Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (তৃতীয় পর্ব: যার কোনও ছায়া নেই)।

তিয়াসা কিছুক্ষণ নন্দিতার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার হাতে তখনও ফোনটা ধরা। স্ক্রিনে বাবার পাঠানো বার্তাটি জ্বলজ্বল করছে।

‘নন্দিতা বারো বছর আগে মারা যায়নি। সে আজও বেঁচে আছে। আর সে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে নেই।’

কিন্তু নন্দিতা তো তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে!

তার হাত ধরে আছে। তার সঙ্গে কথা বলছে। এমনকি কয়েক মুহূর্ত আগেও সে তিয়াসাকে এই বাড়ির গোপন ঘরে নিয়ে এসেছে।

তাহলে তার বাবার কথার অর্থ কী?

তিয়াসা ধীরে ধীরে নন্দিতার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল।

“তুমি কে?”

নন্দিতা কোনও উত্তর দিল না।

“আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি। তুমি কে?”

মেয়েটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার লম্বা চুল মুখের উপর এসে পড়েছে। সাদা শাড়ির আঁচল মেঝেতে লুটিয়ে আছে। অথচ তার পায়ের নীচে কোনও ছায়া নেই।

তিয়াসার বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল।

“তুমি কি সত্যিই নন্দিতা?”

নন্দিতা ধীরে ধীরে মুখ তুলল।

তার চোখে জল।

“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?”

“আমি কাকে বিশ্বাস করব, নন্দিতা? আমার বাবা বলছেন তুমি মৃত। তোমার মা বলছেন তুমি তাঁর মেয়ে। আর এই বাড়ির লোকেরা এমন সব কথা বলছে, যা আমার মাথায় ঢুকছে না!”

নন্দিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও আমি কে, তাহলে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“যেখানে আমার মৃত্যু হয়েছিল।”

তিয়াসা পিছিয়ে গেল।

“তুমি নিজেই তো বলেছিলে, তোমার মৃত্যু হয়েছিল বারো বছর আগে!”

নন্দিতার মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটল।

“আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু কখনও বলিনি, যে মেয়েটিকে সবাই নন্দিতা বলে চিনত, তার মৃত্যু হয়েছিল।”

তিয়াসা আর কোনও কথা বলতে পারল না।

ঠিক তখনই নীচের ঘরের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

মাধুরী রায় চিৎকার করে উঠলেন, “তিয়াসা, ওর সঙ্গে যাস না! ও তোকে যেখানে নিয়ে যাবে, সেখান থেকে আর ফিরতে পারবি না!”

নন্দিতা একবারও পিছন ফিরে তাকাল না।

সে শুধু তিয়াসার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “চলো।”

তিয়াসা জানত, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ।

এক, এই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া।

দুই, নিজের জীবনের সত্যিটা জানার জন্য অন্ধকারের ভিতরে এগিয়ে যাওয়া।

সে দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিল।


জমিদারবাড়ির পিছনে একটা পুরোনো পুকুর ছিল। চারদিকে বিশাল গাছ, ভাঙা ঘাট আর শ্যাওলা জমে থাকা পাথরের সিঁড়ি। গ্রামের লোকেরা পুকুরটাকে বলত ‘মৃত্যুপুকুর’।

কথিত আছে, বারো বছর আগে এই পুকুরেই ডুবে মারা গিয়েছিল নন্দিতা রায়।

তিয়াসা পুকুরের ধারে এসে দাঁড়াতেই নন্দিতা বলল, “এই পুকুরের জল কখনও শুকোয় না।”

“এতে আশ্চর্যের কী আছে?”

“আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই পুকুরে যে একবার নিজের মুখ দেখে, সে নিজের আসল মুখ দেখতে পায় না।”

তিয়াসা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি কি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছ?”

নন্দিতা মাথা নাড়ল।

“না। আমি চাই তুমি নিজের চোখে সত্যিটা দেখো।”

সে পুকুরের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। তিয়াসাও তার পিছনে এগোল।

জলের উপর ঘন কুয়াশা ভাসছে। আশপাশে কোনও বাতাস নেই, তবু জলের উপর ছোট ছোট ঢেউ উঠছে।

নন্দিতা হাঁটু গেড়ে বসল।

“জলের দিকে তাকাও।”

তিয়াসা নিচু হয়ে জলের দিকে তাকাল।

প্রথমে সে নিজের মুখ দেখতে পেল। তারপর সেই মুখটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি হাসপাতালের ঘর। সাদা দেওয়াল, নীল পর্দা, বিছানায় শুয়ে থাকা এক তরুণী। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন চিকিৎসক।

একজনের কোলে একটি নবজাতক।

অন্যজনের হাতে আরেকটি শিশু।

তিয়াসা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

তারপর সে দেখল, ঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকছেন তার বাবা অমিতাভ সেন।

তাঁর সঙ্গে একজন অপরিচিত পুরুষ।

অপরিচিত পুরুষটির হাতে একটি কালো ব্যাগ।

অমিতাভ শিশুটিকে কোলে নিয়ে বললেন, “কেউ যেন জানতে না পারে, কোন শিশুটি কার।”

তিয়াসার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

জলের মধ্যে দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হল।

একজন নার্স কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, “এটা অন্যায়! একটা শিশুর পরিচয় এভাবে বদলে দেওয়া যায় না!”

অমিতাভ তাঁর দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন, “তুমি যা দেখেছ, তা ভুলে যাও। নইলে তোমার নিজের সন্তানকে আর কোনও দিন দেখতে পাবে না।”

তারপর দৃশ্যটা অন্ধকার হয়ে গেল।

তিয়াসা আতঙ্কে পিছিয়ে এল।

“এটা কী দেখলাম আমি?”

নন্দিতা বলল, “তোমার জন্মের রাত।”

“কিন্তু আমার বাবা এমন করতে পারেন না!”

“তুমি কি নিশ্চিত, তুমি তোমার বাবাকে সত্যিই চেনো?”

তিয়াসা উত্তর দিতে পারল না।

তার চোখে তখনও হাসপাতালের সেই দৃশ্য ভাসছে।

“দুটো শিশুর পরিচয় বদলানো হয়েছিল কেন?”

নন্দিতা পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ, একজনকে বাঁচানোর জন্য অন্যজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”

“কাকে বাঁচানোর জন্য?”

নন্দিতা ধীরে ধীরে তিয়াসার দিকে তাকাল।

“তোমাকে।”


ঠিক সেই সময় পুকুরের অন্য প্রান্ত থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।

তিয়াসা ঘুরে তাকাল।

একজন বৃদ্ধা হাতে লণ্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পরনে মলিন শাড়ি, মাথার চুল প্রায় সাদা। মুখে গভীর ক্ষতচিহ্ন।

তিনি তিয়াসাকে দেখেই বললেন, “অমিতাভবাবুর মেয়ে?”

তিয়াসা সতর্ক হয়ে দাঁড়াল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, “আমি সরলা। বারো বছর আগে এই বাড়িতে কাজ করতাম।”

নন্দিতা বৃদ্ধাকে দেখে পিছিয়ে গেল।

“তুমি এখানে কেন এসেছ?”

সরলা তীক্ষ্ণ চোখে নন্দিতার দিকে তাকালেন।

“তোর জন্যই তো এত বছর অপেক্ষা করছি।”

“আমাকে কী বলতে চাও?”

“সত্যিটা।”

নন্দিতা মুখ ফিরিয়ে নিল।

সরলা এবার তিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, তুমি যা দেখেছ, তার সবটা সত্যি নয়। এই পুকুর শুধু অতীত দেখায় না, মানুষের ভয়কেও ছবি করে তোলে। যে দৃশ্য তোমার সামনে এসেছে, তার মধ্যে সত্যি আছে, আবার মিথ্যেও আছে।”

তিয়াসা হতভম্ব হয়ে গেল।

“তাহলে আমি কীভাবে সত্যিটা জানব?”

সরলা লণ্ঠনটা উঁচু করে ধরলেন।

“এই বাড়ির পশ্চিম দিকের ঘরে একটা পুরোনো রেজিস্টার আছে। সেখানে হাসপাতালের সব হিসাব লেখা। দুটো শিশুর জন্ম, একজনের মৃত্যু, আরেকজনের নিখোঁজ হওয়ার বিবরণ। কিন্তু রেজিস্টারটা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।”

“কেন?”

সরলা উত্তর দেওয়ার আগেই নন্দিতা বলে উঠল, “কারণ, সেটা আমার কাছে।”

তিয়াসা তার দিকে তাকাল।

“তাহলে এতক্ষণ আমাকে বলোনি কেন?”

নন্দিতা ঠোঁট কামড়ে ধরল।

“কারণ, ওই রেজিস্টারে এমন একটা নাম আছে, যেটা তুমি দেখতে চাইবে না।”

“কার নাম?”

নন্দিতা চোখ বন্ধ করল।

“তোমার মায়ের।”


রাত তখন প্রায় দুটো।

তিনজনে ফিরে এল জমিদারবাড়িতে। সরলা তাদের নিয়ে গেলেন পশ্চিম দিকের একটি ছোট ঘরে। ঘরটা বহু বছর ধরে বন্ধ। দরজা খুলতেই ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধে ভরে গেল চারপাশ।

ঘরের এক কোণে একটি কাঠের আলমারি। তার ভিতরে পুরোনো নথিপত্র, কয়েকটি ছবি এবং একটি লাল কাপড়ে মোড়া খাতা।

নন্দিতা খাতাটা বের করে টেবিলের উপর রাখল।

“এই সেই রেজিস্টার।”

তিয়াসা কাঁপা হাতে খাতা খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতায় হাসপাতালের সাধারণ হিসাব। তারপর একটি পাতায় এসে তার চোখ আটকে গেল।

তারিখ— ১৭ অক্টোবর।

সময়— রাত ২টা ১৫ মিনিট।

প্রথম শিশুর জন্ম।

মায়ের নাম— মাধুরী রায়।

শিশুর নাম— নন্দিতা।

এর ঠিক বারো মিনিট পরের এন্ট্রি।

দ্বিতীয় শিশুর জন্ম।

মায়ের নাম— মধুমিতা সেন।

শিশুর নাম— তিয়াসা।

তিয়াসা অবাক হয়ে বলল, “আমার জন্ম তো ১৭ অক্টোবর নয়!”

তার মনে পড়ল, তার জন্মদিন পালন করা হয় ২৩ নভেম্বর।

সরলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার জন্মদিন বদলে দেওয়া হয়েছিল, মা। তোমার আসল জন্মতারিখ কেউ জানতে পারুক, সেটা তাঁরা চাননি।”

তিয়াসা পাতাটা উল্টে দিল।

পরের পাতায় লাল কালিতে লেখা—

‘দ্বিতীয় শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হল।’

নিচে একটি স্বাক্ষর।

ডাক্তার দেবাশিস মুখার্জি।

তিয়াসার হাত কেঁপে উঠল।

“কিন্তু এখানে তো লেখা আছে, দ্বিতীয় শিশুটি মৃত!”

সরলা বললেন, “সেটাই ছিল প্রথম মিথ্যে।”

“তার মানে?”

“দ্বিতীয় শিশুটি বেঁচে ছিল। কিন্তু তাকে মৃত ঘোষণা করে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।”

তিয়াসা এবার নন্দিতার দিকে তাকাল।

“সেই শিশুটি কে?”

নন্দিতা কিছু বলল না।

তিয়াসা আবার খাতার পাতায় চোখ রাখল।

পরের পাতায় একটি নাম লেখা ছিল।

মধুমিতা সেন— শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে গ্রহণ করলেন।

তার নীচে আরেকটি লাইন।

‘প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখার দায়িত্ব নিলেন অমিতাভ সেন।’

তিয়াসার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমার বাবা-মা জানতেন?”

সরলা মাথা নাড়লেন।

“তোমার বাবা জানতেন। তোমার মা কী জানতেন, সেটা আমি বলতে পারব না।”

“কেন?”

“কারণ, এই চুক্তির তিন দিন পর মধুমিতা সেন নিখোঁজ হয়ে যান।”

তিয়াসার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

“কী বললেন?”

“তোমার মা বারো বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন। যে মহিলাকে তুমি মা বলে চিনছ, তিনি তোমাকে বড় করেছেন। কিন্তু তিনি সত্যিই তোমার জন্মদাত্রী কি না, তার প্রমাণ এই রেজিস্টারে নেই।”

তিয়াসা মাথা নাড়তে লাগল।

“না। আমি আমার মাকে চিনি। তিনি আমাকে ভালোবাসেন। তিনি আমার মা।”

সরলা মৃদু গলায় বললেন, “ভালোবাসা আর জন্ম— দুটো আলাদা বিষয়, মা।”

তিয়াসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে চেয়ারে বসে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।

ঠিক তখনই ঘরের বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।

একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

“তিয়াসা!”

সে মাথা তুলে তাকাল।

দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন অমিতাভ সেন।

তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক।

“বাবা!”

তিয়াসা ছুটে তাঁর কাছে গেল। কিন্তু অমিতাভ তাকে জড়িয়ে ধরলেন না। তিনি সরাসরি টেবিলের উপর রাখা রেজিস্টারটির দিকে তাকালেন।

“এটা তোদের কে দিয়েছে?”

সরলা সামনে এগিয়ে এলেন।

“যে সত্যি এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই সত্যিই আজ নিজেকে প্রকাশ করছে।”

অমিতাভের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“আপনি জানেন না, আপনি কী করছেন।”

সরলা শান্ত গলায় বললেন, “আমি জানি। বারো বছর আগে আপনি যে মেয়েটিকে নিজের সন্তান বলে নিয়ে গিয়েছিলেন, সে আপনার সন্তান ছিল না।”

তিয়াসা বাবার দিকে তাকাল।

“বাবা, এটা কি সত্যি?”

অমিতাভ চুপ করে রইলেন।

“তুমি কি আমার জন্মতারিখ বদলে দিয়েছিলে?”

নীরবতা।

“তুমি কি জানত, হাসপাতালে দুটো শিশু জন্মেছিল?”

অমিতাভ চোখ বন্ধ করলেন।

“হ্যাঁ।”

একটি শব্দ।

কিন্তু সেই একটি শব্দেই তিয়াসার পৃথিবী ভেঙে গেল।

“কেন?”

অমিতাভ ধীরে ধীরে বললেন, “তোর জীবন বাঁচানোর জন্য।”

“আমার জীবন কে বিপন্ন করেছিল?”

অমিতাভ উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারে একটি মেয়ের হাসি শোনা গেল।

তারপর নন্দিতার কণ্ঠ।

“এবার সত্যিটা বলো, অমিতাভবাবু। বারো বছর আগে কে শিশুটিকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল?”

অমিতাভ কাঁপা গলায় বললেন, “আমি কাউকে মারতে চাইনি।”

“তাহলে হাসপাতালের সেই রাতে তুমি কেন শিশুটিকে বদলে দিয়েছিলে?”

“কারণ, আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল!”

“কে বাধ্য করেছিল?”

অমিতাভ আর উত্তর দিলেন না।

হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে একটা কাচ ভাঙার শব্দ হল।

আলো ফিরে আসতেই সবাই দেখল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।

তার পরনে লাল জামা। চুল ছোট করে কাটা। মুখে তিয়াসার মতোই গড়ন।

কিন্তু মেয়েটির চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।

সে ধীরে ধীরে বলল, “বাবা, তুমি আবার মিথ্যে বলছ।”

অমিতাভের হাত থেকে রেজিস্টার পড়ে গেল।

তিনি পিছিয়ে যেতে যেতে ফিসফিস করে বললেন, “না… তুই এখানে আসতে পারিস না।”

মেয়েটি হাসল।

“কেন? তুমি তো বলেছিলে, আমাকে কেউ কোনও দিন খুঁজে পাবে না।”

তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি তার দিকে তাকাল।

“আমি সেই মেয়ে, যার জন্মদিন তুমি এত বছর ধরে অন্য দিনে পালন করেছ।”

“তাহলে তুমি…”

“আমি তোমার যমজ বোন।”

তিয়াসার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

“কিন্তু নন্দিতা তো বলেছিল, সে আমার বোন!”

মেয়েটি নন্দিতার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।

“ও নন্দিতা নয়, তিয়াসা। ও শুধু নন্দিতার মুখ নিয়ে বেঁচে থাকা একটি স্মৃতি।”

নন্দিতা পিছিয়ে গেল।

প্রথমবারের মতো তার মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠল।

মেয়েটি এবার অমিতাভের দিকে তাকাল।

“বারো বছর আগে তুমি আমাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলে। তারপর আমার মৃত্যুর গল্প বানিয়েছিলে। কিন্তু একটা কথা তুমি ভুলে গিয়েছিলে, বাবা।”

অমিতাভ কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “চুপ কর!”

মেয়েটি আরও কাছে এগিয়ে এল।

“যে শিশুকে তুমি মৃত বলে ঘোষণা করেছিলে, সে কখনও মারা যায়নি।”

তারপর সে তিয়াসার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—

“আমি তোমার যমজ বোন। আমার নাম নন্দিতা নয়।”

এক মুহূর্ত থেমে সে নিজের নাম বলল।

“আমার নাম তৃষা।”

ঘরের ভিতর হঠাৎ তীব্র ঠান্ডা নেমে এল।

তিয়াসা বুঝতে পারল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি হয়তো জীবিত, হয়তো মৃত— কিন্তু সে এমন একটি সত্য জানে, যা এই বাড়ির প্রত্যেক মানুষ এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে।

তৃষা ধীরে ধীরে তিয়াসার দিকে হাত বাড়াল।

“চলো, তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”

“কোথায়?”

“যেখানে আমাদের মা এখনও বেঁচে আছেন।”

তিয়াসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কিন্তু আমার মা তো কলকাতায়!”

তৃষার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি যাঁকে মা বলে ডাকো, তিনি তোমাকে বড় করেছেন। কিন্তু তোমার জন্মদাত্রী মা বারো বছর ধরে এই বাড়ির নীচে বন্দি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে নীচের ঘর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

“তিয়াসা… তৃষা… তোরা দুজনেই কি এসেছিস?”

অমিতাভ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল।

“না… এটা হতে পারে না। আমি তো নিজের হাতে দরজাটা বন্ধ করেছিলাম…”

তিয়াসা ধীরে ধীরে তাঁর দিকে ঘুরল।

“কোন দরজা, বাবা?”

অমিতাভ উত্তর দিলেন না।

তৃষা তিয়াসার হাত ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে তারা দেখল, দেওয়ালের ভিতরে একটি লোহার দরজা।

দরজার গায়ে খোদাই করা আছে দুটি নাম।

তিয়াসা। তৃষা।

আর তার নীচে একটি বাক্য—

‘একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে মরতে হবে।’

দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই নারীকণ্ঠ শোনা গেল।

“তিয়াসা, তৃষাকে বিশ্বাস করিস না!”

তিয়াসা থমকে দাঁড়াল।

কারণ, ঠিক একই সময়ে তার পাশে দাঁড়ানো তৃষা ফিসফিস করে বলল—

“মাকে বিশ্বাস করো না, দিদি। মা বারো বছর আগে আমাদের একজনকে নিজের হাতে মেরে ফেলেছিলেন।”

দরজার ওপাশ থেকে এবার প্রচণ্ড আঘাতের শব্দ এল।

তারপর নীরবতা।

তিয়াসা বুঝতে পারল, সত্যের দরজা খুলতে আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত বাকি।

কিন্তু সেই দরজা খুললে হয়তো সে তার পরিবারকে ফিরে পাবে।

অথবা হারিয়ে ফেলবে চিরদিনের জন্য।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *