১. উত্তরাধিকার
চিঠিটা হাতে পাওয়ার পর প্রথমে অদিতি ভেবেছিল, কেউ হয়তো তার সঙ্গে নিষ্ঠুর রসিকতা করেছে।
সাদা খামের ওপর নীল কালিতে লেখা ছিল তার নাম—অদিতি মুখার্জি। নিচে কলকাতার ঠিকানা। প্রেরকের নাম নেই, ডাকটিকিটও নেই। অথচ খামের ভেতরে থাকা চিঠির প্রথম লাইন পড়তেই তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
‘তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে যে বাড়িটা তোমার নামে লিখে গিয়েছিলেন, সেখানে একা যেয়ো না। কারণ বাড়িটায় এখনও এমন একজন থাকে, যার মৃত্যু আঠারো বছর আগেই হওয়ার কথা ছিল।’
চিঠির নিচে শুধু একটি তারিখ লেখা—১৭ অক্টোবর, ২০০৮।
অদিতি আবার তারিখটা পড়ল।
আঠারো বছর আগে।
তার বাবা দেবব্রত মুখার্জি মারা গিয়েছিলেন মাত্র সাত দিন আগে। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি অদিতির সঙ্গে খুব বেশি কথা বলেননি। শুধু একবার তার হাত ধরে বলেছিলেন, “তুই যদি কখনও আমার পুরোনো বাড়িতে যাস, দোতলার উত্তর দিকের ঘরটা খুলবি না।”
অদিতি তখন বাবার কথার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল, অসুস্থতার কারণে তিনি হয়তো অসংলগ্ন কথা বলছেন।
কিন্তু মৃত্যুর পর আইনজীবী এসে জানিয়েছিলেন, নদিয়ার কৃষ্ণনগরের কাছে অবস্থিত মুখার্জি পরিবারের পুরোনো জমিদারবাড়িটি দেবব্রত তাঁর একমাত্র মেয়ে অদিতির নামে লিখে গিয়েছেন।
বাড়িটি বিক্রি করার ইচ্ছা ছিল অদিতির। কলকাতার একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করত সে। শহর ছেড়ে পুরোনো, নির্জন একটি বাড়িতে গিয়ে থাকার কোনও পরিকল্পনা তার ছিল না।
কিন্তু এই চিঠি তার সিদ্ধান্ত বদলে দিল।
চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল—
‘বাড়িতে পৌঁছে প্রথমেই দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো গুনবে। যদি ছবির সংখ্যা তেরো হয়, তবে বুঝবে কেউ তোমার আসার অপেক্ষায় আছে। আর যদি চৌদ্দটি ছবি দেখো, তবে সেদিন রাতেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কোনও প্রশ্ন করবে না।’
অদিতি চিঠিটা টেবিলে রেখে জানলার বাইরে তাকাল।
বাইরে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। কলকাতার ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার—সবকিছু স্বাভাবিক। অথচ তার মনে হচ্ছিল, কোনও অদৃশ্য হাত তার পরিচিত পৃথিবীটাকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সে বাবার পুরোনো কাগজপত্রের ফাইল খুলল। সম্পত্তির দলিলের মধ্যে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া ছবি পাওয়া গেল। ছবিতে বিশাল একটি বাড়ি। সামনের উঠোনে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বারো জন মানুষ। পেছনের বারান্দায় একজন বৃদ্ধা বসে আছেন। তাঁর মুখ অস্পষ্ট।
ছবির পেছনে বাবার হাতের লেখায় একটি বাক্য—
‘আমাদের পরিবারে মৃতেরা কখনও পুরোপুরি চলে যায় না।’
অদিতি আর দেরি করল না।
পরদিন সকালেই সে কৃষ্ণনগরের উদ্দেশে রওনা দিল।
সে জানত না, সেই যাত্রা তার বাবার মৃত্যুর রহস্যের চেয়েও ভয়ংকর এক সত্যের দিকে তাকে নিয়ে যাচ্ছে।
২. মুখার্জিবাড়ি
কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে বাড়িটি প্রায় বারো কিলোমিটার দূরে। স্টেশনের বাইরে একটি গাড়ি ভাড়া করে অদিতি চালককে ঠিকানা দেখাল।
ঠিকানাটি দেখে চালক প্রথমে কিছু বলল না। তারপর গাড়ি চালু করার আগে একবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি দেবব্রতবাবুর মেয়ে?”
অদিতি অবাক হলো।
“আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”
“চিনতাম না। তবে মুখার্জিবাড়ির কথা জানি। অনেক বছর ওই রাস্তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাইনি।”
“কেন?”
চালক উত্তর না দিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করল।
শহর পেরিয়ে রাস্তা যত সরু হতে লাগল, চারপাশের দৃশ্য তত বদলে গেল। দোকানপাট কমে এল। রাস্তার দু’পাশে জলভরা ধানখেত, মাঝে মাঝে পুরোনো পুকুর, আর দূরে বাঁশবাগানের অন্ধকার।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়িটি একটি লোহার ফটকের সামনে থামল।
ফটকের ওপর মরচে ধরা অক্ষরে লেখা—‘মুখার্জি ভিলা’।
ফটকের ওপারে যে বাড়িটি দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে শুধু পুরোনো বললে ভুল হবে। বাড়িটি যেন বহু বছর ধরে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। দেওয়ালের চুন খসে গেছে। বারান্দার থামগুলিতে শ্যাওলা। ছাদের একাংশে বটগাছের শিকড় নেমে এসেছে। বাড়ির সামনে বিশাল বাগান, কিন্তু সেখানে ফুলের চেয়ে আগাছার সংখ্যাই বেশি।
গাড়ি থেকে নামতেই অদিতির নাকে ভেসে এল ভেজা মাটি আর পুরোনো কাঠের গন্ধ।
চালক তার ব্যাগ নামিয়ে দিয়ে বলল, “আপনি চাইলে আমি অপেক্ষা করতে পারি।”
“কতক্ষণ?”
“যতক্ষণ আপনি বলবেন।”
অদিতি হেসে বলল, “এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”
চালক হাসল না।
“ম্যাডাম, একটা কথা বলি? আপনার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখনও এই বাড়ির লোকজন রাতের পর রাত জেগে থাকত। কিন্তু গত আঠারো বছর কেউ এখানে থাকতে পারেনি।”
“কেন?”
চালক এবার ফটকের দিকে তাকাল।
“কারণ এই বাড়িতে প্রতি রাতে একজন মারা যায়।”
কথাটা বলেই সে গাড়িতে উঠে পড়ল।
অদিতি তাকে থামানোর আগেই গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে চলে গেল।
সে কয়েক মুহূর্ত ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ব্যাগ হাতে ভেতরে ঢুকল।
বাড়ির সদর দরজায় তালা ঝুলছিল না। দরজায় হাত রাখতেই সেটি নিজে থেকেই সামান্য খুলে গেল।
ভেতরে বিশাল হলঘর। মাঝখানে পুরোনো ঝাড়বাতি, দু’পাশে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। দেওয়ালে সারি সারি ছবি।
অদিতি চিঠির কথা মনে করল।
ছবিগুলো গুনতে শুরু করল।
এক, দুই, তিন…
বারো।
তেরো।
সে আবার গুনল।
তেরোটি ছবি।
অদিতি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।
“আপনি এসে গেছেন, ছোটবউমা?”
অদিতি চমকে মাথা তুলল।
সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় ষাট বছর বয়সি এক মহিলা। পরনে সাদা শাড়ি, চুল শক্ত করে বাঁধা। মুখে কোনও হাসি নেই। তাঁর হাতে একটি পিতলের প্রদীপ।
“আপনি কে?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।
“আমার নাম সরলা। এই বাড়িতে ত্রিশ বছর ধরে কাজ করছি।”
“আপনি এখানে থাকেন?”
“থাকি। তবে এই বাড়ির কেউ নই।”
“আমার আসার খবর জানলেন কীভাবে?”
সরলা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন।
“বাড়ির লোকেরা কখন আসবে, তা এই বাড়ি আগে থেকেই জানিয়ে দেয়।”
অদিতি বুঝতে পারল না, কথাটা তিনি মজা করে বললেন কি না।
“বাড়ির লোকেরা বলতে?”
সরলা উত্তর দিলেন না। বরং অদিতির হাতের ব্যাগটি নিয়ে বললেন, “আপনার ঘর তৈরি আছে। আজ রাতে বাইরে যাবেন না। আর একটা কথা মনে রাখবেন—রাত বারোটার পর কেউ যদি আপনার নাম ধরে ডাকে, উত্তর দেবেন না।”
অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনারা সবাই কি আমাকে ভয় দেখানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন?”
সরলা থেমে তার দিকে তাকালেন।
“আপনি আপনার বাবার মেয়ে। আপনার ভয় পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু আপনার মা এই বাড়িতে যে রাতে মারা গিয়েছিলেন, সেই রাতের কথা আপনার নিশ্চয়ই মনে নেই।”
অদিতির মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।
তার মা মারা গিয়েছিলেন যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। পরিবারের সবাই বলেছিল, নদীতে নৌকাডুবিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃতদেহও নাকি উদ্ধার করা যায়নি।
অদিতি ছোটবেলা থেকে মাকে খুব কম মনে করতে পারত। বাবাও এ বিষয়ে কখনও কথা বলতেন না।
“আপনি আমার মাকে চিনতেন?” সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
সরলা প্রদীপটি একটু উঁচু করে ধরলেন।
“চিনতাম। আপনার মায়ের মৃত্যুর পর এই বাড়িতে প্রথম যে মানুষটি মারা গিয়েছিল, তার নামও ছিল অদিতি।”
অদিতি স্থির হয়ে গেল।
“কী বললেন?”
সরলা ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে ফিরে গেলেন।
“রাতের খাবার আটটার সময় দেওয়া হবে। তার আগে দোতলায় যাবেন না।”
“কিন্তু আমার ঘর তো—”
“আপনার ঘর নিচেই। উত্তর দিকের সিঁড়ি ব্যবহার করবেন না।”
কথা শেষ করে সরলা অন্ধকার করিডরে মিলিয়ে গেলেন।
অদিতি হলঘরে একা দাঁড়িয়ে রইল। দেওয়ালের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মনে হলো, ছবির মানুষগুলো যেন তাকে দেখছে।
বিশেষ করে শেষ ছবিটির মহিলা।
তাঁর চোখ দুটো অদিতির মায়ের চোখের মতো।
৩. রাত বারোটার আগে
বাড়ির নিচতলার ঘরটি আশ্চর্যরকম পরিষ্কার। বড় খাট, পুরোনো আলমারি, জানলার পাশে একটি লেখার টেবিল। টেবিলের ওপর ফুলদানিতে শুকনো ফুল রাখা।
অদিতি ব্যাগ রেখে ঘরটি ঘুরে দেখল। আলমারির একটি ড্রয়ার খুলতেই কয়েকটি পুরোনো চিঠি পাওয়া গেল। বেশিরভাগই ইংরেজিতে লেখা, কিন্তু একটি চিঠি বাংলায়।
খামের ওপর লেখা—‘আমার মেয়ে অদিতির জন্য’।
লেখাটি তার বাবার নয়।
অদিতি চিঠিটি খুলল।
‘অদিতি,
যদি কখনও এই বাড়িতে ফিরে আসিস, তবে মনে রাখিস—তুই যা দেখবি, তার সবটাই সত্যি নয়। আর যা শুনবি, তার সবটাই মিথ্যে নয়।
তোর মা মারা যায়নি।
তোর মা-কে এই বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ সে এমন একটি সত্যি জেনে গিয়েছিল, যা এই পরিবারের সাত পুরুষের সম্মান ধ্বংস করে দিতে পারত।
তোর বাবা তোকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সে নিজেও জানত না, কাকে বিশ্বাস করা যায়।
দোতলার উত্তর ঘরে একটা লাল ডায়েরি আছে। সেটা খুঁজে বের করিস। কিন্তু ডায়েরি পড়ার আগে তেরোটি ছবির দিকে আবার তাকাবি।
কারণ তোর পরিচিত মুখের মধ্যে একটি মুখ মৃত নয়।
— তোর মা।’
অদিতির হাত কাঁপতে লাগল।
চিঠিটি বহু পুরোনো। কাগজ হলুদ, কালির রং ফিকে। তবু শেষের স্বাক্ষরটি স্পষ্ট—‘মালবিকা’।
তার মায়ের নাম মালবিকা মুখার্জি।
কিন্তু চিঠিটি এখানে এল কীভাবে? কে লিখেছিল? তার মা যদি বেঁচে থাকেন, তবে এত বছর কোথায় ছিলেন?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি মা বেঁচে থাকেন, তাহলে বাবার মৃত্যুর আগে তিনি কেন ফিরে আসেননি?
অদিতি ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
দরজায় টোকা পড়ল।
সরলা খাবার নিয়ে এসেছেন। টেবিলে ভাত, ডাল, আলুভাজা আর মাছের ঝোল সাজিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন, “খাওয়া শেষ হলে দরজা বন্ধ করে দেবেন। রাতের বেলা কেউ ডাকলেও খুলবেন না।”
“আমার মা কোথায়?” অদিতি সরাসরি প্রশ্ন করল।
সরলার হাত থেমে গেল।
“এই প্রশ্নের উত্তর এখন দেওয়া যাবে না।”
“কেন?”
“কারণ উত্তরটা জানার জন্য আপনি এখনও প্রস্তুত নন।”
অদিতি রেগে উঠল। “আমার জীবনের ব্যাপারে কে ঠিক করবে আমি প্রস্তুত কি না?”
সরলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, “আপনার বাবা শেষবার এই বাড়িতে এসেছিলেন আঠারো বছর আগে। সেদিন রাতেও তিনি একই কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন।”
“কী কথা?”
“মালবিকা কোথায়?”
অদিতির বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
“বাবা এখানে এসেছিলেন?”
“হ্যাঁ। আর সেদিন রাতেই বাড়িতে একজন মারা গিয়েছিল।”
“কে?”
সরলা উত্তর দিলেন না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
বেরোনোর আগে তিনি থেমে বললেন, “রাত বারোটার সময় আপনি যদি কান্নার শব্দ শোনেন, জানবেন সেটা কোনও মানুষের কান্না নয়।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
অদিতি একা বসে রইল। খাওয়ার ইচ্ছা চলে গেছে। সে ফোন বের করে সৌম্যকে কল করল। সৌম্য তার সহকর্মী, একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধু। ভূতের গল্পে সে বিশ্বাস করত না, আর অদিতির কোনও বিপদ হলে প্রথমে তাকেই ফোন করত।
ফোন বেজে গেল, কিন্তু কেউ ধরল না।
অদিতি আবার কল করল।
এবার ফোন ধরল সৌম্য।
“হ্যালো? কোথায় তুই?”
“মুখার্জিবাড়িতে।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
“কোন মুখার্জিবাড়ি?”
“কৃষ্ণনগরের কাছে বাবার পুরোনো বাড়ি। তুই জানিস না?”
“অদিতি, তুই এখনই ওখান থেকে বেরিয়ে আয়।”
“কেন?”
“কারণ তোর বাবার মৃত্যুর আগে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তুই যেন কোনও অবস্থাতেই ওই বাড়িতে না যাস।”
“তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম, তুই যাবি না। কিন্তু এখন আমার কথা শোন—বাড়িতে যদি সরলা নামে কোনও মহিলা থাকে, তার কাছ থেকে দূরে থাকিস।”
অদিতির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“সরলাকে তুই চিনিস?”
“চিনি না। কিন্তু আঠারো বছর আগে ওই বাড়িতে যে খুনের মামলা হয়েছিল, সেখানে সরলার নাম ছিল।”
“খুন?”
“একটি পাঁচ বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল। মেয়েটির নাম ছিল অদিতি মুখার্জি।”
অদিতির মুখ শুকিয়ে গেল।
“কী বলছিস তুই?”
সৌম্যর গলা আরও নিচু হয়ে এল।
“পুলিশের নথিতে লেখা আছে, দেবব্রত মুখার্জির পাঁচ বছরের মেয়ে অদিতি ওই বাড়ির দোতলার উত্তর ঘরে মারা গিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মামলার কয়েক মাস পর থেকেই দেবব্রত কলকাতায় একটি মেয়েকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। সেই মেয়েটির নামও ছিল অদিতি।”
অদিতি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
তারপর কোনওরকমে বলল, “তাহলে আমি কে?”
সৌম্য উত্তর দেওয়ার আগেই ফোনের ওপাশে একটা শব্দ হলো। যেন কেউ তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়েছে।
তারপর অপরিচিত এক পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
“ওকে জিজ্ঞেস করো, তার বাঁ হাতের কবজিতে যে জন্মদাগ আছে, সেটা কোথা থেকে এসেছে।”
লাইন কেটে গেল।
অদিতি ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বাঁ হাতের কবজিতে সত্যিই একটি জন্মদাগ ছিল—অর্ধচন্দ্রের মতো বাঁকানো, গাঢ় বাদামি রঙের।
ছোটবেলা থেকে বাবা বলতেন, জন্মের সময় থেকেই দাগটি ছিল।
কিন্তু এখন সেই কথাটাও মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে।
৪. তেরোটি ছবি
রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।
অদিতি আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। সরলার নিষেধ অগ্রাহ্য করে সে হলঘরে বেরিয়ে এল। বাড়ি নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। ঝাড়বাতির কয়েকটি বাল্ব জ্বলছে, বাকিগুলো অন্ধকার।
দেওয়ালের তেরোটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সে একে একে মুখগুলো দেখতে লাগল।
প্রথম ছবিতে এক বৃদ্ধ জমিদার। দ্বিতীয় ছবিতে তাঁর স্ত্রী। তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম—পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ। কয়েকটি ছবিতে তার বাবা ছোটবেলায় দাঁড়িয়ে আছেন। একটি ছবিতে তার মা মালবিকা, কোলে ছোট্ট একটি মেয়ে।
ছবির নীচে নাম লেখা—‘অদিতি, ২০০৩’।
অদিতির মনে হলো, ছবির মেয়েটি তারই মতো দেখতে।
সে ছবির কাছে এগিয়ে গেল।
মেয়েটির বাঁ হাতের কবজিতে অর্ধচন্দ্রের মতো জন্মদাগ।
অদিতি পিছিয়ে এল।
তার নিজের শৈশবের ছবি খুব কম ছিল। বাবা বলতেন, পুরোনো বাড়ির দুর্ঘটনায় অনেক ছবি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ছবিটি এত বছর ধরে দেওয়ালে ঝুলছে কেন?
সে ছবির ফ্রেম খুলতে গেল। পেছনে একটি ভাঁজ করা কাগজ আটকে ছিল। কাগজটি বের করে দেখল, তাতে মাত্র একটি বাক্য লেখা—
‘যে মেয়েটি ছবিতে আছে, সে তোমার মতো দেখতে, কিন্তু সে তুমি নয়।’
অদিতির মাথা ঘুরে উঠল।
ঠিক তখনই দোতলার উত্তর দিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এল।
একটি ছোট্ট মেয়ের কান্না।
“মা… মা… দরজা খোলো…”
অদিতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কান্নার শব্দ আবার এল।
“মা, আমি অন্ধকারে ভয় পাচ্ছি…”
তার নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল। পাঁচ বছর বয়সে সে নাকি কয়েক মাস ধরে দুঃস্বপ্ন দেখত। অন্ধকার ঘরে আটকে পড়া, দরজায় আঘাত করা, আর মাকে ডাকতে থাকা—এই স্বপ্নগুলো এত স্পষ্ট ছিল যে বড় হওয়ার পরও তার মনে থাকত।
কিন্তু সে তো কখনও এই বাড়িতে আসেনি।
তাহলে এই কান্নার শব্দ তার পরিচিত মনে হচ্ছে কেন?
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল অদিতি। দোতলার উত্তর দিকের দরজাটি বন্ধ। দরজার গায়ে লাল রঙের পুরোনো দাগ, যেন কেউ বহু বছর আগে রক্তমাখা হাত দিয়ে স্পর্শ করেছিল।
দরজার ওপাশ থেকে এবার একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
“অদিতি, তুমি ফিরে এসেছ?”
অদিতি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কণ্ঠটি হুবহু তার নিজের মতো।
“অদিতি, দরজাটা খোলো। ওরা আমাকে আবার মেরে ফেলবে।”
অদিতি দরজার হাতলে হাত রাখল।
ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে সরলার কণ্ঠ ভেসে এল।
“খবরদার!”
অদিতি ঘুরে দাঁড়াল। সরলার হাতে এবার প্রদীপ নেই। তাঁর হাতে একটি পুরোনো লোহার চাবি।
“আমি আপনাকে বলেছিলাম, উত্তর ঘরে যাবেন না।”
“ওখানে কে আছে?”
“কেউ নেই।”
“আমি নিজের কণ্ঠ শুনেছি!”
সরলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
“এই বাড়িতে সব দরজা খুলতে নেই। কিছু দরজার ওপাশে মানুষ থাকে না, স্মৃতি থাকে। আর কিছু স্মৃতি মানুষকে বাঁচতে দেয় না।”
“আপনি সত্যিটা বলছেন না।”
“সত্যিটা বললে আপনি এখান থেকে পালাতে চাইবেন। কিন্তু তার আগেই হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
অদিতি তাঁর হাত থেকে চাবিটা কেড়ে নিতে গেল। সরলা শক্ত করে চাবি চেপে ধরলেন।
দু’জনের টানাটানির মধ্যে চাবিটি মেঝেতে পড়ে গেল। অদিতি ঝুঁকে সেটি তুলে নিয়ে দরজার তালায় ঢুকিয়ে দিল।
সরলা চিৎকার করে উঠলেন, “না!”
তালাটি খুলে গেল।
দরজার ওপাশে ছোট্ট একটি ঘর। জানলা বন্ধ, দেওয়ালে কালচে দাগ, মাঝখানে কাঠের খাট। খাটের ওপর একটি পুতুল পড়ে আছে। পুতুলটির চোখ দুটো কাচের, মুখে লাল সুতো দিয়ে সেলাই করা হাসি।
ঘরের কোণে একটি বড় আয়না।
অদিতি ঘরে ঢুকতেই দরজাটি নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
সে ঘুরে দরজা খুলতে গেল, কিন্তু দরজাটি আর নড়ল না।
আয়নার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা জমে গেল।
আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে না।
তার বদলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ বছরের একটি মেয়ে।
মেয়েটির পরনে সাদা ফ্রক। চুলের পাশে লাল ফিতে। বাঁ হাতের কবজিতে অর্ধচন্দ্রের মতো জন্মদাগ।
মেয়েটি আয়নার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে হাত তুলল।
তার ঠোঁট নড়ল।
“তুমি আমার জীবনটা নিয়ে নিয়েছ।”
অদিতি চিৎকার করতে গিয়েও পারল না।
মেয়েটি এবার হাসল।
“এবার আমার পালা।”
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে থেকে একটি গুলির শব্দ শোনা গেল।
তারপর সব অন্ধকার।
৫. মৃতের ঘর
অদিতির যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সে মেঝেতে শুয়ে। ঘরে আলো জ্বলছে। দরজাটি খোলা। সরলা তার পাশে বসে কপালে জল দিচ্ছেন।
“আমি কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম?” অদিতি উঠে বসে জিজ্ঞেস করল।
“পাঁচ মিনিট।”
“আমি আয়নায় একটা মেয়েকে দেখেছি।”
সরলা চোখ নামিয়ে নিলেন।
“আপনি যা দেখেছেন, সেটা ভুলে যান।”
“মেয়েটি বলল, আমি তার জীবন কেড়ে নিয়েছি।”
সরলা কোনও উত্তর দিলেন না।
অদিতি খাটের দিকে তাকাল। পুতুলটি সেখানে নেই।
আয়নায় এবার তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
“পুতুলটা কোথায়?”
সরলা চুপ।
অদিতি উঠে দাঁড়াল। “আমি পুলিশ ডাকব।”
“ডাকুন। পুলিশ এই বাড়িতে আগেও এসেছিল।”
“তাহলে তারা কী পেয়েছিল?”
সরলা এবার তার চোখের দিকে তাকালেন।
“একটি মৃত শিশু। আর একটি মেয়ে, যে বলেছিল সে কিছুই মনে করতে পারে না।”
অদিতির মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
“মেয়েটি কে ছিল?”
“সেই প্রশ্নের উত্তর আপনার বাবা জানতেন।”
“আমার বাবা এখন মৃত।”
“তাই তো আপনাকে এখানে আসতে হয়েছে।”
সরলা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে বললেন, “সকাল হলে আপনি চলে যেতে পারেন। কিন্তু যাওয়ার আগে বাবার ঘরটা দেখে যাবেন। সেখানে এমন একটি জিনিস আছে, যা আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে আপনি আসলে কে।”
অদিতি সারারাত আর ঘুমোতে পারল না।
ভোরের আলো ফুটতেই সে বাড়ির পেছনের করিডর দিয়ে বাবার পুরোনো ঘরে গেল। ঘরটি বন্ধ ছিল না। ভেতরে বইয়ের আলমারি, একটি কাঠের ডেস্ক, দেওয়ালে বাবার তরুণ বয়সের ছবি।
ডেস্কের ড্রয়ার খুলতেই সে একটি লাল ডায়েরি পেল।
মলাটে লেখা—‘মালবিকা’।
অদিতি চিঠির কথা মনে করল। লাল ডায়েরি—দোতলার উত্তর ঘরে খুঁজতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটি সেখানে নয়, বাবার ঘরে।
সে ডায়েরিটি খুলল।
প্রথম কয়েকটি পাতা দৈনন্দিন ঘটনার বর্ণনা। তারপর একটি পাতায় তারিখ লেখা—১৭ অক্টোবর, ২০০৮।
ঠিক সেই তারিখ, যা অজ্ঞাত চিঠির শেষে লেখা ছিল।
পাতাটিতে দেবব্রত লিখেছেন—
‘আজ অদিতি ফিরে আসবে। আমি জানি না, সে আমাকে ক্ষমা করবে কি না। এত বছর ধরে আমি তাকে সত্যি থেকে দূরে রেখেছি। ভেবেছিলাম, সময় সবকিছু মুছে দেবে। কিন্তু রাত হলেই সেই শিশুর কান্না শুনতে পাই। মালবিকা এখনও বিশ্বাস করে, তার মেয়েকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অথচ আমি জানি, যে মেয়েটিকে আমি নিজের সন্তান বলে বড় করেছি, তার পরিচয় আমি নিজেই বদলে দিয়েছি।’
অদিতির হাত থেকে ডায়েরিটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
পরের পাতায় লেখা—
‘আজ আমি উত্তর ঘরটি খুলেছিলাম। সেখানে কেউ নেই। তবু আয়নায় সেই মুখটা দেখলাম। যে মুখটি আমার মেয়ের হওয়ার কথা ছিল। সে আমাকে বলল, “বাবা, তুমি আমাকে কেন রেখে এলে?” আমি উত্তর দিতে পারিনি।’
আরও একটি পাতা।
‘আমি সত্যিটা লিখে রাখছি। যদি আমার কিছু হয়, অদিতি যেন জানতে পারে—তার জন্মের রাতেই এই বাড়িতে দু’টি মেয়ে ছিল। একটির নাম অদিতি, অন্যটির নাম মাধবী। আগুন লাগার পর সবাই বলেছিল, একটি শিশু মারা গেছে। কিন্তু মৃতদেহটি কার ছিল, তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। আমি সেই সুযোগে একটি শিশুকে নিয়ে চলে যাই। আর অন্য শিশুটিকে এই বাড়ির অন্ধকারে রেখে আসি।’
অদিতির চোখের সামনে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে গেল।
তারপর ডায়েরির শেষ পাতায় সে এমন একটি বাক্য পড়ল, যা তার সমস্ত অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
‘আমি যে মেয়েটিকে এত বছর নিজের মেয়ে বলে বড় করেছি, সে আমার সন্তান নয়। আমার আসল মেয়ে কোথায় আছে, তা আমি জানি না। কিন্তু গতকাল রাতে সে আমাকে ফোন করেছিল। সে বলেছে, সে ফিরে আসছে।’
পাতার নিচে কাঁপা হাতে লেখা একটি নাম—
‘মাধবী।’
অদিতি ডায়েরি বন্ধ করে দিল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
“তুমি কি অদিতি?”
“কে বলছেন?”
“আমার নাম মাধবী। আমি তোমার বোন।”
অদিতি কথা বলতে পারল না।
মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল, “তোমার বাবা আমাকে খুন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বেঁচে গেছি। আর আজ রাতে আমি ওই বাড়িতে ফিরব।”
“তুমি কোথায়?”
“বাড়ির বাইরে।”
অদিতি দৌড়ে জানলার কাছে গেল। সামনের ফটকের বাইরে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পোশাক, লম্বা চুল, মুখে অদ্ভুত এক হাসি।
মেয়েটি মাথা তুলে সরাসরি জানলার দিকে তাকাল।
তার বাঁ হাতের কবজিতে অর্ধচন্দ্রের মতো জন্মদাগ।
অদিতি নিজের কবজির দিকে তাকাল।
তারপর আবার জানলার বাইরে।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি ফোনের ওপাশে ফিসফিস করে বলল—
“অদিতি, তুমি তো আমার নাম নিয়ে বেঁচে আছ। এবার আমার জীবনটা ফিরিয়ে দাও।”
কল কেটে গেল।
আর ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে এল সরলার চিৎকার—
“ছোটবউমা! দোতলায় যাবেন না! আজ রাতে চৌদ্দ নম্বর ছবিটা দেওয়ালে ফিরে এসেছে!”
অদিতি ধীরে ধীরে হলঘরের দিকে তাকাল।
দেওয়ালে সত্যিই একটি নতুন ছবি ঝুলছে।
ছবিতে দুইটি ছোট্ট মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজনের মুখ অদিতির মতো। অন্যজনের মুখও অদিতির মতো।
ছবির নীচে লেখা—
‘অদিতি ও মাধবী—শেষ রাত, ১৭ অক্টোবর, ২০০৮।’
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি ছিল অন্য।
ছবির দুই মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেবব্রত মুখার্জি।
আর তাঁর গলায় পেঁচানো রয়েছে একটি লাল ওড়না।
যে ওড়নাটি অদিতি নিজের মায়ের পুরোনো ছবিতে দেখেছিল।
চলবে…