শহরের এক পুরনো ভবনের দোতলায় ছিল ছোট্ট একটি মানচিত্রের দোকান। দোকানের মালিকের নাম অমলেন্দু বসু। সেখানে পাহাড়, নদী, সমুদ্র কিংবা দেশের সীমানা আঁকা মানচিত্র বিক্রি হতো। কিন্তু অমলেন্দুবাবুর সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল অন্য রকম—তিনি মানুষের ভুলের মানচিত্র আঁকতেন।
অবশ্য সেই মানচিত্র কাগজে আঁকা হতো না। তাঁর দোকানে আসা মানুষ যখন কোনও সমস্যার কথা বলত, তিনি একটি সাদা কাগজে কয়েকটি বাক্স আঁকতেন। একটিতে লিখতেন ‘কী ঘটেছে’, অন্যটিতে ‘কেন ঘটেছে’, আর শেষটিতে ‘এখন কী করা যায়’।
তিনি বলতেন, “ভুলের দিকে শুধু আঙুল তুলে লাভ নেই। ভুলের পথটা খুঁজে বের করতে পারলে সেখান থেকে ফেরার রাস্তাও পাওয়া যায়।”
একদিন দোকানে এল পঁচিশ বছরের যুবক সৌম্য। সে একটি ছোট পরিবহণ সংস্থায় হিসাবরক্ষকের কাজ করত। গত মাসে তার একটি বড় ভুলের কারণে সংস্থার হিসাব গুলিয়ে গিয়েছিল। কয়েকজন গ্রাহকের টাকা ভুল খাতে জমা পড়েছিল। কর্তৃপক্ষ তাকে সতর্ক করেছে, আর সহকর্মীদের অনেকেই তাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
সৌম্য ভীষণ হতাশ হয়ে বলল, “আমি বুঝতে পারছি না, কীভাবে সব ঠিক করব। সবাই ভাবছে আমি কাজের যোগ্য নই।”
অমলেন্দুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ভুলটা কীভাবে হয়েছিল?”
সৌম্য বলল, “একদিনে অনেকগুলো লেনদেন নথিভুক্ত করতে হয়েছিল। তাড়াহুড়োয় আমি কয়েকটি নম্বর গুলিয়ে ফেলি। পরে যাচাই না করেই রিপোর্ট জমা দিয়ে দিই।”
“তুমি কি ইচ্ছা করে ভুল করেছিলে?”
“না।”
“ভুলটা বুঝতে পারার পরে কী করেছ?”
সৌম্য মাথা নিচু করে বলল, “প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। তারপর কয়েকটি হিসাব নিজে থেকে ঠিক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সবটা পারিনি।”
অমলেন্দুবাবু সাদা কাগজে তিনটি বাক্স আঁকলেন।
প্রথম বাক্সে লিখলেন—‘তাড়াহুড়ো’।
দ্বিতীয় বাক্সে লিখলেন—‘যাচাইয়ের অভাব’।
তৃতীয় বাক্সে লিখলেন—‘দ্বৈত পরীক্ষা ও স্বচ্ছতা’।
তারপর বললেন, “দেখো, তোমার ভুলের কারণ শুধু অসতর্কতা নয়। কাজের চাপ সামলানোর পদ্ধতিতেও সমস্যা ছিল। কিন্তু নিজের ভুলের দায় তোমাকে নিতেই হবে। কারণ বোঝা মানে দায় এড়ানো নয়; বরং একই ভুল যেন আর না হয়, তার ব্যবস্থা করা।”
সৌম্য কিছুক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু সবাই যদি আমাকে আর বিশ্বাস না করে?”
অমলেন্দুবাবু মৃদু হেসে বললেন, “বিশ্বাস কথায় ফিরে আসে না। কাজের ধারাবাহিকতায় ফিরে আসে।”
পরদিন সৌম্য অফিসে গিয়ে নিজের ভুলের কথা বিস্তারিতভাবে জানাল। কোন কোন হিসাব ভুল হয়েছে, কোথায় অসংগতি রয়েছে এবং কীভাবে সেগুলো যাচাই করা যায়—সব লিখে দিল। সে নিজের ভুল ঢাকতে চেষ্টা করল না।
প্রথমে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিরক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সৌম্য যখন সংশোধনের জন্য একটি পরিষ্কার তালিকা তৈরি করে দিল এবং ভবিষ্যতে প্রতিটি লেনদেনের পরে দ্বিতীয়বার যাচাই করার প্রস্তাব দিল, তখন তিনি মন দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করলেন।
কয়েক দিনের মধ্যে হিসাবের অসংগতি চিহ্নিত করা গেল। সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনও করা হলো।
তবে সৌম্যর কাজ সেখানেই শেষ হয়নি। সে নিজের উদ্যোগে একটি সহজ যাচাই-পদ্ধতি তৈরি করল। প্রতিদিনের শেষে একজন সহকর্মী গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলো মিলিয়ে দেখবেন, আর মাসের শেষে আলাদা করে অডিট করা হবে। সংস্থার অন্য কর্মচারীরাও পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে শুরু করলেন।
তিন মাস পরে ব্যবস্থাপক একটি বৈঠকে বললেন, “সৌম্যর ভুল আমাদের সমস্যায় ফেলেছিল, কিন্তু সেই ভুল থেকেই আমরা হিসাব যাচাইয়ের দুর্বলতা বুঝতে পেরেছি। এখন আমাদের কাজের পদ্ধতি আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।”
সৌম্য সেদিন কোনও বড় প্রশংসা আশা করেনি। তবু কথাগুলো শুনে তার বুকের ভিতর জমে থাকা ভার কিছুটা হালকা হয়ে গেল।
সন্ধ্যায় সে আবার অমলেন্দুবাবুর দোকানে গেল।
“আপনার আঁকা মানচিত্রটা কাজে লেগেছে,” সে বলল।
অমলেন্দুবাবু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এবার কোন মানচিত্র আঁকবে?”
সৌম্য বলল, “এবার সাফল্যের মানচিত্র। তবে তাতে শুধু শেষ গন্তব্য থাকবে না। থাকবে ভুল, সংশোধন আর শেখার পথও।”
অমলেন্দুবাবু খুশি হয়ে মাথা নাড়লেন।
দোকান থেকে বেরিয়ে সৌম্য বুঝল, জীবনে ভুল না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু ভুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে সংশোধন করার সাহস দেখানো কঠিন। আর সেই কঠিন পথেই মানুষ নিজের যোগ্যতাকে নতুন করে আবিষ্কার করে।
শিক্ষা: ভুল হওয়া মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা, কিন্তু ভুল লুকানো সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। নিজের দায় স্বীকার করে কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করাই প্রকৃত উন্নতির পথ।