Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (চতুর্থ পর্ব: দরজার ওপাশে বন্দি মা)।

লোহার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিয়াসার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের সমস্ত পরিচিত সত্য একে একে ভেঙে পড়ছে।

একদিকে তৃষা বলছে, তাদের মা নিজের হাতে একজনকে হত্যা করেছিলেন। অন্যদিকে দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা সেই নারীকণ্ঠ তৃষাকে বিশ্বাস করতে নিষেধ করছে।

কাকে বিশ্বাস করবে সে?

যে মেয়েটিকে এতক্ষণ নন্দিতা বলে চিনেছিল, সে কি সত্যিই তার বোন? যে মেয়েটি নিজেকে তৃষা বলছে, সে কি সত্যিই বারো বছর আগে পুকুরে হারিয়ে যাওয়া শিশু? আর দরজার ওপাশে যে মহিলা বন্দি হয়ে আছেন, তিনিই কি তার জন্মদাত্রী মা?

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “তৃষা, তুমি আমাকে একটা কথার উত্তর দাও। তুমি যদি আমার বোন হও, তাহলে এত বছর কোথায় ছিলে?”

তৃষা দরজার উপর হাত রাখল।

“যেখানে কেউ আমাকে খুঁজতে আসেনি।”

“সেটা কোথায়?”

“এই বাড়ির নীচে নয়। এই বাড়ির বাইরেও নয়। এমন একটা জায়গায়, যেখানে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা হয়, অথচ তাদের পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা হয়।”

তিয়াসা কিছু বুঝতে পারল না।

তৃষা ধীরে ধীরে বলল, “বারো বছর আগে এই বাড়িতে আগুন লেগেছিল। সবাই ভেবেছিল, আমি সেই আগুনে পুড়ে মারা গেছি। কিন্তু আমাকে আগুনের আগে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আমার স্মৃতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন নিজের নামটাও মনে করতে পারতাম না।”

“তাহলে তুমি কীভাবে সব মনে করলে?”

তৃষা নিজের গলার কাছে হাত রাখল।

সেখানে একটি ছোট, পুরোনো পোড়া দাগ।

“এই দাগটা দেখার পর।”

তিয়াসা দাগটির দিকে তাকিয়ে রইল।

“এটা কীভাবে হল?”

“জন্মের সময়। আমাদের দুজনের গলাতেই একই রকম ছোট দাগ ছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, সেটা বিরল জন্মদাগ। আমার চিকিৎসার সময় পুরোনো নথিতে সেই দাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখান থেকেই আমি নিজের পরিচয় খুঁজতে শুরু করি।”

“আর নন্দিতা?”

তৃষার চোখে অদ্ভুত ছায়া নেমে এল।

“নন্দিতা ছিল আমার থেকে আলাদা। সে এই বাড়ির প্রথম মেয়ে। কিন্তু তার পরিচয় নিয়েও মিথ্যে বলা হয়েছে।”

তিয়াসা পিছনে তাকাল।

যে মেয়েটিকে এতক্ষণ নন্দিতা বলে চিনছিল, সে সিঁড়ির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই।

“তুমি সত্যিটা বলো,” তিয়াসা বলল। “তুমি কে?”

মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“আমি নন্দিতা রায়। অন্তত এই নামেই আমাকে বড় করা হয়েছিল।”

“তাহলে তুমি তৃষা নও?”

“না।”

“তুমি কি আমার বোন?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি তোমার বোনের মতো ছিলাম। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের হিসাব দিয়ে আমাদের জীবনকে বোঝা যাবে না।”

তৃষা হঠাৎ বলে উঠল, “ওর কথা শুনো না। ও জানে, দরজার ওপাশে কে আছে। তবু তোমাকে সত্যিটা বলছে না।”

নন্দিতা এবার তৃষার দিকে তাকাল।

“তুই নিজেই কি সব সত্যি জানিস?”

তৃষা কোনও উত্তর দিল না।

তিয়াসা দুজনের দিকে তাকিয়ে বুঝল, তাদের মধ্যে এমন একটি পুরোনো দ্বন্দ্ব আছে, যার শুরু তার জন্মেরও আগে।

আর সেই দ্বন্দ্বের শেষ লুকিয়ে রয়েছে এই দরজার ওপাশে।


লোহার দরজার নীচে একটি সরু ফাঁক ছিল। সেখান দিয়ে ক্ষীণ আলো বেরিয়ে আসছে।

তিয়াসা হাঁটু গেড়ে বসে ভিতরে তাকানোর চেষ্টা করল।

প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে একটি খাটের অবয়ব ফুটে উঠল। খাটের পাশে বসে আছেন একজন মহিলা। তাঁর চুল কাঁধ ছাড়িয়ে নেমে এসেছে, মুখ শুকনো, চোখের নীচে গভীর কালি।

মহিলাটি দরজার দিকে এগিয়ে এলেন।

“তিয়াসা?”

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

“আপনি কে?”

মহিলাটি কাঁপা হাতে দরজায় হাত রাখলেন।

“আমি মধুমিতা।”

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

মধুমিতা সেন— যে মহিলাকে সে নিজের মা বলে জানে, তিনি তো কলকাতায় বাড়িতে রয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে।

তাহলে এই মহিলা কে?

দরজার ওপাশের মহিলা আবার বললেন, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস না, মা? তুই যখন ছোট ছিলি, তখন তোকে ঘুম পাড়ানোর সময় আমি একটা গান গাইতাম। মনে আছে?”

তিনি আস্তে আস্তে গুনগুন করতে শুরু করলেন।

“ঘুম পাড়ানি চাঁদের আলো, জানলা জুড়ে রাত…”

তিয়াসার শরীর কেঁপে উঠল।

এই গানটা সে চেনে।

ছোটবেলায় জ্বর হলে তার মা এই গান গাইতেন। সে যতবার দুঃস্বপ্ন দেখে কাঁদত, এই গান শুনেই ঘুমিয়ে পড়ত।

কিন্তু গানটির শেষ লাইনটা সে কোনও দিন শুনতে পায়নি। তার মা সব সময় মাঝপথে থেমে যেতেন।

দরজার ওপাশের মহিলা এবার শেষ লাইনটি গাইলেন।

“হারিয়ে গেলেও ফিরবি আবার, মায়ের আঁচল পাত।”

তিয়াসার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আপনি এই গান জানলেন কীভাবে?”

মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “কারণ, গানটা আমি তোকে শোনাতাম।”

“কিন্তু আমার মা তো…”

তিয়াসা কথাটা শেষ করতে পারল না।

মহিলাটি ধীরে ধীরে বললেন, “যে মহিলা তোকে বড় করেছেন, তিনি তোকে ভালোবাসেন। আমি তাঁর ভালোবাসাকে অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমি তোর জন্মদাত্রী মা।”

তিয়াসা দরজার উপর হাত রাখল।

“তাহলে আপনি এত বছর এখানে বন্দি ছিলেন কেন?”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।

“কারণ, আমি এমন একটা সত্য জেনে গিয়েছিলাম, যেটা জানলে এই পরিবারের প্রত্যেকের জীবন বদলে যেত।”

“কী সত্য?”

মধুমিতা দরজার ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বললেন, “তোর জন্মের রাতে কোনও শিশুকে বদলে দেওয়া হয়নি, তিয়াসা। বদলে দেওয়া হয়েছিল দুটো শিশুর ভবিষ্যৎ।”

তিয়াসা হতবাক।

“আমি বুঝতে পারছি না।”

“তুই আর তৃষা একই দিনে জন্মেছিলি। কিন্তু তোদের মধ্যে একজনকে এমন একটি পরিবারে বড় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেখানে তার জীবন নিরাপদ থাকবে। অন্যজনকে রাখা হয়েছিল এই বাড়িতে। কারণ, এই বাড়ির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে একজন মেয়ের পরিচয় দরকার ছিল।”

“কিন্তু কেন?”

“কারণ, এই বাড়ির আসল উত্তরাধিকারী ছিল একটি মেয়ে। আর সেই মেয়ের জন্মের প্রমাণ লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল এমন একজন, যে নিজের অপরাধ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় পেত।”

মধুমিতা থামলেন।

তারপর বললেন, “সেই মানুষটি তোমার বাবা অমিতাভ নয়।”

তিয়াসা ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন অমিতাভ সেন।

তাঁর মুখ ফ্যাকাশে। চোখে এমন এক আতঙ্ক, যা তিয়াসা আগে কখনও দেখেনি।

“বাবা?”

অমিতাভ কোনও উত্তর দিলেন না।

মধুমিতা দরজার ওপাশ থেকে চিৎকার করে উঠলেন, “তিয়াসা, ওকে জিজ্ঞেস কর! বারো বছর আগে কেন তোর জন্মের নথি বদলানো হয়েছিল? আর কেন আমাকে এই ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল?”

অমিতাভ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তিয়াসা তাঁর সামনে এগিয়ে গেল।

“বাবা, তুমি কি আমাকে সব সত্যি বলবে?”

অমিতাভ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“আমি যা করেছি, তার সবটাই তোকে বাঁচানোর জন্য।”

“কিসের থেকে বাঁচানোর জন্য?”

“এই বাড়ির মানুষদের থেকে।”

“কিন্তু তুমি তো নিজেই এই বাড়ির লোকদের সাহায্য করেছিলে!”

অমিতাভ চোখ বন্ধ করলেন।

“হ্যাঁ। করেছিলাম।”

তিয়াসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“কেন?”

অমিতাভের গলা ভেঙে এল।

“কারণ, আমি তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, যদি আমি সত্যিটা প্রকাশ করি, তাহলে তোকে আর কখনও দেখতে পাব না।”

“কে বলেছিল?”

অমিতাভ উত্তর দেওয়ার আগেই নন্দিতা সামনে এগিয়ে এল।

“আমি বলেছিলাম।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

তিয়াসা অবিশ্বাসের চোখে বলল, “তুমি?”

নন্দিতা মাথা নাড়ল।

“না, আমি নই। আমার নাম ব্যবহার করে কেউ একজন বলেছিল।”

“কে?”

নন্দিতা ধীরে ধীরে দেওয়ালের দিকে তাকাল।

সেখানে একটি পুরোনো পারিবারিক ছবি ঝুলছে। ছবিতে শশাঙ্ক রায়, মাধুরী রায়, মধুমিতা এবং আরও একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

তিয়াসা ছবির পুরুষটিকে চিনতে পারল না।

কিন্তু অমিতাভ ছবিটি দেখেই পিছিয়ে গেলেন।

“না… এই মানুষটা তো মারা গেছে!”

মধুমিতা দরজার ওপাশ থেকে বললেন, “মৃত মানুষ সব সময় মৃত থাকে না, অমিতাভ।”

তারপর তিনি এমন একটি নাম উচ্চারণ করলেন, যা শুনে অমিতাভের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।

“দেবব্রত রায়।”


দেবব্রত রায়— শশাঙ্ক রায়ের ছোট ভাই।

বারো বছর আগে এক রহস্যময় দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে গ্রামের সবাই জানত। তাঁর দেহ নাকি নদীর ধারে পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ তদন্ত করে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে রিপোর্ট দিয়েছিল।

কিন্তু তিয়াসার সামনে দেওয়ালে টাঙানো ছবিতে সেই মানুষটি জীবিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন।

আর ছবির নীচে লেখা তারিখ দেখে তিয়াসা বুঝতে পারল, ছবিটি তোলা হয়েছিল মাত্র তিন বছর আগে।

“এটা কীভাবে সম্ভব?” তিয়াসা ফিসফিস করে বলল।

নন্দিতা উত্তর দিল, “কারণ, দেবব্রত রায় কখনও মারা যাননি।”

অমিতাভ হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “চুপ করো!”

তাঁর গলার সেই তীব্রতা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

তিনি দেওয়াল থেকে ছবিটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেললেন। কাচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

“ওর নাম কেউ নেবে না!”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির প্রধান দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ হল।

তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে কারও পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল।

টক… টক… টক…

একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

“এত বছর পরেও আমার নাম শুনলে তোমার এত ভয় হয়, অমিতাভ?”

অমিতাভ স্থির হয়ে গেলেন।

তিয়াসা সিঁড়ির দিকে তাকাল।

অন্ধকার থেকে একজন লম্বা মানুষ বেরিয়ে এলেন। তাঁর পরনে কালো কোট, হাতে একটি লাঠি। মুখের অর্ধেকটা পোড়া দাগে ঢাকা। কিন্তু তাঁর চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।

তিনি হাসলেন।

“অনেক দিন পর দেখা হল, ভাইপো।”

অমিতাভ কাঁপা গলায় বললেন, “আপনি… আপনি তো মারা গিয়েছিলেন!”

লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“তোমরা আমাকে মৃত ঘোষণা করেছিলে। আর আমার নামেই অন্য একজনের দেহ সৎকার করেছিলে। কিন্তু তোমরা একটা কথা ভুলে গিয়েছিলে।”

“কী কথা?”

“যে মানুষ নিজের মৃত্যুর কাগজ নিজেই লিখতে পারে, তাকে মৃত প্রমাণ করা এত সহজ নয়।”

তিয়াসা বুঝতে পারল, এই মানুষটিই দেবব্রত রায়।

দেবব্রত তার দিকে তাকালেন।

“তুমি নিশ্চয়ই তিয়াসা। তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই এত বছর অপেক্ষা করেছি।”

তিয়াসা পিছিয়ে গেল।

“আপনি আমার কাছ থেকে কী চান?”

দেবব্রত মৃদু হাসলেন।

“আমি কিছু চাই না, মা। আমি শুধু তোমাকে তোমার প্রকৃত পরিচয় ফিরিয়ে দিতে চাই।”

“আমার প্রকৃত পরিচয় কী?”

দেবব্রত উত্তর দেওয়ার আগে মধুমিতা দরজার ওপাশ থেকে চিৎকার করে উঠলেন—

“ওর কথা বিশ্বাস করিস না, তিয়াসা! ও-ই তোকে জন্মের পর মেরে ফেলতে চেয়েছিল!”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

দেবব্রত ধীরে ধীরে মধুমিতার দিকে তাকালেন।

“এত বছর বন্দি থেকেও তোমার মুখের ভাষা বদলায়নি, বউদি।”

মধুমিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তুমি আমার সন্তানদের জীবন নষ্ট করেছ!”

দেবব্রত মাথা নাড়লেন।

“আমি শুধু সেই কাজটাই করেছি, যেটা তোমাদের পরিবারের সবাই চেয়েছিল।”

“মিথ্যে!”

“তাহলে বলো, মধুমিতা, তুমি কেন নিজের সন্তানকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলে?”

মধুমিতা চুপ করে গেলেন।

তিয়াসা একবার মধুমিতার দিকে, একবার দেবব্রতের দিকে তাকাল।

“কেউ আমাকে কিছু বুঝিয়ে বলবেন?”

দেবব্রত এবার তার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“তোমার জন্মের রাতে এই বাড়িতে তিনটি শিশু জন্মেছিল।”

তিয়াসার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“তিনটি?”

“হ্যাঁ। তুই, তোর যমজ বোন তৃষা, আর আরও একটি শিশু।”

তৃষা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে চিৎকার করে উঠল, “তৃতীয় শিশুটি কোথায়?”

দেবব্রত তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“সেটাই তো এই গল্পের সবচেয়ে বড় রহস্য।”

তিনি নিজের কোটের ভিতর থেকে একটি ছোট্ট সাদা খাম বের করলেন। খামের ভিতরে একটি ছবি।

ছবিতে তিনটি নবজাতক পাশাপাশি শুয়ে আছে।

প্রথম শিশুটির পাশে লেখা— তিয়াসা।

দ্বিতীয় শিশুটির পাশে— তৃষা।

তৃতীয় শিশুটির পাশে কোনও নাম নেই।

শুধু একটি লাল চিহ্ন।

তিয়াসা ছবিটি হাতে নিয়ে দেখল, তৃতীয় শিশুটির ডান হাতের কবজিতে একটি ছোট জন্মদাগ রয়েছে।

ঠিক সেই জন্মদাগটি তার নিজের হাতেও আছে।

তিয়াসার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

“এটা… এটা কীভাবে সম্ভব?”

দেবব্রত নিচু গলায় বললেন, “কারণ, তুই যাকে নিজের যমজ বোন বলে জানিস, সে আসলে তোর যমজ বোন নয়।”

তৃষা পিছিয়ে গেল।

“আপনি কী বলতে চাইছেন?”

দেবব্রত ধীরে ধীরে তিয়াসার দিকে তাকালেন।

“তুই আর তৃষা একই দিনে জন্মেছিলি ঠিকই। কিন্তু তোরা যমজ নোস।”

তিয়াসার মাথা ঘুরে উঠল।

“তাহলে আমরা কে?”

দেবব্রত উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু মেঝেতে পড়ে থাকা রুপোর নূপুরটি তুলে তিয়াসার হাতে দিলেন।

“এই নূপুরটা তোর জন্মের রাতে তৃতীয় শিশুটির পায়ে ছিল। আর এই নূপুরের ভিতরে এমন একটি গোপন বার্তা আছে, যা জানলে তুই বুঝতে পারবি, তোর আসল মা কে।”

তিয়াসা নূপুরটি হাতে নিল।

তার ভিতরে খুব ক্ষুদ্র অক্ষরে কিছু খোদাই করা ছিল।

সে চোখের কাছে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করল।

সেখানে লেখা—

‘একই মায়ের গর্ভে জন্ম নয়, একই অপরাধের কারণে বাঁধা তিন জীবন।’

তিয়াসা মাথা তুলে দেবব্রতের দিকে তাকাল।

“তৃতীয় শিশুটি কোথায়?”

দেবব্রত এবার প্রথমবারের মতো হাসি থামালেন।

“এই বাড়িতেই।”

“কোথায়?”

তিনি ধীরে ধীরে তিয়াসার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন—

“তুই যখন এই বাড়িতে ঢুকেছিলি, তখন থেকেই সে তোর পাশে ছিল।”

তিয়াসা হঠাৎ চারদিকে তাকাল।

ঘরে তখন সে, তৃষা, নন্দিতা, অমিতাভ, দেবব্রত এবং দরজার ওপাশে বন্দি মধুমিতা।

আর কেউ নেই।

কিন্তু ঠিক তখনই তার পিছন থেকে একটি শিশুর কণ্ঠ ভেসে এল।

“দিদি…”

তিয়াসা ঘুরে দাঁড়াল।

ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় বারো বছরের একটি মেয়ে।

তার পরনে সাদা পোশাক। চুল দুদিকে বাঁধা। মুখে তিয়াসার মতোই চোখ, তৃষার মতোই নাক, আর নন্দিতার মতোই হাসি।

মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল—

“এত দিন পরেও তুমি আমাকে চিনতে পারলে না?”

তিয়াসার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি উত্তর দিল—

“আমি সেই মেয়ে, যার শ্রাদ্ধ তুমি প্রতি বছর নিজের বাড়িতে করো।”

তিয়াসার মাথার ভিতর যেন বজ্রপাত হল।

মেয়েটি তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—

“আমি নন্দিতা নই, তৃষাও নই। আমি তোমাদের তৃতীয় বোন।”

তারপর সে অমিতাভের দিকে তাকিয়ে বলল—

“বাবা, এবার কি তুমি সবাইকে বলবে, বারো বছর আগে কাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলে?”

অমিতাভ মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়লেন।

আর সেই মুহূর্তে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি একসঙ্গে বারোটা বাজিয়ে উঠল।

ঢং… ঢং… ঢং…

তিয়াসা বুঝতে পারল, এই রাতের শেষ এখনও হয়নি।

বরং এত দিন ধরে যে রহস্যের সামনে সে দাঁড়িয়ে ছিল, তার আসল দরজা এখনই খুলতে চলেছে।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *