Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. আবান মিস্ত্রী: তবলার তালে ইতিহাস গড়া ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশাল জগতে কিছু বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে এমন কিছু সামাজিক ধারণা জড়িয়ে ছিল, যা বহুদিন ধরে ভাঙা সহজ ছিল না। তবলা তার অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে তবলা বাদক হিসেবে পুরুষ শিল্পীদেরই বেশি দেখা যেত। সেই পরিবেশে একজন নারী যখন তবলাকে নিজের সাধনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন, তখন সেটি নিছক সংগীতচর্চা ছিল না—ছিল এক ধরনের সামাজিক বাধা অতিক্রমের ঘটনাও।

সেই সাহসী শিল্পীর নাম ড. আবান এ. মিস্ত্রী। সরকারি ‘First Ladies’ সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘First Lady of India’ সম্মানেও ভূষিত করা হয়। তাঁর একক তবলা পরিবেশনা ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে প্রশংসিত হয়েছিল।

তবে আবান মিস্ত্রীর পরিচয় শুধু ‘প্রথম মহিলা তবলা বাদক’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন সংগীতশিল্পী, গবেষক, শিক্ষিকা, লেখক এবং সংগীতশাস্ত্রের একজন নিবেদিত সাধক।

সংগীতময় পরিবারে শৈশব

আবান মিস্ত্রীর জন্ম ৬ মে ১৯৪০ সালে মুম্বইয়ে। তাঁর পরিবারেও সংগীতের পরিবেশ ছিল। তাঁর বাবা এরচশাহ পি. মিস্ত্রী ছিলেন বেহালাবাদক এবং মা সরশেদ মিস্ত্রী দিলরুবা বাজাতেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীত তাঁর পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে।

মাত্র চার বছর বয়সে তিনি সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রথমে তাঁর মাসি মেহরু ওয়ার্কিংবক্সওয়ালার কাছে তিনি হিন্দুস্তানি কণ্ঠসংগীত শেখেন। পরবর্তীকালে পণ্ডিত লক্ষ্মণরাও বডাসের কাছেও দীর্ঘদিন সংগীত শিক্ষা নেন।

শৈশব থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল নানা ধরনের শিল্পকলায়। কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর শিল্পীসত্তার সামনে একটি বড় মোড় এসে দাঁড়ায়।

নৃত্য থেকে তবলার পথে

আবান মিস্ত্রীর সংগীতজীবনের শুরু তবলা দিয়ে হয়নি। তিনি নৃত্য শেখার প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর নৃত্যচর্চার স্বপ্নে বাধা আসে।

সেই সময় তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন পণ্ডিত কেকি এস. জিজিনা। তিনি আবানকে তবলার দিকে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দেন। ধীরে ধীরে তবলাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান সাধনার ক্ষেত্র।

এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে।

উস্তাদ আমির হুসেন খানের কাছে শিক্ষা

আবান মিস্ত্রীর তবলা শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম উস্তাদ আমির হুসেন খান। তিনি পণ্ডিত কেকি এস. জিজিনা এবং উস্তাদ আমির হুসেন খানের মতো গুরুদের কাছ থেকে তালবাদ্যের গভীর শিক্ষা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে পণ্ডিত লক্ষ্মণরাও বডাসের কাছ থেকেও সংগীতের শিক্ষা চালিয়ে যান।

তবলার মতো একটি কঠিন বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ অনুশীলন, তাল-লয়ের গভীর জ্ঞান এবং অসাধারণ ধৈর্য দরকার। আবান মিস্ত্রী এই তিনটিকেই নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন।

তাঁর বাদনে বিভিন্ন ঘরানার প্রভাবও দেখা যায়। তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি দিল্লি, ফরুকাবাদ, আজরাড়া এবং বেনারসের তবলা-পরম্পরার নানা বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করেছিলেন। পখাওয়াজের শিক্ষাও তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

যে সময়ে নারী তবলা বাজানো ছিল ব্যতিক্রম

আজকের দিনে নারী তবলা শিল্পী দেখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আবান মিস্ত্রীর কর্মজীবনের শুরুর সময়টা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

তখন মঞ্চে একজন নারীকে তবলা বাজাতে দেখা অনেকের কাছেই নতুন বিষয় ছিল। এমনকি সংগীতজগতের কিছু মানুষও প্রথম দিকে নারী তবলা বাদককে সহজে গ্রহণ করতে পারেননি।

মারাঠি বিশ্বকোষে প্রকাশিত তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, কর্মজীবনের শুরুর দিকে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল যখন মহিলা গায়িকারা তাঁকে সঙ্গতশিল্পী হিসেবে নিতে দ্বিধা করতেন। কিন্তু সেই বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি।

তিনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে ধীরে ধীরে সেই সংশয় দূর করেন।

এখানেই আবান মিস্ত্রীর বিশেষত্ব। তিনি শুধু অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেননি; বরং এমন একটি ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যেখানে নারীর উপস্থিতিই তখন ছিল ব্যতিক্রম।

মঞ্চ থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর

আবান মিস্ত্রী একক তবলা পরিবেশনায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, তাঁর একক পরিবেশনা ভারত এবং বিদেশ—দুই ক্ষেত্রেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন।

২০০২ সালে ‘Times of India’-র একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা তবলা বাদক হিসেবে উল্লেখ করে ধারওয়াড়ে তাঁর পরিবেশনার কথা লেখা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে তাঁকে উচ্চমানের তবলা শিল্পী, সংগীতশাস্ত্রবিদ এবং পণ্ডিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তাঁর বাদনে শুধু দ্রুততা বা কারিগরি দক্ষতা ছিল না; তাল, লয় এবং সংগীতের কাঠামো সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়াও ছিল।

শিল্পীর পাশাপাশি গবেষক

আবান মিস্ত্রীর জীবনকে অন্য অনেক শিল্পীর জীবন থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো তাঁর গবেষণামূলক কাজ।

তিনি তবলা ও পখাওয়াজের ইতিহাস, ঘরানা এবং পরম্পরা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “Pakhawaj and Tabla: History, Schools and Traditions”। তাঁর এই কাজ তবলা-পখাওয়াজের ঐতিহ্য, ঘরানা এবং বিকাশকে নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

তিনি ‘Tabley ki Bandishein’ নামেও একটি কাজ করেছিলেন। সংগীতশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণামূলক অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সংগীতের পাঠ্যসূচিতেও তাঁর নাম ও কাজ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ তিনি শুধু মঞ্চে তবলা বাজিয়ে থেমে থাকেননি; তবলার জ্ঞানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করার কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

শিক্ষিকা আবান মিস্ত্রী

একজন শিল্পীর প্রকৃত উত্তরাধিকার অনেক সময় তাঁর নিজের পরিবেশনার চেয়েও তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আবান মিস্ত্রী এই দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, ভিজিটিং প্রফেসর, প্রশিক্ষক ও বিচারক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

মুম্বইয়ের ওয়াডিয়া মিউজিক ক্লাসে তিনি প্রায় ২৫ বছর শিক্ষাদান করেছিলেন বলে মারাঠি বিশ্বকোষে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সপল জিজিনা, আদিল মিস্ত্রী এবং সুরেশ শিংগাড়ের নাম পাওয়া যায়।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিনি কর্মশালাও পরিচালনা করতেন। ফলে তাঁর সংগীতচর্চা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যেও সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

একাধিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা

আবান মিস্ত্রীর শিক্ষাজীবনও ছিল বহুমাত্রিক।

তবলার পাশাপাশি তিনি কণ্ঠসংগীত, সেতার এবং সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। সরকারি জীবনীতে তাঁকে তবলায় ‘Sangeet Praveen’, কণ্ঠসংগীতে ‘Sangeet Alankar’, সেতারে ‘Sangeet Visharad’ এবং হিন্দি ও সংস্কৃতে ‘Sahitya Ratna’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ডক্টরেটও ছিল সংগীত ও পারকাশন নিয়ে।

এই শিক্ষার ব্যাপ্তি দেখায় যে তাঁর কাছে সংগীত কেবল মঞ্চে পরিবেশনের বিষয় ছিল না। সংগীতের ইতিহাস, তত্ত্ব, সাহিত্য এবং বাদ্যযন্ত্র—সবকিছুকে মিলিয়ে তিনি একটি বৃহত্তর জ্ঞানভুবন তৈরি করেছিলেন।

সংগীতের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ

আবান মিস্ত্রী সংগীতচর্চার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি Swar Sadhna Samiti-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বলে প্রকাশিত জীবনীমূলক তথ্য থেকে জানা যায়।

এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শিল্পীদের পরিবেশনা, শিক্ষার সুযোগ এবং সংগীতচর্চার পরিসর তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

তাঁর কাছে সংগীত ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যম নয়; এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যাকে সংরক্ষণ ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়ও শিল্পীর রয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

দীর্ঘ সংগীতজীবনে আবান মিস্ত্রী বিভিন্ন সম্মান অর্জন করেন। তাঁর পরিচিত সম্মানগুলোর মধ্যে ‘Taal Mani’, ‘Sangeet Setu’ এবং ‘Sangeet Kala Ratna’-র মতো উপাধির উল্লেখ পাওয়া যায়।

২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও সংগীতমহলে তাঁর অবদানের স্মরণ অব্যাহত থাকে। ২০১৮ সালে ভারত সরকারের ‘First Ladies’ উদ্যোগে তাঁকে মরণোত্তর সম্মান দেওয়া হয়।

আজ তাঁর নাম সংগীতশিক্ষার বিভিন্ন পাঠ্যসূচিতেও পড়ানো হয়। অর্থাৎ তাঁর কাজ কেবল অতীতের একটি স্মৃতি হয়ে নেই; সংগীতের শিক্ষার্থীরা এখনও তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে পড়াশোনা করে।

তবলার প্রতিটি বোলের মধ্যে এক নতুন ইতিহাস

আবান মিস্ত্রীর গল্প আসলে একটি বাদ্যযন্ত্রের গল্পের থেকেও বড়।

তিনি এমন একটি সময়ে তবলা হাতে নিয়েছিলেন, যখন নারীকে এই ক্ষেত্রের কেন্দ্রে দেখা খুব স্বাভাবিক ছিল না। তাঁকে নিজের দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে তাল ও লয়ের কোনো লিঙ্গ নেই।

তাঁর হাতে তবলা হয়ে উঠেছিল আত্মপ্রকাশের ভাষা। কখনও একক পরিবেশনার মাধ্যমে, কখনও শিক্ষাদানের মাধ্যমে, কখনও গবেষণার পাতায়—তিনি একই সঙ্গে শিল্পী এবং জ্ঞানসাধকের ভূমিকা পালন করেছেন।

আর তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এখানেই—তিনি পরবর্তী প্রজন্মের নারী শিল্পীদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছিলেন।

উত্তরাধিকার

আজ ভারতের বিভিন্ন মঞ্চে অসংখ্য নারী তবলা শিল্পীকে দেখা যায়। তাঁদের প্রত্যেকের পথ আলাদা। কিন্তু এই পথকে আরও প্রশস্ত করার জন্য যাঁরা অনেক আগে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ড. আবান মিস্ত্রীর নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

একজন নারী শিল্পী যখন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের প্রতিভাকে প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর সাফল্য ব্যক্তিগত থাকে না। তা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠে।

আবান মিস্ত্রী সেই পরিবর্তনেরই এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

তাঁর হাতে তবলার বোল শুধু “ধা”, “তিন”, “না”, “ধিন” হয়ে থাকেনি—সেগুলো হয়ে উঠেছিল আত্মবিশ্বাসের ভাষা। তাঁর জীবন দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো শিল্পক্ষেত্রকে যদি সত্যিকারের ভালোবাসা যায়, তবে সেই শিল্পের দরজা একদিন না একদিন আরও অনেক মানুষের জন্য খুলে যায়।

ড. আবান মিস্ত্রী তাই শুধু ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার নন; তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এমন এক পথপ্রদর্শক, যাঁর সাধনা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হয়ে রয়েছে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *