ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য আজ আমাদের হাতে রয়েছে বিমান, ট্রেন, বাস কিংবা অসংখ্য আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা। কিন্তু কেউ যদি নিজের মোটরবাইকে একা দেশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেই যাত্রা শুধুই ভ্রমণ থাকে না—তা হয়ে ওঠে নিজের সীমাবদ্ধতাকে পরীক্ষা করার এক কঠিন অভিযান।
আর সেই অভিযান যখন একজন তরুণী একাই করেন, তখন তার তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।
রোশিনি শর্মার নাম সেই কারণেই আলাদা করে মনে রাখার মতো। তিনি মোটরবাইকে একা কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত যাত্রা করে ভারতীয় নারী বাইকারদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নজির তৈরি করেন। India Today এবং Times of India—দুই সূত্রই তাঁকে এই যাত্রার প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে তাঁর গল্প কেবল একটি দীর্ঘ বাইকযাত্রার গল্প নয়। এর শুরু হয়েছিল অনেক ছোটবেলায়—একটি মোটরসাইকেলের প্রতি গভীর আকর্ষণ থেকে।
ছোটবেলাতেই মোটরসাইকেলের প্রতি টান
রোশিনি শর্মার শৈশব কেটেছে উত্তরপ্রদেশের নারোরা অঞ্চলে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই মোটরসাইকেল তাঁর কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় ছিল।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন। তাঁর বাবা তাঁকে বাইক চালানো শেখানোর ক্ষেত্রে উৎসাহ দিয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে রোশিনি জানিয়েছেন, পরিবারের সমর্থন তাঁর আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
সেই বয়সে অনেকের কাছে মোটরসাইকেল ছিল নিছক যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু রোশিনির কাছে সেটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রতীক।
রাস্তার সঙ্গে পরিচয় যত বাড়তে থাকে, ততই তাঁর মনে জন্ম নেয় আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা।
প্রথম বাইক, প্রথম স্বাধীনতা
মোটরসাইকেল শেখার সময় প্রত্যেক নতুন চালকের মতো রোশিনিকেও গিয়ার, ক্লাচ, ব্যালান্স এবং বাঁক নেওয়ার মতো বিষয় আয়ত্ত করতে হয়েছিল।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছেন, শেখার একেবারে শুরুতেই একদিন বাবার অনুপস্থিতিতে নিজেই বাইক নিয়ে টিউশনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখনও বাইক ঘোরানোর ব্যাপারে তাঁর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি। কিন্তু সেই প্রথম স্বাধীন যাত্রাই তাঁর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
এরপর আর পিছনে তাকাননি তিনি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইকের প্রতি তাঁর আগ্রহও বাড়তে থাকে। ছোট শহরের সামাজিক পরিবেশে একজন মেয়ের মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকলেও পরিবারের সমর্থন তাঁকে নিজের আগ্রহকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা ও বেঙ্গালুরু
রোশিনি শর্মা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন এবং পরে বেঙ্গালুরুতে যান। তাঁর জীবনের এই পর্যায়ে মোটরসাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।
বেঙ্গালুরুর ব্যস্ত রাস্তায় বাইক চালানো প্রথমদিকে তাঁর কাছেও সহজ ছিল না। কিন্তু নতুন শহরের রাস্তা, ট্রাফিক এবং ব্যস্ততার সঙ্গে ধীরে ধীরে তিনি অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।
একটি Women’s Day মোটরসাইকেল র্যালিতে অংশ নেওয়া তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। সেখানে অন্য নারী বাইকারদের দেখে তাঁর নিজের মধ্যেও আরও বড় যাত্রার ইচ্ছা তৈরি হয়। র্যালিতে তিনি একটি ৩৫০ সিসি মোটরসাইকেলও চালান, যা তাঁর আগের অভিজ্ঞতার তুলনায় বড় ছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
তারপর থেকেই বড় কোনো বাইক-অভিযানের চিন্তা তাঁর মনে জায়গা করে নিতে শুরু করে।
উত্তর থেকে দক্ষিণ—এক বন্ধুর গল্পে নতুন স্বপ্ন
রোশিনির জীবনে কন্যাকুমারী-কश्मीर যাত্রার ভাবনাটি হঠাৎ আসেনি।
এক বন্ধুর উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত মোটরসাইকেল ভ্রমণের কথা শুনে তাঁর নিজের মধ্যেও একই ধরনের একটি দীর্ঘ যাত্রার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু তিনি শুধু অন্যের পথ অনুসরণ করতে চাননি। বরং এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা নিজের কাছে নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং।
তখনই জন্ম নেয় Kanyakumari to Kashmir, অর্থাৎ দেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত মোটরবাইকে একা যাওয়ার পরিকল্পনা।
একজন নারীর পক্ষে এত দীর্ঘ পথ একা বাইকে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা সেই সময়ে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী ছিল।
চাকরি ছেড়ে অভিযানে
বড় স্বপ্নের সঙ্গে বড় সিদ্ধান্তও আসে।
রোশিনি একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই যাত্রার জন্য তাঁকে চাকরি ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় থাকার জন্য সাধারণ চাকরির ছুটি যথেষ্ট ছিল না।
চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত একটি যাত্রায় বেরিয়ে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
একদিকে ছিল পেশাগত ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে ছিল নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
শেষ পর্যন্ত তিনি যাত্রার পথকেই বেছে নেন।
কন্যাকুমারী থেকে যাত্রা শুরু
ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারী থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
দক্ষিণ ভারতের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে ধীরে ধীরে মধ্য ভারত, উত্তর ভারত এবং শেষ পর্যন্ত হিমালয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের মুখোমুখি হওয়া।
একই যাত্রায় বদলে যায়—
- আবহাওয়া,
- রাস্তার ধরন,
- ভূপ্রকৃতি,
- খাবার,
- ভাষা,
- মানুষের জীবনযাপন।
একজন একাকী বাইকারের জন্য প্রতিটি পরিবর্তনই নতুন অভিজ্ঞতা।
আর রোশিনিকে এগোতে হয়েছে নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের প্রস্তুতির ওপর ভরসা করে।
পথ সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি
দীর্ঘ বাইকযাত্রার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—কাগজে যে পরিকল্পনা করা যায়, বাস্তব রাস্তা সবসময় সেই পরিকল্পনা মেনে চলে না।
রোশিনির নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রার সময় একাধিকবার তিনি দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিলেন। কখনও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিও এসেছিল যখন তাঁকে রাত পর্যন্ত বাইক চালাতে হয়েছিল।
অর্থাৎ তাঁর যাত্রা কোনো সাজানো পর্যটনভ্রমণ ছিল না।
ছিল বাস্তব রাস্তা, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা।
এই কারণেই তাঁর যাত্রাকে শুধুমাত্র একটি ‘রেকর্ড’ হিসেবে দেখলে গল্পটির আসল দিকটি বাদ পড়ে যায়।
পাহাড়ের পথে নতুন পরীক্ষা
দেশের উত্তর দিকে যেতে যেতে রাস্তার চরিত্র বদলে যায়। সমতল থেকে পাহাড়ি পথে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেল চালানোর কৌশলও বদলাতে হয়।
পাহাড়ি রাস্তায় বাঁক, ঢাল, আবহাওয়া এবং রাস্তার অবস্থার দিকে আরও বেশি নজর রাখতে হয়।
রোশিনির যাত্রার শেষ অংশ ছিল উত্তর ভারতের কঠিন ভূপ্রকৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর।
একটি মোটরসাইকেল নিয়ে একা এতটা পথ অতিক্রম করার মধ্যে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক স্থিরতাও প্রয়োজন।
সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন
রোশিনির গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামাজিক মানসিকতা।
তিনি যে পরিবেশ থেকে এসেছিলেন, সেখানে মেয়েদের মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে প্রশ্ন উঠত। তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে, পরিবারের বাইরের কিছু মানুষ মনে করতেন, মেয়েদের পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং পরে বিয়ে করাই যেন স্বাভাবিক পথ।
রোশিনি সেই প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে না গিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে উত্তর দিয়েছেন।
তিনি কাউকে বোঝানোর জন্য মোটরসাইকেলে ওঠেননি।
তিনি উঠেছিলেন কারণ বাইক চালানো তাঁর ভালো লাগত এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নিজের একটি স্বপ্ন ছিল।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
একা পথ চলার মানে
একজন একাকী নারী বাইকার যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন, তখন তাঁকে একই সঙ্গে অনেক বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়।
নিজের নিরাপত্তা, মোটরসাইকেলের অবস্থা, রাস্তার পরিস্থিতি, থাকার জায়গা, খাবার, আবহাওয়া—প্রতিটি বিষয়ের দায়িত্ব নিজের।
কেউ পাশে থাকলে সিদ্ধান্ত ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু একা যাত্রায় ভুলের সুযোগ অনেক কম।
রোশিনির কন্যাকুমারী-কश्मीर অভিযান তাই তাঁর আত্মনির্ভরতারও একটি পরীক্ষা ছিল।
একটি যাত্রা, অনেক অনুপ্রেরণা
২০১৬ সালের India Today এবং ২০২১ সালের Times of India—উভয় প্রকাশনাই রোশিনি শর্মার কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর মোটরবাইক যাত্রাকে নারী অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তাঁর গল্পের প্রভাব শুধু সেই সময়ের সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে বাইকিং নিয়ে সাক্ষাৎকার ও পডকাস্টও হয়েছে। ২০২২ সালে BIG FM-এর ‘Biker Divas’ সিরিজে তাঁর যাত্রা নিয়ে একটি পূর্ণ পর্ব প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি তাঁর শৈশব, বাবার কাছ থেকে বাইক শেখা, বেঙ্গালুরুতে বাইকিং শুরু করা এবং Kanyakumari-to-Kashmir যাত্রার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন।
অর্থাৎ তাঁর অভিযান পরবর্তী সময়েও নারী বাইকারদের গল্পের অংশ হয়ে থেকেছে।
রাস্তাকে ভয় না করে রাস্তা বোঝা
রোশিনি শর্মার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এই যে, তিনি বাইককে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর যন্ত্র হিসেবে দেখেননি।
বাইক তাঁর কাছে ছিল নিজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম।
দীর্ঘ রাস্তা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। কোথাও রাস্তা মসৃণ, কোথাও ভাঙাচোরা। কোথাও দ্রুত এগোনো যায়, কোথাও ধীরে চলতে হয়। কখনও পরিকল্পনা বদলাতে হয়, কখনও থামতে হয়।
জীবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।
সব রাস্তা আগে থেকে জানা থাকে না।
কিছু পথ চলতে চলতেই তৈরি হয়।
নারী বাইকারদের জন্য নতুন দিগন্ত
আজ ভারতের রাস্তায় নারী মোটরসাইকেল চালকদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। দীর্ঘ দূরত্বের বাইকিং, মোটরসাইকেল ট্রাভেল এবং অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়েও বহু নারী অংশ নিচ্ছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। রোশিনি শর্মার কন্যাকুমারী-কश्मीर অভিযান সেই ধারার একটি স্মরণীয় উদাহরণ।
তাঁর যাত্রা দেখিয়েছিল—দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য একজন নারীকে অবশ্যই কারও সঙ্গী হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
নিজের প্রস্তুতি, দক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে একজন নারীও নিজের পথ নিজেই বেছে নিতে পারেন।
শেষ কথা
রোশিনি শর্মার গল্পে কোনো রাজপ্রাসাদ নেই, কোনো বড় মঞ্চ নেই, নেই প্রচলিত অর্থে কোনো পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকাও।
আছে একটি মোটরসাইকেল।
আছে একটি দীর্ঘ রাস্তা।
আর আছে এক তরুণীর নিজের ওপর বিশ্বাস।
কন্যাকুমারীর সমুদ্রতট থেকে উত্তরের পাহাড়ি পথ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা আসলে ভারতের ভূগোলের মধ্য দিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্বপ্নের যাত্রা।
তিনি দেখিয়েছেন, সাহস মানে ভয় না থাকা নয়। বরং ভয়, অনিশ্চয়তা এবং বাধা থাকা সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াই সাহস।
একসময় যে প্রশ্ন উঠেছিল—“একজন মেয়ে একা বাইক নিয়ে এত দূর যাবে কীভাবে?”—তার উত্তর রোশিনি কথায় দেননি।
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন রাস্তায়।
আর সেই রাস্তাই আজ তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর—হাজার হাজার কিলোমিটারের সেই যাত্রা তাই শুধু একটি মোটরবাইক অভিযান নয়; এটি নিজের স্বপ্নকে নিজের হাতে স্টার্ট দিয়ে অজানা পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ কাহিনি।