পাহাড়ঘেরা ছোট্ট শহরটির নাম ছিল মেঘডুবি। শহরটি দিনের আলোয় যত সুন্দর দেখাত, রাত নামলেই ততটা নির্জন হয়ে পড়ত। বিশেষ করে শহরের পুরনো পাড়াগুলোতে রাস্তার আলো ছিল খুব কম। কোথাও বাতি নষ্ট, কোথাও গাছের ডালে আলো আটকে যায়, আবার কোথাও রাস্তার মোড় এতটাই অন্ধকার যে পথচারীদের চলতে অসুবিধা হতো।
সেই শহরেই থাকত ষোলো বছরের মেয়ে অন্বেষা। সে খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু চারপাশের ছোটখাটো বিষয় গভীরভাবে লক্ষ করত।
একদিন সন্ধ্যায় টিউশন থেকে বাড়ি ফেরার সময় তার সহপাঠী রিমি একটি অন্ধকার গলিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। হাঁটুতে চোট পেলেও ভাগ্য ভালো, বড় কিছু হয়নি। কিন্তু ঘটনাটি অন্বেষার মনে দাগ কাটল।
বাড়ি ফিরে সে বাবাকে বলল, “বাবা, আমাদের শহরে কোথায় কোথায় রাস্তার আলো নেই, তার কোনও তালিকা আছে?”
বাবা স্থানীয় পুরসভার কর্মী ছিলেন। তিনি বললেন, “অভিযোগের খাতা আছে, কিন্তু সব জায়গার অবস্থা একসঙ্গে বোঝা কঠিন।”
অন্বেষা ভাবল, সমস্যাটা যদি একসঙ্গে দেখা যায়, তাহলে সমাধান করাও সহজ হতে পারে।
পরদিন সে একটি খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। নিজের পাড়ার প্রতিটি রাস্তা, গলি, মোড় আর বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখল। কোথায় বাতি জ্বলছে না, কোথায় আলো গাছের পাতায় ঢেকে যাচ্ছে, কোথায় আলো থাকলেও পথের একাংশ অন্ধকারে ডুবে থাকছে—সব লিখে রাখল।
প্রথম কয়েক দিন কাজটি একাই করেছিল সে। পরে তার বন্ধু রিমি, সায়ন ও অদিতিও যোগ দিল। তারা নিজেদের এলাকার তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করল।
তবে অন্বেষা শুধু সমস্যার তালিকা তৈরি করেনি। প্রতিটি জায়গার অবস্থান একটি বড় কাগজের মানচিত্রে চিহ্নিত করেছিল। লাল বিন্দু দিয়ে বোঝানো হয়েছিল যেখানে আলো একেবারেই নেই, হলুদ দিয়ে বোঝানো হয়েছিল যেখানে আলো থাকলেও যথেষ্ট নয়, আর নীল দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল যেখানে আলো ঠিকঠাক কাজ করছে।
মানচিত্রটির নাম দিল সে—‘অন্ধকারের মানচিত্র’।
স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক মানচিত্রটি দেখে বললেন, “নামটা সুন্দর, কিন্তু তথ্যগুলো নির্ভরযোগ্য হতে হবে। শুধু একদিন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।”
শিক্ষকের পরামর্শে তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন সময়ে পর্যবেক্ষণ করল। রাতের বেলায় একা বিপজ্জনক জায়গায় না গিয়ে অভিভাবক বা শিক্ষকদের সঙ্গে দল বেঁধে তথ্য সংগ্রহ করল। কোথাও বাতি নষ্ট থাকলে তার ছবি তুলল, আবার কোথাও গাছের ডাল ছেঁটে আলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না, সেটাও লিখল।
সব তথ্য সাজিয়ে অন্বেষা একটি প্রতিবেদন তৈরি করল। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাহায্যে সেটি পুরসভায় জমা দেওয়া হলো।
প্রথমে খুব বেশি সাড়া পাওয়া গেল না। একজন কর্মী বললেন, “রাস্তার বাতি মেরামতের কাজ তো চলছেই। এত বিস্তারিত মানচিত্রের দরকার কী?”
অন্বেষা শান্তভাবে উত্তর দিল, “কাজ চলছে, সেটা আমরা জানি। কিন্তু কোন জায়গাগুলো আগে ঠিক করা দরকার, এই মানচিত্র তা বুঝতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল আর বাসস্ট্যান্ডের আশপাশের অন্ধকার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা আছে।”
প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত পুরসভার এক আধিকারিকের নজরে এল। তিনি কয়েকটি জায়গা সরেজমিনে পরিদর্শন করলেন। দেখা গেল, অন্বেষাদের চিহ্নিত করা বেশ কিছু বাতি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে আলো ঠিক করার জন্য শুধু সংযোগ মেরামত করলেই চলবে।
পরের মাসে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু হলো। স্কুলের সামনে, হাসপাতালের পথে এবং জনবহুল কয়েকটি মোড়ে আলো মেরামত করা হলো। গাছের ডাল ছাঁটার কাজও করা হলো যথাযথ অনুমতি নিয়ে।
এক সন্ধ্যায় রিমি অন্বেষাকে নিয়ে সেই গলিতে গেল, যেখানে সে একদিন পড়ে গিয়েছিল। গলির বাতিটি তখন উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে।
রিমি হাসতে হাসতে বলল, “দেখেছিস? আমাদের মানচিত্র সত্যিই কাজ করেছে!”
অন্বেষা আকাশের দিকে তাকাল। শহরের সব অন্ধকার তখনও দূর হয়নি। কয়েকটি রাস্তা এখনও আলোহীন, কয়েকটি সমস্যার সমাধানও বাকি। কিন্তু সে আর হতাশ হলো না।
সে বুঝেছিল, সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। তবে সমস্যা কোথায়, কতটা গুরুতর এবং কোন কাজ আগে করা দরকার—সেটা স্পষ্ট করে দেখাতে পারলে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
বছর কয়েক পরে অন্বেষা নগর পরিকল্পনা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। তার স্বপ্ন ছিল এমন শহর গড়ে তোলা, যেখানে রাস্তা শুধু গাড়ি চলাচলের জন্য নয়, মানুষের নিরাপদে হাঁটার জন্যও তৈরি হবে।
তার পুরনো খাতাটি আজও যত্ন করে রাখা আছে। প্রথম পাতায় লেখা সেই কথাটি সে কখনও ভুলতে পারেনি—
“অন্ধকারকে দোষ দিলেই আলো জ্বলে না; আলো কোথায় পৌঁছয়নি, তা খুঁজে বের করতে হয়।”
শিক্ষা: কোনও সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সেটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। তথ্য, পর্যবেক্ষণ এবং সম্মিলিত উদ্যোগের সাহায্যে ছোটরাও সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।