Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে প্রতি রাতে একজন মারা যায় (তৃতীয় পর্ব: শেষ মৃত্যুর রাত)।

১. যে মানুষটি বাবা ছিল না

দরজায় তৃতীয় আঘাতটা পড়তেই কাঠের একটি অংশ ভেঙে মেঝেতে পড়ল।

অদিতি মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে। তার মাথার মধ্যে একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরছে। যে মানুষটিকে সে বাবা বলে চিনেছে, যার হাত ধরে ছোটবেলায় স্কুলে গিয়েছে, যার মৃত্যুর পর সাত দিন ধরে কেঁদেছে—সেই মানুষটি যদি দেবব্রত মুখার্জি না হয়, তাহলে সে কে?

আর তার আসল বাবা কোথায়?

“মা, আমাকে সব বলো,” অদিতি কাঁপা গলায় বলল। “একটা কথাও লুকিয়ো না।”

মালবিকা তার মুখের দিকে তাকালেন। চোখে অপরাধবোধ, ক্লান্তি আর বহু বছরের জমে থাকা যন্ত্রণা।

“তোমাদের জন্মের রাতে এই বাড়িতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তার পর থেকে সবকিছু বদলে যায়। তোমাদের আসল বাবা ছিলেন অরুণেশ মুখার্জি। দেবব্রত তাঁর ছোট ভাই। অরুণেশ ছিলেন এই বাড়ির উত্তরাধিকারী। কিন্তু তিনি জানতেন, পরিবারের সম্পত্তির কাগজপত্রে বড় ধরনের জালিয়াতি চলছে। সেই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ছিল অরিন্দম রায়।”

অদিতি অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“তাহলে দেবব্রত?”

“দেবব্রত তোমাদের কাকা। তোমাদের জন্মের পর তিনি তোমাদের একজনকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিয়ে অন্য পরিচয়ে বড় করেন। তিনি আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে নিজেই ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে যান।”

“আর আমার বাবা?”

মালবিকা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার বাইরে থেকে অরিন্দমের কণ্ঠ শোনা গেল।

“মালবিকা! পুরোনো গল্প বলে লাভ নেই। তুমি জানো, সত্যি প্রকাশ পেলে তোমাদের কারও রক্ষা হবে না।”

মাধবী ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আলমারির পেছনের ছোট দরজাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের বেরোনোর অন্য কোনও পথ আছে?”

মালবিকা মাথা নাড়লেন।

“ওই দরজার ওপাশে একটা সরু করিডর আছে। সেটা পুরোনো ভূগর্ভস্থ ঘরে গিয়ে মিশেছে। সেখান থেকে পেছনের বাগানে বেরোনো যায়।”

“তাহলে আগে বলোনি কেন?”

“কারণ ওই ঘরেই অরুণেশকে শেষবার দেখা গিয়েছিল।”

অদিতি তাকিয়ে রইল।

“তুমি কি বলতে চাইছ, আমার আসল বাবা ওই ঘরে আছেন?”

মালবিকা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি জানি না তিনি বেঁচে আছেন কি না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কোনও প্রমাণ আমি কখনও দেখিনি।”

দরজায় এবার প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল। তালা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল।

অরিন্দম রায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর বয়স ষাটের কাছাকাছি, কিন্তু শরীর এখনও শক্তপোক্ত। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। হাতে কালো ছড়ি।

তাঁর পেছনে দু’জন লোক।

“অনেক হয়েছে,” অরিন্দম বললেন। “মালবিকা, মেয়েদের আমার হাতে তুলে দাও।”

মালবিকা দুই মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন।

“তুমি আর ওদের কাছে আসতে পারবে না।”

অরিন্দম মৃদু হাসলেন।

“তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, মালবিকা? এই বাড়িতে কে বাঁচবে আর কে মরবে, সেটা আমি ঠিক করি।”

মাধবী দাঁত চেপে বলল, “তাহলে আজ থেকে নিয়ম বদলাবে।”

অরিন্দম তার দিকে তাকালেন।

“তোমার মতো একটা মেয়েকে আমি আঠারো বছর আগে শেষ করে দিতে পারতাম। কিন্তু তোমার ভাগ্য ভালো ছিল।”

“আমাকে মৃত ঘোষণা করেছিলে কেন?”

“কারণ মৃত মানুষের কোনও অধিকার থাকে না। সে সম্পত্তি দাবি করতে পারে না, নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে না, আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারে না।”

অদিতি বুঝতে পারল, এই ষড়যন্ত্র শুধু তাদের পরিচয় নিয়ে নয়। সম্পত্তির উত্তরাধিকার, জাল নথি আর বহু বছরের অপরাধকে ঢেকে রাখার জন্যই তাদের জীবন বদলে দেওয়া হয়েছিল।

অরিন্দম এবার অদিতির দিকে তাকালেন।

“আর তুমি, অদিতি। তোমাকে আমি অনেকবার সতর্ক করেছিলাম। তোমার বাবা মারা যাওয়ার পরও তোমাকে এই বাড়িতে না আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তুমি কৌতূহল সামলাতে পারোনি।”

“আপনি আমার বাবাকে খুন করেছেন?”

অরিন্দমের চোখে মুহূর্তের জন্য বিরক্তি ফুটে উঠল।

“তোমার বাবা নিজের সিদ্ধান্তের মূল্য দিয়েছিলেন।”

“আপনি কোন বাবার কথা বলছেন? দেবব্রতর, নাকি অরুণেশের?”

প্রশ্নটি শুনে অরিন্দমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

মালবিকা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “এখনই পালাও!”

তিনি অরিন্দমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁর ধাক্কায় অরিন্দম পিছিয়ে গেলেন। মাধবী দ্রুত আলমারির পেছনের দরজাটি খুলে ফেলল।

অদিতি মাকে টেনে নিতে গেল, কিন্তু মালবিকা চিৎকার করে বললেন, “যাও! নিচের ঘরে যা আছে, সেটা খুঁজে বের করো। তোমাদের বাবার সত্যিটা সেখানেই লুকিয়ে আছে!”

দু’জন অন্ধকার করিডরে ঢুকে পড়ল।

পেছনে ধস্তাধস্তির শব্দ, চিৎকার, তারপর একটি গুলির আওয়াজ।

অদিতি থেমে গেল।

“মা!”

মাধবী তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।

“এখন থামলে মায়ের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে!”

অদিতি চোখের জল মুছে অন্ধকারে এগিয়ে চলল।

২. ভূগর্ভস্থ ঘর

সরু করিডরটি এতটাই অন্ধকার যে হাত বাড়ালেও আঙুল দেখা যায় না। দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। মাঝে মাঝে ছাদের ফাঁক দিয়ে জল পড়ছে।

কিছুটা এগিয়ে একটি লোহার দরজা দেখা গেল। দরজার গায়ে মরচে ধরা তালা।

মাধবী ব্যাগ থেকে ছোট একটি ধাতব পিন বের করে তালা খোলার চেষ্টা করল। কয়েক মিনিটের মধ্যে তালাটি খুলে গেল।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দু’জনের নাকে তীব্র দুর্গন্ধ এসে লাগল।

ঘরটি ছোট নয়। দেওয়ালের দু’পাশে কাঠের তাক, পুরোনো বাক্স, ভাঙা আসবাব। এক কোণে একটি টেবিলের ওপর কাগজের স্তূপ। অন্য কোণে একটি লোহার খাট।

খাটের পাশে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ।

তাঁর চুল সাদা, মুখে দাড়ি, শরীর অত্যন্ত দুর্বল। তবু চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন।

“কে?”

অদিতি এগিয়ে গেল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“মালবিকা… তুমি ফিরে এসেছ?”

“আমি মালবিকা নই,” অদিতি বলল। “আমি অদিতি।”

বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল।

“অদিতি?”

তিনি কাঁপা হাতে তার মুখ ছুঁতে গেলেন।

“তুমি এত বড় হয়ে গেছ?”

অদিতির শরীর অবশ হয়ে গেল।

“আপনি কি আমার বাবা?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“আমি অরুণেশ মুখার্জি। তোমার বাবা।”

অদিতি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে বাবার বুকে মুখ রেখে কেঁদে উঠল। যে মানুষটিকে সে কোনওদিন দেখেনি, যাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কেই তার ধারণা ছিল না, তিনি তার সামনে বেঁচে আছেন।

মাধবীও কাছে এসে দাঁড়াল।

অরুণেশ দুই মেয়ের হাত ধরলেন।

“আমি জানতাম, তোমরা একদিন আসবে।”

“আপনাকে এত বছর এখানে আটকে রেখেছিল কে?” মাধবী জিজ্ঞেস করল।

“অরিন্দম। দেবব্রতও তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা আমাকে সম্পত্তির কাগজে সই করাতে চেয়েছিল। আমি রাজি হইনি। তারপর এক রাতে আমাকে আক্রমণ করে এই ঘরে আটকে রাখে। বাইরে সবাইকে বলা হয়, আমি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছি।”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কিন্তু বাবা… দেবব্রত তো আমার কাছে নিজের বাবা ছিলেন।”

অরুণেশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“দেবব্রত তোমাকে ভালোবাসত। কিন্তু সে নিজের অপরাধবোধ থেকে কখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। তোমাকে নিজের মেয়ে বলে বড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে। তোমার পরিচয় বদলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজের জীবনও বদলে ফেলেছিল।”

“তাহলে আমার জন্মের সময় কী হয়েছিল?”

অরুণেশ টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো ফাইল খুললেন।

“তোমরা দুই বোন জন্মানোর পর অরিন্দম হাসপাতালের নথি বদলে দেয়। সে চেয়েছিল, উত্তরাধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে কোনও দাবি না উঠুক। একজনকে মৃত ঘোষণা করে, অন্যজনকে পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু মালবিকা প্রতিবাদ করেছিল। তাই তাকে বাড়ির উত্তর ঘরে আটকে রাখা হয়।”

“কিন্তু মা তো বলেছিল, তাকে নদীতে নৌকাডুবিতে মারা গেছে বলা হয়েছিল।”

“সেই গল্পটা তৈরি করেছিল দেবব্রত। সে ভেবেছিল, মালবিকা নিখোঁজ থাকলে অরিন্দমের নজর অন্যদিকে থাকবে। কিন্তু পরে সে নিজেও ভয় পেয়ে যায়। সত্যি প্রকাশ করলে সে নিজের অপরাধের জন্য শাস্তি পেত।”

অদিতি টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো দেখতে শুরু করল। সেখানে সম্পত্তির দলিল, হাসপাতালের রেজিস্টার, কয়েকটি চিঠি এবং পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং ছিল।

একটি সংবাদপত্রের কাটিংয়ে লেখা—

‘মুখার্জি পরিবারের উত্তরাধিকারী নিখোঁজ, দুই শিশুর পরিচয় নিয়ে রহস্য।’

তারিখ: ১৮ অক্টোবর, ২০০৩।

অদিতির চোখ আটকে গেল।

“এই খবরটা কি কখনও প্রকাশিত হয়েছিল?”

অরুণেশ বললেন, “না। এটা ছিল একটি খসড়া প্রতিবেদন। দেবব্রত সংবাদপত্রে পাঠানোর আগেই কাগজটা সরিয়ে ফেলে।”

মাধবী আরেকটি নথি হাতে নিল। সেটি ছিল একটি মৃত্যুসনদ।

নাম: অদিতি মুখার্জি।

মৃত্যুর তারিখ: ১৭ অক্টোবর, ২০০৩।

মাধবী কাগজটি অদিতির সামনে ধরল।

“তাহলে আমাদের একজনকে জন্মের দিনই মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”

অরুণেশ মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু যে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, তার দেহ কখনও পাওয়া যায়নি। কারণ সে মারা যায়নি।”

“তাহলে কে ছিল সেই শিশু?”

অরুণেশ উত্তর দেওয়ার আগে ঘরের বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

তারপর দরজায় একটি ধাক্কা।

“অরুণেশ! আমি জানি, ওরা তোমার কাছে এসেছে!”

অরিন্দমের কণ্ঠ।

অরুণেশের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।”

৩. মৃত মানুষের স্বীকারোক্তি

অরুণেশ দ্রুত টেবিলের নিচ থেকে একটি ছোট রেকর্ডার বের করলেন।

“এটা নিয়ে যাও। এতে অরিন্দমের স্বীকারোক্তি আছে।”

অদিতি রেকর্ডারটি হাতে নিল।

“আপনি নিজে আমাদের সঙ্গে চলুন।”

“আমি আর পারব না, মা। এত বছর অন্ধকারে থাকতে থাকতে শরীর ভেঙে গেছে। তোমাদের বেরিয়ে যেতে হবে।”

“আমি আপনাকে ফেলে যাব না!”

অরুণেশ তার মাথায় হাত রাখলেন।

“তুমি আমাকে খুঁজে পেয়েছ, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখন আমার শেষ কাজটা করতে দাও।”

মাধবী ঘরের অন্য দিকে একটি সরু দরজা দেখতে পেল। দরজাটি একটি সিঁড়ির সঙ্গে যুক্ত, যা বাগানের দিকে উঠে গেছে।

“এই পথ দিয়ে বেরোনো যাবে,” সে বলল।

অরুণেশ মাথা নাড়লেন।

“যাও। আর মনে রেখো, অরিন্দমের হাতে শুধু সম্পত্তির ক্ষমতা নেই। পুলিশের মধ্যেও তার লোক আছে। রেকর্ডারটি এমন কারও হাতে দেবে, যাকে বিশ্বাস করা যায়।”

অদিতি বাবার হাত চেপে ধরল।

“আপনি কি সত্যিই আমার বাবা?”

অরুণেশের চোখ ভিজে উঠল।

“রক্তের সম্পর্কের প্রমাণ কাগজে লেখা যায়। কিন্তু বাবা হওয়ার প্রমাণ থাকে সন্তানের প্রতি ভালোবাসায়। আমি তোমাকে জন্মের পর থেকে বড় করতে পারিনি, কিন্তু প্রতিটি দিন তোমার জন্য বেঁচে থেকেছি।”

অদিতি তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

তারপর মাধবীকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

দরজার কাছে পৌঁছতেই অরুণেশ ডাকলেন, “অদিতি!”

সে ফিরে তাকাল।

“যে মেয়েটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সে তুমি নও।”

অদিতি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে কে?”

অরুণেশের ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“মাধবী।”

মাধবী যেন পাথর হয়ে গেল।

“কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!”

“তোমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, কারণ অরিন্দম ভেবেছিল, মৃত শিশুর কোনও উত্তরাধিকার থাকবে না। কিন্তু দেবব্রত তোমাকে বাঁচিয়ে অন্য পরিচয়ে পাঠিয়ে দেয়। আর অদিতিকে নিজের কাছে রেখে দেয়।”

অদিতি মাধবীর হাত ধরল।

“তাহলে তুমি এত বছর ধরে নিজের মৃত্যুর পরিচয় নিয়ে বেঁচে ছিলে।”

মাধবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আর তুমি এমন একজনের পরিচয়ে বড় হয়েছ, যে তোমার নিজের পরিচয় ছিল না।”

দু’জন একে অন্যের দিকে তাকাল। তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর পাওয়া গেছে, কিন্তু সেই উত্তরের মধ্যে কোনও আনন্দ ছিল না।

শুধু হারিয়ে যাওয়া সময়ের বেদনা।

ঠিক তখনই দরজার ওপাশে গুলির শব্দ হলো।

অরুণেশ চিৎকার করে উঠলেন।

“পালাও!”

অদিতি আর মাধবী সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দরজা খুলে বাগানে বেরিয়ে এল।

পেছনে আরেকটি গুলির শব্দ।

তারপর নিস্তব্ধতা।

অদিতি পিছন ফিরে তাকাতে চাইল। মাধবী তার হাত ধরে রাখল।

“না, দিদি। এবার আমাদের বাঁচতে হবে। বাবার মৃত্যুকে বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।”

দু’জনে বাগানের ভাঙা দেওয়াল টপকে বাইরে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু অদিতির হাতে থাকা রেকর্ডারটি তখনও চলছিল।

আর তার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল একটি পুরুষ কণ্ঠ—

“আমি অরিন্দম রায়। আমি স্বীকার করছি, ২০০৩ সালের ১৭ অক্টোবর আমি একটি শিশুকে মৃত ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলাম…”

৪. শেষ রাতের সাক্ষী

ভোর হওয়ার আগেই অদিতি ও মাধবী কাছের একটি থানায় পৌঁছল। কিন্তু রেকর্ডারটি পুলিশের হাতে দেওয়ার আগে তারা সৌম্যকে ফোন করল। সৌম্য ছিল অদিতির দীর্ঘদিনের বন্ধু, সংবাদপত্রের অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক।

সব শুনে সে প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তোমরা কি নিশ্চিত, অরুণেশ মুখার্জি এখনও বেঁচে আছেন?”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

সৌম্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি এখনই আসছি। কিন্তু একটা কথা—তোমরা যে রেকর্ডিং পেয়েছ, সেটা হয়তো অরিন্দমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে আমাদের আরও একটি সাক্ষী দরকার।”

“কে?”

“সরলা।”

অদিতির মনে পড়ল, সরলা এখনও বাড়িতে রয়েছেন। অরিন্দম তাঁকে ছেড়ে দেবেন কি না, সে জানে না।

“আমাদের ফিরে যেতে হবে,” অদিতি বলল।

সৌম্য আপত্তি করল।

“এখনই নয়। আগে পুলিশকে সঙ্গে নিতে হবে।”

সকাল আটটার দিকে তারা পুলিশের একটি দল নিয়ে মুখার্জিবাড়িতে ফিরে এল। কিন্তু বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখা গেল, সদর দরজা খোলা। বাগানে কোনও লোকজন নেই। বাড়ির ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা।

পুলিশ তল্লাশি শুরু করল।

হলঘরে দেওয়ালের ছবিগুলো আবার তেরোটি। চৌদ্দ নম্বর ছবিটি নেই।

উত্তর ঘরের দরজা খোলা। ঘরের ভেতর রক্তের দাগ, ভাঙা আসবাব, ছড়িয়ে থাকা কাগজ। কিন্তু মালবিকা নেই। অরিন্দম নেই। সরলাও নেই।

আর ভূগর্ভস্থ ঘরে পৌঁছে তারা দেখল, অরুণেশও নিখোঁজ।

অদিতি মেঝেতে বসে পড়ল।

“সবাই কোথায় গেল?”

সৌম্য ঘরটি খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। টেবিলের নিচে একটি ছোট্ট কাগজ পাওয়া গেল। তাতে লেখা—

‘আজ রাত বারোটায় পুরোনো পুকুরঘাটে এসো। একা। যদি তোমার বাবাকে জীবিত দেখতে চাও।’

নিচে কোনও স্বাক্ষর নেই।

অদিতি কাগজটি শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল।

“আমি যাব।”

সৌম্য বলল, “আমরা সবাই যাব। তবে তোমাকে একা যেতে হবে না।”

পুলিশের এক আধিকারিক জানালেন, অরিন্দম রায়ের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আগে তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে।

সৌম্য রেকর্ডারটি পুলিশের হাতে তুলে দিল। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সেটি পাঠানো হলো। একই সঙ্গে অদিতির বাবার মৃত্যুর নথি পুনরায় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হলো।

সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও খবর পাওয়া গেল না।

অদিতি জানলার পাশে বসে রইল। তার সামনে মায়ের পুরোনো ছবিটি। ছবির পেছনে লেখা—‘আমার মেয়ে অদিতির সঙ্গে শেষ দুর্গাপুজো।’

সে এবার বুঝতে পারল, ছবির কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে ছিল না।

সেই পুজোয় সত্যিই দুই বোন ছিল।

কিন্তু ছবির পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।

রাত এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে সৌম্য, মাধবী ও কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে অদিতি পুরোনো পুকুরঘাটে পৌঁছল। চারদিকে কুয়াশা। পুকুরের জল কালো, ঘাটের সিঁড়িতে শ্যাওলা।

দূরে একটি লণ্ঠনের আলো দেখা গেল।

একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।

অদিতি এগিয়ে গেল।

“বাবা?”

লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুলল।

অরুণেশ মুখার্জি।

কিন্তু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন।

দেবব্রত মুখার্জি।

অদিতি পিছিয়ে গেল।

“আপনি তো মারা গিয়েছেন!”

দেবব্রতর মুখে ক্লান্ত হাসি ফুটল।

“যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনেছ, সে দেবব্রত ছিল। কিন্তু হাসপাতালে যে মানুষটির মৃত্যুসনদ তৈরি হয়েছে, সেই পরিচয়ও পুরোপুরি সত্যি নয়।”

মাধবী রাগে কাঁপতে লাগল।

“আর কত মিথ্যে বলবেন?”

দেবব্রত চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আমি জানি, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকার আমার নেই। কিন্তু আমি এত বছর ধরে একটা অপরাধের বোঝা বয়ে বেড়িয়েছি।”

অরুণেশ বললেন, “দেবব্রতই আমাকে ভূগর্ভস্থ ঘরে আটকে রেখেছিল। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে, অরিন্দম আমাদের সবাইকে শেষ করে দিতে চায়। তাই সে আমার পালানোর ব্যবস্থা করে।”

অদিতি অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“তাহলে বাবা, আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?”

দেবব্রত উত্তর দিলেন, “আমি তোমাদের থেকে দূরে ছিলাম, কারণ অরিন্দম আমাকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু তোমার কাছে যে চিঠিটা পৌঁছেছিল, সেটা আমি পাঠিয়েছিলাম।”

অদিতির মাথা ঘুরে উঠল।

“চিঠিটা আপনি পাঠিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। আমি জানতাম, তুমি বাড়িতে ফিরলে সত্যিটা জানতে পারবে। কিন্তু আমি জানতাম না, অরিন্দম এত তাড়াতাড়ি তোমাদের কাছে পৌঁছে যাবে।”

“তাহলে আমার বাবার মৃত্যু?”

দেবব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“হাসপাতালে যে মানুষটি মারা গিয়েছিল, সে ছিল অরিন্দমের এক সহযোগী। তাকে দেবব্রত মুখার্জি বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। আমি তখনও বেঁচে ছিলাম, কিন্তু নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে পারিনি।”

অদিতি বুঝতে পারছিল না, কাকে বিশ্বাস করবে। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ যেন অন্য কারও পরিচয় নিয়ে বেঁচে আছে।

ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে অরিন্দম রায় বেরিয়ে এলেন।

“বেশ! সবাই এক জায়গায় এসে গেছ।”

পুলিশ অফিসাররা বন্দুক তুললেন।

অরিন্দমের হাতে একটি ছোট পিস্তল।

তিনি অরুণেশের দিকে বন্দুক তাক করলেন।

“এই মানুষটা এত বছর বেঁচে থাকায় আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেছে। এবার আর কোনও সাক্ষী থাকবে না।”

মাধবী চিৎকার করল, “থামুন!”

অরিন্দম তার দিকে তাকালেন।

“তুমি তো মৃত। তোমার কোনও অস্তিত্ব নেই।”

মাধবী ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।

“আমার অস্তিত্ব কাগজে মুছে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি বেঁচে আছি। আর আজ আপনার অপরাধের সাক্ষীও আছি।”

সৌম্য সামনে এসে রেকর্ডারের বোতাম টিপল।

অরিন্দমের নিজের কণ্ঠ চারদিকে ভেসে উঠল—

“আমি অরিন্দম রায়। আমি স্বীকার করছি, ২০০৩ সালের ১৭ অক্টোবর আমি একটি শিশুকে মৃত ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলাম…”

অরিন্দমের মুখ বিকৃত হয়ে গেল।

“ওটা বন্ধ করো!”

তিনি বন্দুক তুলতেই পুলিশ তাঁকে ঘিরে ফেলল। ধস্তাধস্তির মধ্যে গুলি ছুটল। গুলিটি দেবব্রতর কাঁধে লাগল। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন।

পুলিশ অরিন্দমকে নিরস্ত্র করে গ্রেপ্তার করল।

অদিতি দেবব্রতর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

“কেন? আপনি কেন আমাদের সঙ্গে এত মিথ্যে বললেন?”

দেবব্রত কষ্ট করে চোখ খুললেন।

“কারণ আমি ভেবেছিলাম, তোমাদের বাঁচাতে পারব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাদের জীবনটাই নষ্ট করেছি।”

অদিতির চোখ ভিজে উঠল।

“আপনি আমার বাবা ছিলেন।”

দেবব্রত তার হাত ধরলেন।

“এই কথাটুকু শুনেই আমি শান্তি পাব, মা।”

কিছুক্ষণ পর অ্যাম্বুল্যান্স এল। দেবব্রতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।

কিন্তু অদিতির মনে তখনও একটি প্রশ্ন।

“মা কোথায়?”

কেউ উত্তর দিতে পারল না।

৫. শেষ মৃত্যুর রহস্য

পরের কয়েক দিন ধরে তদন্ত চলল। অরিন্দম রায়ের বিরুদ্ধে শিশু পরিচয় জালিয়াতি, বেআইনি সম্পত্তি দখল, অপহরণ, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং একাধিক অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হতে শুরু করল। হাসপাতালের পুরোনো নথি উদ্ধার হলো। কয়েকজন প্রাক্তন কর্মী সাক্ষ্য দিলেন। সরলাকেও খুঁজে পাওয়া গেল—তিনি শহরের একটি ছোট ক্লিনিকে আহত অবস্থায় ছিলেন।

সরলা জানালেন, অরিন্দম মালবিকাকে পুকুরঘাটের কাছের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আটকে রেখেছিলেন। পুলিশের দল সেখানে অভিযান চালিয়ে মালবিকাকে উদ্ধার করল।

মালবিকা বেঁচে ছিলেন।

কিন্তু অরুণেশের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। দীর্ঘদিন অন্ধকার ঘরে আটকে থাকার ফলে তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেও তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে পারলেন না।

এক সন্ধ্যায় হাসপাতালে অদিতি তাঁর পাশে বসেছিল।

অরুণেশ চোখ খুলে বললেন, “তুমি কি তোমার মাকে পেয়েছ?”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“পেয়েছি, বাবা।”

অরুণেশ মৃদু হাসলেন।

“তাহলে আমার আর কোনও আক্ষেপ নেই।”

“আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।”

“সবাই সুস্থ হয়ে ওঠে না, মা। কিন্তু সত্যি বেঁচে থাকে।”

তিনি অদিতির হাত শক্ত করে ধরলেন।

“মাধবীকে কখনও একা ছেড়ে দিস না। তোমাদের দু’জনের জীবন আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তোমরা একে অন্যের শত্রু নও।”

“আমি ওকে ছেড়ে যাব না।”

অরুণেশ চোখ বন্ধ করলেন।

সেই রাতেই তাঁর মৃত্যু হলো।

কিন্তু এবার কোনও মিথ্যে মৃত্যুসনদ তৈরি হয়নি। হাসপাতালের নথিতে তাঁর প্রকৃত পরিচয় লেখা হলো—অরুণেশ মুখার্জি, মালবিকা মুখার্জির স্বামী, অদিতি ও মাধবীর জন্মদাতা পিতা।

অদিতি বাবার হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে রইল। তার চোখে জল ছিল, কিন্তু মনে অদ্ভুত এক শান্তি। যে মানুষটিকে সে কখনও চিনত না, তিনি তাকে নিজের পরিচয় ফিরিয়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে দেবব্রত অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। পুলিশি তদন্তে তাঁর ভূমিকার কথাও প্রকাশ্যে এল। তিনি স্বীকার করলেন, ভয়ে এবং অপরাধবোধে তিনি বহু বছর সত্যি চাপা রেখেছিলেন। আদালতে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করতে রাজি হলেন।

মালবিকা দুই মেয়েকে নিয়ে মুখার্জিবাড়িতে ফিরে এলেন।

কিন্তু বাড়িটি আর আগের মতো ছিল না।

দেওয়ালের ছবিগুলো খুলে নেওয়া হয়েছে। উত্তর ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। ভূগর্ভস্থ ঘর থেকে সমস্ত নথি উদ্ধার করা হয়েছে। বাড়ির পেছনের পুকুরঘাট পরিষ্কার করা হয়েছে।

একদিন অদিতি সেই হলঘরে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে প্রথম দিন সে তেরোটি ছবি গুনেছিল।

এবার দেওয়ালে একটি নতুন ছবি টাঙানো হয়েছে।

ছবিতে মালবিকা মাঝখানে বসে। তাঁর দু’পাশে অদিতি ও মাধবী। পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন অরুণেশ ও দেবব্রত।

ছবির নীচে লেখা—

‘একটি পরিবারের সত্যি, ২০২৬।’

অদিতি ছবিটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“মা, এবার আর কেউ আমাদের পরিচয় বদলাতে পারবে না।”

মালবিকা তার মাথায় হাত রাখলেন।

“না, মা। এবার তোমাদের জীবন তোমরাই লিখবে।”

সেদিন রাতে অদিতি নিজের ঘরে বসে বাবার পুরোনো ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলল। সেখানে এমন একটি বাক্য লেখা ছিল, যা সে আগে পড়েনি।

‘এই বাড়িতে প্রতি রাতে একজন মারা যায়—এ কথাটা সত্যি নয়। সত্যিটা হলো, প্রতি রাতে একজন মানুষের পরিচয় মুছে দেওয়া হতো। কখনও কাগজে, কখনও স্মৃতিতে, কখনও মানুষের মুখে। আর পরিচয় হারানো মানুষটির মৃত্যু ঘটত পৃথিবীর চোখে, যদিও তার শরীর বেঁচে থাকত।’

অদিতি ডায়েরিটি বন্ধ করল।

সে বুঝতে পারল, বাড়ির রহস্য কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির ছিল না। ভয়, লোভ, অপরাধবোধ আর মানুষের তৈরি মিথ্যেই এই বাড়িকে অভিশপ্ত করে তুলেছিল।

রাত বারোটা বাজল।

দূরে ঘড়ির ঘণ্টা শোনা গেল।

অদিতি জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে পূর্ণিমার আলোয় বাগান স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উত্তর ঘরের জানলা খোলা। পর্দা বাতাসে নড়ছে।

হঠাৎ তার মনে হলো, ঘরের ভেতর কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

একটি ছোট্ট মেয়ে।

সাদা ফ্রক, চুলে লাল ফিতে।

অদিতি চোখ কুঁচকে তাকাল।

মেয়েটি ধীরে ধীরে হাসল। তারপর হাত তুলে বিদায় জানাল।

পরের মুহূর্তেই ঘরটি ফাঁকা।

অদিতি জানলা বন্ধ করল না।

সে জানত, হয়তো সেটা তার শৈশবের স্মৃতি, হয়তো দীর্ঘদিনের ভয়ের শেষ প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এবার সে আর ভয় পেল না।

কারণ সে নিজের নাম ফিরে পেয়েছে। নিজের পরিবারকে ফিরে পেয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, সত্যিটাকে আর কেউ অন্ধকার ঘরে আটকে রাখতে পারবে না।

পরদিন সকালে মুখার্জিবাড়ির সদর দরজা খুলে দেওয়া হলো। বহু বছর পর বাড়ির উঠোনে মানুষের হাসির শব্দ শোনা গেল। বাগানে নতুন গাছ লাগানো হলো। পুরোনো ঘরগুলো পরিষ্কার করা হলো।

দেওয়ালের শেষ ছবিটি নামিয়ে আনার সময় অদিতি ছবির পেছনে ছোট্ট একটি লেখা দেখতে পেল।

‘যে বাড়িতে প্রতি রাতে একজন মারা যায়, সেই বাড়িতে একদিন সত্যি জন্ম নেয়।’

অদিতি ছবিটি বুকের কাছে ধরে রাখল।

এই বাড়িতে আর কোনও মিথ্যে মৃত্যু হবে না।

আর কোনও শিশুকে নিজের পরিচয় হারিয়ে বাঁচতে হবে না।

সেই রাতের পর থেকে মুখার্জিবাড়িতে কেউ আর কান্নার শব্দ শোনেনি।

তবে গ্রামের মানুষ আজও বলে, পূর্ণিমার রাতে উত্তর ঘরের জানলা দিয়ে কখনও কখনও দুটি ছোট্ট মেয়েকে দেখা যায়। তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, হাত ধরে হাসে, তারপর আলোয় মিলিয়ে যায়।

কেউ জানে না, সেটা সত্যি, নাকি গল্প।

অদিতি শুধু জানে—যে বাড়িকে সবাই অভিশপ্ত বলত, সেই বাড়িই তাকে শিখিয়েছে, মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার হলো মিথ্যে পরিচয়। আর সেই কারাগারের দরজা খুলতে পারে একমাত্র সত্যি।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *