Categories
কবিতা

কবিতা  — ফিরে আসার পথ।

কখনও কখনও পথ হারিয়ে
মানুষ একা হয়,
চেনা শহর অচেনা লাগে,
চোখে জমে ক্ষয়।

যে স্বপ্নগুলো বুকের মাঝে
সযতনে রেখেছিলাম,
সময়ের ঝড় এসে তাদের
দূরে কোথায় ঠেলে দিল।

তবু পথের ধুলো মেখে
হাঁটতে হাঁটতে বুঝি,
হারিয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু
শেষ হয়ে যাওয়া নয় কিছুই।

একটা তারা রাতের আকাশে
দিক দেখিয়ে যায়,
একটা ছোট্ট আশার প্রদীপ
অন্ধকারে জ্বলে রয়।

যে দরজাটা বন্ধ ভেবেছিলাম,
সেটাই খুলে যায়,
যে মানুষটা হারিয়ে গেছে,
স্মৃতিতে সে থেকে যায়।

ফিরে আসার পথ কখনও
একেবারে হারায় না,
মন যদি সত্যি পথ চেনে,
দূরত্ব তাকে থামায় না।

তাই যতই ঝড় আসুক জীবনে,
থেমো না কোনো ক্ষণ—
একদিন ঠিক পৌঁছে যাবে
তোমার আপন ভুবন।

Share This
Categories
কবিতা

কবিতা — শিউলির সকাল।

ভোরের আকাশ মুছে ফেলে
রাতের কালো দাগ,
ঘাসের বুকে শিশির হাসে,
জেগে ওঠে বাগান।

শিউলি ঝরে উঠোন জুড়ে
সাদা নরম হাসি,
মনে হয়, এই পৃথিবীটা
আজও বড় ভালোবাসি।

দূরের কোনো মন্দির থেকে
ভেসে আসে গান,
পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে,
জেগে ওঠে প্রাণ।

মায়ের হাতে চায়ের কাপ,
জানালাতে রোদ,
ছোট্ট সুখের মুহূর্তগুলো
ভরিয়ে দেয় হৃদয়।

গতকালের যত দুঃখ ছিল
রাখি না আর মনে,
নতুন দিনের নতুন স্বপ্ন
বুনি আপন মনে।

জীবন তো প্রতিদিনই দেয়
নতুন করে সুযোগ,
ভাঙা পথেও ফুটতে পারে
আশার রঙিন ফুল।

তাই শিউলির মতো ঝরে
যাক পুরনো ক্ষয়,
প্রতিটি নতুন সকাল বলুক—
“আবার শুরু হোক নতুনময়।”

Share This
Categories
গল্প

কুয়োর ধারে রাখা চাবি।

শালবনের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা গ্রাম—নবগ্রাম। গ্রামের মাঝখানে ছিল একটা পুরোনো কুয়ো। একসময় সেই কুয়োর জলেই গ্রামের অর্ধেক মানুষের সংসার চলত। ভোর হলেই মেয়েরা কলসি নিয়ে আসত, কৃষকেরা গরুকে জল খাওয়াত, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার আগে মুখ ধুয়ে নিত।

কিন্তু বছর কয়েক ধরে গ্রামের মানুষ কুয়োটাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।

পাশের পাকা রাস্তার ধারে একটা গভীর নলকূপ বসেছিল। সবাই সেখান থেকেই জল নিত। পুরোনো কুয়োটার চারপাশে আগাছা জন্মেছিল। ইটের দেওয়ালে শ্যাওলা, পাশে শুকনো পাতা আর ভাঙা ডাল জমে ছিল।

কুয়োটার পাশে একটা ছোট্ট টিনের ঘর ছিল।

সেই ঘরে থাকতেন গ্রামের বৃদ্ধা কমলা বউদি।

স্বামী বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে কাজের সন্ধানে শহরে গিয়ে আর ফিরেনি। কমলা বউদি একাই থাকতেন। গ্রামের লোকজন তাঁকে ভালোবাসত, কিন্তু তাঁর এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি কুয়োটার চারপাশ ঝাড়ু দিতেন।

একদিন গ্রামের স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী মেঘলা তাঁকে জিজ্ঞেস করল,

—“বউদি, এই কুয়োটা তো কেউ ব্যবহারই করে না। আপনি রোজ পরিষ্কার করেন কেন?”

কমলা বউদি ঝাড়ু থামিয়ে মেঘলার দিকে তাকালেন।

হেসে বললেন,

—“সবকিছু ব্যবহার করার জন্যই বাঁচিয়ে রাখতে হয় না রে। কিছু জিনিস ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে হয়।”

মেঘলা কথাটার মানে বুঝতে পারল না।

—“কিন্তু ভবিষ্যতে এটা কে ব্যবহার করবে?”

কমলা বউদি কুয়োটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“যার দরকার হবে।”

তারপর আর কিছু বললেন না।


কয়েক মাস পর নবগ্রামে ভয়াবহ গরম পড়ল।

পুকুর শুকিয়ে গেল। নলকূপে ভিড় বাড়তে লাগল। সকালে জল নিতে এসে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।

একদিন দুপুরে নলকূপটাও হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।

গ্রামের মানুষ দিশেহারা।

কেউ বলল,

—“মিস্ত্রি না এলে আজ জল পাওয়া যাবে না।”

কেউ বলল,

—“আর একটা নলকূপ বসাতে হবে।”

মেঘলার মনে হঠাৎ কমলা বউদির কথা এল।

সে দৌড়ে কুয়োর কাছে গেল।

কুয়োর চারপাশে আগাছা পরিষ্কার করা। পুরোনো দড়ি একপাশে রাখা। একটা লোহার বালতি ঝুলছে।

কিন্তু কুয়োর মুখে একটা তালা।

মেঘলা অবাক হয়ে গেল।

ঠিক তখন কমলা বউদি এসে দাঁড়ালেন।

—“কী হয়েছে?”

—“বউদি, কুয়োতে তালা কেন?”

কমলা বউদি আঁচলের ভাঁজ থেকে একটা ছোট্ট চাবি বের করলেন।

বললেন,

—“কারণ কুয়ো শুধু জল নয়, দায়িত্বও।”

মেঘলা চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

কমলা বউদি তালা খুলে দিলেন।

কুয়োর ভিতরে পরিষ্কার জল দেখা গেল।

মেঘলা অবাক।

—“এত জল!”

কমলা বউদি মৃদু হেসে বললেন,

—“আমি জানতাম একদিন দরকার হবে।”


খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের মানুষ কুয়োর কাছে জড়ো হল।

প্রথমে সবাই অবাক। তারপর আনন্দ।

কিন্তু কমলা বউদি একটা শর্ত দিলেন।

—“এই জল সবাই নেবে। কিন্তু কুয়ো নোংরা করা যাবে না। আর প্রতিদিন দুজন করে পাহারা দেবে।”

গ্রামের কয়েকজন যুবক বলল,

—“এত নিয়মের দরকার কী?”

কমলা বউদি শান্ত গলায় বললেন,

—“যে জিনিসের মূল্য বোঝা যায় না, সেটা বেশিদিন টেকে না।”

সেদিন থেকেই গ্রামের মানুষ পালা করে কুয়ো দেখাশোনা শুরু করল।

মেঘলা প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে কুয়োর পাশে এসে দাঁড়াত। সে খাতায় হিসাব লিখতে শুরু করল—কত পরিবার জল নিল, কতবার কুয়ো পরিষ্কার করা হল, কোথায় মেরামতি দরকার।

কয়েকদিনের মধ্যেই মেঘলার মাথায় একটা পরিকল্পনা এল।

সে স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলল,

—“স্যার, আমরা কি কুয়োর জল সংরক্ষণ করতে পারি?”

শিক্ষক বললেন,

—“অবশ্যই। শুধু কুয়ো থাকলেই হবে না, তার চারপাশের জলও মাটিতে ঢোকাতে হবে।”

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মিলে কুয়োর পাশে ছোট ছোট জলধারণের গর্ত তৈরি করল। বর্ষার জল যাতে নষ্ট না হয়ে মাটির নিচে ঢুকে যায়, তার ব্যবস্থা করা হল।

গ্রামের লোকজনও সাহায্য করল।

কেউ মাটি কাটল, কেউ ইট আনল, কেউ গাছ লাগাল।

কমলা বউদি দূরে বসে সব দেখতেন।

একদিন মেঘলা তাঁর কাছে গিয়ে বলল,

—“বউদি, আপনি আগে থেকেই এসব জানতেন?”

কমলা বউদি হেসে বললেন,

—“সব জানতাম না। শুধু জানতাম, আজকের সুবিধার জন্য আগামীকালকে নষ্ট করা উচিত নয়।”


বর্ষা এল।

প্রথম বৃষ্টির দিন মেঘলা ছুটে গেল কুয়োর কাছে।

চারপাশের ছোট ছোট গর্তে জল জমছে। ধীরে ধীরে সেই জল মাটির ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে।

কয়েক সপ্তাহ পর কুয়োর জল আরও বেড়ে গেল।

গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, পুরোনো কুয়ো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও।

পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে কুয়োটার চারপাশে পাকা ঘাট তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হল।

কিন্তু কমলা বউদি বললেন,

—“ঘাট বানাও, ভালো কথা। কিন্তু আমার একটা কথা রাখবে?”

সবাই জানতে চাইল,

—“কী কথা?”

তিনি বললেন,

—“কুয়োটার চাবি একজনের হাতে থাকবে না। গ্রামের স্কুলের একটা চাবি থাকবে, মহিলাদের দলের একটা থাকবে, আর পঞ্চায়েতের কাছেও একটা থাকবে।”

সবাই রাজি হল।

মেঘলা তখন হেসে বলল,

—“তাহলে আপনার চাবিটা?”

কমলা বউদি নিজের পুরোনো চাবিটা মেঘলার হাতে দিয়ে বললেন,

—“এটা তুই রাখ।”

মেঘলা অবাক হয়ে বলল,

—“আমি?”

—“হ্যাঁ। কারণ তুই প্রশ্ন করেছিলি—‘ভবিষ্যতে এটা কে ব্যবহার করবে?’ এখন তার উত্তরও তুই জানিস।”

মেঘলার চোখে জল এসে গেল।

সে চাবিটা শক্ত করে মুঠোয় ধরে বলল,

—“আমি এটা হারাব না।”

কমলা বউদি বললেন,

—“চাবি হারালে তালা খোলে না। কিন্তু মনে রাখিস, শুধু চাবি সামলালেই হবে না—যে জিনিসের তালা খোলার দায়িত্ব পেয়েছিস, সেটাও সামলাতে হয়।”


বছর কেটে গেল।

মেঘলা বড় হয়ে জলসম্পদ নিয়ে পড়াশোনা করল। পরে সে অন্য গ্রামেও জল সংরক্ষণের কাজ শুরু করল।

নবগ্রামের সেই পুরোনো কুয়ো তখন গ্রামের পরিচয়ের অংশ।

কুয়োর পাশে একটা ছোট ফলক লাগানো হয়েছিল—

“যে জল আজ বাঁচে, সে জলই আগামীকাল জীবন বাঁচায়।”

কমলা বউদি তখন আর ছিলেন না।

তাঁর টিনের ঘরটিও একদিন ভেঙে গিয়েছিল।

কিন্তু কুয়োর পাশের একটা ছোট কাঠের বাক্সে আজও রাখা আছে সেই পুরোনো চাবি।

মেঘলা যখনই গ্রামে আসে, বাক্সটা খুলে চাবিটা হাতে নেয়।

চাবিটা এখন আর কোনো তালা খোলে না।

তবু তার মূল্য কমেনি।

কারণ সেটি তাকে মনে করিয়ে দেয়—

ভবিষ্যৎ কখনও হঠাৎ তৈরি হয় না।

আজ আমরা যে ছোট্ট ভালো কাজটা করি, যত্ন করে যে সামান্য সম্পদটুকু বাঁচিয়ে রাখি, একদিন সেটাই হয়তো বহু মানুষের জীবন রক্ষা করবে।

আর কখনও কখনও—

একটা ছোট্ট চাবির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটা গ্রামের ভবিষ্যৎ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

আগুনের পাশে বসা মানুষটি।

শালবনের ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম—দেউলিয়া। গ্রামের শেষ মাথায় টিনের চালের একটি ঘর। ঘরের সামনে পড়ে থাকে লোহা, হাতুড়ি, চিমটা আর নানা রকম যন্ত্রপাতি।

সেখানেই বসতেন মহাদেব কর্মকার।

গ্রামের সবাই তাঁকে বলত মহাদেব কাকা।

সকাল হলেই তাঁর ঘর থেকে শোনা যেত—

ঠং! ঠং! ঠং!

লোহার ওপর হাতুড়ির আঘাত।

আগুনের লাল আলোয় তাঁর মুখ আরও গম্ভীর দেখাত।

তিনি কোদাল বানাতেন, কাস্তে বানাতেন, লাঙলের ফলা মেরামত করতেন। কৃষকদের যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে তাঁর কাছেই আসতে হতো।

কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল।

বাজারে তৈরি যন্ত্রের সংখ্যা বাড়ছিল।

অনেকেই আর হাতে তৈরি জিনিস কিনতে চাইত না।

মহাদেবের ছেলে রতন শহরে গিয়ে অন্য কাজ করত।

সে বাবাকে বলত,

—“বাবা, এই দোকানটা বন্ধ করে দাও। এখন আর আগের মতো কাজ নেই।”

মহাদেব হাসতেন।

—“লোহার কাজ কমেছে, মানুষের প্রয়োজন কমেনি।”

রতন বলত,

—“তুমি সবকিছুর মধ্যে আশা খুঁজে পাও।”

মহাদেব উত্তর দিতেন,

—“আশা না থাকলে আগুনও জ্বলে না।”

একদিন গ্রামের স্কুলের ছাত্র অর্ক মহাদেব কাকার কাছে এল।

তার হাতে ছিল একটি ভাঙা লোহার ঘুড়ির কাঠামো।

সে বলল,

—“কাকা, এটা ঠিক করে দিতে পারবেন?”

মহাদেব দেখে বললেন,

—“পারব। তবে তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি না। হাতে কাজ শিখবি।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

—“আমি?”

—“হ্যাঁ।”

সেদিন থেকেই অর্ক মাঝে মাঝে মহাদেবের দোকানে আসতে লাগল।

সে আগুন জ্বালানো শিখল।

লোহা গরম করা শিখল।

চিমটা দিয়ে ধরতে শিখল।

হাতুড়ি চালাতে শিখল।

প্রথম দিন তার হাত কেঁপে যাচ্ছিল।

মহাদেব বললেন,

—“হাতুড়ি জোরে মারলেই কাজ হয় না।”

—“তাহলে?”

—“কোথায় মারছিস, সেটা বুঝতে হয়।”

অর্ক ধীরে ধীরে শিখতে লাগল।

একদিন সে দেখল, মহাদেব একটি পুরোনো লোহার টুকরো আগুনে দিচ্ছেন।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

—“ওটা দিয়ে কী হবে?”

—“দেখবি।”

কিছুক্ষণ পর লাল গরম লোহাটাকে তিনি হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে শুরু করলেন।

ঠং!

ঠং!

ঠং!

ধীরে ধীরে লোহার টুকরোটি একটি সুন্দর ছোট্ট ছুরির আকার নিল।

অর্ক অবাক।

—“এত পুরোনো লোহা থেকে এটা বানালেন?”

মহাদেব বললেন,

—“লোহারও দ্বিতীয় জীবন আছে।”

কথাটা অর্কের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান মেলার ঘোষণা হল।

অর্ক ঠিক করল, সে পুরোনো জিনিস দিয়ে নতুন কিছু বানাবে।

সে মহাদেব কাকার কাছে গেল।

—“কাকা, আমাকে একটা জিনিস বানাতে সাহায্য করবেন?”

—“কী?”

—“পুরোনো লোহা দিয়ে একটা বাতাস চালিত ছোট যন্ত্র।”

মহাদেব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—“চেষ্টা করা যাক।”

দু’জনে মিলে কাজ শুরু করল।

পুরোনো সাইকেলের চাকা।

ভাঙা লোহার রড।

কিছু নাট-বল্টু।

একটি পুরোনো পাখার অংশ।

সব মিলিয়ে তারা একটি ছোট্ট বাতাসচালিত যন্ত্র বানাতে লাগল।

প্রথমবার কাজ করল না।

দ্বিতীয়বারও না।

তৃতীয়বার ঘুরতে গিয়েই ভেঙে পড়ল।

অর্ক হতাশ হয়ে বলল,

—“হবে না।”

মহাদেব বললেন,

—“লোহা ভাঙলে আবার গরম করা যায়।”

—“আর যদি বারবার ভাঙে?”

—“তাহলে বারবার বানাবি।”

অর্ক আবার কাজ শুরু করল।

এক সপ্তাহ পর যন্ত্রটি তৈরি হল।

ছোট্ট একটি চাকা বাতাসে ঘুরল।

তার সঙ্গে লাগানো ছোট ডায়নামো থেকে একটি বাতি জ্বলে উঠল।

অর্ক আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“কাকা! আলো!”

মহাদেব হেসে বললেন,

—“আগুন থেকে আলো আসে, আর পরিশ্রম থেকেও।”

বিজ্ঞান মেলার দিন অর্ক তার মডেল নিয়ে গেল।

অনেক ছাত্র বড় বড় মডেল এনেছিল।

কেউ রোবট।

কেউ সৌরশক্তির মডেল।

কেউ কম্পিউটার প্রজেক্ট।

অর্কের ছোট্ট যন্ত্রটি দেখতে খুব সাধারণ।

কিন্তু যখন সে বাতাসে সেটি ঘুরিয়ে দেখাল এবং বলল কীভাবে গ্রামের পুরোনো লোহার জিনিস দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে, সবাই মন দিয়ে শুনল।

একজন বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,

—“এই কাজের পিছনে তোমাকে কে সাহায্য করেছে?”

অর্ক বলল,

—“আমাদের গ্রামের মহাদেব কাকা।”

—“তিনি কী করেন?”

অর্ক গর্ব করে বলল,

—“তিনি লোহার কারিগর।”

অর্ক পুরস্কার পেল।

কিন্তু বাড়ি ফেরার পর সে সরাসরি মহাদেবের দোকানে গেল।

পুরস্কারটি তাঁর হাতে দিয়ে বলল,

—“এটা আপনার।”

মহাদেব মাথা নাড়লেন।

—“না রে, এটা তোর।”

—“আপনি না থাকলে আমি পারতাম না।”

মহাদেব বললেন,

—“আমি শুধু হাতুড়ি ধরতে শিখিয়েছি। কাজটা তুই করেছিস।”

সেইদিন থেকে অর্ক আরও অনেক ছেলেমেয়েকে নিয়ে মহাদেবের দোকানে আসতে শুরু করল।

মহাদেব তাদের পুরোনো লোহা দিয়ে নানা জিনিস বানানো শেখাতে লাগলেন।

কারও হাতে তৈরি হল পাখির খাবার রাখার পাত্র।

কেউ বানাল গাছের জন্য লোহার খুঁটি।

কেউ বানাল ছোট্ট বাতাসচালিত খেলনা।

মহাদেবের দোকানে আবার শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যেতে লাগল।

একদিন রতন শহর থেকে ফিরে এসে দোকানের সামনে অনেক ছেলেমেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গেল।

সে বাবাকে বলল,

—“এরা সবাই এখানে কেন?”

মহাদেব বললেন,

—“শিখতে এসেছে।”

রতন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“বাবা, তুমি দোকানটা বন্ধ করোনি কেন বুঝতে পারছি।”

মহাদেব হাসলেন।

—“আমি দোকান চালাইনি রে। কাজটা চালিয়ে গেছি।”

রতন বাবার পাশে বসে বলল,

—“আমিও শিখব।”

মহাদেব চমকে তাকালেন।

—“তুই?”

রতন হেসে বলল,

—“হ্যাঁ। শহরে অনেক কাজ শিখেছি। এবার বাবার কাজটাও শিখি।”

সেদিন সন্ধ্যায় আবার আগুন জ্বলল।

তার চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক, রতন আর গ্রামের কয়েকজন শিশু।

মহাদেব একটি লোহার টুকরো আগুনে ধরলেন।

লোহা ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল।

তিনি বললেন,

—“মনে রাখিস, আগুন জিনিসকে শুধু পোড়ায় না। ঠিকভাবে ব্যবহার করলে তাকে নতুন আকারও দেয়।”

অর্ক আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, কথাটা শুধু লোহার জন্য নয়।

মানুষের জীবনেও হয়তো কিছু আগুন আসে—

যা ভেঙে দেয়।

আবার সেই আগুনই কখনও মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলে।

সেদিন রাতেও মহাদেবের দোকান থেকে অনেকক্ষণ ধরে শোনা গেল—

ঠং! ঠং! ঠং!

কিন্তু সেই শব্দ এবার শুধু লোহা পেটানোর শব্দ ছিল না।

সেটা ছিল একটি পুরোনো শিল্পের নতুন প্রজন্মের হাতে ফিরে আসার শব্দ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
বিবিধ

কড়া নিরাপত্তায় মেদিনীপুর আদালতে সুমিত রায়, বালি কেলেঙ্কারি মামলায় শুনানি।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- বালি কেলেঙ্কারি মামলায় ফের মেদিনীপুর আদালতে হাজির করা হল সুমিত রায়কে। শনিবার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হয়।
অভিযোগ, ওভারলোড গাড়ি চলাচলের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা লেনদেনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে। এই মামলায় আদালত সুমিত রায়কে ৯ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিল।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সুমিত রায়ের আইনজীবী প্রতিম দাসগুপ্তের দাবি, ২০২৩ সালের ওই মামলার সঙ্গে সুমিত রায় সরাসরি যুক্ত নন। তাঁর আরও দাবি, জমি কেলেঙ্কারি মামলায় ১৩ দিনের পুলিশি হেফাজতে থাকার সময় সিআইডি মোবাইল ফোন ও একটি ডাটা কেবল ছাড়া আর কোনও গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি।
অন্যদিকে, বালি সংক্রান্ত মামলায় ৯ দিনের পুলিশি হেফাজত শেষে শনিবার ফের আদালতে শুনানি হয়।

Share This
Categories
বিবিধ

গান্ধীজয়ন্তীতে মালদায় বিজ্ঞান অভীক্ষা, সুষ্ঠু পরীক্ষায় যুক্ত ২৫০ বিজ্ঞানকর্মী ও শিক্ষক।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:-২ অক্টোবর ২০২৬, জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর জন্মজয়ন্তী তিথিতে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের মালদা জেলা শাখার উদ্যোগে এবং কালিয়াচক-৩ বিজ্ঞান কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছরের মতো এই বছরও অত্যন্ত সফল ও সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হলো ‘বিজ্ঞান অভীক্ষা ২০২৬’। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আগামী দিনের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য তাদের প্রস্তুত করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
​চলতি বছরে কালিয়াচক-৩ ব্লকের অন্তর্গত বৈষ্ণবনগর উচ্চ বিদ্যালয়, বৈষ্ণবনগর বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয়, বীরনগর উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৯টি পরীক্ষা কেন্দ্রে সফলভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ২,৫০০ জন ছাত্র-ছাত্রী অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে। আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ধরনকে মাথায় রেখে ও.এম.আর. (OMR) শিটের মাধ্যমে এই অভীক্ষা পরিচালিত হয়। পরীক্ষা প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ রাখতে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রায় ৪০ জন বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০ জন সক্রিয় বিজ্ঞান কর্মী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা এই মহতী কর্মসূচিতে নিরলস অবদান রাখেন।
​পরীক্ষা পরিচালনা ও সাফল্য প্রসঙ্গে কালিয়াচক-৩ বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞান অভীক্ষা কনভেনর তথা বীরনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষক শ্রী উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানান, “এবছর অত্যন্ত সুচারুভাবে ও নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান অভীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানচেতনা জাগ্রত করা এবং ও.এম.আর. শিটে অভ্যস্ত করে তুলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভয় কাটানোই আমাদের লক্ষ্য। আগামী বছর এই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী।”
​অন্যদিকে, কালিয়াচক-৩ বিজ্ঞান কেন্দ্রের সভাপতি শ্রী অরুণাভ লালা সকল কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমাদের বিজ্ঞান কর্মীদের সক্রিয় মনোবল ও যৌথ প্রচেষ্টাতেই এই বিরাট আয়োজন সুসম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। কর্মসূচির সাথে যুক্ত সকল কর্মী, পর্যবেক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষার্থীদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আশা করি আগামী দিনে বিজ্ঞান মঞ্চের এই প্রসারের ধারা আরও বিস্তৃত হবে।”

Share This
Categories
বিবিধ

গেরুয়া গামছা পরে ‘বড় নেতা’ সাজা নয়, নব্য কর্মীদের চিহ্নিত করার বার্তা কাটোয়া জেলা সভাপতির।

পূর্বস্থলী, নিজস্ব সংবাদদাতা:- “২৫ টাকার গেরুয়া গামছা গলায় ঝুলিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ বললেই বড় বিজেপি কর্মী হওয়া যায় না।” নব্য বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে এমনই মন্তব্য করলেন কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি মানিক রায়।

শুক্রবার বিকেলে পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের নসরতপুরে ‘পথের সাথী’-তে আয়োজিত এক সম্বর্ধনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের নতুন কর্মীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন তিনি। মানিক রায় বলেন, দোকান থেকে গেরুয়া গামছা কিনে গলায় ঝুলিয়ে নিজেদের বড় বিজেপি কর্মী হিসেবে তুলে ধরছেন—এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে।

তাঁর বক্তব্য, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনও অপকর্ম করলে তার প্রভাব দলের উপর পড়ে এবং তাতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজ্য সভাপতির নির্দেশ মেনে দলের নাম করে অপকর্মে জড়িত কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্বস্থলী দক্ষিণ ৪ নম্বর মণ্ডলের উদ্যোগে নসরতপুরের ‘পথের সাথী’-তে দলীয় কর্মীদের নিয়ে এই সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন মণ্ডল সভাপতি তাপস হালদার-সহ দলের অন্যান্য কর্মীরা।

সভামঞ্চ থেকেই নব্য বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে দলীয় শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ে কড়া বার্তা দেন কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি। তাঁর বক্তব্য ঘিরে দলের অন্দরেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

Share This
Categories
বিবিধ

৯টি পরীক্ষা কেন্দ্রে মেধার লড়াই, গড়বেতা-৩ ব্লকে বিজ্ঞান মানসিকতা অভীক্ষায় ২০০০ পরীক্ষার্থী।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- পড়াশোনার প্রতি পড়ুয়াদের আগ্রহ বাড়ানো এবং তাদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও মেধার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে শুক্রবার গান্ধী জয়ন্তীকে সামনে রেখে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা ৩ নম্বর ব্লকজুড়ে আয়োজন করা হয় বিজ্ঞান মানসিকতা ও মেধা অভীক্ষা পরীক্ষা।
জানা গিয়েছে,ব্লকের মোট ৯টি কেন্দ্রে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২০০০ জন পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। পড়ুয়াদের যুক্তিবোধ, মেধা ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে উপস্থিত ছিলেন চিরঞ্জিত রানা, চিন্ময় ঘোষ, অমর ঘোষ, শংকর প্রসাদ অধিকারী, প্রসেনজিৎ কুণ্ডু, কানাইলাল সিং, সন্দীপ মুখার্জি-সহ অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
উদ্যোক্তাদের দাবি, পড়ুয়াদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে আগামী দিনেও এই ধরনের বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে।

Share This
Categories
কবিতা

অপেক্ষার জানালা।

জানালার পাশে বসে আছি,
বিকেল নামে ধীরে,
মেঘের ভাঁজে রোদ লুকিয়ে
স্বপ্ন আসে ফিরে।

একটা পাখি ডেকে ওঠে
অচেনা কোনো সুরে,
মনে হয়, সে খবর এনেছে
হারিয়ে যাওয়া দূরে।

পথের দিকে তাকিয়ে থাকি,
চেনা পায়ের আশায়,
সময় যেন থমকে থাকে
নীরব ভালোবাসায়।

যে মানুষটি আসবে বলে
দিন গুনেছি কত,
তার জন্যই বুকের মাঝে
জ্বলে ছোট্ট প্রদীপ যত।

হয়তো সে আর আসবে না,
হয়তো ভুলেছে পথ,
তবু কেন মনটা আজও
শোনে তারই রথ?

অপেক্ষা বড় অদ্ভুত জিনিস—
আশা রাখে বাঁচিয়ে,
হারিয়ে গেলেও মানুষকে
রাখে মনে সাজিয়ে।

তাই তো জানালাটা খোলা,
আকাশটাও নীল—
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায়
ফিরবে হারানো শীল।

Share This
Categories
গল্প

করিডরের বেঞ্চ।

হাসপাতালের তৃতীয় তলার করিডরের শেষ প্রান্তে একটা কাঠের বেঞ্চ ছিল।

সকাল থেকে রাত—প্রায় সারাদিনই সেখানে কেউ না কেউ বসে থাকত।

সেদিন রাত দুটোয় বেঞ্চটায় বসে ছিল সমীর।

হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।

তাতে লেখা—

“অপারেশন থিয়েটার—৩।”

তার স্ত্রী ভিতরে।

সমীরের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপা ভয়।

ঠিক তখন পাশের দরজা দিয়ে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন।

বৃদ্ধের হাতে একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ।

তিনি সমীরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

—“আপনারও?”

সমীর বুঝতে না পেরে বলল,

—“জি?”

—“অপেক্ষা।”

সমীর মাথা নাড়ল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“আমার মেয়ে ভিতরে।”

দু’জনেই চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর সমীর জিজ্ঞেস করল,

—“কতক্ষণ হলো?”

—“চার ঘণ্টা।”

সমীর অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি একা?”

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

—“আমি আর কে আছি?”

সমীর আর প্রশ্ন করল না।

ভোরের দিকে নার্স এসে সমীরকে ডাকল।

—“আপনার রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের গ্রুপ?”

সমীর বলল।

নার্স চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর আবার এসে বলল,

—“আপনার সঙ্গে কেউ রক্ত দিতে পারবেন?”

সমীর মাথা নিচু করল।

—“আমি নিজেই দিতে পারব।”

বৃদ্ধ পাশ থেকে বললেন,

—“আপনি চাইলে আমি দিতে পারি।”

সমীর অবাক হয়ে তাকাল।

—“আপনি?”

—“হ্যাঁ।”

—“কিন্তু আপনার মেয়ে তো ভিতরে!”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“রক্ত দিতে আধঘণ্টা লাগে। মানুষের পাশে থাকতে সারাজীবন লাগে।”

সমীর কিছু বলতে পারল না।

পরীক্ষা করে দেখা গেল, বৃদ্ধের রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে।

রক্ত দেওয়ার পর বৃদ্ধ আবার সেই বেঞ্চে এসে বসলেন।

সমীর তাঁর হাত ধরে বলল,

—“আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।”

বৃদ্ধ বললেন,

—“ঋণী হবেন না।”

—“তাহলে?”

—“কেউ একদিন আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজ আমি আপনার পাশে দাঁড়ালাম। এটাই জীবন।”

সকাল আটটার দিকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন,

—“অপারেশন সফল হয়েছে।”

সমীর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর বৃদ্ধকে খুঁজতে গেল।

বেঞ্চটা খালি।

কাপড়ের ব্যাগটাও নেই।

শুধু বেঞ্চের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।

সমীর তুলে পড়ল—

“আপনার স্ত্রী ভালো হয়ে উঠুন। আর যদি কোনওদিন কাউকে হাসপাতালে একা বসে থাকতে দেখেন, তার পাশে একটু বসবেন। সব রোগের ওষুধ হয়তো আপনার কাছে থাকবে না, কিন্তু একাকীত্বের ওষুধ আপনার কাছে থাকতেই পারে।”

সমীর কাগজটা বুকপকেটে রেখে দিল।

বছর দুয়েক পর।

একই হাসপাতাল।

একই করিডর।

একই বেঞ্চ।

সমীর এবার একা নয়।

তার সঙ্গে তার স্ত্রী।

দু’জনেই হাসপাতালের করিডরে বসে আছে।

হঠাৎ তারা দেখল, এক তরুণী একা বেঞ্চের কোণে বসে কাঁদছে।

সমীর উঠে তার পাশে গিয়ে বসল।

—“ভয় লাগছে?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

সমীর বলল,

—“ভয় পেলে একা থাকতে হয় না।”

তার স্ত্রী দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

করিডরের পুরনো বেঞ্চটা তখনও একই জায়গায় ছিল।

শুধু সেখানে বসা মানুষগুলো বদলে গিয়েছিল।

আর অদৃশ্যভাবে এক মানুষের ছোট্ট মানবিকতা থেকে আরেক মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়ছিল আরেকটি আলো।

সমাপ্ত।

Share This