Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : ছায়ার মঞ্চ (তৃতীয় পর্ব — যে সত্যের কোনো দর্শক ছিল না)।

তৃতীয় পর্ব — যে সত্যের কোনো দর্শক ছিল না

১. অন্ধকারের মানুষ

অন্ধকারের মধ্যে নীলাঞ্জনা নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।

কয়েক মুহূর্ত আগেও শর্মিষ্ঠা বসু তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এখন তিনি নেই। মঞ্চের ওপর থেকে ভেসে আসা পুরুষকণ্ঠটিও থেমে গেছে।

অরিন্দম মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নীলাঞ্জনার পাশে এসে দাঁড়াল।

— তুমি ঠিক আছ?

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল না। সে মেঝে থেকে পাণ্ডুলিপিটি তুলে নিল। তার হাত কাঁপছিল।

— তুমি শুনেছ? লোকটা বলল, আমার বাবার দুর্ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।

— শুনেছি। কিন্তু এখন আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে।

ঠিক তখনই অডিটোরিয়ামের পেছনের দরজায় একটা শব্দ হলো।

কেউ দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।

অরিন্দম দরজার কাছে গিয়ে ধাক্কা দিল। দরজা নড়ল না।

— কে আছেন? দরজা খুলুন!

কোনো উত্তর নেই।

মহাদেবকে ডাকতে গিয়ে নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, নিরাপত্তারক্ষীও আর আশপাশে নেই।

অরিন্দম ফোনে আলো ফেলল। মঞ্চের বাঁ দিকে সরু করিডরটি দেখা যাচ্ছে। সেখান দিয়ে সাজঘরের দিকে যাওয়া যায়। তারা দ্রুত সেই পথে এগোল।

করিডরের শেষে একটি দরজা আধখোলা। দরজার ওপাশে পুরোনো পোশাক রাখার ঘর।

নীলাঞ্জনা ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ পড়ল সেই চিড় ধরা আয়নার ওপর।

আয়নার সামনে একটি চেয়ার রাখা। চেয়ারের ওপর সাদা শাড়ির একটি অংশ, আর তার পাশে রুপোর আংটি।

সে আংটিটি হাতে তুলতে যাচ্ছিল, অরিন্দম বাধা দিল।

— ছুঁয়ো না। আগে ছবি তুলি।

ছবি তোলার পর নীলাঞ্জনা আংটিটি তুলে নিল। সেটি ঠান্ডা, ভারী এবং অস্বাভাবিকভাবে পুরোনো।

আংটির ভেতরের দিকে ছোট করে দুটি অক্ষর খোদাই করা—

শ. ব.

শর্মিষ্ঠা বসু।

তাহলে তিনি সত্যিই এখানে ছিলেন। কিন্তু কোথায় গেলেন?

অরিন্দম আয়নার ফ্রেম পরীক্ষা করতে লাগল। ফ্রেমের নীচে একটি ছোট ধাতব বোতাম রয়েছে। সেটি চাপতেই আয়নার এক পাশ সামান্য সরে গেল।

পেছনে সরু একটি ফাঁকা জায়গা।

সেখানে একটি ছোট স্পিকার, কিছু পুরোনো তার এবং একটি আধুনিক ডিজিটাল অডিও যন্ত্র রাখা।

অরিন্দম অবাক হয়ে বলল, — তাহলে এতক্ষণ যে কণ্ঠ শুনেছি, সেটা এখান থেকে চালানো হয়েছে!

নীলাঞ্জনা যন্ত্রটির দিকে তাকাল।

— কিন্তু যে লোকটা আমার কানের কাছে কথা বলল?

অরিন্দম চারদিকে তাকাল।

— এখানে নিশ্চয়ই অন্য কোনো গোপন পথ আছে।

তারা ঘরটি খুঁজতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর পোশাক রাখার আলমারির পেছনে একটি সরু দরজা পাওয়া গেল। দরজাটি সরাসরি ভবনের পুরোনো পরিষেবা-করিডরে খুলে যায়।

সেই পথ দিয়ে বেরিয়ে তারা অডিটোরিয়ামের পেছনের উঠোনে পৌঁছল।

বাইরে এসে নীলাঞ্জনা দেখল, মহাদেব গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি কিছুই জানেন না।

— আপনারা এখানে? — মহাদেব বিস্মিত হয়ে বললেন। — আমি তো সামনের দরজায় ছিলাম!

নীলাঞ্জনা সরাসরি প্রশ্ন করল, — আজ রাতে এখানে আর কেউ ঢুকেছিল?

মহাদেব একটু ইতস্তত করলেন।

— একজন লোক এসেছিল। বলল, পুরসভার লোক। কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরীক্ষা করতে এসেছে। আমি তাকে বাধা দিইনি, কারণ তার কাছে কাগজ ছিল।

— তার নাম জানেন?

— বলেছিল, নাম প্রবীর সেন।

নীলাঞ্জনা নামটি মনে রাখল।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে প্রথমবার অনুভব করল, কেউ তার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে। শুধু ভয় দেখানো নয়, তাকে নির্দিষ্ট পথে চালিত করাও যেন সেই অদৃশ্য মানুষের উদ্দেশ্য।

কিন্তু কেন?

সে কি সত্যিই অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রহস্য জানতে চায়, নাকি কেউ তার বাবার অতীত ব্যবহার করে তাকে ফাঁদে ফেলছে?

উত্তর পেতে হলে তাকে শর্মিষ্ঠা বসুকে আবার খুঁজে বের করতেই হবে।

২. মাধুরী সেনের দরজা

পরদিন সকালে নীলাঞ্জনা অরিন্দমের সঙ্গে দেখা করল। আগের রাতের সমস্ত ঘটনা তারা সাজিয়ে লিখল। তারপর মাধুরী সেনের সন্ধানে বেরোল।

পুরোনো নাট্যসংগঠনের এক কর্মীর সাহায্যে তারা জানতে পারল, মাধুরী এখন দক্ষিণ কলকাতার একটি শান্ত আবাসনে থাকেন। বহু বছর আগে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি অনুবাদ এবং বই সম্পাদনার কাজ করতেন।

বাড়ির দরজায় ঘণ্টা বাজাতেই একজন মহিলা দরজা খুললেন।

বয়স ষাটের কাছাকাছি। মুখে ক্লান্তি, চোখে সতর্কতা।

— আপনি মাধুরী সেন?

— হ্যাঁ। কী দরকার?

নীলাঞ্জনা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, — আমি রঙ্গমহল এবং অদ্বৈত রায়ের শেষ নাটক নিয়ে অনুসন্ধান করছি।

মাধুরীর মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

— ওই নামটা আমি আর শুনতে চাই না।

তিনি দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। নীলাঞ্জনা দ্রুত বলল—

— আমার বাবা অনিরুদ্ধ দত্ত ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের কাজ করতেন। তাঁর নাম ওই নাটকের নথিতে পেয়েছি।

মাধুরী থেমে গেলেন।

— অনিরুদ্ধবাবুর মেয়ে?

— হ্যাঁ।

মাধুরী ধীরে দরজা খুললেন।

— ভেতরে আসুন।

বসার ঘরটি বইয়ে ভরা। দেওয়ালে কয়েকটি পুরোনো নাটকের পোস্টার। এক কোণে কাঠের বাক্সের ওপর রাখা একটি ফ্রেমে অদ্বৈত রায়ের ছবি।

মাধুরী ছবিটির দিকে তাকিয়ে বললেন, — আপনার বাবা সৎ মানুষ ছিলেন। তাঁর মতো মানুষ খুব কম দেখেছি।

নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করল, — সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?

মাধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

— অদ্বৈতবাবু শেষ কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্থির ছিলেন। তিনি দাবি করতেন, ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর গল্পের সঙ্গে একটি বাস্তব অপরাধের মিল রয়েছে। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, নাটককে প্রচারের আলোয় আনার জন্য তিনি এমন কথা বলছেন। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, তিনি সত্যিই ভয় পাচ্ছেন।

— কী অপরাধ?

— রঙ্গমহলের তহবিল থেকে টাকা উধাও হওয়ার ঘটনা। বহু বছর ধরে হিসাবের গরমিল চলছিল। কিছু নথি জাল করা হয়েছিল। অদ্বৈতবাবু জানতে পেরেছিলেন, সেই টাকা দিয়ে শহরের বাইরে একটি সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জমি কেনার নাম করে অন্যত্র অর্থ সরানো হয়েছে।

অরিন্দম বলল, — এই কাজের সঙ্গে দেবব্রত লাহিড়ী যুক্ত ছিলেন?

মাধুরী মাথা নাড়লেন।

— শুধু তিনি নন। আরও কয়েকজন ছিলেন। কিন্তু অদ্বৈতবাবু সব প্রমাণ হাতে পাওয়ার আগেই সমস্যায় পড়ে যান।

নীলাঞ্জনা প্রশ্ন করল, — তাঁর মৃত্যু কি পরিকল্পিত ছিল?

মাধুরী জানালার দিকে তাকালেন।

— আমি নিজে কাউকে তাঁকে আঘাত করতে দেখিনি। তবে সেদিন মঞ্চের আলো ও শব্দের নিয়ন্ত্রণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছিল। নাটকের শেষ দৃশ্যে আলো নিভে যাওয়ার কথা ছিল মাত্র তিন সেকেন্ডের জন্য। কিন্তু সেদিন অন্ধকার ছিল অনেক বেশি সময়। সেই সময়ে মঞ্চে কী ঘটেছিল, দর্শকেরা কেউ দেখতে পায়নি।

— আর আপনি?

— আমি মঞ্চে ছিলাম। অন্ধকারের মধ্যে একটা ধস্তাধস্তির শব্দ শুনেছিলাম। তারপর একটা ভারী বস্তু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ। আলো জ্বলার পর অদ্বৈতবাবু মেঝেতে পড়ে ছিলেন।

— আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেছিলেন?

মাধুরী উত্তর দেওয়ার আগে ঘরের দরজার দিকে তাকালেন।

— সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু প্রমাণ ছিল না।

— কার ওপর?

মাধুরী ধীরে বললেন, — সমরেশ বসুর ওপর। কারণ শেষ মুহূর্তে আলো নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন।

নীলাঞ্জনা বলল, — সমরেশ বসু এখন কোথায়?

— বেঁচে আছেন। তবে বহু বছর ধরে জনসমক্ষে আসেন না। শুনেছি, তিনি এখন নাটকের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।

অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল, — তাঁর ঠিকানা জানেন?

মাধুরী একটি কাগজে ঠিকানা লিখে দিলেন।

তারপর নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বললেন—

— একটা কথা মনে রাখবেন। সেদিন মঞ্চে যা ঘটেছিল, তার জন্য শুধু একজন মানুষকে দায়ী করলে ভুল হবে। অদ্বৈতবাবুর মৃত্যু ছিল একটি ঘটনার শেষ নয়। সেটি ছিল অনেক বড় কিছুর শুরু।

৩. পরিচালকের স্বীকারোক্তি

সমরেশ বসু থাকতেন কলকাতার উপকণ্ঠে একটি ছোট বাড়িতে। বাড়ির সামনে কোনো নামফলক নেই। দরজার পাশে শুধু একটি শুকিয়ে যাওয়া মানিপ্ল্যান্টের টব।

নীলাঞ্জনা ও অরিন্দম পৌঁছলে দরজা খুললেন এক বৃদ্ধ। তাঁর শরীর রোগা, মুখে গভীর বলিরেখা।

— কী চান?

নীলাঞ্জনা নিজের পরিচয় দিল।

— আমি অদ্বৈত রায়ের শেষ নাটক নিয়ে কাজ করছি। আপনার সঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই।

সমরেশের চোখে আতঙ্কের ছায়া দেখা গেল।

— আমি ওই বিষয়ে কথা বলব না।

তিনি দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। নীলাঞ্জনা বলল—

— আমার বাবা অনিরুদ্ধ দত্তের নাম কি আপনার মনে আছে?

সমরেশ থেমে গেলেন।

দীর্ঘক্ষণ নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি দরজা খুলে দিলেন।

— ভেতরে আসুন।

ঘরের মধ্যে একটি পুরোনো ডেস্ক, কিছু বই এবং দেওয়ালে ঝোলানো নাটকের পোস্টার। সমরেশ একটি চেয়ারে বসে বললেন—

— আপনার বাবার কাছে আমি ঋণী।

নীলাঞ্জনা বিস্মিত হলো।

— কীসের ঋণ?

— তিনি যদি সেদিন আমাকে সাহায্য না করতেন, তাহলে হয়তো আমিও বাঁচতাম না।

অরিন্দম দ্রুত প্রশ্ন করল, — অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রাতে কী ঘটেছিল?

সমরেশ চোখ বন্ধ করলেন।

— অদ্বৈত সত্য জানতে পেরেছিল। সে জানতে পেরেছিল, রঙ্গমহলের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দেবব্রত লাহিড়ী ছাড়াও আরও কয়েকজন যুক্ত। সে মূল নথি সংগ্রহ করেছিল। পরিকল্পনা ছিল, নাটকের শেষ অভিনয়ের পর সংবাদমাধ্যমের হাতে সেই নথি তুলে দেবে।

— তাহলে তাকে থামানোর জন্য কেউ ব্যবস্থা করেছিল?

— হ্যাঁ। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, তাকে শুধু ভয় দেখানো হবে। আমি বুঝতে পারিনি, ঘটনাটা এত দূর গড়াবে।

নীলাঞ্জনা কঠিন গলায় বলল, — আপনি আলো নিভিয়ে দিয়েছিলেন কেন?

সমরেশ মুখ তুলে তাকালেন।

— কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, শেষ দৃশ্যের সময় একটি বিশেষ সংকেত দিতে হবে। আমি ভেবেছিলাম, কয়েকজন লোক মঞ্চে উঠে অদ্বৈতের কাছ থেকে নথি নিয়ে যাবে। কিন্তু অন্ধকারে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তারপর শব্দ। আলো জ্বলার পর অদ্বৈত পড়ে ছিল।

— আপনি কি দেখেছিলেন কে তাকে আঘাত করেছিল?

সমরেশ মাথা নাড়লেন।

— না। কিন্তু আমি একটা জিনিস দেখেছিলাম। অন্ধকারের মধ্যে একজন মঞ্চের পেছনের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। তার হাতে ছোট ধাতব যন্ত্র ছিল।

— কী যন্ত্র?

— দেখতে পুরোনো মঞ্চ-নিয়ন্ত্রণের রিমোটের মতো। ওই যন্ত্র দিয়ে আলো ও শব্দের সংকেত বদলানো যেত। কিন্তু রঙ্গমহলের মূল যন্ত্রে তার ব্যবহার হওয়ার কথা নয়।

নীলাঞ্জনা আগের রাতের গোপন অডিও যন্ত্রটির কথা মনে করল।

সমরেশ বললেন, — ঘটনার পর আমাকে বলা হয়, আমি যদি মুখ খুলি, তাহলে আমার পরিবার বিপদে পড়বে। আমি ভয়ে চুপ করে যাই। পরে যখন বুঝলাম, অদ্বৈতের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

— আপনি কি জানেন, আমার বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?

সমরেশের মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— আপনার বাবাকে দুর্ঘটনার আগের রাতে আমি শেষবার দেখেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, মূল পাণ্ডুলিপির দ্বিতীয় অনুলিপি নিরাপদে রাখা হয়েছে। তিনি জানতেন, কেউ তাঁকে অনুসরণ করছে।

— তিনি কি কারও নাম বলেছিলেন?

সমরেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—

— হ্যাঁ। তিনি বলেছিলেন, যে মানুষটি মঞ্চের আলো নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই বাস্তবের অন্ধকারও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল না।

— এর মানে কী?

সমরেশ উত্তর দিলেন, — সেই সময় রঙ্গমহলের আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিল একজন প্রযুক্তিবিদ। তার নাম প্রবীর সেন।

নীলাঞ্জনার মনে পড়ল নিরাপত্তারক্ষী মহাদেবের কথা।

প্রবীর সেন।

যে লোকটি নিজেকে পুরসভার কর্মী পরিচয় দিয়ে রঙ্গমহলে ঢুকেছিল।

অরিন্দম বলল, — সে এখন কোথায়?

সমরেশ মাথা নাড়লেন।

— জানি না। কিন্তু একটা কথা বলতে পারি। প্রবীর কখনও শুধু প্রযুক্তিবিদ ছিল না। সে জানত, কোন আলো কখন নিভবে, কোন দরজা কখন খুলবে, আর মঞ্চের কোন কোণ থেকে কে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

৪. যে মানুষটি আলো নিভিয়েছিল

পরদিন নীলাঞ্জনা পুরসভার দপ্তরে যোগাযোগ করল। প্রবীর সেন নামে কোনো কর্মীর সাম্প্রতিক নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেল না। পুরোনো নথিতে অবশ্য ওই নাম ছিল। তিনি রঙ্গমহলের আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে কাজ করতেন, কিন্তু ২০০৯ সালের ডিসেম্বরেই চাকরি ছেড়ে দেন।

তাঁর শেষ জানা ঠিকানা ছিল উত্তর কলকাতার একটি ভাড়া বাড়ি।

নীলাঞ্জনা ও অরিন্দম সেখানে পৌঁছে জানতে পারল, বাড়িটি বহু বছর আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশের দোকানের এক বৃদ্ধ বললেন, প্রবীর সেন নাকি পরে অন্য শহরে চলে গিয়েছিলেন।

কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি একটি ছোট ইলেকট্রনিক মেরামতির দোকান চালাতেন।

দোকানের পুরোনো নাম ছিল ‘সেন ইলেকট্রনিক্স’।

বর্তমানে সেখানে একটি মোবাইল সারাইয়ের দোকান। মালিক জানালেন, তাঁর বাবা এই দোকানটি কিনেছিলেন। আগের মালিকের কিছু জিনিস এখনও গুদামে আছে।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি পুরোনো ধাতব বাক্স পাওয়া গেল। বাক্সের গায়ে মুছে যাওয়া অক্ষরে লেখা—‘পি. সেন’।

ভেতরে ছিল কিছু সার্কিট, তার, ছোট সুইচ এবং একটি কালো যন্ত্র।

অরিন্দম যন্ত্রটি হাতে নিয়ে বলল, — এটা পুরোনো রিমোট কন্ট্রোল ইউনিট হতে পারে।

নীলাঞ্জনা যন্ত্রটির পাশে একটি খাম পেল। খামের মধ্যে একটি বিল এবং কয়েকটি নাম লেখা কাগজ।

বিলটি তৈরি করা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর। তাতে উল্লেখ ছিল, রঙ্গমহলের আলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় বিশেষ পরিবর্তন করা হয়েছে।

যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম—‘লাহিড়ী টেকনিক্যাল সার্ভিসেস’।

দেবব্রত লাহিড়ীর প্রতিষ্ঠান!

কাগজের নীচে হাতে লেখা একটি বাক্য—

“বিশেষ সংকেতের পর আলো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে ৪৫ সেকেন্ড। পুনরায় চালু হবে কেবল দ্বিতীয় সুইচে।”

নীলাঞ্জনা কাগজটি অরিন্দমকে দেখাল।

— নাটকের সময় তো অন্ধকার থাকার কথা ছিল মাত্র তিন সেকেন্ড। কিন্তু এখানে পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের কথা লেখা।

অরিন্দম বলল, — তার মানে, আলো নিভিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল। তবে কে সেই সুযোগ ব্যবহার করেছে, তা এখনও প্রমাণিত নয়।

ঠিক তখন দোকানের মালিক এসে বললেন, — আপনারা কি প্রবীরবাবুকে খুঁজছেন?

নীলাঞ্জনা চমকে তাকাল।

— আপনি তাঁকে চেনেন?

— আমার বাবা বলতেন, লোকটা মাঝেমধ্যে দোকানে আসত। বহু বছর আগে একবার বলেছিল, সে যদি কোনোদিন ফিরে আসে, তাহলে একটা বাক্স তার জন্য তুলে রাখতে।

— সে কি ফিরে এসেছিল?

— হ্যাঁ। প্রায় পাঁচ বছর আগে। কিন্তু বাক্সটি নিয়ে যায়নি। শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, কেউ তার খোঁজ করেছে কি না।

— সে কোথায় থাকে, জানেন?

দোকানের মালিক একটু ভেবে বললেন—

— আমার বাবা বলেছিলেন, সে সম্ভবত হাওড়ার দিকে একটি পুরোনো নাট্যদলের সঙ্গে কাজ করত।

নীলাঞ্জনা আর অরিন্দম একে অন্যের দিকে তাকাল।

তারা বুঝতে পারছিল, রহস্যের কেন্দ্র ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু প্রবীরকে খুঁজে পাওয়ার আগে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার—অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর পর মূল পাণ্ডুলিপির দ্বিতীয় অনুলিপি কীভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং কেন তার মধ্যে নীলাঞ্জনার নাম ছিল।

সেই উত্তর সম্ভবত শর্মিষ্ঠা বসুর কাছে আছে।

৫. শর্মিষ্ঠার শেষ সাক্ষ্য

শর্মিষ্ঠা বসুর সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। মাধুরীও তাঁর বর্তমান ঠিকানা জানতেন না। তবে নীলাঞ্জনার মনে পড়ল, রঙ্গমহলে শর্মিষ্ঠা বলেছিলেন, অদ্বৈতের মৃত্যুর রাতের সত্য তিনি জানেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি বলেছিলেন—নীলাঞ্জনার বাবা শেষ মুহূর্তে একজনের জীবন বাঁচিয়েছিলেন।

কিন্তু সেই মানুষটি কে?

নীলাঞ্জনা মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে আবার প্রশ্ন করল।

— মা, আমার ছোটবেলার কোনো ছবি কি তোমার কাছে আছে, যেখানে আমি চার বছর বয়সে কারও কোলে ছিলাম?

সুপর্ণা অবাক হলেন।

— অনেক ছবি ছিল। বেশির ভাগই পুরোনো অ্যালবামে আছে।

তারা আলমারি থেকে অ্যালবাম বের করল। পাতার পর পাতা উল্টে হঠাৎ একটি ছবি পাওয়া গেল।

ছবিতে চার বছরের নীলাঞ্জনা একটি নাট্যমঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে। পাশে একজন তরুণী, তাঁর কাঁধে হাত রেখে আছেন অনিরুদ্ধ দত্ত।

তরুণীটি শর্মিষ্ঠা বসু।

ছবির পেছনে লেখা—“রঙ্গমহল, ২০০২। নীলুর প্রথম নাটক দেখা।”

নীলাঞ্জনা ছবিটি মায়ের সামনে ধরল।

— তুমি আমাকে রঙ্গমহলে নিয়ে গিয়েছিলে?

সুপর্ণা ধীরে মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। তোমার বাবা চেয়েছিলেন, তুমি ছোটবেলা থেকেই নাটক দেখো। শর্মিষ্ঠা তখন তাঁর বন্ধু ছিলেন। কিন্তু অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর পর তিনি আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি।

— তুমি কি জানো, তিনি কোথায় থাকেন?

— না। তবে একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদি কখনও বিপদ আসে, তাহলে ‘শেষ আলোর ঘর’-এ যেতে।

নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে বলল, — শেষ আলোর ঘর কোথায়?

সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।

— জানি না। আমি ভেবেছিলাম, ওটা নাটকের কোনো নাম বা রূপক।

নীলাঞ্জনা আবার পুরোনো নোটবুকটি খুলল। পাতাগুলোর মধ্যে এক জায়গায় বাবার হাতের লেখায় একটি বাক্য পাওয়া গেল—

“শর্মিষ্ঠা বলেছে, সত্যের শেষ আলো জ্বলে থাকে সেই ঘরে, যেখানে দর্শকের প্রবেশ নিষেধ।”

অরিন্দম বলল, — এটা রঙ্গমহলের নিয়ন্ত্রণকক্ষ হতে পারে। কিন্তু আমরা সেখানে গিয়ে তো কিছু পাইনি।

নীলাঞ্জনা ধীরে বলল, — হয়তো আমরা ভুল ঘর খুঁজেছি।

তার মনে পড়ল, রঙ্গমহলের ওপরের তলায় একটি পুরোনো কক্ষ আছে, যেখানে আগে আলো নিয়ন্ত্রণ করা হতো। নিরাপত্তারক্ষী মহাদেব বলেছিলেন, সিঁড়িটি ভাঙা বলে সেখানে যাওয়া নিষেধ।

কিন্তু যদি সেই ঘরেই লুকিয়ে থাকে শেষ প্রমাণ?

পরদিন সকালে তারা আবার রঙ্গমহলে গেল। এবার মহাদেবকে সঙ্গে নিয়ে ওপরের তলায় ওঠার ব্যবস্থা করল। ভাঙা সিঁড়ির পাশ দিয়ে একটি সরু লোহার সিঁড়ি ছিল, যা পুরোনো কর্মীদের জন্য ব্যবহার করা হতো।

উপরে পৌঁছে তারা একটি ছোট ঘর পেল। ঘরের জানালাগুলো কাঠের পাটাতনে বন্ধ। দেওয়ালে পুরোনো সুইচবোর্ড, মেঝেতে ধুলো আর তারের স্তূপ।

ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল।

টেবিলের ওপর একটি খাতা।

নীলাঞ্জনা খাতাটি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“শেষ আলোর ঘর — শর্মিষ্ঠা বসু।”

খাতার ভেতরে নাটকের আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত নকশা। কোথায় দাঁড়ালে মঞ্চের কোন অংশ দেখা যায়, কোন সুইচ চাপলে আলো নিভে যায়, কোন দরজা দিয়ে অভিনেতারা প্রবেশ করেন—সব লেখা।

শেষের পাতায় একটি দীর্ঘ বিবৃতি।

শর্মিষ্ঠা লিখেছিলেন—

“১৪ নভেম্বরের রাতে অদ্বৈত রায়কে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, তাঁর মৃত্যুর আগে মঞ্চের আলো ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। সেই অন্ধকারে যা ঘটেছিল, তা প্রত্যক্ষ করেছিল একজন শিশু। শিশুটিকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যান অনিরুদ্ধ দত্ত। পরদিন সেই শিশুর স্মৃতি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কয়েকজন মানুষ নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেন।”

নীলাঞ্জনা পড়তে পড়তে থেমে গেল।

একজন শিশু।

সে কি নিজেই সেই শিশু?

কিন্তু তার বয়স তখন মাত্র দশ। আর নথিতে যে ছবিটি পাওয়া গেছে, সেটি ২০০২ সালের, যখন তার বয়স চার।

সে কি অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রাতে রঙ্গমহলে ছিল?

তার মনে কোনো স্মৃতি নেই।

খাতার শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“শিশুটি যদি কখনও ফিরে আসে, তাকে জানাতে হবে, সে কোনো অপরাধের অংশ ছিল না। কিন্তু সে এমন একটি সত্য দেখেছিল, যা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও সহ্য করতে পারেনি।”

নীলাঞ্জনা খাতাটি বন্ধ করল।

ঠিক তখনই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ হলো।

মহাদেব দরজার কাছে গিয়ে বললেন, — কে?

কোনো উত্তর নেই।

অরিন্দম দরজা খুলে বাইরে তাকাল।

করিডরের মেঝেতে একটি ছোট কাগজ পড়ে আছে।

নীলাঞ্জনা কাগজটি তুলে নিল।

তাতে লেখা—

“শর্মিষ্ঠাকে খুঁজবেন না। তিনি আর কাউকে বাঁচাতে পারবেন না।”

কাগজের নীচে একটি ঠিকানা।

হাওড়ার একটি পুরোনো নাট্যগুদাম।

আর পাশে একটি সময়—

আজ রাত ১০টা।

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, কেউ তাদের প্রবীর সেনের কাছে নিয়ে যেতে চাইছে।

অথবা তাদের এমন কোথাও ডেকে পাঠাচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার পথ নাও থাকতে পারে।

সে অরিন্দমের দিকে তাকাল।

— আমরা যাব।

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

— যাব। তবে এবার কাউকে না জানিয়ে নয়।

নীলাঞ্জনা নিজের ফোন বের করে মায়ের কাছে একটি বার্তা পাঠাল। তারপর সব নথির ছবি তুলে নিরাপদে সংরক্ষণ করল।

রাত দশটার আগে তারা হাওড়ার উদ্দেশে রওনা হলো।

পুরোনো নাট্যগুদামটি ছিল একটি নির্জন শিল্পাঞ্চলের শেষ প্রান্তে। বাইরে কোনো আলো নেই। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে।

দরজার কাছে পৌঁছতেই ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—

— নীলাঞ্জনা দত্ত, তুমি অবশেষে এসেছ।

সে থমকে দাঁড়াল।

এই কণ্ঠ সে আগে শুনেছে।

রঙ্গমহলের অন্ধকারে।

অদ্বৈত রায়ের পুরোনো রেকর্ডিংয়ে।

কিন্তু এবার কণ্ঠটি কোনো যন্ত্র থেকে নয়। একজন জীবিত মানুষের মুখ থেকে আসছে।

দরজার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল এক বৃদ্ধ।

তাঁর হাতে একটি ছোট ধাতব বাক্স।

তিনি নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“তোমার বাবাকে আমি থামাতে পারিনি। অদ্বৈতকেও বাঁচাতে পারিনি। এবার অন্তত তোমাকে সত্যিটা জানাতে চাই।”

নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল—

— আপনি কি প্রবীর সেন?

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। আর আমি তোমাকে এমন একটি সত্য বলব, যা জানার পর তুমি হয়তো আর কখনও কোনো নাটককে শুধু নাটক বলে ভাবতে পারবে না।

তিনি বাক্সটি খুললেন।

ভেতরে ছিল একটি ছোট রেকর্ডার এবং একটি ছবি।

ছবিতে অদ্বৈত রায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি।

নীলাঞ্জনা ছবিটি দেখে জমে গেল।

লোকটি তার বাবা অনিরুদ্ধ দত্ত।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা তারিখটি ছিল—

১৫ নভেম্বর, ২০০৯।

অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর পরের দিন।

নীলাঞ্জনা ধীরে মাথা তুলল।

— বাবা যদি ওই দিনও জীবিত থাকতেন, তাহলে তাঁর মৃত্যু কবে হয়েছিল?

প্রবীর সেনের মুখে গভীর বিষণ্ণতা ফুটে উঠল।

তিনি বললেন—

“অনিরুদ্ধ দত্তের মৃত্যু যে দিন ঘোষণা করা হয়েছিল, সেদিন তিনি আর বেঁচে ছিলেন না—এ কথা সত্যি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর গল্পে যে নামটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেই নামটি আজও কেউ জানে না।”

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, সে সত্যের আরও কাছে এসেছে।

কিন্তু প্রবীরের পরের কথাটি তার সমস্ত ধারণা ভেঙে দিল।

“তোমার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। আর সেই হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এমন একজন, যাকে তুমি ইতিমধ্যেই বিশ্বাস করেছ।”

ঘরের বাতি নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে ধাতব বাক্সটি মেঝেতে পড়ে গেল।

তারপর একটি গুলির শব্দ।

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল।

আলো ফিরে আসার আগেই কেউ তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল গুদামের পেছনের দরজার দিকে।

আর মেঝেতে পড়ে রইলেন প্রবীর সেন।

তাঁর বুকের কাছে রক্তের দাগ ছড়িয়ে পড়ছে।

কিন্তু গুলিটা কে চালিয়েছিল?

আর প্রবীরের শেষ কথায় যে বিশ্বাসঘাতকের কথা বলা হয়েছিল, সেই মানুষটি কি নীলাঞ্জনার সবচেয়ে কাছের কেউ?

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : ছায়ার মঞ্চ (দ্বিতীয় পর্ব — দর্শকাসনের তেরো নম্বর চেয়ার)।

দ্বিতীয় পর্ব — দর্শকাসনের তেরো নম্বর চেয়ার

১. শুক্রবারের আমন্ত্রণ

শুক্রবার বিকেল থেকেই আকাশের মুখ ভার। কলকাতার রাস্তায় সারাদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যার পর বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তেই উত্তর শহরের পুরোনো অলিগলিগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।

নীলাঞ্জনা নিজের ঘরে বসে বারবার ঘড়ি দেখছিল।

রাত আটটায় রঙ্গমহলে যেতে হবে।

কিন্তু সে কি সত্যিই যাবে?

গত দুদিনে তার কাছে আরও তিনটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। প্রথম দুবার কেউ কথা বলেনি। তৃতীয়বার এক নারীকণ্ঠ বলেছিল, “আপনি যা খুঁজছেন, তা পেলে হয়তো আপনার নিজের জীবন সম্পর্কেও কিছু প্রশ্ন উঠবে।”

কথাটা বলে ফোন কেটে দেওয়া হয়েছিল।

নীলাঞ্জনা চেষ্টা করেও নম্বরগুলোর পরিচয় জানতে পারেনি।

তার সহকর্মী অরিন্দম তাকে স্পষ্ট নিষেধ করেছিল।

— তুমি একটা পুরোনো নাটকের মৃত্যু নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ছ, যেন এটা কোনো গোয়েন্দা উপন্যাস। সাবধানে থেকো।

নীলাঞ্জনা হেসে বলেছিল, — বাস্তবের অনেক ঘটনা উপন্যাসের চেয়েও অদ্ভুত।

অরিন্দম উত্তর দিয়েছিল, — আর বাস্তবের বিপদগুলো উপন্যাসের মতো শেষ হয় না।

কথাটা তার মনে পড়ল।

তবু সে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

ব্যাগে রাখল মোবাইল, ছোট টর্চ, নোটবুক, রেকর্ডার এবং অদ্বৈত রায়ের সেই পুরোনো ছবিটি। যাওয়ার আগে অরিন্দমকে একটি বার্তা পাঠাল—

“রঙ্গমহলে যাচ্ছি। রাত সাড়ে দশটার মধ্যে যোগাযোগ না করলে আমাকে ফোন করবে। ফোন না ধরলে পুলিশকে জানাবে।”

বার্তা পাঠিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল।

রাত আটটার পাঁচ মিনিট আগে রঙ্গমহলের সামনে পৌঁছে গেল নীলাঞ্জনা।

বৃষ্টি তখন প্রায় থেমে এসেছে। রাস্তার আলোয় ভেজা পাথরের ওপর হলুদ আভা পড়েছে। বহু বছরের পুরোনো সাইনবোর্ডটি বাতাসে সামান্য দুলছে।

প্রধান দরজার তালা ঝুলছিল না।

দরজাটি সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে।

নীলাঞ্জনা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

সঙ্গে সঙ্গে তার কানে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ।

করতালি।

প্রথমে মৃদু, তারপর ধীরে ধীরে জোরালো।

যেন কয়েকশো দর্শক কোনো অসাধারণ অভিনয় দেখে হাততালি দিচ্ছে।

কিন্তু অডিটোরিয়ামে ঢুকে নীলাঞ্জনা দেখল, আসনগুলো ফাঁকা। মঞ্চের সামনে কোনো মানুষ নেই। শুধু লাল পর্দা টানা।

করতালি থেমে গেল।

ঠিক তখনই অডিটোরিয়ামের শেষ সারিতে একটি ছোট আলো জ্বলে উঠল।

সেখানে একটি আসনের ওপর সাদা কাগজ রাখা।

নীলাঞ্জনা এগিয়ে গেল।

আসনটির গায়ে পিতলের ছোট ফলকে লেখা—

১৩।

কাগজে লেখা ছিল—

“আপনার জন্য নির্দিষ্ট আসন। নাটক শুরু হওয়ার আগে দয়া করে বসুন।”

নীলাঞ্জনা চারদিকে তাকাল। কেউ নেই।

সে তেরো নম্বর আসনে বসল।

ঠিক রাত আটটা।

মঞ্চের ওপর একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।

টং!

তারপর দ্বিতীয়বার।

টং!

লাল পর্দা ধীরে ধীরে দুদিকে সরে গেল।

মঞ্চের মাঝখানে একটি টেবিল, দুটি চেয়ার এবং পেছনে কালো দেওয়াল। টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ডেস্ক ল্যাম্প জ্বলছে।

কেউ একজন মঞ্চের বাঁ দিকের প্রবেশপথ দিয়ে এসে দাঁড়াল।

একজন নারী।

বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরনে সাদা শাড়ি, চুলে পাক ধরেছে। তাঁর ডান হাতের অনামিকায় রুপোর আংটি।

আংটির ওপর বৃত্তের মধ্যে তির্যক রেখা।

নীলাঞ্জনার শ্বাস যেন আটকে গেল।

শর্মিষ্ঠা বসু!

নারীটি দর্শকাসনের দিকে তাকালেন। তারপর ধীর গলায় বললেন—

“আজকের নাটকটি কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়। এই নাটকের প্রতিটি চরিত্র একসময় বাস্তবে বেঁচে ছিল। আর এই নাটকের শেষ দৃশ্যটি সতেরো বছর ধরে অসমাপ্ত রয়েছে।”

তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইল খুললেন।

“প্রথম চরিত্র—অদ্বৈত রায়। অভিনেতা, নাট্যকার এবং সত্য অনুসন্ধানকারী।”

একটু থেমে বললেন—

“দ্বিতীয় চরিত্র—সমরেশ বসু। পরিচালক। যিনি বিশ্বাস করতেন, মঞ্চে যা ঘটে, তার নিয়ন্ত্রণ সব সময় পরিচালকের হাতে থাকে।”

নীলাঞ্জনা নোটবুক বের করতে গিয়েও থেমে গেল। তার মনে হচ্ছিল, এই ঘটনা শুধু একটি নাটক নয়। তাকে এখানে ডাকা হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু শোনানোর জন্য।

শর্মিষ্ঠা এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।

“তৃতীয় চরিত্র—একজন সাংবাদিক। যিনি সত্য প্রকাশ করতে চান, কিন্তু এখনও জানেন না, তাঁর নিজের নামও এই নাটকের পুরোনো তালিকায় লেখা আছে।”

নীলাঞ্জনা চমকে উঠল।

মঞ্চের আলো নিভে গেল।

এক মুহূর্ত পর আলো আবার জ্বলে উঠতেই নারীটি আর সেখানে নেই।

টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে একটি ফাইল।

আর তার প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা—

নীলাঞ্জনা দত্ত।

২. অদৃশ্য অভিনেত্রী

নীলাঞ্জনা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

— কে আছেন? আপনি কোথায় গেলেন?

কোনো উত্তর নেই।

সে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। টেবিলের ওপরের ফাইলটি খুলতেই প্রথম পাতায় তার নামের নীচে একটি তারিখ দেখতে পেল।

১৪ নভেম্বর, ২০০৯।

তারিখটি অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রাত।

পরের পাতায় একটি তালিকা।

অদ্বৈত রায়—অভিনেতা।

সমরেশ বসু—পরিচালক।

মাধুরী সেন—প্রধান অভিনেত্রী।

শর্মিষ্ঠা বসু—নাট্যকার।

দেবব্রত লাহিড়ী—প্রযোজক।

তারপর আরও একটি নাম।

অনিরুদ্ধ দত্ত।

নীলাঞ্জনার হাত কেঁপে উঠল।

এটি তার বাবার নাম।

অনিরুদ্ধ দত্ত মারা গিয়েছিলেন যখন নীলাঞ্জনার বয়স মাত্র দশ বছর। পরিবারের সবাই জানত, তিনি একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। একদিন কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নীলাঞ্জনা কখনও বাবার কাজের জগৎ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে পারেনি। বাড়িতে তাঁর কোনো ডায়েরি ছিল না, কোনো ব্যক্তিগত কাগজপত্রও বিশেষ ছিল না। মা বলতেন, বাবা খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। বই ভালোবাসতেন, নাটক দেখতে পছন্দ করতেন, আর কাজের বাইরে নিজের মতো থাকতেন।

কিন্তু রঙ্গমহলের এই ফাইলে তাঁর নাম কেন?

নীলাঞ্জনা দ্রুত পরের পাতা উল্টাল।

সেখানে লেখা—

“অনিরুদ্ধ দত্ত—প্রকাশনা ও নথি সংরক্ষণের দায়িত্বে। ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর মূল চিত্রনাট্যের অনুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন।”

নীলাঞ্জনা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তার বাবা এই নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন!

তাহলে পরিবারের কাছে এ কথা গোপন রাখা হয়েছিল কেন?

ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চের পেছনের দরজা থেকে শব্দ এল। কেউ যেন ধীরে ধীরে হাঁটছে।

নীলাঞ্জনা টর্চ জ্বালিয়ে সেই দিকে এগোল।

করিডরের শেষ প্রান্তে একটি ছায়া দেখা গেল।

— কে?

ছায়াটি থেমে গেল।

তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল—

— ফাইলটা বন্ধ করুন।

নীলাঞ্জনা বলল, — আপনি কে? আমার বাবার নাম এখানে কেন লেখা?

— সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না।

— আপনি কি শর্মিষ্ঠা বসুকে চেনেন?

— আপনি যাঁকে মঞ্চে দেখেছেন, তিনি শর্মিষ্ঠা কি না, সেটা কি নিশ্চিত?

নীলাঞ্জনা থমকে গেল।

— আপনি বলতে চাইছেন, ওই নারী শর্মিষ্ঠা ছিলেন না?

— আমি কিছুই বলছি না। শুধু বলছি, মঞ্চে দেখা সব চরিত্রকে বাস্তব বলে ধরে নেবেন না।

ছায়াটি সরে যেতে লাগল।

নীলাঞ্জনা তার পিছু নিল। কিন্তু করিডরের বাঁক ঘুরতেই কাউকে দেখা গেল না। সামনে একটি বন্ধ দরজা। দরজার বাইরে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।

সে দরজায় হাত রাখল। দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো।

হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল।

অরিন্দমের ফোন।

— তুমি কোথায়? — অরিন্দম উদ্বিগ্ন গলায় বলল। — তোমার লোকেশন দেখাচ্ছে তুমি এখনও রঙ্গমহলে আছ।

— আমি ঠিক আছি। কিন্তু এখানে অদ্ভুত কিছু ঘটছে।

— বেরিয়ে এসো। এখনই।

নীলাঞ্জনা বলল, — আমার বাবার নাম এই নাটকের ফাইলে আছে। তিনি ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাকে আগে এটা জানতে হবে।

ওপাশে অরিন্দম চুপ করে গেল।

তারপর ধীরে বলল, — তোমার বাবার নাম অনিরুদ্ধ দত্ত?

— হ্যাঁ। তুমি জানো?

— একটা কথা তোমাকে আগে বলা উচিত ছিল। তোমার বাবার মৃত্যুর পুরোনো খবর আমি একবার পড়েছিলাম। দুর্ঘটনার বিবরণে কিছু অসংগতি ছিল। কিন্তু তখন তোমার পরিবারের ব্যাপার বলে আর খোঁজ করিনি।

নীলাঞ্জনা রাগে বলল, — তুমি আমাকে এসব আগে বলোনি কেন?

— কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আর একটা তথ্য আছে, যেটা তোমাকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।

— কী তথ্য?

— তোমার বাবার মৃত্যুর আগের দিন তিনি রঙ্গমহলে গিয়েছিলেন।

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

ফোনের ওপাশে অরিন্দমের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।

— তুমি এখনই বেরিয়ে এসো। বাকি কথা বাইরে এসে বলব।

ফোন কেটে গেল।

নীলাঞ্জনা আবার অডিটোরিয়ামে ফিরে এল।

মঞ্চে আলো জ্বলছে।

ফাইলটি যেখানে রাখা ছিল, সেখানে এখন আর কিছু নেই।

কিন্তু তেরো নম্বর আসনের ওপর একটি নতুন কাগজ পড়ে আছে।

তাতে লেখা—

“আপনার বাবা নাটকের দর্শক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই একমাত্র মানুষ, যিনি শেষ দৃশ্যটি বদলে দিয়েছিলেন।”

৩. বাবার গোপন কাজ

রঙ্গমহল থেকে বেরিয়ে নীলাঞ্জনা সোজা অরিন্দমের কাছে গেল। রাত তখন সাড়ে দশটা। তারা একটি খোলা চায়ের দোকানে বসে কথা বলতে শুরু করল।

অরিন্দম ল্যাপটপ খুলে একটি পুরোনো সংবাদপত্রের ডিজিটাল কপি দেখাল।

— এই খবরটা দেখো।

খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর। শিরোনাম—“মঞ্চেই মৃত্যু, নাট্যজগতে শোকের ছায়া।”

প্রতিবেদনের মাঝখানে একটি ছোট অনুচ্ছেদ ছিল:

“নাটকের মূল চিত্রনাট্য সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রকাশনা কর্মী অনিরুদ্ধ দত্তের সঙ্গে শেষ কয়েক দিনে পরিচালকের মতবিরোধের কথা শোনা গেলেও, বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।”

নীলাঞ্জনা খবরটি বারবার পড়ল।

— আমার মা কখনও বাবার এই কাজের কথা বলেননি।

অরিন্দম বলল, — হয়তো তিনি জানতেন না। অথবা জানলেও কোনো কারণে বলতে চাননি।

— বাবার মৃত্যুর খবরেও তো নাটকের কথা নেই।

— দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল স্থানীয় পাতায়। তদন্তের বিস্তারিত নথি সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।

নীলাঞ্জনা নিজের বাবার মুখ মনে করার চেষ্টা করল। ছোটবেলায় বাবা তাকে বই পড়ে শোনাতেন। বাড়িতে পুরোনো নাটকের বই ছিল কয়েকটি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর মা সেগুলোর অনেকগুলো সরিয়ে ফেলেছিলেন।

একটি ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ল।

বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় বাড়িতে দুজন লোক এসেছিল। মা তাকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরে বাবা খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। পরদিন সকালে নীলাঞ্জনা স্কুলে যাওয়ার আগে দেখেছিল, বাবা একটি কাগজ ছিঁড়ে ছোট ছোট টুকরো করছেন।

তখন সে কিছুই বুঝতে পারেনি।

এখন সেই স্মৃতি যেন নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে।

— আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে, — নীলাঞ্জনা বলল।

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

— কথা বলো। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করো। কেউ তোমাকে রঙ্গমহলে নিয়ে গেছে, তোমার বাবার নাম দেখিয়েছে, তারপর আবার ফাইল সরিয়ে দিয়েছে। এর মানে, কেউ চায় তুমি নির্দিষ্ট কিছু জানো। আবার কেউ চায় তুমি পুরো সত্য জানতে না পারো।

— তাহলে আমরা কী করব?

— প্রথমে তোমার বাবার কাজের কাগজপত্র খুঁজতে হবে। তারপর অদ্বৈত রায়ের মূল চিত্রনাট্য।

নীলাঞ্জনা ব্যাগ থেকে পুরোনো ছবিটি বের করল।

— চিত্রনাট্যটা হয়তো এই ছবির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

অরিন্দম ছবিটি হাতে নিয়ে মন দিয়ে দেখল।

— ছবির পেছনের লেখাটা কে দিয়েছে?

— নিবারণ পাল। তিনি বলেছিলেন, ছবিটি শেষ অভিনয়ের পরদিন মঞ্চের পেছনে পেয়েছিলেন।

অরিন্দম ছবিটি আলোয় ধরল।

— এই ছবিতে অদ্বৈত ছাড়াও পাঁচজন আছে। কিন্তু পুরোনো প্রতিবেদন অনুযায়ী শেষ দৃশ্যের সময় মঞ্চে চারজন অভিনেতা ছিলেন।

— তাহলে পঞ্চম ব্যক্তি কে?

অরিন্দম ছবিটি আরও কাছে নিয়ে গেল।

— দাঁড়াও। পেছনে যে ছায়াটা দেখা যাচ্ছে, সে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে নেই। সে তাকিয়ে আছে দর্শকাসনের দিকে।

নীলাঞ্জনা ছবিটি নিজের হাতে নিল।

সত্যিই তাই।

ছবির পেছনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির শরীর মঞ্চের দিকে থাকলেও মুখ সামান্য ঘোরানো। যেন সে দর্শকদের মধ্যে কাউকে লক্ষ্য করছে।

অরিন্দম বলল, — হয়তো এই মানুষটাই পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।

— কিন্তু সে কে?

— সেটা জানতে হলে আমাদের মাধুরী সেনকে খুঁজতে হবে। কারণ ছবিতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এখনও বেঁচে থাকতে পারেন বলে মনে হচ্ছে।

নীলাঞ্জনা বলল, — তুমি কি জানো, তিনি কোথায় থাকেন?

— নিশ্চিতভাবে নয়। তবে তাঁর এক আত্মীয় দক্ষিণ কলকাতায় থাকতেন। পুরোনো নাট্যসংগঠনের রেজিস্টারে সেই ঠিকানা থাকতে পারে।

তারা সেদিন রাতেই তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করল।

কিন্তু নীলাঞ্জনা বাড়ি ফেরার আগে মায়ের কাছে ফোন করল।

মা ফোন ধরতেই সে জিজ্ঞাসা করল—

— মা, বাবা কি কখনও রঙ্গমহল নাট্যশালায় কাজ করেছিলেন?

ওপাশে নিস্তব্ধতা।

তারপর মায়ের গলা শোনা গেল, অস্বাভাবিক শান্ত—

— তুমি এই প্রশ্ন এখন কেন করছ?

নীলাঞ্জনা বুঝল, মা কিছু জানেন।

— কারণ বাবার নাম ওই থিয়েটারের একটা নথিতে পেয়েছি।

মা দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললেন না।

তারপর বললেন—

— বাড়ি এসো। তোমাকে এমন একটা কথা বলব, যা এত বছর ধরে বলতে পারিনি।

৪. মায়ের স্বীকারোক্তি

পরদিন সকালেই নীলাঞ্জনা বাড়ি গেল।

তার মা সুপর্ণা দত্ত এখন একা থাকেন। ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় কয়েকটি গাছ, বসার ঘরে বইয়ের আলমারি, দেওয়ালে অনিরুদ্ধ দত্তের একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি।

মা দরজা খুলে তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

চা দেওয়ার পর সুপর্ণা অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

— তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন, — তিনি বললেন। — কিন্তু তাঁর একটা স্বভাব ছিল। অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকতে পারতেন না।

নীলাঞ্জনা মায়ের সামনে বসে বলল, — তিনি কি ‘অন্তিম দৃশ্য’ নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?

সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।

— ছিলেন। তিনি একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। সেই সংস্থা নাটকের বই ছাপত। অদ্বৈত রায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল সেখানেই। অদ্বৈত তাঁর লেখা নাটক প্রকাশ করতে চাইতেন, আর তোমার বাবা পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার কাজ করতেন।

— তাহলে নাটকের ফাইলে তাঁর নাম ছিল কেন?

— কারণ অদ্বৈত তাঁকে একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নাটকের মূল পাণ্ডুলিপির দুটি অনুলিপি তৈরি করতে বলেছিলেন। একটি প্রকাশের জন্য, অন্যটি নিরাপদে রাখার জন্য।

নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করল, — কী এমন ছিল সেই পাণ্ডুলিপিতে?

সুপর্ণা জানালার বাইরে তাকালেন।

— নাটকটি প্রথমে ছিল এক বিচারকের গল্প। পরে অদ্বৈত কিছু ঘটনা যোগ করেন, যেগুলো নাকি বাস্তবের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। নাটকের এক চরিত্রের নাম ছিল ‘বিজন সেন’। সে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু নাটক যত এগোয়, ততই বোঝা যায়, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শহরের কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের সম্পর্ক রয়েছে।

— এটা কি বাস্তব কোনো প্রতিষ্ঠানের কথা ছিল?

— আমি জানি না। তোমার বাবা একবার বলেছিলেন, অদ্বৈত এমন কিছু নথি পেয়েছেন, যা প্রকাশ পেলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে।

— তাহলে অদ্বৈত রায়কে খুন করা হয়েছিল?

মা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।

— আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু তোমার বাবা বিশ্বাস করতেন, অদ্বৈতকে স্বাভাবিকভাবে মরতে দেওয়া হয়নি।

নীলাঞ্জনার বুকের ভেতর চাপ অনুভূত হলো।

— তুমি আমাকে এত বছর কিছু বলোনি কেন?

সুপর্ণার চোখে জল এসে গেল।

— কারণ তোমার বাবার মৃত্যুর পর আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তারা বলেছিল, আমি যদি রঙ্গমহল বা অদ্বৈতের নাম নিয়ে কোথাও কথা বলি, তাহলে তোমারও ক্ষতি হবে।

— কারা হুমকি দিয়েছিল?

— মুখ ঢাকা ছিল। আমি কাউকে চিনতে পারিনি। কিন্তু তারা তোমার স্কুলের নাম জানত। তোমার প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় জানত। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

নীলাঞ্জনা মায়ের হাত ধরল।

— বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, সেটা কি তুমি জানো?

সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।

— তিনি বলেছিলেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বাড়িতে এনে রেখেছেন। সেদিন রাতে তিনি রঙ্গমহল থেকে ফিরেছিলেন। পরদিন সকালে বেরিয়ে আর ফেরেননি। দুপুরে খবর এল, রাস্তার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

— কাগজগুলো কোথায়?

সুপর্ণা উঠে আলমারির দিকে গেলেন। বহু পুরোনো একটি কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সের মধ্যে কয়েকটি বই, পুরোনো ছবি এবং হলদেটে কাগজ রাখা।

তিনি একটি ছোট নোটবুক নীলাঞ্জনার হাতে দিলেন।

— তোমার বাবার হাতের লেখা। আমি কখনও পুরোটা পড়িনি। পড়ার সাহস হয়নি।

নীলাঞ্জনা নোটবুক খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“অদ্বৈত বলছে, নাটকের শেষ দৃশ্য বাস্তবের সঙ্গে মিলে গেছে। সে আর অভিনয় করতে চায় না। কিন্তু সমরেশ তাকে থামতে দেবে না।”

পরের পাতায়—

“মাধুরী আজ জানাল, মঞ্চের আলো বদলানোর নির্দেশ শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করা হয়েছে। কে করেছে, সে জানে না।”

আরও একটি পাতায়—

“মূল পাণ্ডুলিপি নিরাপদে নেই। দ্বিতীয় অনুলিপি সরিয়ে রাখতে হবে।”

তারপর কয়েকটি পাতা ছেঁড়া।

শেষের দিকে একটি বাক্য লেখা—

“যদি আমার কিছু হয়, তবে মনে রেখো—মঞ্চের আলো কখনও নিজে থেকে বদলায় না।”

নীলাঞ্জনা বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার বাবা কি কোনো পরিকল্পিত ঘটনার কথা জানতেন?

আর মঞ্চের আলো বদলানোর সঙ্গে অদ্বৈতের মৃত্যুর কী সম্পর্ক?

হঠাৎ নোটবুকের ভাঁজ থেকে একটি ছোট কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।

কাগজটিতে হাতে আঁকা একটি নকশা। চারকোনা একটি ঘর, পাশে সরু পথ, এবং মাঝখানে একটি বৃত্ত।

নকশার নীচে লেখা—

“দ্বিতীয় অনুলিপি — দর্শকাসনের নীচে নয়, তার বিপরীতে।”

নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।

— তুমি কি জানো, এটা কী?

সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।

— না। তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমি আর কোনো কাগজ খুঁজিনি।

নীলাঞ্জনা নকশাটি ব্যাগে রাখল।

তার মনে হচ্ছিল, রঙ্গমহলের রহস্য এখন আর শুধু অদ্বৈত রায়ের মৃত্যু নিয়ে নয়।

এটি তার নিজের পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

৫. শেষ দৃশ্যের গোপন সংকেত

সেদিন বিকেলে নীলাঞ্জনা ও অরিন্দম আবার রঙ্গমহলে গেল।

এবার তাদের কাছে পুরসভার নতুন অনুমতিপত্র ছিল। নিরাপত্তারক্ষী মহাদেব প্রথমে তাদের দেখে অবাক হলেও ভেতরে যেতে দিলেন।

নীলাঞ্জনা মঞ্চের নকশাটি বের করে অরিন্দমকে দেখাল।

— “দর্শকাসনের নীচে নয়, তার বিপরীতে।” কথাটার মানে কী হতে পারে?

অরিন্দম অডিটোরিয়ামের দিকে তাকাল।

— মঞ্চের বিপরীতে তো দর্শকাসন। কিন্তু দর্শকাসনের নীচে কিছু নেই, শুধু কাঠের কাঠামো। হয়তো মঞ্চের বিপরীত দিকের দেওয়ালে কিছু আছে।

তারা দর্শকাসনের শেষ সারি থেকে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে ঘরটি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

তেরো নম্বর আসনের ঠিক বিপরীতে, মঞ্চের পেছনের দেওয়ালের ওপর একটি ছোট আয়তাকার কাঠের ফলক ছিল। এত উঁচুতে যে সাধারণ দর্শকের চোখে পড়ার কথা নয়।

ফলকটির ওপর রঙ্গমহলের পুরোনো প্রতীক খোদাই করা—বৃত্তের মধ্যে তির্যক রেখা।

নীলাঞ্জনা বলল, — এই চিহ্নটাই শর্মিষ্ঠার আংটিতে ছিল।

মহাদেব একটি মই এনে দিলেন। অরিন্দম সাবধানে উঠে ফলকটি পরীক্ষা করল। সেটি দেওয়ালের সঙ্গে পুরোপুরি আটকানো নয়। পাশে ছোট একটি ফাঁক রয়েছে।

মই থেকে নেমে অরিন্দম বলল, — এখানে একটা খোপ আছে। কিন্তু ভেতরে হাত ঢোকানো যাচ্ছে না।

নীলাঞ্জনা টর্চের আলো ফেলল।

খোপের মধ্যে কালো কাপড়ে মোড়া একটি পাতলা বস্তু দেখা গেল।

মহাদেবের সাহায্যে ফলকটি খুলতেই কাপড়ে মোড়া প্যাকেটটি বেরিয়ে এল।

ভেতরে একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপি।

প্রথম পাতায় লেখা—

“অন্তিম দৃশ্য — অদ্বৈত রায় ও শর্মিষ্ঠা বসু।”

নীলাঞ্জনা কাঁপা হাতে পাণ্ডুলিপি খুলল।

এটি নাটকের মূল চিত্রনাট্য।

প্রথম কয়েকটি পাতা সাধারণ নাটকের মতো। চরিত্রের পরিচয়, সংলাপ, মঞ্চসজ্জার নির্দেশ। কিন্তু শেষের দিকে এসে লেখা বদলে গেছে।

একটি পাতায় লাল কালিতে নোট—

“শেষ দৃশ্যে বিচারককে যে গুলি করবে, সে মঞ্চে উপস্থিত থাকবে না। গুলির শব্দ হবে আলো নিভে যাওয়ার পর। দর্শক বুঝবে, বিচারক মারা গেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কে গুলি করেছে, তা প্রকাশ করা হবে না।”

তার পরের পাতায় অন্য হাতের লেখা—

“এই নির্দেশ বাতিল। হত্যাকারীকে দর্শকের সামনে আনতে হবে। নইলে নাটক অসম্পূর্ণ থাকবে।”

অরিন্দম বলল, — মনে হচ্ছে, কেউ শেষ মুহূর্তে নাটকের সমাপ্তি বদলাতে চেয়েছিল।

নীলাঞ্জনা পাতা উল্টাল।

শেষ পাতায় একটি সংলাপ লেখা ছিল, যা সংবাদপত্রের কোনো প্রতিবেদনেই সে পড়েনি।

“তোমরা ভাবছ, আমি মারা গেলে সত্যও মরে যাবে। কিন্তু তোমরা ভুলে গেছ, এই মঞ্চে শুধু অভিনেতারা অভিনয় করে না। দর্শকরাও কখনও কখনও সাক্ষী হয়ে ওঠে।”

সংলাপটির নীচে অদ্বৈত রায়ের স্বাক্ষর।

আর তার পাশে আরেকটি ছোট নোট—

“যে মানুষটি তেরো নম্বর আসনে বসবে, তাকে সব দেখাতে হবে।”

নীলাঞ্জনা পাণ্ডুলিপি থেকে মুখ তুলল।

— তেরো নম্বর আসন! আমাকে সেখানে বসানোর কথা কি অদ্বৈত রায় জানতেন?

অরিন্দম ধীরে বলল, — অসম্ভব নয় যে ওই আসনটি নাটকের পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু কেন?

পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠার ভেতরের দিকে আরও একটি কাগজ আটকানো ছিল। সেটি খুলতেই একটি ছোট ছবি বেরিয়ে এল।

ছবিতে একজন তরুণী, পাশে এক শিশু।

নীলাঞ্জনা ছবিটি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

শিশুটির মুখ তার নিজের ছোটবেলার ছবির সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিলে যাচ্ছে।

ছবির পেছনে লেখা—

“নীলু, বয়স চার। মঞ্চের বাইরে যার জন্য সবকিছু বদলে গেল।”

নীলাঞ্জনার মাথা ঘুরে উঠল।

তার বয়স চার ছিল ২০০২ সালে।

অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর সাত বছর আগে।

ছবির তরুণীটি কে? আর তার কোলে নীলাঞ্জনার মতো দেখতে শিশুটি কেন?

অরিন্দম ছবিটি দেখে বলল, — এই নারীকে কি তুমি চেনো?

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

— না। কখনও দেখিনি।

ঠিক তখনই পেছনের করিডর থেকে কারও পায়ের শব্দ এল।

ধীর, মেপে মেপে এগিয়ে আসছে।

অরিন্দম পাণ্ডুলিপিটি ব্যাগে রাখতে গেল। কিন্তু তার আগেই একটি কণ্ঠ শোনা গেল—

— পাণ্ডুলিপিটা যেখানে ছিল, সেখানেই রেখে দিন।

তারা ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক নারী।

সাদা শাড়ি, রুপোর আংটি, চোখে গভীর ক্লান্তি।

শর্মিষ্ঠা বসু।

এবার তাঁর মুখে কোনো মঞ্চের আলো নেই। নেই অভিনয়ের ভঙ্গি।

তিনি নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“তোমার বাবার মতো একই ভুল তুমি করছ।”

নীলাঞ্জনা এক পা এগিয়ে গেল।

— আপনি শর্মিষ্ঠা বসু?

নারীটি মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ।

— তাহলে সেদিন মঞ্চে আপনি কে ছিলেন?

শর্মিষ্ঠা উত্তর দিলেন না।

নীলাঞ্জনা পাণ্ডুলিপিটি শক্ত করে ধরে বলল—

— আমার বাবার নাম এই নাটকের সঙ্গে কেন জড়িয়ে আছে? এই ছবিতে আমার মতো শিশুটি কে? আর অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুতে আসলে কী ঘটেছিল?

শর্মিষ্ঠা ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন।

তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে নীলাঞ্জনার পায়ের নীচের মাটি যেন সরে গেল।

“অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রাতে তোমার বাবা শুধু একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। তিনি সেই মানুষ, যিনি শেষ মুহূর্তে একজনের জীবন বাঁচিয়েছিলেন।”

— কার জীবন?

শর্মিষ্ঠা নীলাঞ্জনার চোখের দিকে তাকালেন।

“তোমার।”

অডিটোরিয়ামের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে নীলাঞ্জনা শুনতে পেল, মঞ্চের কোথাও একটি চেয়ার ঘষটে সরানো হচ্ছে।

তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ—

“শর্মিষ্ঠা, আর একটা শব্দ বললে, এবার নাটকের শেষ দৃশ্য সত্যিই শেষ হবে।”

একটি তীব্র আলোর রেখা মঞ্চের ওপর পড়ল।

শর্মিষ্ঠা সেখানে দাঁড়িয়ে নেই।

পাণ্ডুলিপি নীলাঞ্জনার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল।

আর অন্ধকারের মধ্যে কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—

“তোমার বাবার দুর্ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।”

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : (ছায়ার মঞ্চ প্রথম পর্ব — শেষ অভিনয়ের রাত)।

প্রথম পর্ব — শেষ অভিনয়ের রাত

১. বন্ধ থিয়েটারের আলো

কলকাতার উত্তর শহরের পুরোনো অলিগলির একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল ‘রঙ্গমহল’ নাট্যশালা। একসময় এই থিয়েটারের সামনে সন্ধ্যা নামলেই ভিড় জমত। টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ ঝগড়া করত, চায়ের দোকানে নাটকের সংলাপ নিয়ে তর্ক চলত, আর রাতের শেষে শিল্পীদের বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকত উৎসাহী দর্শকেরা।

কিন্তু সেসব এখন অতীত।

প্রায় সতেরো বছর ধরে রঙ্গমহলের দরজায় তালা ঝুলছে। বাইরের দেওয়ালে শ্যাওলা, জানালার কাচ ভাঙা, প্রবেশপথের ওপরের বিশাল সাইনবোর্ডের অর্ধেক অক্ষর খসে পড়েছে। স্থানীয় লোকেরা বলে, এই থিয়েটারের ভেতরে রাতে আলো জ্বলে। কেউ কেউ দাবি করে, গভীর রাতে বন্ধ দরজার ওপার থেকে ভেসে আসে সংলাপ, কখনও বা করতালির শব্দ।

বেশির ভাগ মানুষ এসব গুজব বলে উড়িয়ে দেয়।

কিন্তু নীলাঞ্জনা দত্ত জানত, রঙ্গমহলের ভেতরে এমন কিছু আছে, যা কোনো গুজবের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর।

সেদিন বিকেলে একটি পুরোনো সংবাদপত্রের অফিসে বসে কাজ করছিল নীলাঞ্জনা। সে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিবেদক। থিয়েটার, চলচ্চিত্র, পুরোনো শিল্পী এবং হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে লেখালেখি করাই তার কাজ। বয়স আটাশ। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চের প্রতি তার অদ্ভুত টান।

টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল রঙ্গমহল নিয়ে পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং। সতেরো বছর আগে, ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর, এই থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘অন্তিম দৃশ্য’ নামে একটি নাটক। নাটকের শেষ অভিনয়ের রাতেই ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা।

প্রধান অভিনেতা অদ্বৈত রায় মঞ্চে অভিনয় করতে করতে মারা যান।

সরকারি তদন্তে বলা হয়েছিল, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু নাটকের পরিচালক, সহ-অভিনেতা এবং কর্মীদের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি ছিল। ঘটনার মাত্র তিন দিন পর থিয়েটারটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

তারপর থেকে কেউ আর সেখানে নাটক করেনি।

নীলাঞ্জনা খবরের কাগজের একটি পুরোনো প্রতিবেদন পড়ছিল, এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

— হ্যালো?

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

— আপনি কি নীলাঞ্জনা দত্ত বলছেন?

— হ্যাঁ। কে বলছেন?

— আমি রঙ্গমহলের প্রাক্তন মঞ্চকর্মী। আমার নাম নিবারণ পাল। আপনার লেখা পড়েছি। আপনি পুরোনো থিয়েটার নিয়ে কাজ করছেন, তাই না?

নীলাঞ্জনা সোজা হয়ে বসল।

— হ্যাঁ। রঙ্গমহল নিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করছি। আপনি কি অদ্বৈত রায়ের শেষ নাটকের সময় সেখানে কাজ করতেন?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর বৃদ্ধ বললেন, — কাজ করতাম। আর সেই রাতের অনেক কিছুই জানি।

নীলাঞ্জনার হাতের কলম থেমে গেল।

— তাহলে কি আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন?

— পারব। তবে একটা কথা মনে রাখবেন। রঙ্গমহল নিয়ে লিখতে গেলে শুধু মঞ্চের সামনে কী ঘটেছিল, তা জানলেই হবে না। মঞ্চের পেছনের অন্ধকারটাও দেখতে হবে।

— আপনি কী বলতে চাইছেন?

— ফোনে সব বলা যাবে না। কাল বিকেল পাঁচটায় শোভাবাজারের পুরোনো কফির দোকানটায় আসবেন। একা আসবেন।

কথাটা বলে বৃদ্ধ ফোন কেটে দিলেন।

নীলাঞ্জনা বেশ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, এত বছর পরেও কেউ একজন সেই রাতের কথা বলতে ভয় পাচ্ছে।

কিন্তু কেন?

২. নিবারণ পালের সাক্ষাৎকার

পরদিন বিকেল পাঁচটার দশ মিনিট আগে নীলাঞ্জনা নির্দিষ্ট দোকানে পৌঁছে গেল। দোকানটি রাস্তার ধারে ছোট্ট, পুরোনো কাঠের টেবিল আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ দিয়ে সাজানো। এক কোণে বসে ছিলেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধ। পরনে ধূসর পাঞ্জাবি, চোখে মোটা কাচের চশমা।

নীলাঞ্জনাকে দেখেই তিনি হাত তুললেন।

— আপনি নীলাঞ্জনা?

— হ্যাঁ।

— বসুন।

বৃদ্ধের সামনে একটি কাপ চা পড়ে ছিল, কিন্তু চায়ে চুমুক দেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো অস্থিরভাবে টেবিলে ঠুকছিল।

নীলাঞ্জনা রেকর্ডার বের করল।

— আমি কি কথাগুলো রেকর্ড করতে পারি?

— করতে পারেন। তবে প্রকাশ করার আগে আমার সঙ্গে একবার কথা বলবেন।

— নিশ্চয়ই।

নিবারণবাবু চশমা খুলে রুমাল দিয়ে কাচ মুছতে লাগলেন।

— অদ্বৈত রায় শুধু অভিনেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন রঙ্গমহলের প্রাণ। তাঁর অভিনয় দেখতে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসত। ‘অন্তিম দৃশ্য’ ছিল তাঁর জীবনের সেরা নাটক। অন্তত আমরা সবাই তাই ভাবতাম।

— কিন্তু নাটকের শেষ অভিনয়ের রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

— হ্যাঁ।

— তদন্তে হৃদ্‌রোগের কথা বলা হয়েছিল। আপনি কি মনে করেন, সেটা সত্যি ছিল না?

বৃদ্ধ সরাসরি উত্তর দিলেন না।

— আপনি কি জানেন, নাটকটার শেষ দৃশ্যে অদ্বৈতবাবু কী করতেন?

— সংবাদপত্রে পড়েছি, তিনি নিজের চরিত্রের মৃত্যুর অভিনয় করতেন।

— ঠিক। চরিত্রটি ছিল একজন বিচারকের, যিনি একটি পুরোনো অপরাধের সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে খুন হন। শেষ দৃশ্যে তিনি আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘যে সত্যকে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়, একদিন সেই সত্যই মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে।’

নিবারণবাবু একটু থামলেন।

— সেদিনও তিনি ওই সংলাপ বলেছিলেন। তারপর আলো নিভে যায়। আলো আবার জ্বললে তাঁকে মঞ্চে পড়ে থাকতে দেখা যায়। দর্শকেরা প্রথমে ভেবেছিল, এও অভিনয়ের অংশ। তারপর বোঝা যায়, তিনি আর উঠছেন না।

— মঞ্চে চিকিৎসক ছিলেন?

— দর্শকদের মধ্যে একজন চিকিৎসক ছিলেন। তিনি উঠে গিয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

— নাটকের অন্য অভিনেতাদের কী হয়েছিল?

— প্রত্যেকে আলাদা কথা বলেছিল। কেউ বলেছিল, অদ্বৈতবাবু অসুস্থ ছিলেন। কেউ বলেছিল, তিনি অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। আবার কেউ বলেছিল, শেষ দৃশ্যের আগে তিনি কারও সঙ্গে ঝগড়া করেছিলেন।

— কার সঙ্গে?

নিবারণবাবু মাথা নিচু করলেন।

— নাটকের পরিচালক সমরেশ বসুর সঙ্গে।

নীলাঞ্জনা নামটি নোট করে নিল।

— ঝগড়ার কারণ কী?

— সেটা কেউ জানায়নি। কিন্তু ঘটনার আগের কয়েক দিন অদ্বৈতবাবু খুব অস্থির ছিলেন। তিনি বারবার বলতেন, নাটকটা বন্ধ করে দিতে হবে। তাঁর দাবি ছিল, নাটকের চিত্রনাট্যে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন সম্মানিত মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে।

নীলাঞ্জনা বিস্মিত হয়ে তাকাল।

— নাটকটা কি বাস্তব কোনো ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল?

— প্রথমে আমরা জানতাম না। পরে বুঝেছিলাম, অদ্বৈতবাবু শুধু অভিনয় করছিলেন না। তিনি কাউকে একটা বার্তা দিতে চাইছিলেন।

— কাকে?

— জানি না। অথবা জানলেও এখন আর বলতে চাই না।

নীলাঞ্জনা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, — আপনি আমাকে ডেকে এনে যদি কিছুই না বলেন, তাহলে আমার পক্ষে সত্যিটা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে ভয়ের ছায়া।

— সত্যিটা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সত্যিটা জানার পর আপনি আগের মতো থাকতে পারবেন কি না, সেটা আমি জানি না।

তিনি পকেট থেকে একটি ছোট খাম বের করে নীলাঞ্জনার দিকে এগিয়ে দিলেন।

খামটি বহু পুরোনো। কাগজ হলদেটে, কোণগুলো ভাঁজ হয়ে গেছে।

— এটা কী?

— অদ্বৈতবাবুর শেষ অভিনয়ের পরদিন আমি মঞ্চের পেছনে পেয়েছিলাম। এত বছর নিজের কাছে রেখেছি। কেন রেখেছি, জানি না। হয়তো ভয় পেয়েছিলাম। হয়তো অপেক্ষা করছিলাম এমন কারও জন্য, যে সত্যিই জানতে চাইবে।

নীলাঞ্জনা খাম খুলল।

ভেতরে ছিল একটি সাদা-কালো ছবি।

ছবিতে রঙ্গমহলের মঞ্চ। মাঝখানে অদ্বৈত রায়, বিচারকের পোশাকে দাঁড়িয়ে। তাঁর ডান দিকে পরিচালক সমরেশ বসু, বাঁ দিকে এক তরুণী অভিনেত্রী। পেছনে আরও তিনজন।

ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা ছিল—

“শেষ দৃশ্যটি আবার দেখুন। খুনির মুখ দর্শকের দিকে নয়।”

নীলাঞ্জনা ছবিটি উল্টেপাল্টে দেখল।

— এই কথার মানে কী?

নিবারণবাবু উঠে দাঁড়ালেন।

— সেটাই আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে।

— আর আপনি?

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকালেন।

— একটা কথা বলি। অদ্বৈতবাবুর মৃত্যু নিয়ে লেখা সরকারি প্রতিবেদনটি পড়বেন। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি, নাটকের আসল চিত্রনাট্য খুঁজে বের করা। সেটি কখনও প্রকাশিত হয়নি।

— চিত্রনাট্য কোথায় পাব?

— রঙ্গমহলের ভেতরে।

এই বলে নিবারণ পাল চলে গেলেন।

নীলাঞ্জনা ছবিটি হাতে নিয়ে বসে রইল।

বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। অথচ তার মনে হচ্ছিল, সে যেন বহু বছর আগের কোনো অন্ধকার মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

৩. মঞ্চের পেছনে

রঙ্গমহলে ঢোকার অনুমতি পাওয়া সহজ ছিল না। থিয়েটারটি তখন কলকাতা পুরসভার সম্পত্তি। বহু বছর আগে ভবনটি সংস্কারের পরিকল্পনা করা হলেও অর্থের অভাবে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে অস্থায়ী বেড়া, প্রবেশপথে মরচে ধরা তালা।

নীলাঞ্জনা পরদিন পুরসভার সংস্কৃতি দপ্তরে যোগাযোগ করল। পুরোনো থিয়েটার নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির কথা জানিয়ে অনুমতি চাইল। কয়েক ঘণ্টা দৌড়ঝাঁপের পর অবশেষে এক আধিকারিকের কাছ থেকে অনুমতিপত্র পেল। শর্ত ছিল, ভবনের নিরাপত্তারক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে নির্দিষ্ট অংশের বাইরে যাওয়া যাবে না।

সন্ধ্যার কিছু আগে সে রঙ্গমহলে পৌঁছল।

নিরাপত্তারক্ষীর নাম মহাদেব। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স, হাতে টর্চ, কোমরে চাবির গোছা।

— ম্যাডাম, ভেতরে খুব সাবধানে হাঁটবেন। ছাদ থেকে চুনবালি পড়ে। অনেক জায়গায় কাঠ পচে গেছে।

তালা খুলতেই দরজার কবজা থেকে কর্কশ শব্দ উঠল।

ভেতরে প্রবেশ করে নীলাঞ্জনার মনে হলো, কেউ যেন সময়কে একটি ঘরের মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। ধুলোয় ঢাকা আসন, ছেঁড়া পর্দা, দেওয়ালে বিবর্ণ পোস্টার। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ।

মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে সে একবার চোখ বন্ধ করল।

কল্পনায় শুনতে পেল দর্শকদের করতালি, শিল্পীদের পায়ের শব্দ, আলোর নির্দেশ, সংলাপের ওঠানামা।

তারপর চোখ খুলে দেখল, সামনে শুধু শূন্যতা।

— ওইদিকে মঞ্চের পেছনের দরজা, — মহাদেব বললেন। — তবে বেশি ভেতরে যাবেন না।

নীলাঞ্জনা মঞ্চের পাশে সরু করিডর ধরে এগোল। বাঁ দিকে সাজঘর, ডান দিকে পোশাক রাখার ঘর। একটি দরজার ওপর এখনও লেখা—‘শিল্পীদের প্রবেশ নিষেধ, অনুমতি ছাড়া নয়’।

সে দরজাটি ঠেলে খুলল।

ভেতরে পুরোনো পোশাক ঝুলছে। কোথাও ছেঁড়া মুকুট, কোথাও নকল তলোয়ার, কোথাও কাঠের বাক্সে সাজসজ্জার সামগ্রী। ঘরের শেষ প্রান্তে একটি লম্বা আয়না। আয়নাটির ওপর ধুলোর আস্তরণ, মাঝখানে চিড়।

নীলাঞ্জনা ছবিটি বের করে দেখল। ছবিতে যে তরুণী অভিনেত্রী ছিলেন, তাঁর পোশাকের সঙ্গে ঘরে ঝুলে থাকা একটি পোশাকের আশ্চর্য মিল।

পোশাকটির পাশে ছোট্ট ধাতব ফলকে লেখা—‘মাধুরী সেন’।

নীলাঞ্জনা নামটি আগে শুনেছে। মাধুরী সেন ছিলেন সেই নাটকের প্রধান অভিনেত্রী। অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর পর তিনি অভিনয় ছেড়ে দেন। সংবাদপত্রে একবার তাঁর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার বেরিয়েছিল, যেখানে তিনি বলেছিলেন, “কিছু ঘটনা মঞ্চেই শেষ হওয়া উচিত।”

কিন্তু মাধুরী কোথায় থাকেন, তা নীলাঞ্জনা জানত না।

সে পোশাকটির ছবি তুলল। তারপর আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।

আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার চোখে পড়ল, আয়নার কাঠের ফ্রেমের এক পাশে অস্বাভাবিক ফাঁক। যেন ফ্রেমের পেছনে কিছু একটা গুঁজে রাখা হয়েছে।

সে মহাদেবকে ডাকল।

— একটু দেখবেন? এই ফ্রেমটা কি খোলা যায়?

মহাদেব এগিয়ে এসে হাত বুলিয়ে দেখলেন।

— আগে কখনও খেয়াল করিনি।

ফ্রেমের নীচে একটি ছোট পেরেক আলগা হয়ে ছিল। নীলাঞ্জনা সেটি সাবধানে সরাতেই কাঠের পাতলা অংশটি খুলে গেল।

ভেতরে ভাঁজ করা একটি কাগজ।

কাগজটি বের করে নীলাঞ্জনা খুলল।

মাত্র তিনটি লাইন লেখা।

“মঞ্চে যে মারা যায়, সে সব সময় মৃত নয়। যে বেঁচে থাকে, সে সব সময় নির্দোষ নয়। দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজার আগে পর্দা তুলবেন না।”

কোনো তারিখ নেই, কোনো নাম নেই।

নীলাঞ্জনার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

— মহাদেবদা, এখানে কি কোনো ঘণ্টা আছে?

— ঘণ্টা? ছিল বোধহয়। নাটক শুরু হওয়ার আগে দুবার ঘণ্টা বাজানো হতো। প্রথম ঘণ্টা দর্শকদের সতর্ক করত, দ্বিতীয় ঘণ্টার পর পর্দা উঠত।

— এখন সেই ঘণ্টা কোথায়?

মহাদেব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, — মঞ্চের ওপরের দিকটায় একটা পুরোনো নিয়ন্ত্রণঘর আছে। আগে সেখান থেকে আলো আর শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তবে সিঁড়িটা ভাঙা। আপনাকে ওদিকে যেতে দেব না।

নীলাঞ্জনা আর জোর করল না। কিন্তু তার মনে তখন একটি প্রশ্নই ঘুরছিল—দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজানোর কথা কেন লেখা হয়েছে?

সে কাগজটি ব্যাগে রাখল।

ঠিক তখনই মঞ্চের দিক থেকে একটা শব্দ এল।

টং!

একটি ধাতব ঘণ্টার আওয়াজ।

নীলাঞ্জনা আর মহাদেব দুজনেই চমকে ঘুরে দাঁড়াল।

মহাদেবের মুখ ফ্যাকাশে।

— কে বাজাল?

আরেকটি শব্দ এল।

টং!

দ্বিতীয় ঘণ্টা।

তারপর মঞ্চের ওপরের পুরোনো স্পিকার থেকে ভেসে এল এক পুরুষকণ্ঠের সংলাপ।

“বিচার শুরু হওয়ার আগে বিচারককে জানতে হবে, আসামি আসলে কে।”

কণ্ঠটি কর্কশ, কিন্তু স্পষ্ট।

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, এটি অদ্বৈত রায়ের কণ্ঠ।

সে রেকর্ডারে শব্দটি ধরার চেষ্টা করল। মহাদেব প্রায় দৌড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

— চলুন, ম্যাডাম! এখনই বাইরে যেতে হবে!

— কিন্তু শব্দটা এল কোথা থেকে?

— জানি না! আমি কিছু জানি না!

মহাদেব দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। নীলাঞ্জনাও তাঁর পিছু নিল।

থিয়েটারের বাইরে এসে তারা দাঁড়াতেই ভেতরের সব আলো নিভে গেল।

অথচ নীলাঞ্জনা নিশ্চিত, ঢোকার সময় ভবনের ভেতরে কোনো বিদ্যুতের সংযোগ ছিল না।

৪. অদ্বৈত রায়ের শেষ সংলাপ

সেই রাতেই বাড়ি ফিরে নীলাঞ্জনা ছবিটি, পুরোনো কাগজটি এবং রঙ্গমহলের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করল।

অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সংরক্ষিত কয়েকটি প্রতিবেদন পাওয়া গেল। সব প্রতিবেদনেই প্রায় একই কথা লেখা—অভিনয়ের সময় অসুস্থ হয়ে মৃত্যু, কোনো অপরাধের প্রমাণ নেই, পরিবার ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি জানায়নি।

কিন্তু একটি ছোট খবর তার চোখ আটকে দিল।

“মৃত্যুর আগের সপ্তাহে নাট্যকার অদ্বৈত রায়ের সঙ্গে নাটকের প্রযোজক দেবব্রত লাহিড়ীর আর্থিক বিরোধের কথা জানা গেছে। তবে দুই পক্ষই বিষয়টি অস্বীকার করেছে।”

নীলাঞ্জনা নামটি নোট করল—দেবব্রত লাহিড়ী।

আরও খোঁজ করতে গিয়ে সে জানতে পারল, দেবব্রত ছিলেন রঙ্গমহলের অন্যতম অর্থদাতা। থিয়েটার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় চলে যান। কয়েক বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

অর্থাৎ, তাঁর কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার উপায় নেই।

নীলাঞ্জনা এবার মাধুরী সেনের সন্ধান করতে লাগল। পুরোনো নাট্যপত্রিকা, শিল্পীদের সংগঠনের তালিকা, সংবাদপত্রের আর্কাইভ—সব জায়গায় খুঁজেও তাঁর বর্তমান ঠিকানা পেল না। শুধু জানা গেল, মাধুরী দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন এবং শহরের বাইরে কোথাও থাকতেন।

রাত বারোটা পেরিয়ে গেল।

নীলাঞ্জনা ল্যাপটপ বন্ধ করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার ফোনে একটি বার্তা এল।

অজানা নম্বর।

“রঙ্গমহলে আজ যা শুনেছেন, সেটা ভুলে যান। অদ্বৈত রায়ের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে খোঁজ করলে আপনার ক্ষতি হবে।”

নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ বার্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল—

“আপনি কে? কী জানেন?”

কোনো উত্তর এল না।

সে নম্বরটিতে ফোন করল। নম্বরটি বন্ধ।

নীলাঞ্জনা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রাতের কলকাতা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হচ্ছে। দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন, রাস্তার কুকুরের ডাক।

তার ভয় লাগছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কাজ করছিল কৌতূহল।

কেউ একজন তাকে থামাতে চাইছে।

তার মানে, সে এমন কোনো সূত্রের কাছে পৌঁছে গেছে, যা এত বছর ধরে কেউ সামনে আনতে চায়নি।

সে ব্যাগ থেকে ছবিটি বের করল। ছবির পেছনের লাল অক্ষরগুলো আবার পড়ল—

“শেষ দৃশ্যটি আবার দেখুন। খুনির মুখ দর্শকের দিকে নয়।”

হঠাৎ তার মনে পড়ল, ছবিতে মঞ্চের পেছনে একটি বড় আয়না ছিল। সেই আয়নায় প্রতিফলিত হয়েছিল মঞ্চের কিছু অংশ। যদি ছবিটা ভালো করে দেখা যায়, তবে হয়তো এমন কিছু দেখা সম্ভব, যা সামনে থেকে দেখা যায়নি।

সে ছবিটি স্ক্যান করে কম্পিউটারে বড় করল। প্রথমে কিছু বোঝা গেল না। তারপর ছবির ডান কোণে, পর্দার আড়ালে একটি অস্পষ্ট অবয়ব চোখে পড়ল।

একজন মানুষ।

মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাঁর হাতে একটি ছোট ধাতব বস্তু।

নীলাঞ্জনা ছবিটি আরও বড় করল।

বস্তুটি দেখতে পুরোনো পকেটঘড়ির মতো।

সে ছবির সঙ্গে মঞ্চের সাজঘরে তোলা ছবিগুলো মিলিয়ে দেখল। সেখানে ঝুলে থাকা একটি পোশাকের পকেট থেকে একই ধরনের ঘড়ির চেন বেরিয়ে ছিল।

পোশাকটি ছিল মাধুরী সেনের।

কিন্তু ঘড়িটি কি তাঁর ছিল? নাকি অন্য কারও?

নীলাঞ্জনা আবার ছবিটির পেছনটা দেখল। সেখানে আলো-ছায়ার ফাঁকে একটি ছোট চিহ্ন ছিল—একটি বৃত্তের মধ্যে তির্যক রেখা।

সে চিহ্নটি কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছিল না।

তারপর পুরোনো নাটকের বিজ্ঞাপনপত্র ঘাঁটতে গিয়ে একটি পোস্টারে একই চিহ্ন দেখতে পেল। পোস্টারের নীচে লেখা ছিল—

“অন্তিম দৃশ্য — একটি নাটক, যেখানে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু লুকিয়ে রেখেছে।”

পোস্টারের পেছনে ছোট অক্ষরে নাট্যকারের নাম লেখা ছিল—অদ্বৈত রায়।

কিন্তু বিজ্ঞাপনটির নীচে আরেকটি নাম ছিল, যা সংবাদপত্রের কোনো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সহ-লেখক: শর্মিষ্ঠা বসু।

নীলাঞ্জনা নামটি দেখে থমকে গেল।

শর্মিষ্ঠা বসু কে?

নাটকের পরিচালক সমরেশ বসুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী?

এবং কেন অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর নাম সমস্ত নথি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল?

সে দ্রুত নামটি লিখে ইন্টারনেটে খুঁজল। খুব বেশি তথ্য পাওয়া গেল না। তবে একটি পুরোনো নাট্যপত্রিকার ডিজিটাল কপিতে ছোট্ট একটি প্রতিবেদন চোখে পড়ল।

“নাট্যকার শর্মিষ্ঠা বসু হঠাৎ করেই জনজীবন থেকে সরে দাঁড়ালেন। ‘অন্তিম দৃশ্য’ নাটকের সাফল্যের পর তাঁর নতুন নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়।”

প্রতিবেদনটির তারিখ—অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর মাত্র চার দিন পর।

নীলাঞ্জনা চেয়ারে হেলান দিল।

একটি মৃত অভিনেতা। একটি বন্ধ থিয়েটার। একটি হারিয়ে যাওয়া সহ-লেখক। একটি অচেনা কণ্ঠ, যা সতেরো বছর পরও মঞ্চে শোনা যায়।

সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা।

কিন্তু সেই সুতোটি কোথায় গিয়ে মিলেছে, তা এখনও অজানা।

৫. যে দর্শক কখনও বেরিয়ে যায়নি

পরদিন সকালে নীলাঞ্জনা আবার রঙ্গমহলের পুরোনো কর্মীদের তালিকা খুঁজতে শুরু করল। এবার তার লক্ষ্য ছিল শর্মিষ্ঠা বসু।

দুপুরের দিকে একটি নাট্যসংগঠনের প্রবীণ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তাঁর নাম অমলেন্দু মিত্র। একসময় তিনি রঙ্গমহলের নিয়মিত দর্শক ছিলেন।

নীলাঞ্জনা ফোনে নিজের পরিচয় দিয়ে শর্মিষ্ঠার কথা জিজ্ঞাসা করতেই ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।

— ওই নামটা আপনি কোথায় পেলেন? — অমলেন্দু জিজ্ঞেস করলেন।

— ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর পুরোনো বিজ্ঞাপনে। তিনি নাটকের সহ-লেখক ছিলেন বলে মনে হচ্ছে।

— মনে হচ্ছে নয়, তিনি ছিলেন। কিন্তু তাঁর নামটা আর উচ্চারণ করবেন না।

— কেন?

— কারণ শর্মিষ্ঠা বসু বেঁচে নেই।

— কবে মারা গেছেন?

— মারা গেছেন কি না, সেটা কেউ জানে না। তবে তিনি আর কখনও সামনে আসেননি।

— আপনি কি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন?

— শেষবার? হ্যাঁ। নাটকের শেষ অভিনয়ের আগের দিন।

— তিনি কী বলেছিলেন?

অমলেন্দুবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— তিনি বলেছিলেন, “নাটকটা যদি ঠিকমতো শেষ হয়, তাহলে মঞ্চের বাইরে একটা বিচার শুরু হবে।” আমি কথাটার মানে বুঝিনি। পরদিন অদ্বৈত মারা গেলেন। তারপর শর্মিষ্ঠা উধাও।

নীলাঞ্জনা দ্রুত প্রশ্ন করল, — আপনি কি জানেন, তিনি কোথায় থাকতেন?

— উত্তর কলকাতায়। তবে ঠিকানা আমার কাছে নেই। একটা কথা মনে আছে। তিনি সব সময় বলতেন, থিয়েটারে দর্শক যতটা দেখে, তার চেয়ে বেশি কিছু লুকিয়ে থাকে মঞ্চের পেছনের আয়নায়।

নীলাঞ্জনার শরীর শিউরে উঠল।

আয়না!

সাজঘরের সেই চিড় ধরা আয়না!

সে জিজ্ঞাসা করল, — শর্মিষ্ঠার কি কোনো বিশেষ চিহ্ন ছিল? কোনো জিনিস, যা তাঁকে চেনার জন্য কাজে লাগতে পারে?

অমলেন্দুবাবু বললেন, — তিনি সব সময় একটি রুপোর আংটি পরতেন। আংটির ওপর অদ্ভুত একটা চিহ্ন ছিল। বৃত্তের মধ্যে তির্যক রেখা।

নীলাঞ্জনা আর কথা বলতে পারল না।

ছবির পেছনের চিহ্ন। নাটকের পোস্টারের চিহ্ন। শর্মিষ্ঠার আংটির চিহ্ন।

সব একই।

ফোন রেখে সে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর ব্যাগ থেকে ছবিটি বের করে আবার দেখল। এবার ছবির একেবারে বাঁ দিকে, পর্দার ছায়ার কাছে একটি হাত দেখা গেল। হাতে রুপোর আংটি।

কিন্তু ছবিটি তো শেষ অভিনয়ের রাতের।

তাহলে শর্মিষ্ঠা সেখানে ছিলেন?

যদি তিনি ছিলেন, তবে তাঁর নাম কেন তদন্তে নেই?

আর যদি তিনি অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর সত্য জানতেন, তবে সতেরো বছর ধরে নীরব কেন?

নীলাঞ্জনা ঠিক করল, তাকে আবার রঙ্গমহলে যেতে হবে।

তবে এবার শুধু দর্শক হিসেবে নয়, একজন অনুসন্ধানী হিসেবে।

সেদিন সন্ধ্যায় সে থিয়েটারের সামনে পৌঁছে দেখল, প্রধান দরজার তালা আগের মতোই ঝুলছে। কিন্তু দরজার নীচে একটি ছোট সাদা খাম পড়ে আছে।

খামের ওপর তার নাম লেখা।

নীলাঞ্জনা দত্ত।

তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

চারদিকে তাকাল। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। দূরে একজন চা-ওয়ালা দোকান গুটোচ্ছেন। কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই।

সে খাম খুলল।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

মাত্র এক লাইন লেখা—

“আপনি যদি সত্যিই শেষ দৃশ্য দেখতে চান, তাহলে আগামী শুক্রবার রাত আটটায় দর্শকাসনে বসবেন। নাটক আবার শুরু হবে।”

নীলাঞ্জনা ঘড়ি দেখল।

আজ বুধবার।

অর্থাৎ, আর মাত্র দুদিন বাকি।

কিন্তু বন্ধ থিয়েটারে নাটক করবে কে?

আর সতেরো বছর আগে যে অভিনেতা মঞ্চে মারা গিয়েছিলেন, তাঁর নাটকের শেষ দৃশ্য আবার কে অভিনয় করবে?

নীলাঞ্জনা খামটি ব্যাগে রাখল। তারপর শেষবারের মতো থিয়েটারের দিকে তাকাল।

উপরের একটি ভাঙা জানালার পেছনে যেন ক্ষীণ আলো জ্বলল।

এক মুহূর্ত।

তারপর অন্ধকার।

আর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এল খুব মৃদু একটি কণ্ঠ—

“আপনি দেরি করে ফেলেছেন, নীলাঞ্জনা।”

সে জমে গেল।

কণ্ঠটি যেন ঠিক তার পেছনেই কেউ দাঁড়িয়ে বলে উঠেছে।

কিন্তু পিছনে ফিরে সে কাউকে দেখতে পেল না।

শুধু ফাঁকা রাস্তা, বন্ধ থিয়েটার, আর বাতাসে দুলতে থাকা মরচে ধরা সাইনবোর্ড।

নীলাঞ্জনা দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

তার মাথার মধ্যে তখন একটাই প্রশ্ন—

শুক্রবার রাতে রঙ্গমহলের মঞ্চে কার শেষ অভিনয় হতে চলেছে?

চলবে…

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

নীরবতার ভাষা।।

শহরের এক পুরোনো পাড়ায় থাকত বারো বছরের মেয়ে তিথি। সে খুব চঞ্চল, কথা বলতে ভালোবাসত, আর নতুন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে তার একটুও সময় লাগত না। কিন্তু তাদের বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটে নতুন পরিবারটি আসার পর তিথির কৌতূহল যেন আরও বেড়ে গেল।

পরিবারে ছিলেন এক বৃদ্ধা, তাঁর ছেলে এবং বছর দশেকের একটি ছেলে—নাম নীল। নীলকে প্রায়ই বারান্দায় বসে থাকতে দেখা যেত। অন্য ছেলেমেয়েরা খেলতে এলে সে দূর থেকে তাদের দেখত, কিন্তু কখনও খেলায় যোগ দিত না।

একদিন তিথি সাহস করে নীলের কাছে গেল।

“তুমি আমাদের সঙ্গে খেলতে আসো না কেন?”

নীল কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসল।

তিথি আবার প্রশ্ন করল, “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না?”

নীল মাথা নাড়ল। তারপর নিজের আঙুল দিয়ে ইশারা করে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করল। তিথি কিছুই বুঝতে পারল না। একটু অস্বস্তি নিয়ে সে চলে এল।

সন্ধ্যায় মাকে সব কথা বলতেই মা জানালেন, নীল কানে শুনতে পায় না এবং কথা বলতেও পারে না। সে ইশারা ও মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে নিজের মনের কথা প্রকাশ করে।

তিথি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করব কীভাবে?”

মা মৃদু হেসে বললেন, “বন্ধুত্ব করতে সব সময় কথার প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও মন দিয়ে দেখলেই অনেক কথা বোঝা যায়।”

কথাটা তিথির মনে গেঁথে গেল।

পরের দিন স্কুল থেকে ফিরে সে খাতায় কয়েকটি সহজ ইশারা আঁকল। মায়ের সাহায্যে শিখল—‘নমস্কার’, ‘বন্ধু’, ‘খেলা’, ‘ধন্যবাদ’—এই শব্দগুলির সংকেত। কয়েক দিন ধরে সে অনুশীলন করল। ভুল হলে নিজেই হেসে ফেলত, আবার নতুন করে চেষ্টা করত।

এক বিকেলে তিথি নীলের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দুহাত তুলে শিখে রাখা ইশারায় বলল, “তুমি কি আমার বন্ধু হবে?”

নীলের মুখটা মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আনন্দে মাথা নেড়ে তিথিকে ঘরে ডাকল।

সেদিন থেকে শুরু হল তাদের বন্ধুত্ব। তারা ছবি এঁকে, বল ছুড়ে, মুখভঙ্গি করে আর ছোট ছোট ইশারা শিখে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। তিথি বুঝতে পারল, নীলও তার মতোই হাসতে ভালোবাসে, নতুন খেলা আবিষ্কার করে এবং ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ভীষণ আনন্দ পায়।

কিন্তু একদিন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় সমস্যা দেখা দিল। নীলও অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চেয়েছিল। সে মঞ্চে একটি ছোট নাটকে অভিনয় করতে আগ্রহী ছিল। কয়েকজন ছাত্র আপত্তি জানাল। তাদের বক্তব্য, নীল তো সংলাপ বলতে পারবে না, তাই নাটকে তাকে নেওয়া সম্ভব নয়।

কথাগুলো শুনে তিথির খুব খারাপ লাগল। সে শিক্ষিকার কাছে গিয়ে বলল, “নাটকে কি শুধু মুখে কথা বললেই অভিনয় হয়? নীল ইশারায় কথা বলতে পারে। আমরা এমন একটা নাটক করতে পারি, যেখানে কথার পাশাপাশি ইশারাও থাকবে।”

শিক্ষিকা কিছুক্ষণ ভেবে রাজি হলেন।

শুরু হল নতুন প্রস্তুতি। তিথি ও তার বন্ধুরা নীলের কাছ থেকে কয়েকটি ইশারা শিখল। নাটকটির বিষয় ছিল—একটি স্কুলে নতুন আসা শিশুকে সবাই মিলে আপন করে নেওয়া। সেখানে কিছু সংলাপ বলা হবে, কিছু কথা প্রকাশ পাবে ইশারায়, আর বাকিটা ফুটে উঠবে মুখের অভিব্যক্তি ও অভিনয়ের মাধ্যমে।

অনুষ্ঠানের দিন দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে নাটকটি দেখল। নীল যখন মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইশারায় বন্ধুত্বের বার্তা প্রকাশ করল, তখন পুরো হল হাততালিতে ভরে উঠল। নীলের চোখে আনন্দের জল চিকচিক করছিল।

অনুষ্ঠান শেষে সেই ছাত্রদের একজন, যারা প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিল, নীলের কাছে এসে ইশারায় ‘বন্ধু’ বলতে চেষ্টা করল। তার ইশারা নিখুঁত হয়নি, কিন্তু নীল হেসে তাকে ঠিক করে দিল।

তিথি দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে বুঝল, তাদের নাটক শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না। সেটি অনেকের মনে নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছে।

এরপর স্কুলে সপ্তাহে একদিন ইশারার ভাষা শেখার ছোট ক্লাস শুরু হল। তিথি আর নীল সেখানে অন্যদের সঙ্গে অনুশীলন করত। ধীরে ধীরে নীল আর একা বসে থাকত না। তার চারপাশে তৈরি হল এমন একটি বন্ধুত্বের বৃত্ত, যেখানে সবাই কথা বলার জন্য একই পদ্ধতি ব্যবহার করত না, তবু একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করত।

একদিন নীল খাতায় একটি ছবি আঁকল। ছবিতে দুটি হাত পাশাপাশি রাখা, আর তাদের মাঝখানে একটি ছোট হৃদয়। নিচে সে ইশারার ভাষায় লিখল—“বোঝার ইচ্ছাই সবচেয়ে বড় ভাষা।”

তিথি ছবিটা দেখে হাসল।

সে বুঝেছিল, নীরবতা মানেই শূন্যতা নয়। অনেক সময় সেখানে এমন সব কথা লুকিয়ে থাকে, যা শোনার জন্য কান নয়, প্রয়োজন মনোযোগ, ধৈর্য আর আন্তরিকতা।

শিক্ষা: মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ গড়ে ওঠে শুধু কথার মাধ্যমে নয়, পারস্পরিক সম্মান, বোঝার চেষ্টা এবং হৃদয়ের আন্তরিকতার মাধ্যমে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: রেললাইনের পাশের ছোট্ট বাগান।।

রেললাইনের পাশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করত। ট্রেনের শব্দ, ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে জায়গাটা ছিল রুক্ষ ও প্রাণহীন। সেখানে কেউ দাঁড়াত না, কেউ তাকিয়েও দেখত না।

শুধু এক বৃদ্ধ প্রতিদিন সকালে সেখানে আসতেন।

তাঁর নাম মুকুন্দ। হাতে থাকত একটি ছোট কোদাল আর পুরনো জলের বোতল। তিনি রেললাইনের পাশের এক টুকরো অনাবাদি জমিতে মাটি খুঁড়তেন, আগাছা পরিষ্কার করতেন, তারপর ছোট ছোট গাছের চারা লাগাতেন।

লোকজন তাঁকে দেখে হাসত।

একদিন চায়ের দোকানের মালিক বললেন,

—“মুকুন্দ কাকা, এই জায়গায় গাছ লাগিয়ে কী হবে? দুদিন পর ধুলোয় মরে যাবে।”

মুকুন্দ মৃদু হেসে বললেন,

—“মরে গেলে আবার লাগাব।”

—“আপনার কি আর কোনও কাজ নেই?”

বৃদ্ধ কোদাল চালাতে চালাতে বললেন,

—“আছে। কিন্তু এই কাজটা না করলে মনটা ভালো থাকে না।”

কেউ তাঁর কথা বুঝত না।

প্রতিদিন তিনি একটু একটু করে জমিটা পরিষ্কার করতেন। কোথাও গাঁদা, কোথাও জবা, কোথাও সূর্যমুখীর চারা লাগাতেন। জল কম থাকলে বাড়ি থেকে জল নিয়ে আসতেন।

একদিন স্কুলফেরত কয়েকটি শিশু তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল।

একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, আপনি ফুলগুলো কার জন্য লাগাচ্ছেন?”

মুকুন্দ বললেন,

—“যে দেখবে, তার জন্য।”

শিশুরা হেসে উঠল।

—“কিন্তু এখানে তো কেউ আসে না!”

বৃদ্ধ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আজ আসে না। কাল আসতে পারে।”

পরের কয়েক মাসে আশ্চর্য পরিবর্তন হল। চারাগুলো বড় হতে লাগল। গাঁদার হলুদ ফুল ফুটল, জবার লাল পাপড়ি খুলল, সূর্যমুখীগুলো মুখ তুলল আকাশের দিকে।

ট্রেনের জানালা দিয়ে যাত্রীরা বাগানটি দেখতে শুরু করলেন। কেউ ছবি তুলতেন, কেউ হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতেন।

একদিন রেললাইনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক তরুণী দেখল, মুকুন্দ মাটিতে বসে আছেন। তাঁর শরীর ভালো নেই, তবু তিনি গাছের গোড়ায় জল ঢালছেন।

তরুণী এগিয়ে এসে বলল,

—“আপনি একা এত কষ্ট করেন কেন?”

মুকুন্দ বললেন,

—“গাছগুলো ছোট থাকতে একটু যত্ন চায়। বড় হয়ে গেলে নিজেরাই দাঁড়িয়ে থাকবে।”

কথাটা শুনে তরুণী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

পরদিন সে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এল। তারা বাগানের চারপাশে বেড়া দিল, একটি জলের ড্রাম রাখল, শুকনো গাছের জায়গায় নতুন চারা লাগাল।

তারপর সপ্তাহে একদিন করে আরও মানুষ আসতে শুরু করল।

কেউ গাছ লাগাত, কেউ জল দিত, কেউ আবর্জনা পরিষ্কার করত।

এক বছর পর রেললাইনের পাশের সেই জমি ছোট্ট এক বাগানে পরিণত হল।

কিন্তু সেই বছরই মুকুন্দ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আর বাগানে আসতে পারলেন না।

শিশুরা তাঁকে দেখতে গেল। তাদের একজন বলল,

—“দাদু, আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা বাগানটা দেখব।”

মুকুন্দের মুখে ক্লান্ত হাসি ফুটল।

—“তাহলে তো আমার কাজ শেষ।”

কয়েক সপ্তাহ পর মুকুন্দ মারা গেলেন।

তাঁর স্মৃতিতে বাগানের প্রবেশপথে একটি ছোট ফলক বসানো হল। সেখানে লেখা ছিল—

“এই বাগান একজন মানুষ শুরু করেছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন—যে জায়গায় আজ কেউ সৌন্দর্য দেখে না, সেখানেও আগামী দিনের ফুল ফুটতে পারে।”

আজও প্রতিদিন ট্রেন ছুটে যায় সেই বাগানের পাশ দিয়ে। জানালার ধারে বসা যাত্রীরা সবুজ পাতা আর রঙিন ফুল দেখতে পান।

তাঁদের অধিকাংশই মুকুন্দের নাম জানেন না।

কিন্তু তিনি যে সৌন্দর্য রেখে গেছেন, তা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের চোখে পড়ে।

শিক্ষা: ভালো কাজের জন্য সব সময় প্রশংসা বা স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও নিঃশব্দে শুরু করা একটি ছোট উদ্যোগও বহু মানুষের জীবনে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে পারে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: একটি নামহীন সুর।।

শহরের ব্যস্ত মোড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক অন্ধ বৃদ্ধ বসে বাঁশি বাজাতেন। তাঁর নাম কেউ জানত না। মানুষ তাঁকে চিনত শুধু ‘বাঁশিওয়ালা’ বলে।

কেউ তাঁর সামনে কয়েন রেখে যেত, কেউ আবার বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তবু প্রতিদিন একই সময়ে তিনি এসে বসতেন। চোখ বন্ধ করে বাঁশিতে এমন এক সুর তুলতেন, যেন শহরের সমস্ত কোলাহল মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।

সেই মোড় দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেত ছোট্ট মেয়ে ইরা। একদিন সে দাঁড়িয়ে বাঁশিওয়ালার সুর শুনল।

বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করল,

—“মা, উনি চোখে দেখতে পান না, তবু এত সুন্দর সুর বাজান কী করে?”

মা বললেন,

—“হয়তো উনি চোখ দিয়ে যা দেখতে পান না, মন দিয়ে তা অনুভব করেন।”

পরদিন ইরা নিজের টিফিনের টাকা থেকে কয়েকটি কয়েন বাঁশিওয়ালার সামনে রাখল।

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“ধন্যবাদ, মা।”

ইরা জিজ্ঞেস করল,

—“আপনি প্রতিদিন একই সুর বাজান কেন?”

বৃদ্ধ একটু চুপ করে বললেন,

—“একজনের জন্য বাজাই।”

—“তিনি কোথায়?”

—“জানি না।”

ইরা অবাক হল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন। বহু বছর আগে তাঁর একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটি ছোটবেলায় বাবার বাঁশির সুর শুনে ঘুমোত। একদিন কাজের সন্ধানে শহরে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। বৃদ্ধ জানতেন না, মেয়েটি কোথায় আছে, কেমন আছে।

তবু তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও একদিন মেয়ে ফিরে এলে এই সুর শুনে বাবাকে চিনতে পারবে।

ইরা সেদিন বাড়ি ফিরে বাবাকে সব বলল। তার বাবা একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করতেন। তিনি বৃদ্ধের খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন।

কয়েক সপ্তাহ পর জানা গেল, বৃদ্ধের নাম নিত্যানন্দ। তাঁর মেয়ে বহু বছর আগে অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিল। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর আর বাবার সন্ধান পায়নি।

সংগঠনের লোকেরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে মেয়েটির বর্তমান ঠিকানা খুঁজে পেলেন। তাকে খবর পাঠানো হল।

কিন্তু উত্তর এল না।

নিত্যানন্দ অবশ্য আগের মতোই প্রতিদিন বাঁশি বাজাতে লাগলেন।

একদিন শীতের সন্ধ্যায় মোড়ে এসে ইরা দেখল, বৃদ্ধের পাশে এক মহিলা বসে আছেন। তাঁর চোখ ভেজা। তিনি বৃদ্ধের হাত ধরে আছেন।

নিত্যানন্দ কাঁপা গলায় বললেন,

—“তুই এসেছিস?”

মহিলা মাথা নাড়লেন।

—“বাবা, তোমার বাঁশির সুর আমি ভুলিনি। ছোটবেলায় তুমি যে সুর বাজাতে, সেই সুর শুনেই বুঝেছিলাম, তোমাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।”

বৃদ্ধের হাত কাঁপছিল। তিনি মেয়ের মুখ ছুঁয়ে দেখলেন।

—“এত দেরি করলি কেন, মা?”

মেয়ে কেঁদে বলল,

—“পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, বাবা।”

নিত্যানন্দ আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। শুধু মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রইলেন।

সেদিন অনেক দিন পর তিনি বাঁশি বাজালেন। কিন্তু এবার সুরটা আলাদা ছিল। তাতে অপেক্ষার কষ্ট ছিল না, ছিল ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

ইরা দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল।

তার মনে হল, কিছু সুরের কোনও নাম হয় না। তবু সেই সুরই কখনও কখনও হারিয়ে যাওয়া মানুষকে বাড়ির পথ চিনিয়ে দেয়।

পরদিন থেকে মোড়ে নিত্যানন্দ আর একা বসতেন না। তাঁর মেয়ে পাশে বসে থাকত।

আর ইরা যখনই সেখানে যেত, বৃদ্ধ তাকে বলতেন,

—“শোন মা, এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় সুর।”

শিক্ষা: ভালোবাসার সম্পর্ক কখনও কখনও দূরত্বে হারিয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতি আর আন্তরিকতার টান মানুষকে আবার কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: যে গাছটি ফল দিত না।।

গ্রামের মাঝখানে একটি বিশাল আমগাছ ছিল। গাছটির বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর। তার ছায়ায় বসে গ্রামের বৃদ্ধরা গল্প করতেন, দুপুরে পথিকেরা বিশ্রাম নিতেন, আর স্কুলফেরত ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করত।

কিন্তু গাছটির একটি অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—কোনও দিন তাতে আম ধরত না।

গ্রামের অনেকে বলত,

—“এত বড় গাছ, অথচ কোনও কাজে লাগে না!”

কেউ কেউ গাছটি কেটে ফেলার কথাও বলেছিল।

শুধু বৃদ্ধা সরলা দেবী গাছটিকে ভালোবাসতেন। প্রতিদিন সকালে তিনি গাছের গোড়ায় জল দিতেন, শুকনো পাতা পরিষ্কার করতেন।

একদিন গ্রামের নতুন প্রধান তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“মাসিমা, যে গাছে ফল হয় না, তার জন্য এত কষ্ট করেন কেন?”

সরলা দেবী গাছের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আপনি কি কখনও এর ছায়ায় বসেছেন?”

প্রধান বললেন,

—“হ্যাঁ, বসেছি।”

—“তাহলে বলুন তো, আপনার বিশ্রামটা কি মিথ্যে ছিল?”

প্রধান কোনও উত্তর দিতে পারলেন না।

সময় কেটে গেল।

এক বছর গ্রীষ্মে গ্রামে ভয়াবহ দাবদাহ দেখা দিল। পুকুরের জল শুকিয়ে এল, মাঠে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠল। দূর থেকে আসা পথিকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন।

সেই সময় গ্রামের মানুষ ওই আমগাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতেন। সেখানে একটি মাটির কলসিতে জল রাখা শুরু হল। স্কুলের শিক্ষক গাছটির নিচে শিশুদের পড়াতে লাগলেন, কারণ টিনের ঘরে দুপুরের গরম সহ্য করা যাচ্ছিল না।

একদিন প্রচণ্ড গরমে গ্রামের এক বৃদ্ধ পথ চলতে চলতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কয়েকজন তাঁকে দ্রুত গাছের ছায়ায় নিয়ে এলেন। সেখানে বিশ্রাম ও জল পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন।

ঘটনাটির পর গ্রামের মানুষ গাছটিকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করলেন।

তবু একদিন এক কাঠুরে এসে বলল,

—“গাছটা কেটে দিলে অনেক কাঠ পাওয়া যাবে।”

সরলা দেবী তখন খুব অসুস্থ। তাঁকে খবর দেওয়া হলে তিনি নাতির হাত ধরে গাছটির কাছে এলেন।

তিনি বললেন,

—“গাছটা ফল দেয় না, ঠিক। কিন্তু কত মানুষকে আশ্রয় দেয়, সেটা কি কখনও গুনে দেখেছ?”

গ্রামের লোকেরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, গাছটি কাটা হবে না। তার চারপাশে বসার জায়গা তৈরি করা হবে, পথিকদের জন্য জলের ব্যবস্থা করা হবে এবং শিশুদের জন্য ছোট্ট একটি পাঠচক্র চালু হবে।

কয়েক মাস পর সরলা দেবী মারা গেলেন।

তাঁর স্মৃতিতে গ্রামের মানুষ গাছটির পাশে একটি ফলক বসালেন। তাতে লেখা ছিল—

“যে গাছটি ফল দিত না, সে আমাদের শিখিয়েছিল—উপকারের সব রূপ চোখে দেখা যায় না।”

বছর কয়েক পর এক শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, গাছটায় আম ধরে না কেন?”

বাবা হেসে বললেন,

—“জানি না রে। তবে এই গাছ আমাদের এমন কিছু দিয়েছে, যা অনেক ফলের থেকেও দামি।”

—“সেটা কী?”

বাবা ছায়ায় বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“অন্যের জন্য জায়গা করে দেওয়া।”

সেদিন বিকেলে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ মাটিতে নকশা আঁকছিল। তার নিচে কেউ পড়ছিল, কেউ গল্প করছিল, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছিল।

গাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার কোনও ফল ছিল না, অথচ তার দেওয়ার শেষও ছিল না।

শিক্ষা: মানুষের মূল্য শুধু সে কী অর্জন করেছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সে কতজনকে আশ্রয়, স্বস্তি ও সাহস দিয়েছে—সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: পাথরের ভেতর লুকিয়ে থাকা পাখি।।

পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট শহরে থাকতেন ভাস্কর নীলকান্ত। পাথর কেটে মূর্তি তৈরি করাই ছিল তাঁর পেশা। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় শক্ত, নির্জীব পাথরেও যেন প্রাণ ফুটে উঠত।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাজের চাহিদা কমতে লাগল। বড় বড় কারখানায় তৈরি মূর্তি কম দামে বিক্রি হওয়ায় কেউ আর হাতে তৈরি শিল্পকর্মের জন্য অপেক্ষা করতে চাইত না।

তবু নীলকান্ত প্রতিদিন তাঁর কর্মশালায় বসতেন।

একদিন তাঁর কাছে এল এক তরুণী। নাম অন্বেষা। সে শিল্পকলার ছাত্রী।

অন্বেষা কর্মশালার এক কোণে পড়ে থাকা বড় কালো পাথরটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“গুরুজি, এই পাথরটা দিয়ে কী বানাবেন?”

নীলকান্ত বললেন,

—“এখনও ঠিক করিনি।”

অন্বেষা হেসে বলল,

—“এত বড় পাথর, অথচ আপনি জানেন না এর মধ্যে কী আছে?”

নীলকান্ত পাথরটির গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন,

—“আমি জানি না এর মধ্যে কী আছে। শুধু জানি, অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো সরিয়ে দিতে পারলে কিছু একটা বেরিয়ে আসবে।”

কথাটা অন্বেষার মনে গেঁথে গেল।

সে প্রতিদিন কর্মশালায় আসতে শুরু করল। নীলকান্তের কাজ দেখত, পাথরের গায়ে হাত বোলাত, কখনও নকশা আঁকত।

একদিন অন্বেষা বলল,

—“আমি একটা পাখি বানাতে চাই।”

নীলকান্ত জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেমন পাখি?”

—“যে উড়তে পারে না, তবু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।”

নীলকান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তাহলে পাথরটা তুমিই কাটবে।”

অন্বেষা ভয় পেয়ে গেল।

—“আমি পারব না! ভুল হলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।”

নীলকান্ত শান্ত গলায় বললেন,

—“ভুল করার ভয়েই যদি হাত না চালাও, তবে পাথরের ভেতরে যে পাখি লুকিয়ে আছে, সে কোনওদিন বেরোবে না।”

অন্বেষা কাজ শুরু করল।

প্রথম দিন পাথরের একটি ছোট অংশ ভেঙে গেল। দ্বিতীয় দিন পাখির ডানার রেখা বেঁকে গেল। কয়েকবার সে কাজ ছেড়ে দিতে চাইল।

প্রতিবার নীলকান্ত তাকে শুধু একটি কথাই বলতেন,

—“ধীরে করো। পাথরের সঙ্গে লড়াই কোরো না, তাকে বোঝার চেষ্টা করো।”

মাসখানেক পরে পাথরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটি পাখির অবয়ব ফুটে উঠল। তার ডানা দুটো শরীরের গায়ে ভাঁজ করা, মাথা সামান্য উঁচু, চোখ স্থির আকাশের দিকে।

পাখিটি উড়তে পারত না।

কিন্তু তার ভঙ্গিতে ছিল উড়ে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা।

মূর্তিটি দেখে নীলকান্ত দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

অন্বেষা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

—“ভালো হয়নি?”

বৃদ্ধ ভাস্কর মৃদু হেসে বললেন,

—“আমি এত বছর ধরে পাথর কেটেছি। আজ বুঝলাম, শুধু পাথরের ভেতর থেকে মূর্তি বের করতে হয় না। নিজের ভেতরের ভয়টাকেও একটু একটু করে সরাতে হয়।”

অন্বেষা মূর্তিটির নাম দিল ‘আকাশের অপেক্ষা’।

শিল্পকলার প্রদর্শনীতে মূর্তিটি বিশেষ প্রশংসা পেল। কিন্তু অন্বেষার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল অন্য কিছু।

প্রদর্শনী শেষে সে ফিরে এসে নীলকান্তকে বলল,

—“গুরুজি, আমি নিজের কর্মশালা খুলব। যারা ভাবে তারা কিছুই পারে না, তাদের নিয়ে কাজ করব।”

নীলকান্ত বললেন,

—“তাহলে একটা কথা মনে রেখো। কাউকে তার দুর্বলতা দেখে বিচার কোরো না।”

—“কেন?”

—“কারণ তুমি জানো না, তার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে।”

কয়েক বছর পর নীলকান্ত আর পাথর কাটতে পারতেন না। তাঁর হাত কাঁপত, চোখেও আগের মতো জোর ছিল না।

অন্বেষা তাঁর কর্মশালার দায়িত্ব নিল। সেখানে নতুন শিল্পীরা আসতে শুরু করল। কেউ ভাঙা পাথর নিয়ে, কেউ অসম্পূর্ণ নকশা নিয়ে, কেউ আবার নিজের ওপর সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে।

দরজার সামনে একটি পাথরের পাখি রাখা থাকত।

তার নিচে খোদাই করা ছিল—

“ডানা না থাকলেও আকাশের দিকে তাকানো যায়। আর সাহস থাকলে একদিন নিজের আকাশও তৈরি করা যায়।”

শিক্ষা: মানুষের সামর্থ্য সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ধৈর্য, অনুশীলন আর বিশ্বাস অনেক সময় আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে প্রকাশ করে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: শেষ বীজটির গল্প।।

পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটি গ্রামে থাকতেন কৃষক জগন্নাথ। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল এক টুকরো জমি। সেই জমিতে তিনি ধান, শাকসবজি আর নানা রকমের ফসল ফলাতেন।

কিন্তু পরপর দু’বছর বৃষ্টি ঠিকমতো হল না। জমি শুকিয়ে গেল, পুকুরের জল কমে গেল, আর ফসলের আশায় বোনা বীজগুলো মাটির নিচেই নষ্ট হয়ে গেল।

গ্রামের অনেক কৃষক কাজের সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে গেলেন। জগন্নাথও ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর ঘরে তখন সামান্য চাল আর একটি ছোট কাপড়ের থলিতে রাখা কয়েকটি বীজ ছাড়া কিছুই ছিল না।

একদিন তাঁর নাতি অয়ন থলিটা দেখে জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, এগুলো কী?”

জগন্নাথ বললেন,

—“এগুলো বীজ। আগামী দিনের আশা।”

অয়ন অবাক হয়ে বলল,

—“কিন্তু বৃষ্টি না হলে এগুলো গাছ হবে কী করে?”

জগন্নাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—“সেটাই তো জানি না রে।”

পরদিন সকালে অয়ন দেখল, দাদু জমির এক কোণে মাটি খুঁড়ছেন।

সে ছুটে গিয়ে বলল,

—“তুমি আবার বীজ পুঁতছ?”

জগন্নাথ মাথা নাড়লেন।

—“সব বীজ যদি ঘরে রেখে দিই, তবে নতুন গাছ জন্মাবে কী করে?”

অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সে বাড়ির উঠোন থেকে একটা ছোট পাত্রে জল নিয়ে এল। প্রতিদিন সেই পাত্রের জল থেকে অল্প অল্প করে বীজ পোঁতা জায়গাটিতে দিতে লাগল।

প্রথম কয়েক দিন কিছুই হল না।

অয়ন হতাশ হয়ে বলল,

—“দাদু, বীজগুলো বুঝি মরে গেছে?”

জগন্নাথ বললেন,

—“মাটির নিচে কী হচ্ছে, তা সব সময় চোখে দেখা যায় না। তাই বলে কিছুই হচ্ছে না, এমন ভাবতে নেই।”

দিন কেটে গেল।

এক সকালে অয়ন দৌড়ে এসে দাদুকে ডাকল।

—“দাদু! দাদু! সবুজ পাতা বেরিয়েছে!”

জগন্নাথ লাঠিতে ভর দিয়ে জমির কাছে গেলেন। শুকনো মাটির বুক চিরে সত্যিই কয়েকটি ছোট্ট চারা মাথা তুলেছে।

তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি চারাগুলোর চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করলেন। অয়ন প্রতিদিন সেগুলোর যত্ন নিতে লাগল।

কিছুদিন পর গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষক এসে চারাগুলো দেখলেন।

একজন বললেন,

—“এত অল্প জলে তুমি কী করে এগুলো বাঁচালে?”

জগন্নাথ বললেন,

—“আমি একা পারিনি। আমার নাতি হাল ছাড়েনি।”

গ্রামের মানুষ মিলে পাশের পাহাড়ি ঝরনা থেকে ছোট নালা কাটলেন। বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য তৈরি করলেন কয়েকটি জলাধার। ধীরে ধীরে আরও কিছু জমিতে চাষ শুরু হল।

সেই বছর ফসল খুব বেশি হয়নি। কিন্তু গ্রামের মানুষ নতুন করে বীজ জমাতে শিখলেন, জলের অপচয় বন্ধ করলেন এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ালেন।

বহু বছর পর অয়ন কৃষিবিদ হয়ে গ্রামে ফিরে এল। সে কৃষকদের কম জলে চাষের পদ্ধতি শেখাতে শুরু করল।

একদিন পুরনো জমির ধারে দাঁড়িয়ে সে দাদুকে বলল,

—“দাদু, মনে আছে সেই শেষ বীজগুলোর কথা?”

জগন্নাথ মৃদু হেসে বললেন,

—“মনে আছে। সেদিন বীজগুলো শুধু গাছ দেয়নি, আমাদের নতুন করে বাঁচতেও শিখিয়েছিল।”

অয়ন মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে তখন নতুন ফসলের চারা দুলছে।

জগন্নাথের সেই শেষ বীজগুলো আসলে কখনও শেষ হয়ে যায়নি। সেগুলো থেকে জন্মেছিল অসংখ্য নতুন বীজ, আর সেই বীজের সঙ্গে জন্মেছিল একটি গ্রামের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস।

শিক্ষা: প্রতিকূল সময়ে ছোট্ট একটি উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আশা শুধু মনে রাখলেই হয় না, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন একটু করে কাজও করতে হয়।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা  — চাঁদের বুড়ির চরকা।।

নীল আকাশে চাঁদ উঠেছে, তারার মেলা বসে, চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে রূপকথারই দেশে।

সাদা মেঘের তুলোর সুতো আঙুল ঘুরে বোনে, জোছনা হয়ে ঝরে পড়ে পৃথিবীর প্রতিটি কোণে।

ঘুমপাড়ানি রাতের বুকে শিশুর চোখে ঘুম, জানালাতে চাঁদের আলো ছড়ায় মায়ার চুম্বন।

দূরের গাছে পেঁচা ডাকে, ঝিঁঝিঁ পোকার গান, নীরব রাতের আঁচল জুড়ে স্বপ্নের সন্ধান।

চাঁদের বুড়ি জানে বুঝি কত মনের কথা, কারও মনে সুখের ঢেউ, কারও চোখে ব্যথা।

তাই তো সে জোছনা দিয়ে মুছে দেয় অভিমান, অন্ধকারের বুকের মাঝে জ্বালায় আশার গান।

চাঁদটা যখন মেঘে ঢাকে, ভেবো না সে নেই, আড়াল হলেও আলো থাকে— এই সত্য ভুলো নে কেউ।

জীবনও ঠিক চাঁদের মতো, কখনও ঢাকা পড়ে, সময় এলে আলো নিয়ে ফিরবে আবার ঘরে।

Share This