Categories
গল্প

অচেনা স্টেশনের যাত্রী।

প্রথম অধ্যায়: যে স্টেশনে সব ট্রেন থামে না
পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট রেলস্টেশন— শিউলিবাড়ি। মানচিত্রে স্টেশনটির নাম থাকলেও খুব কম ট্রেন সেখানে থামত। দিনে মাত্র চারটি লোকাল ট্রেন। স্টেশন চত্বরের পাশে একটি পুরোনো বটগাছ, একটি চায়ের দোকান, আর একটি ছোট্ট বুকস্টল।
স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ছিলেন অমল চক্রবর্তী। বয়স প্রায় ষাট। চাকরির শেষ বছর চলছে। স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগেই। একমাত্র ছেলে বিদেশে চাকরি করে। তাই স্টেশনই ছিল তাঁর পরিবার।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যার ট্রেনের অপেক্ষায় তিনি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে শীতের ছোঁয়া।
লোকাল ট্রেনটি এসে থামল।
কয়েকজন যাত্রী নামল।
সবাই চলে গেল।
শুধু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রইলেন।
সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চাদর, হাতে পুরোনো চামড়ার স্যুটকেস।
লোকটির চোখে যেন এক অদ্ভুত শান্তি।
অমলবাবু এগিয়ে গিয়ে বললেন,
— “কোথায় যাবেন?”
লোকটি মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি একজনের অপেক্ষায় এসেছি।”
— “কার?”
— “যিনি এখনও জানেন না যে আমি এসেছি।”
কথাটা শুনে অমলবাবু অবাক হয়ে গেলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়: অদ্ভুত অতিথি
স্টেশনে রাত কাটানোর মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
অমলবাবু লোকটিকে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন।
খাওয়ার সময় তিনি জানতে চাইলেন,
— “আপনার নাম?”
লোকটি উত্তর দিলেন,
— “নিরঞ্জন।”
— “কোথা থেকে এসেছেন?”
— “অনেক দূর থেকে।”
— “কোন শহর?”
নিরঞ্জন আবারও শুধু হাসলেন।
সেই হাসির মধ্যে যেন বহু বছরের ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু বললেন,
— “এই স্টেশনটা বদলায়নি।”
অমলবাবু অবাক।
এই মানুষটি আগে এখানে এসেছিলেন?
কিন্তু তিনি তো কোনোদিন দেখেননি!
তৃতীয় অধ্যায়: পুরোনো ছবির রহস্য
পরদিন সকালে চা খেতে খেতে নিরঞ্জনের চোখ পড়ল দেওয়ালে টাঙানো একটি পুরোনো ছবিতে।
ছবিটি ছিল প্রায় চল্লিশ বছরের পুরোনো।
স্টেশনের কর্মীদের দলগত ছবি।
নিরঞ্জন ছবির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ছবির এক যুবকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,
— “এঁর নাম ছিল রমেশ দত্ত। খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন।”
অমলবাবুর শরীর কেঁপে উঠল।
রমেশ দত্ত ছিলেন তাঁর আগের স্টেশনমাস্টার।
কিন্তু তিনি তো প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে মারা গেছেন!
নিরঞ্জন এত কিছু জানলেন কীভাবে?
চতুর্থ অধ্যায়: হারিয়ে যাওয়া চিঠি
স্টেশনের পুরোনো রেকর্ডরুমে বহু বছরের ফাইল জমে ছিল।
নিরঞ্জন হঠাৎ বললেন,
— “ওখানে একটি লাল রঙের টিনের বাক্স আছে।”
অমলবাবু অবাক হয়ে বললেন,
— “আপনি জানলেন কীভাবে?”
তবুও দুজনে মিলে রেকর্ডরুমে গেলেন।
ধুলোমাখা তাকের এক কোণে সত্যিই ছিল একটি লাল টিনের বাক্স।
ভেতরে পুরোনো কাগজপত্রের সঙ্গে একটি খাম।
খামের ওপর লেখা—
“ফিরে এলে খুলবে।”
চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।
প্রাপক—
নিরঞ্জন সেন।
অমলবাবু বিস্ময়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকালেন।
— “এটা তো আপনারই নাম!”
নিরঞ্জন কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।
পঞ্চম অধ্যায়: ত্রিশ বছরের অপেক্ষা
চিঠিটি লিখেছিলেন রমেশ দত্ত।
তাতে লেখা ছিল—
“নিরঞ্জন,
যদি কোনোদিন ফিরে আসো, জেনে নিও—তোমার মা শেষ দিন পর্যন্ত তোমার অপেক্ষা করেছেন।
তিনি তোমাকে কখনও দোষ দেননি।
শুধু বলতেন, একদিন আমার ছেলে ফিরবেই।”
চিঠি পড়ে নিরঞ্জনের চোখ ভিজে উঠল।
ধীরে ধীরে তিনি নিজের গল্প বলতে শুরু করলেন।
যুবক বয়সে কাজের খোঁজে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
বিদেশে চাকরি পান।
তারপর একের পর এক সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন।
চিঠিপত্রের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ফিরে আসতে আসতে কেটে যায় ত্রিশ বছর।
কিন্তু যখন তিনি দেশে ফেরেন—
তখন আর মা বেঁচে নেই।
ষষ্ঠ অধ্যায়: মায়ের বাড়ি
অমলবাবু নিরঞ্জনকে নিয়ে গেলেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে।
বাড়িটি এখন ভাঙাচোরা।
উঠোনে একটি আমগাছ।
দরজায় মরচে ধরা তালা।
পাশের বাড়ির বৃদ্ধা সরলা দেবী নিরঞ্জনকে দেখে কেঁদে ফেললেন।
— “তুই নিরঞ্জন?”
— “হ্যাঁ কাকিমা…”
— “তোর মা শেষ দিন পর্যন্ত সন্ধ্যেবেলা দরজায় বসে থাকত। বলত—’আমার ছেলে আজ আসবে।'”
নিরঞ্জনের আর নিজেকে সামলানো গেল না।
তিনি মাটিতে বসে কাঁদতে লাগলেন।
সপ্তম অধ্যায়: নতুন সিদ্ধান্ত
কয়েকদিন পরে নিরঞ্জন বাড়িটি মেরামত করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু নিজের থাকার জন্য নয়।
তিনি গ্রামের শিশুদের জন্য সেখানে একটি ছোট্ট পাঠাগার গড়ে তুলবেন।
মায়ের নামে।
“সুবর্ণা স্মৃতি পাঠাগার”।
অমলবাবু বললেন,
— “এটাই তোমার মায়ের সবচেয়ে বড় আনন্দ হতো।”
নিরঞ্জন মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি অনেক দেরি করেছি। অন্তত এখন কিছু ভালো কাজ করতে চাই।”
অষ্টম অধ্যায়: বিদায়
এক মাস পরে পাঠাগারের উদ্বোধন হলো।
গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নতুন বই হাতে নিয়ে হাসছে।
নিরঞ্জনের চোখে জল।
অমলবাবু বললেন,
— “এবার কোথায় যাবে?”
নিরঞ্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এবার কোথাও পালাব না।”
“যে মানুষ নিজের শিকড় খুঁজে পায়, তার আর দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।”
সেদিন সন্ধ্যায় সেই ছোট্ট স্টেশনে আবার একটি ট্রেন এসে থামল।
নিরঞ্জন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিন্তু এবার তিনি কোনো অচেনা যাত্রী নন।
তিনি নিজের ঘরে ফিরে আসা একজন মানুষ।
উপসংহার
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা কখনও কখনও এক শহর থেকে আরেক শহরে নয়।
বরং নিজের অতীতের কাছে ফিরে আসার যাত্রা।
যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে,
যে মানুষ হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে সম্মান করতে শেখে,
সে-ই প্রকৃত অর্থে বাড়ি ফেরে।
শিউলিবাড়ি স্টেশনের সেই অচেনা যাত্রী তাই শিখিয়ে গেল—
সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু অপেক্ষা আর ভালোবাসা কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না।
সমাপ্ত। 🚉📖

Share This
Categories
গল্প

অচেনা স্টেশনের যাত্রী।।

প্রথম অধ্যায়: যে স্টেশনে সব ট্রেন থামে না
পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট রেলস্টেশন— শিউলিবাড়ি। মানচিত্রে স্টেশনটির নাম থাকলেও খুব কম ট্রেন সেখানে থামত। দিনে মাত্র চারটি লোকাল ট্রেন। স্টেশন চত্বরের পাশে একটি পুরোনো বটগাছ, একটি চায়ের দোকান, আর একটি ছোট্ট বুকস্টল।
স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ছিলেন অমল চক্রবর্তী। বয়স প্রায় ষাট। চাকরির শেষ বছর চলছে। স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগেই। একমাত্র ছেলে বিদেশে চাকরি করে। তাই স্টেশনই ছিল তাঁর পরিবার।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যার ট্রেনের অপেক্ষায় তিনি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে শীতের ছোঁয়া।
লোকাল ট্রেনটি এসে থামল।
কয়েকজন যাত্রী নামল।
সবাই চলে গেল।
শুধু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রইলেন।
সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চাদর, হাতে পুরোনো চামড়ার স্যুটকেস।
লোকটির চোখে যেন এক অদ্ভুত শান্তি।
অমলবাবু এগিয়ে গিয়ে বললেন,
— “কোথায় যাবেন?”
লোকটি মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি একজনের অপেক্ষায় এসেছি।”
— “কার?”
— “যিনি এখনও জানেন না যে আমি এসেছি।”
কথাটা শুনে অমলবাবু অবাক হয়ে গেলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়: অদ্ভুত অতিথি
স্টেশনে রাত কাটানোর মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
অমলবাবু লোকটিকে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন।
খাওয়ার সময় তিনি জানতে চাইলেন,
— “আপনার নাম?”
লোকটি উত্তর দিলেন,
— “নিরঞ্জন।”
— “কোথা থেকে এসেছেন?”
— “অনেক দূর থেকে।”
— “কোন শহর?”
নিরঞ্জন আবারও শুধু হাসলেন।
সেই হাসির মধ্যে যেন বহু বছরের ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু বললেন,
— “এই স্টেশনটা বদলায়নি।”
অমলবাবু অবাক।
এই মানুষটি আগে এখানে এসেছিলেন?
কিন্তু তিনি তো কোনোদিন দেখেননি!
তৃতীয় অধ্যায়: পুরোনো ছবির রহস্য
পরদিন সকালে চা খেতে খেতে নিরঞ্জনের চোখ পড়ল দেওয়ালে টাঙানো একটি পুরোনো ছবিতে।
ছবিটি ছিল প্রায় চল্লিশ বছরের পুরোনো।
স্টেশনের কর্মীদের দলগত ছবি।
নিরঞ্জন ছবির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ছবির এক যুবকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,
— “এঁর নাম ছিল রমেশ দত্ত। খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন।”
অমলবাবুর শরীর কেঁপে উঠল।
রমেশ দত্ত ছিলেন তাঁর আগের স্টেশনমাস্টার।
কিন্তু তিনি তো প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে মারা গেছেন!
নিরঞ্জন এত কিছু জানলেন কীভাবে?
চতুর্থ অধ্যায়: হারিয়ে যাওয়া চিঠি
স্টেশনের পুরোনো রেকর্ডরুমে বহু বছরের ফাইল জমে ছিল।
নিরঞ্জন হঠাৎ বললেন,
— “ওখানে একটি লাল রঙের টিনের বাক্স আছে।”
অমলবাবু অবাক হয়ে বললেন,
— “আপনি জানলেন কীভাবে?”
তবুও দুজনে মিলে রেকর্ডরুমে গেলেন।
ধুলোমাখা তাকের এক কোণে সত্যিই ছিল একটি লাল টিনের বাক্স।
ভেতরে পুরোনো কাগজপত্রের সঙ্গে একটি খাম।
খামের ওপর লেখা—
“ফিরে এলে খুলবে।”
চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।
প্রাপক—
নিরঞ্জন সেন।
অমলবাবু বিস্ময়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকালেন।
— “এটা তো আপনারই নাম!”
নিরঞ্জন কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।
পঞ্চম অধ্যায়: ত্রিশ বছরের অপেক্ষা
চিঠিটি লিখেছিলেন রমেশ দত্ত।
তাতে লেখা ছিল—
“নিরঞ্জন,
যদি কোনোদিন ফিরে আসো, জেনে নিও—তোমার মা শেষ দিন পর্যন্ত তোমার অপেক্ষা করেছেন।
তিনি তোমাকে কখনও দোষ দেননি।
শুধু বলতেন, একদিন আমার ছেলে ফিরবেই।”
চিঠি পড়ে নিরঞ্জনের চোখ ভিজে উঠল।
ধীরে ধীরে তিনি নিজের গল্প বলতে শুরু করলেন।
যুবক বয়সে কাজের খোঁজে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
বিদেশে চাকরি পান।
তারপর একের পর এক সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন।
চিঠিপত্রের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ফিরে আসতে আসতে কেটে যায় ত্রিশ বছর।
কিন্তু যখন তিনি দেশে ফেরেন—
তখন আর মা বেঁচে নেই।
ষষ্ঠ অধ্যায়: মায়ের বাড়ি
অমলবাবু নিরঞ্জনকে নিয়ে গেলেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে।
বাড়িটি এখন ভাঙাচোরা।
উঠোনে একটি আমগাছ।
দরজায় মরচে ধরা তালা।
পাশের বাড়ির বৃদ্ধা সরলা দেবী নিরঞ্জনকে দেখে কেঁদে ফেললেন।
— “তুই নিরঞ্জন?”
— “হ্যাঁ কাকিমা…”
— “তোর মা শেষ দিন পর্যন্ত সন্ধ্যেবেলা দরজায় বসে থাকত। বলত—’আমার ছেলে আজ আসবে।'”
নিরঞ্জনের আর নিজেকে সামলানো গেল না।
তিনি মাটিতে বসে কাঁদতে লাগলেন।
সপ্তম অধ্যায়: নতুন সিদ্ধান্ত
কয়েকদিন পরে নিরঞ্জন বাড়িটি মেরামত করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু নিজের থাকার জন্য নয়।
তিনি গ্রামের শিশুদের জন্য সেখানে একটি ছোট্ট পাঠাগার গড়ে তুলবেন।
মায়ের নামে।
“সুবর্ণা স্মৃতি পাঠাগার”।
অমলবাবু বললেন,
— “এটাই তোমার মায়ের সবচেয়ে বড় আনন্দ হতো।”
নিরঞ্জন মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি অনেক দেরি করেছি। অন্তত এখন কিছু ভালো কাজ করতে চাই।”
অষ্টম অধ্যায়: বিদায়
এক মাস পরে পাঠাগারের উদ্বোধন হলো।
গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নতুন বই হাতে নিয়ে হাসছে।
নিরঞ্জনের চোখে জল।
অমলবাবু বললেন,
— “এবার কোথায় যাবে?”
নিরঞ্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এবার কোথাও পালাব না।”
“যে মানুষ নিজের শিকড় খুঁজে পায়, তার আর দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।”
সেদিন সন্ধ্যায় সেই ছোট্ট স্টেশনে আবার একটি ট্রেন এসে থামল।
নিরঞ্জন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিন্তু এবার তিনি কোনো অচেনা যাত্রী নন।
তিনি নিজের ঘরে ফিরে আসা একজন মানুষ।
উপসংহার
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা কখনও কখনও এক শহর থেকে আরেক শহরে নয়।
বরং নিজের অতীতের কাছে ফিরে আসার যাত্রা।
যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে,
যে মানুষ হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে সম্মান করতে শেখে,
সে-ই প্রকৃত অর্থে বাড়ি ফেরে।
শিউলিবাড়ি স্টেশনের সেই অচেনা যাত্রী তাই শিখিয়ে গেল—
সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু অপেক্ষা আর ভালোবাসা কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না।
সমাপ্ত। 🚉📖

Share This
Categories
গল্প

বৃষ্টিভেজা বিকেল।।

প্রথম অধ্যায় : সেই বিকেলের বৃষ্টি
শ্রাবণের শেষ দিক। সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। কালো মেঘে ঢেকে আছে চারদিক। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে, যেন আকাশ নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকোতে পারছে না।
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট শহর তমলুকে থাকত সৌম্য। স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একেবারে একা।
বাবা-মা দুজনেই কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। ছোট্ট একটি বাড়ি, কিছু বই আর স্কুল—এই ছিল তার পৃথিবী।
সেদিন স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হলো।
মুষলধারে।
রাস্তাঘাট মুহূর্তে জলে ভরে গেল।
ছাত্রছাত্রীরা একে একে বাড়ি চলে গেল। সৌম্যও বেরোতে যাচ্ছিল, এমন সময় স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলাকে দেখতে পেল।
নীল রঙের শাড়ি।
হাতে একটি ভেজা ছাতা।
মুখে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা।
সৌম্য এগিয়ে গিয়ে বলল—
“আপনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?”
মহিলা একটু চমকে তাকালেন।
“না… আসলে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছি।”
“তাহলে স্টাফরুমে বসতে পারেন।”
মহিলা মৃদু হেসে বললেন—
“ধন্যবাদ।”
সেদিন সৌম্য জানত না, এই বৃষ্টিভেজা বিকেল তার জীবন বদলে দিতে চলেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায় : পরিচয়
স্টাফরুমে বসে কথাবার্তা শুরু হলো।
মহিলার নাম অন্বেষা।
তিনি কলকাতা থেকে এসেছেন।
একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেন।
কিছু পুরোনো লোককাহিনি সংগ্রহের কাজে এই অঞ্চলে এসেছিলেন।
সৌম্য অবাক হয়ে বলল—
“আজকালও কেউ লোককাহিনি নিয়ে কাজ করে?”
অন্বেষা হেসে বলল—
“গল্প না থাকলে মানুষ বাঁচে কীভাবে?”
কথাটা শুনে সৌম্যের ভালো লাগল।
কারণ সেও গল্প ভালোবাসত।
বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ ছিল না।
তাই তারা অনেকক্ষণ গল্প করল।
সাহিত্য।
রবীন্দ্রনাথ।
বিভূতিভূষণ।
জীবনানন্দ।
আর জীবন।
তৃতীয় অধ্যায় : একটি পুরোনো ডায়েরি
পরদিনও অন্বেষা স্কুলে এল।
আসলে তার গবেষণার জন্য কিছু তথ্য দরকার ছিল।
সৌম্য তাকে সাহায্য করতে লাগল।
একদিন স্কুলের পুরোনো লাইব্রেরি ঘাঁটতে গিয়ে তারা একটি ডায়েরি খুঁজে পেল।
ডায়েরিটি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো।
লেখকের নাম—
অমিয় মুখোপাধ্যায়।
একজন শিক্ষক।
ডায়েরিতে লেখা ছিল একটি অসমাপ্ত প্রেমকাহিনি।
একজন শিক্ষক।
একজন সংগীতশিল্পী।
আর একটি বৃষ্টিভেজা বিকেল।
অন্বেষা বলল—
“দেখো, গল্প যেন কখনও শেষ হয় না। শুধু মানুষ বদলে যায়।”
সৌম্য ডায়েরির পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো, অতীত যেন বর্তমানের সঙ্গে কথা বলছে।
চতুর্থ অধ্যায় : বন্ধুত্ব
দিন গড়াতে লাগল।
অন্বেষার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল এক সপ্তাহে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহে গড়াল।
তারপর তিন সপ্তাহে।
সৌম্য ও অন্বেষার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হলো।
তারা নদীর ধারে হাঁটত।
চায়ের দোকানে বসে গল্প করত।
পুরোনো মন্দির ঘুরে দেখত।
একদিন সন্ধ্যায় অন্বেষা বলল—
“তুমি কখনও শহরে যাওয়ার কথা ভাবোনি?”
সৌম্য মাথা নাড়ল।
“না। এখানে আমার ছাত্ররা আছে।”
“তুমি অদ্ভুত মানুষ।”
“ভালো না খারাপ?”
“ভালো।”
অন্বেষা হেসে ফেলল।
সৌম্যও।
পঞ্চম অধ্যায় : লুকিয়ে থাকা কষ্ট
কিন্তু অন্বেষার হাসির আড়ালে কিছু একটা লুকিয়ে ছিল।
সৌম্য তা বুঝতে পারত।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কি কোনো কষ্ট লুকিয়ে রাখছ?”
অন্বেষা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
“আমার বিয়ে হয়েছিল।”
সৌম্য অবাক।
“হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে স্বামী একটি দুর্ঘটনায় মারা যান।”
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
“তারপর?”
“তারপর কাজ। শুধু কাজ।”
সেদিন প্রথমবার অন্বেষার চোখে জল দেখল সৌম্য।
ষষ্ঠ অধ্যায় : বিদায়ের খবর
একদিন অন্বেষা জানাল—
“আমাকে কলকাতায় ফিরতে হবে।”
সৌম্যের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
যেন হঠাৎ কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।
“কবে?”
“আগামী সপ্তাহে।”
সৌম্য কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘুম এল না।
সে বুঝতে পারল—
অন্বেষা শুধু বন্ধু হয়ে থাকেনি।
তার জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে।
সপ্তম অধ্যায় : আবার বৃষ্টি
বিদায়ের আগের দিন।
আবার বৃষ্টি নামল।
ঠিক প্রথম দিনের মতো।
আকাশ ভেঙে পড়া বৃষ্টি।
সৌম্য ও অন্বেষা স্কুলের সেই পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর অন্বেষা বলল—
“জানো, এই কয়েকটা দিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল।”
সৌম্য মৃদু হেসে বলল—
“আমারও।”
“তাহলে এত চুপ কেন?”
সৌম্য উত্তর দিল না।
কারণ কিছু কথা ভাষায় বলা যায় না।
অষ্টম অধ্যায় : অপ্রকাশিত কথা
পরদিন স্টেশনে অন্বেষাকে বিদায় জানাতে গেল সৌম্য।
ট্রেন আসতে এখনও কয়েক মিনিট বাকি।
অন্বেষা বলল—
“একটা কথা বলবে?”
“কী?”
“তুমি কি আমাকে মিস করবে?”
সৌম্য হেসে বলল—
“প্রতিদিন।”
অন্বেষা চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
“আমিও।”
ট্রেন ঢুকে পড়ল।
কিন্তু ঠিক ওঠার আগে অন্বেষা ফিরে দাঁড়াল।
“সৌম্য?”
“হ্যাঁ?”
“আমি আবার আসব।”
নবম অধ্যায় : এক বছরের অপেক্ষা
এক বছর কেটে গেল।
তারা ফোনে কথা বলত।
চিঠি লিখত।
মাঝে মাঝে দেখা হতো।
কিন্তু দূরত্ব রয়ে গেল।
এরপর একদিন অন্বেষা হঠাৎ জানাল—
“আমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।”
সৌম্য অবাক।
“কেন?”
“কারণ আমি আর পালাতে চাই না।”
“মানে?”
“আমি তমলুকে আসছি।”
দশম অধ্যায় : নতুন শুরু
শরতের এক সকালে অন্বেষা স্থায়ীভাবে তমলুকে চলে এল।
একটি ছোট প্রকাশনা কেন্দ্র শুরু করল।
সৌম্য পাশে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো।
একদিন সেই একই স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্বেষা বলল—
“মনে আছে? প্রথম দিন এখানেই আমাদের দেখা হয়েছিল।”
সৌম্য হেসে বলল—
“আর বৃষ্টিও হচ্ছিল।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বৃষ্টি আমাদের জন্য শুভ।”
“হয়তো।”
দুজনেই হেসে উঠল।
উপসংহার
জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কখনও কখনও খুব সাধারণভাবে শুরু হয়।
একটি বৃষ্টি।
একটি অপেক্ষা।
একটি কথোপকথন।
আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন গল্প।
সৌম্য ও অন্বেষার গল্প প্রমাণ করে—
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে ঠিক সময়ে।
যখন আমরা ভাবি সব শেষ,
ঠিক তখনই তারা নতুন শুরুর দরজা খুলে দেয়।
আর তাই আজও যখন শ্রাবণের বৃষ্টি নামে, তমলুকের সেই পুরোনো স্কুলের বারান্দা যেন ফিসফিস করে বলে—
“সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো শুরু হয় এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে।”
সমাপ্ত। ☔❤️

Share This
Categories
গল্প

হারিয়ে যাওয়া মানচিত্র।

প্রথম অধ্যায় : পুরোনো সিন্দুকের আবিষ্কার
পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল অঞ্চলের এক প্রাচীন বাড়িতে বাস করত অয়ন। বয়স মাত্র বাইশ। ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করছিল কলেজে। ছোটবেলা থেকেই তার পুরোনো জিনিস, প্রাচীন স্থাপনা আর রহস্যের প্রতি অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল।
অয়নের দাদু, হরিপদ চৌধুরী, ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষদের একজন। তাঁর কাছে ছিল অসংখ্য পুরোনো বই, দলিল এবং ইতিহাসের নথি।
এক বর্ষার বিকেলে দাদুর পুরোনো ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে অয়ন একটি কাঠের সিন্দুক খুঁজে পেল।
সিন্দুকটি ধুলোয় ঢাকা।
তালা মরিচা পড়ে প্রায় নষ্ট।
কৌতূহলবশত সে সিন্দুক খুলল।
ভেতরে কিছু পুরোনো বই, কয়েকটি মুদ্রা এবং একটি চামড়ার রোল করা কাগজ।
কাগজটি খুলতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
এটি একটি মানচিত্র।
কিন্তু সাধারণ মানচিত্র নয়।
নিচে লেখা—
“রত্নগুহার পথ — ১৮২৪”
দ্বিতীয় অধ্যায় : জমিদারের গুপ্তধন
অয়ন দৌড়ে দাদুর কাছে গেল।
দাদু মানচিত্রটি দেখে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
“এটা আমি বহু বছর ধরে খুঁজছিলাম।”
“এটা কী?”
“দুইশো বছর পুরোনো এক কিংবদন্তির অংশ।”
দাদু বলতে শুরু করলেন—
১৮২৪ সালে মহিষাদলের এক জমিদার নাকি বিদ্রোহ আর লুটপাটের ভয়ে তার বিপুল সম্পদ লুকিয়ে রাখেন।
সোনা, রূপা, মূল্যবান রত্ন—সব একটি গোপন গুহায় রেখে দেওয়া হয়।
কিন্তু সেই গুহার অবস্থান জানতেন মাত্র তিনজন।
পরবর্তীতে তারা রহস্যজনকভাবে মারা যান।
গুপ্তধনের কথা কিংবদন্তি হয়ে যায়।
কেউ আর সেটির খোঁজ পায়নি।
“তাহলে এই মানচিত্র…”
“সম্ভবত সেই গুপ্তধনের পথ।”
তৃতীয় অধ্যায় : অভিযানের শুরু
অয়ন একা যেতে চাইল না।
সে তার দুই বন্ধু—রুদ্র ও মেঘলাকে সঙ্গে নিল।
রুদ্র সাহসী এবং বুদ্ধিমান।
মেঘলা ইতিহাসের ছাত্রী।
তিনজন সিদ্ধান্ত নিল, বিষয়টি গোপন রাখা হবে।
পরদিন ভোরে তারা রওনা দিল।
মানচিত্র অনুযায়ী প্রথম গন্তব্য ছিল একটি পরিত্যক্ত রাজবাড়ি।
বাড়িটি প্রায় ভেঙে পড়েছে।
জঙ্গল ঘিরে রেখেছে চারদিক।
ভেতরে ঢুকতেই তাদের শরীর শিউরে উঠল।
নিস্তব্ধতা।
ধুলো।
আর অতীতের গন্ধ।
চতুর্থ অধ্যায় : গোপন পথ
রাজবাড়ির ভেতরে একটি ভাঙা লাইব্রেরি ছিল।
সেখানে মানচিত্রে আঁকা একটি চিহ্নের সঙ্গে মিলে গেল একটি পাথরের খোদাই।
অয়ন পাথরটি চাপতেই দেয়ালের একটি অংশ সরে গেল।
সামনে দেখা দিল অন্ধকার সুড়ঙ্গ।
রুদ্র ফিসফিস করে বলল—
“আমরা কি সত্যিই ভেতরে যাচ্ছি?”
অয়ন হাসল।
“এতদূর এসে ফিরে যাব?”
তারা টর্চ জ্বালিয়ে এগিয়ে গেল।
সুড়ঙ্গটি বহু পুরোনো।
কোথাও কোথাও ছাদ ভেঙে পড়েছে।
হঠাৎ তারা একটি পাথরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজায় লেখা—
“লোভীদের জন্য মৃত্যু, সত্যসন্ধানীদের জন্য পথ।”
পঞ্চম অধ্যায় : ধাঁধার কক্ষ
দরজার ওপারে ছিল একটি গোলাকার কক্ষ।
মাঝখানে পাথরের স্তম্ভ।
তার উপর তিনটি প্রতীক—
সূর্য।
চাঁদ।
নদী।
দেয়ালে লেখা ছিল—
“যা কখনও থামে না, যা কখনও ফিরে আসে না, অথচ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলে।”
রুদ্র বলল—
“এটা কী?”
মেঘলা কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল—
“সময়।”
সঙ্গে সঙ্গে স্তম্ভের নিচে লুকানো অংশ খুলে গেল।
আরেকটি পথ দেখা দিল।
তারা বুঝল, গুপ্তধনের রক্ষার জন্য ধাঁধা তৈরি করা হয়েছিল।
ষষ্ঠ অধ্যায় : বিশ্বাসঘাতক
যত গভীরে তারা এগোতে লাগল, ততই রহস্য বাড়তে লাগল।
ঠিক তখনই তারা লক্ষ্য করল—
কেউ যেন তাদের অনুসরণ করছে।
কিছুক্ষণ পরে সামনে এসে দাঁড়াল স্থানীয় এক ব্যবসায়ী, শম্ভু দত্ত।
তিনি বহুদিন ধরে গুপ্তধনের খোঁজ করছিলেন।
অয়নের কথোপকথন গোপনে শুনে তিনি তাদের অনুসরণ করেছিলেন।
শম্ভু হেসে বলল—
“এত কষ্ট তোমরা করেছ, ধন্যবাদ। এবার বাকিটা আমি নেব।”
তার হাতে ছিল বন্দুক।
তিন বন্ধু বিপদে পড়ল।
সপ্তম অধ্যায় : অন্ধকার গুহা
শম্ভু তাদের জোর করে সামনে এগোতে বাধ্য করল।
শেষে তারা একটি বিশাল গুহায় পৌঁছাল।
গুহার মাঝখানে পাথরের তৈরি বিশাল সিন্দুক।
সিন্দুকের চারপাশে অদ্ভুত খোদাই।
শম্ভুর চোখ চকচক করে উঠল।
“অবশেষে!”
সে সিন্দুক খুলতে গেল।
কিন্তু সিন্দুক স্পর্শ করতেই মাটিতে কম্পন শুরু হলো।
দেয়াল কাঁপতে লাগল।
গুহার ছাদ ভেঙে পড়ার উপক্রম।
লোভের ফাঁদ!
অষ্টম অধ্যায় : প্রকৃত ধন
সিন্দুক খুলে দেখা গেল—
সোনা-রত্ন রয়েছে বটে, কিন্তু তার চেয়েও মূল্যবান কিছু আছে।
ভেতরে রয়েছে জমিদারির নথি, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক দলিল এবং বাংলার ইতিহাস সম্পর্কিত বহু অমূল্য তথ্য।
অয়ন বিস্ময়ে বলল—
“এগুলো তো জাতীয় সম্পদ!”
শম্ভু শুধুই সোনা দেখতে পেল।
সে রত্ন ভরতে শুরু করল।
ঠিক তখনই ছাদের বড় অংশ ভেঙে পড়ল।
শম্ভু আটকে গেল।
বন্ধুরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করল।
শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে বেরিয়ে এল।
লোভী মানুষটির চোখে জল এসে গেল।
নবম অধ্যায় : সত্যের জয়
গুহা থেকে বেরিয়ে তারা প্রশাসনকে খবর দিল।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিশেষজ্ঞরা এসে সব পরীক্ষা করলেন।
প্রমাণিত হলো—
এটি সত্যিই দুইশো বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ভাণ্ডার।
সেখানে পাওয়া দলিলপত্র বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসের বহু অজানা তথ্য প্রকাশ করল।
অয়ন ও তার বন্ধুদের প্রশংসা করা হলো।
সংবাদপত্রে তাদের ছবি ছাপা হলো।
কিন্তু তারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ধনসম্পদ নিল না।
দশম অধ্যায় : নতুন মানচিত্র
কয়েক মাস পরে অয়ন আবার দাদুর ঘরে বসেছিল।
দাদু হাসতে হাসতে বললেন—
“তুমি গুপ্তধন পেয়েছ।”
অয়ন মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ, তবে সোনা নয়।”
“তাহলে কী?”
অয়ন জানালার বাইরে তাকাল।
“ইতিহাস।”
“জ্ঞান।”
“আর জীবনের শিক্ষা।”
দাদু সন্তুষ্ট হয়ে হাসলেন।
সেই সময় অয়নের চোখ পড়ল সিন্দুকের কোণে রাখা আরেকটি পুরোনো কাগজের দিকে।
সেখানে অদ্ভুত একটি চিহ্ন আঁকা।
নিচে লেখা—
‘দ্বিতীয় মানচিত্র’
অয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
নতুন রহস্য যেন তাকে আবার ডাকছে।
উপসংহার
গুপ্তধনের মূল্য সবসময় সোনা বা রত্নে মাপা যায় না।
কখনও কখনও জ্ঞান, ইতিহাস এবং সত্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
অয়ন, রুদ্র ও মেঘলার অভিযান প্রমাণ করেছিল—
লোভ মানুষকে অন্ধ করে,
কিন্তু কৌতূহল ও জ্ঞান মানুষকে পথ দেখায়।
আর প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া মানচিত্রের শেষে হয়তো লুকিয়ে থাকে নতুন এক গল্পের শুরু।
সমাপ্ত। 🗺️✨

Share This
Categories
গল্প

গল্প : নদীর ওপারে তুমি।

প্রথম অধ্যায় : নদী, নৌকা আর একটি স্বপ্ন
পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম—সোনাখালি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সুবর্ণরেখা নদী। বর্ষাকালে নদীটি যেন এক উন্মত্ত যুবতী, আর শীতকালে শান্ত, ধীর, গভীর।
নদীর এপারে থাকত অরিন্দম। গরিব ঘরের ছেলে। বাবা ছিলেন জেলে, মা গৃহবধূ। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।
অরিন্দমের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়া। সে বিশ্বাস করত, শিক্ষা মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
নদীর ওপারে ছিল কাশীপুর গ্রাম। সেখানে থাকত মেঘলা।
মেঘলার বাবা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পরিবারের অবস্থা ভালো। মেয়েটিও পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী।
প্রতিদিন সকালে একটি নৌকা নদী পারাপার করত। সেই নৌকাতেই প্রথম দেখা অরিন্দম ও মেঘলার।
তখন তারা দুজনেই কলেজে পড়ে।
প্রথম দিন কোনো কথা হয়নি।
দ্বিতীয় দিনও নয়।
কিন্তু তৃতীয় দিন মেঘলার হাত থেকে একটি বই নদীতে পড়ে গেলে অরিন্দম ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি উদ্ধার করেছিল।
সেই থেকেই শুরু।
দ্বিতীয় অধ্যায় : বন্ধুত্বের বীজ
দিন যেতে লাগল।
নৌকার যাত্রা যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হয়ে উঠল।
মেঘলা গল্প করত সাহিত্য নিয়ে।
অরিন্দম বলত তার স্বপ্নের কথা।
দুজনেই বুঝতে পারছিল, এই বন্ধুত্ব সাধারণ নয়।
একদিন নদীর মাঝখানে নৌকা চলছিল।
সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
আকাশে লাল আভা।
মেঘলা হঠাৎ বলল—
“অরিন্দম, তুমি যদি কোনোদিন অনেক বড় হও, আমাকে ভুলে যাবে না তো?”
অরিন্দম হেসে বলল—
“নদী কি কখনও তার দুই তীরকে ভুলে যায়?”
মেঘলা চুপ করে রইল।
কিন্তু তার চোখের ভাষা অনেক কিছু বলে দিল।
তৃতীয় অধ্যায় : প্রেমের শুরু
শীতের এক সকালে কুয়াশার মধ্যে নৌকা চলছিল।
যাত্রীরা কম।
চারপাশে নিস্তব্ধতা।
মেঘলা ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করল।
“এটা তোমার জন্য।”
অরিন্দম অবাক।
খাম খুলে দেখল একটি বুকমার্ক।
সেখানে লেখা—
“যে স্বপ্ন দেখে, সে-ই একদিন পৃথিবী বদলায়।”
নিচে ছোট্ট করে লেখা—
– মেঘলা
সেই দিন অরিন্দম বুঝেছিল, সে আর শুধুই বন্ধুত্বের জায়গায় নেই।
তার হৃদয় অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
চতুর্থ অধ্যায় : ঝড়ের আগমন
সব গল্পের মতো তাদের গল্পেও বাধা এল।
মেঘলার বাবা বিষয়টি জানতে পারলেন।
তিনি মেয়েকে ডেকে বললেন—
“ও ছেলেটা ভালো হতে পারে, কিন্তু আমাদের সমান নয়।”
“বাবা, মানুষ কি টাকায় বড় হয়?”
“সমাজ তাই মানে।”
মেঘলা প্রতিবাদ করল।
কিন্তু লাভ হলো না।
ওদিকে অরিন্দমও বিষয়টি জানতে পারল।
সে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইল।
কারণ সে জানত, ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়।
কখনও কখনও ত্যাগও।
পঞ্চম অধ্যায় : বিচ্ছেদ
কিছুদিন পরে মেঘলাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
উচ্চশিক্ষার জন্য।
আসলে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।
যেদিন মেঘলা গেল, সেদিন নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম।
দুজনের চোখে জল।
মেঘলা বলল—
“আমি ফিরে আসব।”
অরিন্দম বলল—
“আমি অপেক্ষা করব।”
নৌকা ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।
নদীর জলে সূর্যের আলো ঝিকমিক করছিল।
কিন্তু অরিন্দমের চোখে সবকিছু ঝাপসা।
ষষ্ঠ অধ্যায় : সংগ্রামের বছর
পরবর্তী দশ বছর ছিল কঠিন।
অরিন্দম পড়াশোনা চালিয়ে গেল।
অসংখ্য কষ্টের মধ্যেও হাল ছাড়ল না।
দিনে টিউশন, রাতে পড়াশোনা।
অবশেষে সে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলো।
গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করতে শুরু করল।
কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে মেঘলা রয়ে গেল।
এদিকে কলকাতায় মেঘলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে গবেষক হলো।
কিন্তু সেও বিয়ে করেনি।
কারণ তার মনেও একজনের জন্য জায়গা খালি ছিল।
সপ্তম অধ্যায় : বন্যা
এক বর্ষায় সুবর্ণরেখা নদী ভয়ঙ্কর রূপ নিল।
টানা বৃষ্টিতে নদীর বাঁধ ভেঙে গেল।
চারদিকে জল।
গ্রাম ডুবে গেল।
অরিন্দম তখন স্কুলকে ত্রাণশিবিরে পরিণত করে মানুষের সাহায্য করছিল।
ঠিক সেই সময় খবর এল—
নদীর ওপারের একটি নৌকা ডুবে গেছে।
কয়েকজন যাত্রী আটকে আছে।
অরিন্দম সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজে বেরিয়ে পড়ল।
ঝড়ো বাতাস।
প্রবল স্রোত।
মৃত্যুর ভয়।
কিন্তু সে থামল না।
অষ্টম অধ্যায় : পুনর্মিলন
উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের মধ্যে একজন মহিলাকে দেখে অরিন্দম থমকে গেল।
মহিলাটিও তাকিয়ে রইল।
দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল—
“তুমি!”
সে মেঘলা।
দশ বছর পরে।
নদীর বুকে।
ঝড়ের মধ্যে।
মেঘলা গবেষণার কাজে গ্রামে ফিরছিল।
বন্যার মধ্যে আটকে পড়েছিল।
অরিন্দম তাকে নিরাপদে নিয়ে এল।
অনেকক্ষণ কেউ কথা বলতে পারল না।
শুধু চোখে চোখে কথা হলো।
নবম অধ্যায় : পুরোনো প্রতিশ্রুতি
সন্ধ্যায় ত্রাণশিবিরে বসে তারা কথা বলছিল।
মেঘলা বলল—
“জানো, আমি তোমাকে খুঁজেছিলাম।”
অরিন্দম মৃদু হেসে বলল—
“আমিও অপেক্ষা করেছি।”
“তুমি বিয়ে করোনি কেন?”
“হয়তো নদীর ওপারে কাউকে রেখে এসেছিলাম।”
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
সে বলল—
“আমিও।”
দুজনেই নীরবে হাসল।
এত বছর পরও ভালোবাসা হারিয়ে যায়নি।
দশম অধ্যায় : নতুন সকাল
বন্যা কেটে গেল।
গ্রাম আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
মেঘলার বাবা তখন অনেক বয়স্ক।
তিনি অরিন্দমের কাজ, মানুষের জন্য তার ত্যাগ দেখে মুগ্ধ হলেন।
একদিন তিনি নিজেই অরিন্দমকে ডেকে বললেন—
“আমি ভুল করেছিলাম।”
“মানুষকে অর্থ দিয়ে বিচার করা যায় না।”
“তুমি কি এখনও মেঘলাকে ভালোবাসো?”
অরিন্দম মাথা নিচু করল।
উত্তর দিতে পারল না।
কিন্তু তার নীরবতাই ছিল উত্তর।
একাদশ অধ্যায় : নদীর সাক্ষী
শরতের এক বিকেলে নদীর ঘাটে ছোট্ট একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো।
গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছে।
আকাশে সাদা মেঘ।
নদীর জলে রোদ ঝলমল করছে।
সেই নদীর ধারে, যেখানে একদিন তাদের পরিচয় হয়েছিল, সেখানেই অরিন্দম ও মেঘলার বিয়ে হলো।
গ্রামের বৃদ্ধ মাঝি হাসতে হাসতে বলল—
“নদী অনেককে আলাদা করে, কিন্তু কখনও কখনও আবার মিলিয়েও দেয়।”
সবাই হাততালি দিল।
উপসংহার
জীবনে সব অপেক্ষার শেষ হয় না।
সব ভালোবাসাও পূর্ণতা পায় না।
কিন্তু কিছু কিছু ভালোবাসা নদীর মতো।
মাঝে যত দূরত্বই থাকুক, শেষ পর্যন্ত নিজের পথ খুঁজে নেয়।
অরিন্দম ও মেঘলার গল্প সেই ভালোবাসার গল্প—
যে ভালোবাসা সময়ের কাছে হার মানেনি,
দূরত্বের কাছে মাথা নত করেনি,
আর একদিন নদীর দুই তীরকে এক করে দিয়েছিল।
সমাপ্ত। ❤️🌊

Share This
Categories
গল্প

গল্প : শেষ চিঠির অপেক্ষা।।

প্রথম অধ্যায়: অপ্রত্যাশিত চিঠি
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট গ্রাম চন্দনপুর। গ্রামের এক প্রান্তে পুরোনো টালির ছাউনি দেওয়া বাড়িতে একা থাকতেন অনিরুদ্ধ সেন। বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে, কিন্তু মুখের রেখায় যেন আরও অনেক বছরের ক্লান্তি জমে আছে।
প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি উঠোন ঝাড়ু দিতেন, তুলসীতলায় জল দিতেন, তারপর চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে থাকতেন। তাঁর এই একঘেয়ে জীবনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটত না।
কিন্তু একটি অভ্যাস কখনও বদলায়নি—প্রতিদিন দুপুরে তিনি গ্রামের পোস্ট অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
কারণ, তিনি অপেক্ষা করতেন একটি চিঠির।
চিঠিটি আসার কথা ছিল আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে।
গ্রামের সবাই জানত, অনিরুদ্ধ একসময় খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। কলেজে পড়ার সময় তিনি ভালোবেসেছিলেন গ্রামেরই মেয়ে মাধুরীকে।
মাধুরীর চোখ ছিল গভীর নদীর মতো শান্ত। দুজনের স্বপ্ন ছিল শহরে গিয়ে সংসার গড়ার।
কিন্তু ভাগ্য তাদের জন্য অন্য গল্প লিখেছিল।
একদিন মাধুরীর পরিবার আচমকা কলকাতায় চলে যায়। যাওয়ার আগে মাধুরী অনিরুদ্ধকে বলেছিল—
“আমি তোমাকে চিঠি লিখব। তুমি অপেক্ষা করবে তো?”
অনিরুদ্ধ হেসে বলেছিলেন—
“সারা জীবন।”
সেই প্রতিশ্রুতির পর ত্রিশ বছর কেটে গেছে।
চিঠি আর আসেনি।
তবুও তিনি অপেক্ষা ছাড়েননি।
দ্বিতীয় অধ্যায়: এক বর্ষার দুপুর
সেদিন আষাঢ়ের দুপুর।
আকাশ কালো মেঘে ঢাকা।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
অনিরুদ্ধ দরজা খুলে দেখলেন গ্রামের পোস্টম্যান শিবু দাঁড়িয়ে।
শিবুর হাতে একটি হলদেটে খাম।
“অনিরুদ্ধবাবু, আপনার নামে চিঠি এসেছে।”
কথাটা শুনে তাঁর বুক কেঁপে উঠল।
“আমার নামে?”
“হ্যাঁ।”
কাঁপা হাতে খামটি নিলেন তিনি।
খামের উপর লেখা—
অনিরুদ্ধ সেন, চন্দনপুর গ্রাম।
প্রেরকের নাম—
মাধুরী।
মুহূর্তে যেন পৃথিবী থেমে গেল।
ত্রিশ বছর পরে!
তিনি বারান্দায় বসে খাম খুললেন।
ভিতরে একটি মাত্র চিঠি।
তৃতীয় অধ্যায়: চিঠির ভাষা
চিঠিতে লেখা—
প্রিয় অনিরুদ্ধ,
জানি না এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না।
আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম চিঠি লিখব।
কিন্তু জীবন আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি।
কলকাতায় যাওয়ার কিছুদিন পর বাবার জোরে আমার বিয়ে হয়।
আমি প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু পারিনি।
তোমার ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
বহু বছর পরে আবার খুঁজে পেলাম।
তাই লিখছি।
আমি অসুস্থ।
হয়তো বেশি দিন বাঁচব না।
যদি সম্ভব হয়, একবার দেখা করতে এসো।
তোমার মাধুরী।
চিঠির শেষ লাইনে জল পড়ে কালি ছড়িয়ে গেছে।
হয়তো চোখের জল।
অনিরুদ্ধেরও চোখ ভিজে উঠল।
ত্রিশ বছরের অপেক্ষা।
অবশেষে উত্তর এসেছে।
চতুর্থ অধ্যায়: যাত্রা
পরদিনই তিনি কলকাতার ট্রেনে উঠলেন।
দীর্ঘদিন পরে এত দূরে যাচ্ছেন।
ট্রেনের জানালা দিয়ে বৃষ্টি ভেজা মাঠ দেখতে দেখতে তাঁর মনে পড়ছিল পুরোনো দিন।
কলেজের মাঠ।
মাধুরীর হাসি।
নদীর ধারে হাঁটা।
স্বপ্নের কথা।
সবকিছু যেন গতকালের ঘটনা।
কিন্তু আয়নায় মুখ দেখলেই বোঝা যায়, ত্রিশ বছর কেটে গেছে।
কলকাতায় পৌঁছে তিনি চিঠিতে লেখা ঠিকানার খোঁজ করলেন।
একটি ছোট্ট বাড়ি।
দরজায় নাম লেখা—
মাধুরী মুখার্জি।
তিনি কড়া নাড়লেন।
এক তরুণী দরজা খুলল।
“কাকে চান?”
“আমি… মাধুরী দেবীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
তরুণীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“আপনি কি অনিরুদ্ধ কাকু?”
তিনি অবাক।
“হ্যাঁ।”
তরুণী ধীরে বলল—
“মা আপনার কথা বলতেন।”
“মা?”
“আমি মাধুরী দেবীর মেয়ে।”
অনিরুদ্ধের বুক ধক করে উঠল।
“মাধুরী কোথায়?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
“মা তিন মাস আগে মারা গেছেন।”
পঞ্চম অধ্যায়: হারিয়ে যাওয়া সময়
অনিরুদ্ধ যেন পাথর হয়ে গেলেন।
তিন মাস আগে?
তাহলে চিঠি?
মেয়েটি বলল—
“মা মৃত্যুর আগে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন সময়মতো পাঠাতে। কিন্তু নানা কারণে দেরি হয়ে গেছে।”
অনিরুদ্ধ চুপ করে বসে রইলেন।
কোনো কথা বেরোল না।
মেয়েটি একটি বাক্স নিয়ে এল।
“মা এটা আপনার জন্য রেখে গেছেন।”
বাক্স খুলতেই তিনি দেখলেন—
পুরোনো ছবি।
শুকনো শিউলি ফুল।
কলেজ জীবনের স্মৃতি।
আর শতাধিক অপাঠানো চিঠি।
প্রতিটি চিঠি তাঁর নামে লেখা।
ষষ্ঠ অধ্যায়: অপ্রেরিত ভালোবাসা
রাতভর তিনি চিঠিগুলো পড়লেন।
প্রথম চিঠি লেখা ছিল ত্রিশ বছর আগে।
দ্বিতীয়টি এক বছর পরে।
তৃতীয়টি আরও পরে।
প্রতিটি চিঠিতে ছিল তাঁর কথা।
তাঁর স্মৃতি।
তাঁর প্রতি ভালোবাসা।
মাধুরী কখনও তাঁকে ভুলে যাননি।
পরিস্থিতি, দায়িত্ব, সংসার—সবকিছু তাঁকে আটকে রেখেছিল।
কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে অনিরুদ্ধ ছিলেন।
সবসময়।
একটি চিঠিতে লেখা—
অনিরুদ্ধ,
আজ আমার মেয়ের জন্মদিন।
সবাই খুব খুশি।
তবু জানো, তোমার কথা মনে পড়ছে।
তুমি কি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ?
আরেকটিতে—
আজ আমার চুলে প্রথম পাকা রং দেখলাম।
মনে হল সময় কত দ্রুত চলে যায়।
যদি কোনোদিন দেখা হয়, চিনতে পারবে তো?
চিঠিগুলো পড়তে পড়তে অনিরুদ্ধ কাঁদলেন।
জীবনে প্রথমবার তিনি অনুভব করলেন—
তাঁর অপেক্ষা বৃথা ছিল না।
সপ্তম অধ্যায়: শেষ দেখা
পরদিন মাধুরীর মেয়ে তাঁকে নিয়ে গেল কাছের শ্মশানের পাশে স্মৃতিফলকের কাছে।
সেখানে লেখা—
মাধুরী মুখার্জি (১৯৭১–২০২৫)
অনিরুদ্ধ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
হাওয়ায় শিউলি ফুলের গন্ধ।
মনে হল মাধুরী যেন ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি ধীরে বললেন—
“আমি এসেছি, মাধুরী।”
“দেরি হয়ে গেল।”
“ক্ষমা করো।”
বাতাস হালকা করে বয়ে গেল।
যেন অদৃশ্য কেউ উত্তর দিল—
“তুমি তো এসেছ।”
অষ্টম অধ্যায়: অপেক্ষার অবসান
গ্রামে ফিরে এসে অনিরুদ্ধ আর আগের মতো রইলেন না।
তিনি প্রতিদিন পোস্ট অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতেন না।
কারণ অপেক্ষা শেষ হয়েছে।
একদিন তিনি সমস্ত চিঠি একটি কাঠের বাক্সে সাজিয়ে রাখলেন।
বাক্সের উপর লিখলেন—
“অপেক্ষার ইতিহাস”
গ্রামের ছেলেমেয়েদের তিনি গল্প শোনাতেন।
ভালোবাসার গল্প।
প্রতিশ্রুতির গল্প।
অপেক্ষার গল্প।
বছরখানেক পরে এক শরৎ সকালে তিনি বারান্দায় বসে ছিলেন।
হাতে মাধুরীর প্রথম চিঠি।
মুখে শান্ত হাসি।
আকাশে সাদা মেঘ ভাসছিল।
দূরে কাশফুল দুলছিল।
সেই দিন তিনি চিরশান্তির ঘুমে চলে গেলেন।
চিঠিটি তাঁর বুকের উপর রাখা ছিল।
শেষবারের মতো যেন তিনি উত্তর পেয়েছিলেন।
উপসংহার
ভালোবাসা সবসময় একসঙ্গে থাকার নাম নয়।
কখনও কখনও ভালোবাসা হলো অপেক্ষা।
কখনও প্রতিশ্রুতি।
কখনও একটি অপাঠানো চিঠি।
আর কখনও ত্রিশ বছর পর পৌঁছে যাওয়া একটি খাম, যা প্রমাণ করে—
সময় হারিয়ে যেতে পারে, মানুষ চলে যেতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও মরে না।
সমাপ্ত 🌸

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

অনুগল্প: “ফিরে যদি আসো…

” নির্মলা রোজ ভোরবেলা উঠেই ব্যালকনির দিকের চিঠির বাক্সটা দেখে। আজও… কিচ্ছু নেই। পঁচিশ বছর আগেও ঠিক এমন এক সকালে, রুদ্র বলেছিল — — “চলে যাচ্ছি, কিন্তু লিখব রোজ। জানবে, আমি ভুলিনি।” প্রথমে চিঠি এসেছিল নিয়মিত, তারপর মাসে একবার, তারপর বছরে একবার… তারপর… আর কিছুই না। তবু নির্মলা অপেক্ষা করে গেছে। চুলের রঙ বদলেছে, চোখের দৃষ্টিতে এসেছে কাচের ঝাপসা, তবুও অপেক্ষা বদলায়নি। আজ সে চিঠি লেখে — “রুদ্র, যদি ফিরে আসো, জানিও… আমি রোজই অপেক্ষা করেছি। দরজাটা আজও খোলা… — নির্মলা” চিঠিটা সে রাখে জানলার পাশে, বাতাসে উড়তে থাকে। পেছনে তার ঘর — নিঃসঙ্গ, নীরব… কিন্তু দরজাটা আজও হালকা খোলা।

Share This
Categories
গল্প

রোদের নিচে জমে থাকা শীত।

(একটি শীতের দুপুরের প্রেমকাহিনি)

শীতের দুপুরগুলো অদ্ভুত।
সকাল যেমন কুয়াশায় ঢাকা থাকে, সন্ধে যেমন হিম হয়ে আসে—
দুপুর ঠিক তেমন নয়।
দুপুরে রোদ থাকে, অথচ শীত যায় না।
যেমন কিছু মানুষ—ভালোবাসা দেখায়, তবু দূরে থাকে।

সেদিনও এমনই এক শীতের দুপুরে,
কলকাতার উত্তর দিকের ছোট্ট পাড়াটার রাস্তায় হাঁটছিল নীলয়।

রোদ পড়েছে ঠিকই, কিন্তু বাতাসে এখনো কাঁপুনি।
হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে সে ধীরে হাঁটছিল।
আজ অফিস নেই।
ছুটির দিন—তবু কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই।

হঠাৎ চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল সে।

এই দোকানটা তার খুব পরিচিত।
দু’তলা পুরনো বাড়ির নিচে, কাঠের বেঞ্চ, লোহার কেটলি,
আর সেই চেনা গন্ধ—চা, বিস্কুট, ধোঁয়া আর পুরনো সময়।

“এক কাপ লাল চা,” বলল নীলয়।

চা হাতে নিয়ে বেঞ্চে বসতেই চোখ পড়ল জানালার দিকে।
আর ঠিক তখনই—

সে দেখল মিতালীকে

অনেক বছর পর।

মিতালী জানালার ধারে বসে আছে।
হালকা বাদামি সোয়েটার, খোলা চুল, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা।
হাতের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে,
আর মুখে সেই চেনা নির্লিপ্ত ভাব।

যেন কিছুই বদলায়নি।

নীলয়ের বুকের ভেতর হঠাৎ করে কিছু একটা নড়ে উঠল।
অনেকদিন পর কেউ হঠাৎ পুরনো গান বাজিয়ে দিলে যেমন হয়।

সে নিজেও বুঝল না কেন,
পা দুটো নিজে থেকেই মিতালীর দিকে এগোল।

“মিতালী?”
স্বরে সামান্য দ্বিধা।

মিতালী তাকাল।
চোখের পাতা এক মুহূর্ত কাঁপল।
তারপর ধীরে হাসল।

“নীলয়!”

এই এক শব্দে এত স্মৃতি জমে ছিল—
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

“তুমি এখানে?”
মিতালী বলল।

“হ্যাঁ… মানে… মাঝে মাঝে আসি,”
নীলয় হালকা হেসে বলল।

“বসো,”
মিতালী সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে দিল।

নীলয় বসল।
দুজনের মাঝখানে টেবিল, দু’কাপ চা,
আর বহু বছর না বলা কথা।

তাদের শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় সাত বছর আগে।
সেদিনও ছিল শীত।
তবে দুপুর নয়—সন্ধে।

সেই দিনটার কথা দুজনেই মনে রেখেছে।
কারণ সেদিনই সব শেষ হয়েছিল,
কিন্তু কেউ ঠিক করে কিছু শেষ করেনি।

“কেমন আছ?”
মিতালী জিজ্ঞেস করল।

“চলে যাচ্ছে,”
নীলয় বলল।
“তুমি?”

“আমি… ভালোই,”
একটু থেমে যোগ করল,
“মানে, থাকা যায়।”

এই ‘থাকা যায়’ কথাটার ভেতরেই মিতালীর সব কথা লুকিয়ে থাকে।
আগেও থাকত।

নীলয় জানে।

“এখন কোথায় থাকো?”
নীলয় জানতে চাইল।

“সল্টলেকে,”
“অফিস ওখানেই।”

“এখনো লেখালেখি করো?”
নীলয় হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

মিতালী তাকিয়ে রইল।
তারপর হালকা হেসে বলল,
“কখনো সখনো।”

এই উত্তরটার মানে নীলয় ভালো করেই বোঝে।
কখনো সখনো মানে—
মন খারাপ হলে,
শীতের দুপুরে,
অথবা পুরনো কেউ হঠাৎ সামনে এসে বসলে।

চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
তবু কেউ খেয়াল করছিল না।

বাইরে রোদ পড়েছে।
রাস্তায় মানুষজন, রিকশা, সাইকেল—সব চলছে।
কিন্তু এই টেবিলটার চারপাশে যেন সময় থেমে গেছে।

“তুমি কি বিয়ে করেছ?”
মিতালী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

নীলয় একটু থমকে গেল।
তারপর মাথা নাড়ল।

“না।”

“আমি… করেছিলাম,”
মিতালী বলল খুব আস্তে।

নীলয় জানত না কেন,
এই কথাটা শুনে তার ভেতর কোনো ব্যথা হলো না।
বরং একরকম শান্তি।

“কেমন?”
নীলয় জানতে চাইল।

মিতালী জানালার বাইরে তাকাল।
রোদের দিকে।

“শেষ হয়ে গেছে,”
বলল সে।
“কিছু জিনিস টেকে না।”

নীলয় চুপ করে থাকল।
এই কথার মানে সে বুঝতে পারে।

তাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল কলেজে।
শীতের দুপুরে লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে।

মিতালী তখন কবিতা লিখত।
নীলয় পড়ত, শুনত, বোঝার চেষ্টা করত।

তাদের ভালোবাসা ছিল শান্ত।
কোনো নাটক নেই, কোনো চিৎকার নেই।
শুধু দুপুরের রোদ,
চায়ের কাপ,
আর দীর্ঘ নীরবতা।

সমস্যা এসেছিল তখনই—
যখন জীবনের গতি বদলাতে শুরু করেছিল।

নীলয়ের চাকরি,
মিতালীর লেখালেখি,
দুজনের আলাদা আলাদা স্বপ্ন।

তারা ঝগড়া করেনি।
শুধু কথা বলা কমে গিয়েছিল।
আর একদিন—
কথা বলা পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল।

“তোমার মনে আছে?”
মিতালী হঠাৎ বলল।
“সেই শীতের দুপুরটা?”

নীলয় হাসল।
“যেটাতে তুমি বলেছিলে—
ভালোবাসা মানে চুপ করে পাশাপাশি বসে থাকা?”

“হ্যাঁ,”
মিতালীও হাসল।
“আমি এখনো তাই ভাবি।”

নীলয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমিও।”

দুজনেই জানত—
এই কথাটার ভেতর অনেক কিছু আছে।
কিন্তু সেগুলো আর বের করার দরকার নেই।

বাইরে রোদ একটু ঢলে পড়েছে।
শীতের দুপুর ধীরে ধীরে বিকেল হচ্ছে।

মিতালী উঠে দাঁড়াল।

“আমাকে যেতে হবে,”
বলল সে।

নীলয় মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”

দুজনেই জানত—
এই যাওয়াটা চূড়ান্ত নয়,
আবার নয়।

দরজার কাছে এসে মিতালী থামল।
একটু ভেবে বলল,
“কখনো… আবার দেখা হবে?”

নীলয় জানত,
এই প্রশ্নটার উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—
কোনোটাই পুরো সত্য নয়।

তবু বলল,
“হতে পারে।”

মিতালী হালকা হাসল।
তারপর চলে গেল।

নীলয় আবার বেঞ্চে বসল।
ঠান্ডা চা হাতে নিল।

শীতের দুপুর তখন শেষের পথে।
রোদ কমছে,
কিন্তু ভেতরের ঠান্ডা একটু কমেছে।

সে বুঝল—
কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না।
শুধু জমে থাকে।

শীতের দুপুরের মতো।
রোদের নিচে,
চুপচাপ।


✨ শেষ ✨

 

Share This
Categories
গল্প

গল্প : দোতলা বাস আর প্রথম প্রেম।

কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দোতলা বাস ধরত রিয়া।
একদিন উপরের সিটে বসে দেখল—একটা ছেলে তাকে দেখে হাসছে। নাম—সমর।

ধীরে ধীরে প্রতিদিন একই বাসে দেখা হতে হতে তারা কথা বলতে শুরু করল।
একদিন বাস খুব ভিড়। সামান্য ধাক্কায় রিয়ার হাত থেকে বই পড়ে গেল।
সমর ঝুঁকে বই তুলে দিয়ে বলল—“তোমার বই, কিন্তু কাহিনীটা আমার মতো মনে হচ্ছে—তুমিও আমাকে পছন্দ করো, তাই না?”

রিয়া লজ্জায় বলল—
“তুমি সবকিছু এত সহজে কিভাবে বলো?”

সমর মুচকি হেসে বলল—
“সত্যি কথা বলতে সাহস লাগে, কিন্তু চেষ্টা করলে কঠিন না।”

সেদিন থেকে বাসের সিটটাই হয়ে উঠল তাদের ছোট্ট পৃথিবী।
নগরীর শব্দ, মানুষের ভিড়—সবকিছু ম্লান হয়ে দুইজনের হাসি আর কথা।
একদিন সমর বলল—“বাসের ভিড়ের চেয়ে তোমাকে হারানোর ভয়টাই বড়।”

রিয়া হাসল—“তাহলে হারিয়ো না আমাকে।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : আধখানা গল্প।

লেখক অভিজিৎ বছরের পর বছর ধরে নিজের উপন্যাস লিখছে—কিন্তু শেষ অধ্যায়টা লিখতেই পারছে না।
কারণ? গল্পে যে মেয়েটি আছে—মীরা—তার বাস্তব রূপকে সে হারিয়েছে পাঁচ বছর আগে।

এক সন্ধ্যায় বইমেলায় গিয়ে অভিজিৎ চমকে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীরা—হুবহু একই।
মীরা বলল—“তোমার লেখা পড়েছি। সেখানে আমি কেন হারিয়ে যাই?”

অভিজিৎ বলল—
“কারণ বাস্তবে তুমিই হারিয়ে গিয়েছিলে… কারণ না জানিয়েই।”

মীরা চোখ নামিয়ে বলল—
“পরিস্থিতি ছিল… তুমি বুঝতে না।”

দু’জনই চুপ। বইমেলার ভিড়, আলো এবং গন্ধ যেন দূর হয়ে গেল।

মীরা বলল—
“এখন যদি বলি—আবার শুরু করতে চাই… তুমি রাখবে?”

অভিজিৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলল—
“আমার গল্প তো আধখানা হয়ে বাকি আছে। শেষটা লিখব কী করে? যা হারিয়েছিলাম তা যদি ফিরেই আসে… তাহলে হয়তো শেষটা লিখতে পারব।”

মীরা ধীরে অনিকের হাত ধরল—
“শেষটা তবে আমাদের দু’জনের লেখা হোক।”

Share This