Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (প্রথম পর্ব: মৃতের ছবিতে জীবন্ত চোখ)।

রাত তখন ঠিক বারোটা।

পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম শালবনির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো জমিদারবাড়িটায় সেদিনও কেউ আলো জ্বালায়নি। চারপাশে ঘন কুয়াশা, বাঁশবাগানের ভিতর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। বাড়িটার ভাঙা বারান্দায় ঝুলে থাকা মরচে ধরা ঘণ্টাটা হাওয়া ছাড়াই হঠাৎ বেজে উঠল।

ঢং… ঢং… ঢং…

গ্রামের মানুষ এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের একটি নির্দিষ্ট রাতে এই ঘণ্টা বাজে। আর পরদিন সকালে গ্রামের কেউ না কেউ দেখতে পায়, জমিদারবাড়ির সামনের তুলসীমঞ্চে রাখা হয়েছে একটি সাদা ফুলের মালা, একমুঠো চাল এবং একটি মাটির প্রদীপ।

সেই রাতেই বাড়ির মৃত মেয়ে নন্দিতার শ্রাদ্ধ হয়।

অদ্ভুত ব্যাপার হল, নন্দিতার মৃত্যু হয়েছিল আজ থেকে ঠিক বারো বছর আগে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র আঠারো। গ্রামের পুকুরে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছিল বলে সবাই জানত। দেহ পাওয়া যায়নি, কিন্তু তার বাবা শশাঙ্ক রায় গ্রামের পুরোহিত ডেকে যথারীতি শ্রাদ্ধ করেছিলেন।

তারপর থেকে প্রতি বছর একই রাতে সেই শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হয়।

কিন্তু গ্রামের কেউ জানত না, মৃত মেয়েটির শ্রাদ্ধের রাতে জমিদারবাড়ির পিছনের দরজায় এসে দাঁড়ায় একটি জীবন্ত মেয়ে।

আর সে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আর এক বছর, বাবা। তারপর তোমাকে সব বলতে হবে।”


কলকাতার একটি ছোট সংবাদপত্রে কাজ করত তিয়াসা সেন। বয়স আটাশ। পেশায় সাংবাদিক, স্বভাবে জেদি, আর মানুষের মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য খুঁজে বের করাই তার নেশা।

একদিন অফিসে বসে পুরোনো সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে একটি খবর দেখতে পেল।

শিরোনাম— ‘বারো বছর আগে নিখোঁজ তরুণীর মৃত্যু মেনে নিল পরিবার।’

খবরটি খুব ছোট ছিল। তাতে লেখা, পুরুলিয়ার শালবনি গ্রামের জমিদার পরিবারের মেয়ে নন্দিতা রায় পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। দেহ উদ্ধার না হলেও পরিবারের অনুরোধে পুলিশ অনুসন্ধান বন্ধ করেছে।

তিয়াসার চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে।

ছবিতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ। তাঁর পাশে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। তাঁদের মাঝখানে একটি মেয়ে, চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা, ঠোঁটে হালকা হাসি।

ছবির নীচে লেখা— শশাঙ্ক রায়, স্ত্রী মাধুরী রায় এবং কন্যা নন্দিতা।

তিয়াসা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটির মুখ তার ভীষণ পরিচিত লাগছে।

কিন্তু কোথায় দেখেছে, মনে করতে পারল না।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।

‘আপনি কি মৃত মানুষের খবর নিয়ে কাজ করেন?’

তিয়াসা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল, ‘আপনি কে?’

উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।

‘আমি এমন একজন, যার মৃত্যু বারো বছর আগে হয়েছে।’

তিয়াসার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

সে লিখল, ‘আপনার নাম?’

কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল তিনটি শব্দ।

‘নন্দিতা রায়।’

তারপর আরও একটি বার্তা।

‘আপনি যদি সত্যি জানতে চান, তাহলে আগামীকাল রাত বারোটায় শালবনির পুরোনো জমিদারবাড়িতে আসুন। একা আসবেন। কাউকে বিশ্বাস করবেন না। এমনকি পুলিশকেও নয়।’

বার্তাটি পড়ে তিয়াসা প্রথমে ভেবেছিল, কেউ হয়তো তার সঙ্গে মজা করছে। কিন্তু পরের মুহূর্তে আরেকটি ছবি এল।

সেই একই জমিদারবাড়ি। সামনের তুলসীমঞ্চে একটি প্রদীপ জ্বলছে। পাশে সাদা ফুলের মালা। ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।

তার মুখ স্পষ্ট নয়।

কিন্তু ছবির নীচে লেখা তারিখটি দেখে তিয়াসার সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

ছবিটি তোলা হয়েছে পরের দিন নয়, বারো বছর আগের ঠিক সেই রাতেই— যেদিন নন্দিতার শ্রাদ্ধ হয়েছিল বলে সংবাদপত্রে লেখা ছিল।


পরদিন বিকেলে তিয়াসা পুরুলিয়ার ট্রেনে উঠল।

যাত্রাপথে সে বারবার নন্দিতার ছবিটা দেখছিল। মেয়েটির চোখে এমন কিছু ছিল, যা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল, ছবির ভিতর থেকে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে।

রাত সাড়ে দশটার সময় সে শালবনি স্টেশনে নামল।

স্টেশন বলতে ছোট একটি প্ল্যাটফর্ম, একটি টিকিটঘর আর বাইরে দুটো চায়ের দোকান। শেষ বাস চলে গিয়েছে। তিয়াসা একটি ভাড়া গাড়ি খুঁজছিল, কিন্তু গ্রামের দিকে যেতে রাজি হল না কেউ।

শেষ পর্যন্ত এক বৃদ্ধ চায়ের দোকানদার তাকে বললেন, “আপনি কি রায়বাড়ি যাবেন?”

তিয়াসা চমকে তাকাল। “আপনি জানলেন কী করে?”

বৃদ্ধ উত্তর না দিয়ে চারপাশে তাকালেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, “আজ তো সেই রাত। বাইরের মানুষদের ওই বাড়িতে যাওয়া উচিত নয়।”

“কেন?”

বৃদ্ধের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“কারণ, যে মেয়েটা বারো বছর আগে মারা গেছে, সে প্রতি বছর এই রাতে বাড়ি ফেরে।”

তিয়াসা মৃদু হেসে বলল, “আপনি কি সত্যিই এসব বিশ্বাস করেন?”

বৃদ্ধ চায়ের গ্লাস নামিয়ে রাখলেন।

“আমি বিশ্বাস করি না, মা। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

“কী দেখেছেন?”

“বারো বছর ধরে প্রতি বছর রাত বারোটার আগে ওই বাড়ির পিছনের দরজায় একটি মেয়ে আসে। ভোর হওয়ার আগে চলে যায়। তার পায়ের শব্দ হয় না। আর আশ্চর্যের কথা, যেদিন সে আসে, সেদিন বাড়ির কর্তা শশাঙ্কবাবু নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন।”

তিয়াসা আর হাসল না।

বৃদ্ধ আরও বললেন, “একবার গ্রামের এক যুবক ওকে অনুসরণ করেছিল। পরদিন সকালে ছেলেটাকে পুকুরের ধারে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। জ্ঞান ফেরার পর সে শুধু একটা কথাই বলেছিল— মেয়েটার মুখটা তার নিজের মায়ের মতো।”

“তারপর?”

“তারপর ছেলেটা গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। আজও ফেরেনি।”

তিয়াসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “রায়বাড়ির রাস্তা কোন দিকে?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সোজা এগিয়ে বাঁশবাগানের রাস্তা ধরবেন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন— ওই বাড়িতে ঢোকার পর কেউ যদি আপনার নাম ধরে ডাকে, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেবেন না।”

“কেন?”

বৃদ্ধ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন।

“কারণ, কখনও কখনও মৃত মানুষ জীবিতদের নাম ধরে ডাকে না। জীবিত মানুষই মৃতের গলা নকল করে।”


রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।

তিয়াসা জমিদারবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

বাড়িটা আরও ভয়ংকর, আরও নিঃসঙ্গ। বিশাল লোহার ফটক আধখোলা। দেওয়ালে শ্যাওলা, ছাদের কার্নিশে বাদুড় ঝুলছে। জানালাগুলোর কাচ ভাঙা, তবু দোতলার একটি ঘরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে।

তিয়াসা ফোনের সময় দেখল।

১১টা ৫৮।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“আপনি এসেছেন?”

তিয়াসা ঘুরে দাঁড়াল।

সাদা শাড়ি পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাত দূরে। তার লম্বা চুল ভেজা, কপাল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখটি অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “আপনি নন্দিতা?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“আপনি আমাকে মেসেজ করেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি বেঁচে আছেন?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে একটি কথা জানতে হবে।”

“কী কথা?”

“বারো বছর আগে আমার মৃত্যু হয়নি।”

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

নন্দিতা বলল, “আমার বাবা জানতেন আমি বেঁচে আছি। মা-ও জানতেন। কিন্তু তাঁরা দুজনেই আমার মৃত্যুর অভিনয় করেছিলেন।”

“কেন?”

“কারণ, সেদিন রাতে আমি এমন কিছু দেখে ফেলেছিলাম, যা আমার দেখা উচিত ছিল না।”

“কী দেখেছিলেন?”

নন্দিতা একবার বাড়িটার দিকে তাকাল। তারপর তিয়াসার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “আমার নিজের শ্রাদ্ধের রাতে আমি আমার মাকে খুন হতে দেখেছিলাম।”

তিয়াসা স্তব্ধ।

“কিন্তু আপনার মা তো—”

“মা মারা যাননি,” নন্দিতা তাকে থামিয়ে দিল। “অন্তত যেদিন আমি তাঁকে শেষবার দেখেছিলাম, সেদিন তিনি বেঁচে ছিলেন।”

“তাহলে তিনি এখন কোথায়?”

নন্দিতার চোখে জল জমল।

“এই বাড়িতেই।”

ঠিক সেই মুহূর্তে জমিদারবাড়ির দোতলার জানালায় আলো জ্বলে উঠল।

জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধা।

তিয়াসা তাঁর মুখ দেখেই পিছিয়ে গেল।

কারণ, বৃদ্ধার মুখটি অবিকল তার নিজের মায়ের মতো।

কিন্তু তিয়াসার মা তো বেঁচে আছেন। কলকাতায় নিজের বাড়িতে, সুস্থ শরীরে।

জানালার ওপাশের বৃদ্ধা ধীরে ধীরে হাত তুললেন। তাঁর ঠোঁট নড়ল।

দূরত্বের কারণে শব্দ শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু তিয়াসা স্পষ্ট বুঝতে পারল, তিনি কী বলছেন।

‘তিয়াসা, পালিয়ে যাও।’

তারপর হঠাৎ বাড়ির ভিতর থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ গর্জে উঠল—

“নন্দিতা! আবার এসেছিস? তোকে তো আমি বারো বছর আগেই মেরে ফেলেছি!”

নন্দিতা তিয়াসার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “এবার আর পালানোর সময় নেই।”

“কেন?”

মেয়েটি ধীরে ধীরে তার মুখের দিকে তাকাল।

“কারণ, এবার ওরা তোমাকেও মেরে ফেলবে।”

ঠিক তখনই জমিদারবাড়ির সমস্ত দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

আর তিয়াসার ফোনে নতুন একটি বার্তা এল।

প্রেরক— মা।

বার্তায় লেখা—

‘তিয়াসা, তুমি যদি এখন শালবনিতে থাকো, তাহলে মনে রেখো, আমি তোমার মা নই।’

তিয়াসার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

কারণ, বার্তাটি পাঠানো হয়েছে তার নিজের নম্বর থেকেই।

আর ঠিক তার পরেই ফোনে একটি কল এল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল— মা কলিং…

নন্দিতা আতঙ্কে ফিসফিস করে বলল, “ফোনটা ধরবেন না!”

কিন্তু কল থামল না।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

শেষ পর্যন্ত তিয়াসা কাঁপা হাতে কলটি ধরল।

ওপাশ থেকে তার মায়ের গলা ভেসে এল।

“তিয়াসা, তুই কোথায়? তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আয়।”

তিয়াসা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “মা, তুমি কি সত্যিই আমার মা?”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর সেই পরিচিত কণ্ঠে ধীরে ধীরে উচ্চারিত হল—

“তুই কি এখনও জানিস না, তোর জন্মের রাতে হাসপাতালে দুটো মেয়ে জন্মেছিল?”

কল কেটে গেল।

তিয়াসা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার পাশে নন্দিতা মাথা নিচু করে বলল, “এবার বুঝতে পারছেন, কেন আপনাকে এখানে ডেকেছি?”

“তুমি আমার সম্পর্কে কী জানো?”

নন্দিতা উত্তর দিল না। শুধু জমিদারবাড়ির বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল—

“আপনি আমার গল্প জানতে এসেছেন। কিন্তু এই রাত শেষ হওয়ার আগে আপনাকে নিজের গল্পটাও জানতে হবে।”

দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।

“নন্দিতা, ওকে ভিতরে নিয়ে আয়। এত বছর পর আমাদের পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসতে হবে।”

তারপর দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে এল একটি ছোট্ট রুপোর নূপুর।

তিয়াসা নূপুরটি চিনতে পারল।

এটি তার ছোটবেলার নূপুর। যেটি হারিয়ে গিয়েছিল তার জন্মদিনের রাতে, ঠিক বারো বছর আগে।

নন্দিতা নূপুরটি তুলে তার হাতে দিল।

“এবার আর কোনও কিছুই কাকতালীয় নয়,” সে বলল।

ঠিক তখনই বাড়ির ভিতর থেকে একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

আর তিয়াসা বুঝতে পারল, এই বাড়িতে শুধু একজন মৃত মেয়ে ফিরে আসেনি।

ফিরে এসেছে এমন একটি সত্য, যা বারো বছর ধরে তার নিজের জীবনকেও মিথ্যে করে রেখেছে।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *