Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

নদী : সভ্যতার প্রাণ, প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ।

নদী শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বয়ে চলা জলধারা নয়। নদীকে ঘিরে মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর বহু প্রাচীন সভ্যতার জন্ম হয়েছে নদীর তীরে। নদী মানুষের খাদ্য ও পানীয় জলের উৎস হয়েছে, কৃষিজমিকে উর্বর করেছে, যোগাযোগের পথ তৈরি করেছে এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে নদী প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র, যেখানে অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

ভারতের মতো নদীমাতৃক দেশে নদীর গুরুত্ব আরও গভীর। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য নদী মানুষের জীবন ও ভূপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। গঙ্গা, দামোদর, রূপনারায়ণ, কংসাবতী, সুবর্ণরেখা, অজয়, ময়ূরাক্ষীসহ বহু নদী বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

নদীর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো কৃষি। কৃষিনির্ভর সমাজে জল ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। নদীর জল সেচের কাজে ব্যবহৃত হয় এবং নদীর অববাহিকার মাটি অনেক ক্ষেত্রেই কৃষির জন্য উপযোগী। বর্ষাকালে নদীর জল ও পলিমাটি বহু অঞ্চলের জমিকে উর্বর করতে সাহায্য করেছে। ফলে নদী শুধু জল দেয় না, খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

নদীর সঙ্গে মানুষের পানীয় জলের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও নদীর জল সরাসরি পান করার আগে যথাযথ শোধন প্রয়োজন, তবু বহু অঞ্চলে নদী বৃহৎ জল সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম উৎস। নদী থেকে জল নিয়ে পরিশোধন করে শহর ও গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। তাই নদীর জলদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নদী বহু মানুষের জীবিকার উৎস। জেলেরা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নদীকে কেন্দ্র করে নৌপরিবহন, পর্যটন, কৃষি, বালু ও অন্যান্য বৈধ প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক কাজও বহু মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। নদীর ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলোর কাছে নদী শুধু প্রকৃতির দৃশ্য নয়; নদী তাদের জীবনের অংশ।

নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। নদীর তীরে বহু প্রাচীন শহর, মন্দির, ঘাট ও জনপদ গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সঙ্গেও নদীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও নদীর উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও লোকগানে নদী কখনও জীবনের প্রতীক, কখনও বিচ্ছেদের, কখনও আবার যাত্রা ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে এসেছে।

একটি নদী একই সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। নদীর জলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণী বাস করে। নদীর তীরও বহু পাখি, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জলস্তর ও আশপাশের জলাভূমি অনেক প্রাণীর জীবনচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই নদী দূষিত হলে শুধু মানুষের ক্ষতি হয় না; সমগ্র জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিন্তু আধুনিক সময়ে বহু নদী নানা সমস্যার মুখোমুখি। নদীতে প্লাস্টিক, পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলা নদীর পরিবেশকে বিপন্ন করে। অনেক শহর ও শিল্পাঞ্চলে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়লে জলের গুণমান নষ্ট হয়। নদীর তীরে আবর্জনা জমতে থাকে এবং জলজ প্রাণীদের জন্য পরিবেশ অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে।

প্লাস্টিক দূষণ বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। বোতল, প্যাকেট, থলে এবং নানা ধরনের প্লাস্টিক নদীর জলে ভেসে বেড়ায় বা তলদেশে জমে থাকে। জলজ প্রাণী কখনও এসব প্লাস্টিক গিলে ফেলতে পারে, আবার অনেক প্রাণী প্লাস্টিকের মধ্যে আটকে যেতে পারে। প্লাস্টিক সহজে প্রাকৃতিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে যায় না বলে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে থেকে যায়।

নদীর আরেকটি সমস্যা হলো দখল ও অবৈধভাবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ। নদীর তীর বা বন্যাপ্রবণ এলাকা অপরিকল্পিতভাবে দখল ও নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হলে বর্ষাকালে জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে কোথাও জলাবদ্ধতা বা বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নদী রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু নদীর মূল জলধারা নয়, নদীর তীর ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলকেও গুরুত্ব দিতে হয়।

বালি উত্তোলনও অনেক নদীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত বিষয়। নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বাইরে অতিরিক্ত বালি তোলা হলে নদীর তলদেশ ও তীরের স্থিতিশীলতা প্রভাবিত হতে পারে। নদীর স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতি পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব জলপ্রবাহ ও আশপাশের পরিবেশে পড়তে পারে। তাই নদী থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও নিয়ম ও পরিবেশগত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

নদীর সঙ্গে বন্যার সম্পর্কও রয়েছে। বর্ষাকালে নদীতে জল বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, জলাভূমি নষ্ট হওয়া কিংবা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের মতো বিভিন্ন কারণ পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে। অন্যদিকে নদীর জল কমে যাওয়াও অনেক অঞ্চলে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই নদী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া দরকার।

নদী রক্ষার প্রথম শর্ত হলো নদীকে শুধু একটি জলসম্পদ হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখা। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, তীরবর্তী অঞ্চল সংরক্ষণ করা এবং নদীর সঙ্গে যুক্ত জলাভূমি ও খালগুলোকেও রক্ষা করা জরুরি।

নদী পরিষ্কারের জন্য শুধু মাঝে মাঝে বড়সড় অভিযান করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীতে যাতে নতুন করে বর্জ্য না পড়ে, তার ব্যবস্থা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শহর ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন করে তারপর নির্গত করতে হবে। বাড়ির আবর্জনা নদী বা খালে ফেলা বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বের মাধ্যমেই এই কাজ কার্যকর হতে পারে।

শিশু-কিশোরদের নদী সম্পর্কে সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ। নদীকে শুধু ভূগোলের বইয়ের একটি অধ্যায় হিসেবে নয়, জীবন্ত প্রকৃতির অংশ হিসেবে বোঝাতে হবে। নদীর তীরে শিক্ষামূলক ভ্রমণ, নদী পরিষ্কার রাখার প্রচার, জল সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনা তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে।

নদী আমাদের অনেক কিছু দেয়, কিন্তু তার বিনিময়ে নদীরও যত্ন দরকার। আমরা নদীর জল ব্যবহার করি, নদীর ওপর নির্ভর করে কৃষি করি, নদী থেকে মাছ পাই, নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করি—তাই নদীকে দূষিত করার অধিকার আমাদের নেই।

একটি নদী শুকিয়ে গেলে বা দূষিত হয়ে গেলে তার ক্ষতি শুধু বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে। আগামী দিনের শিশুরা যদি স্বচ্ছ নদী, সবুজ নদীতীর ও জীবন্ত জলজ পরিবেশ না পায়, তাহলে তার দায় আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তের ওপরও থাকবে।

নদী আসলে চলমান জীবনের প্রতীক। তার জল থেমে থাকে না; এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বয়ে যায়, পথ বদলায়, নতুন ভূপ্রকৃতি তৈরি করে। মানুষের জীবনও তেমনই পরিবর্তনশীল। তাই নদীকে ভালোবাসা মানে শুধু নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়; তার অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্বও গ্রহণ করা।

নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, জীববৈচিত্র্য বাঁচবে, বহু মানুষের জীবিকা বাঁচবে এবং প্রকৃতির ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। তাই নদীকে রক্ষা করা কোনও একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়—এটি আমাদের সবার ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য: হেরে যাওয়া নয়, শেখার সুযোগ।

জীবনের পথে সাফল্য যেমন আসে, তেমনই আসে ব্যর্থতা। কেউই জীবনে সব কাজেই সফল হয় না। কখনও পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল আসে না, কখনও চাকরি পাওয়া যায় না, কখনও ব্যবসায় ক্ষতি হয়, কখনও কোনও সম্পর্ক ভেঙে যায়, আবার কখনও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। ব্যর্থতার মুহূর্তগুলো মানুষের মনে হতাশা, কষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি করতে পারে। কিন্তু ব্যর্থতা মানেই জীবনের শেষ নয়। বরং অনেক সময় ব্যর্থতাই মানুষকে সাফল্যের প্রকৃত অর্থ বুঝতে শেখায়।

সাফল্যকে আমরা সাধারণত ফলাফলের মাধ্যমে বিচার করি। কেউ পরীক্ষায় ভালো ফল করলে তাকে সফল বলা হয়, কেউ বড় চাকরি পেলে সফল, কেউ ব্যবসায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করলে সফল। কিন্তু সাফল্যের প্রকৃত অর্থ আরও বিস্তৃত। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলা এবং নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে উন্নতি করাও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোথায় ভুল হয়েছে তা বুঝতে শেখা। একজন মানুষ যদি কোনও কাজে ব্যর্থ হয়ে শুধু হতাশ হন, তাহলে সেই ব্যর্থতা থেকে তিনি খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারবেন না। কিন্তু যদি তিনি নিজের কাজটি বিশ্লেষণ করেন, কোথায় ভুল হয়েছে তা খুঁজে বের করেন এবং পরবর্তীবার সেই ভুল না করার চেষ্টা করেন, তাহলে ব্যর্থতাই তার শিক্ষক হয়ে ওঠে।

একজন ছাত্র পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে তার সামনে দুটি পথ থাকে। সে ভাবতে পারে, “আমি পারি না, তাই আর চেষ্টা করে লাভ নেই।” অথবা সে নিজের ভুলগুলো খুঁজে দেখতে পারে—কোন বিষয় ভালোভাবে পড়া হয়নি, কোথায় সময় ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়েছে, কোন ধরনের প্রশ্নে ভুল হয়েছে। দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

ব্যর্থতার সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সম্পর্কও গভীর। একটি ব্যর্থতার পরে অনেকেই নিজের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। মনে হয়, “আমার দ্বারা হবে না।” এই চিন্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে মানুষ নতুন সুযোগ গ্রহণ করতেও ভয় পেতে পারে। অথচ একটি কাজে ব্যর্থ হওয়া মানেই মানুষটি সব কাজে ব্যর্থ—এমন কোনও যুক্তি নেই। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল, একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে ব্যর্থতা বা একটি ব্যবসায়িক ক্ষতি কোনও মানুষের সম্পূর্ণ সামর্থ্য নির্ধারণ করে না।

তাই ব্যর্থতার পরে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন খুব গুরুত্বপূর্ণ। “আমি ব্যর্থ” বলার পরিবর্তে “এই প্রচেষ্টাটি সফল হয়নি” বলা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। কারণ ব্যর্থতা একটি ঘটনা; এটি মানুষের পরিচয় নয়। একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলে অন্য দরজা খোঁজার ক্ষমতাই মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

জীবনের অনেক বড় অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য ব্যর্থতার গল্প। কোনও নতুন আবিষ্কার তৈরি করতে গিয়ে বিজ্ঞানী বহুবার পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পারেন। কোনও শিল্পী নিজের কাঙ্ক্ষিত কাজ তৈরি করতে বারবার চেষ্টা করতে পারেন। কোনও ক্রীড়াবিদ বহু প্রতিযোগিতায় পরাজিত হওয়ার পরও অনুশীলন চালিয়ে যেতে পারেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায় যে সাফল্য অনেক সময় সরলরেখায় আসে না। তার পথে থাকে ভুল, সংশোধন, অপেক্ষা ও পুনরায় চেষ্টা।

তবে ব্যর্থতার অর্থ এই নয় যে একই ভুল বারবার করে যেতে হবে। অন্ধভাবে চেষ্টা করা আর শেখার পর পুনরায় চেষ্টা করা এক বিষয় নয়। যদি কোনও পদ্ধতি কাজ না করে, তাহলে পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে, নিজের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে এবং বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

ব্যর্থতা মানুষকে ধৈর্য শেখায়। আমরা অনেক সময় দ্রুত ফলাফল চাই। কয়েকদিন পরিশ্রম করেই বড় পরিবর্তন দেখতে চাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক সাফল্য পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। একজন কৃষক বীজ বপন করার পর প্রতিদিন মাটি খুঁড়ে দেখেন না গাছ কতটা বড় হয়েছে। তিনি জল দেন, যত্ন নেন এবং সময়ের অপেক্ষা করেন। মানুষের ক্ষেত্রেও অনেক স্বপ্নের ফল পেতে সময় লাগে।

ব্যর্থতার সময় পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যখন ব্যর্থ হন, তখন তাকে শুধু সমালোচনা না করে তার কথা শোনা দরকার। একটি উৎসাহের বাক্য অনেক সময় হতাশ মানুষের মনে নতুন শক্তি তৈরি করতে পারে। একইভাবে নিজের ব্যর্থতা অন্যের সঙ্গে তুলনা করাও ঠিক নয়। প্রত্যেক মানুষের পরিস্থিতি, সুযোগ, দক্ষতা ও যাত্রাপথ আলাদা।

বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিয়ে সামাজিক চাপ একটি বড় সমস্যা হতে পারে। পরীক্ষার ফল, চাকরি, উপার্জন বা পেশাগত সাফল্য নিয়ে সমাজে অনেক প্রত্যাশা থাকে। ফলে কোনও একটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে অনেক তরুণ মনে করতে পারেন যে তাঁদের জীবন শেষ হয়ে গেছে। এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। জীবনে পেশা ও লক্ষ্য পরিবর্তনের সুযোগ থাকে। নতুন দক্ষতা শেখা যায়, নতুন পথ বেছে নেওয়া যায় এবং নতুনভাবে শুরু করা যায়।

ব্যর্থতা কখনও কখনও মানুষের সৃজনশীলতাও বাড়ায়। যখন প্রচলিত কোনও পদ্ধতি কাজ করে না, তখন মানুষ নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে একাধিক পদ্ধতি চেষ্টা করার ফলে নতুন ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই ব্যর্থতাকে শুধু বাধা হিসেবে দেখলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অদৃশ্য থেকে যায়।

তবে ব্যর্থতার পর নিজেকে সময় দেওয়াও জরুরি। প্রত্যেক মানুষ একইভাবে ব্যর্থতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেন না। কেউ দ্রুত নতুন পরিকল্পনা করেন, কেউ কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামলান। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে তা স্বীকার করা দরকার। কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক, হতাশ হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অবস্থায় দীর্ঘদিন আটকে না থেকে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হয়।

সাফল্যের পথে ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা কার্যকর হতে পারে। বড় লক্ষ্যকে একবারে অর্জন করার চেষ্টা অনেক সময় চাপ তৈরি করে। তার বদলে বড় লক্ষ্যকে কয়েকটি ছোট ধাপে ভাগ করা যায়। প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ছোট সাফল্যগুলো একত্রিত হয়েই একসময় বড় অর্জনে পরিণত হতে পারে।

নিজের সাফল্যের সংজ্ঞাও নিজেকেই নির্ধারণ করতে হয়। অন্য কেউ কী অর্জন করেছে তার সঙ্গে নিজের জীবনকে সবসময় তুলনা করলে অসন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্যের ছবি দেখা যায়, কিন্তু তার সংগ্রাম, ব্যর্থতা বা ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো সবসময় দেখা যায় না। তাই অন্যের জীবনের দৃশ্যমান ফলাফলের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ বাস্তবতার তুলনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

ব্যর্থতা মানুষকে বিনয়ী করতেও সাহায্য করে। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই—এই সত্যটি ব্যর্থতার মাধ্যমে অনেক সময় স্পষ্ট হয়। পরিস্থিতি, সময়, অর্থ, সুযোগ কিংবা অন্য মানুষের সিদ্ধান্তও জীবনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ফলে নিজের সাফল্যে যেমন অহংকার না করা দরকার, তেমনই ব্যর্থতার সময় নিজেকে সম্পূর্ণ দোষী মনে করাও ঠিক নয়। নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোকে উন্নত করার চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সুন্দর জীবনের জন্য ব্যর্থতাকে গ্রহণ করার মানসিকতা দরকার। ব্যর্থতা থেকে পালিয়ে গেলে নতুন কিছু করার সাহস কমে যায়। কিন্তু ব্যর্থতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করলে মানুষ নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যে ব্যক্তি কখনও চেষ্টা করেনি, তার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাও নেই; কিন্তু যে চেষ্টা করেছে, সে অন্তত জানে কোন পথে কী সমস্যা হতে পারে।

জীবনে বড় স্বপ্ন থাকা ভালো। কিন্তু বড় স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিশ্রম এবং ব্যর্থতার জন্য মানসিক প্রস্তুতিও থাকা দরকার। সাফল্য এলে যেমন আনন্দ করতে হবে, তেমনই ব্যর্থতা এলে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সাহস রাখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা কোনও চূড়ান্ত পরিচয় নয়। একটি পরাজয় মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তাকে সারাজীবনের জন্য থামিয়ে দিতে পারে না—যদি সে আবার উঠে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। জীবনের পথ কখনও সম্পূর্ণ মসৃণ নয়। কোথাও উঁচু রাস্তা, কোথাও নিচু পথ, কোথাও বাধা, কোথাও সহজ চলার সুযোগ। এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই মানুষের যাত্রা এগিয়ে চলে।

তাই ব্যর্থতাকে ভয় নয়, শিক্ষা হিসেবে দেখতে শেখা দরকার। কারণ কখনও কখনও যে দরজাটি আমাদের সামনে বন্ধ হয়ে যায়, সেই দরজাই আমাদের অন্য একটি পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করে। আর সেই নতুন পথেই হয়তো অপেক্ষা করে থাকে আমাদের পরবর্তী অধ্যায়ের সাফল্য।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

বই পড়ার অভ্যাস: জ্ঞানের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি।

মানুষের জীবনে জ্ঞান অর্জনের অনেক পথ রয়েছে। বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, আলোচনা, প্রযুক্তি—সবকিছু থেকেই মানুষ নতুন কিছু শিখতে পারে। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে প্রাচীন ও কার্যকর মাধ্যমগুলোর মধ্যে বই পড়া অন্যতম। বই শুধু তথ্য দেয় না; বই মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে, ভাষাকে সমৃদ্ধ করে এবং পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। একটি ভালো বই কখনও কখনও একজন মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনদৃষ্টিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রভাবিত করতে পারে।

বইকে বলা হয় মানুষের নীরব বন্ধু। কারণ বই কথা বলে না, কিন্তু তার পাতার ভেতর দিয়ে মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে কথা বলে। একজন মানুষ যখন কোনও বই পড়েন, তখন তিনি শুধু লেখকের কথাই পড়েন না; তিনি লেখকের চিন্তা, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হন। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসবাসকারী কোনও মানুষের জীবন, শত বছর আগের কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের চিন্তাভাবনাও একটি বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

শৈশব থেকেই বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা যখন গল্পের বই পড়ে, তখন তারা নতুন নতুন চরিত্র, ঘটনা ও জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়। রূপকথার গল্প তাদের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে, গোয়েন্দা গল্প তাদের যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়, বিজ্ঞানভিত্তিক বই তাদের প্রশ্ন করতে শেখায় এবং জীবনীগ্রন্থ তাদের অনুপ্রেরণা দিতে পারে। ফলে বই শুধু আনন্দের মাধ্যম নয়, শিশুর মানসিক বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বই পড়ার অভ্যাস নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও, গেম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল বিনোদন মানুষের অবসর সময়ের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের অনেকেই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে কাটায়। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যেতে পারে। তবে প্রযুক্তিকে বই পড়ার শত্রু হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি এবং ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে প্রযুক্তিই আবার বইকে আরও সহজলভ্য করে তুলতে পারে।

বই পড়ার অন্যতম বড় উপকার হলো ভাষার উন্নতি। নিয়মিত বই পড়লে নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় হয়। বাক্য গঠনের ধরন বোঝা যায়। সুন্দরভাবে নিজের কথা প্রকাশ করার ক্ষমতা বাড়ে। যারা নিয়মিত ভালো বই পড়েন, তাদের লেখার ভাষাতেও ধীরে ধীরে পরিণত ভাব দেখা যায়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, জীবনী ও বিজ্ঞানবিষয়ক বই পড়লে তাদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।

বই মানুষের কল্পনাশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। একটি সিনেমায় কোনও দৃশ্য আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই। কিন্তু একটি গল্পের বই পড়ার সময় চরিত্র, পরিবেশ ও ঘটনাগুলোকে নিজের মনের মধ্যে কল্পনা করতে হয়। লেখক হয়তো একটি পুরোনো বাড়ির বর্ণনা দিলেন; পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সাহায্যে সেই বাড়ির একটি ছবি মনের মধ্যে তৈরি করেন। এই মানসিক কল্পনাই সৃজনশীলতার অন্যতম ভিত্তি।

বই পড়া মানুষের চিন্তার গভীরতাও বাড়ায়। সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট পোস্ট আমাদের দ্রুত তথ্য দিতে পারে, কিন্তু একটি ভালো বই কোনও বিষয়কে বিস্তারিতভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। একটি ঐতিহাসিক বই পড়লে শুধু একটি ঘটনার তারিখ জানা যায় না; সেই ঘটনার পেছনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বোঝা যায়। একটি দর্শনের বই মানুষের জীবন, নৈতিকতা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। একটি বিজ্ঞানবিষয়ক বই আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে যুক্তির চোখে দেখতে শেখাতে পারে।

বই মানুষের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা যখন অন্য কোনও মানুষের জীবন ও সংগ্রামের গল্প পড়ি, তখন তার অনুভূতিকে বুঝতে চেষ্টা করি। একজন দরিদ্র মানুষের জীবন, একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা কিংবা কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সংগ্রামের কাহিনি আমাদের নিজের জীবনের বাইরে অন্য মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ফলে মানুষের প্রতি বোঝাপড়া ও সহমর্মিতা বাড়তে পারে।

জীবনীগ্রন্থ এই ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বহু বিশিষ্ট মানুষ তাঁদের জীবনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের সংগ্রাম, ব্যর্থতা, অধ্যবসায় এবং সাফল্যের গল্প পড়লে বোঝা যায় যে বড় অর্জনের পেছনে প্রায়ই দীর্ঘ পরিশ্রম থাকে। কোনও ব্যক্তির জীবনী পড়ে তার সাফল্য অনুকরণ করার চেয়ে তার পরিশ্রম, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে মোকাবিলা করার মানসিকতা থেকে শিক্ষা নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বই মানুষের একাকিত্বের সঙ্গী হতে পারে। জীবনের কোনও কঠিন সময়ে যখন নিজের কথা বলার মতো মানুষ পাওয়া যায় না, তখন একটি ভালো বই মানসিক আশ্রয় দিতে পারে। গল্পের চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের এক ধরনের মানসিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। আবার কোনও চিন্তাশীল প্রবন্ধ নিজের সমস্যাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করতে পারে।

তবে বই পড়ার ক্ষেত্রেও বাছাই গুরুত্বপূর্ণ। সব বই একই ধরনের নয় এবং সব বই সবার জন্য উপযোগীও নয়। নিজের বয়স, আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী বই নির্বাচন করা উচিত। শিশুদের জন্য বয়স উপযোগী বই, শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানমূলক ও সাহিত্যভিত্তিক বই, গবেষণার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যসমৃদ্ধ বই এবং বিনোদনের জন্য ভালো সাহিত্য বেছে নেওয়া যেতে পারে।

বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে বড় লক্ষ্য নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র পনেরো বা বিশ মিনিট দিয়ে শুরু করা যায়। প্রথমে ছোট গল্প বা ছোট প্রবন্ধ পড়া যেতে পারে। পরে ধীরে ধীরে বড় বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। একদিন অনেকক্ষণ পড়ে পরের দশ দিন বই না পড়ার চেয়ে প্রতিদিন অল্প সময় পড়া বেশি কার্যকর হতে পারে।

পড়ার সময় মোবাইলের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা বা কিছু সময়ের জন্য ফোন দূরে রাখা মনোযোগ বাড়াতে পারে। কোনও বই পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ভালো লাগা অংশ লিখে রাখার অভ্যাসও উপকারী। বই পড়ে যদি নিজের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও পড়াশোনাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাড়িতে ছোট একটি বইয়ের তাক রাখা যেতে পারে। শিশুদের জন্মদিনে শুধু খেলনা নয়, বই উপহার দেওয়া যেতে পারে। স্কুলে নিয়মিত পাঠাগার ব্যবহার, বই নিয়ে আলোচনা এবং বই পড়ার অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

সমাজেও পাঠাগারের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যেকের পক্ষে সব বই কেনা সম্ভব নয়। একটি ভালো গণগ্রন্থাগার তাই বহু মানুষের কাছে জ্ঞানের দরজা খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠাগার তৈরি হলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

বই আমাদের অতীতের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। ইতিহাসের বই আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে। বিজ্ঞান বই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখায়। সাহিত্য মানুষের অনুভূতির জগতকে সমৃদ্ধ করে। ভ্রমণকাহিনি আমাদের অচেনা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দর্শন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। অর্থাৎ বইয়ের জগৎ এত বিস্তৃত যে প্রত্যেক মানুষের জন্য সেখানে নিজের পছন্দের কোনও না কোনও দরজা রয়েছে।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষের হাতে সময় কম। তথ্যের পরিমাণও আগের তুলনায় অসীম বেড়েছে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। তথ্য জানা যায় কয়েক সেকেন্ডে, কিন্তু একটি বিষয় গভীরভাবে বোঝার জন্য সময় ও মনোযোগ দরকার। বই সেই গভীরতার সুযোগ তৈরি করে।

সবশেষে বলা যায়, বই পড়া শুধু একটি অভ্যাস নয়; এটি একটি জীবনদর্শন। বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, উত্তর খুঁজতে শেখায় এবং নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে তাকাতে শেখায়। একটি ভালো বই হয়তো আমাদের জীবন এক মুহূর্তে বদলে দেবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারে।

বইয়ের পাতায় শুধু অক্ষর থাকে না—থাকে মানুষের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, স্বপ্ন, জ্ঞান ও কল্পনার এক বিশাল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর দরজা খুলতে হলে শুধু একটি বই হাতে তুলে নেওয়াই যথেষ্ট।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

সময়ের মূল্য: জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

মানুষের জীবনে অনেক মূল্যবান জিনিস রয়েছে—অর্থ, সম্পদ, শিক্ষা, জ্ঞান, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা ভালোবাসা। কিন্তু এই সবকিছুর চেয়েও মূল্যবান একটি সম্পদ রয়েছে, যা একবার চলে গেলে কোনওভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না। সেটি হলো সময়। অর্থ হারালে পরিশ্রম করে আবার উপার্জন করা যায়, সম্পদ নষ্ট হলে পুনরায় তৈরি করা যায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে হারানো সুযোগও পরিশ্রমের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু জীবনের যে মুহূর্তটি একবার চলে যায়, সেটিকে পৃথিবীর কোনও শক্তির বিনিময়েই ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই সময়কে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বলা হয়।

সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ক্ষমতাবান-সাধারণ—সবার জন্য একটি দিনের দৈর্ঘ্য একই। প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন চব্বিশ ঘণ্টা সময় পায়। কিন্তু সেই সময়কে কে কীভাবে ব্যবহার করছে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা। একই সময়ে কেউ নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করছে, কেউ জ্ঞান অর্জন করছে, কেউ পরিবারের জন্য কাজ করছে, আবার কেউ হয়তো অপ্রয়োজনীয় কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে। দিন শেষে সবার কাছেই চব্বিশ ঘণ্টা ছিল, কিন্তু ফলাফল এক হয় না।

সময়ের মূল্য বোঝার জন্য ছাত্রজীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একজন ছাত্র যদি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়াশোনা করে, নিয়মিত অনুশীলন করে এবং নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, তাহলে ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। অন্যদিকে কেউ যদি পরীক্ষার কয়েকদিন আগে সবকিছু পড়ে শেষ করার চেষ্টা করে, তাহলে তার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে এবং প্রত্যাশিত ফল পাওয়াও কঠিন হতে পারে। তাই সাফল্যের জন্য শুধু পরিশ্রম নয়, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করাও জরুরি।

সময় ব্যবস্থাপনা বা Time Management আধুনিক জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন মানুষকে দিনের বিভিন্ন কাজের মধ্যে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। কোন কাজটি এখনই করা দরকার, কোনটি পরে করা যাবে এবং কোন কাজটি একেবারেই জরুরি নয়—এই পার্থক্য বুঝতে পারা সময় ব্যবস্থাপনার অন্যতম অংশ।

অনেক মানুষ সময়ের অভাবের কথা বলেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকৃত সমস্যা সময়ের অভাব নয়; বরং সময়ের সঠিক ব্যবহার না করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় কাটানো, উদ্দেশ্যহীন ভিডিও দেখা, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, অনর্থক আলোচনা কিংবা কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস প্রতিদিন অনেকটা সময় নষ্ট করে। কয়েক মিনিট করে নষ্ট হওয়া সময় দিনের শেষে কয়েক ঘণ্টায় পরিণত হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অভ্যাস চলতে থাকলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নীরবে হারিয়ে যায়।

তবে বিশ্রাম বা বিনোদনকে সময়ের অপচয় বলা ঠিক নয়। মানুষ যন্ত্র নয়। কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, বই পড়া, গান শোনা কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করাও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন বিনোদন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং প্রয়োজনীয় কাজের জায়গা দখল করে নেয়। তাই সময় ব্যবস্থাপনার অর্থ সারাদিন শুধু কাজ করে যাওয়া নয়; বরং কাজ, বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

সময়ের মূল্য কর্মজীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মী যদি নির্দিষ্ট সময়ে নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করেন, তাহলে শুধু নিজের কাজই সহজ হয় না, পুরো প্রতিষ্ঠানের কাজের গতিও বজায় থাকে। একটি কাজ সময়মতো শেষ না হলে তার সঙ্গে যুক্ত পরবর্তী কাজগুলোও পিছিয়ে যেতে পারে। ফলে একটি ছোট বিলম্ব অনেক বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। এই কারণেই পেশাগত জীবনে সময়ানুবর্তিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

সময়ানুবর্তিতা মানুষের ব্যক্তিত্বেরও পরিচয় বহন করে। নির্ধারিত সময়ে কোনও অনুষ্ঠানে পৌঁছানো, প্রতিশ্রুত কাজ সময়মতো শেষ করা কিংবা কারও সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে দেখা করা—এসব আচরণ অন্যের সময়ের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করে। যে ব্যক্তি নিজের সময়ের মূল্য বোঝেন, সাধারণত তিনি অন্যের সময়ের মূল্যও বোঝেন।

জীবনে অনেক মানুষ অতীত নিয়ে অতিরিক্ত আক্ষেপ করেন। “তখন যদি এটা করতাম”, “সেই সুযোগটা যদি কাজে লাগাতাম”, “আর একটু আগে শুরু করলে ভালো হতো”—এই ধরনের চিন্তা মানুষের মনে হতাশা তৈরি করতে পারে। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া অবশ্যই দরকার, কিন্তু অতীতকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই হারানো সময় নিয়ে অনন্তকাল আফসোস না করে বর্তমান সময়কে কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

একইভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করেও বর্তমানকে নষ্ট করা উচিত নয়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা দরকার, লক্ষ্য নির্ধারণ করা দরকার, কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য আজ কী করা হচ্ছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ তৈরি হয় বর্তমানের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত ও কাজের মাধ্যমে।

সময় আমাদের ধৈর্যও শেখায়। জীবনের প্রতিটি ফল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। একটি গাছ লাগানোর পর পরদিনই বড় গাছ হয়ে যায় না। একজন শিক্ষার্থী একদিন পড়াশোনা করেই জ্ঞানী হয়ে ওঠে না। একজন শিল্পী একদিন অনুশীলন করেই দক্ষ হয়ে ওঠেন না। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত চেষ্টা, ভুল থেকে শিক্ষা এবং ধৈর্য—এসবের সমন্বয়েই সাফল্য আসে।

এখানে সময়ের সঙ্গে ধারাবাহিকতার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন সামান্য করে এগিয়ে যাওয়াও দীর্ঘ সময়ের পরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রতিদিন দশটি নতুন শব্দ শেখা, প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা বই পড়া, প্রতিদিন কিছুটা ব্যায়াম করা বা প্রতিদিন নিজের কোনও একটি দক্ষতা উন্নত করার চেষ্টা—এসব ছোট অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় ফল দিতে পারে।

প্রযুক্তির যুগে সময় ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনে অসংখ্য সুবিধা এনেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমরা তথ্য পেয়ে যাচ্ছি, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি, অনলাইনে শিক্ষা নিতে পারছি, কাজ করতে পারছি। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটিই সময় নষ্টের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা দরকার। একটি ভিডিও দেখতে গিয়ে আরেকটি ভিডিও, তারপর আরও একটি—এভাবে কখন যে দীর্ঘ সময় কেটে যায়, অনেক সময় বোঝাই যায় না। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে উদ্দেশ্য নিয়ে। মোবাইল আমাদের ব্যবহার করবে, নাকি আমরা মোবাইলকে ব্যবহার করব—এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে।

পরিবারের ক্ষেত্রেও সময় অত্যন্ত মূল্যবান। কর্মব্যস্ত জীবনে মানুষ অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। কিন্তু অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে কিছু অর্থপূর্ণ সময় কাটানোও জরুরি। কারণ জীবনের অনেক সম্পর্কই সময়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো একটি সাধারণ সন্ধ্যা, সন্তানের সঙ্গে কথা বলা কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকা—এসব মুহূর্ত পরবর্তীতে জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে।

সময় মানুষের সম্পর্কেরও পরীক্ষা নেয়। বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছু টিকিয়ে রাখতে সময় দিতে হয়। কাউকে ভালোবাসি বলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তার জন্য সময় বের করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালোবাসার অন্যতম বাস্তব প্রকাশ হলো উপস্থিত থাকা।

সময়ের মূল্য বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুযোগকে চিনতে শেখা। জীবনে কিছু সুযোগ একবারই আসে। কোনও শিক্ষার সুযোগ, কোনও কাজের সুযোগ, কোনও সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ কিংবা নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ—সবসময় ফিরে আসে না। তাই সুযোগ এলে অযথা দেরি না করে পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।

তবে সময়ের সদ্ব্যবহার মানে প্রতিটি মুহূর্তকে কোনও না কোনও কাজে ব্যস্ত রাখা নয়। কখনও কখনও কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকা, নিজের সঙ্গে কথা বলা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা কিংবা নিজের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করাও সময়ের সঠিক ব্যবহার। মানুষের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের জন্য এমন অবসরও প্রয়োজন।

জীবনে সফল হতে গেলে সময়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দরকার। প্রতিদিন সকালে দিনের কাজের একটি তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে করা, বড় কাজকে ছোট অংশে ভাগ করা, অপ্রয়োজনীয় কাজ কমানো এবং দিনের শেষে কী কী করা হলো তা পর্যালোচনা করা—এসব অভ্যাস সময় ব্যবস্থাপনাকে সহজ করতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, সময়কে সম্মান করার অর্থ আসলে জীবনকে সম্মান করা। কারণ আমাদের জীবন মূলত সময়ের সমষ্টি। জীবনের প্রতিটি মিনিট আমাদের জীবনেরই একটি অংশ। সেই সময় কীভাবে ব্যবহার করছি, সেটিই শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা নির্ধারণ করে।

তাই সময় চলে যাওয়ার পরে তার মূল্য বোঝার অপেক্ষা না করে এখন থেকেই সচেতন হওয়া উচিত। গতকাল আমাদের হাতে নেই, আগামীকাল এখনও আসেনি; আমাদের হাতে রয়েছে শুধু আজকের দিন, এই মুহূর্ত। এই মুহূর্তটিকেই যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।

সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তাই সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা নয়, সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলাই জীবনের সার্থকতা।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ভায়োলেট আলভা: আইন, সাংবাদিকতা ও সংসদীয় নেতৃত্বে পথ দেখানো এক অগ্রদূত।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক নেতা, বিপ্লবী বা আন্দোলনকারীদের ইতিহাস নয়। সেই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করেছিলেন এমন বহু নারী, যাঁরা একইসঙ্গে শিক্ষা, আইন, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা এবং জনজীবনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ভায়োলেট আলভা ছিলেন এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব।

আইনজীবী হিসেবে আদালতে নিজের পরিচয় তৈরি করা, স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া, সাংবাদিকতা করা, সমাজসেবায় যুক্ত থাকা এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে পৌঁছনো—ভায়োলেট আলভার জীবন ছিল বহুস্তরীয়। তিনি শুধু নিজের সময়ের একজন সফল নারী ছিলেন না; তিনি এমন এক সময়ে জনজীবনে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, যখন আইন ও রাজনীতির মতো ক্ষেত্রগুলিতে নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

ভায়োলেট আলভার জন্ম ২৪ এপ্রিল ১৯০৮ সালে আহমেদাবাদে। তিনি একটি বড় পরিবারে বেড়ে ওঠেন। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারানোর পর তাঁর ভাই-বোনেরা তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব নেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি বোম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন এবং উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর Government Law College থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনার খরচ চালাতে তাঁকে নিজের মতো করে কাজও করতে হয়েছিল। তিনি পড়াতেন এবং সেই উপার্জনের সাহায্যে নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিয়ে যান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করে। উচ্চশিক্ষা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় ছিল না; নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য শিক্ষাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন।

শিক্ষকতা থেকে আইন পেশায়

শিক্ষাজীবন শেষ করার পর ভায়োলেট আলভা কিছু সময় শিক্ষকতা করেন। তিনি Indian Women’s University-তে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। একই সময়ে আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতিও নেন।

আইনজীবী হিসেবে তাঁর সামনে তখন একাধিক বাধা ছিল। আদালত ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি।

১৯৪৪ সালে তাঁর কর্মজীবনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। তিনি Bombay High Court-এর একটি Full Bench-এর সামনে মামলা পরিচালনা করেন এবং সফলভাবে সওয়াল করেন। রাজ্যসভার সরকারি নথিতে তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যিনি কোনও High Court-এর Full Bench-এর সামনে সফলভাবে মামলা যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন।

এই ঘটনাটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না। এটি ভারতীয় নারীদের আইন পেশায় এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া

আইন পেশার পাশাপাশি ভায়োলেট আলভা স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হন।

১৯৪৩ সালে Quit India Movement-এর সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তাঁর সন্তান খুব ছোট ছিল। সরকারি ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে তিনি পাঁচ মাসের শিশুকে সঙ্গে নিয়েই কারাবরণ করেছিলেন।

একজন মা হিসেবে তাঁর কাছে পরিস্থিতিটি নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল। কিন্তু সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি নিজের ব্যক্তিগত অসুবিধাকে আন্দোলনের অংশগ্রহণ থেকে আলাদা করে দেখেননি।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার পরিসরও ক্রমশ বিস্তৃত হয়।

সাংবাদিকতায় নতুন পরিচয়

ভায়োলেট আলভার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাংবাদিকতা।

১৯৪৩ সালের ৯ আগস্ট, তাঁর স্বামী জোয়াকিম আলভার সঙ্গে তিনি FORUM নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। এই পত্রিকা স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে বলে সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভায়োলেট আলভা নিজে নারীদের জন্য Begum নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে Indian Woman নামে পরিচিত হয়।

এই কাজটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নারীশিক্ষা ও নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করার জন্য তখন নারীকেন্দ্রিক প্রকাশনার সংখ্যা ছিল খুবই কম।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি শুধু খবর প্রকাশ করেননি; নারীদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, অধিকার ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার একটি পরিসর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা

ভায়োলেট আলভার কর্মজীবন কখনও কেবল আইন বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। Bombay-এর Agripada Rehawasi Seva Mandal-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। International Federation of Women Lawyers-এর সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির আন্তর্জাতিক নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন।

নারী আইনজীবীদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁকে ভারতের বাইরের নারী অধিকার ও আইন-সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করেছিল।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও প্রতিনিধিদলে অংশ নেন এবং মানবাধিকার ও আইন নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।

সংসদীয় জীবনের সূচনা

স্বাধীনতার পরে ভারতের নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠছিল। এই সময় ভায়োলেট আলভাও সক্রিয়ভাবে জনজীবনে প্রবেশ করেন।

১৯৪৭ সালে তিনি Bombay Legislative Council-এর সদস্য হন। ১৯৫২ সালে তিনি Rajya Sabha-তে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলিতেও সদস্য হিসেবে ফিরে আসেন।

তাঁর স্বামী জোয়াকিম আলভাও সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তাঁরা ভারতীয় সংসদে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রথম দম্পতি হিসেবে পরিচিত হন।

ভায়োলেট আলভার সংসদীয় জীবন কেবল উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংসদীয় কমিটি, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দল এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব

১৯৫৭ সালে ভায়োলেট আলভা কেন্দ্রীয় সরকারের Deputy Minister of Home Affairs পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়ে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছিল।

তাঁর আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং সংসদীয় কাজের অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মানবাধিকার, আইন, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বৈঠক ও প্রতিনিধিদলে তিনি অংশ নেন। সরকারি নথিতে দেখা যায়, তিনি United Nations-এর মানবাধিকার-সংক্রান্ত সেমিনারেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান

ভায়োলেট আলভার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলির একটি শুরু হয় ১৯৬২ সালে।

১৯ এপ্রিল ১৯৬২ সালে তিনি Rajya Sabha-এর Deputy Chairman নির্বাচিত হন। রাজ্যসভার সরকারি ইতিহাসে তাঁকে এই পদে নির্বাচিত প্রথম নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে তিনি আবারও এই পদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

রাজ্যসভার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কক্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে Deputy Chairman-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে বসে তাঁকে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছিল, বিভিন্ন সদস্যের বক্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়েছিল এবং সংসদীয় নিয়মকানুন মেনে অধিবেশন পরিচালনা করতে হয়েছিল।

সেই সময়ে একজন নারী এই পর্যায়ের সাংবিধানিক দায়িত্বে পৌঁছনো ভারতীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল।

বহুমুখী আন্তর্জাতিক ভূমিকা

ভায়োলেট আলভা ভারতের সংসদীয় প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নেন।

তিনি Commonwealth Parliamentary Conference-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণ করেন। International Federation of Women Lawyers-এর সঙ্গেও তাঁর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছিল।

তাঁর কর্মজীবনে আইন, সংসদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—এই তিনটি ক্ষেত্র একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

শেষ অধ্যায়

১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসে ভায়োলেট আলভার জীবনাবসান ঘটে। রাজ্যসভার সরকারি নথিতে তাঁর মৃত্যুর তারিখ ২০ নভেম্বর ১৯৬৯ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর জীবনকাল দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু কর্মজীবনের পরিধি ছিল বিস্তৃত।

শিক্ষিকা, আইনজীবী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী—একজন মানুষের জীবনে এতগুলি ভূমিকা একত্রে দেখা বিরল।

ভায়োলেট আলভার উত্তরাধিকার

ভায়োলেট আলভার জীবনকে শুধু ‘প্রথম নারী’ হওয়ার তালিকা দিয়ে বিচার করলে তাঁর কাজের পূর্ণতা বোঝা যায় না।

তিনি এমন সময়ে আইন পেশায় এগিয়েছিলেন, যখন আদালতের পরিসর নারীদের জন্য সহজ ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঝুঁকি জড়িয়ে ছিল। সাংবাদিকতা করেছিলেন এমন একটি সময়ে, যখন নারীদের কণ্ঠকে প্রকাশ্যে আনার সুযোগ সীমিত ছিল।

তারপর স্বাধীন ভারতের সংসদীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সময় তিনি সেই প্রতিষ্ঠানেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

তাঁর জীবন তাই একাধিক দরজা খোলার ইতিহাস। একটি দরজা আইন পেশার দিকে, একটি সাংবাদিকতার দিকে, একটি জনসেবার দিকে এবং আরেকটি ভারতের সংসদীয় নেতৃত্বের দিকে।

ভায়োলেট আলভার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এটাই—তিনি কোনও একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। সময়ের সঙ্গে নিজের ভূমিকা বদলেছেন, নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

ভারতের নারী ইতিহাসের আলোচনায় তাই ভায়োলেট আলভার নাম শুধু একটি ঐতিহাসিক তথ্য নয়; এটি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা স্বাধীনতার আগে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছিলেন এবং স্বাধীনতার পরে নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলিকে গড়ে তোলার কাজে অংশ নিয়েছিলেন।

ছবি: প্রতীকী

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. রাজনী এ. ভিসে: তামাক ও ক্যানসারের অদৃশ্য সম্পর্ক খুঁজে বের করা এক ভারতীয় বিজ্ঞানী।

ক্যানসার নিয়ে মানুষের ভয় বহু পুরনো। কিন্তু ক্যানসারের কারণ কী, পরিবেশের কোন উপাদান শরীরের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘদিনের কোনো অভ্যাস কীভাবে শরীরে জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের বহু দশক ধরে গবেষণা করতে হয়েছে।

ভারতের সেই গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ড. রাজনী এ. ভিসে।

তিনি ছিলেন একজন জীবরসায়নবিদ ও ক্যানসার গবেষক। তাঁর বিশেষ গবেষণার ক্ষেত্র ছিল environmental carcinogenesis, molecular epidemiology এবং বিভিন্ন পরিবেশগত ও পেশাগত ঝুঁকির সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক। Indian Medical Association-এর একটি প্রকাশনাতেও তাঁকে পরিবেশগত carcinogenesis এবং molecular epidemiology-র গবেষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে তাঁর কাজ কেবল গবেষণাগারের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তামাক, পানমশলা এবং অন্যান্য চিবোনো তামাকজাত দ্রব্যের সম্ভাব্য ক্যানসার-ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এবং সেই ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিও তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।

বিজ্ঞানের পথে যাত্রা

রাজনী এ. ভিসের জন্ম ২০ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে বোম্বাইয়ে, যা বর্তমানে মুম্বই নামে পরিচিত। তিনি University of Bombay থেকে স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরে Indian Cancer Research Centre-এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।

National Book Trust-এর “Women Scientists in India” গ্রন্থে তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি University of Bombay থেকে B.Sc. করার পর Indian Cancer Research Centre-এ যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে সেখান থেকেই উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি Ph.D. লাভ করেন।

এই সময়ে ক্যানসার গবেষণা দ্রুত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছিল। শুধু কোনো অঙ্গের রোগ হিসেবে ক্যানসারকে দেখার পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা কোষ, জিন, পরিবেশ এবং রাসায়নিক পদার্থের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

রাজনী ভিসের গবেষণার ক্ষেত্রও ধীরে ধীরে সেই দিকেই বিস্তৃত হয়।

গবেষণাগার থেকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

উচ্চতর গবেষণার সময় রাজনী ভিসে বিদেশেও কাজের সুযোগ পান।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Philadelphia-র Institute for Cancer Research-এ ড. Jerome J. Freed-এর গবেষণাগারে Research Assistant হিসেবে কাজ করেন। National Book Trust-এর জীবনীতে বলা হয়েছে, সেখানে তিনি আধুনিক গবেষণাগার-পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

বিদেশের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

কিন্তু তিনি নিজের গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন ভারতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে সামনে রেখে।

ভারতে তামাক ব্যবহার, বিড়ি তৈরি, পানমশালা এবং বিভিন্ন ধরনের চিবোনো তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। ফলে এই অভ্যাসগুলোর সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক বোঝা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ছিল না—এটি জনস্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ক্যানসার গবেষণার নেতৃত্বে

বিদেশ থেকে ফিরে রাজনী ভিসে Cancer Research Institute, Mumbai-তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

National Book Trust-এর জীবনী অনুযায়ী, তিনি সেখানে Carcinogenesis Division-এর প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং গবেষণাগারটির উন্নয়ন ও গবেষণার পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পরে তাঁর নিজের জীবনীতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৬–১৯৯০ সময়কালে Genetic Toxicity Unit-এর দায়িত্বে ছিলেন এবং ১৯৯০–২০০১ সাল পর্যন্ত Carcinogenesis Division-এর Head হিসেবে কাজ করেন।

একজন গবেষণা-প্রধানের কাজ শুধু নিজে পরীক্ষা করা নয়। তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, গবেষণার বিষয় নির্বাচন, পরীক্ষার পদ্ধতি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

রাজনী ভিসে এই সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিলেন।

তামাকের ক্ষতি নিয়ে অনুসন্ধান

তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তামাক এবং ক্যানসারের সম্পর্ক।

বিশেষ করে পানমশালা, বিড়ি এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের রাসায়নিক প্রভাব নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।

তাঁর নিজের সংক্ষিপ্ত গবেষণা-জীবনীতে বলা হয়েছে, তিনি তামাক ও পানমশালার cancer-causing effect বোঝার জন্য animal models, tissue culture, mutagenicity এবং biochemical assays ব্যবহার করেছিলেন। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের সঙ্গে জিনগত ক্ষতির সম্পর্কও অনুসন্ধান করেন।

এখানে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কেবল একটি রাসায়নিক পদার্থের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করেননি। বরং মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা, পেশা, পরিবেশ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সেই ঝুঁকিকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন।

বিড়ি শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা

ভারতে বিড়ি শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। কিন্তু বিড়ি তৈরির সময় দীর্ঘ সময় তামাকের ধুলো এবং অন্যান্য উপাদানের সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজনী ভিসের গবেষণায় এই পেশাগত ঝুঁকিও গুরুত্ব পায়।

Indian Medical Association-এর প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত Genetic Toxicology Laboratory-তে বিড়ি শ্রমিক এবং তামাক প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে পরিবেশগত তামাক-সংস্পর্শের ফলে জিনগত ক্ষতির সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।

এই গবেষণার গুরুত্ব ছিল দ্বিমুখী।

একদিকে এটি তামাকের রাসায়নিক ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য দিচ্ছিল। অন্যদিকে, কাজের পরিবেশের সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও সামনে আনছিল।

‘জিন’ এবং পরিবেশের সম্পর্ক

ক্যানসারের ক্ষেত্রে সব মানুষ একই ঝুঁকিতে থাকেন না। একই ধরনের পরিবেশগত সংস্পর্শেও ব্যক্তিভেদে ঝুঁকির পার্থক্য থাকতে পারে।

এই প্রশ্নটি বোঝার জন্য molecular epidemiology অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনী ভিসে এই ক্ষেত্রেও গবেষণা করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে gene-environment interaction বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য কীভাবে তামাকের মতো পরিবেশগত ঝুঁকির প্রভাবকে পরিবর্তিত করতে পারে—তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

২০০৭ সালের একটি গবেষণাপত্রে Rajani A. Bhisey-সহ গবেষকরা ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে oral cancer এবং কিছু নির্দিষ্ট genetic polymorphism-এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তামাকের সংস্পর্শকে একটি গুরুত্বপূর্ণ environmental exposure হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

এ ধরনের গবেষণা ক্যানসারকে শুধুমাত্র একটি রোগ হিসেবে না দেখে জিন + পরিবেশ + জীবনযাপন—এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বোঝার পথকে শক্তিশালী করে।

গবেষণাগারে তৈরি হয়েছিল নতুন মডেল

রাজনী ভিসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক কাজ ছিল পরিবেশগত carcinogens-এর প্রভাব বোঝার জন্য পরীক্ষামূলক animal model তৈরি করা।

তাঁর নিজের গবেষণা-জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, তিনি environmental agents-এর মাধ্যমে tumor initiation এবং promotion বোঝার জন্য বিশেষ animal models তৈরি ও ব্যবহার করেছিলেন।

এই ধরনের মডেল বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়।

কোনো ক্ষতিকর উপাদান শরীরের কোষে কী পরিবর্তন ঘটায়, সেই পরিবর্তন কীভাবে ধীরে ধীরে tumor formation-এর দিকে যেতে পারে—এসব বিষয় সরাসরি মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক মডেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনী ভিসে সেই গবেষণার ক্ষেত্রকে ভারতের ক্যানসার গবেষণায় আরও শক্তিশালী করতে কাজ করেন।

শুধু গবেষক নন, শিক্ষকও

রাজনী ভিসে গবেষণার পাশাপাশি বহু তরুণ বিজ্ঞানীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

তাঁর নিজের তথ্য অনুযায়ী, তিনি University of Bombay-তে Ph.D. ও M.Sc. গবেষণার guide হিসেবে কাজ করেছেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে ১০ জন Ph.D. ও একজন M.Sc. গবেষক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

এটি তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

একজন বিজ্ঞানীর প্রকাশিত গবেষণাপত্র তাঁর জ্ঞানকে ধরে রাখে। কিন্তু তাঁর ছাত্রছাত্রীরা সেই জ্ঞানকে আরও বহু বছর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

তাই গবেষণাগারের পাশাপাশি একজন ভালো mentor হিসেবেও রাজনী ভিসের অবদান উল্লেখযোগ্য।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশগ্রহণ

তাঁর গবেষণার পরিসর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি International Agency for Research on Cancer-এর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। IARC-এর প্রকাশিত নথিতে Rajani A. Bhisey-কে smokeless tobacco এবং tobacco-specific carcinogens নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক Working Group-এর সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

NCBI Bookshelf-এ প্রকাশিত IARC-এর আরেকটি নথিতেও তাঁকে একই ধরনের আন্তর্জাতিক গবেষণা আলোচনার সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে ভারতীয় তামাক-সম্পর্কিত গবেষণার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

অবসর মানেই গবেষণার শেষ নয়

প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়নি।

তিনি University of Pune-এর সঙ্গে Adjunct Professor হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা-জীবনীতে ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বের উল্লেখ রয়েছে। পরে Mumbai-র Center for Excellence in Basic Sciences-এর সঙ্গেও তিনি Faculty Member হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

অর্থাৎ তাঁর কাছে গবেষণা ছিল চাকরির নির্দিষ্ট সময়সীমায় আবদ্ধ কোনো কাজ নয়।

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গবেষণা, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক জনসচেতনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

বিজ্ঞান থেকে সমাজের দিকে

রাজনী ভিসের জীবনের বিশেষত্ব এখানেই যে, তাঁর গবেষণার বিষয়টি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ছিল—তামাক ও অন্যান্য চিবোনো পণ্যের সংস্পর্শ কীভাবে শরীরে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাতে পারে?

কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে তার সামাজিক প্রভাব সীমিত হতে পারত।

তাই তিনি তামাক ও পানমশালার ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজেও গুরুত্ব দিয়েছেন। National Book Trust-এর জীবনীতে তাঁকে oral cancer প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির সঙ্গে যুক্ত একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এখানে বিজ্ঞানীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়।

গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা—এটিও জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পুরস্কারের চেয়েও বড় উত্তরাধিকার

রাজনী ভিসে Indian National Science Academy-র Fellow ছিলেন; একটি সংকলনে তাঁকে environmental carcinogenesis এবং molecular epidemiology-র বিশেষজ্ঞ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, গবেষণা-অধ্যায় এবং পর্যালোচনামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নিজের দেওয়া সংক্ষিপ্ত CV-তে ৭৫টি full-length paper, chapter ও review-এর উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু তাঁর কাজের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু প্রকাশনার সংখ্যায় মাপা যায় না।

তিনি এমন একটি সময়ে ভারতে ক্যানসার গবেষণা করেছেন, যখন molecular epidemiology এবং genetic toxicology এখনও সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত শব্দ।

তিনি গবেষণার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন—ক্যানসার শুধু ভাগ্যের বিষয় নয়; পরিবেশ, পেশা, জীবনযাপন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের পারস্পরিক সম্পর্কও রোগের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এক বিজ্ঞানীর দীর্ঘ পথ

রাজনী এ. ভিসের জীবন একদিকে গবেষণাগারের কঠিন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের গল্প, অন্যদিকে সমাজের জন্য বিজ্ঞানের ব্যবহারিক মূল্য বোঝার গল্প।

বোম্বাইয়ের এক তরুণী ছাত্রী থেকে ক্যানসার গবেষক, বিদেশের গবেষণাগার থেকে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব, Genetic Toxicology Laboratory থেকে আন্তর্জাতিক IARC Working Group—তাঁর পথ ছিল বহুমাত্রিক।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন বিজ্ঞানীর কাজ কেবল নতুন তথ্য আবিষ্কার করা নয়।

কখনও সেই কাজের অর্থ হলো একটি বিপজ্জনক অভ্যাসের বৈজ্ঞানিক ক্ষতি বোঝানো।

কখনও তার অর্থ শ্রমিকদের অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করা।

কখনও আবার তরুণ গবেষকদের হাতে সেই জ্ঞান তুলে দেওয়া।

শেষ কথা

ড. রাজনী এ. ভিসের গবেষণার কেন্দ্রে ছিল এমন এক শত্রু, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না—কোষের ভিতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন।

তামাকের ধোঁয়া বা চিবোনো তামাকের রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করার পর কীভাবে জিনগত ক্ষতি তৈরি করতে পারে, পরিবেশগত সংস্পর্শ কীভাবে carcinogenesis-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে তিনি কয়েক দশক গবেষণা করেছেন।

তাঁর জীবন তাই শুধু একজন ক্যানসার গবেষকের জীবনী নয়।

এটি এমন একজন বিজ্ঞানীর গল্প, যিনি গবেষণাগারের মাইক্রোস্কোপ থেকে সমাজের বাস্তব জীবন পর্যন্ত বিজ্ঞানের সেতু তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

বিজ্ঞান কখনও কখনও খুব নিঃশব্দে মানুষের জীবন বদলে দেয়। একটি গবেষণাগারের পরীক্ষা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু সেই গবেষণা যদি কোনো রোগের কারণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেয়, ভবিষ্যৎ গবেষণাকে এগিয়ে দেয় কিংবা একটি বিপজ্জনক অভ্যাস সম্পর্কে সমাজকে সতর্ক করে—তাহলে তার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।

ড. রাজনী এ. ভিসের দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক জীবন সেই নীরব অথচ গভীর প্রভাবেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বিভা চৌধুরী: মহাজাগতিক রশ্মির রহস্য খুঁজতে আকাশের দিকে তাকানো এক ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী।

ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এমন অনেক নাম রয়েছে, যাঁরা নিজেদের সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁরা গবেষণা করেছেন, নতুন প্রশ্ন তুলেছেন, কঠিন বৈজ্ঞানিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন—কিন্তু জীবদ্দশায় তাঁদের অনেকের অবদান সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

ড. বিভা চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন বিজ্ঞানী।

পদার্থবিদ্যার এমন একটি শাখায় তিনি কাজ করেছিলেন, যার বিষয় ছিল পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্ব থেকে আসা অতি উচ্চশক্তির কণা—মহাজাগতিক রশ্মি বা Cosmic Rays। তাঁর গবেষণার সময় আধুনিক কণা-পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশবিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই এখনও বিকাশের পর্যায়ে। সেই সময় একজন ভারতীয় নারী হিসেবে পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করা ছিল নিজেই একটি বিরল ঘটনা।

আজ ভারতীয় বিজ্ঞান ইতিহাসে বিভা চৌধুরীর নাম নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। Tata Institute of Fundamental Research-এর Indian Physics Association-এর প্রকাশনায় তাঁকে TIFR-এর প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞানের পথে এক তরুণীর যাত্রা

বিভা চৌধুরী জন্মেছিলেন ১৯১৩ সালে। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন এমন এক সময়ে কেটেছে, যখন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগতে নারীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম।

তিনি পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩৬ সালে তিনি Physics-এ M.Sc. ডিগ্রি অর্জন করেন। TIFR-এর প্রকাশিত গবেষণামূলক জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৩৪–৩৬ সালের M.Sc. শ্রেণিতে ২৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ছাত্রী।

এই তথ্যটি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়।

এটি সেই সময়ের উচ্চশিক্ষায় নারীদের অবস্থানের একটি ছবি তুলে ধরে।

একটি পুরুষ-প্রধান শ্রেণিকক্ষে একমাত্র নারী শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা শেষ করে গবেষণার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে নিজের দক্ষতা দিয়ে জায়গা তৈরি করতে হয়েছিল।

গবেষণায় প্রবেশের সময় বাধা

M.Sc. শেষ করার পর বিভা চৌধুরী গবেষণা করতে চেয়েছিলেন। তিনি কলকাতার Bose Institute-এ অধ্যাপক ডি. এম. বসের গবেষণা দলে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কিন্তু শুরুতে তাঁকে গবেষণায় নেওয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করা হয়েছিল। TIFR-এর গবেষণামূলক ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ডি. এম. বসের প্রাথমিক আপত্তির কারণ ছিল সে সময় নারীদের জন্য উপযুক্ত গবেষণা প্রকল্প নেই—এমন ধারণা। শেষ পর্যন্ত বিভা চৌধুরী তাঁকে রাজি করাতে সক্ষম হন।

এই ঘটনা তাঁর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

তিনি সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকেননি।

তিনি নিজের আগ্রহের ক্ষেত্রটি বেছে নিয়ে সেই ক্ষেত্রের দরজা খুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

মহাজাগতিক রশ্মির সন্ধানে

বিভা চৌধুরীর গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল Cosmic Rays।

মহাজাগতিক রশ্মি আসলে মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এসে পৌঁছনো উচ্চশক্তির কণা। এগুলোর মধ্যে এমন কণা থাকে, যেগুলোর শক্তি ও আচরণ বিশ্লেষণ করলে মহাবিশ্বের উচ্চশক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

আজ বিজ্ঞানীরা কসমিক রে নিয়ে গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ডিটেক্টর, স্যাটেলাইট ও বিশাল পরীক্ষাগার ব্যবহার করেন। কিন্তু বিভা চৌধুরীর সময় প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না।

তখন বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের photographic plates এবং cloud chamber ব্যবহার করে উচ্চশক্তির কণার গতিপথ ও সংঘর্ষের চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করতেন।

এই কঠিন পরীক্ষামূলক গবেষণাতেই বিভা চৌধুরী নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

দার্জিলিং থেকে সান্দাকফু

তাঁর গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উচ্চ উচ্চতায় photographic plate ব্যবহার করে cosmic-ray shower পরীক্ষা করা।

TIFR-এর প্রকাশিত গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, Bose Institute-এ বিভা চৌধুরী ও ডি. এম. বসের গবেষণায় দার্জিলিং, সান্দাকফু এবং তৎকালীন ফারিজং অঞ্চলের বিভিন্ন উচ্চতায় photographic plates ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল মহাজাগতিক রশ্মি থেকে সৃষ্টি হওয়া কণার shower বা কণার ঝরনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।

আজকের দিনে কোনো পরীক্ষার জন্য পাহাড়ি অঞ্চলে যন্ত্র বসানো আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে এমন গবেষণা পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য।

গবেষকদের শুধু তত্ত্ব জানা থাকলেই চলত না।

তাঁদের যেতে হতো দুর্গম স্থানে, পরীক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করতে হতো, দীর্ঘ সময় ধরে photographic plates সংগ্রহ করতে হতো এবং পরে সেই প্লেটে তৈরি কণার রেখা বিশ্লেষণ করতে হতো।

বিভা চৌধুরী সেই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

একটি কণার রহস্য

তাঁর গবেষণার সময় পদার্থবিদ্যার একটি বড় প্রশ্ন ছিল—মহাজাগতিক রশ্মির মধ্যে থাকা অজানা কণাগুলোর প্রকৃতি কী?

Photographic plate-এ কণার চলার পথের চিহ্ন দেখে বিজ্ঞানীরা তাদের ভর, শক্তি, momentum এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা করতেন।

বিভা চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মীরা এই ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিলেন।

TIFR-এর গবেষণামূলক নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে, তাঁদের পরীক্ষায় কণার track-এর দৈর্ঘ্য, scattering এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট কণার ভৌত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল।

এই গবেষণা ছিল সেই সময়ের কণা-পদার্থবিদ্যার একেবারে সামনের সারির কাজ।

TIFR-এ যোগদান

১৯৪৯ সালে বিভা চৌধুরী Tata Institute of Fundamental Research (TIFR)-এ যোগ দেন।

TIFR-এর Indian Physics Association-এর প্রকাশনায় তাঁকে TIFR-এর প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, তিনি cosmic-ray গবেষণায় TIFR-এর প্রাথমিক দলকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

তখন TIFR ছিল ভারতের আধুনিক মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

হোমি জে. ভাভার নেতৃত্বে সেখানে পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন নতুন ক্ষেত্র গড়ে উঠছিল।

এই পরিবেশে বিভা চৌধুরীর cosmic-ray গবেষণা ভারতীয় উচ্চশক্তির পদার্থবিদ্যার বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বিদেশে গবেষণা

বিভা চৌধুরীর গবেষণাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বিদেশে কাজ ও প্রশিক্ষণ।

TIFR-এর প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি TIFR-এ কাজ করার পর ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে École Polytechnique, Paris এবং University of Michigan-এ সময় কাটান।

সেই সময় বিদেশের উন্নত গবেষণাগারে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে।

পরবর্তীকালে ভারতে ফিরে এসে তিনি গবেষণা চালিয়ে যান।

Physical Research Laboratory-তে নতুন অধ্যায়

১৯৫৮ সালে বিভা চৌধুরী Physical Research Laboratory (PRL), Ahmedabad-এ যোগ দেন।

সেখানে তিনি cosmic-ray গবেষণা চালিয়ে যান এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের প্রশিক্ষণ দেন।

PRL-এ তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল উচ্চশক্তির cosmic rays এবং কণার shower নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা।

তাঁর অধীনে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে পরবর্তীকালে বিশিষ্ট গবেষকরাও ছিলেন। TIFR-এর Physics News-এ প্রকাশিত স্মৃতিচারণে তাঁর একজন প্রাক্তন গবেষক তাঁকে একজন অসাধারণ mentor এবং শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করেছেন।

শুধু বিজ্ঞানী নন, শিক্ষকও

বিভা চৌধুরীর বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর শিক্ষকসত্তাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

TIFR-এর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় প্রাক্তন সহকর্মী ও ছাত্ররা তাঁর পড়ানোর পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। একজন প্রাক্তন TIFR ডিন তাঁকে এমন একজন শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করেছেন, যিনি খুব যত্ন নিয়ে lecture প্রস্তুত করতেন এবং ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিতেন।

এটি একজন গবেষকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

একজন বিজ্ঞানী একটি গবেষণাপত্র রেখে যেতে পারেন। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক নিজের জ্ঞানকে বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

বিভা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেই উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া নাম

বিভা চৌধুরীর জীবন নিয়ে TIFR-এর একটি বক্তৃতার শিরোনাম ছিল “Bibha Chowdhuri: A Scientist Incognito”—অর্থাৎ এমন একজন বিজ্ঞানী, যিনি দীর্ঘ সময় প্রায় অজ্ঞাতই থেকে গিয়েছিলেন। বক্তৃতার সারাংশে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর বহু বছর পর তাঁর কাজ নতুন করে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে।

এটি বিজ্ঞান ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।

কতজন বিজ্ঞানীর কাজ তাঁদের জীবদ্দশায় যথেষ্ট পরিচিতি পায়?

আর কতজনের অবদান পরে নতুন প্রজন্মের গবেষকরা আবিষ্কার করেন?

বিভা চৌধুরীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ঘটনাটিই অনেক বেশি স্পষ্ট।

নক্ষত্রের নামে স্মরণ

বহু বছর পর তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানকে নতুনভাবে স্মরণ করা হয়।

ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত একটি প্রকাশনায় বিভা চৌধুরীকে ভারতের প্রথম দিকের নারী উচ্চশক্তির পদার্থবিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রকাশনায় বলা হয়েছে, International Astronomical Union তাঁর নামে একটি নক্ষত্রের নামকরণ করেছে।

একজন বিজ্ঞানীর নাম একটি নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রতীকী অর্থেও অসাধারণ।

যিনি জীবনের বড় অংশ মহাজাগতিক কণার রহস্য অনুসন্ধান করেছেন, তাঁর নাম শেষ পর্যন্ত মহাকাশের একটি নক্ষত্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেল।

নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে আসা

বিভা চৌধুরীর স্মৃতি ধরে রাখতে TIFR ও Homi Bhabha Centre for Science Education-এর বিভিন্ন উদ্যোগও দেখা যায়।

২০২২ এবং ২০২৩ সালের Vigyan Vidushi কর্মসূচিতে Bibha Chowdhury Memorial Lecture অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল তরুণী পদার্থবিদদের উৎসাহিত করা এবং তাঁদের উন্নত পদার্থবিদ্যার গবেষণার সঙ্গে পরিচিত করা।

এ যেন তাঁর বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারের একটি নতুন অধ্যায়।

একসময় যে নারীকে গবেষণার সুযোগ পাওয়ার জন্য নিজেকেই দরজা খুলতে হয়েছিল, তাঁর নাম এখন তরুণী বিজ্ঞানীদের সামনে অনুপ্রেরণার অংশ হিসেবে ফিরে আসছে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

বিভা চৌধুরীর গল্পে কোনো একক মুহূর্তকে তাঁর সাফল্যের কারণ বলা যায় না।

ছিল কঠিন পড়াশোনা।

ছিল গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ।

ছিল সামাজিক বাধা।

ছিল গবেষণাগারে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম।

ছিল দেশের বাইরে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন।

ছিল দেশে ফিরে আবার গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করা।

আর ছিল দীর্ঘদিন পরিচিতির আড়ালে থেকে কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা।

তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের ইতিহাস শুধু সেইসব মানুষের ইতিহাস নয়, যাঁদের নাম পাঠ্যবইয়ের প্রথম পাতায় লেখা থাকে। অনেক সময় গবেষণার প্রকৃত অগ্রগতি তৈরি হয় এমন বিজ্ঞানীদের হাত ধরে, যাঁদের নাম পরে আবিষ্কার করতে হয়।

উত্তরাধিকার

আজ মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা মহাকাশবিজ্ঞান, কণা-পদার্থবিদ্যা এবং astroparticle physics-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতেও এই গবেষণার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের প্রাথমিক অধ্যায়ে বিভা চৌধুরীর কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

তিনি এমন এক সময়ে বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যখন একজন ভারতীয় নারীর পক্ষে পদার্থবিদ্যার গবেষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু তিনি সেই কঠিন পথেই এগিয়েছিলেন।

দার্জিলিং ও সান্দাকফুর পাহাড়ে photographic plate নিয়ে cosmic ray-এর চিহ্ন খোঁজা থেকে শুরু করে TIFR ও PRL-এর গবেষণাগার—তাঁর পথ ছিল দীর্ঘ এবং বৈজ্ঞানিক কৌতূহলে ভরা।

আজ তাঁর নাম একটি নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত আলো সেই নক্ষত্রে নয়—তাঁর রেখে যাওয়া বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারে।

ড. বিভা চৌধুরী প্রমাণ করে গেছেন, বিজ্ঞানের আকাশে আলো তৈরি করার জন্য সবসময় নিজের নাম পৃথিবীর মানুষকে জানাতে হয় না। কখনও কখনও একজন গবেষকের কাজই যথেষ্ট—সময়ের বহু পরে হলেও সেই আলো একদিন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

রোশিনি শর্মা: একা মোটরবাইকে কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর—সাহসের অন্য নাম।

ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য আজ আমাদের হাতে রয়েছে বিমান, ট্রেন, বাস কিংবা অসংখ্য আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা। কিন্তু কেউ যদি নিজের মোটরবাইকে একা দেশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেই যাত্রা শুধুই ভ্রমণ থাকে না—তা হয়ে ওঠে নিজের সীমাবদ্ধতাকে পরীক্ষা করার এক কঠিন অভিযান।

আর সেই অভিযান যখন একজন তরুণী একাই করেন, তখন তার তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।

রোশিনি শর্মার নাম সেই কারণেই আলাদা করে মনে রাখার মতো। তিনি মোটরবাইকে একা কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত যাত্রা করে ভারতীয় নারী বাইকারদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নজির তৈরি করেন। India Today এবং Times of India—দুই সূত্রই তাঁকে এই যাত্রার প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে তাঁর গল্প কেবল একটি দীর্ঘ বাইকযাত্রার গল্প নয়। এর শুরু হয়েছিল অনেক ছোটবেলায়—একটি মোটরসাইকেলের প্রতি গভীর আকর্ষণ থেকে।

ছোটবেলাতেই মোটরসাইকেলের প্রতি টান

রোশিনি শর্মার শৈশব কেটেছে উত্তরপ্রদেশের নারোরা অঞ্চলে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই মোটরসাইকেল তাঁর কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় ছিল।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন। তাঁর বাবা তাঁকে বাইক চালানো শেখানোর ক্ষেত্রে উৎসাহ দিয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে রোশিনি জানিয়েছেন, পরিবারের সমর্থন তাঁর আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

সেই বয়সে অনেকের কাছে মোটরসাইকেল ছিল নিছক যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু রোশিনির কাছে সেটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রতীক।

রাস্তার সঙ্গে পরিচয় যত বাড়তে থাকে, ততই তাঁর মনে জন্ম নেয় আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা।

প্রথম বাইক, প্রথম স্বাধীনতা

মোটরসাইকেল শেখার সময় প্রত্যেক নতুন চালকের মতো রোশিনিকেও গিয়ার, ক্লাচ, ব্যালান্স এবং বাঁক নেওয়ার মতো বিষয় আয়ত্ত করতে হয়েছিল।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছেন, শেখার একেবারে শুরুতেই একদিন বাবার অনুপস্থিতিতে নিজেই বাইক নিয়ে টিউশনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখনও বাইক ঘোরানোর ব্যাপারে তাঁর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি। কিন্তু সেই প্রথম স্বাধীন যাত্রাই তাঁর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

এরপর আর পিছনে তাকাননি তিনি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইকের প্রতি তাঁর আগ্রহও বাড়তে থাকে। ছোট শহরের সামাজিক পরিবেশে একজন মেয়ের মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকলেও পরিবারের সমর্থন তাঁকে নিজের আগ্রহকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা ও বেঙ্গালুরু

রোশিনি শর্মা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন এবং পরে বেঙ্গালুরুতে যান। তাঁর জীবনের এই পর্যায়ে মোটরসাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।

বেঙ্গালুরুর ব্যস্ত রাস্তায় বাইক চালানো প্রথমদিকে তাঁর কাছেও সহজ ছিল না। কিন্তু নতুন শহরের রাস্তা, ট্রাফিক এবং ব্যস্ততার সঙ্গে ধীরে ধীরে তিনি অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

একটি Women’s Day মোটরসাইকেল র‍্যালিতে অংশ নেওয়া তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। সেখানে অন্য নারী বাইকারদের দেখে তাঁর নিজের মধ্যেও আরও বড় যাত্রার ইচ্ছা তৈরি হয়। র‍্যালিতে তিনি একটি ৩৫০ সিসি মোটরসাইকেলও চালান, যা তাঁর আগের অভিজ্ঞতার তুলনায় বড় ছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

তারপর থেকেই বড় কোনো বাইক-অভিযানের চিন্তা তাঁর মনে জায়গা করে নিতে শুরু করে।

উত্তর থেকে দক্ষিণ—এক বন্ধুর গল্পে নতুন স্বপ্ন

রোশিনির জীবনে কন্যাকুমারী-কश्मीर যাত্রার ভাবনাটি হঠাৎ আসেনি।

এক বন্ধুর উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত মোটরসাইকেল ভ্রমণের কথা শুনে তাঁর নিজের মধ্যেও একই ধরনের একটি দীর্ঘ যাত্রার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু তিনি শুধু অন্যের পথ অনুসরণ করতে চাননি। বরং এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা নিজের কাছে নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং।

তখনই জন্ম নেয় Kanyakumari to Kashmir, অর্থাৎ দেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত মোটরবাইকে একা যাওয়ার পরিকল্পনা।

একজন নারীর পক্ষে এত দীর্ঘ পথ একা বাইকে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা সেই সময়ে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী ছিল।

চাকরি ছেড়ে অভিযানে

বড় স্বপ্নের সঙ্গে বড় সিদ্ধান্তও আসে।

রোশিনি একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই যাত্রার জন্য তাঁকে চাকরি ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় থাকার জন্য সাধারণ চাকরির ছুটি যথেষ্ট ছিল না।

চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত একটি যাত্রায় বেরিয়ে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

একদিকে ছিল পেশাগত ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে ছিল নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

শেষ পর্যন্ত তিনি যাত্রার পথকেই বেছে নেন।

কন্যাকুমারী থেকে যাত্রা শুরু

ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারী থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।

দক্ষিণ ভারতের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে ধীরে ধীরে মধ্য ভারত, উত্তর ভারত এবং শেষ পর্যন্ত হিমালয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের মুখোমুখি হওয়া।

একই যাত্রায় বদলে যায়—

  • আবহাওয়া,
  • রাস্তার ধরন,
  • ভূপ্রকৃতি,
  • খাবার,
  • ভাষা,
  • মানুষের জীবনযাপন।

একজন একাকী বাইকারের জন্য প্রতিটি পরিবর্তনই নতুন অভিজ্ঞতা।

আর রোশিনিকে এগোতে হয়েছে নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের প্রস্তুতির ওপর ভরসা করে।

পথ সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি

দীর্ঘ বাইকযাত্রার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—কাগজে যে পরিকল্পনা করা যায়, বাস্তব রাস্তা সবসময় সেই পরিকল্পনা মেনে চলে না।

রোশিনির নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রার সময় একাধিকবার তিনি দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিলেন। কখনও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিও এসেছিল যখন তাঁকে রাত পর্যন্ত বাইক চালাতে হয়েছিল।

অর্থাৎ তাঁর যাত্রা কোনো সাজানো পর্যটনভ্রমণ ছিল না।

ছিল বাস্তব রাস্তা, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা।

এই কারণেই তাঁর যাত্রাকে শুধুমাত্র একটি ‘রেকর্ড’ হিসেবে দেখলে গল্পটির আসল দিকটি বাদ পড়ে যায়।

পাহাড়ের পথে নতুন পরীক্ষা

দেশের উত্তর দিকে যেতে যেতে রাস্তার চরিত্র বদলে যায়। সমতল থেকে পাহাড়ি পথে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেল চালানোর কৌশলও বদলাতে হয়।

পাহাড়ি রাস্তায় বাঁক, ঢাল, আবহাওয়া এবং রাস্তার অবস্থার দিকে আরও বেশি নজর রাখতে হয়।

রোশিনির যাত্রার শেষ অংশ ছিল উত্তর ভারতের কঠিন ভূপ্রকৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর।

একটি মোটরসাইকেল নিয়ে একা এতটা পথ অতিক্রম করার মধ্যে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক স্থিরতাও প্রয়োজন।

সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন

রোশিনির গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামাজিক মানসিকতা।

তিনি যে পরিবেশ থেকে এসেছিলেন, সেখানে মেয়েদের মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে প্রশ্ন উঠত। তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে, পরিবারের বাইরের কিছু মানুষ মনে করতেন, মেয়েদের পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং পরে বিয়ে করাই যেন স্বাভাবিক পথ।

রোশিনি সেই প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে না গিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে উত্তর দিয়েছেন।

তিনি কাউকে বোঝানোর জন্য মোটরসাইকেলে ওঠেননি।

তিনি উঠেছিলেন কারণ বাইক চালানো তাঁর ভালো লাগত এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নিজের একটি স্বপ্ন ছিল।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

একা পথ চলার মানে

একজন একাকী নারী বাইকার যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন, তখন তাঁকে একই সঙ্গে অনেক বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়।

নিজের নিরাপত্তা, মোটরসাইকেলের অবস্থা, রাস্তার পরিস্থিতি, থাকার জায়গা, খাবার, আবহাওয়া—প্রতিটি বিষয়ের দায়িত্ব নিজের।

কেউ পাশে থাকলে সিদ্ধান্ত ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু একা যাত্রায় ভুলের সুযোগ অনেক কম।

রোশিনির কন্যাকুমারী-কश्मीर অভিযান তাই তাঁর আত্মনির্ভরতারও একটি পরীক্ষা ছিল।

একটি যাত্রা, অনেক অনুপ্রেরণা

২০১৬ সালের India Today এবং ২০২১ সালের Times of India—উভয় প্রকাশনাই রোশিনি শর্মার কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর মোটরবাইক যাত্রাকে নারী অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

তাঁর গল্পের প্রভাব শুধু সেই সময়ের সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে বাইকিং নিয়ে সাক্ষাৎকার ও পডকাস্টও হয়েছে। ২০২২ সালে BIG FM-এর ‘Biker Divas’ সিরিজে তাঁর যাত্রা নিয়ে একটি পূর্ণ পর্ব প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি তাঁর শৈশব, বাবার কাছ থেকে বাইক শেখা, বেঙ্গালুরুতে বাইকিং শুরু করা এবং Kanyakumari-to-Kashmir যাত্রার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন।

অর্থাৎ তাঁর অভিযান পরবর্তী সময়েও নারী বাইকারদের গল্পের অংশ হয়ে থেকেছে।

রাস্তাকে ভয় না করে রাস্তা বোঝা

রোশিনি শর্মার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এই যে, তিনি বাইককে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর যন্ত্র হিসেবে দেখেননি।

বাইক তাঁর কাছে ছিল নিজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম।

দীর্ঘ রাস্তা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। কোথাও রাস্তা মসৃণ, কোথাও ভাঙাচোরা। কোথাও দ্রুত এগোনো যায়, কোথাও ধীরে চলতে হয়। কখনও পরিকল্পনা বদলাতে হয়, কখনও থামতে হয়।

জীবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।

সব রাস্তা আগে থেকে জানা থাকে না।

কিছু পথ চলতে চলতেই তৈরি হয়।

নারী বাইকারদের জন্য নতুন দিগন্ত

আজ ভারতের রাস্তায় নারী মোটরসাইকেল চালকদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। দীর্ঘ দূরত্বের বাইকিং, মোটরসাইকেল ট্রাভেল এবং অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়েও বহু নারী অংশ নিচ্ছেন।

এই পরিবর্তনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। রোশিনি শর্মার কন্যাকুমারী-কश्मीर অভিযান সেই ধারার একটি স্মরণীয় উদাহরণ।

তাঁর যাত্রা দেখিয়েছিল—দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য একজন নারীকে অবশ্যই কারও সঙ্গী হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

নিজের প্রস্তুতি, দক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে একজন নারীও নিজের পথ নিজেই বেছে নিতে পারেন।

শেষ কথা

রোশিনি শর্মার গল্পে কোনো রাজপ্রাসাদ নেই, কোনো বড় মঞ্চ নেই, নেই প্রচলিত অর্থে কোনো পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকাও।

আছে একটি মোটরসাইকেল।

আছে একটি দীর্ঘ রাস্তা।

আর আছে এক তরুণীর নিজের ওপর বিশ্বাস।

কন্যাকুমারীর সমুদ্রতট থেকে উত্তরের পাহাড়ি পথ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা আসলে ভারতের ভূগোলের মধ্য দিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্বপ্নের যাত্রা।

তিনি দেখিয়েছেন, সাহস মানে ভয় না থাকা নয়। বরং ভয়, অনিশ্চয়তা এবং বাধা থাকা সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াই সাহস।

একসময় যে প্রশ্ন উঠেছিল—“একজন মেয়ে একা বাইক নিয়ে এত দূর যাবে কীভাবে?”—তার উত্তর রোশিনি কথায় দেননি।

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন রাস্তায়।

আর সেই রাস্তাই আজ তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর—হাজার হাজার কিলোমিটারের সেই যাত্রা তাই শুধু একটি মোটরবাইক অভিযান নয়; এটি নিজের স্বপ্নকে নিজের হাতে স্টার্ট দিয়ে অজানা পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ কাহিনি।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. আবান মিস্ত্রী: তবলার তালে ইতিহাস গড়া ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশাল জগতে কিছু বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে এমন কিছু সামাজিক ধারণা জড়িয়ে ছিল, যা বহুদিন ধরে ভাঙা সহজ ছিল না। তবলা তার অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে তবলা বাদক হিসেবে পুরুষ শিল্পীদেরই বেশি দেখা যেত। সেই পরিবেশে একজন নারী যখন তবলাকে নিজের সাধনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন, তখন সেটি নিছক সংগীতচর্চা ছিল না—ছিল এক ধরনের সামাজিক বাধা অতিক্রমের ঘটনাও।

সেই সাহসী শিল্পীর নাম ড. আবান এ. মিস্ত্রী। সরকারি ‘First Ladies’ সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘First Lady of India’ সম্মানেও ভূষিত করা হয়। তাঁর একক তবলা পরিবেশনা ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে প্রশংসিত হয়েছিল।

তবে আবান মিস্ত্রীর পরিচয় শুধু ‘প্রথম মহিলা তবলা বাদক’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন সংগীতশিল্পী, গবেষক, শিক্ষিকা, লেখক এবং সংগীতশাস্ত্রের একজন নিবেদিত সাধক।

সংগীতময় পরিবারে শৈশব

আবান মিস্ত্রীর জন্ম ৬ মে ১৯৪০ সালে মুম্বইয়ে। তাঁর পরিবারেও সংগীতের পরিবেশ ছিল। তাঁর বাবা এরচশাহ পি. মিস্ত্রী ছিলেন বেহালাবাদক এবং মা সরশেদ মিস্ত্রী দিলরুবা বাজাতেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীত তাঁর পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে।

মাত্র চার বছর বয়সে তিনি সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রথমে তাঁর মাসি মেহরু ওয়ার্কিংবক্সওয়ালার কাছে তিনি হিন্দুস্তানি কণ্ঠসংগীত শেখেন। পরবর্তীকালে পণ্ডিত লক্ষ্মণরাও বডাসের কাছেও দীর্ঘদিন সংগীত শিক্ষা নেন।

শৈশব থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল নানা ধরনের শিল্পকলায়। কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর শিল্পীসত্তার সামনে একটি বড় মোড় এসে দাঁড়ায়।

নৃত্য থেকে তবলার পথে

আবান মিস্ত্রীর সংগীতজীবনের শুরু তবলা দিয়ে হয়নি। তিনি নৃত্য শেখার প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর নৃত্যচর্চার স্বপ্নে বাধা আসে।

সেই সময় তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন পণ্ডিত কেকি এস. জিজিনা। তিনি আবানকে তবলার দিকে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দেন। ধীরে ধীরে তবলাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান সাধনার ক্ষেত্র।

এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে।

উস্তাদ আমির হুসেন খানের কাছে শিক্ষা

আবান মিস্ত্রীর তবলা শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম উস্তাদ আমির হুসেন খান। তিনি পণ্ডিত কেকি এস. জিজিনা এবং উস্তাদ আমির হুসেন খানের মতো গুরুদের কাছ থেকে তালবাদ্যের গভীর শিক্ষা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে পণ্ডিত লক্ষ্মণরাও বডাসের কাছ থেকেও সংগীতের শিক্ষা চালিয়ে যান।

তবলার মতো একটি কঠিন বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ অনুশীলন, তাল-লয়ের গভীর জ্ঞান এবং অসাধারণ ধৈর্য দরকার। আবান মিস্ত্রী এই তিনটিকেই নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন।

তাঁর বাদনে বিভিন্ন ঘরানার প্রভাবও দেখা যায়। তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি দিল্লি, ফরুকাবাদ, আজরাড়া এবং বেনারসের তবলা-পরম্পরার নানা বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করেছিলেন। পখাওয়াজের শিক্ষাও তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

যে সময়ে নারী তবলা বাজানো ছিল ব্যতিক্রম

আজকের দিনে নারী তবলা শিল্পী দেখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আবান মিস্ত্রীর কর্মজীবনের শুরুর সময়টা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

তখন মঞ্চে একজন নারীকে তবলা বাজাতে দেখা অনেকের কাছেই নতুন বিষয় ছিল। এমনকি সংগীতজগতের কিছু মানুষও প্রথম দিকে নারী তবলা বাদককে সহজে গ্রহণ করতে পারেননি।

মারাঠি বিশ্বকোষে প্রকাশিত তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, কর্মজীবনের শুরুর দিকে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল যখন মহিলা গায়িকারা তাঁকে সঙ্গতশিল্পী হিসেবে নিতে দ্বিধা করতেন। কিন্তু সেই বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি।

তিনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে ধীরে ধীরে সেই সংশয় দূর করেন।

এখানেই আবান মিস্ত্রীর বিশেষত্ব। তিনি শুধু অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেননি; বরং এমন একটি ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যেখানে নারীর উপস্থিতিই তখন ছিল ব্যতিক্রম।

মঞ্চ থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর

আবান মিস্ত্রী একক তবলা পরিবেশনায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, তাঁর একক পরিবেশনা ভারত এবং বিদেশ—দুই ক্ষেত্রেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন।

২০০২ সালে ‘Times of India’-র একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা তবলা বাদক হিসেবে উল্লেখ করে ধারওয়াড়ে তাঁর পরিবেশনার কথা লেখা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে তাঁকে উচ্চমানের তবলা শিল্পী, সংগীতশাস্ত্রবিদ এবং পণ্ডিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তাঁর বাদনে শুধু দ্রুততা বা কারিগরি দক্ষতা ছিল না; তাল, লয় এবং সংগীতের কাঠামো সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়াও ছিল।

শিল্পীর পাশাপাশি গবেষক

আবান মিস্ত্রীর জীবনকে অন্য অনেক শিল্পীর জীবন থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো তাঁর গবেষণামূলক কাজ।

তিনি তবলা ও পখাওয়াজের ইতিহাস, ঘরানা এবং পরম্পরা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “Pakhawaj and Tabla: History, Schools and Traditions”। তাঁর এই কাজ তবলা-পখাওয়াজের ঐতিহ্য, ঘরানা এবং বিকাশকে নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

তিনি ‘Tabley ki Bandishein’ নামেও একটি কাজ করেছিলেন। সংগীতশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণামূলক অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সংগীতের পাঠ্যসূচিতেও তাঁর নাম ও কাজ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ তিনি শুধু মঞ্চে তবলা বাজিয়ে থেমে থাকেননি; তবলার জ্ঞানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করার কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

শিক্ষিকা আবান মিস্ত্রী

একজন শিল্পীর প্রকৃত উত্তরাধিকার অনেক সময় তাঁর নিজের পরিবেশনার চেয়েও তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আবান মিস্ত্রী এই দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, ভিজিটিং প্রফেসর, প্রশিক্ষক ও বিচারক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

মুম্বইয়ের ওয়াডিয়া মিউজিক ক্লাসে তিনি প্রায় ২৫ বছর শিক্ষাদান করেছিলেন বলে মারাঠি বিশ্বকোষে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সপল জিজিনা, আদিল মিস্ত্রী এবং সুরেশ শিংগাড়ের নাম পাওয়া যায়।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিনি কর্মশালাও পরিচালনা করতেন। ফলে তাঁর সংগীতচর্চা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যেও সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

একাধিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা

আবান মিস্ত্রীর শিক্ষাজীবনও ছিল বহুমাত্রিক।

তবলার পাশাপাশি তিনি কণ্ঠসংগীত, সেতার এবং সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। সরকারি জীবনীতে তাঁকে তবলায় ‘Sangeet Praveen’, কণ্ঠসংগীতে ‘Sangeet Alankar’, সেতারে ‘Sangeet Visharad’ এবং হিন্দি ও সংস্কৃতে ‘Sahitya Ratna’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ডক্টরেটও ছিল সংগীত ও পারকাশন নিয়ে।

এই শিক্ষার ব্যাপ্তি দেখায় যে তাঁর কাছে সংগীত কেবল মঞ্চে পরিবেশনের বিষয় ছিল না। সংগীতের ইতিহাস, তত্ত্ব, সাহিত্য এবং বাদ্যযন্ত্র—সবকিছুকে মিলিয়ে তিনি একটি বৃহত্তর জ্ঞানভুবন তৈরি করেছিলেন।

সংগীতের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ

আবান মিস্ত্রী সংগীতচর্চার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি Swar Sadhna Samiti-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বলে প্রকাশিত জীবনীমূলক তথ্য থেকে জানা যায়।

এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শিল্পীদের পরিবেশনা, শিক্ষার সুযোগ এবং সংগীতচর্চার পরিসর তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

তাঁর কাছে সংগীত ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যম নয়; এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যাকে সংরক্ষণ ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়ও শিল্পীর রয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

দীর্ঘ সংগীতজীবনে আবান মিস্ত্রী বিভিন্ন সম্মান অর্জন করেন। তাঁর পরিচিত সম্মানগুলোর মধ্যে ‘Taal Mani’, ‘Sangeet Setu’ এবং ‘Sangeet Kala Ratna’-র মতো উপাধির উল্লেখ পাওয়া যায়।

২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও সংগীতমহলে তাঁর অবদানের স্মরণ অব্যাহত থাকে। ২০১৮ সালে ভারত সরকারের ‘First Ladies’ উদ্যোগে তাঁকে মরণোত্তর সম্মান দেওয়া হয়।

আজ তাঁর নাম সংগীতশিক্ষার বিভিন্ন পাঠ্যসূচিতেও পড়ানো হয়। অর্থাৎ তাঁর কাজ কেবল অতীতের একটি স্মৃতি হয়ে নেই; সংগীতের শিক্ষার্থীরা এখনও তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে পড়াশোনা করে।

তবলার প্রতিটি বোলের মধ্যে এক নতুন ইতিহাস

আবান মিস্ত্রীর গল্প আসলে একটি বাদ্যযন্ত্রের গল্পের থেকেও বড়।

তিনি এমন একটি সময়ে তবলা হাতে নিয়েছিলেন, যখন নারীকে এই ক্ষেত্রের কেন্দ্রে দেখা খুব স্বাভাবিক ছিল না। তাঁকে নিজের দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে তাল ও লয়ের কোনো লিঙ্গ নেই।

তাঁর হাতে তবলা হয়ে উঠেছিল আত্মপ্রকাশের ভাষা। কখনও একক পরিবেশনার মাধ্যমে, কখনও শিক্ষাদানের মাধ্যমে, কখনও গবেষণার পাতায়—তিনি একই সঙ্গে শিল্পী এবং জ্ঞানসাধকের ভূমিকা পালন করেছেন।

আর তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এখানেই—তিনি পরবর্তী প্রজন্মের নারী শিল্পীদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছিলেন।

উত্তরাধিকার

আজ ভারতের বিভিন্ন মঞ্চে অসংখ্য নারী তবলা শিল্পীকে দেখা যায়। তাঁদের প্রত্যেকের পথ আলাদা। কিন্তু এই পথকে আরও প্রশস্ত করার জন্য যাঁরা অনেক আগে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ড. আবান মিস্ত্রীর নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

একজন নারী শিল্পী যখন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের প্রতিভাকে প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর সাফল্য ব্যক্তিগত থাকে না। তা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠে।

আবান মিস্ত্রী সেই পরিবর্তনেরই এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

তাঁর হাতে তবলার বোল শুধু “ধা”, “তিন”, “না”, “ধিন” হয়ে থাকেনি—সেগুলো হয়ে উঠেছিল আত্মবিশ্বাসের ভাষা। তাঁর জীবন দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো শিল্পক্ষেত্রকে যদি সত্যিকারের ভালোবাসা যায়, তবে সেই শিল্পের দরজা একদিন না একদিন আরও অনেক মানুষের জন্য খুলে যায়।

ড. আবান মিস্ত্রী তাই শুধু ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার নন; তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এমন এক পথপ্রদর্শক, যাঁর সাধনা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হয়ে রয়েছে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

ডুব্রোভনিক—অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের নীল জলে ঘেরা পাথরের শহর।

নীল সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন পাথরের শহর—যার চারদিকে বিশাল দুর্গপ্রাচীর, সরু গলি, পুরনো গির্জা, ঘণ্টাধ্বনি আর লাল টালির ছাদ। প্রথম দর্শনে ডুব্রোভনিককে দেখে মনে হতে পারে, কোনো রূপকথার বইয়ের শহর বাস্তবে এসে দাঁড়িয়েছে।

ক্রোয়েশিয়ার দক্ষিণ উপকূলে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে অবস্থিত ডুব্রোভনিক ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক শহর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শহর বাণিজ্য, সমুদ্রযাত্রা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

শহরের পুরনো অংশ বা Old Town-এর চারপাশের দুর্গপ্রাচীর, পাথরে বাঁধানো রাস্তা, ঐতিহাসিক ভবন এবং নীল সমুদ্র—সব মিলিয়ে ডুব্রোভনিকের সৌন্দর্য অন্যরকম।

এটি এমন একটি শহর, যেখানে সকালে পুরনো দুর্গের দেয়াল ধরে হাঁটা যায়, দুপুরে সমুদ্রের ধারে বসে থাকা যায়, বিকেলে পাহাড়ের চূড়া থেকে পুরো শহর দেখা যায় এবং রাতে আলোকিত পুরনো গলির মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটা যায়।


ডুব্রোভনিক কোথায়?

ডুব্রোভনিক ক্রোয়েশিয়ার দক্ষিণে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে অবস্থিত।

শহরের একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে পাহাড়। এই ভৌগোলিক অবস্থান শহরটিকে প্রাকৃতিকভাবেই অসাধারণ করে তুলেছে।

ডুব্রোভনিকের ঐতিহাসিক কেন্দ্রটি পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝখানে গড়ে উঠেছে। সমুদ্রের দিক থেকে শহরের দিকে তাকালে পুরনো দুর্গপ্রাচীর এবং লাল ছাদের বাড়িগুলো একসঙ্গে দেখা যায়।

এই দৃশ্যই ডুব্রোভনিকের সবচেয়ে পরিচিত ছবি।


Old Town—শহরের হৃদয়

ডুব্রোভনিক ভ্রমণের মূল আকর্ষণ হলো Old Town।

শহরের ঐতিহাসিক অংশে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল পাথরের ফটক। ভেতরে ঢোকার পর শুরু হয় পাথরে বাঁধানো রাস্তা।

এখানে আধুনিক গাড়ির ভিড় নেই। সরু গলির মধ্যে ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং শতাব্দী পুরনো স্থাপত্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

পুরনো শহরের অন্যতম প্রধান রাস্তা হলো Stradun।

এই প্রশস্ত পাথরের রাস্তা ডুব্রোভনিকের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

সকালে পর্যটকরা এখানে হাঁটেন। দুপুরে রেস্তোরাঁ ও দোকানগুলো ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় আলো জ্বলে উঠলে Stradun-এর পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যায়।


Dubrovnik City Walls

ডুব্রোভনিকের সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণ হলো এর City Walls।

এই বিশাল দুর্গপ্রাচীর পুরনো শহরকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। প্রাচীরের উপর দিয়ে হাঁটলে একদিকে পুরনো শহরের লাল ছাদ দেখা যায়, অন্যদিকে নীল অ্যাড্রিয়াটিক সাগর।

প্রাচীরের বিভিন্ন অংশ থেকে শহরের বিভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়।

কোথাও নিচে সমুদ্রের ঢেউ পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে, কোথাও ছোট নৌকা চলছে, আবার কোথাও পুরনো বাড়ির ছাদগুলো পাশাপাশি সাজানো।

সূর্যাস্তের সময় City Walls-এ হাঁটার অভিজ্ঞতা বিশেষ সুন্দর।


Pile Gate

Old Town-এ প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হলো Pile Gate।

ঐতিহাসিকভাবে এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ছিল।

গেটের স্থাপত্যে ডুব্রোভনিকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও মধ্যযুগীয় নগর পরিকল্পনার পরিচয় পাওয়া যায়।

আজও পর্যটকদের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পুরনো শহরে প্রবেশ করেন।


Ploče Gate

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হলো Ploče Gate।

এখান থেকেও পুরনো শহরের দিকে প্রবেশ করা যায় এবং আশপাশের সমুদ্র ও দুর্গের দৃশ্য দেখা যায়।

দুটি প্রবেশদ্বারই ডুব্রোভনিকের ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


Rector’s Palace

Old Town-এর অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো Rector’s Palace।

ভবনটি ডুব্রোভনিকের পুরনো শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

স্থাপত্যে বিভিন্ন সময়ের প্রভাব দেখা যায়। এর ভেতরের কক্ষ, পাথরের সিঁড়ি ও উঠান শহরের অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আজ এটি একটি জাদুঘর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।


Sponza Palace

আরেকটি ঐতিহাসিক ভবন হলো Sponza Palace।

এই ভবন একসময় বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ডুব্রোভনিকের প্রাচীন বাণিজ্যিক গুরুত্ব বোঝার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

ভবনের স্থাপত্যে Gothic ও Renaissance প্রভাবের মিশ্রণ দেখা যায়।


Onofrio’s Fountain

Pile Gate-এর কাছে রয়েছে Onofrio’s Fountain।

মধ্যযুগীয় ডুব্রোভনিকের জল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে এই ফোয়ারার ইতিহাস জড়িত।

আজ এটি পর্যটকদের কাছে একটি পরিচিত স্থাপত্য নিদর্শন।

গরম দিনে এখানে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানির স্পর্শ নেওয়া অনেক পর্যটকের কাছে আনন্দের অভিজ্ঞতা।


Franciscan Monastery

ডুব্রোভনিকের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে Franciscan Monastery বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে প্রাচীন স্থাপত্যের পাশাপাশি একটি ঐতিহাসিক ফার্মেসির সঙ্গে সম্পর্কিত সংগ্রহও রয়েছে।

মঠের প্রাঙ্গণ শান্ত ও সুন্দর।

পুরনো পাথরের স্তম্ভ, খিলান এবং উঠান শহরের ব্যস্ততার মধ্যে একটি আলাদা পরিবেশ তৈরি করে।


Dubrovnik Cathedral

শহরের ধর্মীয় স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলো Dubrovnik Cathedral।

এর অভ্যন্তরে ধর্মীয় শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে।

ডুব্রোভনিকের দীর্ঘ ইতিহাসে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। Cathedral সেই ইতিহাসের একটি অংশ।


St. Blaise Church

Dubrovnik-এর পৃষ্ঠপোষক সাধু হিসেবে Saint Blaise বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর নামে নির্মিত St. Blaise Church Old Town-এর অন্যতম পরিচিত স্থাপনা।

চারপাশের ঐতিহাসিক ভবনের মধ্যে গির্জাটির স্থাপত্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

স্থানীয় সংস্কৃতিতে Saint Blaise-এর গুরুত্ব আজও রয়েছে।


Gundulić Square

Old Town-এর আরেকটি পরিচিত স্থান হলো Gundulić Square।

এখানে বাজার বসে এবং স্থানীয় পণ্য, ফল, মশলা ও বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায়।

সকালের দিকে স্থানীয় বাজারের পরিবেশ পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়।

এখানে দাঁড়ালে ডুব্রোভনিকের পর্যটননির্ভর পরিচয়ের বাইরে স্থানীয় জীবনের কিছুটা স্বাদ পাওয়া যায়।


Lokrum Island—শহরের কাছের সবুজ দ্বীপ

ডুব্রোভনিকের ঠিক সামনে সমুদ্রের মধ্যে দেখা যায় একটি সবুজ দ্বীপ—Lokrum।

শহর থেকে নৌকায় অল্প সময়েই এখানে পৌঁছানো যায়।

Lokrum-এর বড় আকর্ষণ হলো এর বনভূমি, সমুদ্রতীর এবং নিরিবিলি পরিবেশ।

শহরের ভিড় থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য দূরে থাকতে চাইলে এটি ভালো গন্তব্য।

দ্বীপে হাঁটার পথ রয়েছে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাও দেখা যায়।


Lokrum-এর প্রকৃতি

Lokrum-এর সবুজ গাছপালা এবং পাথুরে উপকূল ডুব্রোভনিকের পুরনো শহরের সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশ তৈরি করে।

এখানে পাইন, সাইপ্রাস ও অন্যান্য ভূমধ্যসাগরীয় উদ্ভিদ দেখা যায়।

সমুদ্রের নীল জলের সঙ্গে সবুজ গাছপালার বৈপরীত্য অত্যন্ত সুন্দর।


Mount Srđ—শহরকে উপর থেকে দেখা

ডুব্রোভনিকের পেছনে উঠে গেছে Mount Srđ।

পাহাড়ের উপরে উঠে নিচের দিকে তাকালে পুরো Old Town, City Walls এবং অ্যাড্রিয়াটিক সাগর একসঙ্গে দেখা যায়।

এখানে যাওয়ার জন্য কেবল কার ব্যবহার করা যায়।

বিশেষ করে বিকেলের শেষ দিকে Mount Srđ থেকে শহরের দৃশ্য অসাধারণ।

সূর্য যখন সমুদ্রের দিকে নিচে নামতে থাকে, তখন শহরের লাল ছাদগুলো সোনালি আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


Dubrovnik Cable Car

Mount Srđ-এ ওঠার অন্যতম জনপ্রিয় উপায় হলো cable car।

উপরে ওঠার সময় ধীরে ধীরে শহর নিচে ছোট হতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পুরো Old Town একটি ক্ষুদ্র ছবির মতো মনে হয়।

উপরে পৌঁছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের বিস্তৃত নীল জল দেখা যায়।

পরিষ্কার দিনে দূরের দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলও দেখা যেতে পারে।


Adriatic Sea

ডুব্রোভনিকের সৌন্দর্যের একটি বড় অংশ এসেছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর থেকে।

সমুদ্রের জল অনেক জায়গায় স্বচ্ছ নীল। পাথুরে উপকূল, ছোট উপসাগর এবং দ্বীপের কারণে সমুদ্রের দৃশ্য প্রতিটি জায়গায় আলাদা।

অনেক পর্যটক নৌভ্রমণ করে শহরকে সমুদ্রের দিক থেকে দেখতে পছন্দ করেন।

সমুদ্র থেকে City Walls-এর দৃশ্য বিশেষ আকর্ষণীয়।


Kayaking

ডুব্রোভনিকের আশপাশে kayaking একটি জনপ্রিয় কার্যকলাপ।

ছোট নৌকায় বসে সমুদ্রের উপর দিয়ে শহরের প্রাচীর, পাথুরে উপকূল এবং Lokrum-এর আশপাশ ঘুরে দেখা যায়।

শান্ত সমুদ্রে সকালে kayaking করলে পানির স্বচ্ছতা ও শহরের দৃশ্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায়।

অবশ্যই আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিস্থিতি বিবেচনা করে অভিজ্ঞ গাইডের সঙ্গে এই কার্যকলাপ করা উচিত।


Banje Beach

Old Town-এর কাছাকাছি পরিচিত সৈকতগুলোর মধ্যে Banje Beach অন্যতম।

এখান থেকে একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে পুরনো শহরের দৃশ্য দেখা যায়।

গ্রীষ্মকালে সৈকতটি ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

সকালে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে সমুদ্র দেখা এবং বিকেলে শহরের দিকে ফিরে আসা—দুটিই উপভোগ্য।


Lapad

Old Town-এর বাইরে Lapad অঞ্চলটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক এবং পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক।

এখানে সমুদ্রতীরবর্তী হাঁটার রাস্তা, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ছোট সৈকত রয়েছে।

যারা Old Town-এর ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে থাকতে চান, তাদের জন্য Lapad ভালো বিকল্প হতে পারে।


Cavtat—ডুব্রোভনিকের কাছাকাছি শান্ত শহর

ডুব্রোভনিকের কাছাকাছি আরেকটি সুন্দর উপকূলীয় শহর হলো Cavtat।

এখানে পর্যটকের ভিড় তুলনামূলকভাবে কম এবং পরিবেশ শান্ত।

সমুদ্রের ধারে হাঁটা, ছোট বন্দর দেখা এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁয় সময় কাটানো যায়।

যারা ডুব্রোভনিকের বাইরে অল্প দূরের কোনো শান্ত জায়গা দেখতে চান, তাদের জন্য Cavtat আকর্ষণীয়।


Game of Thrones-এর সঙ্গে ডুব্রোভনিকের সম্পর্ক

ডুব্রোভনিক আধুনিক পর্যটন জগতে আরও পরিচিতি পেয়েছে জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ Game of Thrones-এর বিভিন্ন দৃশ্যের শুটিংয়ের কারণে।

শহরের পুরনো দুর্গপ্রাচীর, পাথরের রাস্তা ও মধ্যযুগীয় স্থাপত্য সিরিজের কাল্পনিক King’s Landing-এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

ফলে সিরিজের ভক্তদের কাছে ডুব্রোভনিকের বিভিন্ন স্থান বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

তবে সিরিজের সঙ্গে পরিচিত না হলেও শহরের প্রকৃত ঐতিহাসিক সৌন্দর্য নিজেই যথেষ্ট আকর্ষণীয়।


ডুব্রোভনিকের ইতিহাস

ডুব্রোভনিকের ইতিহাস বহু শতাব্দী দীর্ঘ।

মধ্যযুগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। শহরটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে।

এর পুরনো নাম Ragusa ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়েছে।

শহরটি বাণিজ্য, কূটনীতি এবং সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের ছাপ আজও শহরের ভবন, দুর্গ এবং রাস্তার মধ্যে দেখা যায়।


1667 সালের ভূমিকম্প

ডুব্রোভনিকের ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা হলো ১৬৬৭ সালের ভূমিকম্প।

ভূমিকম্পে শহরের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং বহু মানুষ প্রাণ হারান।

পরবর্তী সময়ে শহরের বিভিন্ন অংশ পুনর্নির্মাণ করা হয়।

আজকের ডুব্রোভনিকের স্থাপত্যে তাই পুরনো ঐতিহ্য ও পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রভাব একসঙ্গে দেখা যায়।


আধুনিক ডুব্রোভনিক

আজকের ডুব্রোভনিক একটি জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র।

পুরনো শহরের পাশাপাশি আধুনিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও পর্যটন পরিষেবা রয়েছে।

তবে শহরের ঐতিহাসিক চরিত্র সংরক্ষণ করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, বিশেষ করে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে, Old Town-এর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই দায়িত্বশীল পর্যটন এখানে গুরুত্বপূর্ণ।


ডুব্রোভনিকের খাবার

সমুদ্রের ধারে অবস্থিত হওয়ায় ডুব্রোভনিকের খাবারে সামুদ্রিক খাদ্যের প্রভাব স্পষ্ট।

তাজা মাছ, অক্টোপাস, চিংড়ি এবং অন্যান্য সামুদ্রিক খাবার জনপ্রিয়।

ভূমধ্যসাগরীয় রান্নার মতো অলিভ অয়েল, শাকসবজি, ভেষজ এবং তাজা উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়।

স্থানীয়ভাবে তৈরি পাউরুটি, পনির, মাংসের খাবার এবং বিভিন্ন ডেজার্টও পাওয়া যায়।

যারা নিরামিষ খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্যও রেস্তোরাঁগুলোতে বিভিন্ন বিকল্প থাকে।


ডুব্রোভনিকের ক্যাফে সংস্কৃতি

Old Town-এর ছোট ছোট ক্যাফে শহরের পরিবেশের একটি অংশ।

পাথরের রাস্তার পাশে বসে কফি খাওয়া এবং মানুষের চলাচল দেখা অনেক পর্যটকের কাছে ভ্রমণের আনন্দের অংশ।

এখানে জীবনযাত্রার গতি অনেক সময় ধীর মনে হয়।

এক কাপ কফির সামনে বসে পুরনো ভবনের দিকে তাকিয়ে থাকা—এটিও ডুব্রোভনিক দেখার একটি পদ্ধতি।


কেন ডুব্রোভনিক এত সুন্দর?

ডুব্রোভনিকের সৌন্দর্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে নেই।

এখানে শহর ও সমুদ্র একসঙ্গে রয়েছে।

ইতিহাস ও আধুনিকতা পাশাপাশি রয়েছে।

দুর্গ ও পাহাড়ের সঙ্গে রয়েছে সৈকত।

পুরনো পাথরের গলি থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই নীল সমুদ্রের ধারে পৌঁছে যাওয়া যায়।

এই বৈপরীত্যই শহরটিকে অনন্য করে তুলেছে।


সূর্যোদয় না সূর্যাস্ত?

দুটিই সুন্দর, তবে অভিজ্ঞতা আলাদা।

ভোরে Old Town অনেক শান্ত থাকে। পর্যটকের ভিড় কম। সকালের আলো পাথরের ভবনের উপর পড়ে শহরকে নরম রঙে সাজিয়ে দেয়।

অন্যদিকে সূর্যাস্তের সময় Mount Srđ বা City Walls থেকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের দিকে তাকালে আকাশের রঙ পরিবর্তন হতে দেখা যায়।

যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য সকাল ও বিকেল—দুটো সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।


তিন দিনের ডুব্রোভনিক ভ্রমণ পরিকল্পনা

প্রথম দিন—Old Town

সকালে Pile Gate দিয়ে Old Town-এ প্রবেশ।

Stradun, Onofrio’s Fountain, Franciscan Monastery, Rector’s Palace, Cathedral এবং Sponza Palace দেখা।

বিকেলে City Walls-এ হাঁটা।

রাতে Old Town-এর রেস্তোরাঁয় স্থানীয় খাবার উপভোগ।

দ্বিতীয় দিন—সমুদ্র ও পাহাড়

সকালে Banje Beach বা Lapad।

দুপুরে Lokrum Island ভ্রমণ।

বিকেলে Cable Car-এ Mount Srđ-এ ওঠা।

সূর্যাস্ত উপভোগ করে শহরে ফেরা।

তৃতীয় দিন—শহরের বাইরে

Cavtat অথবা কাছাকাছি উপকূলীয় অঞ্চলে ভ্রমণ।

সময় থাকলে kayaking বা নৌভ্রমণ করা যেতে পারে।


পাঁচ দিনের বিস্তৃত পরিকল্পনা

যাদের হাতে পাঁচ দিন রয়েছে, তারা আরও ধীরে ভ্রমণ করতে পারেন।

প্রথম দিন: Old Town ও Stradun।

দ্বিতীয় দিন: City Walls ও ঐতিহাসিক স্থাপনা।

তৃতীয় দিন: Lokrum ও সমুদ্রভ্রমণ।

চতুর্থ দিন: Mount Srđ, Lapad ও আশপাশ।

পঞ্চম দিন: Cavtat বা অন্য কোনো উপকূলীয় অঞ্চল।

এইভাবে ভ্রমণ করলে শহরের সৌন্দর্য তাড়াহুড়ো না করে উপভোগ করা যায়।


কখন ডুব্রোভনিক ভ্রমণ করবেন?

গ্রীষ্মকালে ডুব্রোভনিক সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে। আবহাওয়া উষ্ণ এবং সমুদ্রভিত্তিক কার্যকলাপের জন্য ভালো হতে পারে।

তবে এই সময় পর্যটকের সংখ্যাও বেশি।

বসন্ত ও শরৎ তুলনামূলকভাবে শান্ত এবং আরামদায়ক হতে পারে।

শীতকালে পর্যটক কম থাকে। শহর আরও শান্ত লাগে, যদিও সমুদ্রস্নান বা কিছু পর্যটন কার্যকলাপের সুযোগ সীমিত হতে পারে।

ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সময় বেছে নেওয়া ভালো।


ডুব্রোভনিক ভ্রমণে কী মনে রাখবেন?

পুরনো শহরের রাস্তা পাথরের হওয়ায় আরামদায়ক জুতো পরা উচিত।

গরমের সময় পানির বোতল সঙ্গে রাখা ভালো।

City Walls-এ হাঁটার সময় সূর্যের তাপের কথা মাথায় রাখতে হবে।

সমুদ্রের ধারে পাথুরে এলাকায় সাবধানে হাঁটতে হবে।

পর্যটকের ভিড়ের সময় ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের দিকে নজর রাখা উচিত।

আর ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।


ভারত থেকে ডুব্রোভনিক

ভারত থেকে ডুব্রোভনিক যেতে সাধারণত এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবহার করতে হয়।

ডুব্রোভনিকের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শহরের সঙ্গে বিমান যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র।

ভ্রমণের আগে ক্রোয়েশিয়া ও ইউরোপীয় ভ্রমণসংক্রান্ত বর্তমান ভিসা ও প্রবেশের নিয়ম সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা জরুরি।

ডুব্রোভনিক থেকে আশপাশের দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলে নৌপথেও যাতায়াত করা যায়।


ডুব্রোভনিকের স্মৃতি

একটি ভ্রমণ শেষ হওয়ার পর কোনো কোনো শহর শুধু ছবিতে থেকে যায়। আবার কোনো কোনো শহর মনে একটি আবহ তৈরি করে।

ডুব্রোভনিক দ্বিতীয় ধরনের শহর।

এখানে হয়তো মনে থাকবে পাথরের দেয়াল ধরে হাঁটার অনুভূতি।

মনে থাকবে নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা।

মনে থাকবে সন্ধ্যার আলোয় পুরনো শহরের লাল ছাদ।

মনে থাকবে কোনো সরু গলির ছোট্ট ক্যাফে।

মনে থাকবে Mount Srđ থেকে দেখা পুরো শহর।

আর মনে থাকবে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের বাতাস।


উপসংহার

ডুব্রোভনিক এমন একটি শহর, যেখানে ইতিহাস শুধু জাদুঘরে বন্দি নয়। ইতিহাস এখানে মানুষের হাঁটার রাস্তায়, পুরনো দেয়ালে, গির্জার ঘণ্টায়, দুর্গের পাথরে এবং সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি স্থাপত্যে বেঁচে আছে।

একদিকে শতাব্দী পুরনো City Walls, অন্যদিকে আধুনিক পর্যটনজীবন।

একদিকে পুরনো Stradun, অন্যদিকে নীল অ্যাড্রিয়াটিক।

একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে দ্বীপ।

এই সবকিছু মিলিয়ে ডুব্রোভনিক যেন সময়ের দুই প্রান্তকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে।

সকালে যখন পুরনো শহরের পাথরের রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করবেন, মনে হবে আপনি ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। দুপুরে সমুদ্রের ধারে বসলে মনে হবে পৃথিবী অনেক শান্ত। আর সন্ধ্যায় পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে যখন লাল ছাদের শহর ও নীল সমুদ্রের দিকে তাকাবেন, তখন হয়তো বুঝতে পারবেন—কেন ডুব্রোভনিককে এত মানুষ তাদের ভ্রমণের স্মৃতিতে বিশেষ জায়গা দেন।

ডুব্রোভনিক—একটি শহর নয়, যেন পাথরে লেখা একটি দীর্ঘ কবিতা; যার প্রতিটি পংক্তির শেষে আছে নীল অ্যাড্রিয়াটিক সাগর।

========== শেষ ==========

Share This