, বিস্কুট আর কয়েকটা খবরের কাগজ—এই ছিল তার ছোট্ট সংসার।

এক শীতের সকালে চা দিতে গিয়ে সে দেখল, প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।

বিজয় জিজ্ঞেস করল,

—“কাউকে অপেক্ষা করছেন?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“হ্যাঁ। তবে জানি না সে আসবে কি না।”

—“কতক্ষণ ধরে?”

—“বিশ বছর।”

বিজয় অবাক হয়ে গেল।

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় ট্রেন চলে যাওয়ার পর বিজয় দেখল, বেঞ্চের নিচে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স পড়ে আছে।

বাক্সের ওপর লেখা—

“লকার ১৭।”

স্টেশনের পুরনো লকারঘরে গিয়ে সে ১৭ নম্বর লকারটা খুঁজে পেল।

লকারটি তালাবন্ধ।

কিন্তু পাশে একটি ছোট্ট চাবি পড়ে ছিল।

বিজয় চাবিটা দিয়ে লকার খুলল।

ভেতরে একটি কাপড়ে মোড়ানো বাক্স।

আর একটি চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“যে মানুষ এটি পাবে, সে যেন চিঠিটা পড়ে।”

বিজয় চিঠি খুলল।

“আমি জানি না, এই চিঠি কার হাতে পৌঁছবে।

বিশ বছর আগে আমি এই স্টেশনে আমার ছেলেকে শেষবার দেখেছিলাম। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। সে রাগ করে চলে যায়।

যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘বাবা, কোনওদিন যদি মনে হয় আমি তোমাকে ভুলে গেছি, লকার ১৭ খুলবে।’

কিন্তু আমি কখনও লকারটা খুলিনি।

কারণ মনে হয়েছিল, সে নিজেই একদিন ফিরে এসে খুলবে।

যদি আমি না থাকি, তবে এই বাক্সটা তার হাতে পৌঁছে দিও।”

বিজয়ের বুকটা কেঁপে উঠল।

বাক্স খুলে দেখা গেল—একটি পুরনো ঘড়ি, একটি শিশুর ছবি এবং কিছু টাকা।

আর একটি কাগজ।

তাতে লেখা—

“তোর পড়াশোনার জন্য জমিয়েছিলাম। তুই হয়তো নিতে আসিসনি। কিন্তু টাকা এখনও তোরই।”

বিজয় বুঝল, এই বাক্সটি কোনও সাধারণ বাক্স নয়।

সে পরদিন সেই বৃদ্ধকে খুঁজতে শুরু করল।

দু’দিন পর জানতে পারল, বৃদ্ধের নাম নরেন।

তিনি স্টেশনের কাছেই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন।

বিজয় ছুটে গেল।

নরেনবাবু চিঠিটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি লকার খুলেছ?”

—“জি।”

—“আমার ছেলে?”

—“আমি জানি না।”

বৃদ্ধের মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

একজন মাঝবয়সি মানুষ দাঁড়িয়ে।

হাতে পুরনো ব্যাগ।

তিনি ভেতরে ঢুকে বললেন,

—“বাবা…”

নরেনবাবু যেন পাথর হয়ে গেলেন।

মানুষটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁর সামনে বসে পড়ল।

—“আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।”

নরেনবাবু কাঁপা গলায় বললেন,

—“তুই এলি?”

ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,

—“আজ লকার ১৭ খুলতে এসেছিলাম।”

বিজয় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

ছেলেটি বলল,

—“বাবা, আমি জানতাম না তুমি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ।”

নরেনবাবু হেসে বললেন,

—“বাবারা অপেক্ষা করার জন্য কোনও কারণ খোঁজে না।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

বিজয় বেরিয়ে আসার সময় নরেনবাবু তাকে ডাকলেন।

—“বিজয়।”

—“জি?”

—“তুই না থাকলে হয়তো আমার ছেলে আর আমার দেখা হতো না।”

বিজয় মাথা নাড়ল।

—“আমি শুধু লকারটা খুলেছি।”

নরেনবাবু বললেন,

—“না। তুই একটা দরজা খুলেছিস।”

বিজয় কিছু বুঝতে না পেরে চলে গেল।

পরদিন সকালে স্টেশনে এসে সে নিজের চায়ের দোকান খুলল।

কিছুক্ষণ পর এক তরুণ ছুটে এসে বলল,

—“দাদা, এক কাপ চা দেবেন?”

বিজয় চা এগিয়ে দিল।

তরুণটি হাসল।

—“বাবা বলেছে, আপনার কাছে একদিন চা খেতেই হবে।”

বিজয় তাকিয়ে দেখল—নরেনবাবুর ছেলে।

দু’জনেই হেসে ফেলল।

স্টেশনে তখন ট্রেন ঢুকছে।

মানুষ ছুটছে।

ঘোষণার শব্দ ভেসে আসছে।

আর প্ল্যাটফর্মের এক কোণে, লকার নম্বর ১৭ নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে।

কারণ তার ভেতরের অপেক্ষাটা অবশেষে শেষ হয়েছে।

কিছু তালা চাবি দিয়ে খোলা যায়। আর কিছু তালা খুলতে লাগে শুধু একজন মানুষের একটু সাহস।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

রেডিওর শেষ গান।

বৃদ্ধ অশোকবাবুর ঘরে একটা পুরনো রেডিও ছিল।

রেডিওটা প্রায় ত্রিশ বছরের পুরনো। কাঠের গায়ে আঁচড়, ভলিউমের নবটা একটু বেঁকে গেছে, মাঝেমধ্যে শব্দও কেঁপে উঠত।

তবু অশোকবাবু প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় রেডিওটা চালাতেন।

একই সময়ে।

একই চেয়ারে বসে।

একদিন পাশের বাড়ির রিয়া জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, আপনি প্রতিদিন এই রেডিওটা শোনেন কেন?”

অশোকবাবু হেসে বললেন,

—“কারণ এখানে একটা কণ্ঠস্বর আছে।”

—“কার?”

—“যে কণ্ঠস্বরটা আমাকে একদিন বলেছিল—‘অপেক্ষা করো।’”

রিয়া কিছুই বুঝল না।

অশোকবাবু আর কিছু বললেন না।

পরদিনও সন্ধ্যা সাতটায় রেডিও চালু হল।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ রেডিওটা বন্ধ হয়ে গেল।

অশোকবাবু অনেক চেষ্টা করেও চালু করতে পারলেন না।

তিনি যেন খুব ভেঙে পড়লেন।

রিয়া বলল,

—“আমি ঠিক করে দেব।”

পরদিন সে রেডিওটা নিয়ে গেল তার পরিচিত এক মেকানিকের কাছে।

মেকানিক রেডিও খুলে বলল,

—“এটা ঠিক করা সম্ভব। তবে পুরনো হওয়ায় একটু সময় লাগবে।”

রিয়া জিজ্ঞেস করল,

—“এর মধ্যে এমন কী আছে?”

মেকানিক একটা ছোট্ট ক্যাসেট বের করল।

—“এটা কোথা থেকে এল?”

রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—“রেডিওর ভেতরেই ছিল?”

মেকানিক মাথা নাড়ল।

ক্যাসেটটা অনেক পুরনো।

রিয়া বাড়ি ফিরে অশোকবাবুকে সব বলল।

তিনি ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“চালিয়ে দে।”

রিয়া পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার জোগাড় করল।

বোতাম চাপতেই ভেসে এল এক তরুণীর কণ্ঠ—

“অশোক, তুমি যদি কোনওদিন এই কথাগুলো শোনো, তাহলে বুঝবে আমি তোমাকে ভুলিনি।”

অশোকবাবুর হাত কেঁপে উঠল।

রিয়া নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

কণ্ঠস্বরটি বলছিল,

“বাবা আমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না আবার কখন ফিরতে পারব। কিন্তু তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় রেডিওটা চালিয়ে রেখো। কোনওদিন যদি আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাও, বুঝবে আমি ফিরে এসেছি।”

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

শেষে সেই কণ্ঠ বলল,

“আর যদি আমি ফিরতে না পারি, তবুও রেডিওটা চালিয়ে রেখো। কারণ অপেক্ষা করা মানে শুধু কাউকে পাওয়ার আশা নয়। অপেক্ষা মানে কাউকে ভুলে না যাওয়া।”

ক্যাসেট থেমে গেল।

ঘরে নিস্তব্ধতা।

অশোকবাবুর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।

রিয়া ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—“তিনি কোথায়?”

অশোকবাবু জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“জানি না।”

—“আপনি খুঁজেছিলেন?”

—“চল্লিশ বছর।”

পরদিন রিয়া পুরনো রেডিও অনুষ্ঠানের আর্কাইভ খুঁজতে শুরু করল।

কণ্ঠস্বরটি কোনও অনুষ্ঠানের ছিল না।

ক্যাসেটটি ব্যক্তিগত রেকর্ডিং।

তবু ক্যাসেটের বাক্সের নিচে একটি পুরনো কাগজ পাওয়া গেল।

একটি নাম।

মাধুরী সেন।

আর একটি হাসপাতালের নাম।

রিয়া অনেক খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারল, মাধুরী সেন নামে একজন বৃদ্ধা এখনও বেঁচে আছেন।

শহরটা অন্য।

ঠিকানা পাওয়া গেল।

দু’দিন পর অশোকবাবু আর রিয়া সেই ঠিকানায় পৌঁছাল।

দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা।

অশোকবাবুকে দেখে তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল।

অশোকবাবু শুধু বললেন,

—“রেডিওটা এখনও চালাই।”

বৃদ্ধার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

—“আমি ভেবেছিলাম তুমি আর অপেক্ষা করবে না।”

অশোকবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“তুমি বলেছিলে অপেক্ষা করতে।”

বৃদ্ধা চোখ মুছে বললেন,

—“এত বছর?”

—“কণ্ঠস্বরটা তো প্রতিদিন শুনতাম।”

দু’জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

রিয়া একটু দূরে সরে গেল।

কারণ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের মধ্যে থাকা যায় না।

সন্ধ্যা সাতটায় অশোকবাবুর বাড়িতে আবার রেডিও বাজল।

এবার পুরনো কাঁপা শব্দের সঙ্গে মিশে গেল দুটি বৃদ্ধ কণ্ঠের হাসি।

রেডিওর গান শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু অপেক্ষার গল্পটা সেদিনই যেন শেষ হল।

কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে ফিরে আসে দেরিতে—কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আমরা বুঝতে পারি অপেক্ষাটাও ভালোবাসারই একটি রূপ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

করিডরের বেঞ্চ।

হাসপাতালের তৃতীয় তলার করিডরের শেষ প্রান্তে একটা কাঠের বেঞ্চ ছিল।

সকাল থেকে রাত—প্রায় সারাদিনই সেখানে কেউ না কেউ বসে থাকত।

সেদিন রাত দুটোয় বেঞ্চটায় বসে ছিল সমীর।

হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।

তাতে লেখা—

“অপারেশন থিয়েটার—৩।”

তার স্ত্রী ভিতরে।

সমীরের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপা ভয়।

ঠিক তখন পাশের দরজা দিয়ে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন।

বৃদ্ধের হাতে একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ।

তিনি সমীরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

—“আপনারও?”

সমীর বুঝতে না পেরে বলল,

—“জি?”

—“অপেক্ষা।”

সমীর মাথা নাড়ল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“আমার মেয়ে ভিতরে।”

দু’জনেই চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর সমীর জিজ্ঞেস করল,

—“কতক্ষণ হলো?”

—“চার ঘণ্টা।”

সমীর অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি একা?”

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

—“আমি আর কে আছি?”

সমীর আর প্রশ্ন করল না।

ভোরের দিকে নার্স এসে সমীরকে ডাকল।

—“আপনার রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের গ্রুপ?”

সমীর বলল।

নার্স চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর আবার এসে বলল,

—“আপনার সঙ্গে কেউ রক্ত দিতে পারবেন?”

সমীর মাথা নিচু করল।

—“আমি নিজেই দিতে পারব।”

বৃদ্ধ পাশ থেকে বললেন,

—“আপনি চাইলে আমি দিতে পারি।”

সমীর অবাক হয়ে তাকাল।

—“আপনি?”

—“হ্যাঁ।”

—“কিন্তু আপনার মেয়ে তো ভিতরে!”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“রক্ত দিতে আধঘণ্টা লাগে। মানুষের পাশে থাকতে সারাজীবন লাগে।”

সমীর কিছু বলতে পারল না।

পরীক্ষা করে দেখা গেল, বৃদ্ধের রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে।

রক্ত দেওয়ার পর বৃদ্ধ আবার সেই বেঞ্চে এসে বসলেন।

সমীর তাঁর হাত ধরে বলল,

—“আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।”

বৃদ্ধ বললেন,

—“ঋণী হবেন না।”

—“তাহলে?”

—“কেউ একদিন আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজ আমি আপনার পাশে দাঁড়ালাম। এটাই জীবন।”

সকাল আটটার দিকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন,

—“অপারেশন সফল হয়েছে।”

সমীর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর বৃদ্ধকে খুঁজতে গেল।

বেঞ্চটা খালি।

কাপড়ের ব্যাগটাও নেই।

শুধু বেঞ্চের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।

সমীর তুলে পড়ল—

“আপনার স্ত্রী ভালো হয়ে উঠুন। আর যদি কোনওদিন কাউকে হাসপাতালে একা বসে থাকতে দেখেন, তার পাশে একটু বসবেন। সব রোগের ওষুধ হয়তো আপনার কাছে থাকবে না, কিন্তু একাকীত্বের ওষুধ আপনার কাছে থাকতেই পারে।”

সমীর কাগজটা বুকপকেটে রেখে দিল।

বছর দুয়েক পর।

একই হাসপাতাল।

একই করিডর।

একই বেঞ্চ।

সমীর এবার একা নয়।

তার সঙ্গে তার স্ত্রী।

দু’জনেই হাসপাতালের করিডরে বসে আছে।

হঠাৎ তারা দেখল, এক তরুণী একা বেঞ্চের কোণে বসে কাঁদছে।

সমীর উঠে তার পাশে গিয়ে বসল।

—“ভয় লাগছে?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

সমীর বলল,

—“ভয় পেলে একা থাকতে হয় না।”

তার স্ত্রী দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

করিডরের পুরনো বেঞ্চটা তখনও একই জায়গায় ছিল।

শুধু সেখানে বসা মানুষগুলো বদলে গিয়েছিল।

আর অদৃশ্যভাবে এক মানুষের ছোট্ট মানবিকতা থেকে আরেক মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়ছিল আরেকটি আলো।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

লাল সাইকেল।

বাড়ির পেছনের ছোট্ট ঘরটায় বহু বছর ধরে পড়ে ছিল লাল সাইকেলটা।

চাকা দুটোয় হাওয়া নেই। লোহার গায়ে মরচে। ঘণ্টাটাও নষ্ট।

তবু অয়ন কখনও সেটাকে ফেলে দিতে পারেনি।

কারণ সাইকেলটা তার বাবার।

বাবা মারা যাওয়ার আগে শেষবার বলেছিলেন,

—“এটা রেখে দিস। কোনওদিন কাজে লাগবে।”

অয়ন তখন হেসেছিল।

—“এই পুরনো সাইকেল দিয়ে কী হবে বাবা?”

বাবা শুধু বলেছিলেন,

—“সব জিনিসের কাজ টাকা দিয়ে মাপিস না।”

বাবা চলে যাওয়ার পর কথাটা অয়নের মনে বারবার ফিরে আসত।

কয়েক বছর পর অয়ন শহরে চাকরি পেল। নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, নতুন জীবন।

পুরনো সাইকেলটা তবু থেকে গেল।

একদিন বাড়ি পরিষ্কার করার সময় অয়নের স্ত্রী বলল,

—“এটা আর রেখে কী হবে? বিক্রি করে দাও।”

অয়ন কিছুক্ষণ সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“না।”

সেদিন বিকেলে সাইকেলটা পরিষ্কার করতে গিয়ে সে সিটের নিচে একটি ছোট্ট ধাতব বাক্স দেখতে পেল।

বাক্স খুলে বেরিয়ে এল কয়েকটি পুরনো কাগজ।

প্রথম কাগজে লেখা—

“অমলের পড়াশোনার খরচ—৫০০ টাকা।”

দ্বিতীয়টায়—

“রেণুর ওষুধ—৩০০ টাকা।”

তৃতীয়টায়—

“বিপ্লবের পরীক্ষার ফি—৭৫০ টাকা।”

অয়ন অবাক হয়ে গেল।

এই নামগুলো সে চেনে।

পাড়ার মানুষ।

কেউ এখন দোকান চালায়, কেউ অবসর নিয়েছে, কেউ অন্য শহরে চলে গেছে।

কিন্তু তার বাবা তাঁদের জন্য টাকা দিয়েছিলেন?

অয়ন আরও কাগজ বের করল।

প্রায় পঞ্চাশটি নাম।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয়—কোনও কাগজেই বাবার নিজের নাম নেই।

শেষ কাগজে মাত্র একটি লাইন—

“যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কাছ থেকে টাকা ফেরত নিতে নেই। একদিন তারা অন্য কাউকে সাহায্য করবে।”

অয়নের চোখ ভিজে উঠল।

পরদিন সে অমলকাকুর বাড়িতে গেল।

সব শুনে অমলকাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—“তোর বাবা কাউকে জানতে দিত না।”

—“আপনি টাকা ফেরত দেননি?”

—“দিতে গিয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, ‘আমাকে নয়, অন্য কাউকে দিয়ে দিও।’”

অয়ন চুপ করে রইল।

বাড়ি ফেরার পথে তার চোখে পড়ল—একটি ছোট ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সাইকেলের দিকে তাকিয়ে আছে।

ছেলেটির স্কুলের পোশাক পুরনো।

অয়ন জিজ্ঞেস করল,

—“সাইকেল চালাতে পারিস?”

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

—“আমাদের সাইকেল নেই।”

অয়ন কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বাড়িতে ফিরে সেই লাল সাইকেলটা বের করল।

চাকা ঠিক করাল।

ব্রেক বদলাল।

ঘণ্টা লাগাল।

পরদিন ছেলেটাকে ডেকে বলল,

—“এটা তোর।”

ছেলেটি অবাক হয়ে বলল,

—“কিন্তু কাকু, আমি টাকা দিতে পারব না।”

অয়ন হেসে বলল,

—“টাকা দিতে হবে না।”

—“তাহলে?”

অয়ন সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে বলল,

—“যেদিন তুই বড় হবি, আর কাউকে সাহায্য করার সুযোগ পাবি, তখন তাকে সাহায্য করবি।”

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

অয়ন সাইকেলটা তার হাতে তুলে দিল।

সেদিন রাতে অয়ন বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—“বাবা, তোমার সাইকেলটা কাজে লেগেছে।”

ছবির মানুষটি অবশ্য কোনও উত্তর দিলেন না।

তবু অয়নের মনে হল, ঘরের কোথাও যেন সেই পুরনো সাইকেলের ঘণ্টা একবার বেজে উঠল।

টিং…

অয়ন হেসে ফেলল।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

কিছু উত্তর শব্দে আসে না। মানুষের ভালো কাজের মধ্যেই তারা বেঁচে থাকে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

নীল দরজার ঘর।

শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল।

বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা। জানালাগুলোর কাচ ভাঙা। আর সামনের দরজাটা বহু বছর ধরে তালাবন্ধ।

তবু বাড়িটার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—দোতলায় একটি নীল দরজা।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই দরজার নিচ দিয়ে যেন এক ফালি আলো বেরোত।

পাড়ার সবাই বলত,

—“ও বাড়িতে কেউ থাকে না।”

কিন্তু রাহুল বিশ্বাস করত না।

কারণ সে নিজে বহুবার দেখেছে—রাত বাড়লে নীল দরজার নিচে আলো জ্বলে ওঠে।

একদিন প্রবল বৃষ্টির রাতে কৌতূহল সামলাতে না পেরে রাহুল বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল।

দরজাটা আশ্চর্যজনকভাবে খোলা ছিল।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে সে নীল দরজার সামনে দাঁড়াল।

ভেতর থেকে টুপটাপ শব্দ আসছে।

রাহুল দরজা ঠেলে খুলল।

ঘরের মাঝখানে একটি পুরনো টেবিল।

তার ওপর কেরোসিনের বাতি।

আর পাশে একটি কাঠের চেয়ার।

কিন্তু ঘরে কেউ নেই।

টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি খাতা।

রাহুল খাতা খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যে এই খাতা পড়ছ, দয়া করে শেষ পাতাটা পর্যন্ত পড়বে।”

রাহুল পড়তে শুরু করল।

লেখক একজন স্কুলশিক্ষক—নির্মলবাবু।

তিনি লিখেছিলেন, বহু বছর আগে এই ঘরে বসেই তিনি তাঁর এক ছাত্রকে পড়াতেন। ছেলেটির নাম ছিল শুভ।

শুভ অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। পড়াশোনায় ভালো হলেও একদিন বাবার মৃত্যুর পর তাকে স্কুল ছাড়তে হয়।

নির্মলবাবু তাকে বলেছিলেন,

—“তুই পড়া ছাড়বি না। আমি অপেক্ষা করব।”

কিন্তু শুভ আর ফিরে আসেনি।

দিন কেটে বছর।

নির্মলবাবু অবসর নেন।

তারপরও তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই ঘরে বাতি জ্বেলে বসতেন।

কারণ শুভ একদিন বলেছিল,

“স্যার, আমি একদিন বড় হয়ে আপনার কাছে ফিরব।”

রাহুল শেষ পাতার দিকে এগোল।

সেখানে মাত্র একটি বাক্য—

“শুভ, যদি কখনও ফিরে আসিস, দরজার নিচে আলোটা দেখে বুঝবি—আমি এখনও অপেক্ষা করছি।”

রাহুলের বুকটা কেমন করে উঠল।

খাতার নিচে একটা পুরনো ছবি ছিল।

ছবিতে নির্মলবাবু আর এক কিশোর।

ছবির পেছনে একটি ঠিকানা লেখা।

পরদিন রাহুল সেই ঠিকানা খুঁজতে বেরোল।

অনেক খোঁজার পর জানতে পারল, শুভ নামে একজন মানুষ সত্যিই ওই এলাকায় থাকেন।

এখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট।

রাহুল তাঁকে সব বলল।

বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর কাঁপা গলায় বললেন,

—“স্যার… এখনও অপেক্ষা করছেন?”

রাহুল উত্তর দিতে পারল না।

শুভ পরদিন রাহুলের সঙ্গে সেই বাড়িতে এলেন।

দোতলায় উঠে নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি থমকে গেলেন।

ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর খাতাটা দেখলেন।

তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

—“স্যার, আমি ফিরতে এত দেরি করে ফেললাম…”

ঘরের বাতিটা তখনও জ্বলছিল।

হঠাৎ জানালা দিয়ে আসা বাতাসে শিখাটা কেঁপে উঠল।

শুভ খাতার শেষ পাতায় হাত রাখলেন।

তারপর পকেট থেকে একটি ছোট্ট চিঠি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন।

চিঠিতে লেখা—

“স্যার, আপনি বলেছিলেন আমি একদিন ফিরব। আমি ফিরেছি। শুধু আপনি নেই। কিন্তু আপনার আলোটা এখনও জ্বলছে।”

রাহুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

শুভ উঠে যাওয়ার আগে বাতিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আজ থেকে এই আলোটা আমি জ্বালাব।”

সেদিনের পর নীল দরজার ঘর আর কখনও অন্ধকার হয়নি।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে একটি বাতি জ্বলত।

কেউ জানত না, সেই আলো কাকে দেখানোর জন্য।

কিন্তু রাহুল জানত—

কিছু প্রতিশ্রুতি মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘ হয়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

শেষ বাসের আগে।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।

শহরের প্রান্তের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডটা প্রায় ফাঁকা। দোকানপাট একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু একটি চায়ের দোকানে ম্লান আলো জ্বলছে।

দোকানদার নিতাই হিসেব করছিলেন।

ঠিক তখনই তিনি দেখলেন, বেঞ্চের এক কোণে একটা ছোট্ট নীল ব্যাগ পড়ে আছে।

চারপাশে তাকালেন।

কেউ নেই।

ব্যাগটা হাতে নিয়ে ডাকলেন,

—“কার ব্যাগ? কারও ব্যাগ পড়ে গেছে?”

কোনও উত্তর এল না।

শেষ বাসটা আসতে আর দশ মিনিট।

নিতাই ব্যাগটা দোকানের ভেতর রেখে দিলেন। ভাবলেন, সকালে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই খুঁজতে আসবে।

ব্যাগটা তুলতেই তাঁর মনে হল, ভেতরে যেন কিছু ভারী জিনিস আছে।

তিনি ব্যাগ খোলেননি।

কিছুক্ষণ পর একটি বাস এসে দাঁড়াল।

একজন তরুণী ছুটে এসে বাসের দরজার কাছে দাঁড়িয়েই হঠাৎ থেমে গেল।

তার মুখ ফ্যাকাশে।

সে নিজের কাঁধে হাত দিয়ে ব্যাগ খুঁজল।

তারপর চারদিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,

—“আমার ব্যাগটা… এখানে ছিল…”

নিতাই সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন।

—“নীল ব্যাগ?”

মেয়েটি দৌড়ে এল।

—“হ্যাঁ! হ্যাঁ, নীল ব্যাগ!”

নিতাই ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন।

মেয়েটি ব্যাগ খুলে ভেতরের জিনিস দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

—“সব আছে?”

নিতাই জিজ্ঞেস করলেন।

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

তারপর ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করে বুকে চেপে ধরল।

নিতাই বললেন,

—“এটার জন্য এত চিন্তা করছিলেন?”

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“এটা আমার বাবার শেষ চিঠি।”

নিতাই আর কিছু বললেন না।

মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল,

—“বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে এই চিঠিটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যেদিন খুব একা লাগবে, পড়িস।’”

তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

—“আজ প্রথমবার বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে যাচ্ছি। বাবার চিঠিটা সঙ্গে না থাকলে মনে হচ্ছিল… আমি যেন একেবারেই একা হয়ে যাব।”

নিতাই মৃদু স্বরে বললেন,

—“তাই বুঝি এত তাড়াহুড়ো?”

মেয়েটি হেসে মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

বাসের হর্ন বাজল।

মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।

তারপর পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে নিতাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।

—“আপনি এটা রাখুন।”

নিতাই হাত সরিয়ে নিলেন।

—“কেন?”

—“আপনি আমার ব্যাগটা রেখে দিয়েছেন।”

নিতাই হেসে বললেন,

—“আমি শুধু আমার কাজ করেছি।”

মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল,

—“আপনার মতো মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা এখনও নিরাপদ মনে হয়।”

বাস ছেড়ে দিল।

নিতাই অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

পরদিন সকালে দোকান খুলতে এসে দেখলেন, তাঁর দোকানের সামনে একটি ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।

তাতে লেখা—

“কাকু, বাবার চিঠিটা গত রাতে পড়েছিলাম। সেখানে বাবা লিখেছিলেন—‘মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখিস, কারণ পৃথিবীতে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষ এখনও বেশি।’ কাল রাতে আপনার সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো কথাটা বিশ্বাস করতে পারতাম না। — মেঘলা”

নিতাই কাগজটা ভাঁজ করে তাঁর পুরনো হিসেবের খাতার মধ্যে রেখে দিলেন।

সেদিন থেকে দোকান বন্ধ করার আগে তিনি প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে নিতেন।

কোনও হারানো ব্যাগ পাওয়ার আশায় নয়।

বরং এই বিশ্বাসটা মনে রাখার জন্য—

কখনও কখনও আমরা কারও জীবনে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য আসি, অথচ সেই কয়েক মিনিটই তার ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসটাকে আবার জোড়া লাগিয়ে দেয়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : বৃষ্টির রাতে বন্ধ রেডিও।।

অভ্রর বাড়িতে একটি পুরোনো রেডিও ছিল। ছোটবেলায় তার দাদু সেটি ব্যবহার করতেন। বহু বছর ধরে রেডিওটি নষ্ট হয়ে পড়েছিল। ব্যাটারি নেই, অ্যান্টেনা ভাঙা, সুইচও কাজ করে না।

তবু এক বর্ষার রাতে সেটি হঠাৎ বেজে উঠল।

রাত তখন ১টা ১৩ মিনিট।

অভ্র ঘুম থেকে উঠে শুনল—

“…যে শুনছেন, তিনি যেন আজ রাতেই ঘরের উত্তর দিকের জানালাটা বন্ধ করেন…”

অভ্র বিছানায় উঠে বসল।

রেডিওটা নিজে থেকেই চলছে!

সে কাছে গিয়ে সুইচ ঘোরাল। কোনো কাজ হলো না।

আবার রেডিও থেকে আওয়াজ এল—

“অভ্র…”

তার বুক কেঁপে উঠল।

কণ্ঠটা তাকে নাম ধরে ডাকছে।

— কে?

রেডিও কিছুক্ষণ নীরব।

তারপর ভেসে এল,

“কাল সকাল হওয়ার আগেই সত্যিটা খুঁজে বের করো।”

হঠাৎ রেডিও বন্ধ হয়ে গেল।

পরদিন সকালে অভ্র ভেবেছিল, সবটাই হয়তো স্বপ্ন।

কিন্তু রেডিওর পাশে একটি পুরোনো কাগজ পড়ে ছিল।

কাগজে শুধু লেখা—

“১৯৯৮—উত্তর জানালা।”

অভ্রর কৌতূহল হলো।

সে বাড়ির পুরোনো নথি ঘাঁটতে শুরু করল। জানতে পারল, ১৯৯৮ সালে তার দাদুর ছোট ভাই সমীর হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছিলেন।

পরিবারে বলা হতো, তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

কিন্তু কেন?

কেউ জানত না।

অভ্রর দিদা তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি পুরোনো কথাটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— সমীর চলে যায়নি।

— তাহলে?

— ওকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

অভ্র অবাক হয়ে গেল।

দিদা জানালেন, সমীর বাড়ির জমি বিক্রির বিরুদ্ধে ছিলেন। পরিবারের কয়েকজন সদস্য গোপনে জমি বিক্রি করতে চেয়েছিল। সমীর বিষয়টি জানতে পেরে বাধা দিয়েছিলেন।

তারপর এক রাতে তিনি নিখোঁজ হন।

অভ্র জিজ্ঞেস করল,

— কেউ পুলিশে খবর দেয়নি?

— দিয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভ্র সেই রাতের কথা ভাবতে লাগল।

“উত্তর জানালা।”

বাড়ির উত্তর দিকে একটি পুরোনো ঘর ছিল, যা বহু বছর ধরে বন্ধ।

সে তালা খুলে ঘরে ঢুকল।

ধুলোয় ঢাকা আসবাবের মধ্যে একটি কাঠের আলমারি দেখতে পেল।

আলমারির পেছনে দেয়ালের সঙ্গে একটি ছোট ফাঁক।

সেখানে হাত ঢোকাতেই একটি টিনের বাক্স বেরিয়ে এল।

বাক্সে ছিল কিছু দলিল, একটি পুরোনো ক্যাসেট এবং সমীরের হাতের লেখা ডায়েরির কয়েকটি পৃষ্ঠা।

ডায়েরিতে লেখা ছিল—

“আজ বুঝলাম, আমার নিজের মানুষদেরই বিশ্বাস করা উচিত নয়। জমির দলিল বদলানো হচ্ছে। আমি প্রমাণ রেখে যাচ্ছি।”

শেষ পাতায় লেখা—

“যদি আমি আর ফিরে না আসি, উত্তর জানালার পেছনে খুঁজবে।”

অভ্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই বাইরে বজ্রপাত হলো।

আর ঘরের পুরোনো রেডিওটি আবার বেজে উঠল।

এই ঘরে তো রেডিও থাকার কথাই নয়!

অভ্র ধীরে ধীরে রেডিওটির কাছে গেল।

ভেসে এল সমীরের কণ্ঠ—

“ডায়েরি পেয়েছ?”

অভ্র কাঁপা গলায় বলল,

— হ্যাঁ।

“তাহলে এবার ক্যাসেটটা শোনো।”

রেডিও বন্ধ হয়ে গেল।

অভ্র ক্যাসেটটি পুরোনো প্লেয়ারে চালাল।

প্রথমে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর দু’জন মানুষের কথোপকথন।

একজন বলছে,

— তুমি যদি কাউকে বলো, তাহলে সব শেষ।

সমীরের কণ্ঠ—

— সত্য লুকিয়ে রাখা যাবে না।

তারপর ধস্তাধস্তির শব্দ।

ক্যাসেট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

অভ্র সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দিল।

পুরোনো মামলার নথি খোলা হলো। ক্যাসেটের শব্দ পরীক্ষা করে কয়েকজন পুরোনো আত্মীয়ের পরিচয় শনাক্ত করা গেল।

বহু বছর পর সত্য প্রকাশ পেল।

সমীরকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর দেহ বাড়ির কাছের একটি পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করল।

পরিবারের বহু পুরোনো রহস্যের অবসান হলো।

সেদিন রাতে অভ্র আবার সেই ঘরে গেল।

রেডিওটা টেবিলের ওপর রাখা।

সে বলল,

— সমীরকাকা?

কোনো উত্তর নেই।

অভ্র আবার বলল,

— আপনি যা চেয়েছিলেন, সত্যিটা প্রকাশ হয়েছে।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর রেডিও থেকে খুব ক্ষীণ শব্দ এল—

“ধন্যবাদ।”

তারপর রেডিওটি চিরদিনের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

অভ্র পরদিন সেটি যত্ন করে একটি বাক্সে তুলে রাখল।

রেডিওটি আর কখনো চালু হয়নি।

তবে উত্তর জানালার পাশে দাঁড়ালে এখনও মাঝে মাঝে বৃষ্টির রাতে অভ্রর মনে হয়, কেউ যেন খুব ধীরে বলছে—

“সত্যি কথা বলতে কখনো দেরি হয় না।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : বৃষ্টিভেজা বারান্দায় শেষ দেখা।

রাত আটটা।

অর্ক বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

এই সময় সাধারণত কেউ আসত না।

দরজা খুলতেই অর্ক থমকে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে মীরা।

বারো বছর পর।

চোখে ক্লান্তি, হাতে ছোট একটি ব্যাগ।

অর্ক কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

মীরা মৃদু হেসে বলল,

— আমাকে দেখে এত অবাক হয়েছ?

— তুমি এখানে?

— আজ শুধু এক রাতের জন্য এসেছি।

অর্ক তাকে ভেতরে নিয়ে এল।

দু’জনের মধ্যে বারো বছরের দূরত্ব যেন ঘরের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছিল।

একসময় তারা একে অপরকে ভালোবাসত।

কিন্তু মীরা হঠাৎ একদিন অর্ককে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।

অর্ক বহু বছর ধরে ভেবেছিল, মীরা তাকে ভালোবাসেনি।

সেই অভিমান সে কখনো কাউকে বলেনি।

চা বানাতে বানাতে অর্ক জিজ্ঞেস করল,

— এত বছর পর হঠাৎ কেন?

মীরা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

— একটা কাজ ছিল।

— কী কাজ?

মীরা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।

— এটা তোমার জন্য।

অর্ক খামটি হাতে নিল।

ভেতরে একটি হাসপাতালের কাগজ।

তারিখ বারো বছর আগের।

অর্ক কাগজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

মীরার বাবার জরুরি অস্ত্রোপচার দরকার ছিল। প্রচুর টাকা লাগত। সেই সময় মীরা অর্কের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে একটি অন্য শহরে চলে গিয়েছিল।

অর্ক ধীরে বলল,

— তুমি আমাকে কিছু বলোনি কেন?

মীরা চোখ নামিয়ে বলল,

— তোমার কাছে সাহায্য চাইলে তুমি নিজের জীবনটা নষ্ট করতে। আমি সেটা চাইনি।

— কিন্তু তুমি আমাকে একটা সুযোগও দিলে না!

মীরা চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— তোমার বাবা তখন অসুস্থ ছিলেন। তোমার নিজের পরিবারই তোমার ওপর নির্ভর করছিল। আমি জানতাম, তুমি আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের সবকিছু বিক্রি করে দিতে পারো।

অর্কের চোখ ভিজে উঠল।

— তুমি কীভাবে জানলে?

মীরা মৃদু হেসে বলল,

— কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসতে।

বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছিল।

অর্ক বলল,

— তোমার বাবা?

— বেঁচে ছিলেন আরও কয়েক বছর। তারপর চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

অর্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— তুমি কি কখনো আমাকে মনে করেছ?

মীরা উত্তর দিল না।

তার বদলে ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে অর্ক আর মীরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

ছবির পেছনে লেখা—

“যদি কখনো আলাদা হয়ে যাই, তবুও এই দিনটা যেন হারিয়ে না যায়।”

অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— তুমি এতদিন এটা রেখেছিলে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে বিয়ে করোনি কেন?

মীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— সবাই বিয়ে করে সংসার করার জন্য। আমি পারিনি।

অর্ক মৃদু হেসে বলল,

— আমিও না।

দু’জনেই হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই হাসির মধ্যে বহু বছরের কষ্ট মিশে ছিল।

রাত বাড়তে লাগল।

মীরা বলল,

— আমাকে কাল ভোরে চলে যেতে হবে।

অর্ক জানত, এবারও সে তাকে আটকে রাখতে পারবে না।

তবু সে বলল,

— এবার অন্তত যাওয়ার আগে একটা কথা বলো।

— কী?

— তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে?

মীরা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— ভালোবাসতাম না।

অর্কের মুখ ম্লান হয়ে গেল।

মীরা একটু থেমে বলল,

— ভালোবাসি।

অর্ক চোখ তুলে তাকাল।

মীরা হেসে বলল,

— অতীতের কথা বলতে গেলে “ভালোবাসতাম” হয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা শেষ হয়নি।

ভোর হওয়ার আগেই মীরা চলে গেল।

অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

বারান্দায় তখনও বৃষ্টির জল জমে আছে।

মেঝেতে মীরার পায়ের ছোট ছোট ছাপ।

অর্ক জানত না তারা আবার কখনো দেখা করবে কি না।

কিন্তু এবার তার মনে কোনো অভিমান ছিল না।

শুধু একটা উপলব্ধি—

কখনো কখনো মানুষ দূরে চলে যায় ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে নয়।

বরং এত বেশি ভালোবাসে বলেই নিজের কষ্টটুকু একা বহন করে।

সেদিন সকালে অর্ক বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল, বৃষ্টি থেমে গেছে।

রোদ উঠছে।

আর বারান্দার কোণে মীরা একটি ছোট কাগজ রেখে গেছে।

তাতে লেখা—

“এবার যদি আবার দেখা হয়, কোনো কথা লুকিয়ে রেখো না।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : মধ্যরাতের লিফট।।

রাত তখন ১২টা ৪৫।

অফিসের শেষ কর্মী হিসেবে নীহারিকা সতেরো তলা থেকে লিফটে উঠল। পুরো বিল্ডিং প্রায় ফাঁকা। নিচের নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া আর কাউকে সে দেখতে পাচ্ছিল না।

লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক দৌড়ে এসে ভেতরে ঢুকলেন।

— একটু দাঁড়াবেন মা?

নীহারিকা দরজা আটকে দিল।

বৃদ্ধ লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,

— নিচতলা।

লিফট নামতে শুরু করল।

দুই তলা…

এক তলা…

হঠাৎ লিফট থেমে গেল।

আলো নিভে গেল।

নীহারিকা আতঙ্কিত হয়ে বলল,

— কী হলো?

বৃদ্ধ লোকটি শান্ত গলায় বললেন,

— ভয় পাবেন না।

কয়েক সেকেন্ড পর জরুরি আলো জ্বলে উঠল।

নীহারিকা ইন্টারকম চাপল।

কোনো উত্তর নেই।

বৃদ্ধ লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো ঘড়ি বের করে দেখলেন।

— আর দশ মিনিট।

— কীসের দশ মিনিট?

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।

নীহারিকা আবার ইন্টারকম চাপল।

এবার ওপাশ থেকে নিরাপত্তারক্ষীর কণ্ঠ ভেসে এল,

— ম্যাডাম, লিফটটা মাঝপথে আটকে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার আসছে।

নীহারিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু হঠাৎ বৃদ্ধ লোকটি বললেন,

— আপনি কি জানেন, এই লিফটে আগে একজন মারা গিয়েছিল?

নীহারিকার মুখ শুকিয়ে গেল।

— কী বলছেন?

— প্রায় কুড়ি বছর আগে। রাতের শিফটের একজন কর্মচারী। লিফটের দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়ায় সে নিচে পড়ে যায়।

— আপনি সেটা জানেন কীভাবে?

বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— কারণ সেদিন আমি তার সঙ্গে ছিলাম।

নীহারিকা চুপ করে গেল।

তারপর বৃদ্ধ বললেন,

— তার নাম ছিল নীলয়।

লিফটের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইল।

নীহারিকা নিজের হাত জড়িয়ে ধরল।

— আপনি কি নীলয়কে চিনতেন?

— খুব ভালোভাবে।

— তাহলে আপনি…?

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

— আমি তার বাবা।

ঠিক তখন লিফটের আলো আবার নিভে গেল।

অন্ধকারে বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল,

— আজ তার মৃত্যুর কুড়ি বছর পূর্ণ হলো।

নীহারিকা আতঙ্কে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।

হঠাৎ লিফটের ভেতর থেকে আরেকটি শব্দ ভেসে এল।

টুপ…

টুপ…

যেন কারও জুতোর শব্দ।

কিন্তু সেখানে তো দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই!

নীহারিকা কাঁপা গলায় বলল,

— আপনি শুনছেন?

বৃদ্ধ বললেন,

— হ্যাঁ।

শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল।

তারপর লিফটের মেঝেতে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র পড়ে গেল।

নীহারিকা টর্চ জ্বালিয়ে দেখল—

“নীলয় দত্ত — রাত্রিকালীন কর্মী।”

কার্ডটির তারিখ কুড়ি বছর আগের।

বৃদ্ধ সেটি হাতে তুলে নিলেন।

তার চোখে জল।

— আমি প্রতিটি বছর এই দিনে এখানে আসি। কিন্তু আজ প্রথমবার লিফটে আটকে গেলাম।

হঠাৎ ইন্টারকম বেজে উঠল।

নিরাপত্তারক্ষী বললেন,

— লিফট ঠিক হয়ে গেছে। দরজা খুলছে।

দরজা খুলতেই নিচে কেউ ছিল না।

শুধু নিরাপত্তারক্ষী দৌড়ে এসে বলল,

— ম্যাডাম, আপনি একাই ছিলেন?

নীহারিকা অবাক হয়ে বলল,

— না! এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক…

সে পিছনে তাকাল।

লিফটের ভেতর কেউ নেই।

শুধু মেঝেতে পড়ে আছে সেই পুরোনো পরিচয়পত্র।

নীহারিকার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে নিরাপত্তারক্ষীকে সব বলল।

লোকটি পরিচয়পত্র দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।

— এটা নীলয় দত্তের।

— আপনি তাকে চিনতেন?

— আমার বাবা তাকে চিনতেন। শুনেছি, নীলয়বাবুর বাবা প্রতি বছর এই দিনে এখানে আসতেন।

নীহারিকা চারদিকে তাকাল।

— উনি কোথায় গেলেন?

নিরাপত্তারক্ষী ধীরে বলল,

— ম্যাডাম… নীলয়বাবুর বাবা তো বারো বছর আগেই মারা গেছেন।

নীহারিকা কোনো কথা বলতে পারল না।

পরদিন সকালে বিল্ডিংয়ের পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে গিয়ে সে একটি ছবি পেল।

ছবিতে তরুণ নীলয় দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার পাশে।

ছবির পেছনে লেখা—

“ছেলের সঙ্গে শেষ রাতের ডিউটি।”

নীহারিকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝল, আগের রাতের বৃদ্ধটি হয়তো সত্যিই এসেছিলেন।

ছেলেকে শেষবার দেখতে।

কুড়ি বছর আগে যে লিফট তাকে ছেলের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই লিফটেই ফিরে এসে তিনি যেন নিজের অপেক্ষাটুকু শেষ করেছিলেন।

সেদিন থেকে নীহারিকা আর কখনো মধ্যরাতে লিফটে একা ওঠেনি।

তবে বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তারক্ষীরা এখনও বলে—

কুড়ি বছর ধরে বন্ধ থাকা পুরোনো লিফটটি মাঝরাতে কখনো কখনো নিজে থেকেই এক তলায় থামে।

দরজা খুলে যায়।

ভেতরে কেউ থাকে না।

শুধু মেঝেতে পড়ে থাকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র।

নীলয় দত্ত।

Share This