Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (দ্বিতীয় পর্ব: জন্মের রাতে বদলে যাওয়া জীবন)।

জমিদারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিয়াসার মনে হচ্ছিল, তার পায়ের নীচের মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

ফোনটা এখনও তার হাতে। স্ক্রিনে মায়ের নাম নেই, কোনও কলও নেই। অথচ কয়েক সেকেন্ড আগেই সে নিজের মায়ের গলা শুনেছে। সেই গলা, যে গলায় ছোটবেলায় ঘুম পাড়ানোর গান শুনত সে। যে গলা তাকে অসুস্থ হলে সারা রাত জেগে আগলে রাখত। যে গলা আজ বলেছে, তিয়াসার জন্মের রাতে হাসপাতালে দুটো মেয়ে জন্মেছিল।

কিন্তু তিয়াসা তো জানে, সে একমাত্র সন্তান।

তার জন্মের সময় কোনও যমজ বোন ছিল না। অন্তত তার মা-বাবা তাকে কখনও এমন কিছু বলেননি।

“আমাকে সব খুলে বলো,” তিয়াসা নন্দিতার হাত চেপে ধরে বলল। “আমার জন্মের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?”

নন্দিতা একবার বাড়িটার দিকে তাকাল। দোতলার জানালায় দাঁড়ানো বৃদ্ধাটি আর নেই। আলোটাও নিভে গেছে। চারদিকে আবার সেই ঘন অন্ধকার।

“এখানে দাঁড়িয়ে সব বলা যাবে না,” নন্দিতা বলল। “আমাদের ভিতরে যেতে হবে।”

“কিন্তু ভিতরে তো তোমার বাবা আছেন। তিনি তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন!”

“যে মানুষটা ভিতরে আছেন, তিনি আমার বাবা কি না, সেটাই তো জানি না।”

তিয়াসা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

নন্দিতা শান্ত গলায় বলল, “বারো বছর ধরে আমি এই বাড়িতে ফিরে আসি। প্রত্যেক বছর একই রাতে। আর প্রত্যেক বছর কেউ না কেউ আমাকে দেখে ফেলে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, পরদিন সকালে কেউ আমার কথা মনে রাখতে পারে না। শুধু আমার বাবা মনে রাখেন। আর তিনি আমাকে দেখলেই বলেন, আমি যেন আর কখনও ফিরে না আসি।”

“তাহলে তুমি বারবার ফিরে আসো কেন?”

“কারণ, আমার মাকে খুঁজে পাইনি।”

নন্দিতার চোখে জল চিকচিক করছিল।

“আমি জানি, মা এই বাড়ির কোথাও আছেন। কিন্তু তাঁকে খুঁজে বের করার আগেই প্রতিবার রাত শেষ হয়ে যায়। আর ভোর হওয়ার আগে আমাকে চলে যেতে হয়।”

“কেন?”

নন্দিতা উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সদর দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

কেউ দরজা খোলেনি।

তবু দরজাটা এমনভাবে খুলল, যেন ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

ভিতর থেকে ভেসে এল বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ।

“তিয়াসা, ভিতরে এসো। তোমার জন্য অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছি।”

তিয়াসার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে কখনও এই মানুষটির সঙ্গে দেখা করেনি। তবু কণ্ঠটা তার কাছে অদ্ভুত পরিচিত লাগছিল। যেন বহু বছর আগে কোনও স্বপ্নে এই গলা শুনেছিল।

নন্দিতা তার হাত ধরে বলল, “একটা কথা মনে রাখবেন। ভিতরে যা-ই দেখুন, কাউকে বিশ্বাস করবেন না।”

“তোমাকেও না?”

নন্দিতা একটু থেমে বলল, “বিশেষ করে আমাকে।”

তারপর দুজনে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।


জমিদারবাড়ির ভিতরটা বাইরে থেকে আরও ভয়ংকর।

দেয়ালের পুরোনো ছবিগুলোর মুখ অন্ধকারে অস্পষ্ট। কোথাও কোথাও দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। মেঝের উপর ধুলোর পুরু স্তর, অথচ তার মাঝখানে দেখা যাচ্ছে সদ্য তৈরি হওয়া কয়েকটি পায়ের ছাপ।

পায়ের ছাপগুলো ছোট। যেন কোনও শিশুর।

তিয়াসা ঝুঁকে ভালো করে দেখতে গেল।

“ওগুলো ছুঁবেন না,” নন্দিতা দ্রুত বলল।

“কেন?”

“এই বাড়িতে কোনও শিশু নেই।”

“তাহলে পায়ের ছাপ কার?”

নন্দিতা উত্তর দিল না।

দুজনেই এগিয়ে গেল সামনের বড় হলঘরের দিকে।

হলঘরের মাঝখানে একটি লম্বা টেবিল। টেবিলের উপর সাজানো ছয়টি থালা, ছয়টি গ্লাস এবং ছয়টি মোমবাতি। ছয়টি চেয়ারের মধ্যে পাঁচটিতে কেউ বসে নেই। শেষ চেয়ারটিতে বসে আছেন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ।

তাঁর চুল সাদা, মুখে গভীর বলিরেখা। ডান হাতে একটি রুপোর আংটি।

তিয়াসাকে দেখেই তিনি মৃদু হাসলেন।

“এসেছ, মা?”

তিয়াসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধ বললেন, “আমি শশাঙ্ক রায়। এই বাড়ির কর্তা। আর নন্দিতার বাবা।”

নন্দিতা হঠাৎ বলে উঠল, “মিথ্যে কথা!”

বৃদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“আবার শুরু করলি?”

“তুমি আমার বাবা নও!”

“তাহলে কে আমি?”

নন্দিতা কাঁপা গলায় বলল, “সেটা তুমিই সবচেয়ে ভালো জানো।”

বৃদ্ধ এবার তিয়াসার দিকে তাকালেন।

“দেখলে, মা? বারো বছর ধরে এই মেয়েটা আমাকে একই কথা বলে যাচ্ছে। নিজের বাবাকে চিনতে পারছে না।”

তিয়াসা ধীরে ধীরে বলল, “আপনি আমাকে চেনেন?”

“খুব ভালো করে চিনি।”

“কীভাবে?”

বৃদ্ধ টেবিলের উপর রাখা একটি পুরোনো খাম তুলে তার দিকে এগিয়ে দিলেন।

“এই চিঠিটা তোমার জন্য। তোমার জন্মের ঠিক তিন দিন পর লেখা হয়েছিল। কিন্তু তোমার কাছে পৌঁছতে বারো বছর দেরি হয়ে গেল।”

তিয়াসা খামটি খুলল।

ভিতরে একটি হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ। কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি লাইন।

‘যে মেয়েটিকে তুমি নিজের সন্তান বলে বড় করছ, সে তোমার নয়। তোমার প্রকৃত সন্তানকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর যে শিশুটিকে তুমি নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিচ্ছ, তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক অপরাধ, যার শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না।’

চিঠির নীচে কোনও নাম নেই।

শুধু একটি তারিখ।

সেই তারিখটি তিয়াসার জন্মের তিন দিন পরের।

তিয়াসা কাগজটা শক্ত করে ধরে বলল, “এটা কে লিখেছে?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “যে মানুষটা তোমার জন্মের রাতে হাসপাতালে ছিল।”

“সে কে?”

“তোমার বাবা।”

তিয়াসা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

“আমার বাবা তো জীবিত। তিনি কলকাতায় আছেন।”

“যাঁকে তুমি বাবা বলে জানো, তিনি তোমাকে বড় করেছেন। কিন্তু তোমার জন্মদাতা অন্য কেউ।”

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

“না। এটা মিথ্যে। আপনারা সবাই মিলে আমাকে পাগল করে দিতে চাইছেন।”

নন্দিতা এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।

“তিয়াসা, চিঠিটা উল্টে দেখো।”

তিয়াসা চিঠিটি উল্টে দিল।

পিছনে লাল কালিতে লেখা একটি নাম।

অমিতাভ সেন।

তার বাবার নাম।


তিয়াসার মনে পড়ল, ছোটবেলায় একবার সে বাবার পুরোনো আলমারিতে একটি ছবি পেয়েছিল। ছবিতে তার বাবা এক অচেনা মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মহিলার কোলে একটি নবজাতক শিশু।

সে ছবিটি মাকে দেখাতে গিয়েছিল।

মা ছবিটা দেখেই অস্বাভাবিক রেগে গিয়ে বলেছিলেন, “ওটা পুরোনো ছবি। ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবি না।”

পরদিন থেকে ছবিটা আর কোথাও পাওয়া যায়নি।

তিয়াসা এত বছর ঘটনাটা ভুলেই গিয়েছিল।

আজ সেই স্মৃতি হঠাৎ ফিরে এল।

“আমার বাবার সঙ্গে এই বাড়ির কী সম্পর্ক?” সে প্রশ্ন করল।

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “বারো বছর আগে তোমার বাবা এই বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তোমার মা।”

“আমার মা?”

“হ্যাঁ। মধুমিতা সেন।”

তিয়াসার বুকের ভিতর ধক করে উঠল।

তার মায়ের নাম সত্যিই মধুমিতা।

বৃদ্ধ বলতে লাগলেন, “সেদিন রাতে এই বাড়িতে একটি শিশু জন্মেছিল। সেই শিশুটির জন্মদাত্রী ছিল মাধুরী রায়। কিন্তু শিশুটিকে পৃথিবীর আলো দেখানোর পরই সে মারা যায় বলে ঘোষণা করা হয়। তার কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতালে জন্ম হয় আরেকটি মেয়ের। সেই শিশুটিকে নিয়ে এসেছিলেন তোমার বাবা।”

“কিন্তু কেন?”

“কারণ, দুই পরিবারের মধ্যে এমন একটি গোপন চুক্তি হয়েছিল, যার কথা কেউ জানত না।”

“কী চুক্তি?”

বৃদ্ধের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“একটি শিশুর বদলে আরেকটি শিশুকে বড় করা হবে। একজনকে দেওয়া হবে সম্পদ, পরিচয় এবং নিরাপত্তা। অন্যজনকে দেওয়া হবে এমন এক জীবন, যেখানে সত্য জানার কোনও অধিকার থাকবে না।”

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

“আপনি বলতে চাইছেন, আমি অন্য কারও সন্তান?”

“আমি বলছি, তোমার জন্মের সত্যিটা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।”

তিয়াসা চেয়ারের উপর বসে পড়ল।

তার মাথার ভিতরে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।

যদি এই বৃদ্ধের কথা সত্যি হয়, তবে তার বাবা-মা এত বছর ধরে তাকে কী বলে বড় করেছেন? তার নিজের পরিচয় কি মিথ্যে? আর নন্দিতাই বা কেন তাকে এখানে ডেকেছে?

সে নন্দিতার দিকে তাকাল।

“তুমি আমার কে?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি তোমার বোন।”

হলঘরের সমস্ত মোমবাতি একসঙ্গে নিভে গেল।


অন্ধকারে তিয়াসা নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।

“কী বললে তুমি?”

নন্দিতার গলা এবার অনেক কাছে শোনা গেল।

“আমি বলেছি, আমি তোমার বোন।”

“কিন্তু তোমার তো জন্ম বারো বছর আগে! আর আমার বয়স আটাশ!”

“তোমার বয়স আটাশ, কারণ তোমাকে যে জন্মতারিখ বলা হয়েছে, সেটা সত্যি নয়।”

তিয়াসা উঠে দাঁড়াল।

“তুমি কীভাবে জানো?”

নন্দিতা বলল, “কারণ, আমার জন্মের দিনই তোমার জন্ম হয়েছিল।”

তিয়াসা চিৎকার করে উঠল, “তাহলে আমি এত বছর কোথায় ছিলাম? আমার শৈশব, আমার স্কুল, আমার কলেজ— সব কি মিথ্যে?”

“না। তোমার স্মৃতিগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু তোমার জন্মের ইতিহাস বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

“কে বদলেছিল?”

কোনও উত্তর এল না।

কয়েক মুহূর্ত পরে একটি দেশলাই জ্বলে উঠল।

আলোর ক্ষীণ শিখায় দেখা গেল, বৃদ্ধ শশাঙ্ক রায় আর চেয়ারে বসে নেই।

তিনি দাঁড়িয়ে আছেন হলঘরের অন্য প্রান্তে। তাঁর হাতে একটি পুরোনো চাবি।

“তোমরা সত্য জানতে চাও?” তিনি বললেন। “তাহলে আমার সঙ্গে এসো।”

তিনি হলঘরের পিছনের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখানে একটি বড় কাঠের আলমারি। বৃদ্ধ আলমারিটি সরাতেই দেখা গেল, দেওয়ালের ভিতরে লুকোনো একটি ছোট দরজা।

দরজায় তিনটি তালা।

বৃদ্ধ একে একে তিনটি তালা খুললেন।

দরজার ওপাশে ছিল সরু সিঁড়ি, যা নীচের দিকে নেমে গেছে।

ভিতর থেকে ভেসে আসছিল অস্পষ্ট কান্নার শব্দ।

তিয়াসার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

“ওখানে কে আছে?”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না।

নন্দিতা পিছিয়ে গেল। তার মুখে এবার সত্যিকারের ভয়।

“না,” সে ফিসফিস করে বলল। “আপনি ওকে এখানে আনতে পারেন না।”

বৃদ্ধ ঘুরে তাকালেন।

“কেন? তুই তো এত বছর ধরে ওকেই খুঁজছিলি।”

“কিন্তু ওকে যদি সব সত্যি জানানো হয়, তাহলে—”

“তাহলে কী হবে?”

নন্দিতা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তাহলে ও বুঝতে পারবে, বারো বছর আগে যে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সে আমি নই।”

তিয়াসার শরীর অবশ হয়ে গেল।

“তার মানে?”

নন্দিতা চোখ বন্ধ করল।

“বারো বছর আগে নয়, তিয়াসা। আমি জন্মেছিলাম আটাশ বছর আগে। আর আমার মৃত্যু হয়েছিল বারো বছর আগে— এই বাড়িতেই।”

তিয়াসা কিছু বলার আগেই নীচের ঘর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

“নন্দিতা… তুই আবার এসেছিস?”

নন্দিতার মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।

“মা!”

সে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। তিয়াসাও তার পিছনে এগোল।

কিন্তু বৃদ্ধ শশাঙ্ক রায় হঠাৎ তিয়াসার হাত চেপে ধরলেন।

“এক পা-ও এগোবে না!”

তিয়াসা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।

“আমাকে ছাড়ুন!”

বৃদ্ধ তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, “তুই যদি নীচে নামিস, তাহলে তোর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা জানতে পারবি। কিন্তু সেই সত্য জানার পর তুই আর কখনও নিজের মাকে মা বলে ডাকতে পারবি না।”

তিয়াসার চোখ ভিজে উঠল।

“আপনি আমার মাকে চেনেন?”

বৃদ্ধের ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি ফুটল।

“চিনি? আমি তো তাঁকে নিজের হাতে—”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নীচের ঘর থেকে একটি বিকট শব্দ হল।

তারপর সব চুপ।

তিয়াসা ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল।

ঘরটা ছোট। দেওয়ালে কোনও জানালা নেই। মাঝখানে একটি কাঠের খাট। খাটের উপর বসে আছেন একজন মহিলা, তাঁর চুল সাদা হয়ে গেছে, চোখে গভীর ক্লান্তি।

তিয়াসা তাঁকে দেখেই থমকে দাঁড়াল।

মহিলার মুখ অবিকল তার নিজের মায়ের মতো।

কিন্তু এ মুখের সঙ্গে আরও একটি মুখের মিল রয়েছে।

নন্দিতার মুখ।

মহিলাটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“তিয়াসা?”

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কে?”

মহিলার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি মাধুরী রায়। নন্দিতার মা।”

“কিন্তু আপনি তো বারো বছর আগে মারা গিয়েছিলেন!”

মাধুরী মাথা নাড়লেন।

“না, মা। আমি মরিনি। আমাকে সবাই মৃত বলে মেনে নিয়েছিল।”

তিনি তিয়াসার হাত ধরলেন।

“তুই এখানে কেন এসেছিস, জানি না। কিন্তু তোকে একটা কথা বলতেই হবে। তোর মা-বাবা তোকে ভালোবেসে বড় করেছেন, এটা সত্যি। কিন্তু তাঁরা তোকে যে পরিচয় দিয়েছেন, সেটা সত্যি নয়।”

তিয়াসা কেঁদে ফেলল।

“তাহলে আমার আসল মা কে?”

মাধুরী উত্তর দেওয়ার আগেই সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ানো বৃদ্ধ শশাঙ্ক রায় বললেন—

“আমি বলছি।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নীচে নেমে এলেন। তাঁর হাতে একটি পুরোনো ছবির অ্যালবাম।

তিনি অ্যালবাম খুলে একটি ছবি তিয়াসার হাতে দিলেন।

ছবিতে দুই তরুণী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একজন মাধুরী রায়। অন্যজন অচেনা এক মহিলা।

ছবির পিছনে লেখা—

‘মধুমিতা ও মাধুরী— দুই বোন, এক সন্তানকে ঘিরে দুই জীবনের প্রতিশ্রুতি।’

তিয়াসা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

“মধুমিতা… আমার মা?”

মাধুরী চোখ নামিয়ে নিলেন।

“হ্যাঁ। মধুমিতা আমার যমজ বোন ছিল।”

তিয়াসার মাথা ঘুরে উঠল।

তার মা মধুমিতা সেন, যিনি তাকে এত বছর ধরে নিজের সন্তান বলে বড় করেছেন, তিনি এই মহিলার যমজ বোন!

তাহলে নন্দিতা তার কে?

আর জন্মের রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?

মাধুরী তিয়াসার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন, “তোর জন্মের রাতে দুটো মেয়ে জন্মেছিল। একজন তুই। অন্যজন নন্দিতা। কিন্তু আমাদের পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য আমরা দুজনেই নিজেদের সন্তানকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম।”

“কী ঘটনা?”

মাধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে তিয়াসার মনে হল, পৃথিবীর সব আলো এক মুহূর্তে নিভে গেছে।

“তোর জন্মের রাতে নন্দিতা হারিয়ে যায়নি। তুই হারিয়ে গিয়েছিলি।”

তিয়াসা পিছিয়ে গেল।

“না! এটা হতে পারে না!”

মাধুরী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তোর বয়স যখন ষোলো দিন, তখন তোকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মধুমিতা ভেবেছিল, তার নিজের সন্তান মারা গেছে। আর আমি ভেবেছিলাম, আমার সন্তানকে কেউ চুরি করেছে। আমরা কেউ জানতাম না, একই শিশুকে নিয়ে দুটো আলাদা গল্প তৈরি করা হয়েছে।”

“কে করেছিল এসব?”

মাধুরী মুখ তুলে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ানো বৃদ্ধের দিকে তাকালেন।

“ও।”

তিয়াসা ধীরে ধীরে শশাঙ্ক রায়ের দিকে তাকাল।

বৃদ্ধের মুখে কোনও অনুশোচনা নেই।

তিনি শুধু বললেন, “সব সত্য একসঙ্গে জানার দরকার নেই, তিয়াসা। কিছু সত্য মানুষকে বাঁচায়, আর কিছু সত্য মানুষকে শেষ করে দেয়।”

তারপর তিনি পকেট থেকে একটি ছোট রুপোর চাবি বের করলেন।

“এটা নে। তোর জন্মের আসল নথি এই বাড়ির ভিতরেই আছে।”

তিয়াসা চাবিটি নিল।

“কোথায়?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “যে ঘরে বারো বছর আগে তোর মৃত্যু হয়েছিল।”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির উপরের তলা থেকে তিনবার ঘণ্টা বেজে উঠল।

ঢং… ঢং… ঢং…

মাধুরী আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন।

“না! আবার শুরু হল!”

নন্দিতা তিয়াসার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের এখনই পালাতে হবে।”

“কিন্তু নথি?”

“নথি আর কখনও খুঁজে পাবে না, যদি ভোর হয়ে যায়।”

তিয়াসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল।

দেওয়ালে টাঙানো একটি বড় আয়নায় সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল।

কিন্তু আয়নায় তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরও একটি মেয়ে।

মেয়েটির মুখ অবিকল তিয়াসার মতো।

শুধু তার গলায় দড়ির দাগ।

আর আয়নার ভিতরের সেই মেয়েটি ঠোঁট নাড়িয়ে বলছে—

‘তুই আমার জীবন নিয়ে বেঁচে আছিস।’

তিয়াসা ঘুরে দাঁড়াল।

তার পাশে কেউ নেই।

কিন্তু আয়নার ভিতরের মেয়েটি এবার হাসল।

তারপর নিজের গলা থেকে রক্তমাখা একটি নূপুর খুলে আয়নার ওপারে ছুড়ে দিল।

নূপুরটি আয়নার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে মেঝেতে পড়ল।

ঝনঝন করে বেজে উঠল রাতের নীরবতা।

আর ঠিক তখনই তিয়াসার ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।

প্রেরক— অমিতাভ সেন, তার বাবা।

বার্তায় লেখা—

‘তিয়াসা, তুমি যদি রায়বাড়িতে পৌঁছে থাকো, তাহলে নন্দিতাকে খুঁজবে না। কারণ, নন্দিতা বারো বছর আগে মারা যায়নি। সে আজও বেঁচে আছে। আর সে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে নেই।’

তিয়াসা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে নন্দিতার দিকে তাকাল।

নন্দিতা তখনও তার হাত ধরে আছে।

কিন্তু তার হাত বরফের মতো ঠান্ডা।

আর তার পায়ের নীচে…

কোনও ছায়া নেই।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *