Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে প্রতি রাতে একজন মারা যায় (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মেয়ের প্রত্যাবর্তন)।

১. চৌদ্দ নম্বর ছবি

দেওয়ালে ঝুলে থাকা ছবিটার দিকে অদিতি তাকিয়ে রইল।

ছবিতে তার বাবা দেবব্রত মুখার্জি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দু’পাশে একই মুখের দুটি ছোট্ট মেয়ে। দু’জনের পরনেই সাদা ফ্রক, চুলে লাল ফিতে। একজনের বাঁ হাতের কবজিতে অর্ধচন্দ্রের মতো জন্মদাগ। অন্যজনের কবজিও ছবির ভাঁজের কারণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু দেবব্রতর গলায় জড়ানো লাল ওড়নাটা অদিতির চোখ সরাতে দিচ্ছিল না।

ওড়নাটা সে আগে দেখেছে।

বাবার পুরোনো আলমারিতে রাখা মায়ের ছবিতে।

সেই ছবিতে মালবিকার গলায় একই ওড়না ছিল। ছবির পেছনে লেখা ছিল—‘আমার মেয়ে অদিতির সঙ্গে শেষ দুর্গাপুজো’।

অদিতি ছবির কাছে এগিয়ে গেল। ফ্রেমের কাচে হাত রাখতেই তার মনে হলো, ভেতরের একটি মেয়ে চোখের পাতা ফেলল।

সে ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল।

“এটা কী করে সম্ভব?”

পেছন থেকে সরলার কণ্ঠ এল, “আপনি ছবিটা ছুঁয়েছেন?”

অদিতি ঘুরে তাকাল। সরলার মুখে ভয়। তাঁর হাতে একটি থালা, কিন্তু হাত কাঁপতে থাকায় থালার ওপর রাখা কাপ থেকে জল পড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

“এই ছবিটা কে টাঙিয়েছে?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।

“আমি জানি না।”

“আপনি মিথ্যে বলছেন। এই বাড়িতে যা ঘটে, তার সবই আপনি জানেন।”

সরলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “চৌদ্দ নম্বর ছবিটা এই বাড়িতে কখনও থাকার কথা নয়। শেষবার ছবিটা দেখা গিয়েছিল আঠারো বছর আগে। তারপর দেবব্রতবাবু নিজে সেটাকে পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।”

“তাহলে আবার এল কীভাবে?”

“সেটাই তো ভয়।”

অদিতি ছবির পেছনে হাত বাড়াল। ফ্রেমের নিচে একটা ভাঁজ করা কাগজ আটকে ছিল। কাগজটি টেনে বের করতেই তাতে লেখা কয়েকটি শব্দ চোখে পড়ল—

‘একটি মেয়ে মারা গিয়েছিল। অন্যটি তার মৃত্যুর বিনিময়ে বেঁচে ছিল।’

অদিতির মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে উঠল।

“মাধবী কে?” সে প্রশ্ন করল।

সরলা এবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আপনার যমজ বোন।”

“আমার বোন যদি থাকে, তবে বাবা আমাকে এত বছর কেন বলেননি?”

“কারণ তিনি ভয় পেতেন।”

“কাকে?”

সরলা উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সামনের দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।

ধাম! ধাম! ধাম!

তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ—

“দরজা খোলো, অদিতি। আমি জানি তুমি ভেতরে আছ।”

অদিতি দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সরলা তার হাত চেপে ধরলেন।

“খুলবেন না।”

“ও আমার বোন।”

“আপনি নিশ্চিত?”

অদিতি থেমে গেল।

বাইরে থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।

“অদিতি, তুমি যদি দরজা না খোলো, তবে আমি সবাইকে বলে দেব, তোমার বাবাকে কে মেরেছিল।”

অদিতির বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

বাবা মারা গেছেন মাত্র সাত দিন আগে। হাসপাতালের কাগজে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা লেখা। তাঁর কোনও শত্রু ছিল বলে অদিতি জানত না।

কিন্তু এখন এক অচেনা মেয়ে দাবি করছে, তার বাবাকে খুন করা হয়েছে।

অদিতি সরলার হাত ছাড়িয়ে দরজা খুলে দিল।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে সে পিছিয়ে গেল।

মেয়েটির মুখ তার নিজের মুখের মতো। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। শুধু চুলের দৈর্ঘ্য আলাদা। মেয়েটির বাঁ হাতের কবজিতে অর্ধচন্দ্রের মতো জন্মদাগ।

অদিতিরও।

দু’জন কিছুক্ষণ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মেয়েটি মৃদু হাসল।

“আমাকে চিনতে পারছ না, দিদি?”

অদিতির ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“তুমি… মাধবী?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“আমি মাধবী। আর তুমি সেই মেয়ে, যার জন্য আমাকে আঠারো বছর অন্ধকারে থাকতে হয়েছে।”

২. দুই বোনের মুখোমুখি

মাধবী বাড়িতে ঢুকতেই সরলা পিছিয়ে গেলেন। তাঁর মুখে আতঙ্ক এত স্পষ্ট ছিল যে অদিতির মনে হলো, তিনি যেন কোনও জীবিত মানুষকে নয়, মৃত কাউকে দেখছেন।

মাধবী সরলার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছ কেন? তুমি তো জানতেই আমি একদিন ফিরব।”

সরলা কাঁপা গলায় বললেন, “তোমার এখানে আসার কথা ছিল না।”

“আমার জীবনে কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করার অধিকার তোমাদের আর নেই।”

মাধবী হলঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দেওয়ালে ঝুলে থাকা চৌদ্দ নম্বর ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল।

“বাবা শেষ পর্যন্ত ছবিটা ফিরিয়ে এনেছে,” সে বলল।

অদিতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি বাবার মৃত্যুর কথা জানো?”

মাধবী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

“জানি। কারণ তাঁর মৃত্যুর আগের রাতে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম।”

“তুমি কোথায় ছিলে? বাবা তো বলেছিলেন, আমার কোনও বোন নেই।”

“বাবা অনেক কিছু বলেছিলেন। তার সবটাই কি সত্যি ছিল?”

অদিতি উত্তর দিতে পারল না।

মাধবী সোফায় বসে পড়ল। তার চোখের নীচে গভীর কালি। মনে হচ্ছিল, বহু রাত ধরে সে ঘুমোয়নি।

“আমাদের জন্ম হয়েছিল ২০০৩ সালের ১৭ অক্টোবর। এই বাড়িতেই। মা মালবিকা আমাদের দু’জনকে জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু জন্মের পরই একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।”

অদিতি ফিসফিস করে বলল, “কাকে?”

“সেটাই তো আসল প্রশ্ন। হাসপাতালের নথিতে লেখা আছে, আমি মারা গিয়েছিলাম। কিন্তু যে শিশুটিকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, তার দেহ কেউ কখনও দেখেনি।”

“তাহলে তুমি কোথায় ছিলে?”

“আমাকে এই বাড়িরই এক পুরোনো পরিচারিকা লুকিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। পরে আমাকে এক দম্পতির কাছে বড় হতে দেওয়া হয়। তাঁরা আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন। আমি ছোটবেলায় জানতামই না, আমার আসল পরিচয় কী।”

“তাহলে এত বছর পরে ফিরে এলে কেন?”

মাধবীর চোখে কঠিন দৃষ্টি ফুটে উঠল।

“কারণ আমার পালক মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটি বাক্স দিয়েছিলেন। বাক্সের মধ্যে ছিল আমার জন্মের নথি, বাবার লেখা চিঠি আর এই বাড়ির একটি ছবি। সেই ছবিতে তোমাকে দেখেছিলাম। তারপর বুঝলাম, আমার জীবনের গল্পটা অন্য কেউ লিখে দিয়েছে।”

অদিতি ধীরে ধীরে তার পাশে বসে পড়ল।

“আমি তো জানতামই না, তোমার অস্তিত্ব আছে।”

“তোমার জানার কথা নয়। তোমাকে অন্য পরিচয় দিয়ে বড় করা হয়েছিল।”

“অন্য পরিচয় মানে?”

মাধবী ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো জন্মসনদ বের করল। কাগজটি এতটাই বিবর্ণ যে কিছু অক্ষর পড়া কঠিন। তবু নামের ঘরে স্পষ্ট লেখা—‘মাধবী মুখার্জি’। জন্মতারিখ ১৭ অক্টোবর, ২০০৩। পিতার নাম দেবব্রত মুখার্জি। মাতার নাম মালবিকা মুখার্জি।

তারপর সে আরেকটি কাগজ বের করল।

সেটি অদিতির জন্মসনদ।

একই তারিখ। একই বাবা-মা। একই হাসপাতালের নাম।

শুধু একটির পাশে লেখা—‘জীবিত’।

অন্যটির পাশে—‘মৃত’।

অদিতির হাত কাঁপতে লাগল।

“তাহলে আমরা যমজ?”

“হ্যাঁ। কিন্তু আমাদের মধ্যে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। আরেকজনকে সেই মৃত শিশুর পরিচয় দিয়েই বড় করা হয়েছে।”

“কিন্তু কে কোনজন?”

মাধবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি জানি না।”

অদিতি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

“তুমি জানো না?”

“না। কারণ আমাদের জন্মের সময়ই পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল। যে নার্স আমাদের আলাদা করেছিল, সে পরে নিখোঁজ হয়ে যায়। মা মৃত্যুর আগে কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। বাবা সব জানতেন, অথচ শেষ পর্যন্ত সত্যিটা প্রকাশ করেননি।”

“মা কীভাবে মারা গেলেন?”

মাধবী মুখ নামিয়ে বলল, “মা মারা যাননি। অন্তত যেভাবে আমাদের বলা হয়েছে, সেভাবে নয়।”

অদিতি যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

মাধবী তার দিকে তাকাল।

“মা এখনও বেঁচে আছেন।”

৩. যে মা কখনও মরেননি

অদিতি উঠে দাঁড়াল। তার মনে হচ্ছিল, বাড়ির দেওয়ালগুলো ক্রমশ কাছে চলে আসছে।

“অসম্ভব! আমার মা নদীতে নৌকাডুবিতে মারা গিয়েছিলেন। বাবা নিজে আমাকে সেই কথা বলেছেন।”

“তোমার বাবা মিথ্যে বলেছিলেন।”

“কেন?”

“কারণ মা এমন একটা সত্যি জেনে গিয়েছিলেন, যা এই বাড়ির সবাইকে বিপদে ফেলতে পারত।”

মাধবী ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট ক্যাসেট বের করল।

“এটা আমি পালক মায়ের বাক্সে পেয়েছিলাম। ক্যাসেটের ওপর বাবার হাতের লেখায় লেখা—‘মালবিকার সত্যি’।”

অদিতি ক্যাসেটটি হাতে নিয়ে দেখল। পুরোনো টেপ। পাশে একটি তারিখ—১৮ অক্টোবর, ২০০৮।

“এটা কোথায় চালাব?”

সরলা এতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনি বললেন, “বাবুর ঘরে একটা পুরোনো টেপ রেকর্ডার আছে।”

তিনজন বাবার ঘরে গেল।

অদিতি টেপ রেকর্ডারটি খুঁজে বের করে ক্যাসেট ঢোকাল। প্রথমে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর দেবব্রতের কণ্ঠ ভেসে এল।

“মালবিকা, যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনতে পাও, তবে বুঝবে আমি আর তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি। আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না। কিন্তু তোমার মেয়েদের বাঁচানোর জন্য আমি যা করেছি, তার অন্য কোনও পথ আমার সামনে ছিল না।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর দেবব্রত আবার বললেন, “সেই রাতে আমি একজন শিশুকে মৃত বলে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু শিশুটি মারা যায়নি। আমি জানতাম, যদি সত্যিটা প্রকাশ পায়, তবে যারা এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তারা দু’জনকেই মেরে ফেলবে। তাই একজনকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। অন্যজনকে নিজের কাছে রেখেছিলাম।”

অদিতির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

রেকর্ডিংয়ে দেবব্রতের গলা আরও ভেঙে এল।

“কিন্তু আমি ভুল করেছিলাম। সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে আমি তার পরিচয় কেড়ে নিয়েছিলাম। আর তোমাকে হারানোর ভয়ে সত্যিটা চাপা দিয়েছিলাম। তুমি যদি কখনও ফিরে আসো, তবে উত্তর দিকের ঘরটি খুলবে। সেখানে এমন একটি নথি আছে, যা তোমাদের জন্মের আসল পরিচয় জানাবে।”

হঠাৎ রেকর্ডিং থেমে গেল।

অদিতি হতাশ হয়ে বলল, “এতটুকুই?”

মাধবী টেপ রেকর্ডারের দিকে ঝুঁকে দেখল।

“না। টেপের শেষ অংশটা কাটা হয়েছে।”

সে ক্যাসেটটি বের করে উল্টে দিল। আবার চালু করল।

কয়েক সেকেন্ড পরে দেবব্রতের কণ্ঠ শোনা গেল।

“মালবিকা, আমি জানি তুমি এই বাড়ির উত্তর ঘরে আছ। আমি তোমাকে বের করতে পারিনি। কিন্তু তোমার মেয়েরা একদিন তোমাকে খুঁজে নেবে। শুধু একটা কথা মনে রেখো—তাদের মধ্যে যে মেয়েটি নিজের মৃত্যুর খবর পড়বে, সে-ই তোমাকে খুঁজে পাবে।”

অদিতি আর মাধবী একসঙ্গে একে অন্যের দিকে তাকাল।

“নিজের মৃত্যুর খবর পড়বে?” অদিতি ফিসফিস করে বলল।

মাধবী মাথা নাড়ল।

“বাবা কি ভবিষ্যৎ জানতেন?”

সরলা এতক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনি বললেন, “ভবিষ্যৎ নয়। তিনি জানতেন, একদিন এই বাড়ির সত্যি বাইরে আসবেই। আর সেই সত্যির সূত্রপাত হবে এমন একটি খবর দিয়ে, যেখানে মৃত বলে ঘোষণা করা মেয়েটির নাম থাকবে।”

অদিতি চমকে উঠল।

“আপনি এসব জানতেন?”

সরলা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি অনেক কিছু জানি। কিন্তু সব বলার সাহস এত বছর আমার হয়নি।”

“তাহলে এখন বলুন।”

সরলা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।

“আপনাদের জন্মের রাতে এই বাড়িতে শুধু দু’টি শিশু জন্মায়নি। সেদিন আরও একজন মারা গিয়েছিল। সে ছিল মালবিকাদেবীর ছোট বোন, মাধুরী।”

মাধবী উঠে দাঁড়াল।

“আমার মায়ের বোন?”

“হ্যাঁ। মাধুরী ওই রাতে উত্তর ঘরে ছিলেন। তিনি জানতেন, শিশু দু’টির পরিচয় বদলানো হচ্ছে। তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। পরদিন সকালে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।”

অদিতি বলল, “তাহলে পুলিশ?”

“পুলিশকে বলা হয়েছিল, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু আমি জানতাম, তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না।”

“কে তাঁকে মেরেছিল?”

সরলা কাঁপা গলায় বললেন, “আমি জানি না। তবে মৃত্যুর আগে মাধুরী একটি নাম বলেছিলেন—অরিন্দম।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

অদিতি নামটি আগে কখনও শোনেনি। কিন্তু মাধবীর মুখ দেখে বোঝা গেল, সে নামটি তার অচেনা নয়।

“অরিন্দম রায়,” মাধবী বলল। “আমার পালক বাবার পুরোনো বন্ধু। মা মারা যাওয়ার আগে তাঁর নামও বলেছিলেন।”

অদিতি টেবিলের ওপর হাত রাখল।

“তাহলে আমাদের মায়ের সঙ্গে কী হয়েছিল?”

সরলা এবার উত্তর দিলেন না।

কারণ সেই মুহূর্তে দোতলার উত্তর দিক থেকে আবার কান্নার শব্দ ভেসে এল।

“মা… দরজা খোলো…”

এবার সেই কণ্ঠস্বরটি একটি ছোট্ট মেয়ের নয়।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর।

আর সেই কণ্ঠস্বর অদিতির মায়ের মতো।

৪. উত্তর ঘরের দরজা

রাত তখন এগারোটা পঞ্চান্ন।

অদিতি, মাধবী এবং সরলা উত্তর দিকের সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। সিঁড়ির ওপরে সেই বন্ধ দরজা। দরজার নিচ দিয়ে সরু এক রেখা আলো বেরিয়ে আসছে।

“ওখানে কেউ আছে,” অদিতি বলল।

সরলা মাথা নাড়লেন।

“আমি জানি।”

“তাহলে এত বছর দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন কেন?”

“কারণ দেবব্রতবাবু আমাকে শপথ করিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মেয়েরা নিজেরাই ফিরে না আসা পর্যন্ত দরজাটা খোলা যাবে না।”

মাধবী সরলার দিকে তাকাল।

“আপনি আমাদের দু’জনকে এত বছর আলাদা রেখেছিলেন?”

“আমি শুধু নির্দেশ পালন করেছি।”

“কার নির্দেশ?”

সরলা উত্তর দিলেন না।

অদিতি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। মাধবী তার পেছনে। সরলা কিছুটা দূরত্ব রেখে অনুসরণ করলেন।

দরজার সামনে এসে অদিতি হাতল ঘোরাল। দরজাটি খুলে গেল।

ঘরের ভেতর বাতাস ভারী। জানলাগুলো বন্ধ, তবু পর্দা নড়ছে। দেওয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার, টেবিলে ধুলো জমা বই। এক কোণে একটি কাঠের আলমারি।

কিন্তু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটিকে দেখে অদিতির পা থেমে গেল।

সাদা শাড়ি, লম্বা চুল, ফ্যাকাশে মুখ।

মহিলাটি ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালেন।

অদিতি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

সে মুখটি তার শৈশবের স্মৃতিতে অস্পষ্ট হয়ে থাকা মুখ। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বাবার পুরোনো ছবিতে দেখা মুখ। যে মুখকে সে মৃত ভেবে বড় হয়েছে।

“মা?”

মহিলাটির চোখ ভিজে উঠল।

“অদিতি…”

অদিতি ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। এত বছর জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এল। সে মায়ের কাঁধে মুখ রেখে কাঁদতে লাগল।

“তুমি কোথায় ছিলে? কেন আমাকে ফেলে গেলে?”

মালবিকা তার মাথায় হাত রাখলেন।

“আমি তোমাকে ফেলে যাইনি, মা। আমাকে আটকে রাখা হয়েছিল।”

মাধবী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে জল, কিন্তু সে এগিয়ে এল না।

মালবিকা তার দিকে তাকালেন।

“তুইও এসেছিস, মাধবী?”

মাধবী কেঁপে উঠল।

“তুমি আমার নাম জানো?”

“আমি তোকে জন্ম দিয়েছি, মা। তোদের দু’জনের নাম আমি নিজে রেখেছিলাম।”

মাধবী ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তিনজন একে অন্যকে জড়িয়ে ধরল।

বহু বছরের বিচ্ছেদ, ভুল পরিচয়, মিথ্যে মৃত্যু—সবকিছু যেন সেই মুহূর্তে এক জায়গায় এসে থামল।

কিন্তু মালবিকা তাদের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন।

“আমাদের হাতে সময় খুব কম।”

অদিতি চোখ মুছে বলল, “কেন?”

মালবিকা দরজার দিকে তাকালেন।

“কারণ যে মানুষটি আমাকে এত বছর বন্দি করে রেখেছিল, সে জানে তোমরা এখানে এসেছ।”

“কে সে?”

মালবিকা উত্তর দেওয়ার আগে ঘরের কোণ থেকে একটি শব্দ হলো।

টক।

টক।

টক।

যেন কেউ কাঠের ভেতর থেকে আঘাত করছে।

মাধবী আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। আলমারির পেছনে দেওয়ালে একটি ছোট দরজা। দরজার গায়ে লোহার তালা।

মালবিকা ফিসফিস করে বললেন, “ওটা খুলো না।”

কিন্তু মাধবী ইতিমধ্যে তালাটির দিকে হাত বাড়িয়েছে।

“কেন?”

মালবিকার চোখে আতঙ্ক।

“কারণ ওখানে এমন একজনের দেহ আছে, যে আঠারো বছর আগে মারা গিয়েছিল।”

অদিতির গলা শুকিয়ে গেল।

“কার দেহ?”

মালবিকা উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই বাড়ির নিচতলা থেকে ভারী পায়ের শব্দ ভেসে এল। কেউ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে।

একটি পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল।

“মালবিকা, এবার আর লুকিয়ে লাভ নেই।”

মালবিকার মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।

“অরিন্দম!”

মাধবী দরজার দিকে ছুটে গেল। কিন্তু দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেছে।

পায়ের শব্দ আরও কাছে এল।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে অরিন্দম রায়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে এসো, মালবিকা। নইলে এবার তোমাদের তিনজনকেই মৃত বলে ঘোষণা করতে হবে।”

অদিতি মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।

“ওই লোকটা কে?”

মালবিকা তার চোখের দিকে তাকালেন।

“তোমাদের জন্মের রাতে যে মানুষটি একজন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেছিল, সেই মানুষটিই তোমাদের বাবাকে হত্যা করেছে।”

অদিতির বুকের ভেতর রক্ত যেন জমে গেল।

“কিন্তু বাবা তো সাত দিন আগে মারা গেছেন!”

মালবিকা মাথা নাড়লেন।

“না, মা। তোমার বাবা সাত দিন আগে মারা যাননি। তাঁর মৃত্যু হয়েছে আঠারো বছর আগে।”

ঘরের মধ্যে যেন সমস্ত বাতাস থেমে গেল।

অদিতি মায়ের হাত ছেড়ে পিছিয়ে এল।

“তুমি কী বলছ?”

মালবিকা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনেছ, সে দেবব্রত মুখার্জি ছিল না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধাম!

তারপর দ্বিতীয় আঘাত।

ধাম!

দরজার কাঠ ফেটে গেল।

আর মালবিকা অদিতির কানে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন—

“তোমার আসল বাবা এখনও এই বাড়িতেই আছে।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *