পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট গ্রামে থাকত চৌদ্দ বছরের মেয়ে তিয়াশা। তার পৃথিবী ছিল খুব সাধারণ—মাটির উঠোন, টালির চাল, বাড়ির পাশে কয়েকটি ফুলগাছ আর জানালার ধারে রাখা একটি পুরোনো কাঠের বাক্স। সেই বাক্সের ভিতরেই তিয়াশার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ লুকিয়ে ছিল—রঙিন পেনসিল, জলরং, কয়েকটি তুলি আর নিজের হাতে আঁকা ছবি।
তিয়াশা ছবি আঁকতে ভালোবাসত। আকাশের মেঘ, পুকুরের ধারে বসে থাকা বক, ধানখেতের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি—সবকিছুই তার ছবিতে জায়গা পেত। স্কুলের খাতার শেষ পাতায় সে প্রায়ই আঁকিবুঁকি করত। কখনো আঁকত একটি রঙিন বাড়ি, কখনো নদীর ওপরে সূর্যাস্ত, আবার কখনো এমন একটি পৃথিবী, যেখানে কেউ কাউকে অবহেলা করে না।
কিন্তু তিয়াশার বাড়িতে আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সংসারের উপার্জন কমে গেল। মায়ের সেলাইয়ের কাজেই কোনোমতে বাড়ি চলত। ওষুধ, খাবার আর পড়াশোনার খরচ সামলাতে গিয়ে নতুন রং কেনার কথা ভাবাও অসম্ভব হয়ে উঠল।
একদিন তিয়াশা তার রঙের বাক্স খুলে দেখল, বেশির ভাগ পেনসিল ছোট হয়ে গেছে। নীল রংটি প্রায় শেষ, লাল রঙের পেনসিলের মাথা ভেঙে গেছে, আর সাদা কাগজের বদলে বাক্সে পড়ে আছে কয়েকটি পুরোনো খাতার ছেঁড়া পাতা।
সে বাক্সটি বন্ধ করে দিল।
মা জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হলো রে? আজ ছবি আঁকবি না?”
তিয়াশা মৃদু হেসে বলল, “না মা, এখন পড়াশোনায় মন দেব। ছবি আঁকার জন্য অনেক কিছু লাগে।”
মা কিছু বললেন না। শুধু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, তার মনটা ভালো নেই।
১. যে ঘরে আর গান শোনা যেত না
তিয়াশাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নির্মলবাবু। তাঁর স্ত্রী বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে চাকরির জন্য অন্য শহরে চলে গিয়েছে। নির্মলবাবু একা থাকতেন একটি পুরোনো বাড়িতে।
একসময় তাঁর বাড়িতে প্রায়ই গানবাজনা হতো। দুর্গাপুজোর আগে প্রতিবেশীরা সেখানে জমায়েত হতেন। শিশুরা ছবি আঁকত, কেউ গান গাইত, কেউ আবৃত্তি করত। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মলবাবু নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর বাড়ির জানালাগুলোও যেন দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকত।
এক বিকেলে তিয়াশা স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল, নির্মলবাবু উঠোনে বসে একটি পুরোনো ছবির ফ্রেম পরিষ্কার করছেন। ফ্রেমে তাঁর স্ত্রী শিউলিদেবীর ছবি।
তিয়াশা থেমে দাঁড়াল।
“কাকু, ছবিটা খুব সুন্দর।”
নির্মলবাবু একটু চমকে তাকালেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ মা, শিউলি খুব সুন্দর করে আলপনা আঁকত। পুজোর সময় সারা বাড়ি সাজিয়ে দিত।”
“আপনিও আঁকতেন?”
“না রে, আমি শুধু দেখতাম। ও চলে যাওয়ার পর আর কিছু সাজাতে ইচ্ছে করে না।”
কথাটা বলে তিনি ছবির ফ্রেমটি নিয়ে ঘরের ভিতরে চলে গেলেন।
তিয়াশা বাড়ি ফিরেও কথাটা ভুলতে পারল না। তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু রং শুধু কাগজে থাকে না। কিছু রং থাকে স্মৃতিতে, ভালোবাসায়, একসঙ্গে কাটানো সময়ে। কেউ চলে গেলে সেই রংগুলোও যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।
কিন্তু সেগুলো কি আবার ফিরিয়ে আনা যায় না?
২. পুরোনো কাগজে নতুন স্বপ্ন
পরদিন তিয়াশা নিজের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি পুরোনো বাক্স পেল। বাক্সে ছিল বাবার ব্যবহৃত কাগজপত্র, পুরোনো সংবাদপত্র, কয়েকটি কার্ডবোর্ড আর বাতিল খাতার পাতা।
সে কাগজগুলো আলাদা করে রাখল। তারপর মায়ের কাছে জানতে চাইল, পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে ছবি আঁকার উপযোগী কাগজ তৈরি করা যায় কি না।
মা হেসে বললেন, “আমি তো জানি না। তবে তুই চেষ্টা করে দেখতে পারিস। নষ্ট কাগজ দিয়ে কিছু একটা বানাতে পারলে মন্দ কী?”
তিয়াশা স্কুলের গ্রন্থাগার থেকে কাগজ পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে একটি বই নিয়ে এল। বিজ্ঞান শিক্ষিকার সাহায্যে সে কাগজের মণ্ড তৈরি করে নতুন কাগজ বানানোর সহজ পদ্ধতি শিখল। প্রথমবার তার কাগজটি খুব মোটা হলো। দ্বিতীয়বার শুকোতে গিয়ে কাগজের এক কোণ ভেঙে গেল। তৃতীয়বার সে আরও ধৈর্য ধরে কাজ করল।
অবশেষে তৈরি হলো কয়েকটি হাতে বানানো কাগজ।
সেগুলো নিখুঁত ছিল না। কোথাও ছোট ছোট দাগ, কোথাও কাগজের তন্তু দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু তিয়াশার চোখে সেগুলো ছিল অমূল্য।
সে পুরোনো রঙের বাক্স থেকে বাকি থাকা রংগুলো বের করল। অল্প জল দিয়ে রং পাতলা করে আঁকল কয়েকটি ফুল, পাখি আর সূর্যমুখী।
তারপর একটি কাগজে লিখল—
“একটু রং, একটু আলো, একটু ভালোবাসা।”
কাগজটি হাতে নিয়ে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। এত দিন সে ভেবেছিল, নতুন রং না থাকলে ছবি আঁকা সম্ভব নয়। এখন বুঝল, সৃজনশীলতা অনেক সময় অভাবের মধ্যেই নতুন পথ খুঁজে পায়।
৩. একটি ছবির উপহার
তিয়াশা ঠিক করল, নির্মলবাবুর জন্য একটি ছবি আঁকবে।
সে একটি সাদা কাগজের ওপর আঁকল ছোট্ট একটি উঠোন। উঠোনে শিউলিফুল পড়ে আছে। পাশে একটি জানালা, জানালার ধারে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। আকাশে নরম সকালের আলো।
ছবির নীচে সে লিখল, “স্মৃতি চলে যায় না, শুধু নতুনভাবে বাঁচতে শেখায়।”
পরদিন বিকেলে সে ছবিটি নিয়ে নির্মলবাবুর বাড়িতে গেল।
নির্মলবাবু দরজা খুলে অবাক হয়ে বললেন, “কী ব্যাপার, তিয়াশা?”
তিয়াশা ছবিটি তাঁর হাতে দিয়ে বলল, “কাকু, এটা আপনার জন্য। কাকিমার কথা মনে করে এঁকেছি।”
নির্মলবাবু প্রথমে কিছু বললেন না। ছবিটি দুহাতে ধরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
“মা, তুই জানিস না, কত দিন পরে কেউ আমার বাড়ির কথা ভেবে কিছু করল।”
তিয়াশা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “এ তো সামান্য ছবি, কাকু।”
নির্মলবাবু মাথা নাড়লেন।
“উপহার ছোট হতে পারে, কিন্তু তার ভিতরের অনুভূতি ছোট হয় না।”
সেদিন বহু দিন পর নির্মলবাবু তাঁর ঘরের জানালাগুলো খুলে দিলেন। বিকেলের আলো ঘরে ঢুকল। পুরোনো পর্দায় হাওয়া লাগল। আর দেয়ালে ঝুলে গেল তিয়াশার আঁকা ছবিটি।
৪. একা ঘর থেকে সবার ঘর
কয়েক দিন পরে নির্মলবাবু তিয়াশাকে ডেকে বললেন, “তুই কি গ্রামের বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখাবি?”
তিয়াশা অবাক হয়ে গেল।
“আমি? কিন্তু আমার তো ভালো রংও নেই।”
নির্মলবাবু হেসে বললেন, “ছবি আঁকার জন্য শুধু রং লাগে না। চোখ লাগে, কল্পনা লাগে, আর চেষ্টা করার ইচ্ছে লাগে। বাকিটা আমরা দেখব।”
নির্মলবাবু তাঁর বাড়ির সামনের ঘরটি পরিষ্কার করলেন। বহু দিন ধরে সেখানে পুরোনো আসবাবপত্র জমে ছিল। গ্রামের কয়েকজন প্রতিবেশী সাহায্য করলেন। কেউ ঘর ঝাড়লেন, কেউ ভাঙা চেয়ার মেরামত করলেন, কেউ আবার বাতিল কাগজ ও পেন্সিল এনে দিলেন।
তিয়াশা নিজের হাতে তৈরি কাগজ নিয়ে সেখানে বসতে শুরু করল। প্রথম দিন এল তিনটি শিশু। দ্বিতীয় সপ্তাহে এল আটটি। তারপর সংখ্যা বাড়তে লাগল।
কেউ ফুল আঁকতে চাইত, কেউ মাছ, কেউ নিজের বাড়ি। একটি ছোট ছেলে প্রতিবার একই ছবি আঁকত—একটি বড় সূর্য আর তার নীচে একটি ছোট্ট মানুষ।
তিয়াশা তাকে জিজ্ঞাসা করল, “তুই সব সময় এই ছবিটা আঁকিস কেন?”
ছেলেটি বলল, “সূর্যটা বড় হলে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, আমার ওপর অনেক আলো পড়ছে।”
তিয়াশা ছেলেটির কথা শুনে বুঝল, ছবি অনেক সময় এমন অনুভূতি প্রকাশ করে, যা মুখে বলা কঠিন।
সে আর কখনো শিশুদের বলত না যে তাদের ছবি খারাপ হয়েছে। বরং জিজ্ঞাসা করত, “তুমি কী দেখেছ? কী ভাবতে গিয়ে এটা এঁকেছ?”
শিশুরা ধীরে ধীরে নিজেদের মতো করে ছবি আঁকতে শিখল। কেউ ভুল করলে হাসাহাসি করা বন্ধ হলো। সবাই একে অন্যের ছবি দেখত, প্রশংসা করত, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করত।
নির্মলবাবুও প্রতিদিন ঘরে এসে বসতেন। কখনো গল্প বলতেন, কখনো পুরোনো দিনের কথা শোনাতেন। তাঁর বাড়ি আবার শিশুদের হাসিতে ভরে উঠল।
৫. যখন অভাব বাধা হয়ে দাঁড়াল
কিন্তু উদ্যোগটি চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না।
কিছুদিনের মধ্যে কাগজের জোগান কমে গেল। পুরোনো রংগুলোও প্রায় শেষ। নতুন রং কেনার সামর্থ্য তিয়াশার ছিল না। নির্মলবাবুর পেনশনের টাকায় নিজের ওষুধ এবং সংসারের খরচ সামলাতেই কষ্ট হতো।
একদিন তিয়াশা শিশুদের বলল, “আজ আমরা শুধু পেন্সিল দিয়ে আঁকব। রং না থাকলেও ছবি আঁকা বন্ধ হবে না।”
কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে তার মন খারাপ হয়ে গেল। সে ভাবছিল, এত সুন্দর কাজটা যদি একদিন বন্ধ হয়ে যায়!
সেদিন বিজ্ঞান শিক্ষিকা তাকে একটি কথা বলেছিলেন, যা তার মনে পড়ল—প্রকৃতির অনেক উপাদান থেকেই রং পাওয়া যায়, তবে সেগুলো ব্যবহার করার আগে নিরাপত্তা ও উপযুক্ত পদ্ধতি জানা জরুরি।
তিয়াশা শিক্ষিকার সাহায্য নিয়ে নিরাপদ উপকরণ সম্পর্কে জানল। সে বুঝল, সবকিছু নিজে বানানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। কিছু রং বাজার থেকে কিনতে হবে, কিছু উপকরণ স্কুলের পুরোনো সরঞ্জাম থেকে পাওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, সবাই মিলে সামান্য সামান্য সাহায্য করলে কাজটি চালানো সম্ভব।
সে গ্রামের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলল। কাউকে টাকা দিতে বাধ্য করল না। বরং জানাল, কারও বাড়িতে অব্যবহৃত কাগজ, পুরোনো কিন্তু ব্যবহারযোগ্য পেন্সিল বা আঁকার সরঞ্জাম থাকলে সেগুলো কাজে লাগানো যাবে।
কয়েক দিনের মধ্যে আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
একজন দোকানদার কিছু খাতা দিলেন। একজন শিক্ষক দিলেন পেন্সিল। এক মা তাঁর সন্তানের পুরোনো রঙের বাক্স এনে দিলেন। আরেকজন অভিভাবক কয়েকটি বড় কাগজ কিনে দিলেন।
তিয়াশা বুঝল, মানুষকে ভালো কাজে যুক্ত করার জন্য সব সময় বড় অর্থের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো দরকার শুধু একটি পরিষ্কার উদ্দেশ্য।
৬. রঙের উৎসব
শরৎকালের এক বিকেলে নির্মলবাবু প্রস্তাব দিলেন, গ্রামের শিশুদের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করা হোক।
তিয়াশা প্রথমে ভয় পেয়ে গেল।
“কাকু, আমাদের ছবিগুলো কি প্রদর্শনীর মতো হয়েছে?”
নির্মলবাবু বললেন, “প্রদর্শনী মানে শুধু নিখুঁত ছবি দেখানো নয়। মানুষের চোখে নতুন কিছু দেখার সুযোগ তৈরি করাও প্রদর্শনীর কাজ।”
গ্রামের ক্লাবঘরে আয়োজন করা হলো ‘রঙের উৎসব’। দেয়ালে ঝোলানো হলো শিশুদের আঁকা ছবি। কোথাও নদী, কোথাও ধানখেত, কোথাও মায়ের মুখ, কোথাও আবার কল্পনার রাজ্য।
তিয়াশা বিশেষভাবে একটি দেয়াল সাজাল পুরোনো কাগজ দিয়ে তৈরি ছবিতে। তার ওপরে লেখা ছিল—‘ফেলে দেওয়া জিনিসেও নতুন সম্ভাবনা থাকে।’
প্রদর্শনী দেখতে এলেন গ্রামের বহু মানুষ। কেউ শিশুদের ছবি দেখে হাসলেন, কেউ অবাক হলেন, কেউ নিজের সন্তানের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন।
একটি ছবির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন নির্মলবাবু। ছবিটিতে ছিল একটি বাড়ি, খোলা জানালা এবং জানালার পাশে একটি চেয়ার। তার সামনে রঙিন ফুল।
তিয়াশা এসে বলল, “কাকু, এই ছবিটা পছন্দ হয়েছে?”
নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন, “খুব। জানিস, আমার মনে হচ্ছে, আমার বাড়িটাও আবার এমন হয়ে উঠেছে।”
সেদিন প্রদর্শনী থেকে কোনো বড় অর্থ উপার্জন হয়নি। কিন্তু গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিলেন, মাসে অন্তত একদিন এই আঁকার আসর চলবে। যাঁরা পারবেন, তাঁরা সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করবেন। যাঁরা পারবেন না, তাঁরাও শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আসবেন।
৭. রঙের চেয়েও বড় কিছু
বছর ঘুরে গেল।
তিয়াশা এখনো ছবি আঁকে। পড়াশোনার পাশাপাশি সে শিশুদের আঁকা শেখায়। তার নিজের রঙের বাক্সও ধীরে ধীরে ভরে উঠেছে। কিন্তু আগের মতো শুধু নিজের ছবির জন্য রং জমিয়ে রাখে না সে।
একদিন এক ছোট মেয়ে আঁকার আসরে এসে বলল, “দিদি, আমি ছবি আঁকতে পারি না। আমার হাত কাঁপে। সবাই হাসবে।”
তিয়াশা তার পাশে বসে একটি সাদা কাগজ এগিয়ে দিল।
“তুই শুধু একটা দাগ টান। সেটাই তোর প্রথম ছবি।”
মেয়েটি কাঁপা হাতে একটি বাঁকা দাগ টানল। তারপর আরেকটি। কিছুক্ষণ পরে কাগজে ফুটে উঠল একটি ছোট্ট বাড়ি।
মেয়েটির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
তিয়াশা বুঝল, তার এই ছোট্ট উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো প্রদর্শনী নয়, কোনো প্রশংসাপত্রও নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—একটি ভীত শিশুর মনে সাহস জাগিয়ে তোলা, একাকী মানুষের ঘরে আনন্দ ফিরিয়ে আনা এবং অভাবের মধ্যেও সৃষ্টির আনন্দ খুঁজে পাওয়া।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিয়াশা জানালার ধারে বসে নিজের পুরোনো রঙের বাক্সটি খুলল। ছোট হয়ে যাওয়া পেনসিলগুলো এখনো সেখানে আছে। ভাঙা লাল রঙের পেনসিলটিও সে ফেলে দেয়নি।
সে নতুন কাগজে একটি ছবি আঁকল—একটি পুরোনো বাড়ি, খোলা জানালা, উঠোনে কয়েকটি শিশু আর আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রং।
ছবির নীচে লিখল—
“আলো ভাগ করলে কমে না, আনন্দ ভাগ করলে ফুরিয়ে যায় না।”
বাইরে তখন সন্ধ্যার আকাশে শেষ সূর্যের আলো। তিয়াশা জানত, পৃথিবীর সব দুঃখ সে মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু নিজের সামান্য ক্ষমতা দিয়ে কিছু মানুষের জীবনে একটু আনন্দ যোগ করতে পারবে।
আর সেই আনন্দই একদিন আরও অনেকের কাছে পৌঁছে যাবে।
শিক্ষা: প্রতিকূলতা সৃজনশীলতার পথ বন্ধ করতে পারে না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের জীবনে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া, অভাবের মধ্যেও নতুন পথ খোঁজা এবং কাউকে ছোট না করে তার প্রতিভাকে উৎসাহ দেওয়াই প্রকৃত মানবিকতা।