Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আর্মেনিয়া: পাহাড়, প্রাচীন মঠ আর ইতিহাসের এক অনন্য দেশ।

পৃথিবীর মানচিত্রে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত ছোট্ট দেশ আর্মেনিয়া। আয়তনে খুব বড় না হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্থাপত্য, পাহাড়, হ্রদ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে দেশটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ককেশাস অঞ্চলের এই দেশ ভ্রমণকারীদের সামনে এমন এক পৃথিবী খুলে দেয়, যেখানে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন মঠ, গভীর উপত্যকা, আগ্নেয়গিরির ভূপ্রকৃতি, নীল হ্রদ এবং আধুনিক শহর পাশাপাশি অবস্থান করছে।

আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলির একটি হিসেবে পরিচিত। শহরের ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। গোলাপি ও আগ্নেয় পাথরে তৈরি ভবন, প্রশস্ত রাস্তা, ক্যাফে, জাদুঘর ও পাহাড়ের দৃশ্য ইয়েরেভানকে একটি স্বতন্ত্র শহরে পরিণত করেছে।

রাজধানীর বাইরে বেরিয়ে গেলেই আর্মেনিয়ার আরেকটি রূপ দেখা যায়। পাহাড়ের কোলে প্রাচীন মঠ, সরু উপত্যকা, জলপ্রপাত, বনভূমি ও গ্রাম। আবার দেশের পূর্বদিকে রয়েছে বিশাল Lake Sevan, যার নীল জল ও পাহাড়ি পরিবেশ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

আর্মেনিয়া তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক দীর্ঘ গল্প।

আর্মেনিয়ার পরিচয়

আর্মেনিয়া দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে অবস্থিত একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। এর চারপাশে রয়েছে জর্জিয়া, আজারবাইজান, তুরস্ক ও ইরান।

দেশটির ভূপ্রকৃতি মূলত পাহাড়ি। বহু অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যথেষ্ট উঁচু হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দৃশ্য অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা।

আর্মেনিয়ার ইতিহাস বহু প্রাচীন। দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের সম্পর্কও গভীর। আর্মেনিয়াকে বিশ্বের প্রাচীনতম খ্রিস্টান ঐতিহ্যসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলির একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রাচীন গির্জা ও মঠ তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।

ইয়েরেভান: গোলাপি পাথরের শহর

আর্মেনিয়া ভ্রমণের শুরু হতে পারে রাজধানী Yerevan থেকে।

শহরের অনেক ভবন গোলাপি বা লালচে আগ্নেয় পাথর দিয়ে তৈরি। সূর্যের আলোয় এই পাথরের রং বদলে যায়। তাই ইয়েরেভানকে অনেক সময় “Pink City” বা গোলাপি শহর বলা হয়।

শহরের প্রশস্ত রাস্তা, পুরনো ভবন, আধুনিক ক্যাফে, পার্ক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ইয়েরেভানের নিজস্ব চরিত্র তৈরি হয়েছে।

শহরের কেন্দ্রে হাঁটতে হাঁটতে একদিকে ইতিহাসের স্থাপনা, অন্যদিকে আধুনিক জীবনযাত্রা চোখে পড়ে।

Republic Square

ইয়েরেভানের কেন্দ্রে অবস্থিত Republic Square শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

চারপাশে সরকারি ও ঐতিহাসিক ভবন এবং মাঝখানে বিশাল খোলা চত্বর—এই স্থানটি শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সন্ধ্যার সময় এখানে আলো ও পানির ফোয়ারার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলে পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

চত্বরের আশপাশে হাঁটলে ইয়েরেভানের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়।

Cascade Complex

ইয়েরেভানের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা হলো Cascade।

এটি একটি বিশাল সিঁড়ি ও স্থাপত্যসমষ্টি, যার উপরের দিকে উঠলে শহরের বিস্তীর্ণ দৃশ্য দেখা যায়।

পরিষ্কার দিনে দূরে Mount Ararat-এর বিশাল অবয়ব দেখা যেতে পারে। পাহাড়টি বর্তমান আর্মেনিয়ার সীমার বাইরে তুরস্কের ভূখণ্ডে অবস্থিত হলেও আর্মেনিয়ার ইতিহাস ও জাতীয় সংস্কৃতিতে এর প্রতীকী গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর।

Cascade-এর আশপাশে ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম ও খোলা জায়গা রয়েছে। শিল্পপ্রেমীদের কাছে এলাকাটি বিশেষ আকর্ষণীয়।

Matenadaran

আর্মেনিয়ার সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাস জানতে চাইলে Matenadaran গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

এখানে প্রাচীন আর্মেনীয় পাণ্ডুলিপির বিশাল সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে।

পুরনো পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় লেখা, ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চার নানা দলিল আর্মেনিয়ার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় দেয়।

একটি জাতির ইতিহাস শুধু প্রাসাদ বা দুর্গে নয়, বই ও পাণ্ডুলিপির মধ্যেও সংরক্ষিত থাকে—Matenadaran তার সুন্দর উদাহরণ।

Vernissage Market

স্থানীয় শিল্প ও হস্তশিল্প দেখতে চাইলে ইয়েরেভানের Vernissage Market ঘুরে দেখা যায়।

এখানে কাঠের শিল্পকর্ম, চিত্রকর্ম, গয়না, কার্পেট, স্মারক ও বিভিন্ন হস্তশিল্প পাওয়া যায়।

পর্যটকেরা স্থানীয় শিল্পীদের কাজ দেখার পাশাপাশি স্মৃতিচিহ্নও সংগ্রহ করতে পারেন।

Cafesjian Center for the Arts

আধুনিক শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে Cascade-এর কাছে অবস্থিত Cafesjian Center for the Arts আকর্ষণীয়।

আধুনিক ও সমকালীন শিল্পের বিভিন্ন কাজ এখানে প্রদর্শিত হয়।

ইয়েরেভানের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি আধুনিক শিল্পের এই উপস্থিতি শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

Garni Temple

ইয়েরেভান থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে আর্মেনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনা Garni Temple।

পাথরের তৈরি এই প্রাচীন মন্দিরটি পাহাড়ি উপত্যকার প্রান্তে অবস্থিত।

আর্মেনিয়ার খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রাচীন প্রাক-খ্রিস্টীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও Garni গুরুত্বপূর্ণ।

মন্দিরের চারপাশের পাহাড় ও গভীর উপত্যকার দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর।

Symphony of Stones

Garni-এর কাছে Symphony of Stones নামে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক শিলাগঠন রয়েছে।

উঁচু পাথরের স্তম্ভগুলো এমনভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে যে দূর থেকে মনে হয় যেন বিশাল কোনো বাদ্যযন্ত্রের পাইপ সাজানো হয়েছে।

প্রকৃতির তৈরি এই অনন্য আকৃতি পর্যটকদের বিস্মিত করে।

উপত্যকার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের বিশাল পাথুরে দেয়াল দেখা যায়।

Geghard Monastery

আর্মেনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ধর্মীয় স্থাপনা হলো Geghard Monastery।

পাহাড়ি পাথরের মধ্যে নির্মিত এই মঠের কিছু অংশ সরাসরি শিলার ভিতরে খোদাই করা।

পাথর, গুহা, প্রাচীন স্থাপত্য এবং পাহাড়ি পরিবেশ মিলিয়ে Geghard-এর আবহ অন্যরকম।

এখানে গেলে বোঝা যায়, প্রাচীন মানুষ কীভাবে প্রাকৃতিক পাহাড়কে ব্যবহার করে ধর্মীয় স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন।

Khor Virap

আর্মেনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত দৃশ্য পাওয়া যায় Khor Virap থেকে।

এখান থেকে পরিষ্কার আবহাওয়ায় Mount Ararat-এর বিশাল অবয়ব দেখা যায়।

মঠটি সমতল ভূমির মধ্যে অবস্থিত এবং তার পেছনে বিশাল পাহাড়ের উপস্থিতি একটি অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে।

সকালের আলোয় এই দৃশ্য বিশেষ সুন্দর হতে পারে।

Mount Ararat-এর প্রতীকী গুরুত্ব

Mount Ararat আর্মেনিয়ার জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে।

পর্বতটি বর্তমানে তুরস্কের ভূখণ্ডে অবস্থিত। কিন্তু আর্মেনীয় শিল্প, সাহিত্য ও জাতীয় প্রতীকে এর উপস্থিতি ব্যাপক।

ইয়েরেভান বা Khor Virap থেকে দূরে পাহাড়টির দৃশ্য দেখা গেলে ইতিহাস ও ভূগোলের জটিল সম্পর্কও অনুভব করা যায়।

Lake Sevan: আর্মেনিয়ার নীল রত্ন

আর্মেনিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলির একটি হলো Lake Sevan।

এটি একটি বিশাল উচ্চভূমির হ্রদ। নীল জল, চারপাশের পাহাড় এবং বিশাল আকাশ মিলে এখানে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি হয়েছে।

গ্রীষ্মকালে হ্রদের আশপাশে মানুষের আনাগোনা বাড়ে। কেউ সমুদ্রসদৃশ পরিবেশ উপভোগ করেন, কেউ নৌভ্রমণ করেন, আবার কেউ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে নিরিবিলি সময় কাটান।

Sevanavank Monastery

Lake Sevan-এর তীরে অবস্থিত Sevanavank Monastery একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনা।

পাহাড়ের উপর মঠটি দাঁড়িয়ে আছে এবং নিচে বিস্তৃত নীল হ্রদ।

মঠের কাছ থেকে Lake Sevan-এর দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর। ইতিহাস ও প্রকৃতি এখানে যেন একই ফ্রেমে এসে দাঁড়িয়েছে।

Dilijan: আর্মেনিয়ার সবুজ শহর

আর্মেনিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে Dilijan।

পাহাড় ও বনভূমিতে ঘেরা এই শহরকে অনেক সময় আর্মেনিয়ার সবুজ অঞ্চলগুলির অন্যতম হিসেবে দেখা হয়।

শহরের আশপাশে বনভূমি, পাহাড়ি পথ এবং ছোট ছোট গ্রাম রয়েছে।

যারা ইয়েরেভানের ব্যস্ততা থেকে দূরে প্রকৃতির মধ্যে কিছু সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য Dilijan আকর্ষণীয়।

Dilijan National Park

Dilijan-এর আশপাশে রয়েছে Dilijan National Park।

ঘন বন, পাহাড়ি পথ, ছোট জলধারা এবং বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছে।

হাইকিং ও প্রকৃতিভ্রমণের জন্য এলাকাটি উপযোগী।

শরৎকালে গাছের পাতার রং বদলে গেলে বনভূমির সৌন্দর্য আরও বাড়ে।

Haghartsin Monastery

Dilijan অঞ্চলের বনভূমির মধ্যে অবস্থিত Haghartsin Monastery আর্মেনিয়ার অন্যতম সুন্দর মঠ।

চারপাশের গাছপালা ও পাহাড়ের মধ্যে পাথরের প্রাচীন স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে।

শহর থেকে দূরে এমন একটি পরিবেশে দাঁড়িয়ে প্রাচীন স্থাপত্য দেখার অভিজ্ঞতা বিশেষ।

Tatev Monastery

আর্মেনিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত Tatev Monastery ইতিহাস ও প্রকৃতির অসাধারণ মিলন ঘটিয়েছে।

মঠটি গভীর পাহাড়ি উপত্যকার উপরে অবস্থিত।

এখানে পৌঁছানোর অন্যতম আকর্ষণীয় উপায় হলো Wings of Tatev নামে পরিচিত কেবল কার। পাহাড় ও উপত্যকার উপর দিয়ে চলার সময় নিচের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়।

উঁচু থেকে পাহাড়ি ভূদৃশ্য দেখার এই অভিজ্ঞতা আর্মেনিয়া ভ্রমণের স্মরণীয় অংশ হতে পারে।

Vorotan Gorge

Tatev অঞ্চলের চারপাশে গভীর Vorotan Gorge রয়েছে।

পাহাড়ের বিশাল দেয়াল, গভীর উপত্যকা ও নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারা মিলিয়ে এখানকার ভূদৃশ্য নাটকীয়।

প্রকৃতির শক্তি কীভাবে হাজার হাজার বছর ধরে ভূখণ্ডকে বদলে দিয়েছে, এই অঞ্চলে তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

Areni: আঙুর ও প্রাচীন ঐতিহ্য

আর্মেনিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের Areni অঞ্চল আঙুর চাষ ও ঐতিহ্যবাহী পানীয় উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের কারণে অঞ্চলটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।

Areni Cave-এ প্রাচীন মদ তৈরির নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মানবসভ্যতার পুরনো খাদ্য ও পানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

ইতিহাস ও কৃষি সংস্কৃতির সংযোগ বোঝার জন্য অঞ্চলটি আকর্ষণীয়।

Noravank Monastery

লালচে পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত Noravank Monastery আর্মেনিয়ার অন্যতম সুন্দর মঠ।

পাহাড়ের রং ও মঠের পাথরের স্থাপত্য একে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে দূর থেকে পুরো জায়গাটি যেন একটি প্রাকৃতিক ছবির অংশ মনে হয়।

বিশেষ করে বিকেলের আলোয় লাল পাহাড়ের রং আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।

আর্মেনিয়ার প্রাচীন গির্জা ও মঠ

আর্মেনিয়ার ভ্রমণে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে—প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্য।

অনেক গির্জা ও মঠ পাহাড়ের চূড়া, উপত্যকা বা বনভূমির মধ্যে নির্মিত।

এগুলির অনেকগুলোই শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্থাপত্য, পাণ্ডুলিপি, ভাস্কর্য ও স্থানীয় ইতিহাস।

কোনো মঠে গেলে শুধু ছবি না তুলে তার ইতিহাস জানার চেষ্টা করলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও গভীর হয়।

আর্মেনিয়ার খাচকার

আর্মেনীয় সংস্কৃতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো Khachkar।

পাথরের উপর ক্রুশ ও বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা খোদাই করা স্মৃতিস্তম্ভকে Khachkar বলা হয়।

এগুলি আর্মেনীয় শিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পাথরে এত সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করার দক্ষতা বহু শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে।

আর্মেনিয়ার খাবার

আর্মেনিয়ার খাবারও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।

স্থানীয় খাবারে মাংস, শাকসবজি, শস্য, রুটি ও বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উপাদানের ব্যবহার দেখা যায়।

Khorovats আর্মেনিয়ার বিখ্যাত বারবিকিউ ধরনের খাবার। সাধারণত মাংস আগুনে বা কয়লার উপর গ্রিল করা হয়।

Dolma-ও জনপ্রিয়। আঙুরপাতা বা অন্যান্য উপকরণের মধ্যে পুর ভরে এটি রান্না করা হয়।

Lavash হলো পাতলা ঐতিহ্যবাহী রুটি, যা আর্মেনীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের স্যুপ, সালাদ, চিজ, শুকনো ফল ও স্থানীয় মিষ্টিও পাওয়া যায়।

আর্মেনিয়ার ফল ও শুকনো খাবার

আর্মেনিয়ার বাজারে বিভিন্ন ধরনের ফল ও শুকনো ফল পাওয়া যায়।

এপ্রিকটের সঙ্গে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। শুকনো ফল, বাদাম ও ফল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ।

বাজারে গেলে স্থানীয় শুকনো ফল ও বাদামের স্বাদ নেওয়া যেতে পারে।

আর্মেনিয়ার কফি সংস্কৃতি

আর্মেনিয়ার শহরগুলিতে ছোট ক্যাফে বেশ জনপ্রিয়।

বিশেষ করে ইয়েরেভানের কেন্দ্রীয় এলাকায় রাস্তার পাশে বসে কফি খাওয়া, মানুষের চলাচল দেখা এবং শহরের পরিবেশ অনুভব করা ভ্রমণের শান্ত মুহূর্ত হতে পারে।

একটি দেশের সংস্কৃতি বোঝার জন্য শুধু জাদুঘর নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও দেখা দরকার। ক্যাফে সেই সুযোগ করে দেয়।

আর্মেনিয়ার সংগীত ও শিল্প

আর্মেনিয়ার সংগীতে প্রাচীন লোকঐতিহ্য ও আধুনিক ধারার সংমিশ্রণ দেখা যায়।

দেশটির ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে Duduk বিশেষভাবে পরিচিত। কাঠের তৈরি এই বাদ্যযন্ত্রের সুর গভীর ও আবেগপূর্ণ।

আর্মেনীয় সংগীত ও নৃত্যের সঙ্গে দেশের ইতিহাস, পাহাড় ও মানুষের জীবনধারার সম্পর্ক রয়েছে।

আর্মেনিয়ার ইতিহাস

আর্মেনিয়ার ইতিহাস বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্য, রাজ্য ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

রোমান, পারস্য, বাইজেন্টাইন, আরব, অটোমান ও রুশ প্রভাব বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলে পড়েছে।

আধুনিক যুগে আর্মেনিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল এবং পরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

দেশটির ইতিহাস বুঝতে গেলে এই দীর্ঘ পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েরেভানের রাত

দিনের ব্যস্ততার পর রাতে ইয়েরেভানের কেন্দ্র নতুন রূপ ধারণ করে।

Republic Square-এর আলো, Cascade-এর আশপাশের ক্যাফে, রাস্তার মানুষের আনাগোনা এবং শহরের রাতের আলো মিলিয়ে একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় অনেক মানুষ বাইরে সময় কাটান।

শহরের কেন্দ্র থেকে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকালে আবার আধুনিক নগরজীবনের মধ্যে প্রকৃতির উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

ফটোগ্রাফির জন্য আর্মেনিয়া

ফটোগ্রাফারদের জন্য আর্মেনিয়া একটি বৈচিত্র্যময় দেশ।

Khor Virap থেকে Mount Ararat, Sevanavank থেকে Lake Sevan, Noravank-এর লাল পাহাড়, Tatev-এর উপত্যকা, Dilijan-এর বন এবং ইয়েরেভানের গোলাপি পাথরের ভবন—প্রতিটি জায়গা আলাদা ধরনের ছবি তৈরি করে।

সকালের আলো, বিকেলের সোনালি রোদ এবং শরতের রঙিন বনভূমি বিশেষ আকর্ষণীয়।

ঋতুভেদে আর্মেনিয়া

আর্মেনিয়ার ঋতুভেদে প্রকৃতির চেহারা অনেকটাই বদলে যায়।

বসন্ত

বসন্তে পাহাড়ি অঞ্চল সবুজ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ফুল ফুটতে শুরু করে এবং প্রকৃতিভ্রমণের জন্য পরিবেশ মনোরম হয়।

গ্রীষ্ম

গ্রীষ্মে দিন দীর্ঘ থাকে। Lake Sevan, পাহাড় ও শহর ঘোরার জন্য এই সময় অনেক পর্যটকের পছন্দ হতে পারে।

তবে কিছু নিম্নাঞ্চলে গরমও অনুভূত হতে পারে।

শরৎ

আর্মেনিয়ার শরৎ বিশেষ সুন্দর। Dilijan-এর মতো বনাঞ্চলে গাছের পাতার রং হলুদ, কমলা ও লাল হয়ে ওঠে।

আঙুরের মৌসুমও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শীত

শীতে পাহাড় ও উচ্চভূমিতে তুষার দেখা যায়। স্কি ও অন্যান্য শীতকালীন কার্যকলাপের জন্য কিছু পাহাড়ি অঞ্চল আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

তবে তুষার ও ঠান্ডার কারণে ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।

ভারত থেকে আর্মেনিয়া ভ্রমণ

ভারত থেকে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে বিমানপথে যাওয়া যায়, যদিও রুট ও সংযোগ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

ভ্রমণের আগে আর্মেনিয়ায় প্রবেশের জন্য ভারতীয় নাগরিকদের বর্তমান ভিসা ও প্রবেশ-সংক্রান্ত নিয়ম অবশ্যই সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা উচিত।

পাসপোর্ট, ভিসা বা অনুমোদন, থাকার ব্যবস্থা, বিমান টিকিট এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও ভ্রমণ নথি প্রস্তুত রাখা ভালো।

আর্মেনিয়ায় কতদিন থাকবেন

আর্মেনিয়া ভালোভাবে দেখতে অন্তত সাত দিন রাখা যেতে পারে।

প্রথম দিন

ইয়েরেভান—Republic Square, Cascade, শহরের কেন্দ্র ও স্থানীয় ক্যাফে।

দ্বিতীয় দিন

Garni Temple, Symphony of Stones এবং Geghard Monastery।

তৃতীয় দিন

Khor Virap, Areni ও Noravank।

চতুর্থ দিন

Lake Sevan ও Sevanavank।

পঞ্চম দিন

Dilijan ও আশপাশের বনাঞ্চল।

ষষ্ঠ দিন

Tatev Monastery ও পাহাড়ি অঞ্চল।

সপ্তম দিন

ইয়েরেভানে ফিরে কেনাকাটা, জাদুঘর ও অবসর সময়।

আরও সময় থাকলে গ্রামাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চল ধীরে ধীরে দেখা যায়।

আর্মেনিয়ায় ভ্রমণের বিশেষত্ব

আর্মেনিয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর বৈচিত্র্য।

একটি ছোট দেশের মধ্যে এত পুরনো ইতিহাস, এত প্রাচীন মঠ, এত পাহাড়ি অঞ্চল এবং এত ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর।

সকালে একটি প্রাচীন মঠে দাঁড়িয়ে ইতিহাস অনুভব করা যায়, দুপুরে পাহাড়ি উপত্যকার মধ্যে হাঁটা যায় এবং সন্ধ্যায় ইয়েরেভানের আধুনিক ক্যাফেতে বসে শহরের জীবন দেখা যায়।

এই বৈপরীত্যই আর্মেনিয়াকে বিশেষ করে তুলেছে।

দায়িত্বশীল পর্যটন

আর্মেনিয়ার অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা অত্যন্ত পুরনো। তাই ভ্রমণকারীদের এসব স্থানের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া উচিত।

প্রাচীন পাথরের দেওয়ালে লেখা বা আঁকা উচিত নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু স্পর্শ বা সরানো উচিত নয়।

প্রাকৃতিক এলাকায় আবর্জনা না ফেলা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করা জরুরি।

স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতির প্রতি সম্মান দেখানোও ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শেষকথা

আর্মেনিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে ভ্রমণ করলে মনে হয় ইতিহাস ও প্রকৃতি একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।

ইয়েরেভানের গোলাপি পাথরের শহর থেকে Lake Sevan-এর নীল জল, Garni-এর প্রাচীন মন্দির থেকে Geghard-এর পাথর কেটে তৈরি মঠ, Khor Virap-এর সামনে দূরের Mount Ararat থেকে Noravank-এর লাল পাহাড়, Dilijan-এর সবুজ বন থেকে Tatev-এর গভীর উপত্যকা—প্রতিটি স্থান আর্মেনিয়ার ভিন্ন একটি গল্প বলে।

এই দেশের সৌন্দর্য কেবল তার পাহাড় বা স্থাপত্যে নয়। সৌন্দর্য রয়েছে মানুষের সংস্কৃতিতে, খাবারের স্বাদে, প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে, পাথরে খোদাই করা Khachkar-এ, Duduk-এর সুরে এবং ছোট ক্যাফেতে বসে কাটানো একটি সাধারণ সন্ধ্যাতেও।

আর্মেনিয়া ভ্রমণ তাই শুধু একটি বিদেশ সফর নয়; এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা। এখানে প্রতিটি পাহাড়ের পেছনে যেন ইতিহাস, প্রতিটি মঠের দেওয়ালে যেন কোনো পুরনো গল্প এবং প্রতিটি উপত্যকার নীরবতার মধ্যে যেন বহু শতাব্দীর স্মৃতি লুকিয়ে আছে।

যে ভ্রমণকারী শুধুমাত্র বিখ্যাত শহর নয়, বরং একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে অনুভব করতে চান, তাঁর জন্য আর্মেনিয়া হতে পারে এক স্মরণীয় আবিষ্কার।

ককেশাসের পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট দেশ তাই আকারে ছোট হলেও তার গল্পে বিশাল—আর্মেনিয়া, যেখানে পাহাড়ের নীরবতার মধ্যেও ইতিহাস কথা বলে।

========== শেষ ==========

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

জানকীদেবী বাজাজ: স্বাধীনতার লড়াই থেকে গ্রামীণ সমাজসেবায় এক মহীয়সী নারীর যাত্রা।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এমন অনেক নারীর নাম রয়েছে, যাঁরা সরাসরি বড় রাজনৈতিক মঞ্চে না থেকেও আন্দোলনের ভিতকে শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁরা কখনও চরকা কেটেছেন, কখনও বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, কখনও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার স্বাধীনতার পরে গ্রামোন্নয়ন ও নারীকল্যাণের কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

জানকীদেবী বাজাজ ছিলেন সেই ধারারই এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি খাদি ও চরকার প্রচার, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩২ সালের Civil Disobedience Movement-এ অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। স্বাধীনতার পরে তাঁর কাজ থেমে যায়নি; তিনি বিনোবা ভাবের ভূমিদান আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।

তাঁর জীবন তাই স্বাধীনতার আগে ও পরে—দুই ভারতকেই দেখার একটি অনন্য জানালা।

ছোটবেলার জীবন

জানকীদেবী বাজাজের জন্ম ৭ জানুয়ারি ১৮৯৩ সালে মধ্যপ্রদেশের জাওরায়। তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী মারওয়ারি পরিবারে জন্মেছিলেন।

তৎকালীন ভারতীয় সমাজে মেয়েদের জীবনের পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত। অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয় জামনালাল বাজাজের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে জামনালাল বাজাজ একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

কিন্তু জানকীদেবীর নিজের পরিচয় শুধু একজন শিল্পপতির স্ত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

স্বামী যখন জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তিনিও ধীরে ধীরে জনজীবন ও সমাজসেবার কাজে প্রবেশ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর নিজের কাজই তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়।

গান্ধীর আদর্শের প্রভাব

জামনালাল বাজাজ মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন। গান্ধীর সরল জীবনযাপন, স্বদেশি, খাদি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ধারণা বাজাজ পরিবারের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

জানকীদেবীও চরকা কাটতে শুরু করেন এবং খাদি ব্যবহারে গুরুত্ব দেন। বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

চরকা তাঁর কাছে শুধু একটি সুতো কাটার যন্ত্র ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় চরকা হয়ে উঠেছিল আত্মনির্ভরতা ও স্বদেশি অর্থনীতির একটি প্রতীক।

তিনি নিজের জীবনযাপনেও সেই আদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করেন।

নারীদের সংগঠিত করার কাজ

জানকীদেবী বুঝেছিলেন, স্বাধীনতার আন্দোলনকে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে দিতে হলে নারীদেরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

তিনি নারীসমাজের মধ্যে খাদি, স্বনির্ভরতা ও সামাজিক কাজের গুরুত্ব নিয়ে কাজ করেন। নারীকল্যাণ এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

তৎকালীন সময়ে কোনও নারী প্রকাশ্যে সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিলে তাঁকে শুধু বাইরের সামাজিক বাধাই নয়, পারিবারিক ও প্রচলিত রীতিনীতির সঙ্গেও লড়াই করতে হতো।

জানকীদেবীর ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটেছিল।

তিনি নিজের পরিচিত সামাজিক পরিসরকে ব্যবহার করে আরও বেশি নারীকে সামাজিক কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান

জানকীদেবীর সামাজিক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান।

১৯২০-এর দশকে তিনি তথাকথিত ‘হরিজন’ সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক অবস্থার উন্নতির কাজে যুক্ত হন। তাঁদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও তিনি অংশ নেন।

এটি ছিল সেই সময়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল সামাজিক প্রশ্ন।

ভারতীয় সমাজে জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু সমাজকর্মী রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক সংস্কারের কথাও বলেছিলেন।

জানকীদেবীর কাজ সেই বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ধারার অংশ হয়ে ওঠে।

Civil Disobedience Movement এবং কারাবাস

১৯৩০-এর দশকে স্বাধীনতা আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৩২ সালের Civil Disobedience Movement-এ জানকীদেবী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর জন্য তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

একজন নারী হিসেবে কারাবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় তিনি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁদের ভূমিকা শুধু মিছিল বা জনসভায় উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অনেক নারী গ্রেফতার, কারাবাস এবং সামাজিক চাপও সহ্য করেছিলেন।

জানকীদেবীর ক্ষেত্রেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল।

গরুসেবা ও গ্রামীণ সমাজ

জানকীদেবীর সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল গোসেবা।

১৯৪২ সাল থেকে তিনি দীর্ঘ সময় Akhil Bharatiya Goseva Sangh-এর সভাপতি হিসেবে কাজ করেন বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এই কাজের সঙ্গে তাঁর গ্রামীণ ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক ছিল।

ভারতের বহু গ্রামীণ পরিবারের জীবনে গবাদি পশু কৃষি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ফলে গ্রামীণ সমাজে পশুপালন, কৃষি এবং অর্থনৈতিক জীবনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

জানকীদেবীর সমাজসেবার দৃষ্টিভঙ্গিতে তাই গ্রাম ও সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

স্বাধীনতার পরে নতুন কাজ

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে—কিন্তু গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য কীভাবে কমবে?

জানকীদেবী সেই প্রশ্ন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।

স্বাধীনতার পরে তিনি বিনোবা ভাবের ভূমিদান আন্দোলন-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ভূমিদান আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ভূমির মালিকদের কাছ থেকে জমি দান নিয়ে ভূমিহীনদের মধ্যে তা বিতরণের মাধ্যমে গ্রামীণ বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা। জানকীদেবী এই সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

অর্থাৎ তাঁর স্বাধীনতার ধারণা শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসানে শেষ হয়নি।

স্বাধীনতার পরেও তিনি সামাজিক ন্যায় ও গ্রামীণ উন্নয়নের প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন।

নিজের জীবনের কথা নিজেই লিখেছিলেন

জানকীদেবী তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আত্মজীবনী লেখেন—‘মেরি জীবন যাত্রা’।

বইটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়।

আত্মজীবনী কোনও ব্যক্তির জীবনের শুধু ঘটনাপঞ্জি নয়। নিজের সময়কে একজন মানুষ কীভাবে দেখেছেন, কোন ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং নিজের কাজের অর্থ কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—তাও সেখানে ধরা পড়ে।

জানকীদেবীর আত্মজীবনী তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার একটি মূল্যবান উৎস।

পদ্মবিভূষণে সম্মান

১৯৫৬ সালে জানকীদেবী বাজাজকে পদ্মবিভূষণ প্রদান করা হয়। সরকারি পদ্ম পুরস্কারের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে এবং তাঁকে Social Work-এর ক্ষেত্রে সম্মানিত করা হয়।

এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কাজের একটি জাতীয় স্বীকৃতি ছিল।

তাঁর বিশেষত্ব ছিল—তিনি কোনও একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে ছিলেন না।

স্বাধীনতা আন্দোলন, খাদি, নারীকল্যাণ, সামাজিক সংস্কার, গোসেবা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন—বিভিন্ন ক্ষেত্র তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তাঁর নামে আজও কাজ চলছে

জানকীদেবীর মৃত্যুর পরও তাঁর নাম সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে।

তাঁর স্মৃতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। Jamnalal Bajaj Foundation-এর একটি পুরস্কারও তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা নারী ও শিশুদের শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ করা নারীদের সম্মানিত করে।

অর্থাৎ তাঁর কাজ শুধু অতীতের ইতিহাস হয়ে থাকেনি; তাঁর নাম পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

একজন গৃহবধূ থেকে সমাজকর্মী

জানকীদেবীর জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তনগুলির একটি হল তাঁর সামাজিক ভূমিকার বিস্তার।

একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে অল্প বয়সে বিবাহিত একজন নারী ধীরে ধীরে কীভাবে বৃহত্তর সমাজের প্রশ্ন নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন—তাঁর জীবন সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

তিনি কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন না, বড় কোনও প্রশাসনিক পদেও ছিলেন না। কিন্তু নিজের সামাজিক অবস্থান, পরিচিতি এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হন।

এখানেই তাঁর জীবনের বিশেষত্ব।

স্বাধীনতার অর্থ তাঁর কাছে কী ছিল?

জানকীদেবীর কর্মজীবন দেখলে বোঝা যায়, তাঁর কাছে স্বাধীনতার ধারণা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

খাদি ও স্বদেশি অর্থনীতি তাঁকে আত্মনির্ভরতার দিকে টেনেছিল।

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে কাজ তাঁকে সামাজিক সমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

ভূমিদান আন্দোলন তাঁকে গ্রামীণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিল।

নারীকল্যাণের কাজ তাঁকে সমাজের অর্ধেক মানুষের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিল।

এই বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর সামাজিক দর্শনের নানা দিক প্রকাশ পায়।

শেষ অধ্যায়

জানকীদেবী বাজাজ ২১ মে ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

কিন্তু তাঁর জীবনের শেষের সঙ্গে তাঁর কাজের সমাপ্তি ঘটেনি।

যে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও পুরস্কার তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলির মাধ্যমে তাঁর স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উন্নয়ন, শিক্ষা, দক্ষতা এবং গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে যুক্ত কাজের ক্ষেত্রে তাঁর নাম আজও ব্যবহৃত হয়।

উত্তরাধিকার

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি এমন অসংখ্য মানুষের জীবন রয়েছে, যাঁদের কাজ ছিল সমাজের ভিতরে পরিবর্তন তৈরি করা।

জানকীদেবী বাজাজ তাঁদেরই একজন।

তাঁর জীবনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সমাজসেবা আলাদা দুটি অধ্যায় ছিল না। বরং একটি থেকে অন্যটির জন্ম হয়েছে।

স্বাধীনতার আগে তিনি স্বদেশি ও সামাজিক সংস্কারের কাজে যুক্ত হয়েছেন। আন্দোলনের সময় কারাবরণ করেছেন। স্বাধীনতার পরে গ্রামীণ সমাজের প্রশ্নে কাজ করেছেন। ভূমিদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নারীকল্যাণের কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই দীর্ঘ পথচলা দেখায়, একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরে সেই স্বাধীনতাকে সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তোলার কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জানকীদেবী বাজাজের জীবন তাই ইতিহাসের একটি শান্ত অথচ গভীর অধ্যায়—যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব, আত্মনির্ভরতার সঙ্গে মানবিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সঙ্গে জনকল্যাণ একসূত্রে গাঁথা।

তাঁর নাম মনে করিয়ে দেয়—দেশ গড়ার কাজ শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে হয় না; গ্রামের উঠোনে, চরকার পাশে, সমাজের প্রান্তিক মানুষের ঘরে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যেও সেই নির্মাণ চলতে থাকে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

গাছ: মানুষের নীরব বন্ধু ও পৃথিবীর সবুজ প্রাণ।

পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের আগমনের বহু আগে থেকেই গাছপালা এই গ্রহের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বন, পাহাড়, নদী, মাঠ কিংবা শহরের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ—প্রতিটি গাছই প্রকৃতির বৃহত্তর ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা কথা বলে না, মানুষের কাছে কিছু দাবি করে না, অথচ নীরবে মানুষের জীবনকে অসংখ্যভাবে সাহায্য করে যায়।

একটি গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয়, কাঠ দেয়, পাখিদের আশ্রয় দেয়, মাটিকে ধরে রাখে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু গাছের গুরুত্ব কেবল ব্যবহারিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সংস্কৃতি, সাহিত্য, স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গেও গাছের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

গাছ ও মানুষের প্রাচীন সম্পর্ক

মানুষের প্রাচীন জীবন প্রকৃতির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিল। খাদ্যের জন্য মানুষ বনের ফলমূল সংগ্রহ করত, আশ্রয়ের জন্য গাছ ও কাঠ ব্যবহার করত এবং বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেত।

সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু গাছের ওপর নির্ভরতা শেষ হয়নি। আজ আধুনিক শহর, প্রযুক্তি ও শিল্পের যুগেও খাদ্য, কাঠ, কাগজ, ঔষধি উপাদান এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের সঙ্গে উদ্ভিদের সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ প্রযুক্তির অগ্রগতি যতই হোক, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মৌলিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়

গাছের অন্যতম পরিচিত ভূমিকা হলো সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করা এবং অক্সিজেন নির্গত করা। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—শুধু গাছ লাগালেই সব পরিবেশগত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। দূষণ কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, জল ও মাটি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি গাছ ও বন সংরক্ষণ করতে হয়।

গাছ তাই পরিবেশ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়।

শহরের জীবনে গাছের গুরুত্ব

শহরে কংক্রিটের বাড়ি, রাস্তা ও যানবাহনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিবেশে গাছের উপস্থিতি শহরকে তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক ও বাসযোগ্য করতে সাহায্য করতে পারে।

রাস্তার পাশে গাছ ছায়া দেয়। পার্ক ও সবুজ এলাকা মানুষকে বিশ্রামের জায়গা দেয়। গাছপালা শহরের দৃশ্যকেও সুন্দর করে তোলে।

গরমের সময় গাছের ছায়া ও বাষ্পীভবন স্থানীয় পরিবেশকে কিছুটা শীতল রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শহর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে রাস্তার গাছ, পার্ক, উন্মুক্ত সবুজ স্থান ও নগর বনায়নের গুরুত্ব রয়েছে।

গাছ ও বৃষ্টির সম্পর্ক

বন ও গাছপালা জলচক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। উদ্ভিদের পাতার মাধ্যমে জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায় এবং বৃহত্তর জলচক্রের অংশ হয়।

বনভূমি মাটির জলধারণ ক্ষমতা ও স্থানীয় পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় মাটিক্ষয় কমানোর ক্ষেত্রে উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে বন থাকলেই বন্যা বা খরা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সরল ধারণা ঠিক নয়। জল ব্যবস্থাপনা, নদী, ভূপ্রকৃতি, বৃষ্টিপাত ও ভূমি ব্যবহারের মতো বহু বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত।

পাখি ও প্রাণীদের আশ্রয়

একটি বড় গাছ মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য প্রাণীরও বাড়ি। পাখিরা গাছের ডালে বাসা বাঁধে, কাঠবিড়ালি গাছের কোটরে আশ্রয় নেয়, বিভিন্ন পোকামাকড় গাছের পাতায় ও বাকলে বসবাস করে।

একটি পুরোনো বট, অশ্বত্থ বা আমগাছের চারপাশে তাকালে দেখা যায় কত ধরনের প্রাণী তার সঙ্গে যুক্ত। গাছ কেটে ফেলা হলে শুধু একটি গাছ হারায় না; তার ওপর নির্ভরশীল একটি ছোট জীবজগতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই কারণে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পুরোনো ও প্রাকৃতিক গাছ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

ফলের গাছ ও মানুষের জীবন

বাংলার গ্রামাঞ্চলে আম, কাঁঠাল, জাম, নারকেল, সুপারি, পেয়ারা, লিচু, কলা সহ নানা ধরনের ফলের গাছ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত।

গ্রীষ্মের দুপুরে গাছ থেকে পাড়া কাঁচা আম, বর্ষায় পাকা জাম কিংবা শরতের আগে পেয়ারা—এসব শুধু খাদ্য নয়, মানুষের স্মৃতির অংশও হয়ে ওঠে।

অনেক পরিবারে বাড়ির উঠোনের একটি ফলের গাছ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচিত হয়ে থাকে। সেই গাছের ছায়ায় শিশুরা বড় হয়, পরিবার একসঙ্গে বসে এবং বহু স্মৃতি তৈরি হয়।

গাছ ও গ্রামবাংলা

গ্রামবাংলার সৌন্দর্য অনেকটাই গাছপালার সঙ্গে যুক্ত। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, পুকুরের ধারে নারকেল বা তালগাছ, বাড়ির উঠোনে আম-কাঁঠাল, মাঠের পাশে শিমুল বা কৃষ্ণচূড়া—এসব দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক অংশ।

গাছ শুধু গ্রামের সৌন্দর্য বাড়ায় না; কৃষিকাজ, পশুপালন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও তার ভূমিকা রয়েছে। বহু গাছের পাতা, ফল, কাঠ বা অন্যান্য অংশ স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

গাছ ও মানুষের স্মৃতি

কিছু গাছ মানুষের কাছে বিশেষ আবেগের হয়ে ওঠে। স্কুলের মাঠের পুরোনো গাছ, বাড়ির উঠোনের আমগাছ, পাড়ার মোড়ের বটগাছ কিংবা গ্রামের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল গাছ—বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে এসব গাছের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে।

বছরের পর বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ যেন নীরব সাক্ষীর মতো মানুষের জীবনকে দেখে যায়। একটি প্রজন্ম চলে যায়, নতুন প্রজন্ম আসে; কিন্তু গাছটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

এই কারণেই কিছু পুরোনো গাছ শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে ওঠে।

বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষসংরক্ষণ

পরিবেশ রক্ষার আলোচনায় বৃক্ষরোপণের কথা প্রায়ই বলা হয়। গাছ লাগানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু চারা লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

একটি চারা গাছকে বড় হতে সময় লাগে। তাকে জল দিতে হয়, পরিচর্যা করতে হয় এবং বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করতে হয়। তাই বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বৃক্ষসংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় জলবায়ু ও মাটির উপযোগী প্রজাতি বেছে নেওয়া, পর্যাপ্ত জায়গা রাখা এবং ভবিষ্যতে গাছের শিকড় ও ডালের বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

নির্বিচারে গাছ কাটার সমস্যা

শহর সম্প্রসারণ, রাস্তা নির্মাণ, শিল্পায়ন ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক সময় গাছ কাটা হয়। সব উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু উন্নয়নের পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

একটি পুরোনো বড় গাছ কেটে তার জায়গায় কয়েকটি ছোট চারা লাগানো হলেই পরিবেশগত ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ হয়ে যায় না। কারণ বড় গাছের আকার, বয়স, ছায়া, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভূমিকা একটি চারাগাছের মতো নয়।

তাই যেখানে সম্ভব, বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের গাছের সঙ্গে পরিচয়

বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশু শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠে। তাদের প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আগের তুলনায় কম হতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই গাছের সঙ্গে পরিচয় তৈরি করা দরকার।

শিশুকে একটি গাছের নাম শেখানো, তার পাতা ও ফুল দেখানো, বাড়িতে একটি গাছের যত্ন নিতে দেওয়া কিংবা স্কুলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে যুক্ত করা যেতে পারে।

এতে শুধু পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান বাড়বে না, দায়িত্ববোধও তৈরি হতে পারে।

গাছ আমাদের কী শেখায়

গাছের জীবন মানুষের জন্য এক ধরনের প্রতীকী শিক্ষাও বহন করে। একটি ছোট চারা ধীরে ধীরে বড় হয়। তাকে সময় লাগে, ঝড় সহ্য করতে হয়, রোদ-বৃষ্টি পেরোতে হয়। তারপর একদিন সে অন্যদের ছায়া দেয়।

এই প্রক্রিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বড় হওয়া ধীরে ধীরে ঘটে। জীবনের সাফল্যও একদিনে আসে না। ধৈর্য, পরিশ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হয়।

গাছ নিজের জন্য যতটা বাঁচে, অন্য জীবের জন্যও ততটাই উপকারী হয়। তাই নিঃস্বার্থভাবে অন্যের উপকার করার ধারণাটিও গাছের কাছ থেকে প্রতীকীভাবে শেখা যায়।

আমাদের করণীয়

প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে হলে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। অকারণে গাছের ডাল না ভাঙা, চারা গাছের যত্ন নেওয়া, রাস্তার গাছ রক্ষায় সচেতন হওয়া, বাড়িতে উপযুক্ত জায়গায় গাছ লাগানো এবং বৃক্ষনিধনের বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকা—এসব গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। শুধু নিজের বাড়ির সামনে গাছ লাগানো নয়, বৃহত্তর পরিবেশের স্বার্থে প্রাকৃতিক বন, জলাভূমি ও সবুজ অঞ্চল রক্ষার গুরুত্বও বুঝতে হবে।

উপসংহার

গাছ আমাদের জীবনের নীরব বন্ধু। তারা কথা বলে না, কিন্তু প্রতিদিন আমাদের জন্য কাজ করে যায়। বাতাস, ছায়া, ফল, কাঠ, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য—অসংখ্যভাবে গাছ আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে।

একটি গাছ লাগানো মানে শুধু মাটিতে একটি চারা বসানো নয়; এর অর্থ ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাবনা তৈরি করা। আর একটি পুরোনো গাছ রক্ষা করা মানে বহু বছরের একটি জীবন্ত ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা।

আজ আমরা যদি গাছকে শুধু সম্পদ হিসেবে না দেখে জীবনের সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখি, তাহলে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

গাছের ছায়ায় মানুষ বড় হয়, আর মানুষের দায়িত্বে গাছ বেঁচে থাকে। এই পারস্পরিক সম্পর্কই পৃথিবীকে আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

Share This
Categories
বিবিধ

গান্ধী-শাস্ত্রীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, স্বচ্ছতার শপথের পর ৫ কিলোমিটার দৌড়।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী ডিএভি পাবলিক স্কুলে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও বিদ্যালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল ‘রান ফর ডিএভি’ ও ‘ফিট ডিএভি ফ্রিডম রান’ নামে পাঁচ কিলোমিটার দৌড় প্রতিযোগিতা। সুস্থ শরীর ও সচেতন মানসিকতা গড়ে তোলার পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা, সম্প্রীতি এবং স্বচ্ছতার বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গোটা এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
এইদিন সকাল ৭টায় মহাত্মা গান্ধী ও লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান এবং স্বচ্ছতার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর বিদ্যালয়ের পতাকাকে সম্মান জানিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ের সূচনা করেন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শ্রী এন. কে. গৌতম। এই দৌড় প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ জন পড়ুয়া অংশগ্রহণ করে। দৌড় চলাকালীন পথের দু’পাশে থাকা মানুষজন করতালি দিয়ে খুদে ও তরুণ দৌড়বিদদের উৎসাহিত করেন।
প্রতিযোগিতা শেষে ছেলে ও মেয়ে বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারী প্রতিযোগীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও সেরাদের মেমেন্টো প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে দৌড় সম্পূর্ণ করা সকল অংশগ্রহণকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় শংসাপত্র।
শরীরচর্চা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং গান্ধীজির আদর্শকে সামনে রেখে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় গোটা অনুষ্ঠান। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষা কর্মী এবং অভিভাবকদের সক্রিয় সহযোগিতায় এবারের গান্ধী জয়ন্তীর এই বিশেষ আয়োজন সফলভাবে শেষ হয়।

Share This
Categories
বিবিধ

আইহো-সহ চার অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ শিবির, মিলছে একাধিক সরকারি পরিষেবা।।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:— মালদা জেলার বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি হবিবপুর ব্লকেও শুরু হয়েছে সেবা সেতু অভিযান শিবির। হবিবপুর ব্লকের দুটি জায়গায় এই শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। একটি শিবির অনুষ্ঠিত হচ্ছে আইহো উচ্চ বিদ্যালয়ে, অন্যটি হবিবপুর ব্লক অফিস চত্বরে। সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে।
সেবা সেতু অভিযান শিবিরে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে মোট ১৮টি দপ্তর খোলা হয়েছে। এই সমস্ত দপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা ও প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্য, আবেদনপত্র জমা দেওয়া এবং বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নিজেদের এলাকার কাছেই সরকারি পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত এই সেবা সেতু অভিযান শিবির চলবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এলাকার বাসিন্দারা শিবিরে এসে তাঁদের প্রয়োজনীয় সরকারি পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
অন্যদিকে, আইহো উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত শিবিরে চারটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষভাবে পরিষেবা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই চারটি অঞ্চল হল আইহো, ঋষিপুর, শ্রীরামপুর এবং বুলবুলচন্ডী। এই চার অঞ্চলের বাসিন্দারা আইহো উচ্চ বিদ্যালয়ের শিবিরে এসে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
শিবিরে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের আবেদন ও পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এক জায়গায় একাধিক দপ্তরের পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় এলাকার মানুষের সময় ও যাতায়াতের সমস্যাও অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Share This
Categories
বিবিধ

অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা চেয়ে গাছশীতলা মোড়ে পথ অবরোধ, ঘটনাস্থলে পুলিশ।।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখালেন এলাকার মহিলারা। শুক্রবার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়ায় পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায়।
অভিযোগ, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের আগে বিজেপির তরফে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তে যোগ্য মহিলাদের মাসিক ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্তমানে রাজ্য সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনায় যোগ্য মহিলাদের মাসিক ৩ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু তাঁদের দাবি, আবেদন করার পরেও এখনও অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। সেই অভিযোগেই শুক্রবার চন্দ্রকোনার গাছশীতলা মোড়ে রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হন মহিলারা।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় চন্দ্রকোনা থানার পুলিশ। টাকা না পাওয়ার কারণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য মহিলাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। উল্লেখ্য, অন্নপূর্ণা যোজনায় টাকা না পাওয়া নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় আবেদনকারীদের বিক্ষোভের খবরও সামনে এসেছে।

Share This
Categories
বিবিধ

জমিদারি নেই, বাড়িতে ফাটল ধরেছে, তবু বদলায়নি রীতি—সিঙ্গাবাদে ২২৬ বছরের দুর্গাপুজো।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:- পুরনো রীতি মেনে আজও শূন্যে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালিয়ে পুজোর সূচনা হয়। ব্যবসার সূত্রে উত্তরপ্রদেশ থেকে বাংলায় এসে ব্রিটিশদের কাছ থেকে জমিদারি কিনেছিলেন অবোধ নারায়ণ রায়। সাধুদের পরামর্শে শুরু করেছিলেন দেবী দুর্গার আরাধনা। দেখতে দেখতে ২২৬ বছরে পা দিয়েছে হবিবপুরের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী তিলাসনের সিঙ্গাবাদ জমিদার বাড়ির পুজো।
১৯৪৭ সালের দেশভাগে এই জমিদারি স্টেটের সিংহভাগ অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশে চলে যায়। ভারতীয় ভূখণ্ডে সীমান্তের কাঁটাতার থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল রায় জমিদার বাড়ি। জমিদারি প্রথা নেই, বাড়ির বিভিন্ন অংশে ধরেছে ফাটল। তবু অক্ষুণ্ণ রয়েছে পুজোর ঐতিহ্য।
জানা যায়, ডাল ব্যবসার কাজে বাংলায় এসেছিলেন অবোধ নারায়ণ রায়। সিঙ্গাবাদ স্টেশনে ট্রেনে ডাল এনে নৌকাপথে ঢাকা, রাজশাহী ও কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে পাঠাতেন। ব্যবসার সুবিধায় প্রায় তিন হাজার টাকায় জমিদারি কেনেন তিনি। পরে এলাকার মঙ্গলের জন্য তিন সাধুর পরামর্শে দুর্গাপুজো শুরু করেন।

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস : বৃষ্টিভেজা চিঠি (তৃতীয় পর্ব)।

তৃতীয় পর্ব — শেষ চিঠি

অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধি ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

হাতে ধরা টর্চের আলো কাঁপছিল।

ছবির চারজন মানুষ।

একজন যুবক।

একজন তরুণী।

একটি নবজাতক শিশু।

আর শিশুটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে নীলার বাবা।

ছবির পেছনে তারিখ লেখা—

১২ জুন, ১৯৯৮।

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো।

১৯৯৮।

তার জন্মের বছর।

সে ছবিটা আরও কাছে নিয়ে এল।

যুবকটির মুখের দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

এই মুখ সে কোথায় যেন দেখেছে।

পুরনো একটা অ্যালবামে।

তার মায়ের ঘরে।

মায়ের ডায়েরির পাতায়।

অমিতাভ সেন।

তাহলে এটাই কি সেই মানুষ?

তার আসল বাবা?

কিন্তু ছবিতে নীলার বাবার হাতে শিশুটি কেন?

আর নীলার বাবা কেন তাকে এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন?

হঠাৎ সুড়ঙ্গের বাইরে একটা শব্দ হলো।

ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।

দরজার ওপাশে কেউ যেন হাঁটছে।

“নীলা?”

কোনও উত্তর নেই।

সে দরজার কাছে গেল।

কান পেতে শুনল।

নীরবতা।

তারপর খুব ক্ষীণ একটা শব্দ—

“ঋদ্ধি…”

নীলার গলা।

ঋদ্ধি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

নীলা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে।

তার কপালে সামান্য রক্ত।

কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে।

“তুমি ঠিক আছ?”

ঋদ্ধি ছুটে গেল।

নীলা মাথা নাড়ল।

“আমি ঠিক আছি।”

“গুলিটা?”

“দেয়ালে লেগেছে।”

ঋদ্ধি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

“তোমার বাবা?”

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“চলে গেছে।”

“কোথায়?”

“জানি না।”

ঋদ্ধি তার হাত ধরে বলল,

“আমাদের এখন এখান থেকে বেরোতে হবে।”

নীলা মাথা নাড়ল।

“না।”

“কেন?”

“কারণ এত বছর আমরা সত্যি থেকে পালিয়েছি। এবার পালালে আর কখনও শেষ হবে না।”

ঋদ্ধি ছবিটা দেখাল।

“এটা কী?”

নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“এটাই সেই রাতের শুরু।”

“১৯৯৮ সালের ১২ জুন?”

“হ্যাঁ।”

“আমার জন্মের রাত?”

নীলা মাথা নাড়ল।

“তোমার জন্মের রাত।”

ঋদ্ধি গভীর শ্বাস নিল।

“সব বলো।”

নীলা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ল।

“তোমার মা—মাধবী—অমিতাভ সেনকে ভালোবাসতেন।”

ঋদ্ধি চুপ করে শুনছিল।

“অমিতাভ তখন সাংবাদিক ছিলেন। দুর্নীতি আর বেআইনি জমি দখলের বিরুদ্ধে লিখতেন। তোমার মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বহুদিনের।”

“তাহলে?”

“কিন্তু অমিতাভের শত্রু ছিল অনেক।”

নীলা একটু থামল।

“তোমার মায়ের পরিবার সেই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। পরে পরিস্থিতির চাপে তোমার মা অন্য একজনকে বিয়ে করেন।”

ঋদ্ধি বলল,

“যাকে আমি বাবা বলে জেনেছি।”

“হ্যাঁ।”

“তিনি কি জানতেন আমি অমিতাভের ছেলে?”

“জানতেন।”

“তাহলে আমাকে নিজের ছেলে হিসেবে বড় করলেন কেন?”

নীলা চোখ নামিয়ে বলল,

“প্রথমে তোমার জন্য।”

“আর পরে?”

“পরে ভয় থেকে।”

ঋদ্ধি চুপ করে রইল।

নীলা বলল,

“অমিতাভ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেছিলেন। একটা বড় জমি দখল চক্রের বিরুদ্ধে। সেই নথিতে তোমার বাবার নামও ছিল।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“আমার বাবার?”

“হ্যাঁ।”

“তিনি তাহলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন?”

“তিনি সরাসরি সবকিছুর পরিকল্পনাকারী ছিলেন না। কিন্তু তিনি এমন কিছু লোকের সঙ্গে কাজ করতেন, যাদের বিরুদ্ধে অমিতাভ প্রমাণ জোগাড় করেছিলেন।”

“তাহলে অমিতাভ?”

“অমিতাভ সেই প্রমাণ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।”

নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“কিন্তু তার আগেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।”

ঋদ্ধি বলল,

“মারা গিয়েছিলেন?”

“না।”

ঋদ্ধি তাকাল।

“তুমি নিশ্চিত?”

নীলা বলল,

“আমি জানি।”

“কীভাবে?”

“কারণ তিনি আমাকে একবার চিঠি লিখেছিলেন।”

ঋদ্ধির চোখ বড় হয়ে গেল।

“কোথায় সেই চিঠি?”

নীলা তার ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাম বের করল।

খামটা বহু বছরের পুরোনো।

কাগজের রং হলদে হয়ে গেছে।

ঋদ্ধি চিঠিটা খুলল।

লেখা—

“নীলা, যদি কখনও ঋদ্ধি সত্য জানতে চায়, তাকে বলবে আমি তাকে ছেড়ে যাইনি। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য দূরে আছি।”

ঋদ্ধির চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

চিঠির শেষে লেখা—

“তার জন্মের রাতে যে মানুষটি তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিল, সে একদিন বুঝবে—একটি শিশুকে নিজের সন্তান বলে দাবি করলেই সে তার বাবা হয়ে যায় না।”

ঋদ্ধি চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

“অমিতাভ কোথায়?”

নীলা বলল,

“আমি জানি না।”

“তাহলে এত বছর ধরে তুমি কীভাবে নিশ্চিত ছিলে তিনি বেঁচে আছেন?”

নীলা তার দিকে তাকাল।

“কারণ প্রতি বছর আমার জন্মদিনে কেউ একজন আমার কাছে একটা চিঠি পাঠাত।”

“অমিতাভ?”

“হয়তো।”

“চিঠিগুলো কোথায়?”

“আমার কাছে নেই।”

“কেন?”

নীলা মৃদু হাসল।

“কারণ তোমার বাবা সবগুলো নিয়ে নিয়েছিলেন।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্ত থেকে একটা শব্দ এল।

লোহার দরজা খোলার শব্দ।

দুজনেই তাকাল।

কেউ আসছে।

নীলা দ্রুত বলল,

“আমাদের যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“পুরনো ছাপাখানায়।”

“ছাপাখানা?”

“তোমার বাবার পুরনো ব্যবসা।”

“সেখানে কী আছে?”

“অমিতাভের শেষ প্রমাণ।”


বৃষ্টি তখন আরও জোরে পড়ছে।

নীলা আর ঋদ্ধি নীলকুঠির পেছনের জঙ্গল পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে।

প্রায় আধঘণ্টা পর তারা একটা পরিত্যক্ত ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল।

ভাঙা সাইনবোর্ডে লেখা—

“সেন প্রেস।”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে তাকাল।

“এটা কি অমিতাভের?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু এতদিন বন্ধ?”

“প্রায় তিরিশ বছর।”

নীলা একটা ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ভেতরে পুরোনো মেশিন।

ধুলো।

ছেঁড়া কাগজ।

আর দেয়ালে পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।

ঋদ্ধি একটা কাটিং তুলে নিল।

শিরোনাম—

“তরুণ সাংবাদিক অমিতাভ সেন নিখোঁজ।”

তার নিচে ছবি।

সেই একই মুখ।

ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।

“এটা কত বছরের?”

“আটাশ।”

“তাহলে আমার জন্মের আগে।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে অমিতাভ আমাকে চিনতেন কীভাবে?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই একটা শব্দ হলো।

টিক।

তারপর—

টিক।

একটা পুরোনো দেয়ালঘড়ি চলতে শুরু করেছে।

ঘড়িটা এত বছর বন্ধ থাকার কথা।

ঋদ্ধি ঘড়িটার দিকে তাকাল।

কাঁটা থেমে আছে—

রাত ২টা ১৭ মিনিটে।

নীলা বলল,

“তোমার জন্মের সময়।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তুমি কীভাবে জানো?”

“তোমার জন্মসনদে এই সময়টাই লেখা।”

ঘড়ির নিচে একটা ছোট্ট কাঠের তাক।

সেখানে একটা বাক্স।

ঋদ্ধি বাক্সটা নামাল।

ভেতরে একটা ক্যাসেট।

আর একটা চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“ঋদ্ধির জন্য।”

ঋদ্ধির হাত কাঁপতে লাগল।

সে চিঠিটা খুলল।

“ঋদ্ধি,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে সম্ভবত আমি তোমার সামনে নেই।

কিন্তু মনে রেখো—তোমাকে কেউ চুরি করেনি।

তোমাকে কেউ ত্যাগও করেনি।

তোমাকে বাঁচানোর জন্য তোমাকে অন্য নামে বড় হতে হয়েছে।

আমি তোমার বাবা।

আমার নাম অমিতাভ সেন।

তোমার জন্মের রাতে আমি হাসপাতালে ছিলাম।

তোমাকে প্রথমবার কোলে নিয়েছিলাম।

তারপর আমি জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যারা আছে তারা তোমাকে ব্যবহার করে আমাকে চুপ করাতে চায়।

তোমার মাকে নিয়ে আমি পালাতে পারতাম।

কিন্তু তোমাকে নিয়ে পারতাম না।

তাই তোমার মা সিদ্ধান্ত নেন, তুমি অন্য পরিবারের সন্তান হিসেবে বড় হবে।

যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনেছ, সে তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

তার অপরাধ ছিল—সে সত্যিটা লুকিয়েছিল।

কিন্তু তোমার প্রতি তার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না।

তাকে ঘৃণা কোরো না।

একদিন যদি সত্যি জানতে পারো, তাকে বিচার করার আগে মনে রেখো—ভয় মানুষকে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

আর নীলার কথা—

তাকে কখনও ছেড়ে দিও না।

কারণ এই মেয়েটা তোমার বোন নয়।

সে আমার সন্তান নয়।

তাকে ছোটবেলায় তার মা আমার বন্ধু সুশীলের কাছে রেখে যান। সুশীল তাকে নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করেন।

তোমাদের মধ্যে কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই।

যদি কখনও তোমাদের দুজনের পথ আবার এক হয়, তাহলে অতীতের মিথ্যেগুলোকে তোমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে দিও না।

—অমিতাভ।”

ঋদ্ধি চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে বসে রইল।

তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।

নীলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

“তাহলে…”

ঋদ্ধি মাথা তুলল।

“তুমি আমার বোন নও।”

নীলার চোখেও জল।

“না।”

“তোমার বাবা অমিতাভ নন।”

“না।”

“আমাদের বাবা আলাদা?”

নীলা মৃদু হাসল।

“আমাদের বাবা-মায়ের গল্পও আলাদা।”

ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সাত বছর ধরে যে সম্পর্ককে পাপ ভেবে দুজনেই নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল—

সেটা ছিল একটা মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো।

কিন্তু এখনও একটা প্রশ্ন বাকি।

ঋদ্ধি বলল,

“আমার যে বাবা আমাকে বড় করেছেন?”

নীলা বলল,

“তোমার পালক বাবা।”

“তিনি এখন কোথায়?”

“আমি জানি।”

“কোথায়?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই ছাপাখানার দরজা খুলে গেল।

দুজনেই ঘুরে তাকাল।

দরজায় দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ।

চোখে ক্লান্তি।

চুল সাদা।

হাতে একটা লাঠি।

ঋদ্ধির শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

“বাবা?”

বৃদ্ধ লোকটি মাথা নিচু করলেন।

“হ্যাঁ।”

ঋদ্ধি তার দিকে এগিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর ঋদ্ধি বলল,

“আপনি বেঁচে আছেন।”

“হ্যাঁ।”

“আপনি আমাকে কেন মিথ্যে বলেছিলেন?”

বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।

“কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম।”

ঋদ্ধি চুপ।

“আমি অমিতাভকে থামাতে পারিনি। তাকে রক্ষা করতে পারিনি। তোমাকে রক্ষা করার জন্য তোমার পরিচয় বদলেছিলাম।”

“আর নীলাকে?”

বৃদ্ধ নীলার দিকে তাকালেন।

“আমি ওকেও ব্যবহার করেছি।”

নীলা বলল,

“আপনি আমাকে বলেছিলেন ঋদ্ধির কাছ থেকে দূরে থাকতে।”

“হ্যাঁ।”

“বলেছিলেন আমরা ভাই-বোন।”

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”

ঋদ্ধির গলা কেঁপে উঠল।

“কেন?”

“কারণ আমি জানতাম, তুমি যদি অমিতাভের সত্য জানতে পারো, তাহলে তুমি তাকে খুঁজবে। আর যারা অমিতাভকে শেষ করতে চেয়েছিল, তারা তোমাকে খুঁজে পাবে।”

“তাহলে অমিতাভ কোথায়?”

বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

“আমি জানি না।”

ঋদ্ধি অবাক।

“আপনি জানেন না?”

“না।”

“তিনি বেঁচে আছেন?”

“আমি শেষবার তাকে দেখেছিলাম তোমার জন্মের কয়েক মাস পর।”

“কোথায়?”

“রেলস্টেশনে।”

“তারপর?”

“সে চলে গিয়েছিল।”

“কোথায়?”

“আমি জানি না।”

হঠাৎ বৃদ্ধের পকেটের ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন ধরলেন।

কয়েক সেকেন্ড শুনলেন।

তারপর ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।

তার মুখ সাদা হয়ে গেছে।

ঋদ্ধি বলল,

“কী হয়েছে?”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

“অমিতাভের খবর পাওয়া গেছে।”

ঘর নিস্তব্ধ।

“কোথায়?”

“দক্ষিণের একটা ছোট শহরে।”

“কে খবর দিয়েছে?”

“একজন ডাক্তার।”

নীলা এগিয়ে এল।

“তিনি বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“সম্ভবত।”

ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।

এত বছর ধরে যে মানুষটির অস্তিত্ব শুধু চিঠি, ছবি আর স্মৃতিতে ছিল—

তিনি হয়তো সত্যিই বেঁচে আছেন।

কিন্তু তার আগেই আরেকটা কাজ বাকি।

নীলা বলল,

“তোমার পালক বাবা?”

ঋদ্ধি তার দিকে তাকাল।

“আমি তাকে ক্ষমা করতে পারব কি না জানি না।”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

“ক্ষমা চেয়ো না।”

ঋদ্ধি তাকাল।

“কেন?”

“আগে সত্যিটা বুঝে নাও। তারপর সিদ্ধান্ত নিও।”

ঋদ্ধি কিছু বলল না।

বাইরে তখন বৃষ্টি একটু কমেছে।

ভোরের আলো আকাশে ফুটতে শুরু করেছে।


সকালে তারা নদীর ধারে ফিরে এল।

সেই বৃদ্ধা এখনও সেখানে বসে ছিলেন।

ঋদ্ধি তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল।

“আপনি বেঁচে আছেন!”

বৃদ্ধা হাসলেন।

“বলেছিলাম না, যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”

ঋদ্ধি তার পাশে বসে পড়ল।

“আপনি সব জানতেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“সব না। যতটা দরকার ছিল, ততটা।”

“আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছিলেন?”

“কারণ তোমার নিজের গল্প তোমাকেই জানতে হতো।”

“নীলা?”

বৃদ্ধা নীলার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

“ওরও।”

ঋদ্ধি নদীর দিকে তাকাল।

বৃষ্টি থেমে গেছে।

জলে ভোরের আলো পড়ছে।

নীলা তার পাশে এসে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ দুজনেই কিছু বলল না।

তারপর নীলা ধীরে বলল,

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”

ঋদ্ধি তার দিকে তাকাল।

“কিসের জন্য?”

“সাত বছর চলে যাওয়ার জন্য।”

“তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি।”

নীলা চোখ নামিয়ে নিল।

“তাহলে?”

ঋদ্ধি মৃদু হাসল।

“তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলে।”

নীলার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি এখনও আমাকে ভালোবাসো?”

ঋদ্ধি উত্তর দিতে একটু সময় নিল।

তারপর বলল,

“সাত বছর ধরে আমি তোমাকে ভুলতে চেষ্টা করেছি।”

“পারোনি?”

“না।”

নীলা মৃদু হেসে বলল,

“আমিও না।”

ঋদ্ধি তার হাত ধরল।

কোনও প্রতিশ্রুতি দিল না।

কোনও বড় কথা বলল না।

শুধু হাতটা ধরে রাখল।

কারণ কখনও কখনও বহু বছরের বিচ্ছেদের পরে মানুষকে নতুন করে ভালোবাসতে হয় না।

শুধু বুঝতে হয়—

ভালোবাসাটা আসলে কোথাও যায়নি।


ছয় মাস পরে।

শহরের একটা ছোট প্রকাশনা সংস্থার অফিস।

ঋদ্ধি জানালার পাশে বসে পুরোনো চিঠিগুলো সাজাচ্ছিল।

তার সামনে একটা খাম।

দক্ষিণের সেই শহর থেকে আসা।

চিঠির ওপর লেখা—

“ঋদ্ধির জন্য।”

সে খাম খুলল।

ভেতরে অমিতাভ সেনের চিঠি।

“ঋদ্ধি,

তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকে আমার একটা আফসোস ছিল—তোমার হাত ধরে হাঁটতে পারিনি।

কিন্তু তোমার জীবনে যারা ছিল, তারা প্রত্যেকে তাদের মতো করে তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছে।

তোমার পালক বাবা ভুল করেছে।

তোমার মা ভয় পেয়েছে।

আমি পালিয়ে গেছি।

আর নীলা তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে।

কেউই সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়।

কেউই সম্পূর্ণ দোষীও নয়।

জীবন কখনও সাদা-কালো হয় না।

তুমি শুধু নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচো।

আর যদি কখনও বৃষ্টির দিনে পুরোনো চিঠির গন্ধ পাও, মনে রেখো—

কিছু চিঠি মানুষের কাছে পৌঁছতে অনেক বছর সময় নেয়।

কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা—

তার থেকেও বেশি সময় অপেক্ষা করতে পারে।

—তোমার বাবা, অমিতাভ সেন।”

ঋদ্ধি চিঠিটা ভাঁজ করল।

জানালার বাইরে তাকাল।

বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

ঠিক সেই সময় নীলা দরজা খুলে ভেতরে এল।

হাতে একটা পুরোনো নীল খাম।

“এটা তোমার জন্য।”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,

“আবার চিঠি?”

নীলা হাসল।

“হ্যাঁ।”

“কার?”

“আমার।”

ঋদ্ধি খামটা খুলল।

ভেতরে মাত্র দুটো লাইন—

“সাত বছর অপেক্ষা করেছি। এবার সারাজীবন পাশাপাশি হাঁটতে চাই।”

ঋদ্ধি চিঠিটার দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর নীলার দিকে তাকাল।

জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।

শহর ভিজছে।

আর বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝি, ভয়, গোপনীয়তা আর বিচ্ছেদের পরে—

দুজন মানুষ অবশেষে নিজেদের সত্যিটাকে ফিরে পেয়েছে।

সেই দিন ঋদ্ধি বুঝেছিল—

সব চিঠির উত্তর শব্দে দিতে হয় না।

কিছু চিঠির উত্তর হয়—

কারও হাত শক্ত করে ধরে থাকা।

আর কিছু ভালোবাসার শেষ হয় না।

শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার পর—

তার নতুন শুরু হয়।

— সমাপ্ত —

 

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস :: বৃষ্টিভেজা চিঠি (দ্বিতীয় পর্ব)।।।

দ্বিতীয় পর্ব — নীলকুঠির পথে

রাত তখন সাড়ে দশটা।

শিউলি বাড়ির পেছনের সরু পথ ধরে ঋদ্ধি আর বৃদ্ধা এগিয়ে চলেছে।

বৃষ্টি একটু কমেছে, কিন্তু চারপাশে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। গাছের পাতায় জমে থাকা জল টুপটাপ করে পড়ছে।

ঋদ্ধির হাতে সেই কাগজ।

“শিউলি নদীর ওপারে, নীলকুঠি।”

নিচে নীলার হাতের লেখা—

“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”

সাত বছর পর প্রথমবার ঋদ্ধির মনে হলো, নীলা হয়তো সত্যিই তার জন্য অপেক্ষা করছে।

কিন্তু তার বাবার কী ভূমিকা?

যে মানুষটাকে সে সাত বছর ধরে মৃত বলে জেনে এসেছে, সে যদি সত্যিই বেঁচে থাকে, তাহলে এতদিন কোথায় ছিল?

আর কেনই বা তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?

পেছন থেকে হঠাৎ একটা শব্দ এল।

পাতা মাড়ানোর শব্দ।

ঋদ্ধি ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

“কী হয়েছে?” বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।

“কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।”

বৃদ্ধা থেমে গেলেন।

কিছুক্ষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“হয়তো করছে।”

“আপনি জানেন কে?”

“জানি।”

“কে?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।

বরং বললেন,

“তুমি যদি সত্যিই নীলাকে খুঁজতে চাও, তাহলে এখন আর পেছনে তাকাবে না।”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“কারণ কিছু মানুষকে সামনে থেকে দেখা যায় না। তাদের ছায়া আগে আসে।”

ঋদ্ধি কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।

তারা এগিয়ে চলল।

প্রায় দশ মিনিট পর একটা ছোট নদীর ধারে পৌঁছল।

বর্ষায় নদী ফুলে উঠেছে।

জলের স্রোত প্রবল।

ওপারে কালো অন্ধকারের মধ্যে একটা পুরনো বাড়ির ছায়া দেখা যাচ্ছে।

বৃদ্ধা বললেন,

“ওটাই নীলকুঠি।”

ঋদ্ধি তাকিয়ে রইল।

বাড়িটা নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।

দোতলা।

দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ ভেঙে পড়েছে।

কিছু জানালায় এখনও কাঠের পাল্লা।

বাড়ির সামনে একটা বিশাল বটগাছ।

“ওখানে নীলা থাকে?”

“থাকত।”

ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।

“থাকত মানে?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তুমি গিয়ে নিজেই দেখো।”

নদী পার হওয়ার জন্য একটা ছোট নৌকা বাঁধা ছিল।

ঋদ্ধি নৌকায় উঠল।

বৃদ্ধা বললেন,

“আমি যাব না।”

“কেন?”

“এই গল্পের শেষটা তোমাদের দুজনকেই লিখতে হবে।”

“আপনি ফিরবেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“এমন কথা বলছেন কেন?”

বৃদ্ধা কোনো উত্তর দিলেন না।

নৌকাটা ধীরে ধীরে নদী পার হতে লাগল।

মাঝনদীতে পৌঁছতেই ঋদ্ধি হঠাৎ পেছনে তাকাল।

বৃদ্ধা এখনও নদীর ধারে দাঁড়িয়ে।

তার পাশে একটা ছায়ামূর্তি।

ঋদ্ধি চোখ কুঁচকে তাকাল।

লোকটা লম্বা।

কালো ছাতা হাতে।

বৃদ্ধা যেন তার সঙ্গে কথা বলছেন।

তারপর হঠাৎ লোকটা ঋদ্ধির দিকে তাকাল।

বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ দেখা গেল।

ঋদ্ধির বুক কেঁপে উঠল।

সে মুখ—

তার বাবার মতো।

নৌকা তখন নদীর ওপারে পৌঁছে গেছে।

ঋদ্ধি দ্রুত নৌকা থেকে নেমে পড়ল।

পেছনে তাকাতে সাহস করল না।


নীলকুঠির দরজা আধখোলা।

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

“নীলা?”

কোনো উত্তর নেই।

বাড়ির ভেতর অন্ধকার।

দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে।

মেঝেতে শুকনো পাতা।

একটা পুরনো কাঠের সিঁড়ি দোতলার দিকে উঠে গেছে।

ঋদ্ধি আবার ডাকল—

“নীলা?”

হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা গানের সুর ভেসে এল।

খুব আস্তে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত।

ঋদ্ধি গানটা চিনতে পারল।

এই গানটা নীলা প্রায়ই গাইত।

সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।

দোতলার শেষ ঘরের দরজা খোলা।

ভেতরে একটা মেয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।

লম্বা চুল।

নীল শাড়ি।

বাইরে বৃষ্টি।

ঋদ্ধির পা থেমে গেল।

“নীলা…”

মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে যেন সাত বছর জমে থাকা সব কথা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।

নীলা।

একই চোখ।

একই হাসি।

শুধু মুখে এখন একটা গভীর ক্লান্তি।

নীলা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“তুমি এসেছ।”

ঋদ্ধির চোখ ভিজে গেল।

“তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।”

নীলা চুপ।

“কেন?”

“কারণ আমাকে যেতে হয়েছিল।”

“আমাকে একটা কথাও বলোনি।”

“বললে তুমি যেতে দিতে না।”

“আমি তোমাকে যেতে দিতাম না।”

“জানি।”

“তাহলে?”

নীলা ধীরে ধীরে তার কাছে এল।

“তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি তোমাকে ভালোবাসতাম না?”

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল,

“আমি সাত বছর ধরে নিজেকে এই প্রশ্নটাই করেছি।”

নীলা তার চোখের দিকে তাকাল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসতাম।”

ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করল।

সাত বছর ধরে বুকের মধ্যে চাপা থাকা একটা ব্যথা যেন হঠাৎ জেগে উঠল।

“তাহলে কেন?”

নীলা বলল,

“তোমার বাবা।”

ঋদ্ধি চোখ খুলল।

“আমার বাবা?”

“হ্যাঁ।”

“তিনি আমাকে কী করেছিলেন?”

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর একটা পুরনো কাঠের বাক্স খুলল।

ভেতরে বেশ কয়েকটা চিঠি।

নীলা একটা চিঠি ঋদ্ধির হাতে দিল।

“এটা তোমার বাবার লেখা।”

ঋদ্ধি চিঠিটা খুলল।

প্রথম লাইন—

“নীলা, যদি তুমি ঋদ্ধিকে ভালোবাসো, তাহলে তাকে কখনও সত্যিটা বলবে না।”

ঋদ্ধির চোখ স্থির হয়ে গেল।

“এটা কবে লেখা?”

“তোমার যাওয়ার তিন মাস আগে।”

“কেন?”

“পড়ো।”

চিঠিতে লেখা—

“ঋদ্ধি আমার ছেলে নয়।”

ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।

চিঠি পড়া বন্ধ হয়ে গেল।

“এটা মিথ্যে।”

নীলা চুপ।

“এটা মিথ্যে, তাই তো?”

নীলা ধীরে বলল,

“তোমার বাবা নিজেই লিখেছেন।”

“তাহলে আমার বাবা কে?”

নীলা উত্তর দিল না।

ঋদ্ধি চিৎকার করে উঠল,

“কে আমার বাবা?”

নীলা বলল,

“নীলার বাবা।”

ঋদ্ধি স্থির হয়ে গেল।

“মানে?”

“তোমার আর আমার জন্মের গল্প এক নয়।”

“তাহলে?”

নীলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“তোমার মা আর আমার বাবা একসময় একে অপরকে ভালোবাসতেন।”

ঋদ্ধির মাথা ঘুরে উঠল।

“কী বলছ?”

“তোমার মা যখন তোমার জন্ম দিতে চলেছেন, তখন আমার বাবা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন।”

“কিন্তু আমার বাবা?”

“তখন তিনি তোমার মায়ের স্বামী ছিলেন না।”

ঋদ্ধি কিছুই বুঝতে পারছিল না।

নীলা বলল,

“তোমার জন্মের পর তোমার মা তোমাকে নিয়ে চলে যান। পরে তোমার বাবার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।”

“তাহলে আমার জৈবিক বাবা—”

“আমার বাবা।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা।

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে বসে পড়ল।

“তাহলে তুমি…”

“হ্যাঁ।”

নীলা চোখ নামিয়ে বলল,

“আমি তোমার সৎবোন নই।”

ঋদ্ধি তাকাল।

“তুমি আমার বোন?”

“না।”

“তাহলে?”

নীলা কাঁপা গলায় বলল,

“আমরা একই বাবার সন্তান।”

ঋদ্ধির বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।

সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

“না।”

“ঋদ্ধি—”

“না!”

সে পিছিয়ে গেল।

“এটা হতে পারে না।”

“আমি জানি।”

“তাহলে তুমি আমাকে এতদিন ভালোবাসার কথা বললে কীভাবে?”

নীলার চোখে জল।

“কারণ আমি এই সত্যিটা তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে জানতাম না।”

“কখন জানতে?”

“যেদিন তুমি আমাকে সেই চিঠিটা দিয়েছিলে।”

“কোন চিঠি?”

“যেটা তুমি পাঠাওনি।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ।

নীলা বলল,

“তোমার বাবা সেটা আমাকে দিয়েছিলেন।”

“তারপর?”

“তিনি বলেছিলেন—যদি আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাহলে আমাকে তোমার জীবন থেকে চলে যেতে হবে।”

ঋদ্ধির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুমি চলে গেলে।”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু তুমি আমাকে সত্যিটা বলতে পারতে।”

“পারতাম না।”

“কেন?”

নীলা বলল,

“কারণ তোমার বাবা আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিলেন।”

“কী শর্ত?”

“আমি যদি সত্যিটা বলি, তাহলে তিনি তোমার মাকে মেরে ফেলবেন।”

ঋদ্ধি থমকে গেল।

“আমার মা?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু মা তো—”

“তোমার মা এখনও বেঁচে আছেন।”

ঋদ্ধির চোখ বড় হয়ে গেল।

“কোথায়?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

ধাম!

নীলা হঠাৎ চুপ করে গেল।

“ও এসেছে।”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।

“কে?”

“তোমার বাবা।”

“তিনি এখানে?”

নীলা জানালার বাইরে তাকাল।

“হ্যাঁ।”

নিচ থেকে পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল—

“নীলা।”

ঋদ্ধির শরীর কেঁপে উঠল।

সেই কণ্ঠ সে চেনে।

তার বাবা।

“আমি জানি ঋদ্ধি এসেছে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর—

“তাকে নিয়ে নিচে এসো।”

নীলা ঋদ্ধির হাত ধরল।

“পেছনের ঘরে যাও।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা শুধু তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসেনি।”

“তাহলে?”

নীলা ফিসফিস করে বলল,

“সে তোমাকে মেরে ফেলতে এসেছে।”

ঋদ্ধির বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।

“কেন?”

নীলা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ তুমি তোমার বাবার ছেলে নও।”

“আমি জানি।”

“না।”

নীলা মাথা নাড়ল।

“তুমি জানো না।”

“তাহলে?”

“তুমি তার শত্রুর ছেলে।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ।

“কোন শত্রু?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে গুলির শব্দ হলো।

ধাঁই!

দুজনেই চমকে উঠল।

নীলা দ্রুত আলো নিভিয়ে দিল।

বাইরে বৃষ্টি।

ঘরের মধ্যে অন্ধকার।

নিচ থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ উঠছে।

এক ধাপ।

দুই ধাপ।

তিন ধাপ।

তারপর সেই কণ্ঠ—

“ঋদ্ধি…”

“আমি জানি তুমি ওপরে আছ।”

পায়ের শব্দ আরও কাছে।

নীলা ঋদ্ধিকে একটা গোপন দরজার সামনে নিয়ে গেল।

“এর ভেতরে যাও।”

“তুমি?”

“আমি আসছি।”

“না, আমি তোমাকে রেখে যাব না।”

নীলা তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,

“সাত বছর আগে তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম। এবার আর যাব না।”

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ থেমে গেল।

কেউ দরজার হাতলে হাত রাখল।

নীলা ঋদ্ধিকে ভেতরে ঠেলে দিল।

দরজা বন্ধ করার আগে সে ফিসফিস করে বলল—

“তোমার আসল বাবার নাম অমিতাভ সেন।”

ঋদ্ধি থমকে গেল।

এই নামটা সে চেনে।

তার মায়ের পুরনো ডায়েরিতে এই নামটা ছিল।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

বাইরে দাঁড়িয়ে নীলা।

আর দরজার ওপাশে—

তার বাবা।

ঋদ্ধি অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল—

তার বাবার কণ্ঠ,

“নীলা, শেষবারের মতো বলছি। ছেলেটাকে আমার হাতে দাও।”

নীলার উত্তর—

“না।”

তারপর—

একটা গুলির শব্দ।

ঋদ্ধি দরজা খুলতে ছুটে গেল।

কিন্তু তার আগেই সুড়ঙ্গের ভেতর কোথা থেকে একটা আলো জ্বলে উঠল।

সামনে দেয়ালে লেখা—

“অমিতাভ সেনের সত্য জানতে হলে নিজের জন্মের রাতটা মনে করো।”

আর তার নিচে একটা পুরনো ছবি।

ছবিতে—

একজন যুবক।

একজন মহিলা।

একটা নবজাতক শিশু।

আর শিশুটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে—

নীলার বাবা।

ঋদ্ধি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝল—

তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের দরজা এবার খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু সেই দরজার ওপারে যে সত্যি আছে—

তা হয়তো তার ভালোবাসার থেকেও বড়।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস : বৃষ্টিভেজা চিঠি (প্রথম পর্ব)।

প্রথম পর্ব — যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি

শহরটা বৃষ্টিতে ভিজছিল।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ। সারাদিনের গরমের পর সন্ধ্যা নামতেই আকাশ কালো হয়ে এসেছিল। তারপর হঠাৎ এমন বৃষ্টি নামল, যেন আকাশের বহুদিনের জমে থাকা অভিমান একসঙ্গে ঝরে পড়ছে।

কলকাতার পুরনো উত্তর শহরের সরু গলিগুলো জলমগ্ন।

রাস্তার দু’পাশের বাড়িগুলোর পুরনো দেওয়াল বেয়ে জল নামছে। কোথাও জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা, কোথাও বারান্দায় ভেজা জামাকাপড় বাতাসে দুলছে।

সেই বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা মাথায় নিয়ে হাঁটছিল ঋদ্ধি।

বয়স আটাশ।

হাতে একটা পুরনো বাদামি রঙের ব্যাগ।

ব্যাগের ভেতর কয়েকটা বই, একটা নোটবুক, একটা কলম আর একটা চিঠি।

চিঠিটা তার নিজের লেখা।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

চিঠিটা সে কখনও পাঠায়নি।

আর আজ, সাত বছর পর, সেই চিঠিটাই তাকে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটা বাড়ির সামনে, যেখানে যাওয়ার কথা সে কোনোদিন ভাবেনি।

বাড়িটার নাম—

শিউলি বাড়ি।

ঋদ্ধি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

লোহার গেটের গায়ে মরচে।

উপরে একটা ছোট্ট ফলক—

৪৭/বি, শিউলি লেন।

ঋদ্ধি গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

বাড়িটা অদ্ভুত সুন্দর।

পুরনো দিনের দোতলা বাড়ি।

সামনে একটা শিউলি গাছ।

বর্ষার কারণে ফুল নেই, কিন্তু গাছটার নিচে সাদা ফুলের শুকনো পাপড়ি জমে আছে।

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর দরজায় কড়া নাড়ল।

একবার।

দু’বার।

তৃতীয়বার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা।

সাদা শাড়ি।

চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

বৃদ্ধা ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি ঋদ্ধি?”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে গেল।

“আপনি আমার নাম জানেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“তোমাকে দেখতে অনেকটা তোমার বাবার মতো হয়েছে।”

ঋদ্ধির মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”

“চিনতাম।”

“কীভাবে?”

বৃদ্ধা দরজা আরও খুলে দিলেন।

“ভেতরে এসো। অনেক কথা বলার আছে।”

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ঢুকে পড়ল।


সাত বছর আগে।

তখন ঋদ্ধির বয়স একুশ।

কলেজের শেষ বছর।

সেই সময় তার জীবনে এসেছিল নীলা।

নীলা ছিল তার সহপাঠী নয়।

একই পাড়ায় থাকত।

প্রথম দেখা হয়েছিল বইয়ের দোকানে।

ঋদ্ধি একটা পুরনো উপন্যাস খুঁজছিল।

দোকানের শেষ তাক থেকে একটা বই নামাতে গিয়ে তার হাত আরেকজনের হাতের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল।

ঋদ্ধি বলেছিল,

“সরি।”

মেয়েটি বলেছিল,

“আপনি আগে নিন।”

“না, আপনি নিন।”

“কিন্তু বইটা আমি আগে ধরেছি।”

ঋদ্ধি হেসেছিল।

“তাহলে তো আপনি জিতে গেলেন।”

মেয়েটিও হেসেছিল।

সেই হাসিটা ঋদ্ধির মনে থেকে গিয়েছিল।

মেয়েটার নাম—

নীলা।

নীলার সঙ্গে পরিচয় বাড়তে সময় লাগেনি।

প্রথমে বই নিয়ে কথা।

তারপর সিনেমা।

তারপর গান।

তারপর বৃষ্টি।

তারপর—

ভালোবাসা।

ঋদ্ধি কখন যে নীলাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সে নিজেও জানত না।

নীলাও তাকে ভালোবাসত।

কিন্তু তাদের ভালোবাসায় একটা অদ্ভুত সমস্যা ছিল।

নীলা নিজের পরিবার সম্পর্কে খুব কম কথা বলত।

বিশেষ করে তার বাবা সম্পর্কে।

একদিন ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করেছিল,

“তোমার বাবা কী করেন?”

নীলা চুপ করে গিয়েছিল।

অনেকক্ষণ পর বলেছিল,

“আমার বাবা নেই।”

“মানে?”

“তিনি মারা গেছেন।”

“কবে?”

নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল,

“অনেক বছর আগে।”

ঋদ্ধি আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

কিন্তু কয়েকদিন পর সে জানতে পেরেছিল—

নীলার বাবা মারা যাননি।

তিনি নিখোঁজ।

সতেরো বছর আগে।

তারপর আর কোনো খবর নেই।

নীলার মা এই বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না।

ঋদ্ধি তখনও বুঝতে পারেনি, এই নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তার নিজের পরিবারের একটা সম্পর্ক আছে।


বৃদ্ধা একটা কাঠের চেয়ার দেখিয়ে বললেন,

“বসো।”

ঋদ্ধি বসে পড়ল।

বৃদ্ধা সামনে এসে একটা পুরনো অ্যালবাম রাখলেন।

“এটা তোমার জন্য।”

ঋদ্ধি অ্যালবাম খুলল।

প্রথম কয়েকটা পাতায় পুরনো ছবি।

একটা পরিবার।

একটা ছোট মেয়ে।

একজন যুবক।

আর—

ঋদ্ধির বাবা।

ঋদ্ধির হাত থেমে গেল।

“এটা কী?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার বাবা আর নীলার বাবা একসঙ্গে কাজ করতেন।”

“কোথায়?”

“একটা প্রকাশনা সংস্থায়।”

ঋদ্ধি ছবিগুলো উল্টাতে লাগল।

একটা ছবিতে তার বাবা আর আরেকজন যুবক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

পেছনে লেখা—

“শারদীয়া পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগ — ২০০৫।”

ঋদ্ধি ধীরে বলল,

“নীলার বাবা কি লেখক ছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন?”

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তোমাকে এখানে ডেকেছি।”

ঋদ্ধি চমকে তাকাল।

“আপনি আমাকে ডেকেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আমি তো—”

বৃদ্ধা তাকে থামিয়ে দিলেন।

“তুমি ভাবছ, তুমি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছ?”

ঋদ্ধি চুপ।

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার কাছে যে চিঠিটা আছে, সেটা দেখাও।”

ঋদ্ধির বুক ধক করে উঠল।

সে ব্যাগ খুলল।

চিঠিটা বের করল।

সাদা কাগজ।

সাত বছর পুরনো।

চিঠির ওপর লেখা—

“নীলার জন্য।”

কিন্তু চিঠিটা কখনও নীলার হাতে পৌঁছায়নি।

কারণ যেদিন ঋদ্ধি চিঠিটা লিখেছিল, সেদিনই নীলা হঠাৎ শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

কোনো বিদায় নেই।

কোনো ফোন নেই।

কোনো মেসেজ নেই।

শুধু একটা ছোট্ট কাগজ রেখে গিয়েছিল—

“আমাকে খুঁজো না।”

ঋদ্ধি চিঠিটা কখনও পাঠায়নি।

সাত বছর ধরে নিজের কাছে রেখেছিল।

আজ সকালে তার বাড়িতে একটা খাম এসেছিল।

খামের ভেতর ছিল একটা মাত্র লাইন—

“যে চিঠি তুমি পাঠাওনি, তার উত্তর জানতে চাইলে শিউলি বাড়িতে এসো।”

নিচে কোনো নাম ছিল না।

ঋদ্ধি বৃদ্ধার দিকে তাকাল।

“আপনি এই চিঠি সম্পর্কে কীভাবে জানেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“কারণ চিঠিটা নীলার কাছে পৌঁছেছিল।”

ঋদ্ধি যেন শুনতেই পেল না।

“কী?”

“তুমি চিঠিটা পাঠাওনি। কিন্তু সেটা তার কাছে গিয়েছিল।”

“কে দিয়েছিল?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার বাবা।”

ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।

“আমার বাবা?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু তিনি তো জানতেনই না যে আমি নীলাকে ভালোবাসি।”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“তুমি যতটা ভাবো, তোমার বাবা তার চেয়ে অনেক বেশি জানতেন।”

ঋদ্ধির মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।

“আমার বাবা নীলাকে চিনতেন?”

“খুব ভালো করে।”

“কী সম্পর্ক ছিল?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।

তিনি অ্যালবামের একটা ছবি খুলে দেখালেন।

ছবিতে নীলার বাবা, ঋদ্ধির বাবা এবং আরেকজন মহিলা দাঁড়িয়ে।

মহিলার কোলে ছোট্ট নীলা।

ছবির পেছনে লেখা—

“আমাদের তিনজনের গোপন চুক্তির দিন।”

ঋদ্ধি বলল,

“তিনজন?”

“হ্যাঁ।”

“তৃতীয় মানুষটি কে?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার মা।”

ঋদ্ধির বুক কেঁপে উঠল।

“আমার মা?”

“তোমার বাবা, তোমার মা আর নীলার বাবা—তিনজন মিলে একটা গোপন বিষয় লুকিয়ে রেখেছিলেন।”

“কী বিষয়?”

বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন।

“সেটা জানতে হলে তোমাকে ওপরের ঘরে যেতে হবে।”

“কেন?”

“কারণ সেই ঘরটা তোমার মায়ের।”

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোল।

প্রতিটি ধাপে পায়ের শব্দ হচ্ছে।

পুরনো বাড়ি।

দেয়ালে পুরনো ছবি।

একটা ছবির সামনে এসে সে থেমে গেল।

ছবিতে তার মা।

কিন্তু তার পাশে—

নীলা।

ছোট্ট নীলা।

ঋদ্ধি অবাক হয়ে গেল।

“এটা কবে?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তুমি জন্মানোর অনেক আগে।”

“আমার মা নীলাকে চিনতেন?”

“শুধু চিনতেন না।”

বৃদ্ধা নিচু গলায় বললেন,

“তিনি নীলাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন।”

ঋদ্ধি আর কিছু বলতে পারল না।

দোতলার একটা ঘরের সামনে এসে বৃদ্ধা থামলেন।

“এই ঘরে ঢুকো।”

দরজা খুলতেই পুরনো বইয়ের গন্ধ।

একটা কাঠের টেবিল।

একটা আলমারি।

জানালার পাশে একটা চেয়ার।

সবকিছুর ওপর ধুলো।

ঋদ্ধি টেবিলের কাছে গেল।

সেখানে একটা ডায়েরি রাখা।

ডায়েরির ওপর তার মায়ের নাম।

“মাধুরী সেন।”

ঋদ্ধি ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা সাধারণ কথা।

তারপর একটা তারিখ—

১২ আগস্ট, ২০০৫।

নিচে লেখা—

“আজ আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নীলাকে সত্যিটা জানানো যাবে না।”

ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।

পরের পৃষ্ঠা—

“অরুণ বলছে, একদিন সত্যি প্রকাশ করতেই হবে। কিন্তু এখন নয়।”

অরুণ—

তার বাবার নাম।

আরেক পৃষ্ঠা—

“নীলার বাবার কাছে যে চিঠিগুলো আছে, সেগুলো যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে শুধু আমাদের নয়, ঋদ্ধির জীবনও বিপদে পড়বে।”

ঋদ্ধি হঠাৎ ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

তার বুক ধড়ফড় করছে।

“আমার জীবন কেন বিপদে পড়বে?”

বৃদ্ধা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি বললেন,

“কারণ তুমি সেই রহস্যের উত্তরাধিকারী।”

“কীসের?”

“একটা সত্যির।”

“কোন সত্যি?”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বললেন,

“নীলার বাবা নিখোঁজ হননি।”

ঋদ্ধি স্থির হয়ে গেল।

“তাহলে?”

“তাকে নিখোঁজ করা হয়েছিল।”

“কে?”

বৃদ্ধা জানালার বাইরে তাকালেন।

“যে মানুষটা গত সাত বছর ধরে তোমাকে নজরে রেখেছে।”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।

“কে?”

বৃদ্ধা এবার তার দিকে তাকালেন।

“তোমার নিজের বাবা।”

ঋদ্ধি পিছিয়ে গেল।

“অসম্ভব।”

“তোমার বাবা সাত বছর আগে মারা যাননি।”

ঋদ্ধির মুখ সাদা হয়ে গেল।

“কিন্তু… আমার বাবা তো—”

“যে মানুষটাকে তুমি মৃত ভেবেছ, সে এখনও বেঁচে আছে।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল,

“আপনি কীভাবে জানেন?”

বৃদ্ধা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে একটা শব্দ এল।

ঠক।

তারপর আরেকটা।

ঠক।

কেউ দরজায় কড়া নাড়ছে।

বৃদ্ধা হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলেন।

“ও এসে গেছে।”

“কে?”

বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন,

“যাকে তুমি এতদিন মৃত বলে জানো।”

ঋদ্ধি সিঁড়ির দিকে তাকাল।

নিচে অন্ধকার।

দরজায় আবার শব্দ।

ঠক।

ঠক।

তারপর একটা পুরুষের কণ্ঠ—

“মাধুরী…”

ঋদ্ধির শরীর অবশ হয়ে গেল।

এই কণ্ঠ সে চেনে।

শৈশবের অসংখ্য রাত থেকে চেনে।

তার বাবার কণ্ঠ।

কিন্তু তার বাবা তো—

সাত বছর আগে মারা গেছেন।

নিচ থেকে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল—

“দরজা খোলো।”

ঋদ্ধি বৃদ্ধার দিকে তাকাল।

বৃদ্ধা ঠোঁটে আঙুল রাখলেন।

তারপর ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলে দিলেন।

শেষ পাতায় মাত্র একটা বাক্য—

“ঋদ্ধি যদি কখনও জানতে পারে তার বাবা বেঁচে আছেন, তাকে নীলার কাছে পাঠিও। কারণ সত্যিটা একমাত্র নীলাই জানে।”

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে ঝড় বয়ে গেল।

নীলা বেঁচে আছে?

সাত বছর ধরে যার কোনো খবর নেই—

সে কি সত্যিই কোথাও আছে?

আর যদি থাকে—

তাহলে কেন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল?

নিচে দরজায় এবার প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধাম!

বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন,

“পেছনের দরজা দিয়ে বেরোতে হবে।”

ঋদ্ধি বলল,

“নীলা কোথায়?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন—

“যেখানে তোমার পাঠানো সেই চিঠির শেষ লাইনটা লেখা হয়েছিল।”

“কোথায়?”

বৃদ্ধা একটা কাগজ তার হাতে দিলেন।

কাগজে একটা ঠিকানা।

ঋদ্ধি পড়ল—

“শিউলি নদীর ওপারে, নীলকুঠি।”

তারপর নিচে লেখা—

“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”

আর লেখাটা—

নীলার হাতের লেখা।

ঋদ্ধি কাগজটা শক্ত করে ধরে দরজার দিকে তাকাল।

নিচে তখন কেউ চিৎকার করছে—

“ঋদ্ধি! আমি জানি তুমি ভেতরে আছ!”

কণ্ঠটা তার বাবার।

কিন্তু এবার সেই কণ্ঠে একটা অদ্ভুত হাসি।

ঋদ্ধি বুঝতে পারল—

সাত বছর আগে যে গল্পটা শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে সে ভেবেছিল,

সেটা আসলে সেদিনই শুরু হয়েছিল।

চলবে…

Share This