কলকাতার এক ব্যস্ত হাসপাতালে নতুন চাকরি পেয়েছিল চব্বিশ বছরের যুবক অয়ন। তার কাজ ছিল হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে নথি পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা। কাজটি শুনতে সহজ হলেও হাসপাতালটি ছিল বিশাল। কোথাও জরুরি বিভাগ, কোথাও পরীক্ষাগার, কোথাও আবার এমন ওয়ার্ড, যার নামও অয়ন আগে কখনও শোনেনি।
প্রথম দিনেই সে তিনবার ভুল পথে চলে গেল। একবার জরুরি বিভাগের বদলে চলে গেল শিশু বিভাগে, আরেকবার ভুল করে রোগীদের খাবার সরবরাহের ঘরে ঢুকে পড়ল। সহকর্মীরা হাসাহাসি করলেও অয়ন কিছু বলল না।
তার সমস্যা ছিল, সে ছোটবেলা থেকে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বড় হয়েছে। সেখানে রাস্তা ছিল অল্প, মানুষও পরিচিত। শহরের এত বড় ভবন, অসংখ্য করিডর আর একের পর এক দরজা তার কাছে গোলকধাঁধার মতো মনে হতো।
একদিন দুপুরে সুপারভাইজার তাকে ডেকে বললেন, “অয়ন, এভাবে চললে কাজের ক্ষতি হবে। প্রতিটি বিভাগের অবস্থান তোমাকে ভালো করে শিখতে হবে।”
অয়ন মাথা নাড়ল। কিন্তু মনে মনে সে ভয় পেতে শুরু করল। চাকরিটি হারালে বাড়িতে টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যাবে। তার বাবা অসুস্থ, আর ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও তার আয়ের ওপর নির্ভর করে।
সেদিন কাজ শেষে সে হাসপাতালের বাইরে একটি বেঞ্চে বসে ছিল। তখনই দেখল, এক বৃদ্ধ লোক হাতে কাগজ নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছেন। বারবার লোকজনকে কিছু জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু কেউ তাড়াহুড়োয় ঠিক করে উত্তর দিচ্ছে না।
অয়ন এগিয়ে গিয়ে বলল, “কাকু, কোথায় যাবেন?”
বৃদ্ধ বললেন, “আমার স্ত্রীর পরীক্ষা হবে। কাগজে লেখা আছে নিউরোলজি বিভাগ। কিন্তু কোথায়, বুঝতে পারছি না।”
অয়ন নিজেও বিভাগটির অবস্থান নিশ্চিত জানত না। আগে হলে সে হয়তো অন্য কাউকে খুঁজতে চলে যেত। কিন্তু এবার সে বৃদ্ধকে বলল, “চলুন, আমরা তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে জেনে নিই।”
তথ্যকেন্দ্র থেকে ঠিকানা জেনে তারা নির্দিষ্ট বিভাগে পৌঁছাল। বৃদ্ধ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, “তুমি না থাকলে আজ অনেক দেরি হয়ে যেত।”
কথাটা অয়নের মনে থেকে গেল। সে বুঝল, শুধু নিজে পথ জানা নয়, পথ খুঁজে বের করার পদ্ধতি জানাও গুরুত্বপূর্ণ।
পরদিন থেকে অয়ন নতুন একটি কাজ শুরু করল। প্রতিটি বিভাগের নাম, অবস্থান, যাওয়ার রাস্তা এবং কাছাকাছি চেনার মতো চিহ্ন সে ছোট্ট একটি খাতায় লিখে রাখতে লাগল। কোথাও গেলে শুধু কাজ সেরে ফিরে আসত না; মনে মনে পথটাও বুঝে নিত।
কয়েক দিনের মধ্যে সে হাসপাতালের বেশিরভাগ বিভাগ চিনে ফেলল। কিন্তু তার খেয়াল হলো, নতুন রোগী ও তাঁদের আত্মীয়দেরও একই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং যাঁরা প্রথমবার হাসপাতালে আসছেন, তাঁদের পক্ষে বিভাগ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অয়ন সুপারভাইজারের কাছে একটি প্রস্তাব দিল। সে বলল, হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথে সহজ ভাষায় লেখা একটি পথনির্দেশিকা থাকলে সবার সুবিধা হবে। প্রতিটি তলায় রঙের সাহায্যে বিভাগ চিহ্নিত করা যেতে পারে, আর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দিকনির্দেশক বোর্ড লাগানো যেতে পারে।
সুপারভাইজার প্রথমে বললেন, “এত বড় হাসপাতালে নতুন ব্যবস্থা চালু করা সহজ নয়।”
অয়ন উত্তর দিল, “সব একসঙ্গে করতে হবে না। প্রথমে বহির্বিভাগ, পরীক্ষাগার আর জরুরি বিভাগের পথগুলো স্পষ্ট করে লেখা যেতে পারে। তারপর ধীরে ধীরে বাকিগুলো করা যাবে।”
প্রস্তাবটি হাসপাতালের প্রশাসনের কাছে পাঠানো হলো। তাঁরা উদ্যোগটির সম্ভাবনা বুঝতে পেরে একটি ছোট কমিটি গঠন করলেন। অয়নকে নিজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী পথনির্দেশিকার খসড়া তৈরি করতে বলা হলো।
সে বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলল। কোথায় রোগীরা বেশি বিভ্রান্ত হন, কোন মোড়ে বারবার প্রশ্ন করতে হয়, কোন তলায় লিফট থেকে নেমে কোন দিকে যেতে হবে—সব তথ্য সংগ্রহ করল। তার সঙ্গে যুক্ত হলেন একজন গ্রাফিক ডিজাইনার এবং হাসপাতালের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক।
এক মাস পরে হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় নতুন নির্দেশক বোর্ড বসানো হলো। বড় অক্ষর, স্পষ্ট তীরচিহ্ন এবং সহজ ভাষার পাশাপাশি রঙের ব্যবহার থাকায় রোগীদের পথ খুঁজে পেতে সুবিধা হতে লাগল।
একদিন সেই বৃদ্ধ আবার হাসপাতালে এলেন। এবার তিনি নিজের স্ত্রীর নিয়মিত পরীক্ষা করাতে এসেছেন। প্রবেশপথের বোর্ড দেখে সহজেই বিভাগটি খুঁজে পেলেন। অয়নকে দেখতে পেয়ে বললেন, “বাবা, তোমাদের হাসপাতালটা এখন অনেক সহজে চেনা যায়!”
অয়ন হেসে বলল, “আমিও প্রথমে কিছুই চিনতাম না, কাকু।”
বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকালেন। “তাহলে এত সুন্দর ব্যবস্থা করলে কীভাবে?”
অয়ন বলল, “আমি নিজে পথ হারিয়েছিলাম বলেই বুঝতে পেরেছি, অন্যদের কোথায় অসুবিধা হয়।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অয়ন ভাবল, জীবনের প্রতিটি অসুবিধা কেবল নিজের দুর্বলতা নয়। কখনও কখনও নিজের সমস্যাটিকে মন দিয়ে বুঝতে পারলে অন্য মানুষের সমস্যার সমাধানও খুঁজে পাওয়া যায়।
কয়েক মাস পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে কর্মীদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্ত করল। নতুন কর্মীদের হাসপাতালের পথ চিনিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও সে পেল।
যে ছেলেটি একসময় নিজেই পথ হারিয়ে ফেলত, সে এখন অন্যদের সঠিক পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
শিক্ষা: নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে শেখার চেষ্টা করলে সেটিই একদিন শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অন্যের অসুবিধা বুঝতে পারা এবং তার সমাধানে এগিয়ে আসাই প্রকৃত উন্নতির লক্ষণ।