Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

উর্মিলা ‘ইউলি’ চৌধুরী: চণ্ডীগড়ের নেপথ্যের এক বিস্মৃত স্থাপত্য-নায়িকা।

ভারতের আধুনিক স্থাপত্যের ইতিহাসে চণ্ডীগড় একটি অনন্য নাম। স্বাধীনতার পর নতুন ভারতের স্বপ্নকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা এই শহর শুধু একটি প্রশাসনিক রাজধানী ছিল না; এটি ছিল আধুনিক ভারতের নতুন পরিচয়ের একটি স্থাপত্য-প্রতীক। শহরটির পরিকল্পনা ও নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লে করবুজিয়ে, পিয়ের জ্যাঁরের, জেন ড্রু-সহ বহু স্থপতির নাম।

কিন্তু এই আন্তর্জাতিক খ্যাতির আড়ালে এমন একজন ভারতীয় নারী ছিলেন, যাঁর অবদান দীর্ঘদিন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তিনি উর্মিলা ইউলি চৌধুরী—ভারতের আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম পথিকৃৎ, স্থপতি, শিক্ষক, ডিজাইনার, লেখক এবং প্রশাসক।

চণ্ডীগড় প্রকল্পে তিনি ছিলেন একমাত্র ভারতীয় নারী স্থপতি। লে করবুজিয়ে ও পিয়ের জ্যাঁরের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি তিনি নিজেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও নকশা তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের প্রধান স্থপতির দায়িত্বও পালন করেন।

শৈশব থেকেই ছিল অন্যরকম পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয়

উর্মিলা ইউলি চৌধুরীর জন্ম ১৯২৩ সালের ৪ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন কূটনীতিক। বাবার পেশার কারণে ছোটবেলা থেকেই ইউলির জীবন ছিল বহুমাত্রিক। তাঁকে ভারতের এক জায়গায় স্থির হয়ে বড় হতে হয়নি; বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল শৈশবেই।

তিনি জাপানে স্কুলশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে সিরামিকস নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় তাঁর চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

তিনি শুধু স্থাপত্য জানতেন না। ফরাসি ভাষাতেও তাঁর দক্ষতা ছিল। এই বহুমুখী শিক্ষা পরবর্তীকালে চণ্ডীগড় প্রকল্পে তাঁকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

স্বাধীন ভারতের নতুন শহরের ডাক

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশটি এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দেশভাগের ফলে পাঞ্জাব তার পুরনো রাজধানী লাহোর হারায়। স্বাধীন ভারতের নতুন পাঞ্জাবের জন্য একটি নতুন রাজধানীর প্রয়োজন দেখা দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে চণ্ডীগড়কে নতুন শহর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

লে করবুজিয়ে-র নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক স্থপতিদের একটি দল এই প্রকল্পে যুক্ত হয়। ১৯৫১ সালে ইউলি চৌধুরীও সেই দলের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে ১৯৬৮ সালে আবার চণ্ডীগড় প্রকল্পে ফিরে আসেন।

তখন চণ্ডীগড় আজকের মতো সুপরিকল্পিত শহর ছিল না। নতুন শহরের রাস্তা, সরকারি ভবন, আবাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনপরিসর—সবকিছুই কার্যত নতুন করে ভাবতে হচ্ছিল।

এই বিশাল কাজের মধ্যে ইউলি চৌধুরীর ভূমিকা ছিল বহুমুখী।

লে করবুজিয়ে ও পিয়ের জ্যাঁরের সঙ্গে কাজ

বিশ্বখ্যাত স্থপতি লে করবুজিয়ে-র সঙ্গে কাজ করা যে কোনও স্থপতির জন্যই বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু ইউলি চৌধুরীর ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু একজন বিখ্যাত স্থপতির সহযোগী হিসেবে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি চণ্ডীগড়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন। ক্যাপিটল কমপ্লেক্স, জিওমেট্রিক হিল, টাওয়ার অব শ্যাডোস এবং মার্টার্স মেমোরিয়ালের মতো প্রকল্পের বিস্তারিত ড্রয়িং তৈরির কাজে তাঁর ভূমিকা ছিল।

ফরাসি ভাষায় তাঁর দক্ষতার কারণে তিনি লে করবুজিয়ে, পিয়ের জ্যাঁরের এবং ভারতীয় স্থপতি ও প্রশাসকদের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অর্থাৎ তিনি শুধু নকশা আঁকতেন না; বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও পেশাগত পরিমণ্ডলের মধ্যে একটি সেতু হিসেবেও কাজ করতেন।

নিজের স্থাপত্য-পরিচয়

অন্যের পরিকল্পনায় সহযোগিতা করার পাশাপাশি ইউলি চৌধুরী নিজের স্থাপত্য-ভাবনাকেও বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

চণ্ডীগড়ের Government Home Science College তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির একটি। Women’s Polytechnic এবং কয়েকটি সরকারি আবাসনের নকশার সঙ্গেও তাঁর সরাসরি সম্পর্ক ছিল। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, Home Science College, Women’s Polytechnic এবং বেশ কিছু মন্ত্রীর বাড়ির নকশা ও নির্মাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই কাজগুলির মধ্য দিয়ে তাঁর স্থাপত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আধুনিকতা ও ব্যবহারিকতার সমন্বয়।

তিনি শুধু একটি ভবনকে সুন্দর দেখাতে চাইতেন না। ভবনটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কারা ব্যবহার করবে এবং ভারতীয় পরিবেশে সেটি কতটা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ও তাঁর চিন্তার অংশ ছিল।

‘চণ্ডীগড় চেয়ার’-এর গল্প

ইউলি চৌধুরীর নামের সঙ্গে যে বিষয়টি বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে, সেটি হলো চণ্ডীগড়ের বিখ্যাত কাঠ ও বেতের আসবাব।

আজ সারা বিশ্বে “Chandigarh Chair” বা “Jeanneret Chair” নামে পরিচিত কিছু আসবাব সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু এগুলির ইতিহাসে ইউলি চৌধুরীর অবদান বহুদিন যথেষ্ট স্বীকৃতি পায়নি।

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের গবেষণায় ইউলি চৌধুরীকে এই আসবাবের নকশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, তিনি চণ্ডীগড়ের আসবাবের নকশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁর নকশা করা কিছু চেয়ার পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইউলি চৌধুরী শুধু আসবাবের সৌন্দর্য নিয়ে ভাবেননি; তিনি মানুষের শরীরের অনুপাতের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

লে করবুজিয়ে ও জ্যাঁরের ব্যবহৃত কিছু মাপ ছিল ইউরোপীয় পুরুষের গড় শরীরের অনুপাতকে ভিত্তি করে। ইউলি চৌধুরী সেগুলিকে ভারতীয় ব্যবহারকারীদের জন্য নতুনভাবে বিবেচনা করেছিলেন। ফলে আসবাবগুলি আরও আরামদায়ক ও ব্যবহারোপযোগী হয়ে ওঠে।

এটি দেখায় যে একজন স্থপতির কাজ কেবল বড় বড় ভবন নির্মাণ নয়; একটি সাধারণ চেয়ারের নকশাতেও মানুষের জীবনযাত্রার প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ পেতে পারে।

স্থাপত্যের বাইরে একজন বহুমুখী মানুষ

ইউলি চৌধুরী শুধু স্থপতি ছিলেন না। তিনি শিক্ষক, লেখক, ডিজাইনার এবং অনুবাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লির School of Architecture-এর পরিচালক ছিলেন। এই দায়িত্ব তাঁর শিক্ষাক্ষেত্রে নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে।

লে করবুজিয়ে-র সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি Those Were the Days নামে স্মৃতিকথাও লেখেন।

ফরাসি ভাষায় দক্ষতার কারণে তিনি অনুবাদের কাজও করেন। লে করবুজিয়ে-র Three Human Establishments বইটি ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের কাজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্র স্থাপত্যের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে ছিল না।

সরকারি স্থাপত্য প্রশাসনে নেতৃত্ব

ইউলি চৌধুরীর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সরকারি স্থাপত্য প্রশাসনে তাঁর নেতৃত্ব।

১৯৭০ সালে তিনি হরিয়ানার Chief Architect হন। পরে পাঞ্জাবের Chief State Architect-এর দায়িত্বও পালন করেন। চণ্ডীগড়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণ ও পরিকল্পনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

একজন নারী হিসেবে সেই সময়ে এত উচ্চপর্যায়ের স্থাপত্য প্রশাসনিক পদে পৌঁছানো ছিল অসাধারণ ঘটনা।

স্থাপত্য তখনও মূলত পুরুষ-প্রধান পেশা। সেই পরিবেশে একজন নারী শুধু পেশায় টিকে থাকেননি; বরং নেতৃত্বের শীর্ষস্থানেও পৌঁছেছিলেন।

নারী হওয়াটাই ছিল এক নীরব চ্যালেঞ্জ

ইউলি চৌধুরীর সময়ে ভারতে পেশাদার নারী স্থপতির সংখ্যা ছিল খুবই কম।

তাঁর সামনে বাধা ছিল একাধিক—নারী হওয়া, সদ্য স্বাধীন দেশের সীমিত পেশাগত পরিকাঠামো, পুরুষ-প্রধান স্থাপত্যজগৎ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতিদের সঙ্গে কাজ করার চাপ।

কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও শুধুমাত্র “একজন নারী স্থপতি” হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

তিনি স্থপতি হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই কারণেই তাঁকে ভারতের আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়। কিছু সূত্র তাঁকে এশিয়ার প্রথমদিকের নারী স্থপতিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করে; তবে “এশিয়ার প্রথম মহিলা স্থপতি” দাবিটি নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রগুলির মধ্যে একমত নেই। তাই তাঁর অবদানকে নিশ্চিতভাবে ভারতের প্রথমদিকের নারী স্থপতিদের অন্যতম হিসেবে দেখা বেশি নিরাপদ।

Alliance Française এবং সাংস্কৃতিক কাজ

অবসর গ্রহণের পরও ইউলি চৌধুরী থেমে থাকেননি।

১৯৮১ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি চণ্ডীগড়ে ব্যক্তিগত স্থাপত্যচর্চা চালিয়ে যান। ১৯৮৩ সালে তিনি Alliance Française de Chandigarh প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং সংগঠনটির প্রথম দিকের নেতৃত্বে ছিলেন।

এটি তাঁর বহুসাংস্কৃতিক মানসিকতারই আরেকটি উদাহরণ।

ভারতীয় স্থাপত্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির যে যোগাযোগ তিনি নিজের জীবনে অনুভব করেছিলেন, সেই যোগাযোগকে তিনি পরবর্তী জীবনেও এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার

ইউলি চৌধুরী ছিলেন Royal Institute of British Architects এবং Indian Institute of Architects-এর নির্বাচিত Fellow—ভারতীয় নারী স্থপতিদের ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

তিনি ১৯৬৪ সালে তাঁর স্থাপত্যকর্ম এবং কম খরচের আসবাব নকশার জন্য রাষ্ট্রপতির পদকও লাভ করেন।

তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় তাঁর উত্তরাধিকার হলো চণ্ডীগড়ের দৃশ্যমান স্থাপত্য।

আজ চণ্ডীগড়ের বহু ভবন, রাস্তা, আবাসিক এলাকা এবং আসবাবের নকশার দিকে তাকালে ইউলি চৌধুরীর কাজের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।

দুঃখের বিষয়, বহু বছর ধরে তাঁর অবদান জনপ্রিয় স্থাপত্য-আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম জায়গা পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গবেষক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি তাঁর অবদান নতুন করে সামনে আনছে।

শেষ জীবন

ইউলি চৌধুরী ১৯৯৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চণ্ডীগড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত স্থাপত্য, লেখা, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় ছিল।

তিনি চলে গেলেও তাঁর তৈরি ভবন ও নকশাগুলি থেকে গেছে।

আর থেকে গেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—একটি শহর শুধু ইট, কংক্রিট, রাস্তা ও ভবনের সমষ্টি নয়। একটি শহর মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের ধারণাকেও ধারণ করে।

উপসংহার

উর্মিলা ‘ইউলি’ চৌধুরীর জীবন আমাদের সামনে একজন এমন নারীর ছবি তুলে ধরে, যিনি নিজের প্রতিভাকে কোনও নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেননি।

তিনি স্থপতি ছিলেন, কিন্তু শুধু স্থপতি নন।

তিনি শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু শুধু শিক্ষক নন।

তিনি ডিজাইনার ছিলেন, লেখক ছিলেন, অনুবাদক ছিলেন, প্রশাসক ছিলেন এবং সংস্কৃতির সেতুবন্ধনকারীও ছিলেন।

চণ্ডীগড়ের ইতিহাসে লে করবুজিয়ে-র নাম যেমন অবিচ্ছেদ্য, তেমনই সেই বিশাল প্রকল্পের ভারতীয় বাস্তবায়ন ও সৃষ্টিশীল পরিমণ্ডলে ইউলি চৌধুরীর অবদানও স্মরণযোগ্য।

বিশেষ করে তাঁর নকশা করা বা তাঁর সঙ্গে যুক্ত ভবন ও আসবাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্থাপত্যের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখা যায় না; মানুষের ব্যবহার, আরাম এবং জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যেও তার সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।

ইউলি চৌধুরীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো এই যে, তিনি এমন একটি সময়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, যখন স্থাপত্যের পৃথিবী নারীদের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। তিনি শুধু সেই পৃথিবীতে প্রবেশ করেননি—নিজের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে সেই পৃথিবীর একটি অংশকে বদলে দিয়েছিলেন।

তাঁর জীবন তাই ভারতীয় নারীর সাফল্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যে অধ্যায়ের স্থাপত্য আজও চণ্ডীগড়ের রাস্তায়, ভবনে এবং আসবাবে নীরবে কথা বলে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

শৈমালা গোপালন: ক্যান্সার গবেষণায় নিবেদিত এক বিজ্ঞানীর জীবনকথা।

ইতিহাসে এমন অনেক মহীয়সী নারী রয়েছেন, যাঁদের পরিচিতি কোনও রাজনৈতিক আন্দোলন, সাহিত্যকর্ম কিংবা জনসমক্ষে নেতৃত্বের কারণে নয়; তাঁদের পরিচয় গড়ে উঠেছে গবেষণাগারের নীরব পরিশ্রমে। মানুষের রোগ, তার কারণ এবং চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করে তাঁরা মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। শৈমালা গোপালন ছিলেন তেমনই একজন বিজ্ঞানী।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই গবেষক ক্যান্সার জীববিজ্ঞান ও স্তন ক্যান্সার গবেষণার ক্ষেত্রে কাজ করেছিলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবন ছিল অনুসন্ধিৎসা, অধ্যবসায় এবং গবেষণার প্রতি গভীর নিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি এমন সময়ে বিজ্ঞানচর্চা করেছিলেন, যখন গবেষণাক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল।

তাঁর জীবনকে শুধু একজন বিজ্ঞানীর জীবনী হিসেবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। তাঁর গবেষণা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার তাঁর সাহস এবং নিজের সন্তানদের মধ্যেও শিক্ষার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা।

শৈশব ও শিক্ষার পরিবেশ

শৈমালা গোপালনের জন্ম ১৯৩৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মাদ্রাজ শহরে, বর্তমান চেন্নাইয়ে। তাঁর পরিবারে শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল।

ছোটবেলা থেকেই তিনি বিজ্ঞান ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। সেই সময়ে ভারতে নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছিল, কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি পেশা বেছে নেওয়া এখনও খুব সাধারণ বিষয় ছিল না।

শৈমালা সেই প্রচলিত সীমাবদ্ধতার বাইরে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন।

তিনি হোম সায়েন্স বা প্রচলিত নারীবান্ধব বিষয়ের পরিবর্তে বিজ্ঞানের দিকে এগিয়ে যান। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে পুষ্টিবিজ্ঞান ও এন্ডোক্রাইনোলজি নিয়ে গবেষণা করেন।

সেখান থেকেই তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।

গবেষণার জগতে প্রবেশ

গবেষণাগারে কাজ করা মানে শুধু নতুন কোনও আবিষ্কার করা নয়। বিজ্ঞানীর কাজের একটি বড় অংশ হলো একই প্রশ্ন বারবার পরীক্ষা করা, তথ্য সংগ্রহ করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ফলাফল যাচাই করা।

শৈমালা গোপালনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল এমনই।

তিনি ক্যান্সার গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন এবং স্তন ক্যান্সারের জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সারের হরমোন-নির্ভর প্রকৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার কোষের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল হরমোন-সংবেদনশীল স্তন ক্যান্সার কোষ নিয়ে গবেষণা।

আজ আমরা জানি, স্তন ক্যান্সার এক ধরনের রোগ নয়। এর বিভিন্ন জৈবিক ধরন রয়েছে এবং প্রতিটি ধরনের চিকিৎসার প্রতিক্রিয়াও আলাদা হতে পারে। এই বৈচিত্র্য বোঝার জন্য ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ও আচরণ সম্পর্কে গভীর গবেষণা প্রয়োজন।

শৈমালা সেই গবেষণারই একটি অংশ ছিলেন।

ক্যান্সার গবেষণায় অবদান

শৈমালা গোপালনের গবেষণাকর্মের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের হরমোন-নির্ভর কোষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার সম্পর্ক ছিল। তিনি ক্যান্সার কোষের আচরণ বোঝার জন্য পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় কাজ করেন।

এই ধরনের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল ক্যান্সার কোষ কীভাবে বৃদ্ধি পায়, কীভাবে হরমোনের সংকেতের প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কীভাবে তাদের আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে—এসব বিষয়কে আরও ভালোভাবে বোঝা।

গবেষণার ফলাফল সরাসরি কোনও রোগীর চিকিৎসা হয়ে যায় না। কিন্তু মৌলিক গবেষণাই ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে।

একজন গবেষক যখন ক্যান্সার কোষের একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন তথ্য আবিষ্কার করেন, তখন সেই তথ্য পরবর্তী গবেষকদের নতুন প্রশ্ন করতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞান তাই একটি ধারাবাহিক যাত্রা।

শৈমালা গোপালনের গবেষণাকর্ম সেই দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রার একটি অংশ হয়ে রয়েছে।

একজন নারী বিজ্ঞানীর সময়ের সঙ্গে লড়াই

শৈমালার কর্মজীবনের সময় বিজ্ঞান ও গবেষণা ক্ষেত্রটি আজকের মতো বৈচিত্র্যময় ছিল না। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের গবেষণা ও একাডেমিক নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি ছিল সীমিত।

একজন নারী বিজ্ঞানীর জন্য গবেষণার পাশাপাশি পরিবার, সন্তান এবং সামাজিক প্রত্যাশার ভারসাম্য বজায় রাখাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

কিন্তু শৈমালা নিজের বৈজ্ঞানিক পরিচয়কে কখনও পিছনে সরিয়ে রাখেননি।

তিনি দীর্ঘ সময় গবেষণা করেছেন, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এবং ক্যান্সার গবেষণার ক্ষেত্রে নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করেছেন।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রতিভার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষা

একজন বিজ্ঞানীর অবদান শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি যে জ্ঞান তৈরি করেন, সেটি পরবর্তী গবেষকদের জন্য ভিত্তি তৈরি করে।

শৈমালাও তাঁর কর্মজীবনে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তাঁর কাজের সঙ্গে ক্যান্সার জীববিজ্ঞান, স্তন ক্যান্সার এবং কোষের হরমোন-নির্ভর আচরণ সম্পর্কিত গবেষণার যোগ ছিল।

বিজ্ঞান গবেষণায় এমন বিশেষায়িত কাজের গুরুত্ব অনেক।

কারণ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা উন্নত করতে হলে প্রথমে রোগটির জীববিজ্ঞান বুঝতে হয়।

কোন কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে?

কেন বাড়ছে?

কোন সংকেত সেই বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করছে?

কোন ওষুধ সেই সংকেতকে প্রভাবিত করতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার কাজই শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করে।

পরিবার ও বিজ্ঞান

শৈমালা গোপালনের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে পরিচিত দিক হলো তাঁর দুই কন্যা—কমলা হ্যারিস এবং মায়া হ্যারিস।

তবে তাঁর পরিচয়কে কেবল তাঁদের মা হিসেবে দেখলে তাঁর নিজের বৈজ্ঞানিক পরিচয়টি আড়াল হয়ে যায়।

শৈমালা নিজের সন্তানদের এমন একটি পরিবেশে বড় করেছিলেন যেখানে পড়াশোনা, যুক্তিবোধ, স্বাধীন চিন্তা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মূল্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর নিজের জীবনও ছিল তার একটি উদাহরণ।

তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন নারী একই সঙ্গে গবেষক, মা এবং সমাজের সক্রিয় সদস্য হতে পারেন।

পরবর্তী জীবনে তাঁর কন্যারা জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও শৈমালার নিজস্ব পরিচয় গড়ে উঠেছিল তাঁর বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে।

নিজের পরিচয় তৈরি করার সাহস

নারীর জীবনের ক্ষেত্রে সমাজ অনেক সময় তাঁর পরিচয়কে পরিবার ও সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখতে চায়।

কিন্তু শৈমালার জীবন অন্য একটি বার্তা দেয়।

তিনি ছিলেন একজন গবেষক।

তিনি ছিলেন ক্যান্সার বিজ্ঞানী।

তিনি নিজের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের মধ্যে কাজ করেছিলেন।

তাঁর জীবনের এই দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি এমন সময়ে গবেষণা করেছেন, যখন নারী বিজ্ঞানীদের সামনে অনেক অদৃশ্য বাধা ছিল।

বিজ্ঞানীর পরিচয় অর্জনের জন্য শুধু মেধা যথেষ্ট নয়। দরকার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার সুযোগ, গবেষণার পরিবেশ এবং নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস।

শৈমালা সেই বিশ্বাস ধরে রেখেছিলেন।

ভারতীয় শিকড় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান

শৈমালা গোপালনের জীবনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত পরিমণ্ডলের প্রভাব ছিল।

ভারতে জন্ম নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে সেখানেই তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মজীবনের বড় অংশ গড়ে ওঠে।

এটি স্বাধীনোত্তর ভারতীয় শিক্ষিত প্রজন্মের একটি বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গেও যুক্ত—ভারতের বহু তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

শৈমালার বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু নিজের পেশা তৈরি করেননি; একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিমণ্ডলেও কাজ করেছেন।

বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণ

ক্যান্সার গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের জীবন রক্ষা ও উন্নত করা।

যদিও গবেষণাগারে করা কোনও নির্দিষ্ট কাজের ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চিকিৎসায় দেখা যায় না, তবুও মৌলিক গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির অপরিহার্য ভিত্তি।

শৈমালা গোপালনের কাজের ক্ষেত্রও সেই বৃহত্তর মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

স্তন ক্যান্সার পৃথিবীর বহু নারীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই রোগ সম্পর্কে যত বেশি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তৈরি হয়, তত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হয় উন্নত রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের গবেষণার।

তাই একজন গবেষকের নীরব পরিশ্রমের মূল্য অনেক সময় তাঁর জীবদ্দশার পরিচিতির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

তাঁর জীবন থেকে যে শিক্ষা

শৈমালা গোপালনের জীবন থেকে প্রথম শিক্ষা হলো—স্বপ্নের জন্য নিজের সময়কে বিনিয়োগ করতে হয়।

দ্বিতীয় শিক্ষা—নারীদের জন্য বিজ্ঞান কোনও নিষিদ্ধ ক্ষেত্র নয়।

তৃতীয় শিক্ষা—গবেষণার ফল অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। কিন্তু একটি ছোট বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তরও ভবিষ্যতের বড় আবিষ্কারের ভিত্তি হতে পারে।

আর চতুর্থ শিক্ষা হলো—একজন মানুষের পরিচয়কে শুধু তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।

শৈমালা গোপালন তাঁর নিজের কর্মের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন।

শেষ অধ্যায়

শৈমালা গোপালন ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও গবেষণার উত্তরাধিকার আলোচনায় রয়েছে।

তিনি হয়তো জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিচিত মুখ ছিলেন না। কোনও বিশাল রাজনৈতিক মঞ্চেও তাঁকে দেখা যায়নি। কিন্তু গবেষণাগারের নীরব পরিশ্রমে তিনি যে কাজ করেছিলেন, তা বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তাঁর নিজস্ব স্থান তৈরি করেছে।

উপসংহার

মহীয়সী নারী বলতে আমরা প্রায়ই তাঁদের কথা ভাবি, যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে এমন মানুষের হাত ধরে, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে নিজেদের কাজ করে যান।

শৈমালা গোপালন ছিলেন তেমনই একজন নারী।

তিনি প্রমাণ করেছেন—বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অবদান রাখার জন্য সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে হয় না। কখনও কখনও একটি গবেষণাগারে দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়ও মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান অবদান হয়ে উঠতে পারে।

তাঁর জীবন তাই শুধু একজন ক্যান্সার গবেষকের জীবনকথা নয়; এটি একজন নারীর নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার, জ্ঞানের সন্ধানে সীমা অতিক্রম করার এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিক্ষার মূল্য তুলে ধরার গল্প।

নিজের জন্য তৈরি করা সাফল্য একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের জন্য করা কাজ বহু মানুষের ভবিষ্যৎকে স্পর্শ করে যেতে পারে—শৈমালা গোপালনের জীবন সেই সত্যের একটি সুন্দর উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

সুধীরা দাস: ওড়িশার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার, যিনি নারীদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন প্রযুক্তিশিক্ষার দরজা।।

ভারতের ইতিহাসে এমন অনেক নারী রয়েছেন, যাঁদের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখলে তাঁদের প্রকৃত অবদানকে ছোট করে দেখা হয়। তাঁরা নিজেরা যে পথ পেরিয়ে গিয়েছেন, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সেই পথটিকেই আরও প্রশস্ত করে দিয়েছেন। ওড়িশার সুধীরা দাস ছিলেন তেমনই এক পথপ্রদর্শক। তিনি এমন এক সময়ে প্রযুক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জগতে প্রবেশ করেছিলেন, যখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণই বহু নারীর জন্য সামাজিকভাবে কঠিন ছিল। পরবর্তীকালে তিনি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

সুধীরা দাসকে ওড়িশার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বড় অবদান ছিল ভুবনেশ্বরে Women’s Polytechnic প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকা। এই প্রতিষ্ঠান নারী শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ও ডিপ্লোমা শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শৈশব ও গণিতের প্রতি আকর্ষণ

সুধীরা দাসের জন্ম ১৯৩২ সালের ৮ মার্চ ওড়িশার কটকে। ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতা আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও বিশেষ করে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মতো বিষয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত।

কিন্তু সুধীরা প্রচলিত ধারণার কাছে নিজেকে আটকে রাখেননি। পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং নিজের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

তিনি কটকের Ravenshaw College থেকে ১৯৫১ সালে B.Sc. সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে কলকাতার University of Science and Technology-তে Radio Physics and Electronics বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

এই শিক্ষাগত প্রস্তুতি তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

পুরুষ-প্রধান প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ

আজকের দিনে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিপুল সংখ্যক ছাত্রীকে দেখা গেলেও কয়েক দশক আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রযুক্তিগত শিক্ষায় নারীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সেই সময় একজন নারী যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতেন, তখন তাঁকে শুধু পড়াশোনার পরীক্ষায় নয়, সামাজিক মানসিকতার সঙ্গেও লড়তে হতো।

সুধীরা দাস সেই কঠিন সময়েই নিজের পথ তৈরি করেছিলেন।

উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর ১৯৫৭ সালে তিনি Berhampur Engineering School-এ গণিত বিভাগের লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হলেও খুব দ্রুত তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।

তিনি বুঝেছিলেন, একজন নারী নিজে প্রযুক্তি শিক্ষায় সফল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আরও অনেক নারীর জন্য সেই সুযোগ তৈরি করা।

শিক্ষকতা থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব

সুধীরা দাসের কর্মজীবন শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তীকালে তিনি Women’s Polytechnic, Rourkela-এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ওড়িশা সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বেও কাজ করেন।

১৯৫৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষা, প্রশাসন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান দেওয়ার কাজ করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে তিনি আরও বড় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হন—কীভাবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যেখানে মেয়েরাও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে নিজেদের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখতে পারে?

এই চিন্তাই তাঁর পরবর্তী কাজের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

Women’s Polytechnic, Bhubaneswar: একটি বড় পদক্ষেপ

সুধীরা দাসের জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান হল ভুবনেশ্বরে Women’s Polytechnic প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ডিপ্লোমা পর্যায়ের প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব বোঝার জন্য সেই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতির কথা মনে রাখতে হয়।

প্রযুক্তি শিক্ষা তখনও মূলত পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। অনেক পরিবার মেয়েদের সাধারণ শিক্ষার পরেই বিয়ে দেওয়াকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করত। ফলে মেয়েদের দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল।

Women’s Polytechnic-এর মতো প্রতিষ্ঠান সেই মানসিকতার সামনে একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছিল।

একজন মেয়ে যে প্রযুক্তিগত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং নিজের পেশা তৈরি করতে পারে—এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সুধীরা দাসের চিন্তার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল এখানেই। তিনি শুধু নিজের জন্য দরজা খুলতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন অন্য নারীরাও সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করুক।

একজন নারীর সাফল্য থেকে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা

সুধীরা দাসের জীবনকে শুধু “ওড়িশার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার” পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব ধরা পড়বে না।

একজন পথিকৃৎ সাধারণত এমন একটি কাজ করেন, যার ফল তাঁর নিজের জীবনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

সুধীরা দাস নিজে প্রযুক্তিগত শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি শিক্ষকতা করেছেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হয়েছেন।

অর্থাৎ তাঁর জীবনের ধারাটি ছিল—

শিক্ষা → পেশা → নেতৃত্ব → প্রতিষ্ঠান নির্মাণ → পরবর্তী প্রজন্মের সুযোগ।

এই ধারাটিই তাঁকে বিশেষ করে তোলে।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে নারীকে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখার কোনও স্বাভাবিক কারণ নেই। সুযোগ পেলে নারীরাও বিজ্ঞান, গণিত, ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তির মতো কঠিন বিষয়কে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারে।

সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা চিন্তা

সুধীরা দাসের কর্মজীবন এমন একটি সময়ে বিস্তৃত ছিল, যখন ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। স্বাধীনতার পর দেশকে এগিয়ে নিতে প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী এবং দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু এই উন্নয়নের যাত্রায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

সুধীরা দাস সেই চ্যালেঞ্জকে শিক্ষা দিয়ে মোকাবিলা করেছিলেন।

তাঁর কাজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—শুধু নারীদের উৎসাহ দেওয়া যথেষ্ট নয়; তাঁদের জন্য বাস্তব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত সুযোগও তৈরি করতে হবে।

আজকের দিনে STEM—Science, Technology, Engineering and Mathematics—ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন সুধীরা দাসের মতো পথিকৃৎদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

একজন শিক্ষকের প্রভাব কত দূর যায়?

একজন ভালো শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন। কিন্তু একজন শিক্ষাবিদ যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পায়, তাহলে তাঁর প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।

সুধীরা দাসের কাজকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যায়।

তিনি শ্রেণিকক্ষে গণিত পড়িয়েছেন। কিন্তু তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় বিস্তার ঘটেছে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মাধ্যমে।

Women’s Polytechnic-এর মতো উদ্যোগ নারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের একটি সাংগঠনিক পথ তৈরি করেছিল। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান সমাজকে ধীরে ধীরে বোঝাতে সাহায্য করে যে মেয়েদের ভবিষ্যৎ শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট পেশায় সীমাবদ্ধ নয়।

মেয়েরাও ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে।

মেয়েরাও প্রযুক্তিবিদ হতে পারে।

মেয়েরাও প্রশাসনিক নেতৃত্ব দিতে পারে।

মেয়েরাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে।

সুধীরা দাস নিজের জীবন দিয়ে এই সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তব করে দেখিয়েছিলেন।

সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে নীরব লড়াই

সুধীরা দাসের জীবনে কোনও নাটকীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের গল্প নেই। তাঁর সংগ্রাম ছিল অনেক বেশি নীরব—শিক্ষার মাধ্যমে, পেশার মাধ্যমে এবং প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে।

এই নীরব সংগ্রাম কখনও কখনও সামাজিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।

তিনি কোনও স্লোগান দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেননি; বরং এমন একটি বাস্তব কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, যেখানে নারীরা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে।

এই কারণেই তাঁর জীবন আজও প্রাসঙ্গিক।

বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রী যখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়, কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ে, ইলেকট্রনিক্স শেখে কিংবা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, তখন তার পেছনে বহু প্রজন্মের নারীর লড়াই রয়েছে। সুধীরা দাস সেই দীর্ঘ যাত্রার একজন গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ।

শেষ জীবন

দীর্ঘ কর্মজীবনের পর সুধীরা দাস ১৯৯০ সালের মধ্যে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। কিন্তু তাঁর তৈরি শিক্ষার উত্তরাধিকার তাঁর ব্যক্তিগত অবসরের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি।

২০১৫ সালের ৩০ অক্টোবর ভুবনেশ্বরে ৮৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর জীবন শেষ হলেও তাঁর কাজের প্রভাব থেকে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং সেইসব নারীর জীবনে, যাঁরা প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন।

উত্তরাধিকার

সুধীরা দাসের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পরিবর্তন সবসময় বড় কোনও আন্দোলন দিয়ে শুরু হয় না। কখনও কখনও একজন মানুষ নিজের পছন্দের একটি ক্ষেত্রকে বেছে নিয়ে, দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে সমাজের কাঠামোতেই পরিবর্তন আনতে পারেন।

তিনি ছিলেন ওড়িশার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের পথিকৃৎ। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের আরও বড় অংশ হলো—তিনি নারী শিক্ষার জন্য প্রযুক্তির দরজা খুলতে চেয়েছিলেন।

নিজে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করাই ছিল তাঁর সাফল্যের প্রকৃত অর্থ।

সুধীরা দাস তাই শুধু একজন ইঞ্জিনিয়ার নন। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা এবং নারী ক্ষমতায়নের এক নীরব স্থপতি।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

“একজন মানুষ যখন নিজের জন্য একটি পথ তৈরি করেন, তখন তিনি সফল। আর যখন সেই পথ দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম হাঁটতে পারে, তখন তাঁর জীবন হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার।”

সুধীরা দাসের জীবন সেই উত্তরাধিকারেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

সরলা রায়: নারীশিক্ষার আলো জ্বালানো এক মহীয়সী নারী।

ভারতের সমাজসংস্কারের ইতিহাসে নারীশিক্ষা একটি দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। একসময় মেয়েদের উচ্চশিক্ষা তো দূরের কথা, বিদ্যালয়ে যাওয়াকেও অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় বলে মনে করত না। সেই সময়ে কিছু সাহসী নারী ও পুরুষ সমাজের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলায় সেই অগ্রণী নারীদের অন্যতম ছিলেন সরলা রায়।

তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং নারীশিক্ষার প্রবল সমর্থক। তাঁর কাজের অন্যতম বড় পরিচয় কলকাতার গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল প্রতিষ্ঠা। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় আজও তাঁর শিক্ষাদর্শের স্মৃতি বহন করছে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসেও সরলা রায়কে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু তাঁর অবদান শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নারীশিক্ষা, নারীর সামাজিক অধিকার, শিক্ষার প্রসার এবং সংগঠিত নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সংস্কারমুখী পরিবারে বেড়ে ওঠা

সরলা রায় জন্মেছিলেন উনিশ শতকের বাংলার এক বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সমাজসংস্কারক দুর্গামোহন দাস। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যও নারীশিক্ষা ও সমাজসংস্কারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর বোন অবলা বসুও পরবর্তীকালে নারীশিক্ষা ও সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ফলে ছোটবেলা থেকেই সরলা রায় এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন যেখানে শিক্ষা, যুক্তিবাদ এবং সামাজিক সংস্কারের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা ছিল স্বাভাবিক।

এই পারিবারিক পরিবেশ তাঁর চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

নিজের শিক্ষাজীবনও ছিল ঐতিহাসিক

যে সময়ে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত ছিল, সেই সময়েই সরলা রায় পড়াশোনার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন।

তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রথমদিকের ভারতীয় নারীদের অন্যতম ছিলেন। চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও সেই প্রজন্মের নারী, যাঁরা উচ্চশিক্ষার দরজা নারীদের জন্য আরও প্রশস্ত করার পথে প্রথম দিকের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের প্রথম মহিলা সদস্য হন।

এই ঘটনাটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না।

এটি ছিল সেই সময়ের সমাজের জন্য একটি প্রতীকী পরিবর্তন।

একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন—সরলা রায় নিজের জীবন দিয়েই সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

ঢাকায় নারীশিক্ষার কাজ

বিবাহের পর সরলা রায়ের জীবনের একটি সময় ঢাকায় কাটে। সেই সময়ও তিনি নারীশিক্ষার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখেন।

ঢাকায় তিনি মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় এবং একটি মহিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দরিদ্র ও বিধবা নারীদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি করার চিন্তাও তাঁর কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এখান থেকেই তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের বিষয় নয়; শিক্ষা মানুষের জীবন বদলানোর একটি সামাজিক শক্তি।

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই শক্তির গুরুত্ব তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন।

কলকাতায় ফিরে নতুন উদ্যোগ

কলকাতায় ফিরে সরলা রায় বিভিন্ন নারীকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।

তিনি স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘সখী সমিতির’ সঙ্গেও কাজ করেছিলেন। এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল দরিদ্র ও বিধবা নারীদের শিক্ষা দেওয়া এবং তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা।

এই কাজের মধ্য দিয়ে সরলা রায় বুঝতে পেরেছিলেন যে নারীশিক্ষাকে কেবল অভিজাত পরিবারের মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের কাছেও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে।

এই চিন্তা তাঁর পরবর্তী কাজের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল

সরলা রায়ের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলির একটি ছিল গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল প্রতিষ্ঠা।

১৯২০ সালে কলকাতায় এই বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। বিদ্যালয়টির নাম রাখা হয়েছিল বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলের নামে।

সরলা রায়ের শিক্ষাদর্শ ছিল অত্যন্ত আধুনিক।

তিনি মনে করতেন, শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, ব্যক্তিত্ব, সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিকশিত করবে।

গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলে তাই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত, খেলাধুলা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এই পদ্ধতি সেই সময়ের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রসর ছিল।

তিন ভাষায় শিক্ষার ভাবনা

সরলা রায় বুঝেছিলেন, একটি শিক্ষিত মেয়েকে শুধু নিজের মাতৃভাষায় সীমাবদ্ধ রাখলে তার জ্ঞানের পরিসর ছোট হয়ে যেতে পারে।

তাই বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজির মতো ভাষা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এর মধ্যে ছিল একটি বিস্তৃত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলার মেয়েরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে, আবার ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য হিন্দি এবং বৃহত্তর বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য ইংরেজিও শিখবে—এই ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা ছিল তাঁর শিক্ষাদর্শের একটি বৈশিষ্ট্য।

নারীশিক্ষা থেকে নারী অধিকার

সরলা রায়ের কাছে নারীশিক্ষা ছিল বৃহত্তর নারী-অধিকার আন্দোলনের অংশ।

তিনি বুঝেছিলেন, একজন নারী যদি নিজের অধিকার সম্পর্কে না জানেন, তবে কেবল বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেই তাঁর সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

তাই নারীশিক্ষার পাশাপাশি নারীর সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের প্রশ্নেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

১৯২০-এর দশকে নারীর ভোটাধিকার ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে যে সংগঠিত নারী আন্দোলন গড়ে উঠছিল, সরলা রায় তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্সের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এবং পরে তিনি সংগঠনটির সভাপতি হন।

অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স

১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত All India Women’s Conference বা AIWC ভারতের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংগঠন।

সরলা রায় এই সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী ছিলেন। সংগঠনের বঙ্গীয় শাখা গড়ে তোলা এবং নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল।

১৯৩২ সালে তিনি AIWC-এর সভাপতি হন। সেই সময় সংগঠনটি নারীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করছিল।

এখানে সরলা রায়ের ভূমিকা শুধু একজন শিক্ষাবিদের ছিল না।

তিনি ছিলেন একজন সংগঠকও।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীদের একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান

নারীশিক্ষার অন্যতম বড় বাধা ছিল অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া।

একজন মেয়ের শৈশব শেষ হয়ে যেত, শিক্ষা থেমে যেত এবং খুব অল্প বয়সেই তাকে সংসারের দায়িত্ব নিতে হতো।

সরলা রায় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসার এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকে তিনি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে দেখতেন।

তাঁর যুক্তি ছিল সহজ কিন্তু শক্তিশালী—

একটি মেয়েকে যদি শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সে নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ

সরলা রায়ের জীবন শুধু শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতেন। এমনকি তাঁর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’ বেথুন স্কুলে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই ঘটনাটি তাঁর শিক্ষাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

তিনি মনে করতেন, একজন শিক্ষিত নারীর বিকাশ শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

সংগীত, নাটক, শিল্প, সাহিত্য—এসবও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক

সরলা রায়ের সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন ছিল—মেয়েদের কী শেখানো হবে?

শুধু গৃহস্থালির কাজ?

শুধু পরীক্ষার বিষয়?

নাকি তাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে?

সরলা রায় তৃতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি এমন শিক্ষা চেয়েছিলেন, যা একজন মেয়েকে চিন্তা করতে শেখাবে, প্রশ্ন করতে শেখাবে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে শেখাবে এবং সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

এই কারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শে পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ওপর গুরুত্ব ছিল।

একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে আন্দোলনের রূপ নেয়

গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল শুধু একটি বিদ্যালয় হয়ে থাকেনি।

সময়ের সঙ্গে এটি কলকাতার নারীশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

সরলা রায়ের মৃত্যুর বহু দশক পরেও প্রতিষ্ঠানটি তাঁর আদর্শের স্মৃতি বহন করছে। বর্তমান বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাঁকে ১৯২০ সালের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করে এবং তাঁর শিক্ষাদর্শের কথা তুলে ধরে।

এটাই একজন শিক্ষাবিদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

একটি ভবন তৈরি করা সহজ।

কিন্তু এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবন গড়ে তোলে—সেটিই প্রকৃত উত্তরাধিকার।

সমাজের নানা স্তরে নারীদের জন্য কাজ

সরলা রায়ের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীদের সংগঠিত করা।

তিনি বুঝেছিলেন, একজন নারী একা যতটা এগোতে পারেন, সংগঠিতভাবে এগোলে তার শক্তি অনেক বেশি হয়।

মহিলা সমিতি, নারীশিক্ষা সংগঠন এবং পরবর্তীতে সর্বভারতীয় নারী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যুক্ততা সেই ভাবনারই প্রকাশ।

তিনি নারীকে শুধু সহানুভূতির পাত্র হিসেবে দেখতে চাননি।

তিনি চেয়েছিলেন নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোক এবং সামাজিক পরিবর্তনের অংশীদার হোক।

তাঁর সময়ের তুলনায় কতটা এগিয়ে ছিল তাঁর চিন্তা?

আজ আমরা নারীশিক্ষা, নারীস্বনির্ভরতা, সমান অধিকার এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের কথা স্বাভাবিকভাবে বলি।

কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ায় এই ধারণাগুলি সমাজের সর্বত্র গ্রহণযোগ্য ছিল না।

সেই সময়ে একটি মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বসবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটে থাকবে, বিদ্যালয় পরিচালনা করবে এবং নারীদের অধিকার নিয়ে সর্বভারতীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দেবে—এটি ছিল যথেষ্ট সাহসী পদক্ষেপ।

সরলা রায় সেই সাহস দেখিয়েছিলেন।

তাঁর জীবন থেকে আজকের শিক্ষকদের শিক্ষা

সরলা রায়ের জীবন আজকের শিক্ষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন শিক্ষক বা শিক্ষাবিদ শুধু পাঠ্যবই পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না।

একজন সত্যিকারের শিক্ষাবিদ সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেন।

একটি মেয়ের আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারেন।

একটি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারেন।

এমনকি একটি সমাজের মূল্যবোধও বদলে দিতে পারেন।

সরলা রায় সেই বৃহত্তর শিক্ষার ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন।

উত্তরাধিকার

১৯৪৬ সালে সরলা রায়ের জীবনাবসান হয়। কিন্তু তাঁর কাজ থেমে যায়নি।

গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল আজও কলকাতায় শিক্ষার একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার পরিসর সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, আধুনিক হয়েছে, কিন্তু নারীশিক্ষার যে স্বপ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম—তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অটুট।

একজন মানুষের জীবন কতটা দীর্ঘ ছিল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কী পরিবর্তনের বীজ বপন করে গিয়েছেন।

সরলা রায় সেই অর্থে একজন সফল সমাজসংস্কারক।

আমাদের জন্য সরলা রায়ের বার্তা

সরলা রায়ের জীবন আমাদের শেখায়—শিক্ষা কখনও কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়।

শিক্ষা সমাজকে বদলাতে পারে।

একজন শিক্ষিত নারী একটি পরিবারকে বদলাতে পারেন।

শিক্ষিত প্রজন্ম একটি সমাজকে বদলাতে পারে।

আর সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন এমন শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞান, সংস্কৃতি, মানবিকতা, স্বাধীন চিন্তা এবং সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর সমন্বয় থাকবে।

সরলা রায় সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন।

তিনি এমন এক সময়ে মেয়েদের জন্য শিক্ষার দরজা খুলতে চেয়েছিলেন, যখন সেই দরজার সামনে ছিল অসংখ্য সামাজিক বাধা।

তাঁর হাতে তৈরি সেই পথ ধরে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য মেয়ে এগিয়ে গেছে।

তাই সরলা রায়কে শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর অবদানকে ছোট করা হবে।

তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যিনি বিশ্বাস করেছিলেন—একটি মেয়ের হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; ভবিষ্যতের একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে আলোকিত করার সম্ভাবনা তৈরি করা।

এই বিশ্বাসই তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

আশোকা গুপ্ত: দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক মহীয়সী নারী।।।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজগঠনের ইতিহাসে এমন অনেক নারী রয়েছেন, যাঁদের নাম বড় রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু তাঁদের কাজ ছাড়া সেই ইতিহাস পূর্ণ হয় না। তাঁরা মানুষের দুঃখের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিপন্ন পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছেন, নারী ও শিশুর পুনর্বাসনের জন্য লড়াই করেছেন এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

আশোকা গুপ্ত ছিলেন তেমনই এক মহীয়সী নারী।

তিনি ছিলেন শিক্ষিত, সংগঠক, সমাজকর্মী এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এক দৃঢ়চেতা মানুষ। বাংলার দুর্ভিক্ষ থেকে নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক হিংসা, দেশভাগের উদ্বাস্তু সমস্যা থেকে গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর জীবনকে শুধু সমাজসেবার ইতিহাস বললে কম বলা হবে। এটি ছিল সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির গল্প।

শিক্ষাজীবন থেকেই আলাদা পথ

আশোকা গুপ্তের জন্ম ১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে। কলকাতায় তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেই সময়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী মেয়েদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু পড়াশোনায় তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।

তিনি বেথুন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং গণিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। তারও আগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

এই শিক্ষাগত সাফল্য তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু তিনি কেবল নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য শিক্ষা ব্যবহার করেননি। পরবর্তী জীবনে শিক্ষাকে মানুষের সামাজিক উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন।

সমাজসেবার সঙ্গে প্রথম পরিচয়

ছাত্রজীবন থেকেই স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীকালে অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স বা AIWC-এর সঙ্গে যুক্ত হন।

এই সংগঠনের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণের নানা কাজে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সমাজসেবা তাঁর জীবনের প্রধান কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়।

বিয়ের পর স্বামী শৈবাল কুমার গুপ্ত ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য। তাঁর কর্মসূত্রে আশোকা গুপ্তকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকতে হয়েছিল। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামাজিক সমস্যাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে।

বাংলার দুর্ভিক্ষে মানুষের পাশে

১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

অসংখ্য মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যান। বহু পরিবার ভেঙে পড়ে। শিশুরা অনাহারে দিন কাটায়। গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ।

এই সময় আশোকা গুপ্ত বাঁকুড়ায় ত্রাণ ও সমাজসেবার কাজে যুক্ত হন। নারী ও শিশুদের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ়ভাবে সমাজসেবার পথে নিয়ে যায়।

তাঁর কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনও আনুষ্ঠানিক কাজ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিপদের সময় সমাজের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ও শিক্ষিত মানুষের একটি দায়িত্ব রয়েছে—তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

নোয়াখালির ভয়াবহ দিন

আশোকা গুপ্তের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি ছিল ১৯৪৬ সালের নোয়াখালি।

সাম্প্রদায়িক হিংসার কারণে নোয়াখালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারায়। নারীরা ও শিশুরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

সেই সময় আশোকা গুপ্ত অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্সের চট্টগ্রাম শাখার পক্ষ থেকে ত্রাণকর্মীদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নোয়াখালিতে যান।

এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

একজন শিক্ষিত, নিরাপদ পারিবারিক জীবনে থাকা নারী হিসেবে তিনি চাইলে সেই পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

তিনি আক্রান্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন।

ত্রাণ দিয়েছেন, আতঙ্কিত মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।

গান্ধীর সঙ্গে নোয়াখালিতে

নোয়াখালির ঘটনায় মহাত্মা গান্ধীও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেখানে যান।

আশোকা গুপ্তের কাজও সেই সময় গান্ধীয় শান্তি ও মানবসেবার ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। তিনি মানুষের মধ্যে ভয় কমানোর চেষ্টা করেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করেন।

নোয়াখালির অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

তিনি বুঝেছিলেন, সাম্প্রদায়িক হিংসার সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক সংঘাতের অভিঘাত শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সেই পরিবারগুলির ওপর, যাদের হাতে কোনও ক্ষমতা নেই।

এই উপলব্ধি তাঁর পরবর্তী সমাজসেবার দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

বিপদের মধ্যেও থেকে যাওয়া

নোয়াখালিতে কাজ করার সময় আশোকা গুপ্ত শুধু ত্রাণ বিলি করে ফিরে আসেননি।

দুর্গত মানুষের মধ্যে থেকে তাঁদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি নোয়াখালির প্রত্যন্ত গ্রামেও তিনি মানুষের সঙ্গে থেকেছেন এবং তাদের পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছেন। তাঁর জীবনীতে এই সময়টিকে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই কাজ তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে—তিনি সমস্যাকে দূর থেকে দেখতে চাইতেন না।

সমস্যার কাছে যেতে চাইতেন।

মানুষের সঙ্গে বসে তাঁদের কথা শুনতে চাইতেন।

তারপর সমাধানের পথ খুঁজতেন।

দেশভাগের পর নতুন সংকট

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। তাঁরা ছিলেন উদ্বাস্তু। অনেকেই ঘরবাড়ি, জমিজমা, সম্পদ এবং জীবিকার সমস্ত কিছু হারিয়ে এসেছিলেন।

বিশেষ করে নারী, শিশু এবং পরিবারহীন মানুষের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।

এই সময় আশোকা গুপ্ত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পুনর্বাসনমূলক কাজের সমন্বয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর নেতৃত্বে নারী ও শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই কাজের ধারাবাহিকতায় মহিলা সেবা সমিতি-র মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদ্বাস্তু ও বিপন্ন নারীদের পুনর্বাসনের জন্য এই সংগঠন কাজ চালিয়ে যায়।

নারীর হাতে শিক্ষা ও কাজ

আশোকা গুপ্ত বিশ্বাস করতেন, নারীর প্রকৃত পুনর্বাসন শুধু আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

একজন নারীকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

তার শিক্ষা দরকার।

তার কাজ দরকার।

তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দরকার।

এই চিন্তা থেকেই তিনি গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।

কস্তুরবা গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে তিনি গ্রামীণ এলাকায় নারীশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিশু কল্যাণ ও নিরক্ষরতা দূরীকরণের কাজে নেতৃত্ব দেন।

বুনিয়াদি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

১৯৪৭ সালে তিনি AIWC Buniyadi Bidyapith প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও সাক্ষরতার আওতায় আনা এবং পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব ছিল।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে বজায় ছিল।

শুধু পড়াশোনা নয়—শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার কাজও এই উদ্যোগের অংশ ছিল।

এখানে তাঁর শিক্ষাদর্শ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি।

গ্রামীণ সমাজের জন্য কাজ

আশোকা গুপ্তের কাজের বড় অংশ জুড়ে ছিল গ্রাম।

তিনি জানতেন, ভারতের সামাজিক উন্নয়ন শহরকেন্দ্রিক হলে চলবে না।

গ্রামের নারীরা যদি শিক্ষার সুযোগ না পান, শিশুরা যদি বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে এবং পরিবারগুলি যদি জীবিকার স্থায়ী সুযোগ না পায়, তাহলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তাই গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, নারী পুনর্বাসন এবং শিশু কল্যাণের কাজকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গ্রামসেবা কেন্দ্রগুলির উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

প্রশাসনিক দায়িত্বেও সমাজকল্যাণ

আশোকা গুপ্ত শুধু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না।

তিনি পশ্চিমবঙ্গ স্টেট সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাডভাইজরি বোর্ডের চেয়ারপার্সন ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ বোর্ডের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।

এই দায়িত্বগুলির মাধ্যমে সমাজকল্যাণের বৃহত্তর নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।

তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল মাঠের।

তাই নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাকে সামনে রাখার সুযোগ তাঁর ছিল।

শিশুদের জন্য তাঁর চিন্তা

নারীর পাশাপাশি শিশুদের কল্যাণও তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল।

অসহায় ও পরিবারহীন শিশুদের জন্য আশ্রয়, শিক্ষা ও পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করার বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কলকাতায় SOS Children’s Village-এর সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল।

তিনি মনে করতেন, একটি শিশুর জন্য শুধু খাবার ও আশ্রয় যথেষ্ট নয়।

তার দরকার নিরাপত্তা।

তার দরকার ভালোবাসা।

তার দরকার শিক্ষা।

এবং সবচেয়ে বেশি দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সে নিজেকে পরিবারের একজন সদস্য বলে মনে করতে পারে।

লেখিকার ভূমিকাতেও আশোকা গুপ্ত

আশোকা গুপ্ত নিজের অভিজ্ঞতাগুলি লিখেও রেখে গিয়েছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য বই “Noakhalir Durjoger Dine” এবং “In the Path of Service: Memories of a Changing Century”।

বিশেষ করে তাঁর স্মৃতিকথা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলার দুর্ভিক্ষ, নোয়াখালির অভিজ্ঞতা, স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময়ের সামাজিক পরিবর্তন এবং স্বাধীনতার পর সমাজসেবার নানা অভিজ্ঞতা।

ফলে তাঁর লেখা ইতিহাসেরও একটি মূল্যবান দলিল।

পুরস্কার ও সম্মান

দীর্ঘ সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে আশোকা গুপ্ত বিভিন্ন পুরস্কার পান।

১৯৯৪ সালে তিনি গান্ধী সেবা পুরস্কারে সম্মানিত হন। ২০০৩ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গোল্ড প্ল্যাক পান। ২০০৭ সালে তিনি জামনালাল বাজাজ পুরস্কার লাভ করেন।

কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল তাঁর কাজের সামাজিক প্রভাব।

যে নারী দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, নোয়াখালির হিংসার মধ্যে গিয়েছিলেন, দেশভাগের উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তী জীবনে নারী ও শিশুদের শিক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন—তাঁর জীবনের আসল সম্মান মানুষের স্মৃতিতে।

দীর্ঘ জীবনের শেষ অধ্যায়

আশোকা গুপ্ত ২০০৮ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি প্রায় এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে ভারতের সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন।

একজন তরুণী হিসেবে যে সময়ে তিনি সমাজসেবায় প্রবেশ করেছিলেন, তখন ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে।

পরবর্তীতে তিনি দেখেছেন স্বাধীনতা।

দেখেছেন দেশভাগ।

দেখেছেন উদ্বাস্তু স্রোত।

দেখেছেন নতুন ভারতের নির্মাণ।

আর এই প্রতিটি পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন।

আমাদের কী শেখায় আশোকা গুপ্তের জীবন?

আশোকা গুপ্তের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষের সেবা করার জন্য অসাধারণ ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন অসাধারণ সাহস ও মানবিকতা।

নোয়াখালির মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তিনি মানুষের কাছে গিয়েছিলেন।

দেশভাগের পর উদ্বাস্তু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

নারীদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

শিশুদের জন্য বিদ্যালয় ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।

এবং নিজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিখে রেখে গিয়েছিলেন।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষিত নারী চাইলে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজের জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

তাঁর জীবন আমাদের আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু বড় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি করেন সেইসব নীরব কর্মীরাও, যারা বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং ধীরে ধীরে একটি সমাজকে বদলে দেন।

আশোকা গুপ্ত ছিলেন সেই নীরব অথচ শক্তিশালী পরিবর্তনের একজন নির্মাতা।

তাঁর জীবন তাই আজও আমাদের কাছে এক উজ্জ্বল বার্তা—

মানুষের দুঃখকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করা এবং সেই দায়িত্ব থেকে কখনও পিছিয়ে না যাওয়াই প্রকৃত মানবসেবা।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা  — বাবুই পাখির বাসা।।।

তালগাছের ওই ডালে দেখি
বাবুই পাখির বাসা,
খড়কুটোয় গড়া ছোট্ট ঘর
ভালোবাসার ভাষা।

ঝড় এলে দোলে বাসাটি,
বৃষ্টি নামে ঝরে,
তবু পাখি ছেড়ে যায় না
নিজের আপন ঘরে।

দিনভর সে উড়ে বেড়ায়,
খুঁজে আনে খাবার,
সন্ধ্যা হলে ফিরে আসে
সন্তানেরই দ্বারে।

কত যত্নে বুনেছে বাসা,
একটি একটি তন্তু,
ছোট্ট ঘরে লুকিয়ে থাকে
তার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু।

মানুষও তো ঘর বানায়
ইট-পাথরের ভরে,
তবু সুখের আসল ঠিকানা
ভালোবাসার ঘরে।

বড় বাড়ি, দামি আসবাব
সবই অর্থহীন,
যদি সেখানে আপনজনের
হাসি না থাকে দিন।

বাবুই পাখি শেখায় আমায়—
ঘর বড় নয়, মন বড়,
ভালোবাসায় বাঁধা থাকলে
ছোট্ট ঘরও স্বর্গতুল্য।

Share This
Categories
কবিতা

কবিতা  — একজন অচেনা মানুষের হাসি।।

ভিড়ের মাঝে হঠাৎ দেখি
একটি মানুষের হাসি,
চোখে তার ক্লান্তি থাকলেও
মুখে মায়া ভাসি।

কোনোদিন তাকে দেখিনি আমি,
নেই পরিচয় কোনো,
তবু তার সেই ছোট্ট হাসি
মন ছুঁয়ে গেল যেন।

হয়তো তারও দুঃখ আছে,
আছে না-পাওয়ার ক্ষত,
তবু সে হাসি বিলিয়ে দেয়
অচেনা মানুষের শত।

বাসের ভিড়ে জায়গা ছেড়ে
দেয় বৃদ্ধ মানুষটিকে,
নিজের কষ্ট ভুলে গিয়ে
হাসি দেয় শিশুটিকে।

এক মুহূর্তের ছোট্ট কাজে
বদলে যায় দৃশ্য,
মনে হয়—মানুষ এখনো
মানুষের জন্য নিঃশেষ।

আমরা কত ব্যস্ত থাকি
নিজের হিসাব নিয়ে,
কখনও কি একটু থামি
অন্যের পাশে গিয়ে?

একটি হাসি, একটি কথা,
একটু সহানুভূতি—
এই সামান্য জিনিসেই তো
বেঁচে থাকে মানবিকতা।

সেদিনের সেই অচেনা মানুষ
চলে গেল ভিড়ের মাঝে,
কিন্তু তার হাসিটুকু রয়ে গেল
আমার হৃদয়ের পাতায়।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা  — বটগাছ।।

গ্রামের পথে বটগাছটি
দাঁড়িয়ে আছে চুপ,
তারই নিচে কত দুপুর
পেয়েছে শান্তির রূপ।

ঝুরি নেমে মাটির বুকে
গড়েছে নতুন ঘর,
শত পাখির কোলাহলে
ভরে ওঠে প্রহর।

তার ছায়াতে পথিক বসে
মুছে পথের ক্লান্তি,
কেউবা এসে গল্প করে,
কেউ খোঁজে একটু শান্তি।

দাদুর মুখে শুনেছি কত
পুরনো দিনের কথা,
এই গাছ নাকি দেখেছে
যুদ্ধ, প্রেম আর ব্যথা।

কত মানুষ এসেছে এখানে,
কত মানুষ গেছে,
বটগাছটি দাঁড়িয়ে থেকেছে
সময়ের স্রোতের পাশে।

তার শরীরে বয়সের দাগ,
তবু প্রাণে জোর,
ঝড়ের রাতে বুক পেতে দেয়,
রোদে দেয় শীতল ঘোর।

আমরাও যদি বটের মতো
দিতে পারি ছায়া,
তবে হয়তো মানুষের মনে
রয়ে যাবে মায়া।

একদিন যখন থাকব না আর
এই পৃথিবীর পথে,
আমাদেরও কোনো স্মৃতি থাকুক
কারও হৃদয়ের সাথে।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা — নীরবতার ভাষা।।।

সব কথা কি মুখে বলতে হয়?
কিছু কথা চোখে থাকে,
নিঃশব্দ কোনো দৃষ্টির ভেতর
হাজার গল্প জাগে।

কখনও কাছে থেকেও মানুষ
দূরে সরে যায়,
কখনও দূরের মানুষটিই
হৃদয়ের কাছে ঠাঁই পায়।

নীরবতা কখনও অভিমান,
কখনও গভীর প্রেম,
কখনও আবার হারিয়ে যাওয়া
স্বপ্নের শেষ নেমে।

একটি দীর্ঘশ্বাস বলে দেয়
কতটা কষ্ট জমে,
একটি হাসি লুকিয়ে রাখে
কত কান্না মনে।

তাই কাউকে বিচার করার আগে
একবার থেমে দেখো,
তার নীরব চোখের পাতায়
কী গল্প আছে রেখো।

সব মানুষ কথা বলতে পারে না,
সব ব্যথা ভাষা পায় না,
কিছু অনুভূতি হৃদয় ছাড়া
কেউ কখনও বুঝতে পারে না।

যে মানুষ নীরব হয়ে গেছে,
তার পাশে একটু থেকো,
হয়তো তোমার নীরবতাই
তার সবচেয়ে প্রিয় ভাষা হবে।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা  — হারিয়ে যাওয়া বিকেল।।

বিকেল নামে নদীর ঘাটে,
রোদ হয় ধীরে ফিকে,
হাওয়া এসে গল্প বলে
পুরনো দিনের দিকে।

দূরের মাঠে গরু ফেরে,
পাখি ফেরে নীড়ে,
একটা বাঁশির সুর ভেসে যায়
নিস্তব্ধতার ভিড়ে।

সেই বিকেলে কেউ ছিল পাশে,
হাত ছিল হাতের মাঝে,
কথা ফুরোত না কখনও
নদীর নরম সাজে।

আজও সেই ঘাট আছে,
আছে নদীর জল,
শুধু নেই সেই মানুষটি—
নেই সেই কোলাহল।

পাথরের ওপর বসে আমি
জলের দিকে চাই,
ঢেউগুলো কি জানে তবে
সে কোথায় হারায়?

সূর্য ডোবে, আকাশ জ্বলে
কমলা রঙের মায়ায়,
স্মৃতিগুলো ফিরে আসে
নীরব কোনো ছায়ায়।

হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলো
ফিরবে না আর কভু,
তবু তাদের ভালোবাসা
থাকুক হৃদয়ে তবু।

সময় যত দূরেই নিয়ে যাক
জীবনের সেই দিন,
কিছু বিকেল থেকে যায়
চিরকাল রঙিন।

Share This