Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ ঘণ্টার আগে।

শহরের পুরনো একটি কারখানায় তৈরি হতো দেওয়ালঘড়ি, অ্যালার্ম ঘড়ি আর ছোট ছোট টাইমার। কারখানাটির নাম ছিল ‘সময়’। বহু বছর ধরে সেখানে কাজ করতেন অসংখ্য শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন মৃণালকান্তি দাস। তিনি যন্ত্রের শব্দ শুনেই বুঝতে পারতেন কোথায় সমস্যা হয়েছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাজার বদলাতে লাগল। ডিজিটাল ঘড়ি আর মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ায় কারখানার বিক্রি কমে গেল। একদিন মালিক ঘোষণা করলেন, এক মাসের মধ্যে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাবে।

খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শ্রমিকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিল। কারও বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, কারও সন্তান স্কুলে পড়ে, কারও আবার ঋণের বোঝা। এত বছর যে জায়গাটিকে নিজেদের জীবনের অংশ বলে মনে করেছিলেন, সেটি ছেড়ে চলে যাওয়া তাঁদের কাছে সহজ ছিল না।

মৃণালকান্তি অবশ্য চুপ করে কাজ করছিলেন। তাঁর সহকর্মী হরিপদ একদিন বললেন, “মৃণালদা, আপনি কিছু বলছেন না কেন? এত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন কোথায় যাবেন?”

মৃণালকান্তি একটি ছোট ঘড়ির পেছনের ঢাকনা খুলতে খুলতে বললেন, “যন্ত্র থেমে গেলে আগে দেখতে হয় কোন অংশটি কাজ করছে না। শুধু বাইরে থেকে আওয়াজ করে লাভ নেই।”

কথাটি শুনে হরিপদ বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন।

পরদিন কারখানায় এল নতুন এক কর্মী, নাম রাহুল। সে প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করেছে এবং কারখানার হিসাবপত্র গুছিয়ে দেওয়ার কাজে নিযুক্ত হয়েছিল। পুরনো যন্ত্রপাতি দেখে সে প্রথমে ভেবেছিল, এগুলো দিয়ে আর কিছু করা সম্ভব নয়।

কিন্তু একদিন সে দেখল, মৃণালকান্তি একটি নষ্ট অ্যালার্ম ঘড়ি খুলে তার ভেতরের অংশগুলো আলাদা করছেন। রাহুল জিজ্ঞেস করল, “এত পুরনো ঘড়ি মেরামত করে কী হবে? নতুন ঘড়ি তো অনেক সস্তায় পাওয়া যায়।”

মৃণালকান্তি বললেন, “সবাই নতুন ঘড়ি কিনতে চায় না। কারও কাছে পুরনো ঘড়ি মানে বাবার স্মৃতি, কারও কাছে বিয়ের উপহার। আবার কিছু মানুষ পুরনো যন্ত্র মেরামত করতেই পছন্দ করেন। কিন্তু আমরা তাঁদের কথা কখনও ভেবে দেখিনি।”

রাহুলের মাথায় নতুন ভাবনা এল। সে প্রস্তাব দিল, কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগে সেখানে ঘড়ি মেরামতের একটি বিভাগ চালু করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হোক। পাশাপাশি পুরনো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ বিজ্ঞান-শিক্ষার কিট তৈরি করা যেতে পারে।

প্রথমে মালিক রাজি হলেন না। তাঁর বক্তব্য, “কারখানা চালাতে হলে নিয়মিত আয় দরকার। শুধু আবেগ দিয়ে ব্যবসা চলে না।”

রাহুলও বুঝতে পারল, প্রস্তাবটি বাস্তবসম্মত করতে হবে। সে কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে বাজার সমীক্ষা শুরু করল। কাছাকাছি স্কুল, ঘড়ির দোকান এবং পুরনো জিনিস সংগ্রহ করেন এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলল। দেখা গেল, অনেকেই নির্ভরযোগ্য ঘড়ি মেরামতের দোকান খুঁজছেন। কয়েকটি স্কুল আবার হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখানোর জন্য কম খরচের যন্ত্রপাতি চায়।

রাহুল একটি পরিকল্পনা তৈরি করল। তাতে সম্ভাব্য খরচ, গ্রাহকের চাহিদা, প্রয়োজনীয় কর্মী এবং প্রথম ছয় মাসের কাজের হিসাব ছিল। মৃণালকান্তি তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে পরিকল্পনাটি আরও বাস্তবসম্মত করে তুললেন।

এবার মালিক আলোচনায় বসতে রাজি হলেন। দীর্ঘ কথাবার্তার পরে ঠিক হলো, কারখানার একটি অংশে পরীক্ষামূলকভাবে মেরামতের বিভাগ চালু হবে। কয়েকজন শ্রমিককে নতুন কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শিক্ষামূলক কিট তৈরির উদ্যোগটিও সীমিত পরিসরে শুরু হবে।

কারখানার সব সমস্যা মিটে গেল না। কয়েকটি বিভাগ বন্ধ করতেই হলো, আর কিছু শ্রমিককে অন্য কাজ খুঁজতে হয়েছে। তবু পুরো কারখানার দরজায় তালা পড়ল না।

প্রথম মাসে মেরামতের বিভাগে খুব বেশি কাজ এল না। দ্বিতীয় মাসে ধীরে ধীরে গ্রাহক বাড়ল। একটি স্কুল থেকে বিজ্ঞান কিটের অর্ডারও পাওয়া গেল। মৃণালকান্তি নতুন কর্মীদের পুরনো যন্ত্রের গঠন শেখাতে লাগলেন, আর রাহুল তাঁদের দেখাতে লাগল কীভাবে গ্রাহকের হিসাব ও কাজের নথি ডিজিটাল পদ্ধতিতে রাখা যায়।

একদিন বিকেলে কারখানার দেওয়ালে টাঙানো বড় ঘড়িটি বন্ধ হয়ে গেল। সবাই কাজ থামিয়ে তার দিকে তাকাল। আগে হলে হয়তো সেটিকে খুলে ফেলে দেওয়া হতো।

মৃণালকান্তি এগিয়ে গিয়ে ঘড়িটির ঢাকনা খুললেন। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন, “স্প্রিংটা আটকে গেছে। ঠিক হয়ে যাবে।”

অল্প সময়ের মধ্যেই ঘড়িটি আবার চলতে শুরু করল। টিকটিক শব্দে ঘরটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।

রাহুল হাসতে হাসতে বলল, “দেখুন, সময় থামেনি!”

মৃণালকান্তি উত্তর দিলেন, “সময় কখনও থামে না। তবে সময়ের সঙ্গে চলতে হলে আমাদের নিজেদেরও বদলাতে হয়।”

সেদিন শ্রমিকেরা বুঝলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা মূল্যবান হলেও শুধু পুরনো পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না। অভিজ্ঞতা আর নতুন চিন্তা একসঙ্গে কাজ করলেই ভবিষ্যতের পথ তৈরি হয়।

শিক্ষা: পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে নতুন পথ খোঁজা জরুরি। অভিজ্ঞতা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, বহু মানুষের জীবিকাকেও নতুন সুযোগ দিতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *