Categories
গল্প বিবিধ

যে ছেলেটি নীরবতার শব্দ শুনতে পেত।

১. অন্য রকম একটি ছেলে

বীরভূমের এক ছোট্ট গ্রামে থাকত ষোলো বছরের ছেলে নীল। তার বাবা গ্রামের একটি ছোট মুদির দোকান চালাতেন, আর মা বাড়িতে হাতে তৈরি নকশিকাঁথা সেলাই করতেন। নীল পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো হলেও তার একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকতে পারত।

কখনও পুকুরের ধারে, কখনও মাঠের আলের ওপর, কখনও বাড়ির পিছনের পুরোনো আমগাছটার নিচে বসে থাকত সে। অন্য ছেলেরা যখন মাঠে ফুটবল খেলত, তখন নীল কখনও তাদের সঙ্গে খেলত, আবার কখনও একা বসে চারপাশের পরিবেশ লক্ষ করত।

গ্রামের লোকেরা তাকে নিয়ে মজা করত।

—ছেলেটা বড্ড চুপচাপ! সারাক্ষণ কী ভাবে কে জানে!

কেউ কেউ বলতেন, নীল নাকি নিজের কল্পনার জগতে বাস করে।

কিন্তু নীলের কাছে চারপাশের পৃথিবী কখনও নীরব ছিল না। সে শুনতে পেত পুকুরের জলে মাছের লাফ দেওয়ার শব্দ, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে ছোট প্রাণীর ছুটে যাওয়া, দূরের মাঠে কৃষকের লাঙল চালানোর ছন্দ, এমনকি বৃষ্টির আগে বাতাসের বদলে যাওয়া সুরও।

একদিন বিকেলে সে পুকুরের ধারে বসেছিল। হঠাৎ খেয়াল করল, গত কয়েক দিন ধরে যে জায়গাটিতে অসংখ্য ব্যাঙ ডাকত, সেখানে আজ অস্বাভাবিক নীরবতা।

সে চারপাশে তাকাল। জল আগের মতোই আছে, গাছপালাও রয়েছে। তবু কিছু একটা যেন বদলে গেছে।

নীল বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞাসা করল, —মা, আমাদের পুকুরের ধারে ব্যাঙের ডাক কি কমে গেছে?

মা রান্না করতে করতে বললেন, —তা তো খেয়াল করিনি। বর্ষা এলে আবার ডাকবে হয়তো।

কিন্তু নীলের মনে প্রশ্নটা থেকে গেল।

সে ঠিক করল, পুকুরের আশপাশে কী পরিবর্তন ঘটছে, তা খুঁজে দেখবে।

২. ছোট্ট খাতার বড় কাজ

নীলের স্কুলে পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন সৌমেনবাবু। তিনি ছাত্রছাত্রীদের শুধু বই পড়তে বলতেন না; আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতেও উৎসাহ দিতেন।

পরদিন স্কুলে নীল তাঁর কাছে পুকুরের ব্যাঙের ডাক কমে যাওয়ার কথা বলল।

সৌমেনবাবু মন দিয়ে শুনলেন।

—তুমি কি নিশ্চিত যে সত্যিই ডাক কমেছে, নাকি সময়ের পরিবর্তনের জন্য তোমার এমন মনে হচ্ছে?

নীল একটু থেমে বলল, —পুরোপুরি নিশ্চিত নই, স্যার। তাই আমি কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করতে চাই।

শিক্ষক খুশি হলেন।

—খুব ভালো। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে পর্যবেক্ষণ দরকার। তবে মনে রেখো, শুধু ডাক কমে যাওয়া থেকে ব্যাঙের সংখ্যা কমেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। আবহাওয়া, ঋতু, সময়—অনেক কারণ থাকতে পারে।

তিনি নীলকে একটি ছোট খাতা রাখতে বললেন। সেখানে প্রতিদিনের তারিখ, সময়, আবহাওয়া এবং সে কী লক্ষ করেছে, তা লিখে রাখতে হবে।

নীল খাতাটির নাম দিল—‘আমাদের পুকুরের দিনলিপি’।

প্রতিদিন বিকেলে সে নির্দিষ্ট সময়ে পুকুরের ধারে যেত। একই জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করত। কখনও ব্যাঙের ডাক শুনত, কখনও পোকামাকড়ের শব্দ, কখনও জলের রং কিংবা পাড়ের অবস্থা লক্ষ করত।

প্রথম সপ্তাহে তেমন কিছু বোঝা গেল না। দ্বিতীয় সপ্তাহে সে দেখতে পেল, পুকুরের এক পাশের জলে সবুজ আস্তরণ বেড়েছে। পাড়ের কাছে কয়েকটি প্লাস্টিকের প্যাকেটও পড়ে ছিল।

নীল সেগুলো খাতায় লিখে রাখল।

সে জানত না, এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ব্যাঙের ডাকের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। কিন্তু তার মনে হলো, পুকুরের চারপাশে যা ঘটছে, তা আরও ভালোভাবে দেখা দরকার।

৩. যে পরিবর্তন কেউ খেয়াল করেনি

পুকুরটি গ্রামের বহু মানুষের কাজে লাগত। কেউ সেখানে গবাদি পশুকে জল খাওয়াতেন, কেউ পাড়ে বসে কাপড় ধুতেন, আবার কেউ মাছ ধরতেন।

গত কয়েক মাসে পুকুরের এক পাশে কিছু নির্মাণকাজও চলছিল। বৃষ্টির সময় সেই দিক থেকে মাটি ধুয়ে পুকুরে পড়ত। কয়েকটি বাড়ি থেকে আবর্জনাও এসে জমত পাড়ের কাছে।

নীল বিষয়গুলো খাতায় লিখে রাখলেও সে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।

একদিন সে তার বন্ধু সায়নকে সঙ্গে নিয়ে পুকুরের চারপাশে হাঁটল। তারা দেখল, একদিকে পাড়ের ঘাস উঠে গেছে, অন্যদিকে জমে রয়েছে প্লাস্টিক ও শুকনো আবর্জনা।

সায়ন বলল, —এগুলো পরিষ্কার করে দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে!

নীল বলল, —পরিষ্কার করা দরকার, কিন্তু শুধু এটুকু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে কি না, আমরা জানি না। আগে বড়দের জানাই।

দুজন মিলে সৌমেনবাবুর কাছে গেল। শিক্ষক তাদের পর্যবেক্ষণের খাতা দেখে বললেন, —তোমরা খুব ভালো কাজ করেছ। এবার পুকুরটি যারা দেখাশোনা করেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। পরিবেশের সমস্যা বুঝতে হলে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও জানতে হয়।

তিনি গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করলেন। তাঁরা জানালেন, আগে বর্ষাকালে পুকুরের চারপাশে অনেক ছোট জলজ প্রাণী দেখা যেত। তবে তাঁদের স্মৃতি থেকে একা কোনো নির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

সবাই মিলে ঠিক করলেন, পুকুরের অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। প্রয়োজনে উপযুক্ত পরিবেশকর্মী বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাহায্য নেওয়া হবে।

নীল বুঝতে পারল, তার ছোট্ট পর্যবেক্ষণ তাকে একা কোনো সমস্যার সমাধান দেয়নি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো সামনে আনতে পেরেছে।

৪. গ্রামের সভায় এক কিশোর

রবিবার বিকেলে গ্রামের ক্লাবঘরে একটি সভা বসেছিল। সেখানে পুকুরের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। সৌমেনবাবু নীলকে তার খাতা নিয়ে যেতে বললেন।

প্রথমে নীল খুব ভয় পেয়ে গেল। এত বড়দের সামনে সে কখনও কথা বলেনি।

বাবা তাকে সাহস দিয়ে বললেন, —যা দেখেছিস, শুধু সেটুকুই বলবি। যা জানিস না, তা জানি না বলবি। সত্যি কথা বলার জন্য ভয় পাস না।

সভায় নীল দাঁড়াল। তার হাত একটু কাঁপছিল। তবু সে খাতাটি খুলে বলল, —আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে একই সময়ে পুকুরের ধারে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিছু দিনে ব্যাঙের ডাক কম শুনেছি। পুকুরের এক পাশে সবুজ আস্তরণ বেড়েছে, আর পাড়ের কাছে আবর্জনা জমেছে। তবে এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে ঠিক কী সম্পর্ক আছে, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।

সভায় কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।

একজন বললেন, —এত ছোট ছেলে এত কিছু লিখে রেখেছে!

অন্য একজন প্রশ্ন করলেন, —তাহলে কি পুকুরের জল খারাপ হয়ে গেছে?

সৌমেনবাবু উত্তর দিলেন, —শুধু দেখে জলের গুণমান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করাতে হবে।

নীল আবার বলল, —আমরা অন্তত পুকুরের পাড়ে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে পারি। আর পুকুরের অবস্থা নিয়মিত লক্ষ্য করতে পারি।

তার কথায় গ্রামের মানুষ উৎসাহিত হলেন। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, পুকুরের চারপাশ পরিষ্কার করা হবে এবং আবর্জনা ফেলার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি পুকুরের জলের অবস্থা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে নীলের মনে হলো, চুপ করে লক্ষ করা কখনও কখনও কথা বলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

৫. পরিষ্কারের দিন

পরের রবিবার গ্রামের অনেক মানুষ পুকুরের পাড়ে জড়ো হলেন। যুবকেরা আবর্জনা সংগ্রহ করলেন, বড়রা পাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করলেন, আর স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বার্তা লেখা ছোট পোস্টার তৈরি করল।

নীল ও সায়ন প্লাস্টিকের প্যাকেট সংগ্রহ করতে করতে দেখল, পুকুরের এক পাশে ভাঙা বোতলও পড়ে রয়েছে। তারা সাবধানে বড়দের সাহায্যে সেগুলো সরাল।

তবে নীল খেয়াল করল, পরিষ্কার করার পরও পুকুরের জলে সবুজ আস্তরণ রয়ে গেছে।

সে সৌমেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, আমরা তো আবর্জনা সরালাম। কিন্তু জলের রং এখনও একই রকম কেন?

শিক্ষক বললেন, —জলের রং বদলানোর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কখনও শৈবালের বৃদ্ধি, কখনও পলির উপস্থিতি, কখনও অন্য পরিবেশগত কারণ কাজ করতে পারে। শুধু রং দেখে কারণ নির্ধারণ করা ঠিক নয়। প্রয়োজনে জল পরীক্ষা করতে হবে।

নীল আবার খাতায় লিখল—‘পাড় পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু জলের অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য দরকার।’

সে বুঝতে পারছিল, কোনো সমস্যার দৃশ্যমান অংশ সরিয়ে ফেললেই সব সময় মূল সমস্যা মেটে না।

৬. বৃষ্টির রাত

কয়েক দিন পরে প্রবল বৃষ্টি হলো। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বৃষ্টি পড়ল একটানা। সকালে নীল পুকুরের ধারে গিয়ে দেখল, নির্মাণকাজ চলা দিক থেকে মাটি ধুয়ে পুকুরের পাড়ে জমেছে। কিছু আবর্জনাও আবার জলের কাছে এসে পড়েছে।

নীল বুঝল, শুধু এক দিনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যথেষ্ট নয়। যে দিক থেকে মাটি ও আবর্জনা আসছে, সেখানে স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার।

সে ছবি তুলে শিক্ষককে দেখাল। সৌমেনবাবু বিষয়টি গ্রামের সভায় তুললেন। নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে বৃষ্টির জল কোন পথে নামছে, তা পরীক্ষা করা হলো। পাড়ে মাটি আটকানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং আবর্জনা যাতে জলে না আসে, সেই পরিকল্পনা নেওয়া হলো।

এবার গ্রামের মানুষ বুঝলেন, পুকুর রক্ষা করার জন্য নিয়মিত পরিচর্যা এবং পরিকল্পনা দুটোই দরকার।

নীল তার দিনলিপি চালিয়ে গেল। সে কোনোদিন ব্যাঙের ডাক বেশি শুনত, কোনোদিন কম। সে প্রতিটি দিনের আবহাওয়া লিখে রাখত, যাতে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনগুলো তুলনা করা যায়।

তার পর্যবেক্ষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হলো—প্রকৃতিকে বোঝার জন্য এক দিনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করা দরকার।

৭. যে উত্তরটি সহজ ছিল না

কয়েক সপ্তাহ পর সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পরামর্শে পুকুরের জল পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হলো। পরীক্ষার ফলাফল থেকে জলের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেল। তবে ব্যাঙের ডাক কম শোনার একমাত্র কারণ হিসেবে কোনো একটি বিষয়কে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা গেল না।

নীল প্রথমে একটু হতাশ হলো।

সে ভেবেছিল, এত দিন পর্যবেক্ষণ করার পরে নিশ্চয়ই একটি স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে।

সৌমেনবাবু তাকে বুঝিয়ে বললেন, —বিজ্ঞানে সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। অনেক সময় তথ্য থেকে কিছু সম্ভাবনা বোঝা যায়, কিন্তু নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা দরকার হয়।

নীল বলল, —তাহলে আমার এত দিনের খাতাটা কি কাজে লাগল না?

শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, —কেন লাগবে না? তুমি পরিবর্তনগুলো নথিভুক্ত করেছ, সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে মানুষকে যুক্ত করেছ। এখন ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তোমার তথ্য তুলনা করা যাবে। সব উত্তর না পেলেও কাজের মূল্য কমে যায় না।

কথাগুলো শুনে নীলের মন হালকা হলো।

সে বুঝল, অনুসন্ধানের সাফল্য সব সময় চূড়ান্ত উত্তর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনও সাফল্য হলো সঠিক প্রশ্ন করা এবং আরও ভালোভাবে জানার পথ তৈরি করা।

৮. নীরবতার অর্থ

পরবর্তী কয়েক মাস ধরে গ্রামের মানুষ পুকুরের পরিচর্যা চালিয়ে গেলেন। আবর্জনা ফেলার সমস্যা কমানোর চেষ্টা হলো। বৃষ্টির জল নামার পথেও কিছু পরিবর্তন আনা হলো। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পালা করে পুকুরের চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

নীল এখনও প্রতিদিন সেখানে যেত না, তবে সপ্তাহে কয়েক দিন নির্দিষ্ট সময়ে পর্যবেক্ষণ করত। সে জানত, ব্যাঙের ডাক ঋতু ও আবহাওয়ার সঙ্গে বদলাতে পারে। তাই শুধু একদিনের শব্দ শুনে সিদ্ধান্ত নিত না।

এক বর্ষার সন্ধ্যায় পুকুরের ধারে বসে থাকতে থাকতে সে আবার ব্যাঙের ডাক শুনল। প্রথমে একটি, তারপর আরেকটি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শব্দগুলো স্পষ্ট হলো।

নীল খুশি হলো, কিন্তু এবার সে অতিরিক্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিল না। সে শুধু তারিখ, সময় এবং আবহাওয়ার কথা লিখে রাখল।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

বাতাসে পাতার শব্দ, দূরের মানুষের কথা, জলের মৃদু ঢেউ—সব মিলিয়ে চারপাশ আবার জীবন্ত মনে হচ্ছিল।

সে বুঝতে পারল, প্রকৃতির শব্দ শোনা মানে শুধু কান খোলা রাখা নয়। চোখ দিয়ে দেখা, মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা এবং নিজের ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহসও দরকার।

৯. নতুন প্রজন্মের কানে

বছর ঘুরে স্কুলে পরিবেশ দিবস এল। শিক্ষক নীলকে ছোটদের সামনে তার অভিজ্ঞতা বলতে বললেন।

নীল মঞ্চে উঠে নিজের খাতাটি দেখাল। পাতাগুলোতে তারিখ, আবহাওয়া, পর্যবেক্ষণ এবং ছোট ছোট প্রশ্ন লেখা।

সে বলল, —আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, ব্যাঙের ডাক কমে যাওয়ার একটা নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু পরে বুঝেছি, শুধু একটি লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমাদের আরও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে, বড়দের সাহায্য নিতে হয়েছে এবং পুকুরের পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

একটি ছোট মেয়ে হাত তুলে জিজ্ঞাসা করল, —দাদা, তাহলে আমরা কীভাবে প্রকৃতিকে সাহায্য করব?

নীল বলল, —প্রথমে চারপাশে কী ঘটছে, সেটা মন দিয়ে দেখো। অযথা আবর্জনা ফেলো না, জলাশয় নোংরা হতে দেখলে বড়দের জানাও, গাছপালা ও প্রাণীদের বিরক্ত কোরো না। আর কোনো সমস্যার কারণ না জেনে নিশ্চিত কথা বলো না।

ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে শুনল।

অনুষ্ঠানের শেষে শিক্ষক নীলের হাতে তার পর্যবেক্ষণের খাতাটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, —এই খাতাটি তোমার প্রথম গবেষণার স্মৃতি। যত দিন কৌতূহল থাকবে, তত দিন শেখার পথও খোলা থাকবে।

নীল খাতাটি বুকের কাছে ধরে হাসল।

১০. যে নীরবতা প্রশ্ন করতে শেখায়

সেদিন সন্ধ্যায় নীল আবার পুকুরের ধারে গেল। আকাশে মেঘ ছিল, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। সে পুকুরের পাশে বসে রইল।

দূরে কয়েকটি ব্যাঙ ডাকছিল। ঝোপের মধ্যে পোকামাকড়ের শব্দ হচ্ছিল। পুকুরের জলে ছোট ঢেউ উঠছিল।

নীল ভাবল, আগে সে নীরবতাকে শুধু শান্ত পরিবেশ বলে মনে করত। এখন সে জানে, কখনও নীরবতা একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোনো পরিচিত শব্দ হঠাৎ কমে গেলে, কোনো গাছ শুকিয়ে গেলে, কোনো জলাশয়ের চেহারা বদলে গেলে—সেগুলোকে মন দিয়ে দেখা দরকার।

তবে প্রতিটি পরিবর্তনের অর্থ নিজে থেকে নির্ধারণ করা যায় না। জানতে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, অভিজ্ঞ মানুষের সাহায্য নিতে হয়।

বাড়ি ফেরার আগে সে খাতায় লিখল—

‘আজ ব্যাঙের ডাক শুনলাম। পুকুরের পাড় আগের চেয়ে পরিষ্কার। পর্যবেক্ষণ চলবে।’

খাতাটি বন্ধ করে নীল আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হলো, পৃথিবী প্রতিদিনই অসংখ্য গল্প বলে যায়। কেউ সেই গল্প শুনতে পায়, কেউ পায় না। কিন্তু যে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, তার কাছে নীরবতার মধ্যেও নতুন জ্ঞানের দরজা খুলে যায়।

আর সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বড় কোনো পদবি লাগে না। লাগে কৌতূহল, ধৈর্য এবং সত্যকে জানার আন্তরিক ইচ্ছা।

শিক্ষা: প্রকৃতিকে রক্ষা করার প্রথম ধাপ হলো মনোযোগ দিয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করা। পর্যবেক্ষণ, সঠিক তথ্য, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ছোট সমস্যাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা সম্ভব।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

শেষ বীজের আশ্চর্য বাগান।

১. ছোট্ট বাক্সের ভিতরে

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার একটি গ্রামে থাকত এগারো বছরের মেয়ে পিউ। তার বাবা বাজারে সবজি বিক্রি করতেন, আর মা বাড়ির উঠোনে শাকপাতা ও কয়েক রকমের ফুলের গাছ লাগাতেন। তাদের বাড়িটি ছিল ছোট, কিন্তু উঠোনের এক কোণে মায়ের যত্নে তৈরি বাগানটি ছিল পিউয়ের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

সেই বাগানে গাঁদা, জবা, তুলসী, লঙ্কা, বেগুন আর কয়েকটি টমেটোর গাছ ছিল। স্কুল থেকে ফিরে পিউ প্রথমেই বাগানে যেত। কখনও গাছে জল দিত, কখনও শুকনো পাতা সরাত, আবার কখনও নতুন কুঁড়ি দেখে মাকে ডেকে আনত।

একদিন পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে পিউ একটি ছোট টিনের বাক্স পেল। বাক্সটির গায়ে মরচে পড়েছিল। খুলতেই দেখা গেল, ভিতরে কয়েকটি কাগজের পুঁটলি। প্রতিটি পুঁটলিতে আলাদা আলাদা বীজ রাখা।

পিউ অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করল, —মা, এগুলো কীসের বীজ?

মা বাক্সটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—এগুলো তোর ঠাকুমার জমানো বীজ। উনি নিজের বাগানের গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে রেখে দিতেন। বলতেন, ভালো বীজ কখনও অবহেলায় ফেলে দিতে নেই।

পিউ একটির পর একটি পুঁটলি খুলে দেখতে লাগল। কোথাও গোল ছোট বীজ, কোথাও লম্বাটে, কোথাও আবার শুকনো ফলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বীজ।

একটি পুঁটলির ওপর বিবর্ণ কালিতে লেখা ছিল—‘দেশি ফুল’।

পিউ জিজ্ঞাসা করল, —এই বীজগুলো থেকে কি আবার গাছ হবে?

মা বললেন, —বীজ ভালো থাকলে, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অবশ্যই হতে পারে। তবে কোন বীজ কতটা ভালো আছে, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

সেদিন থেকেই পিউয়ের মাথায় নতুন চিন্তা ঢুকে গেল। এই বীজগুলো থেকে যদি আবার গাছ জন্মায়, তাহলে ঠাকুমার পুরোনো বাগানের কিছু স্মৃতি কি ফিরিয়ে আনা যাবে?

২. হারিয়ে যাওয়া গাছের গল্প

রাতে খাওয়ার পরে পিউ ঠাকুমার পাশে বসে বাক্সটির কথা তুলল। ঠাকুমা তখন অনেক বয়স্ক। ধীরে ধীরে কথা বলতেন, কিন্তু পুরোনো দিনের গল্প বলতে ভালোবাসতেন।

পিউ জানতে চাইল, —ঠাকুমা, তুমি এই বীজগুলো কোথা থেকে পেয়েছিলে?

ঠাকুমা বললেন, —কিছু নিজের গাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম। কিছু পেয়েছিলাম প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। তখন আমাদের পাড়ায় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ছোটখাটো বাগান ছিল। কেউ লাউ লাগাত, কেউ শিম, কেউ আবার নানা রঙের ফুল। এক বাড়ির গাছের বীজ অন্য বাড়িতে যেত। এভাবেই অনেক গাছ ছড়িয়ে পড়ত।

পিউ বলল, —এখন তো অনেক বাড়িতে আর বাগান নেই।

ঠাকুমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—জায়গা কমেছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। অনেকে বাজার থেকে চারা কিনে লাগায়। তাতে দোষ নেই। কিন্তু নিজের গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করার অভ্যাসটা কমে গেছে।

পিউ বাক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, —আমি কি এই বীজগুলো লাগিয়ে দেখতে পারি?

ঠাকুমা হাসলেন।

—অবশ্যই পারিস। তবে মনে রাখিস, সব বীজ থেকে গাছ হবে না। কোনো বীজ নষ্টও হতে পারে। গাছ জন্মালেও সব গাছ একই রকম হবে না। যত্ন নিতে হবে, আর ফলাফল দেখে শিখতে হবে।

পিউয়ের মনে হলো, সে যেন একটি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু এই গুপ্তধন সোনা বা রুপোর নয়। এর মূল্য লুকিয়ে রয়েছে ভবিষ্যতের সবুজ পাতায়।

৩. প্রথম চারা

পরদিন স্কুল থেকে ফিরে পিউ কাজ শুরু করল। বাড়ির উঠোনে কয়েকটি পুরোনো টব ছিল। মা সেগুলো পরিষ্কার করে দিলেন। পিউ মাটি তৈরি করল এবং ঠাকুমার নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকটি বীজ আলাদা পাত্রে লাগাল।

সে প্রতিটি পাত্রে ছোট কাগজের লেবেল লাগিয়ে দিল। কোন পাত্রে কোন বীজ আছে, কোথা থেকে পাওয়া গেছে, কবে লাগানো হয়েছে—সব লিখে রাখল।

কয়েক দিন কেটে গেল।

প্রতিদিন সকালে পিউ ছুটে এসে টবগুলোর দিকে তাকাত। প্রথম সপ্তাহে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। দ্বিতীয় সপ্তাহেও কয়েকটি পাত্রে মাটি একই রকম রইল।

একদিন পিউ মন খারাপ করে বলল, —মা, বীজগুলো বুঝি নষ্ট হয়ে গেছে!

মা বললেন, —হতে পারে। আবার কিছু বীজের অঙ্কুর বেরোতে বেশি সময়ও লাগতে পারে। মাটিতে অতিরিক্ত জল দিস না। একটু ধৈর্য ধর।

পিউ অপেক্ষা করতে লাগল।

এক সকালে সে দেখতে পেল, একটি টবের মাটি ফুঁড়ে ছোট্ট সবুজ অঙ্কুর মাথা তুলেছে।

তার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন উঠোনে নতুন অতিথি এসেছে।

—ঠাকুমা! দেখো! গাছ বেরিয়েছে!

ঠাকুমা ধীরে ধীরে এসে টবটির সামনে বসলেন। অঙ্কুরটির দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখে কোমল হাসি ফুটে উঠল।

—দেখলি, পুরোনো বীজের মধ্যেও নতুন জীবনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে।

সেই দিন পিউ তার খাতায় লিখল—‘প্রথম অঙ্কুর দেখা গেল।’

৪. একা বাগান নয়

পিউয়ের ছোট্ট পরীক্ষার কথা স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল। তার বন্ধু রিমি একদিন জিজ্ঞাসা করল, —তুই কি সত্যিই পুরোনো বীজ থেকে গাছ জন্মাচ্ছিস?

পিউ বলল, —কিছু বীজ থেকে অঙ্কুর বেরিয়েছে। কিছু এখনও বেরোয়নি।

রিমি বলল, —আমাদের বাড়িতেও ঠাকুমার রাখা কয়েকটি বীজ আছে। আমি নিয়ে আসব?

পিউয়ের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—অবশ্যই! তবে আগে জেনে নিতে হবে সেগুলো কীসের বীজ। আর সব বীজ একসঙ্গে না লাগিয়ে আলাদা করে পরীক্ষা করব।

কয়েক দিনের মধ্যে অয়ন, সোহম এবং আরও কয়েকজন বন্ধু তাদের বাড়ি থেকে বীজ নিয়ে এল। কারও কাছে শিমের বীজ, কারও কাছে লাউয়ের বীজ, কারও কাছে আবার পুরোনো ফুলের বীজ।

বীজের উৎস ও পরিচয় জানা থাকলে তা নথিভুক্ত করা হলো। যেগুলোর পরিচয় জানা গেল না, সেগুলোর নাম দেওয়া হলো ‘অজানা নমুনা’। তারা অনুমান করে কোনো বীজের নাম লিখল না।

স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষিকা মধুমিতাদেবী বিষয়টি শুনে তাদের উৎসাহ দিলেন।

তিনি বললেন, —তোমরা একটি ছোট বীজ-সংগ্রহ প্রকল্প শুরু করতে পারো। তবে বীজের পরিচয়, সংগ্রহের সময়, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং অঙ্কুরোদ্গমের ফলাফল লিখে রাখতে হবে।

পিউ জিজ্ঞাসা করল, —ম্যাডাম, আমরা কি স্কুলের এক কোণে বাগান করতে পারি?

শিক্ষিকা বললেন, —প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে, স্কুলের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে করা যেতে পারে।

এভাবেই একটি টিনের বাক্সের গল্প ধীরে ধীরে অনেকের কাজে পরিণত হতে শুরু করল।

৫. বাধার দিন

স্কুলের বাগান তৈরি করার অনুমতি পাওয়া গেল। স্কুলের পেছনে একটি ছোট জায়গা পরিষ্কার করা হলো। শিক্ষকেরা গাছ লাগানোর উপযোগী স্থান নির্বাচন করতে সাহায্য করলেন। কোথায় রোদ বেশি পড়ে, কোথায় জল জমে থাকে, কোথায় বেড়া দেওয়া দরকার—সব খুঁটিয়ে দেখা হলো।

শুরুতে কাজ ভালোই চলছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরে সমস্যা দেখা দিল।

কিছু চারা শুকিয়ে যেতে লাগল। কয়েকটি টবের মাটি অতিরিক্ত ভিজে থাকছিল। কিছু গাছের পাতায় পোকা দেখা গেল।

বন্ধুরা চিন্তিত হয়ে পড়ল।

সোহম বলল, —আমাদের বাগানটা বুঝি নষ্ট হয়ে যাবে।

পিউও হতাশ হলো। সে ভেবেছিল, বীজ লাগালেই সব গাছ সুন্দর হয়ে উঠবে। এখন বুঝতে পারছে, গাছ বাঁচিয়ে রাখার কাজ আরও কঠিন।

মধুমিতাদেবী এসে গাছগুলো দেখলেন।

তিনি বললেন, —প্রথমেই সব গাছের জন্য একই ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক নয়। কোথায় জল বেশি হচ্ছে, কোন গাছ কতটা রোদ পাচ্ছে, পাতায় কী ধরনের ক্ষতি দেখা যাচ্ছে—এসব আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ছাত্রছাত্রীরা আবার খাতা খুলল।

তারা লক্ষ্য করল, এক কোণে বৃষ্টির জল জমে থাকছে। কয়েকটি টব এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যেখানে পর্যাপ্ত আলো পৌঁছায় না। কিছু গাছে জল দেওয়ার সময়ও ঠিক রাখা হয়নি।

তারা জায়গার ব্যবস্থা বদলাল, জল নিষ্কাশনের দিকে নজর দিল এবং শিক্ষিকার পরামর্শ অনুযায়ী গাছের যত্ন নিতে শুরু করল।

সব চারা বাঁচল না। কয়েকটি গাছ হারিয়ে গেল।

পিউ মন খারাপ করলেও খাতায় সেই ফলাফলও লিখে রাখল।

ঠাকুমা বললেন, —যে গাছ বাঁচল না, তার কথাও লিখে রাখবি। শুধু সাফল্যের গল্প লিখলে শেখা সম্পূর্ণ হয় না।

৬. বীজ বিনিময়ের দিন

বাগান একটু বড় হওয়ার পরে পিউ একটি নতুন প্রস্তাব দিল। গ্রামের মানুষ নিজেদের বাড়ির গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে একে অন্যের সঙ্গে বিনিময় করতে পারেন।

প্রথমে অনেকে বিষয়টি নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখালেন না। কেউ বললেন, বীজ সংগ্রহ করার সময় কোথায়? কেউ বললেন, বাজার থেকে চারা কিনলেই তো হয়।

তবু পিউ হাল ছাড়ল না।

সে মধুমিতাদেবীর সাহায্যে স্কুলে একটি ‘বীজ পরিচয় ও বিনিময় দিবস’ আয়োজনের পরিকল্পনা করল। সেখানে বীজ নিয়ে আসা প্রত্যেককে যতটা সম্ভব তার পরিচয় এবং সংগ্রহের উৎস জানাতে বলা হলো।

অনুষ্ঠানের দিন স্কুলের উঠোনে ছোট ছোট টেবিল সাজানো হলো। কোথাও সবজির বীজ, কোথাও ফুলের বীজ, কোথাও আবার শুকনো ফলের মধ্যে রাখা বীজ প্রদর্শন করা হলো।

এক বৃদ্ধা নিজের বাড়ির বহু পুরোনো একটি ফুলগাছের বীজ নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, তাঁর মা সেই গাছ লাগাতেন। বহু বছর ধরে তিনি নিজের গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে রেখেছেন।

পিউ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, —আপনি এত বছর ধরে বীজগুলো সংরক্ষণ করেছেন?

বৃদ্ধা বললেন, —সব বীজ যে এখনও ভালো আছে, তা বলতে পারব না। তবে যত্ন করে রেখেছি। তোমরা চাইলে কিছু বীজ পরীক্ষা করে দেখতে পারো।

সেদিন অনেক মানুষ বীজ বিনিময় করলেন। কেউ নতুন বীজ পেলেন, কেউ নিজের বাগানের গল্প বললেন, কেউ আবার গাছের যত্নের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন।

পিউ বুঝল, বীজের মূল্য শুধু তার থেকে জন্মানো গাছের মধ্যে নেই। বীজের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জ্ঞানও জড়িয়ে থাকে।

৭. একটি বিশেষ গাছ

ঠাকুমার টিনের বাক্সে থাকা ‘দেশি ফুল’ লেখা পুঁটলিটির কয়েকটি বীজ থেকে অবশেষে একটি গাছ জন্মেছিল। গাছটি ধীরে ধীরে বড় হলো। তার পাতার আকৃতি অন্য গাছগুলোর থেকে আলাদা ছিল।

পিউ প্রতিদিন সেটির যত্ন নিত। তবে সে জানত না গাছটি ঠিক কোন প্রজাতির।

একদিন গাছে ছোট ছোট কুঁড়ি দেখা দিল। কয়েক দিন পরে ফুল ফুটল। ফুলগুলো ছিল হালকা বেগুনি রঙের, মাঝখানে সূক্ষ্ম হলুদ অংশ।

পিউ আনন্দে ঠাকুমাকে ডাকল।

ঠাকুমা ফুলটি দেখে বললেন, —এই রংটা আমার মনে আছে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির পেছনে এমন ফুল ফুটত। কিন্তু নামটা আর মনে করতে পারছি না।

পিউ ফুলটির ছবি তুলল এবং শিক্ষিকার সাহায্যে গাছটি শনাক্ত করার চেষ্টা করল। তারা বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল, পরিচিত মানুষের কাছেও জানতে চাইল। তবু নিশ্চিত পরিচয় পাওয়া গেল না।

মধুমিতাদেবী বললেন, —নাম না জানলে অনুমান করে লিখবে না। আপাতত ‘অশনাক্ত ফুলগাছ’ হিসেবে নথিভুক্ত করো। পরে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যেতে পারে।

পিউ কথাটি মেনে নিল।

ফুলটি ফুটে থাকার সময় স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রী সেটি দেখতে এল। কেউ ছবি আঁকল, কেউ গাছটির উচ্চতা মাপল, কেউ ফুল ফোটার তারিখ লিখে রাখল।

গাছটির পরিচয় তখনও অজানা ছিল, কিন্তু সেটি তাদের কৌতূহল আর অনুসন্ধানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল।

৮. গ্রামের বাগান

এক বছরের মধ্যে স্কুলের বাগানটি গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠল। শিশুরা সেখানে গাছের বৃদ্ধি দেখতে আসত। শিক্ষকরা বিজ্ঞান ও পরিবেশের পাঠ বোঝাতে বাগান ব্যবহার করতেন। গ্রামের কয়েকজন মানুষও নিজেদের বাড়িতে ছোট বাগান তৈরি করতে শুরু করলেন।

পিউয়ের বাবা প্রথমে এসব কাজকে শিশুদের শখ বলে মনে করতেন। কিন্তু একদিন তিনি দেখলেন, স্কুলের বাগান থেকে উৎপন্ন কিছু শাকসবজি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে স্কুলের রান্নাঘরে ব্যবহার করা হয়েছে। বাগানের যত্ন নিতে গিয়ে শিশুরা মাটি, জল, আলো এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখছে।

বাড়ি ফিরে তিনি মেয়েকে বললেন, —তোর এই বাগান শুধু ফুল দেখার জায়গা নয়। এখানে তোরা কত কিছু শিখছিস!

পিউ বলল, —হ্যাঁ বাবা। আমরা শিখেছি, বীজ লাগানোই শেষ কাজ নয়। গাছের প্রয়োজন বুঝতে হয়। আর যে বীজের পরিচয় জানি না, তার নাম বানিয়ে লেখা যায় না।

বাবা হাসলেন।

—তাহলে তুই শুধু গাছ লাগাতে শেখিসনি, সত্যি কথা বলার শিক্ষাও পেয়েছিস।

পিউ মাথা নাড়ল।

বাগানের পাশে একটি ছোট ফলকে লেখা হলো—

‘প্রতিটি বীজ একটি সম্ভাবনা। যত্ন, জ্ঞান ও ধৈর্য তাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়।’

৯. ঠাকুমার শেষ উপহার

শীতের এক সকালে ঠাকুমা পিউকে নিজের কাছে ডাকলেন। তাঁর হাতে ছিল আরেকটি ছোট কাপড়ের পুঁটলি।

—এটা তোর জন্য রেখেছি।

পিউ পুঁটলিটি খুলে দেখল, তার মধ্যে কয়েকটি বীজ।

—এগুলো কীসের?

ঠাকুমা বললেন, —এগুলো আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। নামটা মনে আছে—এক ধরনের শাক। তবে ঠিক কোন জাত, সেটা নিশ্চিত নই। তুই চাইলে এগুলোও পরীক্ষা করে দেখতে পারিস।

পিউ পুঁটলিটি হাতে নিয়ে বলল, —আমি যত্ন করে রাখব। কিন্তু সব বীজ যে অঙ্কুরিত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

ঠাকুমা হাসলেন।

—নিশ্চয়তা না থাকলেও চেষ্টা করা যায়। শুধু মনে রাখিস, বীজ বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কেবল পুরোনো জিনিস আঁকড়ে থাকা নয়। যা কাজে লাগে, যা থেকে শেখা যায়, তা পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

পিউ ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরল।

তার মনে হলো, এই ছোট্ট পুঁটলির মধ্যে শুধু বীজ নেই। রয়েছে পরিবারের ইতিহাস, ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস।

১০. নতুন ঋতুর অপেক্ষা

পরের বসন্তে স্কুলের বাগানে নতুন চারা লাগানো হলো। পুরোনো বীজ থেকে জন্মানো কিছু গাছ ফুল দিল, কিছু গাছে ফল ধরল, আবার কিছু বীজ আর অঙ্কুরিত হলো না।

পিউ সব ফলাফল নথিভুক্ত করল। কোন বীজ থেকে গাছ হলো, কোনটি হলো না, কোন গাছের জন্য কী ধরনের যত্ন দরকার—সব লেখা রইল খাতায়।

বাগানটি আর শুধু পিউয়ের প্রকল্প ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল গ্রামের শিশুদের শেখার জায়গা।

একদিন এক ছোট্ট ছাত্র এসে পিউকে বলল, —দিদি, আমি আমার বাড়িতেও বীজ লাগাব। আমার ঠাকুমার কাছেও অনেক পুরোনো বীজ আছে।

পিউ হেসে বলল, —লাগাবি, তবে আগে বীজগুলো কীসের তা জানার চেষ্টা করবি। আর গাছের যত্ন নিতে ভুলবি না।

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

সন্ধ্যায় পিউ বাগানের পাশে বসে ছিল। বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছিল। মাটির ওপর পড়ে থাকা একটি শুকনো ফুলের মধ্যে কয়েকটি বীজ দেখা যাচ্ছিল।

সে সেগুলো সাবধানে সংগ্রহ করল।

তার মনে হলো, জীবনের অনেক বড় কাজের শুরু হয় খুব ছোট কিছু দিয়ে। একটি বীজ, একটি প্রশ্ন, একটি যত্নশীল হাত—এসবের মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।

ঠাকুমার সেই পুরোনো টিনের বাক্সটি এখন আর একা আলমারিতে পড়ে নেই। তার বীজ থেকে জন্মেছে গাছ, গাছ থেকে এসেছে নতুন বীজ, আর সেই বীজের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে অনেক বাড়িতে।

পিউ জানত, সব বীজ বাঁচবে না, সব গাছ ফুল দেবে না। তবু সে বীজ সংগ্রহ করে যাবে, গাছ লাগাবে, আর যা শিখবে তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেবে।

কারণ তার কাছে বাগান মানে শুধু সবুজ পাতা আর রঙিন ফুল নয়। বাগান মানে ধৈর্য, দায়িত্ব, স্মৃতি এবং আগামী দিনের জন্য কিছু ভালো রেখে যাওয়ার চেষ্টা।

শিক্ষা: ছোট কোনো সম্পদকেও অবহেলা করা উচিত নয়। জ্ঞান, যত্ন ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ছোট বীজও ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে ছেলেটি প্রশ্ন করতে শিখেছিল।।

পলাশপুর গ্রামের স্কুলে অর্ণব নামে একটি ছেলে পড়ত। সে পড়াশোনায় খারাপ ছিল না, কিন্তু ক্লাসে কখনও প্রশ্ন করত না। শিক্ষক কোনও বিষয় বুঝিয়ে দিলে অন্যরা প্রশ্ন করত, নিজেদের সন্দেহ দূর করত। অর্ণব চুপচাপ খাতায় লিখে নিত, যদিও অনেক কিছুই তার কাছে পরিষ্কার হত না।

তার সহপাঠীরা ভাবত, অর্ণব খুব বুদ্ধিমান। কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্য রকম। সে ভয় পেত—প্রশ্ন করলে যদি সবাই হাসে! যদি শিক্ষক মনে করেন, সে কিছুই বোঝে না!

একদিন গণিতের ক্লাসে শিক্ষক সমীকরণ বোঝাচ্ছিলেন। অর্ণবের কিছুতেই হিসাবটা মিলছিল না। তবু সে হাত তুলল না। বাড়ি ফিরে বই খুলে বসে রইল, কিন্তু সমস্যার সমাধান করতে পারল না।

পরদিন খাতা জমা দিতে গিয়ে শিক্ষক তার ভুলগুলো দেখলেন।

“অর্ণব, তুমি কোথায় আটকে গিয়েছিলে?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

অর্ণব মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, বুঝতে পারিনি।”

“তাহলে ক্লাসে জিজ্ঞাসা করোনি কেন?”

ছেলেটি ইতস্তত করে বলল, “সবাই হাসবে ভেবেছিলাম।”

শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ব্ল্যাকবোর্ডে বড় করে লিখলেন—‘আমি জানি না’।

তিনি বললেন, “এই কথাটা বলতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বরং না জেনেও জানার ভান করাটা শেখার পথে বড় বাধা।”

ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা চুপ করে শুনছিল।

শিক্ষক আরও বললেন, “আজ থেকে এই ক্লাসে যে সবচেয়ে ভালো প্রশ্ন করবে, তাকে আমি পুরস্কার দেব। তবে প্রশ্নের উত্তর জানা থাকতেই হবে, এমন নয়। প্রশ্নটি হতে হবে সত্যিকারের কৌতূহল থেকে করা।”

ক্লাসে হাসির রোল উঠল। কেউ বলল, “তাহলে তো অনেক পুরস্কার পাব!”

কিন্তু অর্ণবের মনে কথাগুলো গভীরভাবে দাগ কাটল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে নিজের চারপাশের জিনিস নিয়ে ভাবতে শুরু করল। আকাশ নীল কেন? গাছের পাতা সবুজ কেন? বৃষ্টির আগে বাতাসের গন্ধ বদলে যায় কেন? সব প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল না। সে একটি খাতায় প্রশ্নগুলো লিখে রাখল।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে প্রথম প্রশ্নটি করল—“স্যার, আকাশ নীল দেখায় কেন?”

কয়েকজন সহপাঠী মুচকি হাসল। অর্ণবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিন্তু শিক্ষক হাসলেন না। তিনি সহজ ভাষায় আলো ও বায়ুমণ্ডলের কথা বোঝালেন।

অর্ণবের মনে হল, প্রশ্ন করার পর সে ছোট হয়ে যায়নি। বরং নতুন কিছু জানতে পেরেছে।

এরপর তার অভ্যাস বদলে গেল। কোনও বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে সে প্রশ্ন করত। বই পড়ার সময় নতুন শব্দ পেলে তার অর্থ খুঁজত। কখনও শিক্ষক উত্তর দিতেন, কখনও বলতেন, “এটা আমরা পরের ক্লাসে আলোচনা করব।” অর্ণব তখন নিজেই তথ্য খুঁজে দেখার চেষ্টা করত।

একদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ঘোষণা হল। ছাত্রছাত্রীদের এমন একটি প্রকল্প তৈরি করতে হবে, যা দৈনন্দিন জীবনের কোনও সমস্যা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

অর্ণব প্রথমে ভেবেছিল, সে পারবে না। কিন্তু তার প্রশ্নের খাতাটি খুলতেই একটি বিষয় চোখে পড়ল—গ্রামের স্কুলে গরমের দিনে পানীয় জল ঠান্ডা রাখার সহজ উপায় কী হতে পারে?

সে শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করল। তারপর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে মাটির পাত্র, ভেজা কাপড় ও বাতাসের সাহায্যে জল তুলনামূলক ঠান্ডা রাখার একটি ছোট পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করল। তারা বিভিন্ন সময়ে জলের তাপমাত্রা মেপে ফলাফল লিখে রাখল। সব পরীক্ষা সমান ফল দেয়নি, কিন্তু সেই ব্যর্থতাগুলো থেকেও তারা অনেক কিছু শিখল।

প্রদর্শনীর দিন বিচারকেরা তাদের প্রকল্প দেখে নানা প্রশ্ন করলেন। অর্ণব এবার ভয় পেল না। যে প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল, সে ব্যাখ্যা করল। আর যে উত্তর জানা ছিল না, সেখানে সোজাসুজি বলল, “এটা আমরা এখনও পরীক্ষা করে দেখিনি। ভবিষ্যতে চেষ্টা করব।”

বিচারকদের একজন হেসে বললেন, “নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারাও বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।”

অর্ণবদের প্রকল্প প্রথম পুরস্কার পায়নি। কিন্তু তারা বিশেষ প্রশংসা পেয়েছিল নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও সৎভাবে ফলাফল জানানোর জন্য।

বাড়ি ফিরে অর্ণব খাতার শেষ পাতায় লিখল—

‘প্রশ্ন করলে সব সময় উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন না করলে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার পথটাই বন্ধ হয়ে যায়।’

বহু বছর পরে অর্ণব যখন একজন বিজ্ঞানশিক্ষক হল, তখন তার শ্রেণিকক্ষে একটি নিয়ম ছিল—কোনও প্রশ্নকে হাসির বিষয় করা যাবে না। কারণ সে জানত, কখনও কখনও একটি ছোট প্রশ্নই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দরজা খুলে দেয়।

শিক্ষা: না জানার কথা স্বীকার করা দুর্বলতা নয়। কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তর খোঁজার ধৈর্যই প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

রাত বারোটার রান্নাঘর।।

কলকাতার এক ব্যস্ত হাসপাতালের পিছনের গলিতে ছোট্ট একটি খাবারের দোকান ছিল। দোকানটির নাম ‘রাতের হাঁড়ি’। দিনের বেলায় দোকানটি প্রায় বন্ধই থাকত, কিন্তু রাত দশটার পর তার আসল কাজ শুরু হত।

দোকানের মালিক ছিলেন পঞ্চান্ন বছরের শচীনবাবু। তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছেন অনেক দিন আগে। একমাত্র মেয়ে বিয়ের পর অন্য শহরে থাকে। তাই দোকানটাই ছিল তাঁর সংসার, আর রান্না ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ।

তবে শচীনবাবুর দোকানের একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর কেউ খাবার চাইলে তিনি তার কাছ থেকে টাকা নিতেন না।

প্রথম দিকে আশপাশের লোকজন ভেবেছিল, এটা হয়তো ব্যবসার প্রচারের কৌশল। কেউ কেউ ইচ্ছা করে রাত বারোটার পর এসে খাবার চাইত। কিন্তু শচীনবাবু কখনও কারও কাছে জানতে চাইতেন না, কেন সে এত রাতে এসেছে। চুপচাপ ভাত, ডাল আর তরকারি পরিবেশন করে দিতেন।

একদিন নতুন এক কর্মচারী, নাম বাবাই, দোকানে কাজে যোগ দিল। সে নিয়মটি শুনে অবাক হয়ে বলল, “কাকু, এভাবে বিনা পয়সায় খাবার দিলে আপনার লাভ হবে কী করে?”

শচীনবাবু হাঁড়ির ঢাকনা খুলতে খুলতে বললেন, “সব লাভ টাকার অঙ্কে মাপা যায় না রে।”

বাবাই কথাটা বুঝল না।

কয়েক দিন পর এক শীতের রাতে দোকানে এলেন এক মহিলা। তাঁর কোলে ছোট্ট শিশু। চোখেমুখে ক্লান্তি, কাপড়চোপড় এলোমেলো। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ইতস্তত করলেন।

শচীনবাবু তাঁকে বসতে বললেন।

মহিলা নিচু গলায় বললেন, “আমার কাছে টাকা নেই। বাচ্চাটা সারাদিন কিছু খায়নি। একটু ভাত পাওয়া যাবে?”

শচীনবাবু কোনও প্রশ্ন না করে খাবার গরম করতে শুরু করলেন। শিশুটির জন্য পাতলা খিচুড়ি বানিয়ে দিলেন, আর মহিলার সামনে রাখলেন গরম ভাত, ডাল ও আলুর তরকারি।

মহিলা খেতে খেতে কাঁদতে লাগলেন।

“কী হয়েছে?” বাবাই আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল।

মহিলা জানালেন, স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সঙ্গে টাকা ছিল না। পরিচিত কেউ কাছাকাছি থাকেন না। শিশুটিকে নিয়ে কোথায় যাবেন, বুঝতে পারছিলেন না।

শচীনবাবু তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “খাওয়া শেষ করুন। তারপর আমরা এমন একটা ব্যবস্থা করব, যাতে আজ রাতে আপনারা নিরাপদে থাকতে পারেন।”

তিনি কাছের একটি মহিলা সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কর্মীরা এসে মহিলাকে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে মহিলা বারবার কৃতজ্ঞতা জানাতে চাইলেন, কিন্তু শচীনবাবু শুধু বললেন, “আগে নিজের আর বাচ্চার যত্ন নিন।”

সেই রাতে বাবাই প্রথম বুঝল, রাত বারোটার রান্নাঘর শুধু খাবারের দোকান নয়।

তবু তার কৌতূহল কাটল না। একদিন সে শচীনবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি এই নিয়ম শুরু করলেন কেন?”

শচীনবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর পুরোনো একটি ছবি বের করলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ মানুষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে বসে আছেন আরেকজন, যাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ।

“ও আমার ছোট ভাই,” শচীনবাবু বললেন। “বহু বছর আগে ওর বড় একটা অস্ত্রোপচার হয়েছিল। আমি তখন কাজের খোঁজে অন্য শহরে। খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম, কিন্তু কয়েক রাত প্রায় কিছু না খেয়ে কাটাতে হয়েছিল। পকেটে টাকা ছিল না, বাড়ির লোকের কাছেও খবর পাঠাতে পারিনি। এক রাতে হাসপাতালের বাইরে এক অচেনা মানুষ আমাকে ভাত খাইয়েছিলেন। টাকা দিতে পারিনি বলে তিনি বলেছিলেন, ‘যেদিন পারবে, অন্য কাউকে খাইয়ো।’”

শচীনবাবু ছবিটা আবার ভাঁজ করলেন।

“সেই মানুষটির নামটাও আমি জানতে পারিনি। কিন্তু তাঁর দেওয়া খাবার আর কথাটা ভুলিনি। তাই দোকান খুলে ঠিক করেছিলাম, রাত বারোটার পর যে সত্যিই ক্ষুধার্ত অবস্থায় আসবে, তাকে খালি হাতে ফেরাব না।”

বাবাই ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

এরপর থেকে সে নিজেও রাতের রান্নাঘরের নিয়ম মেনে চলতে শুরু করল। কখনও খাবার প্যাকেট করত, কখনও পরিষ্কার থালা এগিয়ে দিত, কখনও ক্লান্ত মানুষটির পাশে বসে দুটো কথা বলত।

কয়েক মাস পরে দোকানের সামনে একটি ছোট বোর্ড লাগানো হল—

‘রাত বারোটার পর ক্ষুধার্ত হলে দরজায় কড়া নাড়ুন। সামর্থ্য থাকলে মূল্য দিন, না থাকলে নিশ্চিন্তে খেয়ে যান।’

বোর্ডটি দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়াতেন। কেউ চাল দিয়ে যেতেন, কেউ সবজি, কেউ সামান্য টাকা। শচীনবাবু কাউকে সাহায্য করতে বাধ্য করতেন না। শুধু বলতেন, “যতটুকু পারেন, ততটুকুই যথেষ্ট।”

এক বছর পর শচীনবাবুর শরীর খারাপ হল। চিকিৎসক তাঁকে বিশ্রাম নিতে বললেন। দোকান বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে বাবাই চিন্তায় পড়ল।

কিন্তু আশ্চর্যভাবে, আশপাশের কয়েকজন দোকানি এগিয়ে এলেন। কেউ রান্না করতে জানতেন, কেউ বাজার করতে, কেউ হিসাব রাখতে। তাঁরা মিলে ‘রাতের হাঁড়ি’ চালু রাখলেন।

শচীনবাবু এক সন্ধ্যায় দোকানের বাইরে বসে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁর চোখে জল এসে গেল।

তিনি বুঝলেন, বহু বছর আগে এক অচেনা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এক থালা ভাতের যাত্রা এখনও থামেনি।

কখনও কখনও পৃথিবীকে বদলাতে বড় কোনও ঘোষণা লাগে না। লাগে শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে একটি গরম থালা এগিয়ে দেওয়ার মতো ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত।

শিক্ষা: সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়ালে একটি ছোট ভালো কাজও বহু মানুষের জীবনে আশার আলো ছড়িয়ে দিতে পারে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে বাড়িতে কেউ মিথ্যে বলত না।

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি অদ্ভুত বাড়ি। বাড়িটির মালিক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অমিয় সেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একাই থাকতেন। বাড়িটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার দরজা সব সময় পরিচিত মানুষদের জন্য খোলা থাকত।

অমিয়বাবুর একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। কেউ তাঁর বাড়িতে এলে তাঁকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হত—“আজ তুমি কি কোনও মিথ্যে কথা বলেছ?”

প্রশ্নটি শুনে অনেকেই অস্বস্তিতে পড়তেন। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন, কেউ বলতেন, “এত ছোটখাটো মিথ্যে আবার মনে রাখে কে?”

অমিয়বাবু শান্তভাবে উত্তর দিতেন, “মিথ্যে ছোট না বড়, সেটা পরে বিচার করা যাবে। আগে স্বীকার করতে শেখো।”

একদিন তাঁর বাড়িতে এলেন পাশের পাড়ার কলেজপড়ুয়া সৌরভ। সে খুব আত্মবিশ্বাসী ছেলে। বন্ধুদের মধ্যে তার পরিচয় ছিল—সে কখনও হার মানে না, কখনও ভুল স্বীকার করে না।

অমিয়বাবুর প্রশ্ন শুনে সে হেসে বলল, “না, আমি মিথ্যে বলি না।”

বৃদ্ধ কিছু বললেন না। শুধু তাকে বসতে দিলেন।

চা খেতে খেতে সৌরভ জানতে পারল, অমিয়বাবু একসময় কলেজে দর্শন পড়াতেন। অবসরের পর তিনি তরুণদের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসেন, বিশেষ করে যারা নিজেদের জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় থাকে।

সৌরভ সেদিন নিজের সাফল্যের গল্প করল। কলেজে সে ভালো ফল করেছে, বিতর্কে পুরস্কার পেয়েছে, বন্ধুমহলে সবাই তাকে সম্মান করে।

অমিয়বাবু মন দিয়ে শুনলেন। তারপর শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি কখনও কাউকে নিজের ভুলের জন্য দোষী করেছ?”

সৌরভ একটু থেমে বলল, “সবাই তো করে।”

“আমি সবার কথা জিজ্ঞাসা করিনি,” বৃদ্ধ বললেন। “তোমার কথা জানতে চেয়েছি।”

সৌরভের মুখটা শক্ত হয়ে গেল। সে প্রসঙ্গ বদলে বাড়ি থেকে চলে এল।

কয়েক দিন পর কলেজে একটি সমস্যা দেখা দিল। একটি দলগত প্রকল্পে সৌরভের দায়িত্ব ছিল তথ্য সংগ্রহ করা। সে কাজটি ঠিকমতো করেনি। জমা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসতেই সে দলের অন্য সদস্যদের বলেছিল, তথ্যগুলো সম্পূর্ণ। কিন্তু শিক্ষক কাজ পরীক্ষা করতে গিয়ে ভুল ধরলেন। পুরো দল নম্বর হারানোর আশঙ্কায় পড়ল।

বন্ধু অনির্বাণ রেগে বলল, “তুই আগে সত্যিটা বললে আমরা অন্য ব্যবস্থা করতে পারতাম। এখন সবাই বিপদে পড়েছি।”

সৌরভ প্রথমে বলতে চাইল, অন্যদেরও দোষ আছে। কিন্তু কথাটা মুখে আসতেই তার মনে পড়ল অমিয়বাবুর প্রশ্ন।

সেদিন রাতে সে দীর্ঘক্ষণ নিজের ঘরে বসে রইল। অবশেষে দলের সবাইকে ফোন করে স্বীকার করল, কাজটি সে ঠিকমতো করেনি এবং মিথ্যে বলে ভুল ঢাকতে চেয়েছিল।

বন্ধুরা প্রথমে রেগে গেলেও পরে একসঙ্গে বসে কাজটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নিল। তারা শিক্ষককে সত্যিটা জানাল। নম্বর কিছু কম পেল, কিন্তু প্রকল্পটি জমা দিতে পারল।

পরদিন সৌরভ আবার অমিয়বাবুর বাড়িতে গেল।

“স্যার, আমি মিথ্যে বলেছিলাম,” সে বলল। “ভেবেছিলাম, ভুল স্বীকার করলে সবাই আমাকে ছোট ভাববে। কিন্তু লুকোতে গিয়ে আরও বড় সমস্যা তৈরি করেছি।”

অমিয়বাবু চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, “ভুল করা মানুষের স্বভাব। কিন্তু ভুলকে আড়াল করতে গিয়ে আমরা নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যাই।”

সৌরভ জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কি সব সময় সব কথা সবাইকে বলে দিতে হবে?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। “সততা মানে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সব কথা সবাইকে জানানো নয়। সততা মানে যেখানে তোমার কথা বা কাজের দায়িত্ব আছে, সেখানে ইচ্ছা করে কাউকে ভুল পথে চালিত না করা। আর ভুল হলে তা শুধরে নেওয়ার সাহস রাখা।”

সৌরভ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

বাড়ি ফেরার সময় অমিয়বাবু তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। দরজার পাশে ছোট একটি কাঠের ফলকে লেখা ছিল—

‘সত্য কথা বলার সাহসের চেয়েও বড় সাহস হলো, নিজের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো।’

সৌরভ সেই বাক্যটি পড়ে থামল। তার মনে হল, এত দিন সে অন্যদের কাছে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চেয়েছে, অথচ নিজের দুর্বলতাগুলোকে চিনতেই চায়নি।

এরপর থেকে সে কখনও ভুল করেনি, এমন নয়। কিন্তু ভুল হলে অজুহাত দেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করত—সে কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করছে, নাকি শুধু নিজের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করছে?

বছর কয়েক পরে সৌরভ একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করল। সেখানে একদিন তার অধীনে কাজ করা নতুন কর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব ভুল করে ফেলল। ভয়ে ছেলেটি বিষয়টি লুকোতে চাইছিল।

সৌরভ তাকে বকাঝকা না করে বলল, “ভুলটা এখনই জানালে আমরা ঠিক করার সুযোগ পাব। কিন্তু লুকিয়ে রাখলে সমস্যা বাড়বে। সত্যি বলার জন্য তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে না; বরং আমরা একসঙ্গে সমাধান খুঁজব।”

ছেলেটির মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।

সৌরভ সেদিন বুঝল, অমিয়বাবুর বাড়িতে শেখা শিক্ষাটি শুধু নিজের জীবনের জন্য নয়। অন্যদেরও এমন পরিবেশ দেওয়া জরুরি, যেখানে মানুষ ভুল স্বীকার করতে ভয় পায় না।

শিক্ষা: সততা মানে কখনও ভুল না করা নয়; নিজের ভুল স্বীকার করে তার দায় নেওয়া এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করাই প্রকৃত সততা।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ টিকিটের রহস্য।

শহরের পুরোনো নাট্যমঞ্চটির নাম ছিল ‘রঙ্গমহল’। একসময় সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাটক হত। দর্শকদের ভিড়ে সামনের রাস্তা পর্যন্ত জমজমাট হয়ে থাকত। কিন্তু সময় বদলেছে। সিনেমা হল, টেলিভিশন আর মোবাইলের যুগে নাট্যমঞ্চের জনপ্রিয়তা কমতে কমতে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

রঙ্গমহলের টিকিটঘরে কাজ করতেন প্রভাসবাবু। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি দর্শকদের হাতে টিকিট তুলে দিয়েছেন। তাঁর কাছে প্রতিটি টিকিট ছিল একটি গল্পের প্রবেশপত্র। কেউ প্রথমবার নাটক দেখতে আসত, কেউ পরিবার নিয়ে, আবার কেউ প্রিয় অভিনেতার অভিনয় দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াত।

কিন্তু সেদিন সকালে নাট্যমঞ্চের মালিক এসে জানালেন, আর্থিক ক্ষতির কারণে আগামী রবিবারের পর রঙ্গমহল চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

খবরটি শুনে প্রভাসবাবু চুপ করে রইলেন। এত বছর ধরে যে জায়গাটিকে নিজের জীবনের অংশ বলে মনে করেছেন, সেটি আর থাকবে না—এই কথা মেনে নিতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।

পরদিন থেকে তিনি লক্ষ করলেন, টিকিটের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। পুরোনো দর্শকেরা খবর পেয়ে শেষবারের মতো নাটক দেখতে আসতে চাইছেন। ফোনে, কাউন্টারে, এমনকি চিঠি পাঠিয়েও অনেকে টিকিট চাইছেন।

শেষ দিনের জন্য নির্ধারিত নাটকটির নাম ছিল ‘ফিরে দেখা’। বহু বছর আগে এই নাটকেই অভিনয় করে বিখ্যাত হয়েছিলেন অভিনেতা অমরেশ সেন। বর্তমানে তিনি অসুস্থতার কারণে অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।

রবিবারের শোয়ের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। শুধু একটি টিকিট বাকি রইল। সেটি ছিল প্রথম সারির মাঝখানের আসনের।

প্রভাসবাবু টিকিটটি কাউন্টারের কাচের নিচে রেখে দিলেন। কেন জানি না, তাঁর মনে হচ্ছিল, টিকিটটি কোনও বিশেষ মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।

শনিবার বিকেলে এক কিশোর কাউন্টারে এল। তার নাম ঈশান। পরনে সাধারণ জামাকাপড়, হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।

সে জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, কালকের নাটকের একটা টিকিট হবে?”

প্রভাসবাবু বললেন, “সব বিক্রি হয়ে গেছে। শুধু একটি আছে। কিন্তু সেটি প্রথম সারির। দামও একটু বেশি।”

ঈশান ব্যাগ থেকে কয়েকটি নোট ও কয়েন বের করল। সব মিলিয়ে টিকিটের দামের চেয়ে কম।

“আর কিছু টাকা নেই কাকু,” সে বলল। “আমি অনেক দিন ধরে এই নাটকটা দেখতে চাইছি।”

প্রভাসবাবু তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত আগ্রহ কেন?”

ঈশান একটু ইতস্তত করে বলল, “আমার দাদু আগে নাটক করতেন। তিনি বলতেন, রঙ্গমহলের মঞ্চে একদিন অভিনয় করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সংসারের দায়িত্বে আর হয়ে ওঠেনি। দাদু এখন আর ভালো দেখতে পান না। তবু এই নাট্যমঞ্চের গল্প আমাকে প্রায়ই শোনান। কাল আমি নাটকটা দেখে তাঁকে সব বলব।”

প্রভাসবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর টিকিটটি তুলে ঈশানের হাতে দিয়ে বললেন, “টাকাটা থাক। টিকিটটি তোমার।”

ঈশান অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু কাকু, আপনি কি নিজের পকেট থেকে টাকা দেবেন?”

“না,” প্রভাসবাবু হেসে বললেন, “আজ এই টিকিটের দাম আমি অন্যভাবে পেলাম।”

রবিবার সন্ধ্যায় নাট্যমঞ্চ দর্শকে পূর্ণ হয়ে গেল। মঞ্চে আলো জ্বলল, পর্দা উঠল, অভিনেতারা অভিনয় শুরু করলেন। দর্শকদের মধ্যে ঈশানও বসেছিল। নাটকের প্রতিটি দৃশ্য সে মন দিয়ে দেখছিল।

শেষ দৃশ্যে নায়ক দীর্ঘদিন পর নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। মঞ্চের সংলাপ শুনে ঈশানের চোখ ভিজে উঠল। সে যেন নিজের দাদুর না-পাওয়া স্বপ্নের কথা ভাবছিল।

নাটক শেষ হলে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। অনেকের চোখে জল। অভিনেতারা মঞ্চে এসে শেষবারের মতো দর্শকদের অভিবাদন জানালেন।

পর্দা নামার পর ঈশান টিকিটঘরের কাছে ফিরে এল। তার হাতে সেই টিকিটটি।

সে বলল, “কাকু, দাদুর জন্য নাটকের কিছু সংলাপ লিখে নিয়েছি। বাড়ি গিয়ে তাঁকে পড়ে শোনাব। আজ বুঝলাম, একটা গল্প শুধু মঞ্চে শেষ হয় না।”

প্রভাসবাবু টিকিটটি হাতে নিলেন। তার পেছনে ঈশান নিজের হাতে লিখেছে—‘স্বপ্ন দেখার জন্য কোনও মঞ্চই ছোট নয়।’

প্রভাসবাবু টিকিটটি যত্ন করে নিজের ডায়েরিতে রেখে দিলেন।

পরদিন রঙ্গমহলের দরজায় তালা পড়ল। নামিয়ে ফেলা হল পুরোনো সাইনবোর্ড। টিকিটঘরের জানালাও বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু প্রভাসবাবুর ডায়েরিতে রয়ে গেল সেই শেষ টিকিটটি। তিনি জানতেন, একদিন হয়তো কেউ আর রঙ্গমহলের কথা মনে রাখবে না। তবু একটি কিশোরের মনে নাটকের প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছে, সেটি অন্য কোনও মঞ্চে, অন্য কোনও গল্পে আবার আলো জ্বালাতে পারে।

বহু বছর পর ঈশান নিজেই একটি ছোট নাট্যদল গড়ে তুলেছিল। তাদের প্রথম নাটকের নাম ছিল ‘শেষ টিকিট’। মঞ্চের এক কোণে সে একটি পুরোনো টিকিট বাঁধিয়ে রেখেছিল—রঙ্গমহলের স্মৃতিতে।

দর্শকদের কেউ জানতেন না, সেই টিকিটের পেছনে লেখা কয়েকটি শব্দ একদিন এক কিশোরের স্বপ্নকে নতুন পথ দেখিয়েছিল।

শিক্ষা: কোনও স্বপ্নের মূল্য শুধু তার সফলতায় নয়, অন্যের মনে সেই স্বপ্নের আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা।।

শান্তিপুরের একটি স্কুলে প্রতি বছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। দৌড়, লং জাম্প, অঙ্কের কুইজ, গান—সব বিভাগেই ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিত। যারা প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হত, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হত পুরস্কার।

কিন্তু এবছর প্রধান শিক্ষক অরুণবাবু ঘোষণা করলেন, স্কুলে একটি নতুন প্রতিযোগিতা হবে। নাম—‘সবচেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতা’।

ঘোষণাটি শুনে ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে গেল।

সপ্তম শ্রেণির রুদ্র বন্ধুদের বলল, “ভালো মানুষ হওয়ার আবার প্রতিযোগিতা হয় নাকি? কে কত ভালো, সেটা মাপবে কী দিয়ে?”

তার বন্ধু সায়ন হেসে বলল, “হয়তো যে সবচেয়ে বেশি ভালো কথা বলতে পারবে, সে জিতবে!”

ক্লাসের সবাই হেসে উঠল।

পরদিন অরুণবাবু প্রতিযোগিতার নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন। আগামী সাত দিন ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিনের আচরণ, দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের চেষ্টা লক্ষ করা হবে। কোনও নির্দিষ্ট নম্বরের তালিকা থাকবে না। শিক্ষকেরা বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবেন, তবে কাউকে কোনও ভালো কাজ করতে বাধ্য করা হবে না।

রুদ্র প্রতিযোগিতাটিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নিল। সে ঠিক করল, যেভাবেই হোক তাকে জিততেই হবে।

প্রথম দিন সে শ্রেণিকক্ষের মেঝে থেকে একটি কাগজ তুলে ডাস্টবিনে ফেলল। তারপর পাশের বন্ধুকে বলল, “দেখেছিস? আমি কত ভালো কাজ করলাম!”

দ্বিতীয় দিন সে একজন সহপাঠীকে পেনসিল ধার দিল। কিন্তু ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই তিনবার তাকে মনে করিয়ে দিল, যেন শিক্ষককে বিষয়টি জানায়।

তৃতীয় দিন সে লাইনে দাঁড়িয়ে এক ছোট ছাত্রকে আগে যেতে দিল। তারপর বন্ধুদের কাছে গিয়ে বলল, “এমন সুযোগ পেলে তোমরাও কিন্তু আমাকে ভোট দেবে!”

তার বন্ধুরা হাসলেও রুদ্র বুঝতে পারল না, কেন তারা তার প্রশংসা করছে না।

অন্যদিকে একই ক্লাসের মেঘলা কোনও প্রতিযোগিতার কথা বিশেষ ভাবছিল না। একদিন সে দেখল, নতুন ছাত্র রাহুল বাংলা পড়তে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে। মেঘলা নিজের কাজ শেষ করে তাকে পড়াটা বুঝিয়ে দিল।

আরেক দিন স্কুলের এক কর্মচারীর হাত থেকে কিছু কাগজ মাটিতে পড়ে গেলে সে সেগুলো কুড়িয়ে দিল। কেউ দেখেছে কি না, সে দিকে তার কোনও খেয়াল ছিল না।

সপ্তম দিনের সকালে রুদ্র স্কুলে এসে দেখল, তার প্রিয় ফুটবলটি শ্রেণিকক্ষের জানালার পাশে পড়ে আছে। আগের দিন সে বলটি সেখানে রেখেছিল। হঠাৎ তার মনে হল, প্রতিযোগিতায় ভালো নম্বর পেতে হলে আজও কিছু একটা করতে হবে।

সে বলটি হাতে নিয়ে মাঠে যাওয়ার সময় দেখল, স্কুলের ছোট্ট বাগানের পাশে একটি টব উল্টে পড়ে আছে। গাছটি মাটি থেকে প্রায় উপড়ে এসেছে। রুদ্র চারদিকে তাকাল। কেউ নেই।

প্রথমে সে ভাবল, গাছটি ঠিক করে দিলে হয়তো শিক্ষকরা দেখতে পাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল, প্রতিযোগিতা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এত সময় নষ্ট করলে ফুটবল খেলতে পারবে না।

সে এগিয়ে গেল মাঠের দিকে।

কিছুদূর যাওয়ার পর তার চোখে পড়ল মেঘলা। সে হাঁটু গেড়ে বসে টবের গাছটিকে আবার মাটিতে বসাচ্ছে। তার স্কুলের পোশাকে মাটি লেগে গেছে। মেঘলা খুব সাবধানে গাছটির চারপাশে মাটি চেপে দিচ্ছিল, যাতে শিকড়গুলো ঠিকমতো বসে যায়।

রুদ্র জিজ্ঞাসা করল, “তুই এখানে কী করছিস? প্রতিযোগিতা তো আজ শেষ!”

মেঘলা মাথা না তুলে বলল, “গাছটা পড়ে ছিল। এভাবে থাকলে শুকিয়ে যাবে।”

“কিন্তু শিক্ষকরা তো দেখছেন না!”

মেঘলা এবার তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “গাছটাকে বাঁচানোর জন্য শিক্ষককে দেখানোর দরকার কী?”

কথাটা রুদ্রকে থামিয়ে দিল।

সে নিজের ফুটবলটি পাশে রেখে মেঘলাকে সাহায্য করতে বসে পড়ল। দুজনে মিলে টবটি সোজা করল, মাটি ভরল এবং জল দিল। কাজ শেষ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। মাঠে পৌঁছে রুদ্র দেখল, তার বন্ধুরা খেলা শুরু করে দিয়েছে।

সেদিন বিকেলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অরুণবাবু মঞ্চে উঠলেন। তিনি জানালেন, এই প্রতিযোগিতায় কোনও প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নেই। বরং স্কুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে নিজের আচরণ সম্পর্কে ভাবার জন্য একটি করে ডায়েরি দেওয়া হবে।

রুদ্র একটু হতাশ হল। সে ভেবেছিল, অন্তত একটি পুরস্কার পাবে।

অনুষ্ঠান শেষে অরুণবাবু তাকে কাছে ডাকলেন।

“রুদ্র, তুমি কি জানো, এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী ছিল?”

রুদ্র মাথা নাড়ল।

শিক্ষক বললেন, “ভালো কাজের জন্য প্রশংসা পাওয়া আনন্দের। কিন্তু প্রশংসা পাওয়ার আশায় ভালো কাজ করলে নিজের উদ্দেশ্যটাই ছোট হয়ে যায়। আসল পরিবর্তন তখনই আসে, যখন কেউ না দেখলেও আমরা ঠিক কাজটি করি।”

রুদ্র চুপ করে রইল। তার মনে পড়ল, মেঘলার সঙ্গে গাছটি ঠিক করার সময় কোনও পুরস্কারের কথা তার মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছিল, গাছটিকে বাঁচানো দরকার।

বাড়ি ফেরার পথে সে সিদ্ধান্ত নিল, পরের দিন থেকে নিজের কাজের হিসাব অন্যদের কাছে দেওয়ার বদলে প্রতিদিন রাতে ডায়েরিতে লিখবে—কোথায় সে ভালো করেছে, কোথায় ভুল করেছে এবং পরদিন কীভাবে নিজেকে একটু ভালো করতে পারে।

কয়েক মাস পর রুদ্রের আচরণে সত্যিই পরিবর্তন এল। সে আগের মতোই খেলত, হাসত, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করত। কিন্তু ভালো কাজ করার পর আর কারও কাছে তার হিসাব দিত না।

স্কুলের বাগানে সেই টবের গাছটিও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল।

একদিন তার প্রথম ফুলটি ফুটলে রুদ্র আর মেঘলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফুলটির দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ ছবি তুলল না, কেউ পুরস্কার দিল না।

তবু দুজনের মনেই সেদিন এক অদ্ভুত আনন্দ জন্মেছিল।

শিক্ষা: ভালো মানুষ হওয়া কোনও প্রতিযোগিতা নয়। অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার জন্য ভালো কাজ করাই প্রকৃত মানবিকতা।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার ওপারে (তৃতীয় পর্ব : যে সত্যকে মুছে ফেলা যায় না)।

শেষ পর্ব

কাচের ঘরের ভিতরে দুটি শিশু একসঙ্গে চোখ খুলেছে।

নীলাঞ্জনা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, এতক্ষণ যা কিছু দেখেছে, তার কোনওটাই সত্যি নয়। আবার সবকিছুই যেন তার জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে।

দুটি শিশুর মুখ অবিকল এক।

তাদের চোখের মণি গাঢ় নীল।

কাচের ঘরের দেয়ালে লাল আলো জ্বলছে। যন্ত্রের ভিতর থেকে একটানা শব্দ আসছে। আর সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বারবার ঘোষণা করছে—

‘বিষয়বস্তু নং ২৭, জেগে উঠুন।’

নীলাঞ্জনা পিছনে ফিরে ইরার দিকে তাকাল।

‘এগুলো কী?’

ইরা পিস্তলটা নামিয়ে বলল, ‘আমি জানি না। কিন্তু এই ঘরটার খোঁজ আমি ছোটবেলা থেকে করছি।’

‘তুমি কী করে জানতে?’

‘কারণ আমাকে যখন এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমার বয়স ছয় মাস। আমার মনে থাকার কথা নয়। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি আমার কাছে ফিরে এসেছে। একটি অন্ধকার ঘর, কাচের দেওয়াল, আর দুটো শিশুর কান্না।’

অদ্বৈত রায় সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখে আর সেই আত্মবিশ্বাস নেই।

তিনি বললেন, ‘তোমরা যা দেখছ, তার ভুল ব্যাখ্যা কোরো না। এই ঘরটি একটি পরীক্ষাগার ছিল।’

নীলাঞ্জনা ঘুরে দাঁড়াল।

‘কীসের পরীক্ষাগার?’

অদ্বৈত উত্তর দিলেন না।

সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চলত এখানে। মানুষ কীভাবে নিজের অতীত ভুলে যায়, কীভাবে অন্যের বলা কথা নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে—সেসব নিয়ে গবেষণা করা হত।’

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘আমাদের ওপর?’

‘হ্যাঁ,’ সুচরিতা বললেন। ‘তোমাদের জন্মের পর তোমাদের বাবা অরুণাভ জানতে পেরেছিলেন, এই প্রকল্পে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি তোমাদের দুজনকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।’

ইরা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে আমাদের স্মৃতিগুলো মিথ্যে?’

‘সব নয়,’ মা বললেন। ‘কিছু সত্যি, কিছু অন্যের তৈরি করে দেওয়া। কোনটা কোনটি, তা বোঝা খুব কঠিন।’

নীলাঞ্জনা কাচের ভিতরে শুয়ে থাকা শিশু দুটির দিকে তাকাল।

‘তাহলে ওরা কারা?’

অদ্বৈত ধীরে ধীরে বললেন, ‘ওরা এই প্রকল্পের শেষ দুটি নমুনা।’

‘নমুনা?’ নীলাঞ্জনার গলা কেঁপে উঠল। ‘ওরা শিশু!’

‘আমি জানি।’

‘না, আপনি জানেন না!’ নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল। ‘আপনি এত বছর ধরে কী করেছেন? আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করেছেন, আমাদের পরিচয় কেড়ে নিয়েছেন, আর এখন বলছেন আপনি জানেন?’

অদ্বৈত মাথা নীচু করলেন।

‘আমি অপরাধ করেছি। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত আমার ছিল না।’

‘তাহলে সিদ্ধান্ত কে নিত?’

অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ঋত্বিক চৌধুরী।’

নামটা শুনে নীলাঞ্জনার শরীর শক্ত হয়ে গেল।

তার অফিসের মালিক। যে মানুষটি তাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। যিনি তার সাংবাদিকতার প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। যিনি মায়ের মৃত্যুর পর তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সেই মানুষই কি এত বড় ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে?

ঠিক তখনই উপরতলা থেকে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একজন পুরুষের গলা ভেসে এল—

‘অদ্বৈত, আর কতক্ষণ লাগবে?’

নীলাঞ্জনা মুখ তুলে তাকাল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন ঋত্বিক চৌধুরী।

পরনে কালো কোট, হাতে একটি চামড়ার ব্যাগ। তাঁর মুখে কোনও বিস্ময় নেই। যেন তিনি জানতেন, নীলাঞ্জনা ঠিক এখানেই থাকবে।

‘বাবা?’ শব্দটা নীলাঞ্জনার মুখ থেকে অনিচ্ছায় বেরিয়ে এল।

ঋত্বিক হাসলেন।

‘এত বছর পর এই সম্বোধন শুনতে ভালো লাগছে।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আপনি আমার বাবা নন।’

‘রক্তের সম্পর্কই কি সব?’

‘আপনি আমার মায়ের সঙ্গে কী করেছেন?’

ঋত্বিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘তোমার মা এমন কিছু সত্য জেনে ফেলেছিলেন, যা তাঁর জানা উচিত ছিল না।’

‘আপনি তাঁকে বন্দি করে রেখেছিলেন?’

‘আমি তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’

সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যে! তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখোনি। তুমি আমাকে আমার সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা করেছিলে!’

ঋত্বিক মায়ের দিকে তাকালেন।

‘তুমি যদি চুপ থাকতে, তাহলে কিছুই হত না।’

‘আমার সন্তানদের নিয়ে পরীক্ষা চালানোর অনুমতি আমি তোমাকে দিইনি!’

‘পরীক্ষা?’ ঋত্বিক মৃদু হাসলেন। ‘তুমি এখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারোনি, সুচরিতা। আমরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলাম, যার সাহায্যে মানুষের স্মৃতি থেকে যন্ত্রণা মুছে ফেলা সম্ভব। যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অত্যাচার—মানুষের মস্তিষ্কে জমে থাকা ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মুছে ফেলা গেলে পৃথিবীটা আরও ভালো হত।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘তাহলে শিশুদের কেন ব্যবহার করেছিলেন?’

ঋত্বিকের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

‘কারণ শিশুদের মস্তিষ্কে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করলে ফল পাওয়া সহজ। কিন্তু তোমাদের মা বাধা দিয়েছিলেন। তোমার বাবা অরুণাভও বাধা দিয়েছিলেন। তাই আমাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।’

ইরা পিস্তলটা তুলে ধরল।

‘আপনি আমার পরিবার কেড়ে নিয়েছেন।’

ঋত্বিক তার দিকে তাকালেন।

‘তোমার পরিবার তোমাকে ছেড়ে যায়নি, ইরা। তোমাকে রক্ষা করার জন্যই তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল।’

‘আমাকে মিথ্যে বলা হয়েছিল!’

‘হ্যাঁ। কারণ সত্যিটা জানলে তুমি এখানে ফিরে আসতে।’

‘আমি ফিরে এসেছি আপনাকে থামাতে।’

ঋত্বিক মৃদু হাসলেন।

‘তুমি কি জানো, তোমার হাতে থাকা পিস্তলটা আসল নয়?’

ইরা চমকে উঠল।

ঋত্বিক বললেন, ‘তুমি যখন এই বাড়িতে ঢুকেছিলে, তখন তোমার হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে তার বদলে অন্য একটি অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। তুমি বুঝতে পারোনি।’

ইরা ট্রিগার টিপল।

শুধু একটা মৃদু ক্লিক শব্দ হল।

কোনও গুলি বেরোল না।

ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।

‘এবার অস্ত্রটা নামিয়ে রাখো।’

ইরা পিছিয়ে গেল। তার মুখে আতঙ্ক।

নীলাঞ্জনা বোনের সামনে দাঁড়াল।

‘আপনি আর এক পা এগোবেন না।’

ঋত্বিক থেমে গেলেন।

‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, নীলু। তোমাকে এখানে আনা আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তুমি নিজেই সব দরজা খুলে দিয়েছ।’

‘কেন?’

‘কারণ তোমার স্মৃতির মধ্যে এমন একটি তথ্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা কেউ খুঁজে পাইনি।’

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

‘আমার কোনও বিশেষ স্মৃতি নেই।’

‘আছে। তোমার জন্মের রাতের স্মৃতি। যে স্মৃতি তোমার বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই তোমার মস্তিষ্কে তৈরি হয়েছিল। তুমি সেই রাতের একটি দৃশ্য দেখেছিলে, যা অন্য কেউ দেখেনি।’

সুচরিতা ফিসফিস করে বললেন, ‘নীলু, ওর কথা শুনিস না।’

ঋত্বিক বললেন, ‘তোমার বাবা মৃত্যুর আগে একটি রেকর্ডিং রেখে গিয়েছিলেন। সেই রেকর্ডিংয়ে তিনি বলেছিলেন, নীলাঞ্জনা একদিন সব মনে করতে পারবে। সেই স্মৃতির মধ্যেই আছে প্রকল্প নীলের আসল নথি কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।’

ঋত্বিক চামড়ার ব্যাগ থেকে একটি ছোট যন্ত্র বের করলেন।

‘এই যন্ত্র তোমার মস্তিষ্কের পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত সংকেত শনাক্ত করতে পারবে। একবার তথ্যটা পেয়ে গেলে, তুমি মুক্ত। আমরাও মুক্ত।’

‘আর এই শিশু দুটো?’

‘ওদেরও মুক্ত করা হবে।’

‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।’

ঋত্বিকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘তাহলে তোমার মায়ের কী হবে, ভেবে দেখো।’

তিনি ব্যাগের ভিতর থেকে একটি ছোট রিমোট বের করলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাচের ঘরের ভিতরে লাল আলো জ্বলে উঠল। দুটি শিশুর বিছানার পাশে যন্ত্রগুলো দ্রুত শব্দ করতে শুরু করল।

সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘ঋত্বিক, বন্ধ করো! ওরা মারা যাবে!’

‘নীলাঞ্জনা, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’

নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।

তারপর কাচের ভিতরে শুয়ে থাকা শিশু দুটির দিকে।

একটি শিশু কাঁদছে। অন্যটি স্থির হয়ে আছে।

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, সময় খুব কম।

সে চোখ বন্ধ করল।

মনে করার চেষ্টা করল সেই রাতের কথা।

হাসপাতালের ঘর। মায়ের কান্না। বাবার কণ্ঠস্বর। অদ্বৈতের হাতে সাদা কাপড়ে মোড়া শিশু।

তারপর একটি দরজা।

দরজার গায়ে লেখা—১৩।

আর দরজার ওপারে একটি কাঠের বাক্স।

বাক্সের ভিতরে একটি লাল ডায়েরি।

নীলাঞ্জনা চোখ খুলে বলল, ‘ডায়েরিটা কোথায়?’

ঋত্বিক চমকে গেলেন।

‘কোন ডায়েরি?’

‘লাল ডায়েরি। বাবা সেটা কক্ষ ১৩-তে লুকিয়ে রেখেছিলেন।’

ঋত্বিকের মুখে প্রথমবার ভয়ের ছাপ দেখা গেল।

‘তুমি মনে করতে পেরেছ?’

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

‘হ্যাঁ। আর আমি জানি, সেটা কোথায়।’

সে মেঝের নীচে খোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

কাচের ঘরের পিছনে আরেকটি সরু পথ রয়েছে। সেই পথের শেষে একটি ছোট কাঠের বাক্স। নীলাঞ্জনা বাক্সটা খুলল।

ভিতরে সত্যিই একটি লাল ডায়েরি।

ডায়েরির প্রথম পাতায় অরুণাভ সেনের হাতের লেখা—

‘যদি আমার মেয়েরা কখনও এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে জেনে রেখো—তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল তোমাদের বাঁচানোর জন্য নয়। তোমাদের স্মৃতির ভিতরে একটি অপরাধের প্রমাণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।’

নীলাঞ্জনা পাতা উল্টাতে লাগল।

পরের পাতায় একটি তালিকা।

সেখানে কয়েকজন চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার নাম লেখা। তাঁদের প্রত্যেকের পাশে উল্লেখ রয়েছে, প্রকল্প নীলের কোন পর্যায়ে তাঁরা যুক্ত ছিলেন।

শেষ পাতায় লেখা—

‘প্রকল্প নীল কখনও স্মৃতি মুছে ফেলার প্রকল্প ছিল না। এটি ছিল সাক্ষীদের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রকল্প।’

নীলাঞ্জনার মাথায় যেন বাজ পড়ল।

ঋত্বিকের মুখের রং বদলে গেছে।

‘ডায়েরিটা আমাকে দাও।’

নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

‘না।’

ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।

‘তুমি বুঝতে পারছ না, এটা প্রকাশ পেলে কত মানুষ ধ্বংস হবে।’

‘যারা অপরাধ করেছে, তাদেরই ধ্বংস হওয়া উচিত।’

‘তুমি কি তোমার নিজের জীবনটাও ধ্বংস করতে চাও?’

নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল, ‘আমার জীবন আপনারা অনেক আগেই ধ্বংস করেছেন। এবার সত্যিটা বাইরে আসবে।’

ঋত্বিক তার হাত থেকে ডায়েরি কেড়ে নিতে গেলেন।

ঠিক সেই সময় অদ্বৈত তাঁর সামনে দাঁড়ালেন।

‘যথেষ্ট হয়েছে, ঋত্বিক।’

ঋত্বিক অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।

‘তুমিও আমার বিরুদ্ধে যাবে?’

অদ্বৈত বললেন, ‘আমি অনেক দিন তোমার হয়ে অপরাধ করেছি। আর নয়।’

তিনি পকেট থেকে একটি ছোট রেকর্ডার বের করলেন।

‘তোমার সমস্ত কথা রেকর্ড হয়েছে।’

ঋত্বিকের চোখ জ্বলে উঠল।

‘তুমি জানো না, তুমি কী করছ।’

‘জানি। এত বছর পরে প্রথমবার ঠিক কাজ করছি।’

ঋত্বিক অদ্বৈতের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হল। রেকর্ডারটা মেঝেতে পড়ে গেল। নীলাঞ্জনা সেটি তুলে নিয়ে ইরার হাতে দিল।

‘এটা নিয়ে মাকে বের করে নিয়ে যাও!’

ইরা মাকে ধরে সিঁড়ির দিকে এগোল।

কিন্তু ঋত্বিক হঠাৎ অদ্বৈতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তারপর কাচের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন। তিনি একটি লাল বোতাম টিপলেন।

ঘরের ভিতর থেকে তীব্র অ্যালার্মের শব্দ উঠল।

যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘোষণা করল—

‘স্বয়ংক্রিয় ধ্বংসপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট সময়: পাঁচ মিনিট।’

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি কী করলেন?’

ঋত্বিক বললেন, ‘কোনও প্রমাণ থাকবে না।’

কাচের ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শিশুদুটিকে ঘিরে থাকা যন্ত্রগুলো থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল।

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু তালা খুলছে না।

ইরা চাবিটা বের করে তালায় ঢোকাল। তবু দরজা খুলল না।

সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ওদের বাঁচাও!’

অদ্বৈত দেয়ালের পাশে একটি লাল সুইচ দেখতে পেলেন।

‘এটাই জরুরি বন্ধের সুইচ!’

তিনি সুইচের দিকে ছুটলেন।

ঋত্বিক তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালেন।

‘ওটা ছুঁয়ো না!’

অদ্বৈত বললেন, ‘এই পাগলামি শেষ হতেই হবে।’

ঋত্বিক তাঁকে আঘাত করলেন। অদ্বৈত মেঝেতে পড়ে গেলেন।

নীলাঞ্জনা আর অপেক্ষা করল না। সে মায়ের দেওয়া পুরোনো চাবিটা নিয়ে সুইচের বাক্সের তালা ভাঙল। ভিতরে তিনটি বোতাম।

কালো।

সাদা।

নীল।

ডায়েরির শেষ পাতায় অরুণাভের লেখা ছিল একটি নির্দেশ—

‘বিপদ এলে নীল বোতাম টিপবে। অন্য দুটিতে হাত দেবে না।’

নীলাঞ্জনা নীল বোতাম টিপে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য সব আলো নিভে গেল।

তারপর অ্যালার্ম থেমে গেল। কাচের ঘরের দরজা খুলে গেল। যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে গেল।

দুটি শিশু কাঁদছে।

নীলাঞ্জনা দৌড়ে গিয়ে প্রথম শিশুটিকে কোলে তুলে নিল। ইরা দ্বিতীয় শিশুটিকে তুলে নিল।

শিশু দুটির কান্না ধীরে ধীরে থেমে এল।

নীলাঞ্জনা নিজের হাতে ধরা শিশুটির কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘তোমাদের আর কেউ আঘাত করতে পারবে না।’

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঋত্বিক মেঝেতে বসে পড়েছেন। তাঁর চোখে আর কোনও অহংকার নেই।

সুচরিতা এগিয়ে এসে দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।

বহু বছর পর নীলকুঠির নীল আলো নিভে গেল।

৫. শেষ সাক্ষ্য

পরের কয়েক ঘণ্টার ঘটনা যেন ঝড়ের মতো কেটে গেল।

নীলাঞ্জনা নিজের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় দপ্তরে ফোন করল। রেকর্ডার, ডায়েরি এবং হাসপাতালের নথির ছবি নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দিল। তারপর পুলিশের কাছে খবর দেওয়া হল।

পুলিশ নীলকুঠি থেকে উদ্ধার করল বহু বছরের নথি, পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং প্রকল্প নীলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা। ঋত্বিক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হল। অদ্বৈত রায়ও তদন্তে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করলেন।

তবে সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া গেল না।

প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন। কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কিছু নথি ধ্বংস করা হয়েছিল। আর নীলাঞ্জনার স্মৃতিতে যে রাতের দৃশ্যগুলি ফিরে এসেছিল, তার সবকিছুর প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হল না।

তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি প্রকাশ্যে এল।

প্রকল্প নীলের আড়ালে বহু মানুষের স্মৃতি ও সাক্ষ্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মধ্যে কয়েকজনকে নতুন পরিচয় দিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছিল। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ইরা ছিল সেই শিশুদের একজন, যাকে তার প্রকৃত পরিচয় থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল।

আর নীলাঞ্জনা?

তার জন্মপরিচয় নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর বাকি। ঋত্বিক দাবি করেছিলেন, তিনি তার জৈবিক বাবা। কিন্তু আদালতে তা প্রমাণ করার জন্য আরও নথি এবং পরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। নীলাঞ্জনা সিদ্ধান্ত নিল, নিজের পরিচয়ের সত্য জানতে সে আইনি পথেই এগোবে।

তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় কথা—সে আর কোনও মিথ্যার মধ্যে বাস করবে না।

কয়েক মাস পরে, শালিখা গ্রামের আদালতে সাক্ষ্য দিতে এলেন সুচরিতা সেন।

নীলাঞ্জনা ও ইরা পাশাপাশি বসেছিল। দুজনের মাঝখানে একটি ছোট শিশু ঘুমোচ্ছিল। উদ্ধার হওয়া শিশু দুটির মধ্যে একজনকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, অন্যজনকে রাখা হয়েছে বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে। তাদের পরিচয় এবং পরিবারের খোঁজ চলছে।

সুচরিতা আদালতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার মেয়েদের কাছ থেকে সত্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, চুপ থাকলে ওদের বাঁচাতে পারব। কিন্তু নীরবতা অপরাধকে আরও শক্তিশালী করেছে।’

তাঁর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

‘আজ আমি চাই, কোনও মা যেন আর নিজের সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে নিজের স্মৃতিকেই সন্দেহ না করে। কোনও সন্তান যেন নিজের পরিচয় জানার অধিকার হারিয়ে না ফেলে।’

আদালতকক্ষে নীরবতা নেমে এল।

সেদিন নীলাঞ্জনা বুঝল, সত্যের জন্য লড়াই মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি চাওয়া নয়। সত্যের জন্য লড়াই মানে যাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

৬. দুই বোনের নতুন জীবন

ছয় মাস পর।

কলকাতার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে নীলাঞ্জনা একটি প্রতিবেদন লিখছে। শিরোনাম—‘প্রকল্প নীল: স্মৃতি, পরিচয় ও হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কাহিনি।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সে শেষবারের মতো নথিগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিল।

দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।

ইরা এসেছে।

তার হাতে দুটি কাপ চা।

‘আবার কাজ?’

নীলাঞ্জনা হেসে বলল, ‘শেষ করতে হবে।’

‘তুই কোনও দিন বদলাবি না।’

‘তুইও তো বদলাসনি।’

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু সেই হাসির ভিতরে আর আগের মতো ভয় নেই। আছে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ফিরে পাওয়া সম্পর্কের উষ্ণতা।

ইরা জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।

‘দিদি, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’

‘কর।’

‘তোর কি এখনও মনে হয়, আমাদের জীবনে যা ঘটেছিল, তার সবকিছুর উত্তর আমরা পেয়ে গেছি?’

নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

‘না। কিছু উত্তর হয়তো কোনও দিন পাব না। কিন্তু এখন অন্তত আমরা জানি, কোন প্রশ্নগুলো করা দরকার।’

ইরা মাথা নাড়ল।

‘আমি মাঝে মাঝে এখনও সেই নীল দরজার স্বপ্ন দেখি।’

‘আমিও।’

‘স্বপ্নে দেখি, দরজার ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।’

নীলাঞ্জনা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।

‘কে?’

ইরা বলল, ‘জানি না। কিন্তু সে আমাদের নাম ধরে ডাকে।’

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নীলাঞ্জনা নিজের ল্যাপটপ বন্ধ করল।

‘চল, আজ কোথাও ঘুরে আসি।’

‘কোথায়?’

‘যেখানে কোনও পুরোনো বাড়ি নেই, কোনও বন্ধ দরজা নেই, কোনও গোপন নথি নেই।’

ইরা হেসে বলল, ‘তোর পক্ষে সেটা সম্ভব?’

‘চেষ্টা করে দেখা যাক।’

দুজন বেরিয়ে গেল।

বাইরে শরতের আকাশ। রাস্তায় মানুষের ভিড়, দোকানে আলো, চায়ের কাপে ধোঁয়া। পৃথিবীটা অন্য দিনের মতোই চলছে।

কেউ জানে না, এই দুই বোন কত অন্ধকার পেরিয়ে এখানে এসেছে।

কেউ জানে না, তাদের শৈশবের কতটা সময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু তারা জানে—তাদের জীবন আর অন্য কারও হাতে লেখা হবে না।

সেদিন রাতে নীলাঞ্জনা বাড়ি ফিরে মায়ের পুরোনো ডায়েরিটা খুলল। ডায়েরির শেষ পাতার নীচে সে একটি নতুন বাক্য লিখল—

‘স্মৃতি ভুলে যাওয়া যায়, পরিচয় লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে চিরকাল বন্দি করে রাখা যায় না।’

ডায়েরিটা বন্ধ করে সে জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে আকাশে মেঘ জমেছে।

হঠাৎ তার মনে হল, কোনও এক অন্ধকার ঘরে নীল আলো জ্বলে উঠল।

সে চোখ মুছে আবার তাকাল।

আলো নেই।

শুধু দূরের বাড়িগুলোর জানালায় সাধারণ হলুদ আলো জ্বলছে।

নীলাঞ্জনা নিজেকে বোঝাল, সব শেষ হয়েছে। নীলকুঠির গোপন ঘর সিল করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প নীলের নথি তদন্তকারীদের হাতে। ঋত্বিকের বিচার চলছে।

আর কোনও রহস্য নেই।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।

বার্তায় লেখা—

‘তোমরা দুজনেই বেঁচে গেছ। কিন্তু তৃতীয় শিশুটির কী হল, তা কি মনে আছে?’

নীলাঞ্জনার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ইরাকে ফোন করল।

ফোন ধরতেই নীলাঞ্জনা বলল, ‘ইরা, তুই কোথায়?’

‘বাড়িতে। কী হয়েছে?’

‘আমাদের জন্মের সময় কি সত্যিই দুটো শিশু ছিল?’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ইরা বলল, ‘দিদি, তুই কী বলতে চাইছিস?’

নীলাঞ্জনা বার্তাটি পড়ে শোনাল।

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘অসম্ভব। আমরা তো সব নথি দেখেছি।’

‘হয়তো কোনও নথি আমাদের দেখানো হয়নি।’

‘তুই কি আবার নীলকুঠিতে যাবি?’

নীলাঞ্জনা জানালার বাইরে তাকাল।

তার মনে পড়ল সেই নীল দরজা, সেই অন্ধকার সিঁড়ি, সেই কাচের ঘর।

তারপর সে ধীরে ধীরে বলল, ‘না। এবার আমরা কোথাও অন্ধকারে ঢুকব না। আগে খুঁজে বের করব, এই বার্তা কে পাঠিয়েছে।’

সে নম্বরটিতে ফোন করল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

কেউ ধরল না।

তারপর ফোনের পর্দায় আরেকটি বার্তা ভেসে উঠল।

‘আমি তোমাদের তৃতীয় বোন।’

নীলাঞ্জনা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক সেই মুহূর্তে, শহরের অন্য প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ির নীল দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ভিতর থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

‘এবার আমার পালা।’

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার (ওপারে দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মেয়ের ফিরে আসা)।

রাত এগারোটা তেতাল্লিশ।

নীলকুঠির সমস্ত জানালায় তখনও নীল আলো জ্বলছে। বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতে একটি লাল বল। মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি, অথচ চোখের গভীরে জমে রয়েছে বহু বছরের অভিমান।

মেয়েটি একবার গেটের তালায় হাত রাখল।

সঙ্গে সঙ্গে তালাটি খুলে মাটিতে পড়ে গেল।

সে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল না। বরং বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব নিচু গলায় বলল, ‘দিদি, আমি এসেছি।’

বাড়ির ভিতর থেকে কোনও উত্তর এল না।

মেয়েটি মাথা তুলে দোতলার দিকে তাকাল। নীল আলোয় ভেসে থাকা জানালার ওপারে যেন একটা ছায়া নড়ে উঠল।

‘দিদি, তুমি কি এখনও আমাকে ভয় পাও?’

তারপর সে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।

১. বন্ধ ঘরের ভিতর

নীলাঞ্জনা তখনও নীল ঘরের মেঝেতে বসে। অন্ধকারের মধ্যে তার হাত দুটো কাঁপছে। বৃদ্ধ কোথায় গেলেন, সে বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে যাঁকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের সাক্ষী বলে মনে করেছিল, তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।

আয়নাটা আবার দৃশ্যমান হয়েছে।

কিন্তু এবার তাতে হাসপাতালের ঘর নেই। দেখা যাচ্ছে নীলকুঠির দোতলার করিডর। করিডরের এক প্রান্ত থেকে সাদা পোশাক পরা একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে।

নীলাঞ্জনা চোখ মুছল।

মেয়েটি তারই মতো দেখতে। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। এমনকী বাঁ ভ্রুর পাশে ছোট্ট তিলটিও রয়েছে।

মেয়েটি আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।

তার ঠোঁট নড়ল।

‘তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?’

নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিল না।

‘ছোটবেলায় তুমি আমাকে একটা নাম দিয়েছিলে। মনে আছে?’

‘আমি তোমাকে কখনও দেখিনি।’

‘দেখেছ। শুধু তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল। ‘এসব মিথ্যে। আমার কোনও বোন নেই।’

মেয়েটি মৃদু হাসল।

‘তাহলে তোমার জন্মদিনে প্রতি বছর কেন দুটি মোমবাতি জ্বালানো হত?’

প্রশ্নটা শুনে নীলাঞ্জনার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

ছোটবেলায় জন্মদিনের কেক কাটার আগে তার মা দুটি মোমবাতি জ্বালাতেন। একটি নীলাঞ্জনার জন্য, অন্যটি কার জন্য—সে কোনও দিন জানতে পারেনি। একবার জিজ্ঞাসা করায় মা কেঁদে ফেলেছিলেন। তারপর থেকে সে আর প্রশ্ন করেনি।

মেয়েটি আবার বলল, ‘আমার নাম ইরা। তোমার যমজ বোন।’

নীলাঞ্জনা চোখ বন্ধ করল।

তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় একটা স্বপ্ন সে প্রায়ই দেখত। একটি মেয়ে তার পাশে শুয়ে আছে। দুজনেরই পরনে একই রঙের পোশাক। মেয়েটি তার হাত ধরে বলছে, ‘তুই আমাকে ছেড়ে যাবি না তো?’

প্রতিবার ঘুম ভাঙলে নীলাঞ্জনা মায়ের কাছে ছুটে যেত। মা তাকে বুকে টেনে নিতেন, কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতেন না।

এত বছর ধরে সেই স্বপ্নকে সে শিশুমনের কল্পনা ভেবেছে।

নীলাঞ্জনা চোখ খুলে বলল, ‘তুমি যদি আমার বোন হও, এত বছর কোথায় ছিলে?’

ইরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘যেখানে আমাকে রেখে গিয়েছিল তোমাদের বাবা।’

‘আমার বাবা তোমাকে কোথায় রেখে গিয়েছিলেন?’

‘এই বাড়িতেই।’

নীলাঞ্জনা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

ইরা বলল, ‘তুমি চলে যাওয়ার পর আমি অনেক দিন এখানে ছিলাম। তারপর একদিন আমাকে বলা হল, তুমি আর বেঁচে নেই। মা-ও নেই। বাবা-ও নেই। আমার পৃথিবীতে কেউ নেই।’

‘কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!’

‘হ্যাঁ। তুমি বেঁচে আছ। আর আমি এত বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।’

‘তুমি কোথায় ছিলে?’

ইরা উত্তর দেওয়ার আগেই আয়নার কাচে ফাটল ধরল।

একটি সরু রেখা মাঝখান থেকে নীচের দিকে নেমে এল। তারপর আরেকটি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো আয়নাটা জালের মতো ফাটলে ভরে গেল।

ইরা চিৎকার করে উঠল, ‘দিদি, ঘর থেকে বেরিয়ে যাও!’

‘কেন?’

‘ও জেগে উঠেছে!’

‘কে?’

আয়নার ভিতর থেকে এবার একটি পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

‘যে সত্যকে কবর দিয়েছিল।’

নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।

ফাটল ধরা আয়নার ভিতরে এবার তার বাবাকে দেখা যাচ্ছে।

অরুণাভ সেন—যাঁর মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। তাঁর মুখে সেই পরিচিত হাসি, কিন্তু চোখে এমন এক কঠোরতা যা নীলাঞ্জনা কোনও দিন দেখেনি।

তিনি বললেন, ‘নীলু, আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্যই সব করেছি।’

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি আমার বোনকে কোথায় রেখেছিলেন?’

‘ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’

‘কার থেকে?’

অরুণাভের মুখ বদলে গেল।

‘তোমার মায়ের কাছ থেকে।’

এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেল।

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘মায়ের কাছ থেকে?’

‘তোমার মা যা জানত, তা পৃথিবীর কেউ জানতে পারত না। তাই ওকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

‘কে সরিয়ে দিয়েছিল?’

অরুণাভ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আয়নাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

কাচের টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

প্রতিটি টুকরোয় দেখা যাচ্ছে নীলাঞ্জনার আলাদা আলাদা প্রতিবিম্ব। কিন্তু কোনও প্রতিবিম্বেই তার মুখ এক নয়। কোথাও সে শিশু, কোথাও কিশোরী, কোথাও বৃদ্ধা। আর একটি টুকরোয় সে দাঁড়িয়ে আছে একটি হাসপাতালের বিছানার পাশে।

বিছানায় শুয়ে আছে ইরা।

তার চোখ বন্ধ।

মনিটরে সোজা একটি রেখা।

নীলাঞ্জনা সেই টুকরোটা তুলতেই তার হাত কেটে গেল। রক্তের ফোঁটা কাচের ওপর পড়ল।

মুহূর্তের মধ্যে ঘরের নীল আলো নিভে গেল।

দরজার বাইরে থেকে শোনা গেল পায়ের শব্দ।

কেউ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।

এবার আর কোনও রহস্যময় শব্দ নয়।

এটি একজন জীবিত মানুষের পায়ের শব্দ।

২. ডাক্তারের স্বীকারোক্তি

দরজাটা খুলে গেল।

সাদা পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর মুখে উদ্বেগ। হাতে একটি ছোট টর্চ এবং বাদামি রঙের ফাইল।

‘তোমাকে এখানে আনা আমার ভুল হয়েছে,’ তিনি বললেন।

নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়াল। ‘আপনি কে? আমার পরিবারের সব কথা জানেন কীভাবে?’

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আমার নাম ডা. শৈলেন বসু। বাইশ বছর আগে আমি এই অঞ্চলের একটি নার্সিংহোমে কাজ করতাম। তোমার জন্মের সময় তোমার মায়ের চিকিৎসা আমিই করেছিলাম।’

‘আমার মা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?’

বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।

‘আমাকে উত্তর দিন!’

‘না,’ তিনি বললেন। ‘তোমার মা সেদিন মারা যাননি।’

নীলাঞ্জনার চোখে জল চলে এল। ‘তাহলে তাঁকে মৃত বলে জানানো হল কেন?’

ডাক্তার ফাইল খুললেন।

‘তোমার জন্মের সময় পরিস্থিতি খুব জটিল ছিল। তোমার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একই সময়ে তোমাদের পরিবারে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা বাইরে প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন বদলে যেত।’

‘কী ঘটনা?’

‘তোমার যমজ বোন ইরার জন্মের কয়েক মিনিট পর থেকেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চিকিৎসার জন্য তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার আগেই হাসপাতাল থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’

‘কে সরিয়েছিল?’

‘তোমার বাবা।’

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

ডাক্তার বললেন, ‘তোমার বাবা বলেছিলেন, ইরাকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু পরে জানা যায়, তাকে এই নীলকুঠিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেন, সেটা আমি তখন বুঝতে পারিনি।’

‘আর মা?’

‘তোমার মা সুস্থ হওয়ার পর ইরার খোঁজ করেন। তাঁকে বলা হয়, মেয়েটি মারা গেছে। তোমার মা বিশ্বাস করেননি। তিনি বারবার খোঁজ নিতে থাকেন। তারপর একদিন হঠাৎ তাঁকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।’

‘কোথায়?’

‘সেই উত্তর আমার কাছে নেই।’

নীলাঞ্জনা ফাইলটা ছিনিয়ে নিল। ভিতরে হাসপাতালের নথি, কয়েকটি ছবি এবং পুরোনো চিঠি রয়েছে। একটি কাগজে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই, ১৯৯৮। তার নীচে দুটি শিশুর নাম।

প্রথমটি: নীলাঞ্জনা সেন।

দ্বিতীয়টি: ইরা সেন।

দুটি নামের পাশে একই জন্মসময়।

নীলাঞ্জনার হাত কাঁপতে লাগল।

‘আপনি এত বছর চুপ করে ছিলেন কেন?’

ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম।’

‘কাকে?’

‘তোমার বাবাকে নয়। যে মানুষটা তোমার বাবাকে নির্দেশ দিত, তাকে।’

‘কে সে?’

ডাক্তার উত্তর দেওয়ার আগে নীচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

তারপর কেউ জোরে বলল, ‘ডাক্তারবাবু! আপনি ভিতরে আছেন?’

শৈলেন বসুর মুখের রং বদলে গেল।

তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘সে এসে গেছে।’

‘কে?’

‘যার কথা এতক্ষণ বলছিলাম।’

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ থামল।

একজন পুরুষ বলল, ‘নীলাঞ্জনা, তোমার মায়ের কথা জানতে চাও? তাহলে আমার সঙ্গে এসো।’

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ডাক্তার তার হাত ধরে থামালেন।

‘না। ওর কথা শুনবে না।’

বাইরে থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর—

‘তোমার মা বেঁচে আছেন। আর তুমি যদি আজ রাতেই আমার সঙ্গে না যাও, কাল সকালে তাঁর মৃতদেহ পাবে।’

নীলাঞ্জনা ডাক্তারকে সরিয়ে দরজা খুলে দিল।

করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সে চিনতে পারল।

তার নাম অদ্বৈত রায়। কলকাতার বিখ্যাত চিকিৎসক, বহু হাসপাতালের উপদেষ্টা এবং তার বাবার পুরোনো বন্ধু। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই নীলাঞ্জনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে চাকরির প্রথম সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই তিনি সাহায্য করেছিলেন।

নীলাঞ্জনা তাঁকে প্রায় পরিবারের সদস্য বলেই মনে করত।

অদ্বৈত মৃদু হাসলেন।

‘অবশেষে দেখা হল, নীলু।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আপনি আমার মাকে কোথায় রেখেছেন?’

অদ্বৈতের হাসি মিলিয়ে গেল।

‘তোমার মা কোথায় আছেন, সেটা জানার অধিকার তোমার নেই।’

‘কেন?’

‘কারণ তুমি এখনও সত্যের জন্য প্রস্তুত নও।’

‘আমার বোনকে কোথায় রেখেছিলেন?’

অদ্বৈত এবার শৈলেন বসুর দিকে তাকালেন।

‘ডাক্তারবাবু, আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই বিষয় নিয়ে আর মুখ খুলবেন না।’

শৈলেন বললেন, ‘আমি অনেক দিন চুপ থেকেছি। আর নয়।’

অদ্বৈত ধীরে ধীরে কোটের পকেটে হাত ঢোকালেন।

নীলাঞ্জনা ভাবল, তিনি হয়তো ফোন বের করবেন।

কিন্তু তিনি একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে নীলকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন মানুষ—অরুণাভ সেন, সুচরিতা এবং অদ্বৈত। তাঁদের মাঝখানে দুটি ছোট মেয়ে।

ছবির নীচে লেখা—

‘পরিবার, ১৯৯৯।’

নীলাঞ্জনা ছবির দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েদের মধ্যে একজন সে নিজে। অন্যজন ইরা।

কিন্তু ছবির পিছনে লাল কালিতে লেখা ছিল আরও একটি বাক্য—

‘দ্বিতীয় মেয়েটি আসল নয়।’

৩. ইরা কি সত্যিই ফিরে এসেছে?

অদ্বৈত ছবিটা আবার পকেটে রেখে দিলেন।

‘চলো, তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাই।’

নীলাঞ্জনা নড়ল না।

‘আমি কোথাও যাব না। আগে বলুন, ছবির পিছনে ওই কথাটা কে লিখেছে?’

অদ্বৈত ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘তোমার মা।’

‘কেন?’

‘কারণ তোমার মা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে একজন মানুষ নয়।’

শৈলেন বসু চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যে!’

অদ্বৈত তাঁর দিকে তাকালেন। ‘আপনি এখনও সবটা জানেন না, ডাক্তারবাবু।’

‘আমি জানি, আপনি কী করেছিলেন।’

‘আপনি শুধু অর্ধেকটা জানেন।’

নীলাঞ্জনা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ কি আমাকে সত্যিটা বলবেন?’

অদ্বৈত কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘তোমার জন্মের আগেই এই পরিবারের একটা ইতিহাস ছিল। তোমার মা ছোটবেলায় একটি দুর্ঘটনায় তাঁর যমজ বোনকে হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকে তিনি বিশ্বাস করতেন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ কখনও কখনও অন্য কারও জীবনে ফিরে আসে।’

‘এটা তো কুসংস্কার!’

‘হতে পারে। কিন্তু তোমার জন্মের পর তোমার মা এমন কিছু ঘটনা দেখেছিলেন, যেগুলো তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।’

‘যেমন?’

‘তোমার মা দাবি করেছিলেন, একই সময়ে তোমাদের দুজনকে আলাদা ঘরে রেখে গেলেও তোমরা একই কথা বলতে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কাঁদত। একজনের শরীরে আঘাত লাগলে অন্যজনের শরীরেও একই জায়গায় দাগ দেখা যেত।’

নীলাঞ্জনা কাঁপা গলায় বলল, ‘এগুলো কি সত্যি?’

শৈলেন বললেন, ‘কিছু ঘটনা সত্যি ছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনও অলৌকিক ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। শিশুদের মধ্যে এমন কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে পারে। আর তোমার মা তখন মানসিকভাবে খুব দুর্বল ছিলেন।’

অদ্বৈত মাথা নাড়লেন।

‘কিন্তু একটি ঘটনা কাকতালীয় ছিল না। তোমার জন্মের ছয় মাস পর ইরা নিখোঁজ হয়ে যায়। আর ঠিক সেই রাতেই তোমার মা একটি ডায়েরিতে লেখেন—“আমার মেয়েটি ফিরে এসেছে। কিন্তু সে আমার মেয়ে নয়।”’

নীলাঞ্জনা চোখ বন্ধ করল।

তার মাথার ভিতর শব্দগুলো ঘুরতে লাগল।

‘আমার মেয়ে নয়…’

‘এর মানে কী?’ সে জিজ্ঞাসা করল।

অদ্বৈত বললেন, ‘সেটাই জানতে তোমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’

নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে এখানে নিয়ে আসেননি। আমি নিজেই এসেছি।’

অদ্বৈত মৃদু হাসলেন।

‘তুমি কি নিশ্চিত?’

তিনি কোটের পকেট থেকে আরেকটি কাগজ বের করলেন। সেটি একটি পুরোনো চিঠি। নীলাঞ্জনার নিজের হাতের লেখার মতো দেখতে অক্ষরে লেখা—

‘আমি নীলকুঠিতে আসছি। আমার বোনকে ফিরিয়ে আনব।’

তারিখ—তিন মাস আগের।

নীলাঞ্জনা চিঠিটা দেখে শিউরে উঠল।

‘আমি এই চিঠি লিখিনি।’

‘তোমার হাতের লেখা নয়?’ অদ্বৈত জিজ্ঞাসা করলেন।

‘না।’

‘তাহলে তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে যে, চিঠিতে তোমার ব্যক্তিগত ডায়েরির একটি বাক্য হুবহু লেখা আছে?’

নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিতে পারল না।

সে বুঝতে পারছিল, কেউ তাকে বহুদিন ধরে এই বাড়ির দিকে ঠেলে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কে? আর কেন?

হঠাৎ করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে ইরার গলা ভেসে এল।

‘দিদি!’

নীলাঞ্জনা ঘুরে তাকাল।

সাদা পোশাক পরা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে লাল বল। চোখে জল।

‘ওদের কথা শুনো না। ওরা তোমাকে আবার নিয়ে যাবে।’

অদ্বৈত মেয়েটিকে দেখে এক পা পিছিয়ে গেলেন।

শৈলেন বসু ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।

নীলাঞ্জনা ইরার দিকে এগিয়ে গেল।

‘তুমি কোথায় ছিলে?’

ইরা বলল, ‘আমি সব সময় তোমার কাছেই ছিলাম।’

‘কিন্তু আমি তোমাকে দেখিনি কেন?’

‘কারণ তোমাকে দেখানো হয়নি।’

অদ্বৈত হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওর কাছে যেও না!’

নীলাঞ্জনা থেমে গেল।

‘কেন?’

অদ্বৈত বললেন, ‘ও ইরা নয়।’

ইরা কেঁদে উঠল।

‘দিদি, তুমি কি ওদের কথা বিশ্বাস করবে?’

নীলাঞ্জনা এক পা এগোল।

ইরা হাত বাড়িয়ে দিল।

তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল।

সেই মুহূর্তে নীলাঞ্জনার চোখের সামনে সবকিছু বদলে গেল।

সে আর নীলকুঠিতে নেই।

সে দাঁড়িয়ে আছে একটি অন্ধকার হাসপাতালের করিডরে। দেয়ালে লাল আলো জ্বলছে। দূরে একটি শিশুর কান্না। দরজার পাশে তার মা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি শিশুকে জড়িয়ে রাখা সাদা কাপড়।

মা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে হারাতে হবে।’

তারপর অদ্বৈতকে দেখা গেল। তিনি মায়ের হাত থেকে শিশুটিকে নিয়ে অন্ধকার ঘরে ঢুকে গেলেন।

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল।

দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

সে আবার নীলকুঠির করিডরে দাঁড়িয়ে। ইরা তার সামনে নেই।

তার বদলে মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো হাসপাতালের পরিচয়পত্র।

কার্ডে লেখা—

রোগীর নাম: সুচরিতা সেন।

অবস্থা: জীবিত।

স্থানান্তরের তারিখ: ১৭ জুলাই, ১৯৯৮।

গন্তব্য: কক্ষ ১৩।

নীলাঞ্জনা কার্ডটা হাতে তুলে নিল।

‘কক্ষ ১৩ কোথায়?’

অদ্বৈত এবার আর হাসলেন না।

তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘নীলকুঠির নীচে।’

৪. বাড়ির নীচে আরেকটি বাড়ি

বাড়ির নীচতলার পেছনের অংশে একটি সরু করিডর ছিল। এতক্ষণ কেউ সেখানে যাওয়ার কথা বলেনি। অদ্বৈত দরজাটা খুলতেই ভেজা মাটির গন্ধ বেরিয়ে এল।

সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে।

শৈলেন বসু বললেন, ‘এখানে যাওয়া ঠিক হবে না।’

নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আগে এসেছেন?’

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

‘একবার। বাইশ বছর আগে। তখন এখানে একটি ছোট চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। অমরেশবাবু গ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জন্য এটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এক রাতে সব বন্ধ হয়ে যায়।’

‘কেন?’

‘সেই রাতে একজন রোগী নিখোঁজ হয়েছিলেন।’

‘কে?’

শৈলেন উত্তর দেওয়ার আগেই অদ্বৈত বললেন, ‘সুচরিতা সেন।’

নীলাঞ্জনা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে শুরু করল।

প্রতিটি ধাপের পাশে মরচে ধরা লোহার রেলিং। দেয়ালে পুরোনো বৈদ্যুতিক তার। কয়েকটি বাল্ব এখনও জ্বলছে, যদিও বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ থাকার কথা নয়।

নীচে পৌঁছে দেখা গেল, সামনে তিনটি দরজা।

প্রথম দরজায় লেখা—কক্ষ ১১।

দ্বিতীয় দরজায়—কক্ষ ১২।

তৃতীয় দরজায় কোনও নম্বর নেই। শুধু নীল রঙের একটি হাতের ছাপ।

নীলাঞ্জনা হাতের ছাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, এই হাতের ছাপ সে আগে কোথাও দেখেছে।

মায়ের পুরোনো ডায়েরিতে।

ডায়েরির শেষ পাতায় নীল কালিতে আঁকা ছিল ঠিক এই চিহ্নটি।

অদ্বৈত বললেন, ‘এই দরজার ওপারে যা আছে, তা দেখার পর তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমার জীবন তো অনেক আগেই বদলে গেছে।’

সে হাতের ছাপের ওপর হাত রাখল।

দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভিতরে একটি ছোট ঘর। মাঝখানে হাসপাতালের বিছানা। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার, কয়েকটি পুরোনো যন্ত্র এবং দেয়ালে ঝোলানো একটি ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা বেয়াল্লিশে থেমে আছে।

বিছানায় কেউ নেই।

কিন্তু বিছানার পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন একজন মহিলা।

চুল সাদা হয়ে গেছে। মুখে বয়সের ছাপ। হাতে একটি বই। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন কারও আসার অপেক্ষা করছেন।

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে বলল, ‘মা?’

মহিলাটি মাথা ঘোরালেন।

দুটি চোখে জল জমে উঠল।

‘নীলু?’

নীলাঞ্জনা দৌড়ে তাঁর কাছে গেল। মাকে জড়িয়ে ধরল। বহু বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এল।

‘তুমি বেঁচে আছ! তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?’

সুচরিতা মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন।

‘আমি তোকে খুঁজেছি, মা। প্রতিদিন খুঁজেছি।’

‘তাহলে ফিরে এলে না কেন?’

সুচরিতা চোখ বন্ধ করলেন।

‘কারণ আমি জানতাম না, তুই সত্যিই আমার মেয়ে কি না।’

নীলাঞ্জনা মায়ের হাত ছেড়ে পিছিয়ে গেল।

‘তুমি কী বলছ?’

সুচরিতা কাঁপা গলায় বললেন, ‘যেদিন তোর জন্ম হয়েছিল, সেদিন আমার দুটি মেয়ে জন্মেছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমার কোলে ছিল একটি শিশু। অন্য শিশুটিকে মৃত বলে জানানো হয়েছিল।’

‘ইরা?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু ইরা তো বেঁচে আছে!’

সুচরিতা মাথা নাড়লেন।

‘আমি জানি না, মা। আমি জানি না ও বেঁচে আছে কি না। আমি শুধু জানি, তোর বাবার মৃত্যুর আগে সে আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল—যদি কখনও নীলাঞ্জনা নীলকুঠিতে ফিরে আসে, তাকে কক্ষ ১৩-তে নিয়ে যেও না।’

নীলাঞ্জনা হতবাক হয়ে গেল।

‘কিন্তু তুমি তো এখানেই আছ!’

সুচরিতা চারদিকে তাকালেন।

‘আমি এখানে আসিনি। আমাকে এখানে রাখা হয়েছে।’

‘কে রেখেছে?’

মা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

অদ্বৈত রায় বাইরে থেকে বললেন, ‘দুঃখিত, সুচরিতা। কিন্তু এবার সত্যিটা শেষ করতে হবে।’

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে ছুটে গেল। দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হয়েছে।

শৈলেন বসুর গলা শোনা গেল, ‘অদ্বৈতবাবু, আপনি কী করছেন?’

‘যা বাইশ বছর আগে করা উচিত ছিল।’

তারপর ভারী কোনও যন্ত্র চালু হওয়ার শব্দ এল।

ঘরের এক কোণে লাল আলো জ্বলে উঠল।

সুচরিতা আতঙ্কিত হয়ে নীলাঞ্জনার হাত ধরলেন।

‘নীলু, তুই এখানে আসতে পারিস না। তোর এখানে থাকার কথা নয়।’

‘মা, আমাকে বলো, কী হচ্ছে!’

সুচরিতা মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিলেন।

‘তুই আমার মেয়ে। তোর জন্মের সময় কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি। কেউ মৃত থেকে ফিরে আসেনি। কিন্তু তোর বাবার একটি অপরাধ ছিল—সে একটি শিশুকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিল, আর সেই শিশুর পরিচয় বদলে দিয়েছিল।’

‘কেন?’

‘কারণ সেই শিশুর বাবা ছিল এমন একজন মানুষ, যার অপরাধ প্রকাশ পেলে অনেক বড় বড় মানুষ ধ্বংস হয়ে যেত।’

নীলাঞ্জনা বলল, ‘শিশুটি কে?’

সুচরিতা তার চোখের দিকে তাকালেন।

‘তুই।’

কথাটা শুনে নীলাঞ্জনার মনে হল, মাটিটা তার পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে।

‘আমি?’

‘হ্যাঁ। তুই যে পরিবারে বড় হয়েছিস, তারা তোকে ভালোবেসেছে। কিন্তু তোর জন্মের সত্যিটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তোর আসল বাবা অরুণাভ সেন নয়।’

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে আমার বাবা কে?’

সুচরিতা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দেয়ালে একটি পর্দা জ্বলে উঠল। সেখানে একটি পুরোনো ভিডিও দেখা যাচ্ছে।

ভিডিওতে অল্পবয়সি অরুণাভ সেন একটি শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে অদ্বৈত রায়। আর তাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন এক অচেনা মানুষ।

লোকটির মুখ ক্যামেরার দিকে ফিরতেই নীলাঞ্জনা শিউরে উঠল।

এ মুখ সে দেখেছে।

ছোটবেলার একটি ছবিতে।

মায়ের আলমারির ভিতরে লুকিয়ে রাখা সেই ছবিতে।

লোকটি আর কেউ নয়—তার নিজের বর্তমান বস, সংবাদপত্রের মালিক, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ঋত্বিক চৌধুরী।

ভিডিওতে ঋত্বিক বলছেন, ‘মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখো। বড় হলে ও নিজেই আমাদের কাছে ফিরে আসবে।’

তারপর পর্দা কালো হয়ে গেল।

নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।

‘ঋত্বিক চৌধুরী আমার বাবা?’

সুচরিতা চোখ নামিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।’

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে অদ্বৈতের কণ্ঠস্বর এল।

‘সত্যিটা জানলে ভালোই হল, নীলাঞ্জনা। এবার আর তোমাকে কিছু লুকোতে হবে না।’

দরজা খুলে গেল।

কিন্তু অদ্বৈত একা ছিলেন না।

তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাক পরা সেই মেয়েটি—ইরা।

ইরার হাতে একটি পিস্তল।

সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিদি, মাকে নিয়ে বেরিয়ে এসো।’

নীলাঞ্জনা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

‘তুমি তো বলেছিলে, তুমি আমার বোন!’

ইরা মৃদু হাসল।

‘আমি তোর বোনই।’

‘তাহলে তোমার হাতে পিস্তল কেন?’

ইরার চোখে জল এসে গেল।

‘কারণ যে মানুষটা আমাদের দুজনকে আলাদা করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।’

সে পিস্তলটা ঘুরিয়ে অদ্বৈতের দিকে তাক করল।

‘ডাক্তারবাবু, এবার বলুন—আমার জন্মের সময় দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন?’

অদ্বৈত চুপ করে রইলেন।

ইরা আবার বলল, ‘আপনি যদি আজও মিথ্যে বলেন, আমি গুলি চালাব।’

সুচরিতা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

‘ইরা, না!’

ইরা মায়ের দিকে তাকাল।

‘তুমি এত বছর আমাকে খুঁজলে না কেন, মা?’

সুচরিতা কেঁদে ফেললেন।

‘আমি তোকে খুঁজেছি, ইরা। কিন্তু যে মেয়েটাকে আমি খুঁজছিলাম, সে আমার কাছে ফিরতে চায়নি।’

ইরার মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল।

‘কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলে।’

‘না!’

‘আমাকে বলা হয়েছিল, দিদি আমার জায়গা নিয়ে নিয়েছে। আমার নাম, আমার পরিবার, আমার জীবন—সব কেড়ে নিয়েছে।’

নীলাঞ্জনা ইরার কাছে এগিয়ে গেল।

‘আমি কিছুই জানতাম না, ইরা। বিশ্বাস করো।’

ইরা তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পিস্তলটা নীচু করে রাখল।

তারপর বলল, ‘আমি জানি।’

‘তাহলে আমরা একসঙ্গে এখান থেকে বেরিয়ে যাব।’

ইরা মাথা নাড়ল।

‘না, দিদি। এখনও একটা সত্যি বাকি।’

সে পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করল। চাবির গায়ে খোদাই করা—১৩।

‘কক্ষ ১৩-এর দরজা খুলতে এই চাবি লাগে। কিন্তু এই ঘরটা কক্ষ ১৩ নয়।’

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

‘তাহলে কক্ষ ১৩ কোথায়?’

ইরা মেঝের দিকে তাকাল।

‘আমাদের পায়ের নীচে।’

তারপর সে চাবিটা মেঝের একটি ছোট ছিদ্রে ঢুকিয়ে ঘোরাল।

ঘরের মেঝে কেঁপে উঠল।

বিছানার নীচে একটি গোপন দরজা খুলে গেল। ভিতর থেকে ভেসে এল শিশুর কান্না।

একটি নয়।

দুটি শিশুর কান্না।

সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘না! এই দরজাটা খোলার কথা ছিল না!’

নীলাঞ্জনা নীচের দিকে তাকাল।

অন্ধকার সিঁড়ির শেষে একটি কাচের ঘর দেখা যাচ্ছে। কাচের ভিতরে পাশাপাশি রাখা দুটি ছোট হাসপাতালের বিছানা।

একটি বিছানায় শুয়ে আছে নবজাতক শিশু।

অন্য বিছানাটিও খালি নয়।

সেখানে শুয়ে আছে আরেকটি শিশু।

দুটি শিশুর মুখ অবিকল এক।

আর কাচের ঘরের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

‘প্রকল্প নীল: প্রথম পর্যায় সম্পূর্ণ। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে ১৭ জুলাই, ২০২৬।’

নীলাঞ্জনা তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল।

আজ ১৭ জুলাই, ২০২৬।

ঠিক সেই মুহূর্তে কাচের ঘরের ভিতর থেকে একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘোষণা করল—

‘দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হচ্ছে। বিষয়বস্তু নং ২৭, জেগে উঠুন।’

একটি শিশুর চোখ খুলে গেল।

তারপর অন্য শিশুটিরও।

আর দুজনেই একই সঙ্গে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে হাসল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল দরজার ওপারে প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে কেউ থাকে না)।

রাত তখন এগারোটা বেয়াল্লিশ।

শহরের শেষ বাসটা চলে যাওয়ার পর শালিখা গ্রামের রাস্তায় আর কোনও যানবাহন দেখা যায় না। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক, মাঝে মাঝে বাঁশবাগানের মাথায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, আর আকাশজুড়ে জমে থাকা কালো মেঘ—সব মিলিয়ে রাতটা যেন অস্বাভাবিক রকমের ভারী।

এই অন্ধকারের মধ্যেই একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল নীলাঞ্জনা।

বাড়িটার নাম ‘নীলকুঠি’।

গ্রামের লোকেরা বলে, গত বাইশ বছর ধরে বাড়িটায় কেউ থাকে না। বাড়ির মালিক অমরেশ মুখোপাধ্যায় এক বর্ষার রাতে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী মাধুরী দেবী তার কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যান। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ইরা কোথায় গিয়েছিল, তা কেউ জানে না। কেউ বলে তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল, কেউ বলে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। কিন্তু কোনও কথারই প্রমাণ নেই।

তারপর থেকে বাড়িটা বন্ধ।

তবু প্রতি বছর বর্ষার প্রথম রাতে বাড়ির দোতলার একটি জানালায় নীল আলো জ্বলে ওঠে।

নীলাঞ্জনা এসব গল্প বিশ্বাস করত না।

সে কলকাতার একটি সংবাদপত্রে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লেখে। রহস্যময় বাড়ি, নিখোঁজ মানুষ, পুরোনো মামলা—এসবের পিছনে তার আগ্রহ বহুদিনের। তিন সপ্তাহ আগে তার কাছে একটি বেনামি খাম এসেছিল। খামের ভিতরে ছিল একটি সাদা-কালো ছবি, একটি পুরোনো চাবি এবং মাত্র এক লাইনের চিঠি।

‘তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্য জানতে চাইলে, আষাঢ়ের প্রথম রাতে নীলকুঠিতে এসো।’

চিঠির নীচে কোনও নাম ছিল না।

কিন্তু ছবিটা দেখার পর নীলাঞ্জনার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল।

ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি তার মা—সুচরিতা সেন।

সুচরিতা মারা গিয়েছিলেন যখন নীলাঞ্জনার বয়স মাত্র আট বছর। সরকারি নথিতে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল, গাড়ি দুর্ঘটনা। কিন্তু নীলাঞ্জনার মনে আছে, মৃত্যুর আগের কয়েক মাস মা প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। কাউকে ফোনে খুব নিচু গলায় বলতেন, ‘ওরা আবার ফিরে এসেছে।’

কাদের কথা বলতেন মা?

কেন মৃত্যুর আগের রাতে মাকে এত আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল?

আর বাইশ বছর আগে পরিত্যক্ত একটি বাড়ির সামনে তাঁর মা দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?

ছবির পিছনে লেখা তারিখটি ছিল মায়ের মৃত্যুর ঠিক সাত দিন আগের।

নীলাঞ্জনা ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করল। মরচে পড়া লোহার গেটের তালায় চাবি ঢোকাতেই একটা খটাস শব্দ হল। তালাটা খুলে গেল আশ্চর্য সহজে।

গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ উঠল।

বাড়ির সামনে আগাছায় ঢাকা বাগান। মাঝখানে পাথরের শুকনো ফোয়ারা। একপাশে ভাঙা দোলনা, অন্য পাশে একটি বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মূর্তির মুখ শ্যাওলায় ঢেকে গেছে।

নীলাঞ্জনা টর্চ জ্বালিয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল।

দোতলার বাঁদিকের জানালায় নীল আলো জ্বলছে।

সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। আলোয় বাড়িটার দেয়ালে দেখা গেল লম্বা, কালচে দাগ—যেন বহু বছর আগে আগুন লেগেছিল। অথচ গ্রামের লোকেরা বলেছিল, বাড়িতে কখনও আগুন লাগেনি।

সদর দরজার সামনে পৌঁছে সে কলিং বেল খুঁজল। ভাঙা কাঠের দরজায় বেল নেই। শুধু পিতলের একটি হাতল।

নীলাঞ্জনা হাতলটি তুলতেই ভিতর থেকে তিনবার শব্দ হল।

ঠক। ঠক। ঠক।

সে থমকে দাঁড়াল।

দরজায় তো সে মাত্র একবার আঘাত করেছে।

ভিতর থেকে কে যেন তার আঘাতের জবাব দিল!

‘কে?’ নীলাঞ্জনা জোরে বলল।

কোনও উত্তর এল না।

সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।

একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল। মেঝের ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ। দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো ছবি, অধিকাংশের কাচ ভাঙা। এক কোণে কাঠের আলমারি, তার পাশে পড়ে আছে একটি ভাঙা ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে এগারোটা বেয়াল্লিশে।

নীলাঞ্জনা নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল।

এগারোটা বেয়াল্লিশ।

তার বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঠিক তখনই উপরতলা থেকে কারও পায়ের শব্দ ভেসে এল।

ধীরে ধীরে।

এক পা।

দুই পা।

তিন পা।

যেন কেউ সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছে।

নীলাঞ্জনা টর্চটা সিঁড়ির দিকে ধরল।

কেউ নেই।

কিন্তু সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে একটা ছোট্ট লাল বল গড়িয়ে পড়ল। বলটা তার পায়ের কাছে এসে থামল।

নীলাঞ্জনা বলটা তুলে নিল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার মায়ের আলমারিতে ঠিক এমনই একটি লাল বল ছিল। মা বলতেন, বলটি তাঁর ছোটবেলার। একবার নীলাঞ্জনা খেলতে গিয়ে সেটি হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর আর কখনও খুঁজে পায়নি।

বলটার গায়ে সাদা রঙে লেখা—‘ইরা’।

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল, ‘ইরা কে?’

উপরতলা থেকে এবার একটি মেয়ের গলা ভেসে এল।

‘তুমি এত দেরি করলে কেন?’

গলাটা খুব পরিচিত।

এতটাই পরিচিত যে নীলাঞ্জনার চোখে জল চলে এল।

ওই গলায় তার মা তাকে ছোটবেলায় ঘুম পাড়াতেন।

‘মা?’

শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই বাড়ির ভিতরের সব দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

ধড়াম!

ধড়াম!

ধড়াম!

টর্চের আলো কেঁপে উঠল। নীলাঞ্জনা নিজেকে সামলে সিঁড়ির দিকে এগোল। প্রতিটি ধাপের কাঠ চাপ পড়লেই কেঁদে উঠছে। দোতলায় পৌঁছে সে দেখতে পেল, করিডরের শেষ প্রান্তে একটি দরজা।

দরজাটি নীল রঙের।

বাড়ির অন্য সব দরজা কালচে বাদামি, শুধু এই দরজাটিই উজ্জ্বল নীল। দরজার মাঝখানে পিতলের ছোট্ট ফলকে খোদাই করা—

‘ইরার ঘর। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।’

দরজার নীচ দিয়ে নীল আলো বেরিয়ে আসছে।

নীলাঞ্জনা হাত বাড়িয়ে দরজায় ঠেলা দিল।

দরজাটি খুলল না।

সে হাতল ঘোরাল। তালা দেওয়া।

ব্যাগ থেকে চাবিটা বের করতেই বুঝল, চাবিটি এই দরজার তালার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

চাবি ঢুকিয়ে ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে একটি মেয়ের হাসির শব্দ এল।

তারপর ফিসফিসানি—

‘মাকে তুমি চিনতে পেরেছ?’

নীলাঞ্জনার হাত কেঁপে উঠল।

‘তুমি কে?’

‘আমি ইরা।’

‘তুমি কোথায়?’

‘দরজার ওপারে।’

‘দরজা খোলো।’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেয়েটি বলল, ‘খুললে তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।’

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল, ‘আমি সত্য জানতে এসেছি।’

‘সত্য?’ মেয়েটি হেসে উঠল। ‘সত্য তো তোমার বাড়িতেই ছিল। তুমি কোনও দিন খুঁজে দেখোনি।’

কথাটা শুনে নীলাঞ্জনার মাথার ভিতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।

তার বাড়ি?

কলকাতার ফ্ল্যাটে তো মায়ের পুরোনো জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিলেন। তিনি কখনও নীলকুঠির কথা বলেননি। এমনকী গ্রামের নামও বলেননি।

তাহলে ইরা তার বাড়ির কথা জানে কী করে?

নীলাঞ্জনা আবার চাবি ঘোরাল।

ক্লিক করে তালা খুলে গেল।

দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই ভিতর থেকে বরফশীতল বাতাস বেরিয়ে এল। নীল আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ঘরটা আশ্চর্য পরিষ্কার।

একটি ছোট বিছানা, কাঠের পড়ার টেবিল, দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার, জানালার পাশে নীল পর্দা। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই এবং একটি খোলা ডায়েরি। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বড় আয়না, যার ওপর সাদা কাপড় ঢাকা।

কিন্তু ঘরে কেউ নেই।

নীলাঞ্জনা ভিতরে ঢুকল।

দরজাটি পিছনে বন্ধ হয়ে গেল।

সে দ্রুত ঘুরে হাতল টানল। দরজা নড়ল না।

‘ইরা!’

কোনও উত্তর নেই।

টেবিলের ওপর ডায়েরিটা খুলে সে প্রথম পাতায় তারিখ দেখতে পেল—১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই।

নীলাঞ্জনার জন্ম ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই।

তার শ্বাস আটকে এল।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

‘আজ আমার মেয়ে পৃথিবীতে এসেছে। ওর নাম রাখব নীলাঞ্জনা। কিন্তু ওকে কেউ যেন জানতে না দেয়, ও আসলে কার মেয়ে।’

নীলাঞ্জনা চেয়ারটা ধরে দাঁড়াল।

‘না… এটা হতে পারে না।’

সে পরের পাতাটা উল্টাল।

‘অমরেশ বলেছে, মেয়েটিকে বাঁচাতে হলে ওকে দূরে পাঠাতেই হবে। সুচরিতা রাজি নয়। সে বলছে, মেয়েকে ছাড়া সে বাঁচবে না। কিন্তু আমরা যদি সত্যিটা বলে দিই, তাহলে ওরা নীলাঞ্জনাকেও নিয়ে যাবে।’

পরের পাতাগুলো ছেঁড়া।

শেষ পাতায় শুধু একটি বাক্য—

‘আজ রাত এগারোটা বেয়াল্লিশে দরজাটা খুলবে। যদি নীলাঞ্জনা ফিরে আসে, তাকে বলবে—তার মা কখনও মারা যায়নি।’

নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা হাত থেকে ফেলে দিল।

তার মা মারা যাননি?

তাহলে যে দেহটি সে দেখেছিল, যে শেষকৃত্যে সে কেঁদেছিল, যে ছবির সামনে প্রতি বছর ফুল দিয়েছে—সবই কি মিথ্যে?

তার মাথার মধ্যে একের পর এক স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল। বাবার মুখ, হাসপাতালের করিডর, সাদা চাদরে ঢাকা একটি দেহ, আর মায়ের ঠান্ডা হাত ধরে থাকা ছোট্ট নীলাঞ্জনা।

কিন্তু সেই স্মৃতির মধ্যে একটা অদ্ভুত ফাঁক ছিল।

সে কখনও মায়ের মুখটা স্পষ্ট মনে করতে পারে না।

শুধু কণ্ঠস্বর মনে আছে।

শুধু একটি কথা মনে আছে—

‘কখনও নীল দরজার ওপারে যাস না।’

ঘরের কোণে ঢাকা আয়নাটির দিক থেকে একটা শব্দ এল।

খসখস।

যেন কেউ কাপড়ের নীচে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিল।

আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা গেল না।

দেখা গেল একটি হাসপাতালের ঘর।

সাদা দেয়াল, জানালার পাশে একটি বিছানা। বিছানায় শুয়ে আছে এক মহিলা। মুখে অক্সিজেনের নল। চুলের পাশে পাক ধরেছে, চোখ বন্ধ।

নীলাঞ্জনা মহিলাটিকে চিনতে পারল।

ছবিতে দেখা সেই মুখ।

তার মা—সুচরিতা সেন।

মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বৃদ্ধ। হাতে একটি ফাইল। তাঁর মুখটা স্পষ্ট নয়। তিনি ঝুঁকে মহিলার কানে কিছু বললেন।

সুচরিতা চোখ খুললেন।

আয়নার ওপার থেকে তাঁর ঠোঁট নড়ল।

‘নীলু… পালিয়ে যা।’

ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটি হাত নীলাঞ্জনার কাঁধ চেপে ধরল।

সে চিৎকার করে ঘুরে দাঁড়াল।

একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন তার পিছনে। ধূসর চুল, কুঁচকে যাওয়া মুখ, চোখে মোটা কাচের চশমা। পরনে পুরোনো ধাঁচের সাদা পাঞ্জাবি।

নীলাঞ্জনা তাঁকে কোনও দিন দেখেনি।

কিন্তু বৃদ্ধের মুখে এমন এক পরিচিত বিষণ্ণতা ছিল, যেন বহু বছর ধরে তিনি তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

বৃদ্ধ বললেন, ‘তুমি অবশেষে এসেছ।’

‘আপনি কে?’

‘যে মানুষটাকে তোমার বাবা মৃত বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন।’

নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তিনজন মানুষ—একজন তরুণী, একজন পুরুষ এবং কোলে একটি শিশু। তরুণীটি সুচরিতা। পুরুষটির মুখ বৃদ্ধের সঙ্গে মিলে যায়।

আর শিশুটি—

নীলাঞ্জনার নিজের মুখের মতো।

কিন্তু ছবির পিছনে লেখা ছিল অন্য একটি নাম।

‘ইরা মুখোপাধ্যায়।’

বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমাকে নীলাঞ্জনা নামে বড় করা হয়েছে। কিন্তু তোমার জন্মের সময় তোমার নাম রাখা হয়েছিল ইরা। আর যে মেয়েটিকে তুমি এতক্ষণ খুঁজছ, সে তোমার বোন।’

নীলাঞ্জনা কোনও কথা বলতে পারল না।

‘আমার বোন কোথায়?’

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই নীল দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

দরজার ওপাশ থেকে একটি মেয়ের গলা চিৎকার করে উঠল—

‘দাদু, ওকে কিছু বলো না! ও এখনও জানে না, ওর ভিতরে কী আছে!’

বৃদ্ধের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি নীলাঞ্জনার হাত শক্ত করে ধরলেন।

‘শোনো, যা-ই ঘটুক, দরজাটা আবার খুলবে না। তোমার বোন ওখানে নেই।’

‘তাহলে কে কথা বলছে?’

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

দরজার ওপাশের কণ্ঠস্বর এবার বদলে গেল। মেয়েলি গলা মিলিয়ে গেল এক পুরুষের কর্কশ হাসিতে।

তারপর শোনা গেল নীলাঞ্জনার বাবার কণ্ঠস্বর—

‘নীলু, দরজাটা খোলো। বাবা এসেছে।’

নীলাঞ্জনা জমে গেল।

তার বাবা মারা গিয়েছেন পাঁচ বছর আগে।

আয়নার ভিতরে হাসপাতালের দৃশ্যটা আবার ফিরে এল। বিছানায় শুয়ে থাকা সুচরিতা এবার চোখ মেলে সরাসরি নীলাঞ্জনার দিকে তাকালেন।

আয়নার কাচে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কয়েকটি শব্দ—

‘তোমার জন্মের দিন একজন মারা গিয়েছিল। কিন্তু সে তোমার মা নয়।’

তারপর আলো নিভে গেল।

পুরো ঘর অন্ধকার।

বৃদ্ধের হাত নীলাঞ্জনার হাত থেকে সরে গেল।

সে চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি কোথায়?’

কোনও উত্তর এল না।

শুধু অন্ধকারের মধ্যে কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।

তারপর একেবারে কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলল—

‘ইরা, এবার তোমার পালা।’

দরজার বাইরে আবার তিনবার আঘাত পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

এবার নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, শব্দটা দরজার ওপার থেকে আসছে না।

আসছে তার নিজের বুকের ভিতর থেকে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল এমন একটি স্মৃতি, যা তার মনে থাকার কথা নয়।

একটি হাসপাতালের ঘর।

দুটি নবজাতক শিশু।

একটি শিশুকে কোলে তুলে নিচ্ছেন সুচরিতা।

অন্য শিশুটিকে নিয়ে অন্ধকার করিডরে চলে যাচ্ছেন এক অচেনা মানুষ।

আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার বাবা বলছেন—

‘একটাকে বাঁচাতে হলে অন্যটাকে হারাতেই হবে।’

নীলাঞ্জনা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি শিশুর কান্না ভেসে এল।

সেই কান্না যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা কোনও দরজার ওপার থেকে আসছে।

আর বাড়ির নীচতলায়, যেখানে ভাঙা ঘড়িটা এগারোটা বেয়াল্লিশে থেমে ছিল, সেখানে ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল।

এগারোটা তেতাল্লিশ।

বাইশ বছর পর প্রথমবার।

নীলকুঠির সব জানালায় একসঙ্গে নীল আলো জ্বলে উঠল।

বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে তখন একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে সাদা পোশাক, হাতে লাল বল। মুখটা নীলাঞ্জনার মতোই।

সে বাড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—

‘দিদি, এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।’

তারপর সে গেটের দিকে এগিয়ে এল।

কিন্তু গেটের তালা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল না।

ভিতর থেকে কেউ সেটি আটকে রেখেছিল।

চলবে…

Share This