Categories
গল্প বিবিধ

নদীর ধারের আলো।।।

নদীটা দিনের বেলায় শান্ত থাকত।

কিন্তু রাত নামলেই তার চেহারা বদলে যেত।

বিশেষ করে বর্ষাকালে।

কালো জলের ওপর বাতাসের ঝাপটা, মাঝে মাঝে বৃষ্টির শব্দ, দূরে কোথাও নৌকার ইঞ্জিনের আওয়াজ—সব মিলিয়ে নদী তখন যেন এক অচেনা জগৎ।

নদীর বাঁকে একটি ছোট্ট বাতিঘর ছিল।

বাতিঘর বললে অবশ্য খুব বড় কিছু নয়। পাকা দোতলা ঘর, উপরে কাচে ঘেরা একটি আলো, আর তার পাশে সরু লোহার সিঁড়ি।

সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্ব ছিল মাধব কাকার।

বয়স ষাটের কাছাকাছি।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাতিঘরে উঠে আলো জ্বালাতেন।

গ্রামের লোকেরা বলত,

—“ওই আলো না থাকলে রাতের নদী চিনতে ভুল হয়।”

মাধব কাকা সবসময় বলতেন,

—“আলো নিজের জন্য জ্বলে না। অন্যকে পথ দেখানোর জন্য জ্বলে।”

তার স্ত্রী বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

এখন তিনি একাই থাকতেন।

তবে পাশের বাড়ির কিশোরী মেঘা প্রায়ই তার কাছে আসত।

মেঘার বাবা নদীতে মাছ ধরতেন।

মা বাড়িতে কাজ করতেন।

মেঘা পড়াশোনায় ভালো ছিল। তার স্বপ্ন ছিল একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবে।

কিন্তু সে মাঝেমধ্যে বলত,

—“কাকা, আমাদের গ্রামের মেয়েরা এত দূর পড়তে পারে না।”

মাধব কাকা বলতেন,

—“আলো যত দূর যায়, পথও তত দূর হয়।”

মেঘা বুঝত না।

—“আলো দিয়ে আবার পথ হয় নাকি?”

মাধব হাসতেন।

—“হয়। শুধু চোখ দিয়ে দেখলে বুঝবি না।”

এক বর্ষার রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় উঠল।

সন্ধ্যার পর থেকেই নদী উত্তাল।

মাধব কাকা বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে নিচে নামছিলেন।

ঠিক তখন মেঘা দৌড়ে এসে বলল,

—“কাকা!”

—“কী হয়েছে?”

—“বাবার নৌকা এখনও ফেরেনি।”

মাধব নদীর দিকে তাকালেন।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল।

তিনি বললেন,

—“কখন বেরিয়েছিল?”

—“বিকেলে।”

মাধবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

সাধারণত সন্ধ্যার আগেই জেলেদের নৌকা ফিরে আসে।

তিনি আবার বাতিঘরে উঠে গেলেন।

দূরে তাকিয়ে রইলেন।

ঝড়ের মধ্যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

মেঘা নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

—“কাকা, বাবা কি ফিরবে?”

মাধব বললেন,

—“ফিরবে।”

—“আপনি কী করে জানেন?”

—“কারণ এখনও আলো জ্বলছে।”

মেঘা বুঝতে পারল না।

কিন্তু মাধবের কথায় তার সাহস হল।

রাত বাড়তে লাগল।

বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।

হঠাৎ বাতিঘরের আলো কেঁপে উঠল।

তারপর নিভে গেল।

মাধব থমকে গেলেন।

বিদ্যুৎ নেই।

জেনারেটরও চালু হচ্ছে না।

তিনি দ্রুত নিচে নেমে এলেন।

মেঘা বলল,

—“কী হয়েছে?”

—“আলো নিভে গেছে।”

—“এখন?”

মাধব কোনো উত্তর দিলেন না।

তিনি টর্চ নিয়ে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করলেন।

একটি তার পুড়ে গেছে।

জেনারেটরের পুরোনো অংশও নষ্ট।

মেঘা বলল,

—“তাহলে এখন কী হবে?”

মাধব বললেন,

—“আলো জ্বালাতেই হবে।”

তিনি ঘরের পুরোনো বাক্স খুললেন।

সেখানে ছিল কেরোসিনের লণ্ঠন, কয়েকটি পুরোনো কাচ আর কিছু তার।

মেঘা অবাক হয়ে বলল,

—“এগুলো দিয়ে হবে?”

—“চেষ্টা করলে হয়।”

দুজন মিলে কাজ শুরু করল।

মাধব যন্ত্র ঠিক করছেন।

মেঘা কাচ পরিষ্কার করছে।

বাতাসে দরজা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টি ঢুকে পড়ছে।

তবু তারা থামল না।

প্রায় এক ঘণ্টা পর একটা লণ্ঠন জ্বলে উঠল।

মাধব সেটাকে বাতিঘরের কাচঘেরা ঘরে তুলে রাখলেন।

আলো খুব উজ্জ্বল নয়।

কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

মাধব বললেন,

—“যতক্ষণ বড় আলো না জ্বলে, এই ছোট আলোই যথেষ্ট।”

মেঘা নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখন দূরে একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

একবার।

দুবার।

তারপর আবার অদৃশ্য।

মাধব চিৎকার করে বললেন,

—“নৌকা!”

মেঘার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

মাধব লণ্ঠনটা আরও উঁচুতে ধরলেন।

নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

কিন্তু স্রোত তাকে বারবার অন্যদিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

মাধব দ্রুত ঘণ্টা বাজাতে শুরু করলেন।

ঢং!

ঢং!

ঢং!

নৌকার দিক থেকে একটা আলো নড়ল।

তারপর একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল,

—“আলো দেখা যাচ্ছে!”

মেঘা চিৎকার করে উঠল,

—“বাবা!”

নৌকাটা কিছুক্ষণ পরে ঘাটে এসে পৌঁছল।

মেঘার বাবা ভিজে একেবারে কাঁপছিলেন।

মেঘা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

মাধব দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

জেলে বললেন,

—“মাধবদা, আজ আপনার আলো না থাকলে আমরা ঘাট খুঁজে পেতাম না।”

মাধব বললেন,

—“আলোটা আমার নয়।”

—“তাহলে কার?”

মাধব নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“যার পথ হারায়, তার।”

পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা বাতিঘরের কাছে জড়ো হল।

সবাই জানল, পুরোনো ব্যবস্থা আর নিরাপদ নয়।

গ্রামের পঞ্চায়েত থেকে নতুন সৌরবিদ্যুৎ চালিত আলো বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাতিঘরে নতুন সৌর আলো লাগল।

এখন আর বিদ্যুৎ চলে গেলেও আলো নিভে না।

মেঘা প্রতিদিন মাধবের কাছে এসে পড়াশোনা করত।

একদিন সে বলল,

—“কাকা, আমি বড় হয়ে এমন কিছু বানাতে চাই, যাতে গ্রামের আলো কখনও না নেভে।”

মাধব হেসে বললেন,

—“তাহলে তুই ইঞ্জিনিয়ার হ।”

—“পারব?”

—“যে মেয়ে ঝড়ের রাতে লণ্ঠন নিয়ে বাতিঘরে উঠতে পারে, সে অনেক কিছুই পারে।”

মেঘা হেসে ফেলল।

বছর কয়েক কেটে গেল।

মেঘা শহরে পড়তে গেল।

তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ল।

একদিন সে গ্রামে ফিরে এল।

বাতিঘরের পাশে দাঁড়িয়ে মাধব কাকাকে বলল,

—“কাকা, মনে আছে? এক রাতে আলো নিভে গিয়েছিল।”

মাধব হাসলেন।

—“মনে আছে।”

—“সেদিন আপনি একটা কথা বলেছিলেন।”

—“কী?”

—“ছোট আলোও অন্ধকার ভাঙতে পারে।”

মাধব কিছু বললেন না।

মেঘা বলল,

—“আমি বুঝেছি, আপনি শুধু বাতিঘরের কথা বলেননি।”

মাধব তার দিকে তাকালেন।

মেঘা বলল,

—“মানুষের জীবনেও আলো দরকার। আর কখনও কখনও সেই আলো অন্য কেউ জ্বালিয়ে দেয়।”

মাধবের চোখে জল চিকচিক করল।

তিনি ধীরে ধীরে বললেন,

—“এবার তুই আলো জ্বালাবি।”

সন্ধ্যা নেমে এল।

বাতিঘরের নতুন সৌর আলো জ্বলে উঠল।

নদীর কালো জলের ওপর সেই আলো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল।

মাধব কাকা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলেন।

তার মনে হল, আলোটা শুধু নদীর পথ দেখাচ্ছে না।

একটা মেয়ের স্বপ্নের পথও আলোকিত করছে।

আর সেই মুহূর্তে তিনি বুঝলেন—

কোনও আলো ছোট নয়।

যদি তা অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ওঠে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

জলের চাকা।।

শালবন গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল বিশাল এক ধানখেত। বর্ষায় সেই মাঠ সবুজ হয়ে উঠত, শীতকালে সোনালি ধানের ঢেউ খেলত। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

বর্ষা শেষ হওয়ার পর মাঠে জল ধরে রাখা যেত না।

পুকুর শুকিয়ে যেত, ছোট খালগুলোর জল কমে যেত। চাষিরা ডিজেল পাম্প চালিয়ে জমিতে জল দিতেন। তাতে খরচ বাড়ত।

গ্রামের কৃষক মধুসূদন এসব দেখে খুব চিন্তায় ছিলেন।

বয়স পঞ্চান্ন। ছোটবেলা থেকেই চাষ করছেন।

একদিন সকালে ছেলে রাহুলকে নিয়ে মাঠে গিয়ে দেখলেন, পাশের কৃষক শিবু পাম্প চালিয়ে জল তুলছেন।

পাম্পের শব্দে চারপাশ কাঁপছে।

শিবু মাথায় হাত দিয়ে বলল,

—“আর পারছি না মধুদা। ডিজেলের দাম বাড়ছে, জল তুলতে খরচ বাড়ছে, ফসলের দাম আবার ঠিক নেই।”

মধুসূদন বললেন,

—“জল তো আছে। শুধু তুলতে হচ্ছে।”

শিবু হেসে বলল,

—“জল আছে, কিন্তু টাকার জোর নেই।”

কথাটা মধুসূদনের মনে দাগ কাটল।

সেদিন রাতে তিনি পুরোনো ঘরের বাক্স খুললেন।

সেখানে ছিল কিছু মরচে ধরা লোহার যন্ত্র, পুরোনো ছবি আর একটি অদ্ভুত নকশা।

নকশাটা করেছিলেন তাঁর বাবা।

মধুসূদনের বাবা ছিলেন গ্রামের মানুষ হলেও যন্ত্রপাতি নিয়ে নানা পরীক্ষা করতেন।

অনেক বছর আগে তিনি নদীর স্রোত ব্যবহার করে জল তোলার একটি চাকা বানিয়েছিলেন।

চাকার সঙ্গে বাঁধা থাকত ছোট ছোট পাত্র।

নদীর স্রোতে চাকা ঘুরত।

চাকা ঘুরলে পাত্রগুলো জল তুলে ওপরে নিয়ে যেত।

তারপর জল নেমে যেত খালের মধ্যে।

কোনও ডিজেল লাগত না।

কিন্তু মধুসূদনের বাবা মারা যাওয়ার পর সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।

মধুসূদন নকশাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।

রাহুল পাশে এসে বলল,

—“বাবা, কী দেখছ?”

—“তোর ঠাকুরদার পুরোনো নকশা।”

—“এটা কী?”

—“জলের চাকা।”

রাহুল আগ্রহী হয়ে উঠল।

—“আবার বানানো যায়?”

মধুসূদন বললেন,

—“জানি না। তবে চেষ্টা করা যায়।”

পরদিন বাবা-ছেলে নদীর ধারে গেল।

পুরোনো চাকার জায়গাটা এখনও ছিল।

কাঠের কিছু অংশ পচে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

লোহার একটি মোটা দণ্ড এখনও পড়ে ছিল।

রাহুল বলল,

—“বাবা, এটা তো অসম্ভব।”

মধুসূদন হেসে বললেন,

—“অসম্ভব কথাটা খুব তাড়াতাড়ি বলিস না।”

তারা কাজ শুরু করল।

প্রথমে কাঠ জোগাড় হল।

তারপর লোহা।

গ্রামের মেকানিক বিজয়ও সাহায্য করতে এগিয়ে এল।

কয়েকজন কৃষক হাসাহাসি করল।

—“মধু পাগল হয়ে গেছে।”

কেউ বলল,

—“নদীর জল দিয়ে চাকা ঘুরিয়ে জমি সেচ করবে! সিনেমায় হয়।”

মধুসূদন কিছু বললেন না।

তিনি শুধু কাজ করে গেলেন।

প্রথম চাকা তৈরি হল।

নদীর জলে বসানো হল।

রাহুল উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে।

চাকা একটু নড়ল।

তারপর থেমে গেল।

সবাই হতাশ।

বিজয় বলল,

—“কোথাও ভারসাম্য ঠিক নেই।”

তারা আবার খুলল।

দুই দিন পর আবার চেষ্টা।

চাকা ঘুরল।

কিন্তু জল উঠল না।

তৃতীয়বারও ব্যর্থ।

চতুর্থবার চাকা ঘুরল, কিন্তু পাত্রগুলো অর্ধেক জল নিয়ে উঠে আসার আগেই খালি হয়ে গেল।

রাহুল বিরক্ত হয়ে বলল,

—“বাবা, ছেড়ে দাও।”

মধুসূদন বললেন,

—“তুই জানিস, তোর ঠাকুরদা এই চাকা বানাতে কতবার চেষ্টা করেছিলেন?”

—“কতবার?”

—“গুনে রাখেননি।”

রাহুল চুপ করে গেল।

পরের সপ্তাহে আবার কাজ শুরু হল।

এইবার গ্রামের দুই কৃষকও সাহায্য করলেন।

চাকার পাত্রের আকার বদলানো হল।

নদীর স্রোতের সঙ্গে চাকার কোণ ঠিক করা হল।

শেষ পর্যন্ত এক ভোরে চাকা ঘুরতে শুরু করল।

ধীরে।

তারপর একটু দ্রুত।

একটা পাত্র জলে ডুবল।

উঠে এল।

আর তার ভেতরের জল ছোট্ট কাঠের নালার মধ্যে পড়ল।

নালা দিয়ে জল এগিয়ে গেল।

তারপর খালে।

রাহুল চিৎকার করে উঠল,

—“জল আসছে!”

মধুসূদনের চোখে জল।

তিনি হাত দিয়ে জলটা ছুঁয়ে দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“এটা শুধু জল নয়। এটা সময়ের ফিরে আসা।”

সেদিন গ্রামের মানুষ জড়ো হল।

যারা হাসাহাসি করেছিল, তারাও এল।

শিবু চাষি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“মধুদা, এটা যদি সত্যিই কাজ করে, তাহলে আমাদের অনেক টাকা বাঁচবে।”

মধুসূদন বললেন,

—“শুধু আমার জমিতে জল দিলে হবে না। সবার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে।”

কাজ আরও বড় হল।

চাকার জল একটা বড় খালে নিয়ে যাওয়া হল।

সেখান থেকে কয়েকটি ছোট নালায় জল ভাগ করা হল।

গ্রামের কৃষকরা পালা করে সেই জল ব্যবহার করতে লাগলেন।

ডিজেল পাম্পের ব্যবহার কমে গেল।

কয়েক মাস পর দেখা গেল, কৃষকদের সেচের খরচ অনেকটাই কমেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, গ্রামের তরুণরা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল।

রাহুল নিজের বন্ধুদের নিয়ে আরও কয়েকটি ছোট জলচাকা বানানোর পরিকল্পনা করল।

স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক এসে বললেন,

—“এটা তো ছাত্রদের দেখানো যায়।”

একদিন স্কুলের মাঠে বিজ্ঞান প্রদর্শনী হল।

রাহুল সেখানে ছোট একটি মডেল নিয়ে গেল।

বিচারকরা জিজ্ঞেস করলেন,

—“এই ধারণা কোথা থেকে পেয়েছ?”

রাহুল বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমার বাবার কাছ থেকে। আর তারও আগে আমার ঠাকুরদার কাছ থেকে।”

মধুসূদন দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন।

তার মুখে মৃদু হাসি।

কয়েক মাস পর খবর এল, পাশের আরও তিনটি গ্রাম এই জলচাকার পদ্ধতি ব্যবহার করতে চায়।

মধুসূদন বললেন,

—“নকশা নিয়ে যাও। বানিয়ে নাও।”

লোকেরা বলল,

—“আপনি টাকা নেবেন না?”

তিনি মাথা নাড়লেন।

—“জলের জন্য টাকা নিলে জল ছোট হয়ে যায়।”

এক সন্ধ্যায় রাহুল বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, তুমি যদি ঠাকুরদার নকশাটা না পেতে?”

মধুসূদন বললেন,

—“তাহলে হয়তো আমরা নতুন একটা নকশা বানাতাম।”

—“মানে?”

—“পুরোনো জ্ঞান পথ দেখায়, কিন্তু নতুন পথ তৈরি করতে হয় নিজেদের।”

রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

নদীর দিকে তাকিয়ে দেখল, চাকা এখনও ঘুরছে।

ধীরে ধীরে।

নিরন্তর।

কেউ তাকে তেল দিচ্ছে না।

কেউ তাকে ডিজেল খাওয়াচ্ছে না।

নদীর স্রোতই তার শক্তি।

রাহুল বলল,

—“বাবা, চাকা তো থামছে না।”

মধুসূদন হাসলেন।

—“চাকা থামলে জল থামবে। আর জল থামলে জীবনও থেমে যাবে।”

সেদিন থেকে গ্রামের মানুষ জলকে নতুন চোখে দেখতে শিখল।

তারা বুঝল, বড় সমস্যার সমাধান সবসময় বড় যন্ত্র দিয়ে হয় না।

কখনও কখনও পুরোনো একটা নকশা, কয়েকজন মানুষের পরিশ্রম আর একটু বিশ্বাসই যথেষ্ট।

আর নদীর ধারে সেই কাঠের চাকা আজও ঘুরে চলেছে।

তার প্রতিটি ঘূর্ণনের সঙ্গে যেন একটা কথাই শোনা যায়—

“প্রকৃতির শক্তিকে বুঝতে পারলে, প্রকৃতিই তোমার সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে ওঠে।”

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

মাটির বাঁশি।।

শীতের সকাল। গ্রামের চারপাশে তখনও কুয়াশার পাতলা চাদর। পুকুরের জলে সূর্যের আলো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। দূরের তালগাছগুলোর মাথা কুয়াশার মধ্যে অর্ধেক দেখা যাচ্ছে।

গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট মাটির বাড়ি। বাড়ির উঠোনে সারি সারি মাটির পাত্র, ছোট ছোট প্রদীপ, পুতুল আর নানা রকমের খেলনা।

সেখানেই থাকতেন হরিপদ কুমোর।

বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। সারাজীবন মাটি নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল মাটির বাঁশি তৈরি করা।

বাঁশি খুব সাধারণ দেখতে।

কিন্তু হরিপদ বলতেন,

—“মাটির বাঁশির শব্দের মধ্যে গ্রামের মাটির গন্ধ আছে।”

তার ছেলে শহরে চাকরি করত। সে চাইত বাবা যেন আর কাজ না করেন।

প্রায়ই ফোন করে বলত,

—“বাবা, আপনার বয়স হয়েছে। কাজটা ছেড়ে আমার কাছে চলে আসুন।”

হরিপদ হেসে বলতেন,

—“আমি শহরে গেলে আমার মাটিগুলো কে দেখবে?”

ছেলে বিরক্ত হয়ে বলত,

—“মাটি কি মানুষ?”

হরিপদ উত্তর দিতেন,

—“যে মাটিতে মানুষ জন্মায়, তাকে মানুষ না ভাবলে মানুষ হওয়া যায় না।”

ছেলে আর কথা বাড়াত না।

হরিপদের নাতনি তুলি ছিল অন্যরকম।

সে দাদুর কাজ খুব পছন্দ করত।

স্কুল থেকে ফিরেই দৌড়ে চলে আসত উঠোনে।

—“দাদু, আজ কী বানাবে?”

—“তুই বল।”

—“একটা পাখি।”

—“পাখি তো কাল বানিয়েছিলাম।”

—“তাহলে একটা ঘোড়া।”

—“ঘোড়াও বানিয়েছি।”

তুলি একটু ভেবে বলত,

—“তাহলে এমন কিছু বানাও, যা আগে কখনও বানাওনি।”

হরিপদ হাসতেন।

—“এটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।”

একদিন তুলি দাদুর কাছে বসে বাঁশির দিকে তাকিয়ে বলল,

—“দাদু, তুমি মাটির বাঁশি বানাও কেন?”

—“কারণ বাঁশি বাজলে মানুষ হাসে।”

—“সব বাঁশি কি বাজে?”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

—“না।”

—“তাহলে?”

—“মাটি ভালো হতে হয়, ছিদ্রের মাপ ঠিক হতে হয়, আগুনের তাপ বুঝতে হয়। একটু ভুল হলেই শব্দ বেরোবে না।”

তুলি বলল,

—“তাহলে একটা বাঁশি বানানোও পরীক্ষা?”

হরিপদ বললেন,

—“জীবনের মতোই।”

কথাটা তুলির মনে গেঁথে গেল।

সেই বছর গ্রামে বড় মেলা বসবে।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্রামের কারুশিল্পের প্রদর্শনী।

হরিপদকে বলা হল কিছু মাটির জিনিস নিয়ে যেতে।

তিনি বাঁশি, পুতুল, ঘোড়া আর কয়েকটি ছোট প্রদীপ তৈরি করলেন।

কিন্তু মেলার আগের দিন বিপদ হল।

ভোরে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল।

উঠোনে রাখা কাঁচা মাটির অনেক জিনিস ভিজে নষ্ট হয়ে গেল।

হরিপদ ছুটে এসে দেখলেন, অর্ধেক কাজ শেষ।

তুলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“দাদু, সব নষ্ট হয়ে গেল!”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“সব নয়।”

তুলি অবাক হয়ে তাকাল।

—“কোথায় আছে?”

হরিপদ ঘরের ভেতর থেকে একটা কাপড়ে মোড়া বাঁশি বের করলেন।

—“এটা।”

বাঁশিটা কয়েকদিন আগে তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু এখনও বাজিয়ে দেখেননি।

তুলি বলল,

—“এটা কি বাজবে?”

হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,

—“আজ পরীক্ষা হবে।”

তিনি বাঁশিটা ঠোঁটে তুললেন।

ফুঁ দিলেন।

কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।

তুলি হতাশ হয়ে বলল,

—“বাজল না!”

হরিপদ আবার চেষ্টা করলেন।

এবারও শুধু বাতাসের শব্দ।

তৃতীয়বারও একই।

তুলি বলল,

—“দাদু, এটা ফেলেই দাও।”

হরিপদ বাঁশিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“না। যে জিনিস একবার ব্যর্থ হয়েছে, তাকে শেষ সুযোগ না দিয়ে ফেলে দিতে নেই।”

তিনি বাঁশির ছিদ্রগুলো পরীক্ষা করলেন।

একটির মাপ সামান্য ভুল।

ছোট্ট বাটালি দিয়ে তিনি সেটি একটু ঠিক করলেন।

আবার ফুঁ দিলেন।

এইবার—

মিষ্টি একটা শব্দ উঠল।

খুব ছোট।

কিন্তু পরিষ্কার।

তুলির চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল।

—“দাদু! বাজছে!”

হরিপদ হাসলেন।

—“দেখলি? একটু ভুল ছিল। তাই বলে বাঁশিটা খারাপ ছিল না।”

পরদিন মেলা বসলো।

চারদিকে মানুষের ভিড়।

হরিপদের স্টলের সামনে তেমন লোক ছিল না।

বড় দোকানগুলোতে রঙিন খেলনা, প্লাস্টিকের পুতুল, আলো জ্বলা গাড়ি—সবকিছুই ছিল।

তুলির মনে হচ্ছিল, দাদুর মাটির জিনিস কেউ কিনবে না।

হঠাৎ এক ছোট্ট ছেলে স্টলের সামনে এসে দাঁড়াল।

তার হাতে ছিল বাবার দেওয়া কয়েকটা টাকা।

সে একটা মাটির বাঁশি তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, এটা বাজে?”

তুলি বলল,

—“হ্যাঁ।”

ছেলেটি বলল,

—“কত?”

হরিপদ দাম বললেন।

ছেলেটি টাকা গুনে দেখল।

কিছু টাকা কম।

সে বাঁশিটা নামিয়ে রেখে চলে যেতে লাগল।

হরিপদ ডাকলেন,

—“এই যে, দাঁড়াও।”

ছেলেটি ফিরে তাকাল।

হরিপদ বাঁশিটা তার হাতে দিয়ে বললেন,

—“নাও।”

ছেলেটি অবাক।

—“কিন্তু টাকা কম।”

—“তুই বাজাতে শিখবি। সেটাই দাম।”

ছেলেটির মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সে বাঁশি নিয়ে দৌড়ে চলে গেল।

তুলি বলল,

—“দাদু, তুমি টাকা নিলে না কেন?”

হরিপদ বললেন,

—“সব জিনিস টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয় না।”

মেলার শেষ বিকেলে সেই ছেলেটি আবার ফিরে এল।

তার সঙ্গে তার বাবা-মা।

ছেলেটি বাঁশিটা বাজানোর চেষ্টা করছিল।

শব্দ ঠিক বেরোচ্ছিল না।

হরিপদ তাকে পাশে বসিয়ে বললেন,

—“জোরে ফুঁ দিস না। আস্তে। বাঁশির সঙ্গে লড়াই করবি না। ওকে সময় দে।”

ছেলেটি চেষ্টা করল।

একটু পর—

ফুঁউউ…

একটা ভাঙা, কাঁপা শব্দ বেরোল।

ছেলেটি আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

তুলি হাততালি দিল।

হরিপদ বললেন,

—“এই তো! প্রথম শব্দ।”

ছেলেটির বাবা বললেন,

—“কাকু, আপনি কি ওকে শেখাবেন?”

হরিপদ একটু থেমে বললেন,

—“শেখাব। যদি ও শিখতে চায়।”

সেই ঘটনা থেকেই নতুন কিছু শুরু হল।

মেলার পর গ্রামের আরও কয়েকটি শিশু হরিপদের কাছে আসতে শুরু করল।

কেউ মাটি দিয়ে পুতুল বানাতে চায়।

কেউ বাঁশি।

কেউ ছোট্ট পাখি।

হরিপদ সপ্তাহে দুদিন শিশুদের শেখাতে শুরু করলেন।

তুলি পাশে বসে তাদের সাহায্য করত।

ধীরে ধীরে উঠোনটা ছোট্ট কর্মশালায় পরিণত হল।

একদিন হরিপদের ছেলে শহর থেকে এল।

সে অবাক হয়ে দেখল, বাড়ির উঠোনে দশ-বারোটা শিশু বসে মাটি নিয়ে কাজ করছে।

সে বাবাকে বলল,

—“এগুলো কী হচ্ছে?”

হরিপদ হাসলেন।

—“তোর প্রশ্নের উত্তর তুই নিজেই দেখছিস।”

ছেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর একটা মাটির বাঁশি হাতে তুলে নিল।

—“এটা কি তুমি বানিয়েছ?”

—“হ্যাঁ।”

ছেলে বাঁশিটা ঠোঁটে তুলল।

ফুঁ দিল।

শব্দ বেরোল না।

তুলি হেসে ফেলল।

হরিপদ বললেন,

—“জোরে নয়। আস্তে।”

ছেলে আবার চেষ্টা করল।

এইবার খুব ক্ষীণ একটা শব্দ বেরোল।

সবাই হেসে উঠল।

হরিপদের ছেলে অনেক বছর পর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“বাবা, তুমি ঠিকই বলেছিলে।”

—“কী?”

—“মাটিরও প্রাণ আছে।”

হরিপদ কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।

সন্ধ্যায় যখন সবাই চলে গেল, উঠোনে পড়ে রইল কিছু ভাঙা মাটির পুতুল, অসম্পূর্ণ বাঁশি আর শুকোতে দেওয়া ছোট ছোট মাটির পাখি।

তুলি দাদুকে বলল,

—“দাদু, তোমার বাঁশি এখন অনেকেই বাজাবে।”

হরিপদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আমার বাঁশি নয় রে। আমাদের মাটির গল্প বাজবে।”

দূরে তখন সন্ধ্যার পাখির ডাক।

উঠোনে হালকা বাতাস।

আর হরিপদের কর্মশালার ভেতর থেকে ভেসে এল এক শিশুর প্রথম শেখা বাঁশির সুর।

সুরটা নিখুঁত ছিল না।

কোথাও ভাঙা, কোথাও কাঁপা।

তবু সেই সুরের মধ্যে ছিল নতুন শুরুর আনন্দ।

হরিপদ চোখ বন্ধ করে শুনলেন।

তিনি জানতেন—

একজন কারিগরের আসল সাফল্য নিজের হাতে তৈরি জিনিসের সংখ্যা নয়।

তার হাতে তৈরি জ্ঞান যখন অন্যের হাতে বেঁচে থাকে, তখনই তার কাজ সত্যিকার অর্থে অমর হয়ে যায়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
বিবিধ

শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, স্কুলে উত্তেজনার মাঝে পুলিশে উদ্ধার শিক্ষক ও নাবালিকা।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:— শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিল হরিশ্চন্দ্রপুর সদর এলাকার একটি ঘটনা। এক প্রৌঢ় শিক্ষকের বিরুদ্ধে নাবালিকা ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে। স্কুলের নির্ধারিত সময়ের বাইরে বারবার ওই ছাত্রীকে নিয়ে স্কুলে প্রবেশের অভিযোগ ঘিরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ভোর কিংবা বিকেলের মতো স্কুল বন্ধ থাকার সময় ওই শিক্ষক ও নাবালিকা ছাত্রীকে স্কুলে ঢুকতে দেখা যেত। অভিযোগ, ভিতরে ঢোকার পর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত। বারবার এমন ঘটনা নজরে আসায় সন্দেহ তৈরি হয় এলাকাবাসীর মধ্যে।
সোমবার সকালে ফের একইভাবে দু’জনকে স্কুলে ঢুকতে দেখে স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন বলে অভিযোগ। পরে তাঁদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ক্ষুব্ধ জনতা ওই শিক্ষককে মারধর করেন বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সমস্যায় পড়ে। পুলিশ শিক্ষককে উদ্ধার করতে গেলে স্থানীয়দের একাংশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানা গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ শিক্ষক ও নাবালিকা ছাত্রীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সত্যতা প্রকাশ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। শিক্ষাঙ্গনের মতো জায়গায় এমন অভিযোগ সামনে আসায় শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্ক, স্কুলের নিরাপত্তা এবং কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে

Share This
Categories
বিবিধ

চোখে দেখেননি নিজের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা, স্পর্শেই অনুভব করেন মা-কে—মালদার মুকুন্দের অনন্য ভক্তি।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:— দৃষ্টিহীন এক ব্যক্তি, পুরোহিত ছাড়াই দুর্গা পূজা করে আসছেন।স্বপ্নাদেশে পেয়ে বছর পর বছর ধরে মা দুর্গার আরাধনা অন্ধ মুকুন্দ ঘরামী।ছোট বেলায় চোখে আলো হারিয়েছেন কোন এক অসুখে । নিজের চোখে কখনও তার বাড়ির মা দুর্গার প্রতিমার রূপ দেখেনি । নেই বড় কোনও আয়োজন, নেই পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, নেই জাঁকজমক। তবুও বিশ্বাস আর ভক্তির আলোয় প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে নিজের হাতেই মা দুর্গার পুজো করে চলেছেন মালদহের বামনগোলা ব্লকের চাঁদপুর অঞ্চলের নন্দিনাদহ এলাকার বাসিন্দা মুকুন্দ ঘরামি। অন্ধ মুকুন্দ বাবুর জীবনের এই গল্প যেন বিশ্বাস আর ভক্তির এক অন্যরকম অধ্যায়।
তিনি দৃষ্টিহীন। আর্থিক সামর্থ্যও নেই। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক আগে এক রাতে তাঁর জীবনে ঘটে যায় এক ঘটনা, যা আজও তাঁর কাছে সত্যের মতোই স্পষ্ট। তাঁর দাবি, স্বপ্নে এসেছিলেন মা দুর্গা। তাঁকে পুজো করার নির্দেশ দিয়েছিলেন দেবী।
মুকুন্দবাবু স্বপ্নে তিনি মাকে বলেছিলেন—
“আমি তো চোখে দেখতে পাই না মা। আমার কোনও উপার্জনের পথ নেই। কীভাবে তোমার পুজো করব?”
তখন তাঁর দাবি অনুযায়ী, স্বপ্নে মা দুর্গা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন—পুজোর জন্য বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। জল আর ফুল দিলেই হবে । সেই স্বপ্নের পর থেকেই শুরু হয় তাঁর দুর্গাপুজো।গ্রামের মানুষকে জানালে প্রথমদিকে গ্রামের মানুষজনও সেভাবে পাশে দাঁড়াননি। প্রতিমা তৈরির টাকাটুকুও ছিল না তাঁর হাতে। কিন্তু মায়ের প্রতি বিশ্বাসে থেমে যাননি মুকুন্দবাবু। আর ঠিক সেই সময়ই, তাঁর কথায়, এক মৃৎশিল্পী হঠাৎ তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হন। জানান, তিনি মা দুর্গার প্রতিমা তৈরি করে দিতে চান মায়ের মায়ের আদেশ রয়েছে । এরপর ছোট্ট করে তৈরি হয় মায়ের প্রতিমা।এরপর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে সহযোগিতা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে গিয়েছেন মায়ের পুজো।
আজ তাঁর বাড়িতে রয়েছে কংক্রিটের তৈরি মা দুর্গার মূর্তি। মুকুন্দবাবুর দাবি, স্বপ্নের নির্দেশেই এক শিল্পী তাঁর বাড়িতে এসে এই মূর্তি তৈরি করে দিয়েছেন।
চোখে দেখতে না পেলেও মুকুন্দবাবুর বিশ্বাসে যেন মায়ের প্রতিমা স্পষ্ট। হাত দিয়ে প্রতিমাকে স্পর্শ করেই তিনি অনুভব করেন তাঁর আরাধ্য মাকে। পুরোহিতের অপেক্ষা করেন না। বড়ং কোনও মন্ত্রও জানেন না। নিজের মতো করে জল, ফুল আর ভক্তি দিয়ে মায়ের পুজো করেন তিনি।একজন আসে শুধু চণ্ডীপাঠ করতে।
আজ তাঁর সংসারে রয়েছেন স্ত্রী। এক ছেলে ভিনরাজ্যে কাজ করেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে থাকা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মিলে মায়ের সেবা করেন।
চোখে আলো নেই, কিন্তু বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত তাঁর জীবন।
দারিদ্র্য তাঁকে থামাতে পারেনি, দৃষ্টিহীনতা কেড়ে নিতে পারেনি তাঁর ভক্তি।
মুকুন্দ ঘরামির কাছে দুর্গাপুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয় তিনি পুজোর কয়দিন কোন খাবার না খেয়ে জল সরবত খেয়ে পুজো করেন। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর বিশ্বাস।

Share This
Categories
বিবিধ

বালুরঘাটে ‘আকাশ যখন হাতের মুঠোতে’, বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়াতে শিক্ষামূলক উদ্যোগ।।

দক্ষিণ দিনাজপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে পড়ুয়াদের কৌতূহল ও আগ্রহ বাড়াতে বালুরঘাটে অনুষ্ঠিত হল বিশেষ শিক্ষামূলক কর্মসূচি ‘আকাশ যখন হাতের মুঠোতে’। পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশনের উদ্যোগে এবং বালুরঘাট স্কাই ক্লাবের সহযোগিতায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন শালগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট এডুকেশন অফিসার বানিব্রত দাস, বালুরঘাট উত্তর চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক অরিজিত ভাদুড়ি, এছাড়াও আরও দুই অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক জ্যোতির্ময় সিনহা ও রাহুল শঙ্কর শেঠ, বালুরঘাট স্কাই ক্লাবের পক্ষে তুহিন শুভ্র মন্ডল, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রণব প্রামাণিক-সহ অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা। কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়াদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। টেলিস্কোপের মাধ্যমে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়ে উৎসাহিত হয়ে ওঠে তারা। টেলিস্কোপে চোখ রেখে চাঁদ, তারা ও বিভিন্ন গ্রহ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায় পড়ুয়ারা।

বালুরঘাট স্কাই ক্লাবের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের আকাশের বিভিন্ন জ্যোতিষ্ক সম্পর্কে ধারণা দেন। নক্ষত্র ও গ্রহের পার্থক্য, তাদের বৈশিষ্ট্য এবং আকাশে অবস্থান সম্পর্কেও সহজভাবে বোঝানো হয়। বইয়ের পাতায় পড়া বিষয়কে সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে।

আয়োজকদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করাই এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। আকাশ পর্যবেক্ষণের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে পড়ুয়াদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করবে বলে আশা তাঁদের।

Share This
Categories
বিবিধ

বিকশিত ভারত সংকল্প সভাকে সামনে রেখে মেদিনীপুরে শোভাযাত্রা, শহরজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির আবহ।।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- বিকশিত ভারত সংকল্প সভাকে ঘিরে বুধবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর শহরে সেবা জ্যোতি যাত্রা।
শোভাযাত্রায় দেখা গেল প্রচুর সাধারণ মানুষের উপস্থিতি। এই কর্মসূচিতে অংশ নেন পঞ্চায়েত ও গ্রাম উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ-সহ অন্যান্য বিধায়ক ও নেতৃত্বরা। পতাকা হাতে শোভাযাত্রায় পা মেলান বহু মানুষ। মেদিনীপুর শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিক্রমা করে এই সেবা জ্যোতি যাত্রা। বিকশিত ভারত সংকল্প সভাকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচিকে ঘিরে শহরে তৈরি হয় রাজনৈতিক কর্মসূচির আবহ। মেদিনীপুর শহর থেকে ধরা পড়েছে সেবা জ্যোতি যাত্রার সেই ছবি।

Share This
Categories
বিবিধ

জনবহুল এলাকায় গুলি চলার অভিযোগ, অথচ শব্দ শোনেননি বাসিন্দারা—ঘটনায় বাড়ছে রহস্য।।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- দিনের আলোয় খড়্গপুর শহরে গুলি চালানোর অভিযোগকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বুধবার বেলা নাগাদ খড়্গপুর রেল এলাকার ওল্ড সেটেলমেন্টের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে গুলির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। গীতাঞ্জলি হলের পিছনের একটি গলিতে বাইকে করে যাওয়ার সময় দুই যুবককে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অক্ষয় ঝা নামে এক ছাত্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি বাইকে করে ওই গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন দুই যুবক। বাইকটি চালাচ্ছিলেন সাগর কুমার এবং পিছনে ছিলেন অক্ষয় ঝা। অভিযোগ, সেই সময় তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলি এসে লাগে অক্ষয়ের বুকে। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে কলকাতায় রেফার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এই গুলি চালানোর ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। কারণ, যে গলিতে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে, তার আশপাশের কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, তাঁরা কোনও গুলির শব্দই শুনতে পাননি। এমনকি গুলির পর চিৎকার, হইচই বা আতঙ্কের কোনও শব্দও তাঁদের কানে আসেনি বলে দাবি স্থানীয়দের। ফলে দিনের বেলায় জনবহুল এলাকায় কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে রহস্য।
কারা ওই দুই যুবককে লক্ষ্য করে গুলি চালাল? কেনই বা অক্ষয় ও সাগরকে টার্গেট করা হল? এর পিছনে কি কোনও পুরনো বিবাদ, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অন্য কোনও কারণ রয়েছে? নাকি ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও রহস্য—একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ঘটনার খবর পেয়ে তদন্তে নামে খড়্গপুর টাউন থানার পুলিশ। আহত ছাত্রের সঙ্গী সাগর কুমারের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, আশপাশের তথ্য-প্রমাণ এবং ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, দুপুরবেলায় খড়্গপুর শহরের মতো এলাকায় গুলি চালানোর অভিযোগে নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ঠিক কীভাবে গুলি চালানো হয়েছিল এবং অভিযুক্তরা কারা—তদন্ত শেষ হলেই সেই ছবি স্পষ্ট হবে। আপাতত গুলিবিদ্ধ ছাত্রের চিকিৎসা চলছে এবং গোটা ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ।

Share This
Categories
বিবিধ

ভূতনির আলদিয়ায় নতুন করে নদীভাঙন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস বিধায়কের।।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:- ফুলহার গঙ্গা একসাথে মিশে দ্বিতীয়বার নতুন করে ভূতনির আলদিয়া এলাকায় ফুলহর নদীতে ভাঙন। খবর পেয়ে গভীর রাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পরিদর্শন মানিকচকের জান বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মন্ডল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বাদ রক্ষার কাজ চলছে এলাকায়। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে তাঁদের সমস্যা তাড়াতাড়ি মেটানোর জন্য আশ্বাস দেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এবং ভূতনির মানুষের নিরাপত্তা, নদীভাঙন রোধ এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আমরা সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গঙ্গা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন ও ভূতনির মানুষের পাশে বলে জানিয়েছেন বিধায়ক গৌর চন্দ্র মন্ডল।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার ওপারে (তৃতীয় পর্ব)।

তৃতীয় পর্ব — কুয়াশা কেটে গেলে

দরজার হাতলটা ধীরে ধীরে নড়ছিল।

অর্ক নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে।

মেঘলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল, বাইরে ঘন কুয়াশা।

তারপর সে ফিসফিস করে বলল,

— পিছনের জানলা দিয়ে বেরোতে হবে।

অর্ক মাথা নাড়ল।

কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল—

— অর্কবাবু, আমি জানি আপনার কাছে সুব্রতবাবুর নোটবুক আছে।

অর্ক থমকে গেল।

লোকটা জানল কীভাবে?

মেঘলা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পিছনের ঘরে।

জানলার কাঠের পাল্লা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল।

দুজনেই বাইরে বেরিয়ে পড়ল।

কিন্তু মেঘলা নামার আগেই নিচ থেকে একটা হাত তার কবজি ধরে ফেলল।

সে চিৎকার করতে যাচ্ছিল।

অর্ক ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটাকে সরিয়ে দিল।

কুয়াশার মধ্যে লোকটা পিছিয়ে গেল।

তার মুখ দেখা গেল না।

অর্ক শুধু দেখল—

তার হাতে কালো ডায়ালের সেই ঘড়ি।

ঠিক ছবির মতো।

লোকটা দৌড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

মেঘলা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— এবার বুঝতে পারছ?

অর্ক বলল,

— রণজিৎ নয়।

— না।

— তাহলে কে?

মেঘলা বলল,

— যে মানুষটা এত বছর ধরে রণজিৎকে ব্যবহার করেছে।


১

পরদিন সকাল।

শিলাবতীপুর থানার সামনে অর্ক আর মেঘলা দাঁড়িয়ে।

তারা আগের রাতের ঘটনা জানাল।

থানার অফিসার অনিরুদ্ধ পাল প্রথমে সন্দেহের চোখে তাকালেন।

— আপনারা বলছেন রণজিৎ পাল মারা গেছে?

মেঘলা বলল,

— হ্যাঁ।

অনিরুদ্ধ একটা ফাইল খুললেন।

— মৃত্যুর রিপোর্ট অনুযায়ী, রণজিৎ পাল তিন দিন আগে পাহাড়ের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

অর্ক বলল,

— তাহলে গতরাতে আমাদের কাছে কে এসেছিল?

অফিসার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

— সম্ভবত এমন কেউ, যে চায় আপনারা ভাবুন রণজিৎ এখনও বেঁচে আছে।

অর্ক নোটবুকটা টেবিলে রাখল।

— আমার বাবার মৃত্যুর তদন্ত নতুন করে শুরু করতে চাই।

অনিরুদ্ধ নোটবুকটা দেখেই চমকে উঠলেন।

— এটা কোথায় পেলেন?

— পুরনো রেলগুদামে।

অফিসার নোটবুকের মলাট ছুঁয়ে বললেন,

— আপনার বাবা এই খাতার কথা আমাকে একবার বলেছিলেন।

অর্ক অবাক।

— আপনি বাবাকে চিনতেন?

— খুব ভালোভাবে নয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগের সপ্তাহে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

— তখন আপনি কী জানতেন?

অনিরুদ্ধ ধীরে বললেন,

— আমি জানতাম তিনি বড় একটা বিষয় নিয়ে তদন্ত করছেন।

— আর আপনি সাহায্য করেননি?

অফিসারের চোখ নিচু হয়ে গেল।

— আমি তখন নতুন অফিসার। আমার ওপরের লোকেরা আমাকে চুপ থাকতে বলেছিল।

— কারা?

অনিরুদ্ধ একটা নাম লিখে দিলেন।

অমল সরকার।

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

নোটবুকেও এই নাম ছিল।


২

অমল সরকারকে খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না।

তিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত।

শিলাবতীপুরের কাছেই একটি ছোট বাড়িতে থাকেন।

অর্ক, মেঘলা ও অনিরুদ্ধ তাঁর বাড়িতে পৌঁছতেই বৃদ্ধ দরজা খুলে বললেন,

— অবশেষে তুমি এলে।

অর্ক থেমে গেল।

— আপনি আমাকে চিনতেন?

অমল মৃদু হাসলেন।

— তুমি ছোট ছিলে। তোমার বাবা তোমার ছবি দেখিয়েছিলেন।

— আমার বাবা কী জানতে পেরেছিলেন?

অমল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— অনেক কিছু।

— তারপর তাঁকে মেরে ফেলা হল?

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।

অর্ক টেবিলের ওপর নোটবুকটা রাখল।

অমল সেটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— এই খাতা এখনও তোমার কাছে আছে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে ওরা তোমাকে থামানোর চেষ্টা করবে।

মেঘলা বলল,

— “ওরা” কারা?

অমল জানলার দিকে তাকালেন।

— একজন মৃত মানুষের নাম দিয়ে শুরু হয়েছিল এই গল্প। কিন্তু আসল মানুষটি এখনও বেঁচে আছে।

অর্ক বলল,

— কে?

অমল বললেন,

— দেবাশিস মল্লিক।

অর্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— কিন্তু তিনি তো এখন কলকাতায়!

— থাকেন।

— তাহলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়নি কেন?

— কারণ প্রমাণ সবসময় সত্যির সঙ্গে থাকে না।

অমল একটা পুরনো খাম বের করলেন।

— তোমার বাবা এটা আমাকে দিয়েছিলেন।

অর্ক খাম খুলল।

ভেতরে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ।

অ্যাকাউন্টটি দেবাশিস মল্লিকের নামে নয়।

একটি ভুয়ো প্রতিষ্ঠানের নামে।

কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানে টাকা পাঠিয়েছিল সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি সংস্থা।

সুশান্ত ধরের কোম্পানিও সেখানে ছিল।

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

— তাহলে সুশান্তও জড়িত?

অমল বললেন,

— শুরুতে ছিল।

মেঘলা বলল,

— পরে?

— পরে তোমার বাবা ওকে রাজি করান সত্যিটা প্রকাশ করতে।

অর্কের মনে পড়ল সুশান্তের কথা—

“আমি কাপুরুষ ছিলাম।”

এবার কথাটার অর্থ পরিষ্কার হল।


৩

কলকাতায় ফিরে অর্ক সরাসরি দেবাশিস মল্লিকের বাড়িতে গেল।

বড় বাড়ি।

উঁচু গেট।

নিরাপত্তারক্ষী।

অর্ক নিজের পরিচয় দেওয়ার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল।

তারপর দেবাশিস নিজেই এসে দরজা খুললেন।

বয়স সত্তরের কাছাকাছি।

চোখে চশমা।

মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব।

তিনি অর্ককে দেখে বললেন,

— সুব্রতর ছেলে।

অর্ক অবাক হল।

— আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?

— চিনতাম।

— তাহলে জানেন তিনি কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?

দেবাশিস ধীরে বললেন,

— দুর্ঘটনা।

অর্ক ব্যাগ থেকে নোটবুক বের করল।

দেবাশিসের মুখের শান্ত ভাব মুহূর্তে বদলে গেল।

— এটা কোথায় পেলে?

অর্ক বুঝল।

এটাই ছিল আসল প্রমাণ।

সে বলল,

— আপনি ভয় পাচ্ছেন?

দেবাশিস চুপ।

অর্ক আরও কাছে এগিয়ে গেল।

— আমার বাবাকে কেন মরতে হল?

দেবাশিস বললেন,

— তোমার বাবা এমন একটা সত্যি জানতে পেরেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষের জীবন নষ্ট হত।

অর্ক রাগে বলল,

— তাই তাঁকে মেরে ফেললেন?

— আমি মারিনি।

— তাহলে কে?

দেবাশিস উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ।

অনিরুদ্ধ পাল নেমে এলেন।

তার হাতে গ্রেফতারি পরোয়ানা।

দেবাশিস মল্লিকের মুখের রং বদলে গেল।


৪

তদন্তের পর আসল সত্যি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।

আঠারো বছর আগে পাহাড়ি অঞ্চলের জমি দখল করে একটি বড় রিয়েল-এস্টেট প্রকল্প করার পরিকল্পনা হয়েছিল।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করে জমির মালিকানা বদলানো হচ্ছিল।

অমল সরকার কাগজপত্রে অনিয়ম লক্ষ্য করেছিলেন।

সুব্রত সেন সেই অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।

রণজিৎ পাল তখন পরিবহণ সংস্থায় কাজ করত।

সে দুর্ঘটনার রাতে ট্রাকটি দেখেছিল।

বিপ্লব রায় হিসাবের নথি জাল করেছিল।

নির্মাণ ব্যবসায়ী ও কয়েকজন সরকারি কর্মচারী মিলে পুরো চক্রটি চালাচ্ছিল।

কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী ছিল দেবাশিস মল্লিক।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—

সুব্রতর মৃত্যুর রাতে গাড়ি চালানো ব্যক্তি ছিল দেবাশিসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

পরে সেই ব্যক্তি বিদেশে পালিয়ে যায়।

তাকে বহু বছর পর খুঁজে বের করা হয়।

আদালতে পুরনো নথি, ব্যাংক লেনদেন, সাক্ষ্য এবং সুব্রতর নোটবুক একসঙ্গে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হল।

মামলা দীর্ঘদিন চলল।

কিন্তু এবার সত্যি আর চাপা পড়ল না।


৫

সবচেয়ে কঠিন ছিল অর্কের জন্য অন্য একটা সত্যি মেনে নেওয়া।

তার মা সব জানতেন।

পুরোটা নয়।

কিন্তু অনেকটাই।

বাবার মৃত্যুর পর মা তাকে ইচ্ছে করেই সবকিছু থেকে দূরে রেখেছিলেন।

কারণ তিনি জানতেন, অর্ক সত্যিটা জানতে চাইলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে।

মায়ের পুরনো আলমারি থেকে অর্ক একটি চিঠি পেল।

চিঠির শুরু—

“অর্ক, তুই যদি কোনোদিন এই সত্যিটা জানতে পারিস, আমাকে ক্ষমা করিস।”

চিঠিতে লেখা ছিল—

“আমি তোকে মিথ্যে বলেছি। কিন্তু সেই মিথ্যেটা ছিল তোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। তোর বাবা সত্যি খুঁজতে গিয়ে অনেক শত্রু তৈরি করেছিল। আমি চাইনি তুই তাঁর পথ অনুসরণ করিস। আমি শুধু চেয়েছিলাম তুই বেঁচে থাকিস।”

চিঠির শেষে—

“কখনও যদি ফিরে যাস, ভয় নিয়ে ফিরিস না।”

অর্ক চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তার মনে হল—

বাবা তাকে সত্যির কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন।

মা তাকে সত্যি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।

দুজনের উদ্দেশ্য আলাদা ছিল।

কিন্তু ভালোবাসা একই।


৬

কয়েক মাস পর শিলাবতীপুরে আবার কুয়াশা নামল।

অর্ক পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে।

মেঘলা পাশে।

মেঘলা বলল,

— এবার কি ফিরে যাবে?

অর্ক হাসল।

— হ্যাঁ।

— আবার আসবে?

— জানি না।

মেঘলা কিছু বলল না।

অর্ক বলল,

— তবে একটা কথা বুঝেছি।

— কী?

— মানুষ অনেক সময় সত্যির খোঁজে বাড়ি ছেড়ে যায়।

মেঘলা তাকাল।

— তারপর?

— সত্যি খুঁজে পাওয়ার পর বুঝতে পারে, সে আসলে নিজের কাছেই ফিরছিল।

মেঘলা মৃদু হাসল।

— তোমার বাবা এই কথাটা বলতেন।

অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।

— বাবা?

— হ্যাঁ।

— কী বলতেন?

মেঘলা দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “কুয়াশা কখনও পথ হারায় না। কুয়াশা শুধু পথটাকে কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করে রাখে।”

অর্ক চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে হাসল।

শহরের দিকে নামার রাস্তা কুয়াশায় ঢাকা।

কিন্তু এবার সে পথ চিনতে পারছিল।


৭

এক বছর পর সুব্রত সেনের নামে একটি ছোট গবেষণা ও নথি সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হল।

নাম—

“সুব্রত সেন স্মৃতি কেন্দ্র।”

উদ্বোধনের দিন অর্ক বাবার পুরনো ছবিটা দেয়ালে টাঙাল।

ছবিতে চারজন মানুষ ছিল।

কিন্তু এবার সেই ছবির ইতিহাস আর রহস্য নয়।

সবাই জানে, সেখানে কারা ছিল।

কেউ আর মুখ লুকিয়ে রাখতে পারে না।

সুশান্ত নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচার মেনে নিয়ে পরে তদন্তে সহযোগিতা করেছিল।

নির্মল সাক্ষ্য দিয়েছিল।

রণজিৎ মারা যাওয়ার আগে যে নথি রেখে গিয়েছিল, সেটিও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়েছিল।

আর মেঘলা?

সে শিলাবতীপুরেই থেকে গেল।

অর্ক কলকাতা থেকে মাঝেমধ্যে সেখানে যেত।

তাদের সম্পর্কের কোনো নাম দেওয়া হয়নি।

প্রয়োজনও হয়নি।

কিছু সম্পর্কের জন্য নামের চেয়ে বিশ্বাস বড়।

এক সন্ধ্যায় অর্ক মেঘলাকে বলল,

— জানো, আমি প্রথম দিন এখানে এসেছিলাম বাবার মৃত্যুর সত্যি জানতে।

— আর এখন?

অর্ক পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— এখন মনে হয়, সত্যি জানার থেকেও বড় ছিল একটা জিনিস।

— কী?

— বাবাকে নতুন করে চিনতে শেখা।

মেঘলা হাসল।

— আর নিজেকে?

অর্কও হাসল।

— সেটাও।


সেদিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের ওপর কুয়াশা নেমেছিল।

কিন্তু অর্ক আর ভয় পেল না।

কারণ সে জানত—

কুয়াশার ওপারে পথ আছে।

অতীতকে মুছে ফেলা যায় না।

মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না।

হারানো বছরগুলোও ফিরে আসে না।

কিন্তু সত্যি কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

কখনও একটা পুরনো ছবি হয়ে ফিরে আসে।

কখনও একটা নোটবুক হয়ে।

কখনও কোনো অপরিচিত মানুষের কণ্ঠে।

আর কখনও—

একজন ছেলের কাছে তার মৃত বাবার অসমাপ্ত কথার মতো ফিরে আসে।

অর্ক শেষবারের মতো পাহাড়ের দিকে তাকাল।

তারপর মেঘলার পাশে হাঁটতে শুরু করল।

কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছিল।

কিন্তু এবার সামনে যাওয়ার জন্য আলো দরকার ছিল না।

কারণ পথটা সে চিনে ফেলেছে।

কুয়াশার ওপারে নয়—

পথটা আসলে তার নিজের ভেতরেই ছিল।

— সমাপ্ত —

Share This