Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে যাত্রার শেষ নেই)।

১. নিজের মুখোমুখি

“দাদা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”

ছোট ছেলেটির প্রশ্নে অরিন্দমের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল।

ছেলেটির বয়স আট কি নয়। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, পায়ে কালো জুতো, হাতে লাল রঙের খেলনা ট্রেন। কপালের বাঁ দিকে ছোট একটি কাটা দাগ।

অরিন্দমের নিজের শৈশবের ছবিতেও ঠিক সেই জায়গায় এমন একটি দাগ ছিল।

“তুমি কে?” অরিন্দম কোনও রকমে প্রশ্ন করল।

ছেলেটি অবাক হয়ে তাকাল।

“আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তো তোমার সঙ্গে সব সময় খেলতাম!”

মেঘলা অরিন্দমের পাশে এসে দাঁড়াল।

“এটা কোনওভাবে সম্ভব নয়। তুমি তো বলেছিলে, তোমার যমজ ভাই জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা গিয়েছিল।”

অরিন্দম ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার নাম কী?”

ছেলেটি হাসল।

“তুমি জানো না? আমার নাম অরুণ।”

“অরুণ রায়?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি কোথায় থাকো?”

ছেলেটি আঙুল তুলে ট্রেনের দিকে দেখাল।

“ওখানে।”

তারপর সে অরিন্দমের হাত ধরতে গেল।

অরিন্দম পিছিয়ে এল।

“আমাকে ছোঁবে না!”

ছেলেটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মাথা নীচু করে বলল, “তুমিও কি আমাকে ভুলে গেছ?”

এই প্রশ্নটি অরিন্দমের বুকের গভীরে কোথাও আঘাত করল। তার মনে পড়তে লাগল কিছু অস্পষ্ট ছবি—একটি ছোট বাড়ি, উঠোনে দু’টি শিশু, মায়ের কোলে বসে থাকা দুই ভাই, আর একটি খেলনা ট্রেন নিয়ে ঝগড়া।

কিন্তু সে জানত, স্মৃতি সব সময় নির্ভুল নয়। কোনও ছবি মনে পড়লেই সেটি বাস্তব ঘটনা ছিল, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সে নিজেকে সামলে বলল, “আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। কিন্তু তোমার পরিচয় জানতে চাই।”

ছেলেটি খেলনা ট্রেনটি মেঝেতে রাখল।

“তাহলে আমার সঙ্গে চলো। মা অপেক্ষা করছেন।”

“তোমার মা?”

“আমাদের মা।”

অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।

তার মা মারা গিয়েছিলেন যখন সে খুব ছোট। মায়ের মুখের স্মৃতি তার কাছে ঝাপসা। কিন্তু ছেলেটির কথায় এমন একটি ব্যথা ছিল, যা অভিনয় বলে মনে হচ্ছিল না।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “ওর সঙ্গে যেও না। আমরা জানি না, এটা কী।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আমি কোথাও যাচ্ছি না। আগে প্রমাণ চাই।”

ছেলেটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে দিল।

ছবিতে দু’টি শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজন অরিন্দম, অন্যজন সম্ভবত অরুণ। পিছনে তাঁদের মা। ছবিটির কোণে তারিখ লেখা—১৭ মার্চ, ১৯৯৬।

অরিন্দম ছবিটি হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগল।

“এই ছবিটা কোথায় পেলে?”

“মা দিয়েছেন।”

“তোমার মা কোথায়?”

ছেলেটি এবার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “শেষ কামরায়।”

তারপর সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার অবয়ব কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল।

অরিন্দম ছুটে এগিয়ে গেল।

“দাঁড়াও! অরুণ!”

কিন্তু সেখানে আর কেউ নেই।

মেঝেতে পড়ে রয়েছে শুধু লাল খেলনা ট্রেনটি।

অরিন্দম সেটি তুলে নিল। খেলনাটির নীচে ছোট অক্ষরে লেখা—‘অরিন্দম ও অরুণের জন্য, মা।’

তার চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু ঠিক তখনই সে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করল।

খেলনাটির গায়ে ধুলো জমে আছে, কিন্তু ছেলেটির হাত থেকে পড়ার পর মেঝেতে কোনও পায়ের ছাপ নেই।

সে মেঘলার দিকে তাকাল।

“আমরা যা দেখলাম, তার ব্যাখ্যা এখনও জানি না। কিন্তু এই খেলনাটি বাস্তব। ছবিটাও বাস্তব হতে পারে। আমাদের জানতে হবে, আমার যমজ ভাইয়ের কথা পরিবার কেন গোপন করেছিল।”

মেঘলা বলল, “তাহলে প্রথমে তোমার জন্মের নথি খুঁজতে হবে।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আর তারপর কালো সেতুতে যেতে হবে।”

২. জন্মের নথিতে যে মিথ্যে ছিল

ভোর পাঁচটার দিকে তাঁরা শালবনপুর স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লেন। রাতের অদ্ভুত ঘটনার পরও অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দীর্ঘ স্বপ্নের মধ্যে রয়েছে।

কিন্তু তার পকেটে রাখা ছবিটি বাস্তব। লাল খেলনা ট্রেনটিও বাস্তব।

সকালে তাঁরা শহরের পুরোনো পুরসভা কার্যালয়ে পৌঁছলেন। সেখানে অরিন্দমের জন্মের নথি থাকার কথা। অরিন্দম আগে কখনও এই নথি সংগ্রহ করার চেষ্টা করেনি, কারণ পরিবারের সবাই বলেছিল, তার জন্মের সময় কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একজন প্রবীণ কর্মচারী পুরোনো রেজিস্টার বের করে আনলেন।

জন্মের তারিখ: ১৭ মার্চ, ১৯৯৬।

প্রথম শিশুর নাম: অরিন্দম রায়।

দ্বিতীয় শিশুর নাম: অরুণ রায়।

দু’জনের জন্মের ব্যবধান: চার মিনিট।

অরিন্দমের হাত কেঁপে উঠল।

“দ্বিতীয় শিশুর মৃত্যুর কোনও নথি আছে?”

কর্মচারী অন্য একটি রেজিস্টার খুললেন।

সেখানে লেখা ছিল, দ্বিতীয় শিশুকে জন্মের পর চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। মৃত্যুর নথি নেই।

অরিন্দম ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।

“তাহলে সবাই কেন বলেছিল, সে জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল?”

কর্মচারী অসহায়ভাবে বললেন, “আমি শুধু নথি দেখাতে পারি। কেন এমন বলা হয়েছিল, তা জানি না।”

অরিন্দম নিজের ফোনে নথির ছবি তুলে নিল।

ঠিক তখন তার ফোনে একটি কল এল। নম্বরটি অচেনা।

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

“তুমি অবশেষে জন্মের নথি খুঁজে পেয়েছ?”

অরিন্দম চমকে উঠল।

“আপনি কে?”

“আমার নাম ড. শৈলেন বসু। আমি তোমার জন্মের সময় হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম।”

“আপনি কি আমার যমজ ভাইকে চিনতেন?”

“হ্যাঁ। আর আমি জানি, তাকে কেন তোমাদের পরিবার থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।”

অরিন্দম উঠে দাঁড়াল।

“কেন?”

“ফোনে সব বলা সম্ভব নয়। তুমি যদি সত্য জানতে চাও, আজ বিকেল চারটায় পুরোনো মাতৃসদনে এসো। তবে একা এসো না।”

কল কেটে গেল।

মেঘলা বলল, “আমরা যাব।”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“তুমি কি মনে করো, এই লোকটি বিশ্বাসযোগ্য?”

“না। কিন্তু তাঁর কাছে এমন তথ্য থাকতে পারে, যা আমাদের দরকার। আমরা প্রমাণ যাচাই করব।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, এই রহস্যের সমাধান হয়তো কোনও ভূতুড়ে ট্রেনে নেই।

সমাধান লুকিয়ে আছে মানুষের তৈরি নথি, গোপন সিদ্ধান্ত এবং বহু বছরের অপরাধবোধের মধ্যে।

৩. ডাক্তারের স্বীকারোক্তি

পুরোনো মাতৃসদনটি শহরের এক নির্জন প্রান্তে। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভবনটির বেশিরভাগ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। শুধু একটি ছোট অফিসঘর এখনও ব্যবহারযোগ্য।

বিকেল চারটায় অরিন্দম ও মেঘলা সেখানে পৌঁছলেন।

ঘরের ভিতরে বসে ছিলেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধ। পাশে একটি লাঠি, টেবিলে কয়েকটি পুরোনো ফাইল।

“আপনি অরিন্দম?” বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যাঁ।”

“তোমাকে দেখে তোমার বাবার কথা মনে পড়ছে।”

অরিন্দম সরাসরি বলল, “আমার যমজ ভাই কোথায়?”

ড. শৈলেন বসু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার ভাই জন্মের পর মারা যায়নি। সে জীবিত ছিল। কিন্তু জন্মের সময় তার শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তোমার বাবা-মায়ের মধ্যে একটি গুরুতর বিরোধ শুরু হয়।”

“কী নিয়ে?”

“তোমার বাবা চেয়েছিলেন, দুই সন্তানকে একসঙ্গে বড় করতে। কিন্তু তোমার মা তখন দীর্ঘদিনের একটি অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তোমার বাবার এক আত্মীয় নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি অরুণকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন।”

অরিন্দমের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে আমার ভাইকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটি সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায় হয়নি। তোমার মা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলাতে চেয়েছিলেন। তখন পরিবারের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়। কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ বিষয়টি গোপন রাখেন।”

“আমার বাবার ভূমিকা কী ছিল?”

ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, “তোমার বাবা প্রথমে রাজি হয়েছিলেন। পরে অনুতপ্ত হন। তিনি অরুণকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে শিশুটিকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

“কোথায়?”

“এ তথ্য আমার কাছে নেই। আমি শুধু চিকিৎসার নথি দেখেছিলাম। পরে আমাকে চুপ থাকতে বলা হয়।”

অরিন্দম টেবিলে হাত রাখল।

“আপনি এত বছর চুপ ছিলেন কেন?”

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার চাকরি, সুনাম, পরিবার—সব হারানোর ভয় ছিল। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, নীরব থেকেও আমি অন্যায়ের অংশ হয়েছি।”

তিনি একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন।

“এখানে তোমার ভাইকে স্থানান্তরের কাগজ রয়েছে। ঠিকানাটি পুরোনো, কিন্তু শেষ যে প্রতিষ্ঠানটির নাম আছে, সেটি শালবনপুরের কাছেই।”

অরিন্দম কাগজটি পড়ল।

প্রতিষ্ঠানের নাম—শিশু কল্যাণ নিবাস।

ঠিকানার পাশে লাল কালিতে লেখা ছিল—‘পরবর্তীকালে বন্ধ’।

মেঘলা বলল, “আমাদের সেখানে যেতে হবে।”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“যাও। কিন্তু মনে রেখো, তোমার ভাইয়ের জীবন তোমার কল্পনার মতো নাও হতে পারে। তাকে খুঁজে পেলেই তোমরা আবার ছোটবেলার মতো হয়ে যাবে, এমন নয়।”

অরিন্দম ধীরে বলল, “আমি তাকে ফিরে পেতে চাই না শুধু। আমি জানতে চাই, তার সঙ্গে কী ঘটেছিল।”

ডাক্তার তার দিকে তাকালেন।

“তাহলে তুমি সত্য জানার জন্য প্রস্তুত।”

৪. শিশু কল্যাণ নিবাস

শিশু কল্যাণ নিবাস ছিল শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো ভবন। একসময় সেখানে অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুদের রাখা হতো। এখন ভবনটি সরকারি দপ্তরের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অরিন্দম ও মেঘলা সেখানে পৌঁছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর সঙ্গে কথা বললেন।

প্রথমে কেউ পুরোনো নথি খুঁজে দিতে রাজি হলো না। পরে ড. শৈলেন বসুর দেওয়া কাগজ দেখে একজন কর্মী পুরোনো রেজিস্টারের ঘরে তাঁদের নিয়ে গেলেন।

ধুলোমাখা আলমারি থেকে একটি রেজিস্টার বের করা হলো।

অরুণ রায়ের নাম সেখানে রয়েছে।

কিন্তু তার পাশে একটি নোট লেখা—

‘দত্তক গ্রহণকারী পরিবার শিশুটিকে অন্য জেলায় স্থানান্তর করেছে।’

পরিবারের নাম: সেনগুপ্ত পরিবার।

ঠিকানা: কলকাতা।

অরিন্দমের মনে পড়ল, তার বাবার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন দেবাশিস সেনগুপ্ত। তিনি কলকাতায় থাকতেন এবং বহু বছর আগে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

“আমাদের কলকাতায় ফিরতে হবে,” অরিন্দম বলল।

কর্মচারী তাঁদের থামিয়ে দিলেন।

“একটা কথা বলি? এই নথির সঙ্গে আরেকটি কাগজ আছে। সেটি বহু বছর আগে কেউ এখানে জমা দিয়েছিল।”

কাগজটি ছিল একটি চিঠি।

‘অরুণ,

তুমি হয়তো কোনও দিন জানতে পারবে না, তোমার জন্মের পর কী ঘটেছিল। কিন্তু মনে রেখো, তোমার মা তোমাকে ছেড়ে দিতে চাননি। তিনি শেষ পর্যন্ত তোমাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

যদি কোনও দিন তোমার ভাই তোমাকে খুঁজতে আসে, তাকে বলবে, তোমাদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত তোমাদের কোনও দোষের জন্য নেওয়া হয়নি।

তোমাদের দু’জনের জীবনই তোমাদের নিজেদের।

— এক অপরাধী মানুষ।’

চিঠির নীচে কোনও নাম নেই।

অরিন্দম চিঠিটি পড়ে দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল।

“এই চিঠি কে লিখেছিল?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।

কর্মচারী বললেন, “জানি না। তবে চিঠিটি এখানে জমা পড়েছিল ২০০৪ সালে।”

অরিন্দম মাথা তুলল।

“২০০৪? আমি তখন আট বছরের। দিদি তখন হাসপাতালের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। আর এই চিঠির তারিখের সঙ্গে ১৩০৭ নম্বর ট্রেনের কোনও সম্পর্ক আছে কি?”

মেঘলা বলল, “হয়তো সরাসরি নয়। কিন্তু তোমার পরিবারের ইতিহাস আর নন্দিতার তদন্তের মধ্যে কোনও যোগ থাকতে পারে।”

অরিন্দম কাগজটি পকেটে রাখল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি ছবি এল।

অচেনা নম্বর থেকে পাঠানো।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বৃদ্ধ লোক জানলার পাশে বসে আছেন। তাঁর হাতে একটি ছোট্ট খেলনা ট্রেন।

ছবির নীচে লেখা—

‘তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে কালো সেতুতে ফিরে যাও। সেখানে তোমার দিদি অপেক্ষা করছে।’

অরিন্দম মেঘলার দিকে তাকাল।

“আমাদের আবার কালো সেতুতে যেতে হবে।”

৫. কালো সেতুর নীচে

পরদিন ভোরে তাঁরা কালো সেতুর কাছে পৌঁছলেন।

সেতুটি এখন পরিত্যক্ত। পুরোনো রেললাইন তুলে নেওয়া হয়েছে, শুধু কিছু মরচে ধরা কাঠের স্লিপার পড়ে আছে। নিচে সরু নদী। বর্ষার জল কমে গিয়ে পাথর দেখা যাচ্ছে।

অরিন্দম চারদিকে তাকাল।

“এখানে তো কোনও ট্রেন চলতে পারে না।”

মেঘলা বলল, “সরকারি লাইনে নয়। কিন্তু সাত বছর আগের দুর্ঘটনার নথি অনুযায়ী, ওই রাতে এখানে একটি বিশেষ ট্রেন ছিল।”

তারা সেতুর নীচে নামল।

একটি ভাঙা কংক্রিটের স্তম্ভের পাশে অরিন্দম একটি ধাতব ফলক দেখতে পেল। ফলকটি মাটির মধ্যে অর্ধেক পোঁতা।

সে মাটি সরিয়ে ফলকটি বের করল।

তাতে লেখা—

‘দুর্ঘটনাস্থল: ১৩ অক্টোবর, ২০১৯। তদন্তাধীন।’

অরিন্দমের মাথায় তারিখটি ঘুরতে লাগল। নন্দিতা নিখোঁজ হয়েছিল সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে। অথচ যাত্রী তালিকায় ১৩ অক্টোবর, ২০২৬-এর তারিখও রয়েছে।

একই তারিখের পুনরাবৃত্তি।

একই সময়।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

মেঘলা নদীর ধারে কিছু দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল।

একটি ছোট ধাতব বাক্স পাথরের নীচে লুকিয়ে রাখা। বাক্সের তালা ভাঙা, ভিতরে কয়েকটি কাগজ এবং একটি অডিও রেকর্ডার।

অরিন্দম রেকর্ডারটি চালু করল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ।

“আমার নাম দেবব্রত দত্ত। আমি শালবনপুর স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। আজ ১৩ অক্টোবর, ২০১৯। রাত ১১টা ৪৫ মিনিট।”

মেঘলা চোখ বন্ধ করল। বাবার কণ্ঠ সে কোনও দিন ভুলতে পারেনি।

রেকর্ডিং চলতে লাগল।

“আজ একটি বিশেষ ট্রেনকে নির্ধারিত লাইনের বদলে পুরোনো লাইনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশটি লিখিত নয়। আমাকে বলা হয়েছে, ট্রেনে কয়েকজন যাত্রীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু যাত্রী তালিকায় তাঁদের নাম নেই। আমি আপত্তি জানিয়েছি।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

“ট্রেনটি এখন স্টেশন ছেড়েছে। চালককে শেষ মুহূর্তে সিগন্যাল বদলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি আশঙ্কা করছি, সামনে বিপদ রয়েছে। যদি এই রেকর্ডিং কেউ পায়, তবে জানবে—এই দুর্ঘটনা কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না।”

রেকর্ডিংয়ে হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল। তারপর শব্দ থেমে গেল।

মেঘলা কাঁদতে শুরু করল।

“বাবা জানতেন! তিনি দুর্ঘটনা আটকাতে পারেননি!”

অরিন্দম রেকর্ডারটি বন্ধ করল না। শেষ অংশে আবার কণ্ঠ শোনা গেল।

“আরেকটি কথা। নন্দিতা রায়কে এই ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। কিন্তু সে কোনও অপরাধ করেনি। সে শুধু যাত্রীদের তালিকা দেখেছিল। তাকে বাঁচাতে হলে আসল নথি খুঁজে বের করতে হবে।”

তারপর দেবব্রত দত্তের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

“যদি অরিন্দম রায় কখনও এই রেকর্ডিং শোনে, তাকে বলবে, তার ভাই জীবিত। কিন্তু তার ভাইকে খুঁজে পাওয়ার আগে তাকে জানতে হবে, কেন তাদের আলাদা করা হয়েছিল। কারণ এই ঘটনায় একই মানুষ বারবার নিজের পরিচয় বদলেছে।”

রেকর্ডিং শেষ।

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

“একই মানুষ বারবার নিজের পরিচয় বদলেছে—এর অর্থ কী?”

মেঘলা বলল, “হয়তো কেউ মিথ্যা নামে কাজ করছিল।”

“কিন্তু কে?”

ঠিক তখন সেতুর ওপর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“আমি।”

দু’জনেই উপরে তাকাল।

একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন।

লম্বা চুল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ।

নন্দিতা।

এবার তাঁর হাতে কোনও কাগজ নেই, জানলার কাচও নেই। তিনি সরাসরি তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

অরিন্দম ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“দিদি?”

নন্দিতা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন।

“হ্যাঁ, ভাই। আমি নন্দিতা।”

অরিন্দম ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

নন্দিতা কাঁদতে লাগলেন। সাত বছরের বিচ্ছেদ যেন সেই মুহূর্তে সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিল।

“তুমি কোথায় ছিলে?” অরিন্দম বলল। “কেন ফিরে এলে না?”

নন্দিতা তার মুখ দু’হাতে ধরে বললেন, “সব বলব। কিন্তু আগে তোমাকে একটা কথা জানতে হবে।”

“কী কথা?”

নন্দিতা মেঘলার দিকে তাকালেন।

“দেবব্রত দত্তের মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনায় হয়নি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।”

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

“কী বলছেন?”

নন্দিতা ধীরে বললেন, “আর যে মানুষটি এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, সে এখনও জীবিত।”

৬. শেষ যাত্রার আসল যাত্রী

নন্দিতা তাঁদের কালো সেতুর পাশের একটি ছোট বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়িটি ছিল পরিত্যক্ত রেলওয়ে কর্মচারীদের থাকার জায়গা। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না, সেখানে কেউ থাকে।

ঘরের ভিতরে পুরোনো কাগজ, মানচিত্র এবং কয়েকটি কম্পিউটার রাখা। দেওয়ালে বিভিন্ন তারিখের সংবাদপত্রের কাটিং।

অরিন্দম বলল, “তুমি এত বছর এখানে ছিলে?”

“না। আমি বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ছিলাম। এই বাড়িটি ব্যবহার করতাম শুধু প্রমাণ রাখার জন্য।”

মেঘলা বাবার রেকর্ডিংটি টেবিলে রাখল।

“আমার বাবার সঙ্গে কী হয়েছিল?”

নন্দিতা চেয়ারে বসে পড়লেন।

“দেবব্রতবাবু দুর্ঘটনার রাতে ট্রেনটিকে ভুল লাইনে পাঠানোর নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি জানতেন, ট্রেনে এমন কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন একটি বড় আর্থিক দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সেই সাক্ষীকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার নামে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে ট্রেনের রহস্য আসলে একটি গোপন পরিবহণ ব্যবস্থা?”

“প্রথমে তাই ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে যায়। ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। কয়েকজন মারা যান, কয়েকজন বেঁচে যান। বেঁচে যাওয়া লোকদের মধ্যে দেবব্রতবাবুও ছিলেন। তিনি দুর্ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে তাঁকে কে হত্যা করল?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “রেলওয়ের তৎকালীন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিকাশ সেন। তিনি বিশেষ ট্রেনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার দায় চাপা দিতে তিনি নথি বদলান, সাক্ষীদের আলাদা করে দেন এবং কয়েকজনকে নিখোঁজ বলে দেখানোর ব্যবস্থা করেন।”

“তিনি এখন কোথায়?” অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল।

“অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে কলকাতায় থাকেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ তখন আমাদের হাতে ছিল না।”

নন্দিতা একটি ফাইল বের করলেন।

“এই ফাইলে ট্রেনের আসল যাত্রী তালিকা, সিগন্যাল পরিবর্তনের নির্দেশ এবং দুর্ঘটনার পরে তৈরি করা ভুয়ো রিপোর্টের অনুলিপি আছে। দেবব্রতবাবু এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন।”

মেঘলা ফাইলটি খুলে বাবার স্বাক্ষর দেখল।

“তাহলে এত বছর ধরে যে ট্রেনকে আমরা দেখেছি, তার রহস্য কী?”

নন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সবকিছু একসঙ্গে ঘটেনি। প্রথম দিকে আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, ওই ট্রেন আবার ফিরে আসে। দুর্ঘটনার রাতের কিছু দৃশ্য আমার মনে এত গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, বারবার মনে হতো, আমি ট্রেনটিকে দেখছি। দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব, ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে থাকলে মানুষের উপলব্ধিতে এমন প্রভাব পড়তে পারে। পরে বুঝেছি, স্টেশনের কিছু পুরোনো কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভয়কে ব্যবহার করত।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে জানলার ভিতরে তোমাকে দেখা যাওয়া?”

“সেটি কীভাবে ঘটেছিল, আমি নিশ্চিত নই। স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রজেকশন ব্যবস্থা ছিল। পরে কেউ সেটিকে ব্যবহার করেছে কি না, তা তদন্ত করতে হবে। আর কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা এখনও আমাদের জানা নেই। কিন্তু অজানা বলেই তাকে অতিপ্রাকৃত বলে মেনে নেওয়ার দরকার নেই।”

মেঘলা বলল, “আমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম সেই ট্রেনে।”

নন্দিতা তার হাত ধরলেন।

“তুমি তাঁকে দেখেছিলে বলে তোমার কষ্ট বা স্মৃতি মিথ্যা হয়ে যায় না। কিন্তু সেই দৃশ্যের অর্থ বোঝার জন্য আমাদের প্রমাণ দরকার। আমরা জানি, তিনি দুর্ঘটনার পর বেঁচে ছিলেন। আমরা জানি, তাঁর রেকর্ডিং রয়েছে। কিন্তু তাঁর শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য আরও তদন্ত দরকার।”

অরিন্দম হঠাৎ বলল, “আমার ভাই অরুণ কোথায়?”

নন্দিতা মাথা নীচু করলেন।

“আমি জানি, সে বেঁচে আছে। তাকে কলকাতার একটি পরিবার দত্তক নিয়েছিল। কিন্তু পরে সেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি বহু বছর ধরে তাকে খুঁজেছি।”

“তাহলে কাল রাতে যে ছেলেটিকে দেখলাম?”

“আমি জানি না। তুমি সত্যিই তাকে দেখেছ, নাকি ক্লান্তি ও মানসিক চাপের কারণে তোমার চোখে এমন দৃশ্য এসেছে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে তোমার ভাইয়ের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। সেটাই আমাদের অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া উচিত।”

অরিন্দম চুপ করে গেল।

তার এত দিনের রহস্যের একটি বড় অংশের উত্তর মিলেছে। কিন্তু সবচেয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নটির উত্তর এখনও বাকি।

তার ভাই কোথায়?

আর সেই ভাই কি এখনও তাকে মনে রেখেছে?

৭. বিকাশ সেনের মুখোমুখি

নন্দিতার দেওয়া নথিগুলি যাচাই করার জন্য অরিন্দম তার সাংবাদিক বন্ধু সৌরভের সাহায্য নিল। পাশাপাশি একজন আইনজীবীর মাধ্যমে পুলিশকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো হলো। নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পুরোনো রেলওয়ে রেকর্ড, হাসপাতালের কাগজ এবং সরকারি তদন্তের ফাইল সংগ্রহ করা শুরু হলো।

তদন্তকারীরা প্রথমে বিষয়টিকে পুরোনো, প্রমাণহীন অভিযোগ বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেবব্রত দত্তের রেকর্ডিং, সিগন্যাল রেজিস্টার এবং নন্দিতার সংগ্রহ করা নথির মধ্যে মিল পাওয়া গেল।

এরপর বিকাশ সেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হলো।

অরিন্দম ও নন্দিতা আইনজীবীর উপস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

বিকাশ সেনের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। পরিপাটি পোশাক, শান্ত মুখ, কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস। প্রথমে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলেন।

“এই নথি জাল হতে পারে,” তিনি বললেন। “আমি কোনও গোপন ট্রেন চালানোর নির্দেশ দিইনি।”

অরিন্দম টেবিলে সিগন্যাল পরিবর্তনের নথি রাখল।

“এখানে আপনার স্বাক্ষর রয়েছে।”

“স্বাক্ষর জাল করা কঠিন নয়।”

নন্দিতা এবার কথা বললেন।

“দেবব্রত দত্ত আপনাকে ফোন করেছিলেন দুর্ঘটনার আগে। সেই ফোনের রেকর্ডও রয়েছে।”

বিকাশ সেনের মুখের ভাব সামান্য বদলে গেল।

“আমি বহু বছর আগে অবসর নিয়েছি। এত পুরোনো ঘটনা আমার মনে নেই।”

অরিন্দম বলল, “আপনি কি দেবব্রত দত্তকে চিনতেন?”

“অনেক কর্মচারীকে চিনতাম।”

“তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে কিছু জানেন?”

“না।”

নন্দিতা একটি ছবি বের করলেন। ছবিতে বিকাশ সেনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেবব্রত দত্ত। ছবিটি দুর্ঘটনার কয়েক মাস আগে তোলা।

“আপনি বলেছিলেন, তাঁকে মনে নেই। কিন্তু এই ছবিতে আপনারা একসঙ্গে আছেন।”

বিকাশ সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ছবি দিয়ে অপরাধ প্রমাণ হয় না।”

“ঠিক বলেছেন,” অরিন্দম বলল। “তাই আমরা ছবি নয়, সব প্রমাণ একসঙ্গে তদন্তকারীদের হাতে দিয়েছি।”

বিকাশ সেন এবার আর কিছু বললেন না।

সেদিন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো দুর্ঘটনার নথি বদল, প্রমাণ নষ্ট করা এবং সম্ভাব্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়।

নন্দিতা বাইরে এসে বললেন, “এটা শেষ নয়।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আমি জানি। কিন্তু এবার অন্তত সত্যটা কাগজে রয়েছে। কেউ সহজে মুছে ফেলতে পারবে না।”

৮. অরুণের সন্ধানে

দুর্ঘটনার তদন্ত নতুন করে শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে অরিন্দম একটি ফোন পেল।

ফোন করেছিলেন কলকাতার এক বৃদ্ধ আইনজীবী। তাঁর কাছে দেবাশিস সেনগুপ্তের পুরোনো নথি ছিল। তিনি জানালেন, অরুণ রায়কে দত্তক নেওয়ার পরে তাঁর নাম বদলে রাখা হয়েছিল—অরুণাভ সেনগুপ্ত।

বহু বছর আগে দেবাশিসবাবুর পরিবার অন্য শহরে চলে যায়। অরুণাভ বড় হয়ে একজন সংগীতশিক্ষক হন। পরে তিনি উত্তরবঙ্গে চলে যান।

বর্তমান ঠিকানা ছিল শিলিগুড়ির কাছে একটি ছোট সংগীত বিদ্যালয়।

অরিন্দম আর দেরি করল না। নন্দিতাকে সঙ্গে নিয়ে সে উত্তরবঙ্গে গেল।

সংগীত বিদ্যালয়টি ছিল একটি পুরোনো বাড়ির একতলায়। দরজার বাইরে ছোট একটি ফলকে লেখা—‘সুরবীথি সংগীতশিক্ষা কেন্দ্র’।

ভিতর থেকে হারমোনিয়ামের সুর ভেসে আসছিল।

একজন যুবক ছাত্রদের গান শেখাচ্ছিলেন। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। মুখের গঠন অরিন্দমের মতো, চোখের কোণে একই ভাঁজ।

লোকটি ক্লাস শেষ করে তাঁদের দিকে এগিয়ে এলেন।

“আপনারা কাকে খুঁজছেন?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

নন্দিতা এগিয়ে এলেন।

“অরুণাভ?”

লোকটি থমকে গেল।

“আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?”

নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।

“আমি তোমার দিদি নন্দিতা। আর এই যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোমার যমজ ভাই অরিন্দম।”

অরুণাভ দীর্ঘক্ষণ তাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন, “আমার তো কোনও ভাই নেই।”

অরিন্দম পকেট থেকে পুরোনো ছবিটি বের করল।

দুই শিশুর ছবি।

“এই ছবিটি দেখো।”

অরুণাভ ছবিটি হাতে নিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর আঙুল কাঁপছিল।

“এটা কোথায় পেলে?”

“শালবনপুর স্টেশনে।”

অরুণাভ ছবির পিছনের লেখাটি পড়লেন।

‘অরিন্দম ও অরুণের জন্য, মা।’

তাঁর চোখে জল এসে গেল।

“ছোটবেলায় আমি প্রায়ই একটি স্বপ্ন দেখতাম,” তিনি বললেন। “একটি ছেলে আমার পাশে বসে খেলনা ট্রেন নিয়ে খেলছে। আমি তাকে দাদা বলে ডাকছি। কিন্তু বড় হওয়ার পর সবাই বলেছে, এগুলো আমার কল্পনা।”

অরিন্দম ধীরে তাঁর পাশে বসল।

“আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু তোমাকে আমার ভাই বলে মেনে নিতে হবে, এমন কোনও দাবি করতে আসিনি। তুমি চাইলে আমরা একসঙ্গে বসে নথিগুলো দেখতে পারি। তুমি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।”

অরুণাভ তার দিকে তাকালেন।

“তুমি এত বছর আমাকে খুঁজেছ?”

“আমি জানতামই না, তোমাকে খুঁজতে হবে। সত্যিটা আমিও সম্প্রতি জেনেছি।”

নন্দিতা দু’জনের হাত একসঙ্গে ধরলেন।

“তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল বড়দের সিদ্ধান্তে। তোমাদের কারও দোষ ছিল না।”

অরুণাভ ধীরে বললেন, “আমি কি তোমাদের সঙ্গে কলকাতায় যেতে পারি?”

অরিন্দমের মুখে প্রথমবারের মতো স্বস্তির হাসি ফুটল।

“অবশ্যই। তবে তোমার কাজ, তোমার জীবন—সবকিছু তোমার নিজের থাকবে। আমরা শুধু নতুন করে পরিচিত হব।”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“আমার মনে হয়, সেটাই ঠিক।”

৯. শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী

এক বছর পরে শালবনপুর স্টেশনে একটি ছোট স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হলো। সাত বছর আগের দুর্ঘটনায় নিহতদের নাম সংগ্রহ করে একটি স্মারক ফলক তৈরি করা হয়েছে। যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, তাঁদের নামও সেখানে লেখা।

দেবব্রত দত্তের নামের পাশে লেখা—

‘সত্য প্রকাশের জন্য যিনি নিজের নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করেছিলেন।’

তদন্তে বহু বাধা এসেছে। কিছু নথি এখনও পাওয়া যায়নি। কয়েকজন সাক্ষী মারা গেছেন। বিকাশ সেনের বিরুদ্ধে মামলার বিচারও শেষ হয়নি। কিন্তু দুর্ঘটনাটি আর কোনও গুজব নয়। সরকারি তদন্তের নথিতে এখন তার উল্লেখ রয়েছে।

মেঘলা বাবার স্মারকের সামনে একটি ফুল রাখল।

“বাবা, আমি জানি না তোমার শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল। কিন্তু তোমার কণ্ঠ আমি শুনেছি। তোমার সংগ্রামের প্রমাণ পেয়েছি। তুমি হারিয়ে যাওনি—তোমার সত্য এত দিন চাপা ছিল।”

নন্দিতা তার কাঁধে হাত রাখলেন।

অরিন্দম ও অরুণাভ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

অরুণাভ বলল, “তুমি কি এখনও সেই ট্রেনটিকে দেখতে পাও?”

অরিন্দম মৃদু হাসল।

“না। এখন আর কোনও ট্রেনকে ভয় পাই না।”

“তাহলে সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“না। কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই। কিন্তু আমি বুঝেছি, প্রতিটি অজানা ঘটনার ব্যাখ্যা অলৌকিক কিছু হতে হবে না। কখনও অপরাধ, কখনও ভয়, কখনও স্মৃতির ভুল—আর কখনও এমন তথ্য, যা আমরা এখনও জানি না।”

অরুণাভ বলল, “তুমি কি আমাকে দাদা বলে ডাকতে পারবে?”

অরিন্দম তার কাঁধে হাত রাখল।

“আমি ছোটবেলায় তোকে চিনতাম কি না, তা মনে নেই। কিন্তু আজ থেকে তোকে চিনতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।”

দু’জনেই হেসে উঠল।

ঠিক তখনই স্টেশনের মাইক্রোফোনে ঘোষণা শোনা গেল—

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, রামপুর জংশনগামী শেষ লোকাল ট্রেনটি কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম নম্বর দুইয়ে প্রবেশ করবে।”

সবাই স্বাভাবিকভাবে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু অরিন্দমের চোখ একবার চলে গেল দূরের পুরোনো লাইনের দিকে। যে লাইনটি বহু বছর আগে তুলে ফেলা হয়েছে, সেখানে এখন শুধু ঘাস জন্মেছে।

কুয়াশার মধ্যে সে যেন এক মুহূর্তের জন্য একটি ট্রেনের আলো দেখতে পেল।

শেষ কামরার জানলায় একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি পুরোনো রেলওয়ে পরিচয়পত্র।

অরিন্দম চোখ মুছে আবার তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু বাতাসে ঘাস নড়ছে।

সে আর কাউকে ডাকল না। কোনও ছবি তুলল না। কাউকে বললও না যে সে কী দেখেছে।

কারণ, এবার সে জানত—দেখা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

কিছুক্ষণ পরে নন্দিতা এসে তার পাশে দাঁড়ালেন।

“কী দেখছিস?”

অরিন্দম হেসে বলল, “কিছু না। পুরোনো লাইনের দিকে তাকাচ্ছিলাম।”

নন্দিতা তার হাত ধরলেন।

“চল। ট্রেন এসে গেছে।”

চারজন একসঙ্গে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে লাগল—অরিন্দম, নন্দিতা, অরুণাভ আর মেঘলা।

সেদিন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে কোনও অদ্ভুত ট্রেন আসেনি।

কোনও অচেনা কণ্ঠ মাইক্রোফোনে কথা বলেনি।

কোনও মৃত মানুষ জানলার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকেনি।

এসেছিল একটি সাধারণ লোকাল ট্রেন। তার কামরায় ছিল ক্লান্ত যাত্রী, ঘুমন্ত শিশু, বাড়ি ফেরার তাড়া আর জীবনের স্বাভাবিক শব্দ।

অরিন্দম ট্রেনে উঠে জানলার পাশে বসল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

সাত বছর ধরে যে রহস্য তাকে তাড়া করেছে, তার সমস্ত উত্তর সে পায়নি। কিন্তু সে তার দিদিকে ফিরে পেয়েছে, ভাইকে চিনেছে, আর বাবার অতীত সম্পর্কে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, সে আর নিজের স্মৃতি বা ভয়ের হাতে বন্দি নয়।

ট্রেনটি অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে চলল।

অরিন্দম জানলার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। তার পাশে বসে আছে অরুণাভ। সামনের সিটে নন্দিতা ও মেঘলা কথা বলছে।

চারটি মানুষ। চারটি আলাদা জীবন। আর একটি নতুন শুরু।

অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।

এবার তার মনে কোনও অজানা ট্রেনের হুইসেল বাজল না।

বাজল বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক শব্দ।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের টিকিট)।

১. সুড়ঙ্গের ওপারে কে?

“অরিন্দম, বাড়ি ফিরে যা।”

অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটি আবার শোনা গেল।

অরিন্দমের শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর পর সে আর কখনও এই কণ্ঠ শোনেনি। পরিবারের অ্যালবামে বাবার কয়েকটি ছবি ছাড়া তাঁর স্মৃতি বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। অথচ সেই কণ্ঠের স্বর, কথা বলার ভঙ্গি—সবই যেন তার মনের গভীরে কোথাও জমে ছিল।

মেঘলা তার হাত চেপে ধরল।

“ওপাশে যাবেন না। আপনার দিদিও তো আপনাকে ট্রেনে উঠতে নিষেধ করেছিলেন।”

অরিন্দম চোখ না সরিয়ে বলল, “কিন্তু যদি সত্যিই বাবা হন?”

“যদি না হন?”

প্রশ্নটা অরিন্দমকে থামিয়ে দিল।

সে সাংবাদিকতা করত। বহু প্রতারণা, জালিয়াতি, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করেছে। অন্যের কাছে প্রমাণ চেয়েছে। অথচ নিজের দিদির মুখ দেখার পর থেকেই তার যুক্তিবোধ যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সে মোবাইলের আলো সুড়ঙ্গের দিকে ফেলল।

সামনে প্রায় বিশ গজ দূরে একটি দরজা। দরজার ওপরে মরচে ধরা ফলক।

প্ল্যাটফর্ম ১৩।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব? এই স্টেশনে তো তিনটি প্ল্যাটফর্ম।”

অরিন্দম বলল, “আমাদের সামনে যা আছে, সেটাকে অস্বীকার করে লাভ নেই। কিন্তু কী দেখছি, তা না বুঝে বিশ্বাসও করব না।”

দু’জনে সাবধানে এগিয়ে গেল।

দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখা গেল, মেঝেতে একটি কালো চামড়ার জুতো পড়ে আছে। জুতোটির পাশে ছোট একটি ধাতব বাক্স।

অরিন্দম বাক্সটি তুলে খুলল।

ভিতরে একটি পুরোনো রেলওয়ে পরিচয়পত্র।

ছবিতে মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ। চোখে চশমা, মুখে গম্ভীর ভাব।

নাম: দেবব্রত দত্ত।

মেঘলা কেঁপে উঠল।

“এটা আমার বাবার পরিচয়পত্র।”

পরিচয়পত্রের পিছনে পেন্সিলে লেখা ছিল—

‘যদি আমার মেয়ে কখনও এখানে আসে, তাকে বলবে, তার বাবাকে খুঁজতে হলে সে যেন ট্রেনের দিকে না তাকিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়।’

মেঘলা অস্ফুট স্বরে বলল, “ঘড়ির দিকে তাকাবে মানে?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোনে আলো জ্বলে উঠল।

কোনও নেটওয়ার্ক ছিল না, তবু একটি নতুন বার্তা এসেছে।

বার্তায় মাত্র তিনটি শব্দ—

“সময়টা পরীক্ষা করো।”

অরিন্দম মাথা তুলে ঘড়ির দিকে তাকাল।

সিগন্যাল ঘরের নীচের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

কিন্তু তার হাতঘড়িতে রাত ১২টা ৪১।

মেঘলার ফোনে রাত ১২টা ০৯।

তিনটি ঘড়িতে তিন রকম সময়।

অরিন্দম ধীরে বলল, “এই ঘরে সময়ের হিসাব ঠিক নেই।”

ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

দেবব্রত দত্তের কণ্ঠ আবার ভেসে এল।

“মেঘলা, তুমি এসেছ?”

মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“বাবা!”

সে দরজার দিকে ছুটতে গেল। অরিন্দম তাকে ধরে ফেলল।

“দাঁড়ান!”

“ছাড়ুন! আমি আমার বাবাকে সাত বছর ধরে খুঁজছি!”

“আপনার বাবা যদি সত্যিই ওখানে থাকেন, তিনি এখানেও থাকতে পারেন। কিন্তু দরজা খুলে কী আছে না জেনে ঢোকা বিপজ্জনক।”

মেঘলা চোখ মুছে তার দিকে তাকাল।

“তাহলে কী করব?”

অরিন্দম ধাতব বাক্সের মধ্যে আবার হাত ঢোকাল। এবার একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।

সেখানে লেখা—

‘১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনোর আগে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নাও।

প্রথম প্রশ্ন: যে মানুষ নিখোঁজ, সে কি সত্যিই হারিয়ে যায়?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: যে মানুষকে মৃত বলা হয়েছে, তার মৃত্যু কে দেখেছে?

তৃতীয় প্রশ্ন: যে ট্রেন কখনও সময়সূচিতে ছিল না, তার টিকিট কে কেটেছে?’

অরিন্দম কাগজটি মুঠোয় ধরল।

“এটা কোনও ভূতের ধাঁধা নয়। কেউ আমাদের কিছু বোঝাতে চাইছে।”

“কে?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।

অরিন্দম উত্তর দিল না।

কারণ, ঠিক তখনই দরজার নীচ দিয়ে একটি সাদা কাগজ গড়িয়ে এসে তাদের পায়ের কাছে থামল।

কাগজে লেখা—

‘অরিন্দম, তোমার দিদি তোমাকে যা বলেছে, তার অর্ধেক সত্যি। বাকি অর্ধেক জানলে তুমি আর তাকে খুঁজতে চাইবে না।’

২. বন্ধ স্টেশনের পুরোনো হিসাব

দু’জনে সিগন্যাল ঘরের নীচে ফিরে এল।

অরিন্দমের মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে। নন্দিতা কি সত্যিই বেঁচে আছে? দেবব্রত দত্ত কি জীবিত? আর যদি সবটাই কোনও পরিকল্পিত প্রতারণা হয়, তবে তার উদ্দেশ্য কী?

সে পুরোনো রেলওয়ে রেজিস্টারগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখল।

“মেঘলা, তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার আগে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল?”

মেঘলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “বাবা শেষ কয়েক মাস খুব চিন্তায় থাকতেন। রাতে ঘুমোতে পারতেন না। বাড়িতে পুরোনো নথি নিয়ে আসতেন। একদিন তাঁকে বলতে শুনেছিলাম, রেলওয়ের একটি দুর্ঘটনার রিপোর্ট বদলে দেওয়া হয়েছে।”

“কী দুর্ঘটনা?”

“সেটা জানি না। আমি তখন কলেজে পড়ি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, এসব বড়দের ব্যাপার।”

“আর তোমার বাবার মৃত্যুসনদ?”

“পুলিশ একটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। মুখ চেনা যাচ্ছিল না। পোশাক ও একটি আংটি দেখে তাঁকে আমার বাবা বলে শনাক্ত করা হয়। আমাকে দেহ দেখানো হয়নি। আমার মা তখন বেঁচে ছিলেন না। মামা আমাকে বলেছিলেন, দেহ শনাক্ত করা হয়ে গেছে।”

অরিন্দম চুপ করে রইল।

“তুমি কি কখনও ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলে?”

“না। তখন এসব ভাবিনি। বাবার মৃত্যুর কষ্টে ভেঙে পড়েছিলাম।”

অরিন্দম রেজিস্টারের একটি পাতায় আঙুল রাখল।

“এখানে দেখো। সাত বছর আগে, ১৩ অক্টোবর, রাত ১২টা ১৭ মিনিটে বিশেষ যাত্রী পরিবহণের উল্লেখ আছে। কিন্তু ট্রেনের নম্বর নেই, চালকের নাম নেই, গার্ডের নাম নেই।”

“এটা কি জাল রেজিস্টার হতে পারে?”

“হতে পারে। কিন্তু এই পাতায় যে সিল আছে, সেটি পুরোনো রেলওয়ে দপ্তরের আসল সিলের মতো।”

সে পরের পাতাটি উল্টাল।

একটি নামের পাশে লাল কালি দিয়ে দাগ দেওয়া।

নন্দিতা রায় — কর্মী নথি নম্বর: ৪৭১২।

অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“দিদি তো এই স্টেশনে কাজ করত না।”

মেঘলা বলল, “হয়তো অন্য কোনও নথি থেকে নামটা এখানে এসেছে।”

অরিন্দম নথির নীচে লেখা তারিখটি দেখল। তারিখটি নন্দিতার নিখোঁজ হওয়ার ছয় মাস আগের।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, নামের পাশে লেখা ছিল—

‘সাক্ষী হিসেবে নিযুক্ত। বিশেষ দুর্ঘটনা তদন্ত।’

অরিন্দম এবার বুঝতে পারল, নন্দিতার নিখোঁজ হওয়ার আগে এমন কিছু ঘটেছিল, যার কথা তার জানা ছিল না।

সে ফোন বের করে নিজের পুরোনো সহকর্মী সৌরভকে কল করল। সৌরভ রেলওয়ে সংক্রান্ত খবর নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে।

কয়েকবার চেষ্টা করার পর ফোন ধরল সৌরভ।

“এত রাতে ফোন করেছিস কেন?”

“শালবনপুরে সাত বছর আগের কোনও রেল দুর্ঘটনার খবর মনে আছে?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

“কেন জিজ্ঞাসা করছিস?”

“একটা পুরোনো তদন্ত করছি। ১৩ অক্টোবরের রাত। বিশেষ ট্রেন, সম্ভবত ১৩০৭ নম্বর।”

সৌরভের গলা বদলে গেল।

“অরিন্দম, তুই কোথায় আছিস?”

“শালবনপুরে।”

“যেখানেই থাকিস, এখনই সেখান থেকে চলে আয়।”

“কেন?”

সৌরভ নিচু গলায় বলল, “সাত বছর আগে শালবনপুরের কাছে একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়েছিল। সরকারি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, কোনও যাত্রীবাহী ট্রেন জড়িত ছিল না। কিন্তু দুর্ঘটনার পর কয়েকজন রেলকর্মী নিখোঁজ হন। একজনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, বাকিদের খোঁজ মেলেনি।”

“তাদের নাম কী?”

“আমি সব নাম মনে করতে পারছি না। কিন্তু সহকারী স্টেশনমাস্টার দেবব্রত দত্তের নাম শুনেছিলাম।”

মেঘলা ফোনের কাছে এগিয়ে এল।

“আমার বাবা!”

সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মেঘলা দত্ত কি তোর সঙ্গে আছে?”

অরিন্দম বিস্মিত হয়ে বলল, “তুই তার নাম জানিস কী করে?”

“কারণ দুর্ঘটনার তদন্তে তার বাবার সাক্ষ্য নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি নিখোঁজ হন।”

“আর নন্দিতা রায়?”

এবার সৌরভের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

“তোর দিদি সেই দুর্ঘটনার একমাত্র বেসরকারি প্রত্যক্ষদর্শী ছিল।”

অরিন্দমের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“কী বলছিস?”

“দুর্ঘটনার পর একটা অভিযোগ উঠেছিল, রেললাইনে সিগন্যালের সমস্যা ছিল। কয়েকজন যাত্রীকে নির্ধারিত ট্রেনের বদলে অন্য একটি ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি নথিতে সেই ট্রেনের অস্তিত্ব নেই। নন্দিতা নাকি সেই যাত্রীদের তালিকা দেখেছিল।”

“তারপর?”

“তারপর সব নথি গায়েব হয়ে যায়। তোর দিদি নিখোঁজ হয়। আর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।”

অরিন্দম ধীরে ফোন নামিয়ে রাখল।

মেঘলা ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে।

“তাহলে আমার বাবা কোনও রহস্যময় ট্রেনে হারিয়ে যাননি। তিনি দুর্ঘটনার সাক্ষী ছিলেন!”

অরিন্দম বলল, “হয়তো। কিন্তু এখনও সব প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।”

ঠিক তখনই ওপরের ঘর থেকে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।

দু’জনে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।

দরজার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।

কালো কোট, মাথায় টুপি, হাতে একটি পুরোনো টিকিট।

লোকটি মুখ তুলে তাকাল।

“আপনারা দু’জনেই ভুল জায়গায় এসেছেন।”

৩. টিকিট পরীক্ষক

লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ছাঁটা গোঁফ, চোখে গোল চশমা। তার পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল, সে কোনও পুরোনো রেলওয়ে কর্মচারী।

অরিন্দম বলল, “আপনি কে?”

লোকটি টিকিটটি সামনে ধরল।

“আমি এই ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক।”

“কোন ট্রেনের?”

“যে ট্রেনের অস্তিত্ব আপনারা অস্বীকার করছেন।”

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

লোকটি মৃদু হাসল।

“ভয় পাবেন না। আমি আপনাদের ক্ষতি করতে আসিনি। বরং আপনাদের বাঁচাতে এসেছি।”

অরিন্দম বলল, “আপনি যদি টিকিট পরীক্ষক হন, আপনার পরিচয়পত্র কোথায়?”

লোকটি পকেট থেকে একটি কার্ড বের করল।

কার্ডে লেখা—

শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।
টিকিট পরীক্ষক।
বিশেষ যাত্রী পরিবহণ বিভাগ।

অরিন্দম কার্ডটি হাতে নিল। কাগজটি পুরোনো, কিন্তু তাতে যে ছবি রয়েছে, তা স্পষ্ট।

“আপনি কি এই স্টেশনে কাজ করতেন?”

“করতাম।”

“কত বছর আগে?”

“অনেক বছর আগে।”

“আপনার চাকরির নথি কোথায়?”

লোকটি উত্তর দিল না।

অরিন্দম আবার জিজ্ঞাসা করল, “আপনি আমাদের বাঁচাতে এসেছেন বললেন। কী থেকে?”

শশাঙ্ক শেষ কামরার দিকে তাকাল।

“সেই ট্রেন থেকে, যার যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্য ভুলে গেছে।”

“আপনি কি নন্দিতা রায়কে চেনেন?”

লোকটির চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।

“চিনি।”

“তিনি কোথায়?”

“ট্রেনে।”

“তিনি জীবিত?”

শশাঙ্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে, জীবিত থাকার অর্থ কী।”

অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বলল, “ধাঁধা বন্ধ করুন। সরাসরি উত্তর দিন।”

শশাঙ্ক তার হাতে থাকা টিকিটটি টেবিলে রাখল।

টিকিটে লেখা—

যাত্রীর নাম: অরিন্দম রায়।

যাত্রার তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।

গন্তব্য: ফিরে যাওয়ার অসম্ভব স্থান।

অরিন্দম টিকিটটি তুলে নিল।

“এটা কে বানিয়েছে?”

“আপনার দিদি।”

“কিন্তু আমি তো টিকিট কাটিনি!”

“সব যাত্রীর টিকিট নিজের হাতে কাটা হয় না।”

মেঘলা বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার বাবারও টিকিট কাটা হয়েছিল?”

শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তিনি কোথায়?”

“তিনি তাঁর যাত্রা শেষ করতে পারেননি।”

মেঘলা চোখ মুছে বলল, “আমি তাঁকে দেখতে চাই।”

শশাঙ্কের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“তাহলে আপনাকে তিনটি বিষয় জানতে হবে। প্রথমত, আপনার বাবা কেন সেই ট্রেনে উঠেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি কেন ফিরতে পারেননি। তৃতীয়ত, আপনি যদি তাঁকে দেখতে পান, তাঁকে চিনতে পারবেন কি না।”

মেঘলা বলল, “আমি আমার বাবাকে চিনব।”

শশাঙ্ক মৃদু মাথা নাড়ল।

“সেটাই সবাই ভাবে।”

অরিন্দম টেবিলে হাত রেখে বলল, “আপনি কি জানেন, সাত বছর আগে কী ঘটেছিল?”

“জানি।”

“তাহলে বলুন।”

শশাঙ্ক জানলার দিকে তাকাল।

“সাত বছর আগে একটি বিশেষ ট্রেনে কয়েকজন যাত্রীকে তোলা হয়েছিল। তাঁদের বলা হয়েছিল, ট্রেনটি তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবে। কিন্তু ট্রেনটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছয়নি। পথে দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারি নথিতে দুর্ঘটনার বিবরণ বদলে দেওয়া হয়। কিছু মানুষ মারা যান, কয়েকজন নিখোঁজ হন। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই সত্য প্রকাশ করতে পারেননি।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে এই ট্রেন সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আমরা যে ট্রেন দেখলাম, সেটি কীভাবে সাত বছর ধরে প্রতি বছর ফিরে আসে?”

শশাঙ্ক এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।

“আমি জানি না। হয়তো আপনারা যে ট্রেন দেখছেন, তা বাস্তব ট্রেন নয়। হয়তো পুরোনো স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং গোপন নথির মধ্যে তৈরি একটি বিভ্রম। কিন্তু একটা বিষয় সত্যি—যে মানুষদের নাম ওই যাত্রী তালিকায় রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে একটি বাস্তব ঘটনা জড়িত।”

অরিন্দম কিছুটা শান্ত হলো।

“তাহলে আমরা কি কোনও মানসিক প্রভাবের শিকার হচ্ছি?”

“সেটাও হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমের অভাব, ভয়, অন্ধকার এবং প্রত্যাশা মানুষের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই যা দেখছেন, তার সবকিছুকে সত্যি ধরে নেবেন না।”

মেঘলা প্রশ্ন করল, “তাহলে আপনি কে? সত্যিই কি টিকিট পরীক্ষক?”

শশাঙ্ক কোনও উত্তর দিল না।

বরং সে টেবিলের নীচ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।

“এই খামটি আপনার দিদি রেখে গিয়েছিলেন, অরিন্দম।”

খামের ওপর লেখা—‘ভাইয়ের জন্য’।

অরিন্দম হাত বাড়াতেই শশাঙ্ক বলল, “খোলার আগে একটা কথা মনে রাখবেন। আপনার দিদি হয়তো আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি যা করেছেন, তার সবটাই সঠিক ছিল—এমন নয়।”

৪. নন্দিতার চিঠি

অরিন্দম খাম খুলল।

ভিতরে চার পাতার একটি চিঠি।

‘অরিন্দম,

যদি এই চিঠি তোর হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝব তুই শেষ পর্যন্ত শালবনপুরে এসেছিস।

আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। আমি জানি, তুই ভেবেছিস আমি তোকে ছেড়ে চলে গেছি। কিন্তু সত্যিটা এত সহজ নয়।

সাত বছর আগে আমি হাসপাতালের কাজে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা জানতে পারি। রেল দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজন যাত্রীকে আমাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁদের নাম সরকারি তালিকার সঙ্গে মিলছিল না। একজন বৃদ্ধ বারবার বলছিলেন, তাঁকে যে ট্রেনে তোলা হয়েছিল, সেটির নম্বর ১৩০৭।

কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সেদিন ওই নম্বরের কোনও ট্রেন চলেনি।

আহতদের মধ্যে একজন ছিলেন দেবব্রত দত্ত। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ট্রেনটি দুর্ঘটনার আগে অন্য লাইনে পাঠানো হয়েছিল। সিগন্যাল পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা, যার নাম কোনও নথিতে ছিল না।

আমি তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেছিলাম।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে ওই রোগীদের মধ্যে দু’জন মারা যান, একজন নিখোঁজ হন, আর দেবব্রত দত্তকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আমি বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই আমাকে হুমকি দেওয়া হয়।

আমি তোকে কিছু বলতে পারিনি, কারণ তুই তখন কলেজে পড়তিস। আমি চাইনি, তুই এই বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়িস।

কিন্তু এরপর আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।

আমি জানতে পারি, দুর্ঘটনার রাতে যে ট্রেনটি চলেছিল, তার যাত্রী তালিকায় আমার নিজের নামও রয়েছে।

অথচ আমি সেদিন ট্রেনে উঠিনি।

কেউ আমার নামে টিকিট কেটেছিল।

কেন?

সেই উত্তর আমি এখনও জানি না।

আমি জানি না, যে ট্রেনটিকে আমি দেখেছিলাম, সেটি সত্যিই ছিল কি না। আমি শুধু জানি, দুর্ঘটনার পরে কিছু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিখোঁজ বলে দেখানো হয়েছিল।

আমি এখন নিরাপদে আছি। কিন্তু আমার কাছে এমন নথি রয়েছে, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের নাম সামনে চলে আসবে।

আমি চাই না, তুই আমার জন্য বিপদে পড়িস।

যদি কখনও আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করিস না। আমার পরিচয় যাচাই করিস। আমার কথা প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিস।

কারণ, এই ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য কোনও ভূতুড়ে ট্রেন নয়।

সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—কেউ কেন চেয়েছিল, কিছু মানুষকে পৃথিবীর চোখে মৃত করে দিতে?

— তোর দিদি, নন্দিতা।’

চিঠিটি পড়ে অরিন্দমের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

“দিদি জীবিত,” সে ফিসফিস করে বলল। “চিঠিতে সে নিজেই লিখেছে।”

শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।

“চিঠিটি সাত বছর আগে লেখা। এখন তিনি কোথায়, আমি জানি না।”

“কিন্তু একটু আগেই তো তাঁকে ট্রেনে দেখেছি!”

“আপনি তাঁর মুখ দেখেছেন। কিন্তু তিনি সত্যিই সেখানে ছিলেন কি না, তা এখনও প্রমাণিত নয়।”

অরিন্দম রাগে বলল, “তাহলে এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে এসব খেলা করছেন কেন?”

শশাঙ্ক শান্ত গলায় বলল, “কারণ আপনাকে এমন জায়গায় পৌঁছতে হবে, যেখানে কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন।”

সে টেবিলের ওপর একটি মানচিত্র খুলল।

মানচিত্রে শালবনপুর স্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো রেলসেতু চিহ্নিত করা।

সেতুটির নাম—কালো সেতু।

“সাত বছর আগে দুর্ঘটনাটি এখানেই ঘটেছিল,” শশাঙ্ক বলল। “সরকারি রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই রাতে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনও সেখানে ছিল।”

অরিন্দম মানচিত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

“যদি আমরা সেখানে যাই?”

“তাহলে হয়তো এমন কিছু পাবেন, যা এখনও কেউ সরাতে পারেনি।”

মেঘলা বলল, “চলুন। আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না।”

শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।

“এখন নয়। সূর্য ওঠার আগে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। রাতের অন্ধকারে আপনারা আবার এমন কিছু দেখতে পারেন, যা আপনাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে আমরা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করব।”

শশাঙ্ক উঠে দাঁড়াল।

“আমি যাচ্ছি। কিন্তু যাওয়ার আগে আপনাদের একটি কথা বলি। ১৩০৭ নম্বর ট্রেনের যাত্রী তালিকায় একটি নাম এখনও অজানা রয়ে গেছে।”

“কার নাম?”

শশাঙ্ক দরজার কাছে গিয়ে থামল।

“আপনাদের দু’জনের মধ্যে একজনের।”

৫. যে নামটি লেখা ছিল না

শশাঙ্ক চলে যাওয়ার পর অরিন্দম আবার রেজিস্টারের কাছে ফিরে গেল।

সে যাত্রী তালিকাটি খুলে দেখল।

নন্দিতা রায়।

দেবব্রত দত্ত।

অজ্ঞাতপরিচয় নারী।

অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।

চারটি নাম বা পরিচয়।

কিন্তু শশাঙ্ক বলেছে, অরিন্দম ও মেঘলার মধ্যে একজনের নাম তালিকায় রয়েছে।

“এটা কীভাবে সম্ভব?” মেঘলা বলল।

অরিন্দম উত্তর দিল, “আমাদের কারও নাম হয়তো পরে বদলে দেওয়া হয়েছে।”

“আমার বাবার নাম তো আছে।”

“তাহলে অন্য কেউ।”

অরিন্দম পুরোনো নথির প্রতিটি পাতা পরীক্ষা করতে লাগল। একটি পাতার কোণে সে দেখতে পেল, কালি দিয়ে কিছু মুছে ফেলা হয়েছে। কাগজটি আলোয় ধরতেই নিচে লেখা অক্ষরগুলো অস্পষ্টভাবে দেখা গেল।

সে মোবাইলের আলো কাগজের পিছন থেকে ফেলল।

মুছে দেওয়া নামটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো।

অরিন্দম রায়।

তারিখ—১৩ অক্টোবর, ২০২৬।

অরিন্দমের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

“এটা অসম্ভব। আমি তো আজ প্রথম এখানে এসেছি!”

মেঘলা কাগজটি হাতে নিয়ে দেখল।

“এই নামটা আজকের তারিখে লেখা। কিন্তু তুমি তো সাত বছর আগে নিখোঁজ হওনি।”

“তাহলে কে আমার নামে টিকিট কেটেছে?”

তারপরই অরিন্দমের মনে পড়ল, শৈশবে একবার সে একটি দুর্ঘটনার কথা শুনেছিল। তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আত্মীয়রা বলেছিল, অরিন্দমের জন্মের আগেই তার এক যমজ ভাই জন্মেছিল, কিন্তু জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায়।

অরিন্দম কোনও দিন বিষয়টি নিয়ে বেশি প্রশ্ন করেনি।

কিন্তু এখন তার মনে হলো, হয়তো পরিবারের ইতিহাসের আরও একটি অধ্যায় গোপন করা হয়েছে।

সে মেঘলাকে বলল, “আমার জন্মের নথি দেখতে হবে।”

“কেন?”

“কারণ, আমার নামে এই ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছে। আর আমি জানতে চাই, আমার জন্মের দিন সত্যিই কী ঘটেছিল।”

মেঘলা বলল, “তোমার কি যমজ ভাই ছিল?”

অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি কী করে জানলে?”

“তোমার মুখে শুনিনি। কিন্তু রেজিস্টারের শেষ পাতায় একটা নোট আছে।”

সে পাতাটি উল্টে দেখাল।

সেখানে লেখা—

‘যাত্রী নম্বর ৫: অরিন্দম রায়। পরিচয় যাচাই বাকি। যমজ জন্মের নথি সংযুক্ত।’

অরিন্দমের মাথার ভিতর যেন সবকিছু ঘুরতে লাগল।

যে রহস্যের সমাধান করতে সে শালবনপুরে এসেছিল, সেটি এখন তার নিজের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

সে জানলার বাইরে তাকাল।

দূরে কুয়াশার মধ্যে শেষ ট্রেনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

শেষ কামরার জানলায় আবার সেই পরিচিত মুখ।

নন্দিতা এবার কাচের ওপারে একটি কাগজ তুলে ধরল।

অরিন্দম চোখ কুঁচকে দেখল।

কাগজে বড় অক্ষরে লেখা—

“তোর জন্মের দিনই প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল।”

তারপর জানলার আলো নিভে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে সিগন্যাল ঘরের পুরোনো ঘড়িটি চলতে শুরু করল।

কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট থেকে ১২টা ১৬।

তারপর ১২টা ১৫।

তারপর ১২টা ১৪।

মেঘলা আতঙ্কিত গলায় বলল, “অরিন্দম, ঘড়িটা উল্টো দিকে চলছে!”

অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল—

“সময়টা পিছিয়ে যাচ্ছে না। কেউ আমাদের অতীতের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে।”

দূরে ট্রেনের দরজা খুলল।

শেষ কামরা থেকে নেমে এল একটি ছোট ছেলে।

তার পরনে পুরোনো স্কুলের পোশাক। হাতে লাল রঙের খেলনা ট্রেন।

ছেলেটি ধীরে ধীরে সিগন্যাল ঘরের দিকে এগিয়ে এল।

অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর বলল—

“দাদা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”

অরিন্দম ছেলেটির মুখ দেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

কারণ, ছেলেটির মুখটি অবিকল তার নিজের ছোটবেলার মুখ।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (প্রথম পর্ব: যে মেয়েটি ট্রেন থেকে নামেনি)।

১. রাত ১২টা ১৭ মিনিট

রাতের শেষ ট্রেনটা যখন শালবনপুর স্টেশনে ঢুকল, তখন প্ল্যাটফর্মে মাত্র চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।

একজন বৃদ্ধ চা-ওয়ালা, দু’জন রেলকর্মী আর স্টেশনের বুকিং ক্লার্ক অমলবাবু। শীতের শেষ দিকের রাত। চারপাশে হালকা কুয়াশা। দূরের সিগন্যালের লাল আলোটা কুয়াশার মধ্যে জ্বলজ্বল করছিল।

ট্রেনটির নাম ছিল নীলাচল লোকাল। প্রতিদিন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে এটি শালবনপুর স্টেশনে পৌঁছত। তারপর কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে আবার রামপুর জংশনের দিকে চলে যেত।

সেদিনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।

অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত।

ট্রেনটি থামতেই শেষ কামরার দরজা থেকে এক যুবক নেমে এল। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। পরনে কালো জ্যাকেট, কাঁধে বাদামি ব্যাগ। মুখে কয়েক দিনের দাড়ি। চোখ দুটো অস্বাভাবিক ক্লান্ত।

যুবকটি প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই চারদিকে তাকাল।

তারপর সোজা স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

“আপনি কি অমলবাবু?”

অমলবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।

“হ্যাঁ। আপনি?”

“আমার নাম অরিন্দম রায়। আমি কলকাতা থেকে এসেছি।”

“এত রাতে? কিছু দরকার?”

অরিন্দম ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। লম্বা চুল, কপালে ছোট্ট কালো টিপ, চোখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

অমলবাবু ছবিটি দেখেই স্থির হয়ে গেলেন।

তাঁর হাত থেকে কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল।

“এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন?”

অরিন্দম শান্ত গলায় বলল, “আমার দিদি। নাম নন্দিতা রায়। সাত বছর আগে এই স্টেশন থেকে নিখোঁজ হয়েছিল।”

অমলবাবু কোনও উত্তর দিলেন না।

“পুলিশ বলেছিল, দিদি হয়তো ট্রেনে কোথাও চলে গিয়েছিল। কিন্তু তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সাত বছর ধরে আমি তাকে খুঁজছি।”

অরিন্দম ছবিটি টেবিলে রাখল।

“তিন দিন আগে আমার বাড়িতে একটি চিঠি এসেছে। চিঠিতে লেখা—নন্দিতা এই স্টেশন ছেড়ে কখনও যায়নি।”

বাইরে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা এল। স্টেশনমাস্টারের ঘরের জানলা কেঁপে উঠল।

অমলবাবু ফিসফিস করে বললেন, “আপনি চলে যান।”

অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।

“কী বললেন?”

“আমি কিছু জানি না। এই ব্যাপারে আমাকে আর প্রশ্ন করবেন না।”

“কিন্তু আপনি ছবিটা দেখেই চিনেছেন!”

অমলবাবু উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি বলেছি, চলে যান!”

ঠিক সেই সময় স্টেশনের মাইক্রোফোনে কর্কশ শব্দ হলো। তারপর একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, ১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যে ছেড়ে যাবে।”

অরিন্দম চমকে উঠল।

শালবনপুর স্টেশনে মাত্র তিনটি প্ল্যাটফর্ম।

১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্ম বলে কিছু নেই।

কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।

“অরিন্দম রায়, আপনার দিদি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। শেষ কামরায় উঠে পড়ুন।”

অরিন্দমের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

স্টেশনমাস্টারের ঘর থেকে বেরিয়ে সে প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটল।

নীলাচল লোকাল তখনও দাঁড়িয়ে আছে। কামরাগুলোর অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। কিন্তু শেষ কামরার একটি জানলায় হলুদ আলো জ্বলছে।

জানলার পাশে একজন মহিলা বসে আছেন।

লম্বা চুল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ।

নন্দিতা।

অরিন্দমের মনে হলো, তার পা দুটো মাটিতে আটকে গেছে।

সাত বছর ধরে যে মুখটি সে শুধু ছবিতে দেখেছে, সেই মুখ আজ তার সামনে।

মহিলাটি ধীরে জানলার দিকে মুখ ফেরালেন।

তারপর ঠোঁট নাড়লেন।

অরিন্দম স্পষ্ট বুঝতে পারল, তিনি বলছেন—

“ভাই, ট্রেনে উঠিস না।”

পরের মুহূর্তেই ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।

২. সাত বছর আগের সেই রাত

অরিন্দমের মনে পড়ল সেই রাতের কথা।

তখন তার বয়স তেইশ। নন্দিতা ছিল তার একমাত্র দিদি। বাবা-মা দু’জনেই মারা গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। ছোটবেলা থেকে দিদিই তাকে আগলে রেখেছিল।

নন্দিতা একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের কাজ করত। কাজের প্রতি তার অদ্ভুত নিষ্ঠা ছিল। রাতের ডিউটি শেষ করেও অসুস্থ রোগীদের পাশে বসে থাকত।

কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে তার আচরণ বদলে গিয়েছিল।

সে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে দরজা পরীক্ষা করত। বাড়ির ফোন বাজলেই ভয় পেত। একদিন অরিন্দম দেখেছিল, দিদি পুরোনো কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলছে।

“কী পুড়িয়ে ফেলছ?”

নন্দিতা চমকে উঠে বলেছিল, “কিছু না।”

“আমার কাছেও লুকোবে?”

দিদি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “অরিন্দম, কখনও যদি আমি হঠাৎ চলে যাই, আমাকে খুঁজতে যাবি না।”

অরিন্দম হেসেছিল।

“তুমি কি সিনেমার নায়িকা? হঠাৎ চলে যাবে কেন?”

নন্দিতা হাসেনি।

“কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছ থেকে দূরে থাকা যায় না। আবার কাছে থাকাও বিপজ্জনক।”

অরিন্দম তখন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।

সাত বছর আগে, এক নভেম্বরের রাতে নন্দিতা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। বলেছিল, হাসপাতালে অতিরিক্ত ডিউটি আছে। তারপর আর ফেরেনি।

তার মোবাইল বন্ধ। হাসপাতাল জানিয়েছিল, সে সেদিন ডিউটিতে যোগ দেয়নি। শালবনপুর স্টেশনের একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাকে রাতের শেষ ট্রেনে উঠতে দেখা গিয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করেছিল।

কিন্তু সেই ফুটেজের কোনও কপি অরিন্দমকে দেওয়া হয়নি।

পুলিশের তদন্ত কয়েক মাস চলেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ফাইল বন্ধ হয়ে যায়।

অরিন্দম থামেনি।

সে হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে, পুরোনো সহকর্মীদের খুঁজেছে, নন্দিতার বন্ধুদের বাড়িতে গিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকের উত্তর ছিল আলাদা, আর প্রত্যেক উত্তরেই যেন কোনও একটা অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নন্দিতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নিখোঁজ হওয়ার পরেও কয়েকবার টাকা জমা পড়েছিল।

প্রতিবার টাকা জমা পড়েছে রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।

প্রতিবার জমার উৎস ছিল—শালবনপুর রেলওয়ে বুকিং অফিস।

অরিন্দম এই তথ্য পুলিশকে জানিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, প্রযুক্তিগত ভুল।

কিন্তু একই ভুল সাত বছর ধরে চলতে পারে না।

তিন দিন আগে আসা চিঠিটি সেই কারণেই তাকে শালবনপুরে টেনে এনেছে।

চিঠিতে লেখা ছিল—

‘যদি সত্য জানতে চাও, ১৩ অক্টোবর রাত ১২টা ১৭ মিনিটে শালবনপুর স্টেশনে এসো। শেষ ট্রেনটি চলে যাওয়ার আগে তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

— নন্দিতা।’

আজ ১৩ অক্টোবর।

আর কয়েক মিনিট আগেই সে তার দিদিকে ট্রেনের জানলায় দেখেছে।

৩. বন্ধ কামরার ভিতরে

ট্রেনটি হঠাৎ কেঁপে উঠল।

অরিন্দম প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দেখল, শেষ কামরার দরজা নিজে থেকেই খুলে গেছে।

ভিতরে কেউ নেই।

সে এক পা এগিয়ে গেল।

তার মনে পড়ল দিদির সতর্কবাণী—“ভাই, ট্রেনে উঠিস না।”

কিন্তু সাত বছর ধরে সে যে উত্তর খুঁজছে, তা যদি এই ট্রেনের ভিতরেই থাকে?

অরিন্দম দরজার কাছে পৌঁছতেই পেছন থেকে কেউ তার হাত চেপে ধরল।

“উঠবেন না!”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

একজন তরুণী। বয়স আটাশ-তিরিশ। পরনে রেলওয়ের কর্মীদের মতো নীল পোশাক। গলায় পরিচয়পত্র, কিন্তু তার ওপর কোনও নাম লেখা নেই।

“আপনি কে?” অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল।

“আমার নাম মেঘলা দত্ত। আমি এই স্টেশনে কাজ করি।”

“তাহলে ট্রেনে উঠতে বাধা দিচ্ছেন কেন?”

মেঘলা শেষ কামরার দিকে তাকাল।

“কারণ, যে ট্রেনে আপনার দিদিকে দেখেছেন, সেটি আজ প্রথমবার আসেনি।”

“মানে?”

“প্রতি বছর এই তারিখে আসে। ঠিক রাত ১২টা ১৭ মিনিটে। আর প্রত্যেকবার কেউ না কেউ শেষ কামরায় নিজের পরিচিত মানুষকে দেখতে পায়।”

অরিন্দমের মুখ শুকিয়ে গেল।

“তারপর?”

“কেউ ট্রেনে ওঠে না। যারা ওঠে, তারা আর ফিরে আসে না—এমন কথা প্রচলিত আছে।”

“এটা কি কুসংস্কার?”

“আমি জানি না। আমি শুধু জানি, সাত বছর আগে এই ট্রেনে আমার বাবাও উঠেছিলেন।”

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আপনার বাবাও নিখোঁজ?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“তিনি ছিলেন এই স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—কোনও দিন যদি রাতের শেষ ট্রেনটি এসে দাঁড়ায়, তার যাত্রীদের মুখের দিকে তাকাবে না।”

“কেন?”

“কারণ তাদের মধ্যে এমন মানুষও থাকতে পারে, যারা অনেক বছর আগেই মারা গেছেন।”

দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

মেঘলা অরিন্দমের হাত আরও শক্ত করে ধরল।

“এখন আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।”

ঠিক তখনই শেষ কামরার জানলায় আবার নন্দিতাকে দেখা গেল।

এবার তার পাশে আরও একজন বসে আছেন।

একজন বৃদ্ধ।

মেঘলা বৃদ্ধটিকে দেখেই হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

“বাবা…”

বৃদ্ধ ধীরে মাথা তুললেন। জানলার কাচের ওপার থেকে তাঁর চোখ সরাসরি মেয়ের দিকে।

তারপর তিনি হাত তুলে জানলার কাচে তিনবার আঘাত করলেন।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মেঘলা কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল।

“এটা হতে পারে না। বাবা তো সাত বছর আগেই মারা গেছেন!”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“আপনি বলেছিলেন, তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাদের বাড়িতে তাঁর মৃত্যুসনদ এসেছে। নদীর ধারে একটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, সেটি বাবার। কিন্তু আমি কখনও মুখ দেখিনি।”

ট্রেনের ভিতর থেকে এবার একটি শিশুর কান্না ভেসে এল।

তারপর মাইক্রোফোনে সেই নারীকণ্ঠ—

“যাত্রীরা সাবধান। যাঁরা জীবিত, তাঁরা যেন মৃতদের সঙ্গে যাত্রা না করেন।”

অরিন্দমের মনে হলো, মাটির নীচ থেকে যেন ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে।

ট্রেনের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “এবার আর কোনও উপায় নেই।”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“কী উপায়?”

মেঘলা পকেট থেকে একটি ছোট চাবি বের করল।

“ট্রেন চলে যাওয়ার আগে আমাদের স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরে যেতে হবে। আমার বাবা সেখানে কিছু রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেষ ট্রেনের রহস্য বুঝতে হলে প্রথমে সেই ঘরের দরজা খুলতে হবে।”

৪. সিগন্যাল ঘরের নীচে

স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। নতুন প্রযুক্তি চালু হওয়ার পর সেটি আর ব্যবহার করা হয় না। ভবনটির চারদিকে আগাছা, দেওয়ালে শ্যাওলা, জানলায় ধুলো জমে আছে।

মেঘলা তালায় চাবি ঢোকাল।

দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পুরোনো কাগজ ও স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ বেরিয়ে এল।

ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল লোহার যন্ত্র। দেওয়ালে কয়েকটি পুরোনো ঘড়ি। তার নীচে একটি কাঠের টেবিল, যার ওপর ধুলো জমে আছে।

মেঘলা টেবিলের ড্রয়ার খুলল।

ভিতরে একটি চিঠি।

‘মেঘলা,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে শেষ ট্রেন আবার এসেছে।

আমি জানি, তুমি তোমার বাবাকে খুঁজবে। কিন্তু মনে রেখো, এই রহস্যের সঙ্গে শুধু আমার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জড়িত নয়। সাত বছর আগে যে রাতে নন্দিতা রায় নিখোঁজ হয়েছিল, সেই রাতেই স্টেশনের পুরোনো রেকর্ড থেকে একটি ট্রেনের নাম মুছে ফেলা হয়।

ট্রেনটির নম্বর ছিল ১৩০৭।

সরকারি সময়সূচিতে এই ট্রেনের কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু পুরোনো সিগন্যাল রেজিস্টারে তার উল্লেখ রয়েছে।

রাত ১২টা ১৭ মিনিটে যে ট্রেনটি আসে, সেটি নীলাচল লোকাল নয়।

এটি এমন একটি ট্রেন, যার যাত্রা কখনও নথিভুক্ত হয়নি।

এর শেষ কামরায় যে মানুষদের দেখা যায়, তারা সবাই কোনও না কোনও অসমাপ্ত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।

তাদের মধ্যে কেউ নিখোঁজ, কেউ মৃত বলে ঘোষিত, আবার কেউ এমন মানুষ, যাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর কোনও দিন প্রকাশিতই হয়নি।

এই ট্রেন কোথা থেকে আসে, আমি জানি না।

কিন্তু আমি জানি, একে থামানোর চেষ্টা করলে আরও মানুষ হারিয়ে যাবে।

— তোমার বাবা।’

মেঘলা চিঠিটি পড়ে কেঁপে উঠল।

অরিন্দম বলল, “আপনার বাবা কি সত্যিই এই চিঠি লিখেছিলেন?”

“হাতের লেখা তাঁরই।”

“তাহলে তিনি জানতেন, এই ট্রেন আসবে।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“কিন্তু তিনি জানতেন না, কেন আসে।”

অরিন্দম ঘরের চারদিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল মেঝের একটি অংশে। অন্য অংশের তুলনায় সেখানে ধুলো কম।

সে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে মেঝেতে চাপ দিল।

একটি কাঠের পাত নড়ে উঠল।

পাতটি সরাতেই নীচে সিঁড়ি দেখা গেল।

অন্ধকারে নেমে গেছে সরু সিঁড়ি।

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

“এখানে তো কোনও ঘর থাকার কথা নয়!”

অরিন্দম মোবাইলের আলো জ্বালল।

“আপনার বাবা এই পথের কথা জানতেন?”

“না।”

দু’জন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল।

নিচে ছোট একটি ঘর। দেওয়ালে পুরোনো মানচিত্র। টেবিলের ওপর কয়েকটি রেলওয়ে রেজিস্টার। এক কোণে ধাতব আলমারি।

অরিন্দম একটি রেজিস্টার খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

১৩০৭ — বিশেষ যাত্রী পরিবহণ।

পরের পাতায় যাত্রীদের নাম।

তারিখ: ১৩ অক্টোবর, সাত বছর আগে।

যাত্রী নম্বর ১: নন্দিতা রায়।

যাত্রী নম্বর ২: দেবব্রত দত্ত।

যাত্রী নম্বর ৩: অজ্ঞাতপরিচয় নারী।

যাত্রী নম্বর ৪: অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।

অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“মেঘলা, দেবব্রত দত্ত কি আপনার বাবার পুরো নাম?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

অরিন্দম পরের পাতাটি উল্টাল।

সেখানে লাল কালিতে একটি বাক্য লেখা।

‘যাত্রীদের কেউই নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাননি।’

তার নীচে আরও একটি লাইন—

‘পরবর্তী যাত্রার তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।’

অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত ১২টা ৩৬ মিনিট।

ট্রেন চলে যাওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই।

কিন্তু ওপরের প্ল্যাটফর্ম থেকে এখনও ট্রেনের শব্দ আসছে।

তারপরই ঘরের পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।

রিং।

রিং।

রিং।

মেঘলা ভয়ে স্থির হয়ে গেল।

অরিন্দম রিসিভার তুলল।

ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ বলল—

“অরিন্দম, তুমি এখনও নীচে আছ?”

“কে বলছেন?”

“আমি নন্দিতা।”

অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।

“দিদি! তুমি কোথায়?”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নন্দিতা বলল—

“তুমি যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছ, সেই ঘরটা সাত বছর আগে তৈরি হয়নি।”

“মানে?”

“এই ঘর তৈরি হয়েছিল অনেক আগে। আর এই ঘরে শেষবার যে মানুষটি এসেছিলেন, তিনি তোমার বাবা।”

অরিন্দম হতবাক।

“আমাদের বাবা তো ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছিলেন!”

ওপাশে নন্দিতার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“তোমাকে সেটাই বলা হয়েছিল। কিন্তু অরিন্দম, তোমার বাবা মারা যাননি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পিছনের দেওয়ালে একটি লোহার দরজা খুলে গেল।

দরজার ওপারে অন্ধকার সুড়ঙ্গ।

সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে ভেসে এল ট্রেনের চাকার শব্দ।

আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে একটি পুরুষকণ্ঠ—

“অরিন্দম, বাড়ি ফিরে যা।”

অরিন্দমের হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভার পড়ে গেল।

কারণ, সেই কণ্ঠ সে চিনতে পেরেছে।

সাত বছর নয়, তারও বহু আগে শৈশবের স্মৃতিতে সে এই কণ্ঠ শুনেছিল।

এটি তার বাবার কণ্ঠ।

চলবে…

Share This
Categories
বিবিধ

স্নেহার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি, বিধাননগর মাঠ থেকে মিছিল।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- গৃহবধূ স্নেহা চক্রবর্তীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে মোমবাতি হাতে মৌন মিছিল করলেন তাঁর বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেদিনীপুর শহরের বিধাননগর মাঠ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে সংলগ্ন বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন স্নেহার বাবা-মাও। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের আবহে একদিকে যেমন স্নেহার আত্মার শান্তি কামনা করা হয়, তেমনই অন্যদিকে তাঁর মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে।

মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের দাবি, স্নেহার মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, স্নেহার পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন যমুনাবালিতে স্নেহার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। স্নেহার বাপের বাড়ির পক্ষ থেকে থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ স্নেহার স্বামী রণদীপ জানা এবং তাঁর বাবাকে গ্রেফতার করেছে।

স্নেহার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে তাঁর পরিবার-পরিজন ও পরিচিতদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের একাংশের দাবি, স্নেহা আত্মহত্যা করতে পারেন না। তাঁদের অভিযোগ, এই মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার নেপথ্যে কী রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।

মঙ্গলবারের মোমবাতি মিছিল থেকে স্নেহার মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। প্রজ্জ্বলিত মোমবাতি হাতে নীরবে পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে প্রয়াত স্নেহার প্রতি শ্রদ্ধা জানান মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা। তাঁদের একটাই প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক এবং স্নেহার পরিবার ন্যায়বিচার পাক।

Share This
Categories
বিবিধ

রক্তের সংকট মেটাতে এগিয়ে এল শুকনাতোড় যুব সংঘ, রক্তদান শিবিরে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসবের আবহে ব্লাড ব্যাংকগুলিতে রক্তের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করল শুকনাতোড় যুব সংঘ ক্লাব। মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা ৩ নম্বর ব্লকের চন্দ্রকোনারোড শহর সংলগ্ন শুকনাতোড় এলাকায় ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এক রক্তদান শিবিরের।
এই রক্তদান শিবিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এলাকার বহু মানুষ। শিবিরে ২৩ জন মহিলা-সহ মোট ৭৩ জন রক্তদাতা রক্তদান করেন। উৎসবের আনন্দের মাঝেও মুমূর্ষু রোগীদের পাশে দাঁড়াতে এবং রক্তের সংকট মোকাবিলায় ক্লাবের এই উদ্যোগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এই দিনের রক্তদান শিবিরে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবী ধীমান কোলে, ক্লাবের সভাপতি গোলাপ হোসেন পাঠান, নিশার আলী পাঠান, সম্পাদক মনিরুল পাঠান, কোষাধ্যক্ষ ইস্তাজুল পাঠান, নাসিবুল পাঠান-সহ ক্লাবের অন্যান্য সদস্যরা। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নজরুল পাঠান। ক্লাব সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী দিনেও সমাজের স্বার্থে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও সমাজসেবামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
উৎসবের মরশুমে রক্তের চাহিদা মেটাতে শুকনাতোড় যুব সংঘের এই উদ্যোগ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠল।

Share This
Categories
বিবিধ

খড়গপুর পৌরসভা চত্বরে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা, ধস্তাধস্তির পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ।

পশ্চিম মেদিনীপুর , নিজস্ব সংবাদদাতা:- খড়গপুর পৌরসভায় চেয়ারম্যান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা। সোমবার কাউন্সিলরদের মধ্যে চেয়ারম্যান নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষোভ প্রকাশ করে খড়গপুর পৌরসভার সামনে বিক্ষোভ দেখান বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা এবং স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। অভিযোগ, নির্বাচনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা পৌরসভার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয় বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পৌরসভা চত্বরে উত্তেজনা ছড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পুলিশি তৎপরতা দেখা যায়।
তবে চেয়ারম্যান নির্বাচনকে ঘিরে ঠিক কী কারণে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে কি না, তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। ঘটনায় প্রশাসন বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

Share This
Categories
বিবিধ

পুজোর আগে সরকারি অনুদান পেয়ে উৎসাহিত উদ্যোক্তারা, গড়বেতায় চেক তুলে দিল প্রশাসন।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে পুজো কমিটিগুলির পাশে রাজ্য সরকার। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার বিকেলে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা থানা এলাকার ১২০টি পুজো কমিটির হাতে এক লক্ষ টাকা করে চেক তুলে দেওয়া হল। গড়বেতা থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই চেক বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
উল্লেখ্য, রাজ্যে পালাবদলের পর রাজ্য সরকারের তরফে পুজো কমিটিগুলিকে এক লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোষণা অনুযায়ী, এদিন গড়বেতা থানা এলাকার ১২০টি পুজো কমিটির প্রতিনিধিদের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হয়।
এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন গড়বেতা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক প্রদীপ লোধা, শালবনী বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক বিমান মাহাতো, গড়বেতা থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক প্রদীপ সিংহ-সহ অন্যান্য পুলিশ আধিকারিক এবং এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবীরা।
পুজোর আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে এই আর্থিক সহায়তা পুজো কমিটিগুলির কাজে লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারি এই অনুদানকে ঘিরে ইতিমধ্যেই পুজো কমিটিগুলির মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

Share This
Categories
বিবিধ

ভুয়ো নথিতে সরকারি জমি বিক্রির অভিযোগ, শালবনিতে জমি দখলে নিল ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- শালবনির জমি কেলেঙ্কারি মামলায় এবার বড় পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের। সরকারি জমি বেআইনিভাবে রায়তি জমি হিসেবে নথিভুক্ত করে বিক্রির অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট জমি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিল প্রশাসন। সোমবার বিতর্কিত জমিগুলির সামনে সরকারি বোর্ড লাগিয়ে সেগুলিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন বলে ঘোষণা করা হয়। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনিতে।

অভিযোগ, ভুয়ো নথিপত্রের মাধ্যমে সরকারি জমিকে রায়তি জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল। বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্তে নামে সিআইডি। মামলায় একাধিক ব্যক্তির নাম জড়িয়েছে। এবার তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জমিগুলির উপর সরকারি অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জমি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াতেও সক্রিয় হল রাজ্য প্রশাসন।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার নির্দিষ্ট জমিগুলির সামনে বোর্ড লাগিয়ে সেগুলি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। শালবনির ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি নির্দেশ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
মামলায় একাধিক ব্যক্তির নাম এই জমি কেলেঙ্কারি মামলায় অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক তথা দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি সুজয় হাজরা। পাশাপাশি, তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের নামও এই মামলায় উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়াও অমিত ঘোষ, নৃত্য রায় এবং লক্ষ্মীকান্ত ভুঁইয়ার নামও মামলার সূত্রে সামনে এসেছে। সরকারি জমি বেআইনিভাবে হস্তান্তরের অভিযোগের তদন্ত চালাচ্ছে সিআইডি। মামলার সূত্রে অভিযুক্তদের হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষ।
কী জানাল ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর?
শালবনির বিএলআরও মৈনাক চট্টোপাধ্যায় জানান, সরকারি নির্দেশ পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জমিগুলিতে বোর্ড লাগিয়ে দখল নেওয়ার কাজ করা হয়েছে।
তাঁর কথায়, “আমাদের নির্দেশ এসেছে, সেইমতো আমরা কাজ করলাম। এগুলো সরকারি জমি, এগুলো দখল নেওয়া হয়েছে।” তদন্তের পাশাপাশি জমি পুনরুদ্ধারে নজর
সরকারি জমি কীভাবে রায়তি জমি হিসেবে নথিভুক্ত হল এবং কীভাবে সেই জমি বিক্রির অভিযোগ উঠল, তা নিয়েই তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমিগুলির উপর সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
তবে কত পরিমাণ জমি এই প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে এবং আগামী দিনে আরও কী কী পদক্ষেপ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
একদিকে জমি কেলেঙ্কারি মামলার তদন্ত, অন্যদিকে সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ—এই দুই বিষয়কে ঘিরেই এখন নজর শালবনির দিকে। আগামী দিনে তদন্তের গতিপ্রকৃতি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Share This
Categories
বিবিধ

পুজোর আগে সরকারি অনুদান পেয়ে খুশি উদ্যোক্তারা, ফালাকাটায় ২৬১টি কমিটির হাতে চেক।

ফালাকাটা, নিজস্ব সংবাদদাতা :- দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে রাজ্য সরকারের তরফে ফালাকাটার পুজো কমিটিগুলির হাতে সরকারি আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হল। সোমবার ফালাকাটা কমিউনিটি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এলাকার ২৬১টি দুর্গাপুজো কমিটিকে ওই অনুদানের চেক দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী দীপক বর্মন-সহ পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকেরা। সরকারি অনুদান হাতে পেয়ে পুজো কমিটির প্রতিনিধিরা খুশি।

Share This
Categories
বিবিধ

পুজোর আনন্দে সামিল খুদেরাও, বালুরঘাটে ৩০ শিশুকে নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট:- শরতের উৎসব মানেই নতুন জামা, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা আর প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। সেই আনন্দের ভাগ যাতে ছোটদের কাছেও পৌঁছয়, সেই ভাবনা থেকেই পুজোর আগে বিশেষ উদ্যোগ নিল বালুরঘাটের মঙ্গলপুরের বনেদি বাঙালি রেস্টুরেন্ট।
সোমবার দুপুরে শহরের বিভিন্ন এলাকার সর্বশিক্ষা কেন্দ্রের ৩০ জন শিশুকে নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। শুধু খাবার পরিবেশন নয়, খুদেদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়া এবং তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর মধ্য দিয়েই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন রেস্টুরেন্টের উদ্যোক্তারা।
পুজোর মুখে এমন আয়োজনে শিশুদের মধ্যে তৈরি হয় খুশির আবহ। উৎসবের দিনগুলিতে আনন্দের পরিসর যেন কেবল নিজের পরিবার বা পরিচিতদের মধ্যে আটকে না থাকে, সেই বার্তাই উঠে আসে এই উদ্যোগে। উদ্যোক্তাদের কথায়, পুজোর আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ভাবনা থেকেই এই আয়োজন। ছোটদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের সঙ্গে উৎসবের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

Share This