Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: হারানো রঙের বাক্স।।।

শহরের এক পুরনো পাড়ায় থাকত তেরো বছরের মেয়ে তৃষা। পড়াশোনায় মোটামুটি, কিন্তু ছবি আঁকতে সে অসম্ভব ভালোবাসত।

তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল একটি ছোট্ট কাঠের রঙের বাক্স। বাক্সটির ঢাকনায় তার বাবা নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন—

“রঙ শেষ হয়ে গেলেও আঁকা থামিও না।”

বাবা ছিলেন বাড়ি রং করার মিস্ত্রি। সংসারে অভাব থাকলেও মেয়ের আঁকার খাতার জন্য কখনও টাকা দিতে কৃপণতা করতেন না।

এক বর্ষার দুপুরে তৃষা স্কুল থেকে ফিরে দেখল, তার রঙের বাক্সটি নেই।

সে পুরো ঘর খুঁজল।

আলমারি, খাটের নিচে, বইয়ের তাক—কোথাও নেই।

মা বললেন,

—“হয়তো স্কুলে রেখে এসেছিস।”

তৃষা পরদিন স্কুলে গিয়েও পেল না।

কয়েকদিন কেটে গেল।

তৃষা আর ছবি আঁকল না।

একদিন স্কুলের আঁকার শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুই ছবি আঁকছিস না কেন?”

তৃষা বলল,

—“আমার রং নেই।”

শিক্ষক বললেন,

—“রং নেই, নাকি মনটা নেই?”

তৃষা কোনও উত্তর দিল না।

সেদিন স্কুল ছুটির পর সে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখতে পেল। বৃদ্ধের সামনে কয়েকটি পুরনো বোতল, কাঠের টুকরো আর ভাঙা জিনিসপত্র।

তৃষা কৌতূহলী হয়ে দাঁড়াল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“কী দেখছিস?”

—“আপনি এগুলো দিয়ে কী করেন?”

—“যা ফেলে দেয় মানুষ, সেগুলো দিয়ে নতুন জিনিস বানাই।”

তৃষা অবাক হল।

বৃদ্ধ একটি পুরনো কাঠের টুকরো তুলে বললেন,

—“সবাই ভাবে এটা আবর্জনা। আমি ভাবি, এর এখনও কাজ বাকি।”

কথাটা তৃষার মনে গেঁথে গেল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে পুরনো খবরের কাগজ, কয়লা, হলুদ মাটি, ফুলের পাপড়ি আর রান্নাঘরের কিছু প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে নিজেই রং তৈরি করার চেষ্টা করল।

প্রথম ছবি খুব একটা ভালো হল না।

দ্বিতীয়টাও নয়।

তবু সে থামল না।

কয়েক সপ্তাহ পর তার আঁকা ছবিগুলো স্কুলের প্রদর্শনীতে রাখা হল।

ছবির নাম—

“রঙ ছাড়াও রঙ”।

ছবিটিতে ছিল একটি মেয়ে, যার হাতে কোনও রঙের বাক্স নেই। কিন্তু চারপাশে পৃথিবীর সব রঙ ছড়িয়ে আছে।

প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখে এক ব্যক্তি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তিনি তৃষার বাবা।

তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

—“তোর সেই রঙের বাক্সটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

তৃষা অবাক হয়ে তাকাল।

বাবা বললেন,

—“কাজে যাওয়ার সময় ভুল করে ব্যাগে চলে গিয়েছিল। পরে কোথায় রেখেছি মনে ছিল না। আজ বাড়ির পুরনো বাক্স খুলতে গিয়ে পেলাম।”

তৃষার চোখ বড় হয়ে গেল।

বাবা বাক্সটা তার হাতে তুলে দিলেন।

বাক্সটা আগের মতোই আছে।

শুধু ভেতরের রংগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে।

তৃষা ঢাকনাটা খুলে বাবার লেখা কথাটা পড়ল—

“রঙ শেষ হয়ে গেলেও আঁকা থামিও না।”

সে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল।

—“বাবা, আমি থামিনি।”

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“জানি।”

কয়েক বছর পরে তৃষা একজন চিত্রশিল্পী হল।

তার প্রথম প্রদর্শনীর নাম ছিল—

“যা হারিয়ে গিয়েছিল”।

প্রদর্শনীর একেবারে মাঝখানে রাখা ছিল সেই পুরনো কাঠের রঙের বাক্স।

তার পাশে ছোট্ট একটি লেখা—

“কখনও কখনও আমরা যা হারাই, তা আমাদের নতুন কিছু খুঁজে পেতে শেখায়।”

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: একটি ভাঙা মূর্তি।।

শহরের পুরনো পাড়ায় একটা ছোট্ট কারিগরের দোকান ছিল। সেখানে পাথর, কাঠ আর ধাতু দিয়ে নানা ধরনের মূর্তি তৈরি করতেন রঘুনাথ।

বয়স হয়েছে, হাতের জোর কমেছে। তবু কাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা একটুও কমেনি।

একদিন এক ব্যবসায়ী তাঁর কাছে একটি দামি পাথরের মূর্তি বানানোর অর্ডার দিলেন।

রঘুনাথ কয়েক মাস ধরে কাজ করলেন।

মূর্তিটা প্রায় শেষ।

কিন্তু এক সকালে শেষবারের মতো পাথরে আঘাত করতেই—

ঠক!

মূর্তির মুখের একপাশ ভেঙে গেল।

রঘুনাথ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।

ব্যবসায়ী এসে দেখে রেগে গেলেন।

—“এটা কী করেছেন? এত টাকা খরচ করলাম!”

রঘুনাথ মাথা নিচু করে বললেন,

—“আমি ঠিক করে দেব।”

—“আর হবে না। অর্ডার বাতিল।”

ব্যবসায়ী চলে গেলেন।

মূর্তিটা দোকানের এক কোণে পড়ে রইল।

কয়েকদিন পর সেখানে এল রঘুনাথের নাতি শুভ।

সে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“ঠাকুরদা, এটা ফেলে রেখেছ কেন?”

—“ভেঙে গেছে।”

শুভ মূর্তির মুখের ভাঙা অংশটা ছুঁয়ে বলল,

—“তাহলে?”

—“তাহলে আর কিছু করার নেই।”

শুভ বলল,

—“আপনি তো আমাকে বলেছিলেন, ভাঙা জিনিস ফেলে দিতে নেই।”

রঘুনাথ হেসে বললেন,

—“সব ভাঙা জিনিস ঠিক করা যায় না।”

শুভ কিছু বলল না।

পরদিন সে আবার এল।

হাতে কয়েকটি ছোট পাথরের টুকরো।

—“আমি একটা চেষ্টা করেছি।”

রঘুনাথ অবাক হয়ে দেখলেন, শুভ ভাঙা অংশের পাশে ছোট ছোট পাথর বসিয়ে একটি নকশা তৈরি করেছে।

মূর্তির মুখের দাগটা আর লুকোনো হয়নি।

বরং সেটাই হয়ে উঠেছে মূর্তিটির বিশেষ সৌন্দর্য।

রঘুনাথ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

—“তুই আমাকে আজ একটা নতুন জিনিস শিখলি।”

মূর্তিটা তিনি নতুন করে সাজালেন।

ভাঙা অংশের চারপাশে সূক্ষ্ম নকশা করলেন। ফাটলগুলো ঢাকলেন না।

কয়েক মাস পর শহরে একটি শিল্প প্রদর্শনী হল।

রঘুনাথ সেখানে মূর্তিটা নিয়ে গেলেন।

নাম দিলেন—

“অসম্পূর্ণতায় সৌন্দর্য”।

মূর্তিটির সামনে মানুষের ভিড় জমে গেল।

একজন শিল্পসমালোচক বললেন,

—“এই মূর্তির ভাঙা দাগগুলোই এর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ।”

রঘুনাথ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

শুভ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—“ঠাকুরদা, দেখলে? ভেঙে গেলেও সুন্দর হওয়া যায়।”

রঘুনাথ তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“শুধু মূর্তি নয় রে। মানুষও।”

বহু বছর পর রঘুনাথ আর কাজ করতে পারলেন না।

তাঁর দোকানটি শুভই চালাতে শুরু করল।

দোকানের দরজার ওপরে সে একটি বাক্য লিখে রাখল—

“ভাঙা জিনিস মেরামত করার আগে, তার ভাঙার গল্পটা শুনুন।”

কারণ শুভ জানত—

কিছু দাগ মুছে ফেলতে হয় না। কিছু দাগই প্রমাণ করে, ভেঙে যাওয়ার পরও কেউ আবার নিজেকে গড়ে তুলেছিল।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: শূন্য মাঠের গোলপোস্ট।।।

গ্রামের প্রান্তে একটা বড় মাঠ ছিল। একসময় সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের ভিড় লেগে থাকত। ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড়—সবই চলত।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে মাঠটা প্রায় ফাঁকা।

শুধু দুটো পুরনো লোহার গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে ছিল।

একদিন বিকেলে তেরো বছরের নীলয় স্কুল থেকে ফেরার পথে মাঠের ধারে দাঁড়াল। তার হাতে ফুটবল।

সে অনেকক্ষণ গোলপোস্ট দুটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর একা একাই বল নিয়ে খেলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর পাশের বাড়ির রোহন এসে বলল,

—“একা খেলছিস?”

নীলয় বলল,

—“দল নেই তো।”

রোহন হাসল,

—“দল বানাতে হয়।”

পরদিন তারা আরও দুজনকে নিয়ে এল।

তারপর পাঁচজন।

তারপর দশজন।

কিন্তু সমস্যা হল—কারও কাছে ভালো বল নেই, কারও জুতো নেই, কারও আবার জার্সি নেই।

তবুও খেলা থামল না।

একদিন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়াশিক্ষক অরুণবাবু মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছেলেদের খেলা দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“কে কোচ হবে?”

সবাই একসঙ্গে বলল,

—“আপনি!”

অরুণবাবু হেসে ফেললেন।

সেই দিন থেকে প্রতিদিন বিকেলে তিনি মাঠে আসতে শুরু করলেন।

শুধু ফুটবল শেখাতেন না—শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর একে অন্যকে সম্মান করাও শেখাতেন।

একদিন নীলয় বলল,

—“স্যার, আমরা কি কখনও বড় দলের সঙ্গে খেলতে পারব?”

অরুণবাবু বললেন,

—“আগে নিজেদের মধ্যে বড় হও।”

কয়েক মাস পর গ্রামের দলটি ব্লক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নামল।

তারা প্রথম ম্যাচেই হেরে গেল।

ছেলেরা মন খারাপ করে মাঠের এক পাশে বসে ছিল।

অরুণবাবু বললেন,

—“হেরেছিস বলে এত চুপ কেন?”

রোহন বলল,

—“আমরা পারিনি।”

অরুণবাবু বললেন,

—“আজ হারিসনি। আজ শিখেছিস কোথায় আরও ভালো হতে হবে।”

পরের বছর তারা আবার প্রতিযোগিতায় গেল।

এবার ফাইনাল পর্যন্ত উঠল।

শেষ ম্যাচে এক গোলে পিছিয়ে ছিল তারা।

খেলা শেষ হতে মাত্র কয়েক মিনিট।

নীলয় বল পেল।

সামনে শুধু গোলপোস্ট।

সে শট নিল।

বল পোস্টে লেগে বাইরে চলে গেল।

খেলা শেষ।

তারা দ্বিতীয়।

সবাই হতাশ।

কিন্তু অরুণবাবু হাততালি দিতে শুরু করলেন।

একজন বলল,

—“স্যার, আমরা তো হেরে গেলাম!”

অরুণবাবু বললেন,

—“এই মাঠটা মনে আছে?”

সবাই চুপ।

—“এক বছর আগে এই মাঠে কেউ খেলত না। ওই দুইটা গোলপোস্ট শুধু দাঁড়িয়ে থাকত। আজ তোমরা একটা দল হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস। বল তো, সত্যিই হেরেছিস?”

নীলয় মাথা তুলল।

তার চোখে জল, কিন্তু মুখে হাসি।

বছর কয়েক পরে সেই গ্রামের মাঠে একটি ছোট্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হল।

নীলয় বড় হয়ে ফুটবল কোচ হল।

একদিন নতুন এক ছোট ছেলে মাঠে এসে জিজ্ঞেস করল,

—“দাদা, এখানে কি ফুটবল শেখানো হয়?”

নীলয় বলল,

—“হ্যাঁ।”

ছেলেটি বলল,

—“আমার জুতো নেই।”

নীলয় নিজের পুরনো জুতোর জোড়া খুলে তার হাতে দিল।

—“জুতো পরে খেলতে হয় না। আগে মাঠে নামতে হয়।”

ছেলেটি জুতো হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দূরে তখন সেই পুরনো গোলপোস্ট দুটো এখনও দাঁড়িয়ে।

একসময় যে মাঠ ছিল শূন্য, সেখানে এখন প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর স্বপ্ন ছুটে বেড়ায়।

কিছু জায়গা নিজে থেকে বদলে যায় না। একজন মানুষ প্রথম পা বাড়ালে, তার পেছনে অনেকগুলো পা এগিয়ে আসে।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: বৃদ্ধ ঘড়িওয়ালার দোকান।।

শহরের পুরনো বাজারের ভেতরে একটা সরু গলি ছিল। সেই গলির একেবারে শেষ মাথায় ছোট্ট একটি দোকান—“সময় মেরামত ঘর”।

দোকানের মালিক ছিলেন নব্বই ছুঁইছুঁই নিবারণবাবু। সারাজীবন ঘড়ি মেরামত করেছেন। তাঁর দোকানে দেয়ালজুড়ে ঝুলত নানা রকমের ঘড়ি—কেউ টিকটিক করত, কেউ ধীরে চলত, আবার কোনওটা বহু বছর ধরে বন্ধ।

নিবারণবাবু বলতেন,

—“ঘড়ি নষ্ট হয়, সময় নয়। মানুষ শুধু সময়টাকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না।”

একদিন দুপুরে দোকানে এল এক যুবক। নাম সৌরভ।

তার হাতে একটি পুরনো হাতঘড়ি।

—“কাকু, এটা কি ঠিক করা যাবে?”

নিবারণবাবু ঘড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন।

—“পুরনো মডেল। যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন।”

সৌরভ বলল,

—“যত টাকা লাগে দেব। এটা আমার বাবার।”

নিবারণবাবু ঘড়ির পিছনের ঢাকনাটা খুললেন।

ভেতরে ছোট করে খোদাই করা—

“সৌরভের জন্য—যেদিন সে বুঝবে, সময়ের দাম।”

নিবারণবাবু থেমে গেলেন।

—“তোমার বাবা কী করতেন?”

—“রেলওয়েতে কাজ করতেন। আমি ছোট থাকতেই মারা যান।”

—“তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?”

সৌরভ একটু হেসে বলল,

—“খুব একটা ভালো ছিল না। উনি সবসময় বলতেন পড়াশোনা কর, সময় নষ্ট করিস না। আমি ভাবতাম, উনি শুধু বকেন।”

নিবারণবাবু আর কিছু বললেন না।

তিনদিন ধরে তিনি ঘড়িটা মেরামত করতে লাগলেন।

চতুর্থ দিন ঘড়িটা চলতে শুরু করল।

সৌরভ খুশি হয়ে টাকা দিতে চাইলে নিবারণবাবু বললেন,

—“টাকা পরে দিও। আগে একটা কাজ করো।”

—“কী?”

—“বাবার সঙ্গে তোমার যে কথাগুলো বলা হয়নি, সেগুলো মনে মনে একবার বলে নিও।”

সৌরভ অবাক হলেও মাথা নাড়ল।

ঘড়িটা হাতে নিয়ে সে চলে গেল।

কয়েক সপ্তাহ পর সৌরভ আবার দোকানে এল।

তার হাতে একটি পুরনো কাঠের বাক্স।

—“কাকু, এটা আপনাকে দিতে এসেছি।”

নিবারণবাবু বাক্স খুলে দেখলেন—ভেতরে বেশ কয়েকটি পুরনো ঘড়ি।

—“এগুলো?”

—“বাবার জিনিস। উনি ঘড়ি খুব ভালোবাসতেন। আমি কখনও বুঝিনি।”

সৌরভ একটু থেমে বলল,

—“বাবার মৃত্যুর পর তাঁর আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা চিঠি পেয়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল, ‘সৌরভ বড় হয়ে যদি কোনওদিন এই ঘড়িটা পরে, তাহলে বুঝব আমি অপেক্ষা করতে জানতাম।’”

নিবারণবাবুর চোখ নরম হয়ে এল।

সৌরভ বলল,

—“আমি এত বছর ভেবেছি বাবা আমাকে বোঝেননি। আসলে আমিই তাঁকে বুঝিনি।”

নিবারণবাবু ধীরে বললেন,

—“সময় কখনও কখনও আমাদের ভুল বুঝতে শেখায়। কিন্তু তার জন্য সময় থাকতে হয়।”

সৌরভ চলে যাওয়ার পর নিবারণবাবু দোকানের সামনে একটা কাগজ ঝুলিয়ে দিলেন—

“পুরনো ঘড়ি মেরামত হয়। পুরনো সম্পর্কও—যদি সময় থাকতে হাত বাড়ানো যায়।”

বহু বছর পর নিবারণবাবুর দোকান বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু দোকানের সেই সাইনবোর্ডটি রয়ে গেল।

আর তার নিচে ছোট্ট অক্ষরে কেউ লিখে দিয়েছিল—

“সময়কে ঠিক করার আগে, সময় থাকতে মানুষটাকে ঠিক করে নিন।”

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অনুগল্প: শেষ মাটির প্রদীপ।।।

শহর থেকে একটু দূরে ছোট্ট এক গ্রামে থাকতেন কুমোর গদাধর পাল। তাঁর সংসার বলতে একমাত্র নাতনি পিউ আর মাটির কাজের ছোট্ট ঘর।

সারা বছর তিনি মাটির হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ আর পুতুল বানাতেন। কিন্তু আগের মতো আর বিক্রি হতো না। বাজারে প্লাস্টিক আর বৈদ্যুতিক সাজসজ্জা এসে তাঁর মাটির জিনিসের কদর কমিয়ে দিয়েছিল।

তবু গদাধর প্রতিদিন চাকা ঘোরাতেন।

পিউ মাঝে মাঝে বলত,

—“ঠাকুরদা, এত কষ্ট করে মাটির জিনিস বানাও কেন?”

গদাধর হেসে বলতেন,

—“মাটি কখনও পুরনো হয় না রে। শুধু মানুষ তার দিকে তাকানো বন্ধ করে দেয়।”

সেবার শীতের শেষে গ্রামে বড় উৎসব হবে। গদাধর ঠিক করলেন, অনেকগুলো মাটির প্রদীপ বানাবেন।

দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি প্রদীপ তৈরি করলেন।

কিন্তু উৎসবের দিন দেখা গেল, কেউ প্রদীপ কিনতে চাইছে না।

সবাই বৈদ্যুতিক আলো কিনছে।

দিনের শেষে গদাধরের ঝুড়িতে পড়ে রইল মাত্র একটি প্রদীপ।

পিউ বলল,

—“এটাও বিক্রি হল না।”

গদাধর প্রদীপটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসলেন।

—“সব জিনিস বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হয় না।”

সন্ধ্যা নামল।

উৎসবের মাঠের এক কোণে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিকে অন্ধকার।

মানুষজন ছোটাছুটি শুরু করল।

কেউ পথ দেখতে পাচ্ছে না।

গদাধর তাঁর ঝুড়ির শেষ প্রদীপটা বের করলেন। তাতে একটু তেল ঢেলে সলতে জ্বালালেন।

ছোট্ট আলোটা অন্ধকারে জ্বলে উঠল।

একজন বৃদ্ধা সেই আলো দেখে রাস্তা খুঁজে পেলেন।

তারপর একজন শিশু।

তারপর আরও কয়েকজন।

কেউ প্রদীপটার আলো অনুসরণ করে বাড়ির পথে গেল, কেউ আবার সেই আলোয় পড়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পেল।

কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ ফিরে এল।

সবাই আবার উৎসবে ব্যস্ত হয়ে গেল।

কিন্তু পরদিন সকালে গদাধরের দোকানের সামনে অদ্ভুত দৃশ্য।

অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন বললেন,

—“কাকু, কাল আপনার প্রদীপটা না থাকলে আমার মা বাড়ি ফিরতে পারতেন না।”

আরেকজন বললেন,

—“আমার মেয়েটা অন্ধকারে পড়ে গিয়েছিল। ওই আলো দেখে ওকে খুঁজে পেয়েছি।”

গদাধর কিছু বললেন না।

সেদিন তাঁর দোকান থেকে সব প্রদীপ বিক্রি হয়ে গেল।

কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ নয়।

পরের বছর গ্রামের উৎসবের আগে পঞ্চায়েত থেকে গদাধরের কাছে এল কয়েকজন তরুণ।

তারা বলল,

—“কাকু, এবার আমরা আপনার সঙ্গে মাটির প্রদীপ বানাব।”

গদাধর অবাক হয়ে বললেন,

—“তোমরা?”

একজন হেসে বলল,

—“গত বছর আমরা বুঝেছি, আলো বড় হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আলো কারও কাজে লাগছে কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

গদাধরের চোখ ভিজে উঠল।

তিনি চাকার ওপর নতুন মাটি চাপালেন।

পিউ পাশে বসে বলল,

—“ঠাকুরদা, এবার অনেক প্রদীপ বানাব তো?”

গদাধর মাটির দলাটাকে আকার দিতে দিতে বললেন,

—“হ্যাঁ রে। তবে মনে রাখিস—”

তিনি একটু থামলেন।

—“একটা ছোট আলোও কখনও কখনও অনেক বড় অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।”

সেদিন থেকে গ্রামের উৎসবে বৈদ্যুতিক আলোর পাশাপাশি শত শত মাটির প্রদীপ জ্বলতে শুরু করল।

আর প্রতিটি প্রদীপের নিচে ছোট করে লেখা থাকত—

“আলো যতটুকুই হোক, কারও পথ যেন অন্ধকার না থাকে।”

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার বাড়ি – ( তৃতীয় পর্ব : কুয়াশা সরে যাওয়ার পরে)।

তৃতীয় পর্ব : কুয়াশা সরে যাওয়ার পরে

—অভীক, দরজা খোল।

কণ্ঠস্বরটা আবার এল।

অভীক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এই গলা তার অচেনা নয়।

বরং এতটাই পরিচিত যে, সেই পরিচিতিই এখন তাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।

সে ধীরে দরজার কাছে গেল।

—কে?

বাইরে থেকে উত্তর এল,

—আমি।

অভীক দরজা খুলল না।

—নাম বলুন।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর উত্তর এল—

—আমি সুশান্ত দে।

অভীক চমকে উঠল।

আইনজীবী।

যে মানুষটা দুদিন আগে তার কাকার উইল নিয়ে এসেছিল।

অভীক দরজার ফাঁক দিয়ে তাকাল।

করিডোরে সত্যিই সুশান্ত দাঁড়িয়ে।

কিন্তু তার মুখে সেই শান্ত ভাব নেই।

চোখে উদ্বেগ।

—দরজা খোল, অভীক। কথা আছে।

অভীক বলল,

—আপনি এই সময়ে এখানে কেন?

সুশান্ত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—তোর কাকার একটা জিনিস আমার কাছে ছিল। সেটা আজই তোকে দিতে হবে।

—কী জিনিস?

—একটা ডায়েরি।

অভীক দরজা খুলে দিল।

সুশান্ত ঘরে ঢুকে চারদিকে তাকালেন।

তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,

—রণেন তোকে সব বলেনি।

—কী বলেনি?

—অয়নকে লুকিয়ে রাখার আসল কারণ।

অভীক তাকিয়ে রইল।

—তাহলে আপনি জানেন অয়ন কোথায়?

সুশান্ত মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ।

—কোথায়?

—নবগ্রামে।

অভীক চমকে উঠল।

রণেনের দেওয়া ঠিকানা।

সুশান্ত বললেন,

—কিন্তু যাওয়ার আগে তোর কাকার ডায়েরিটা পড়তে হবে।

তিনি ব্যাগ থেকে একটা কালো ডায়েরি বের করলেন।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যদি অভীক ফিরে আসে।”

অভীক ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েক পাতা অরুণের নিজের লেখা।

“আমি জানি, একদিন অভীক ফিরবে।

সেদিন ওকে আর মিথ্যে বলা যাবে না।

অয়ন বেঁচে আছে।

কিন্তু ওকে আমি নিজের ইচ্ছায় লুকিয়ে রাখিনি।

ওকে বাঁচানোর জন্যই লুকিয়েছিলাম।

রণেন ওকে নদী থেকে তুলে এনেছিল।

কিন্তু রণেনকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি।

কারণ রণেন নিজেও সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

পরে সে অনুতপ্ত হয়েছিল।

তবে শুরুতে সে তাদের হয়ে কাজ করত।”

অভীক থেমে গেল।

রণেনের কথাগুলো মনে পড়ল।

“আমাকে মৃত থাকতে হয়েছিল।”

ডায়েরির পরের পাতায়—

“অয়ন বাস দুর্ঘটনার পরে যে বাক্সটা দেখেছিল, সেটার মধ্যে শুধু জমির কাগজ ছিল না।

ছিল মানুষের নাম।

ঘুষের হিসাব।

ব্যাংক লেনদেন।

আর একটি ভিডিও।

সেই ভিডিওতে প্রমাণ ছিল, দুর্ঘটনাটা দুর্ঘটনা নয়।”

অভীক জিজ্ঞেস করল,

—ভিডিওটা কোথায়?

সুশান্ত বললেন,

—তোর কাকা সেটা কখনও কাউকে দেননি।

—কেন?

—কারণ ভিডিওতে এমন একজন মানুষ ছিল, যাকে প্রকাশ করলে পুরো চক্রের পাশাপাশি আরও বড় বিপদ তৈরি হতে পারত।

অভীক ডায়েরির পরের পাতায় গেল।

সেখানে লেখা—

“যে মানুষটা সবকিছুর পেছনে ছিল, সে বাইরের কেউ নয়।”

অভীকের বুক ধক করে উঠল।

তারপরের পাতায় শুধু একটা নামের প্রথম অক্ষর—

“স…”

পাতাটা ছেঁড়া।

অভীক বলল,

—এই পাতাটা কে ছিঁড়েছে?

সুশান্ত চুপ।

অভীক এবার কঠিন গলায় বলল,

—আপনি?

সুশান্ত মাথা নাড়লেন।

—না।

—রণেন?

—না।

—তাহলে?

সুশান্ত ধীরে বললেন,

—তোর কাকা নিজেই ছিঁড়েছিলেন।


হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ।

সুশান্ত জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন।

—ওরা এসে গেছে।

অভীক বলল,

—কারা?

—যারা এত বছর ধরে অয়নকে খুঁজছে।

—কিন্তু অয়ন তো এখানে নেই।

—ওরা জানে না।

সুশান্ত দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

—তুই এখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।

অভীক বলল,

—আমি পালাব না।

—এটা পালানো নয়। সত্যিটা বাঁচিয়ে রাখা।

তিনি একটা ছোট চাবি অভীকের হাতে দিলেন।

—এটা অরুণের স্টাডির টেবিলের গোপন ড্রয়ারের।

—সেখানে কী আছে?

—শেষ উত্তর।


বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে অভীক বেরিয়ে গেল।

কুয়াশা তখন এত ঘন যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না।

সে রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে পিছনে তাকাল।

চৌধুরী বাড়ির দোতলার উত্তরের জানালায় আলো জ্বলছে।

একটা ছায়া দাঁড়িয়ে।

অভীক থেমে গেল।

ছায়াটা হাত তুলল।

তারপর জানালার আলো নিভে গেল।


সকাল হওয়ার আগেই অভীক মাধবপুর ছাড়ল।

নবগ্রামের দিকে যাওয়ার বাসে বসে তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন—

অয়ন কেন এত বছর নিজের পরিচয় লুকিয়ে ছিল?

দুই ঘণ্টা পরে বাস পাহাড়ি রাস্তার কাছে পৌঁছল।

একটা ছোট শহর।

নবগ্রাম।

রণেন যে ঠিকানা দিয়েছিল, সেটা ছিল একটা পুরনো লাইব্রেরির পাশে।

অভীক সেখানে পৌঁছে দরজায় দাঁড়াল।

দরজায় ছোট নামফলক—

“অর্ক সেন।”

অভীকের বুক কেঁপে উঠল।

সে দরজায় কড়া নাড়ল।

কোনো উত্তর নেই।

আবার।

এইবার ভেতর থেকে পায়ের শব্দ।

দরজা খুলল একজন যুবক।

বয়স প্রায় আটাশ।

চোখ দুটো গভীর।

মুখে অদ্ভুত শান্তি।

অভীক কিছু বলতে পারল না।

যুবকটি বলল,

—দাদা?

অভীকের চোখে জল চলে এল।

—অয়ন?

যুবকটি ধীরে হাসল।

—হ্যাঁ।

অভীক আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।

দুজনেই অনেকক্ষণ কিছু বলল না।

পনেরো বছরের দূরত্ব যেন সেই এক মুহূর্তে ভেঙে গেল।


কিছুক্ষণ পর অয়ন বলল,

—আমি জানতাম তুমি একদিন আসবে।

—তুই আমাকে চিনলি কীভাবে?

—রণেন স্যার তোমার ছবি দেখিয়েছিলেন।

—তুই এত বছর কোথায় ছিলি?

—প্রথমে রণেন স্যারের পরিচিত এক পরিবারের কাছে। পরে নিজের নামে পড়াশোনা শুরু করি। অর্ক নামটা ব্যবহার করি।

—কিন্তু আমাকে একটা খবরও দিলি না?

অয়ন মাথা নিচু করল।

—দিতে চেয়েছিলাম।

—তাহলে?

—যারা আমাকে খুঁজছিল, তারা তোমাকেও ব্যবহার করত।

অভীক চুপ।

অয়ন একটা আলমারি খুলে একটা ধাতব বাক্স বের করল।

—এটার জন্যই এত বছর আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।

বাক্সের ভেতরে একটা পুরনো মেমোরি কার্ড।

আর একটা ছবি।

ছবিতে বাস দুর্ঘটনার দৃশ্য।

অয়ন বলল,

—আমি সেদিন নদীর ধারে ছিলাম। দুর্ঘটনার পর সবাই যখন মানুষ বাঁচাতে ছুটছিল, তখন আমি দেখলাম একজন লোক বাসের ভেতর থেকে একটা কালো বাক্স বের করল।

—কে?

—প্রথমে মুখ দেখতে পাইনি।

—তারপর?

—লোকটা যখন গাড়ির কাছে গেল, তখন আলো পড়েছিল মুখে।

অয়ন ছবিটা উল্টে ধরল।

ছবির পেছনে পেন্সিলে একটা মুখ আঁকা।

অভীক তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—সুশান্ত দে?

অয়ন মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

অভীক স্তব্ধ হয়ে গেল।

আইনজীবী সুশান্ত!

যে তাকে বাড়িতে এসে সাহায্য করছিল।

যে অরুণের উইল নিয়ে এসেছিল।

যে ডায়েরি দিয়েছিল।

সবই অভিনয়?

অয়ন বলল,

—না।

অভীক তাকাল।

—মানে?

—সুশান্ত দে-কে আমি দেখেছিলাম বাক্সটা নিয়ে যেতে। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে সেটা নিজের জন্য নেয়নি।

—তাহলে?

—সে সেটা তোর কাকার কাছে দিয়েছিল।

অভীক কিছু বুঝতে পারল না।

—তাহলে সুশান্ত খারাপ লোক নয়?

—না।

অয়ন বলল,

—সুশান্ত কাকার হয়ে কাজ করছিল।

অভীক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তাহলে আসল মানুষটা কে?

অয়ন মেমোরি কার্ডটা হাতে নিল।

—এই ভিডিওটা দেখ।


ল্যাপটপে ভিডিও চালু হল।

দৃশ্য ঝাপসা।

একটা রাস্তা।

দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাস।

কয়েকজন লোক দৌড়াচ্ছে।

তারপর ক্যামেরা একটু ঘুরল।

একজন মানুষ কালো বাক্স হাতে বাস থেকে বেরিয়ে এল।

মুখ স্পষ্ট নয়।

সে গাড়ির কাছে গেল।

আর তখনই ক্যামেরা একটু কাছে জুম করল।

অভীক হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

—এটা…

লোকটা গাড়িতে বাক্সটা দেওয়ার সময় তার মুখ দেখা গেল।

হরিপদ।

অভীক কিছু বলতে পারল না।

তারপর ভিডিওতে হরিপদের সঙ্গে আরেকজনের কথা শোনা গেল।

কণ্ঠস্বর—

অরুণ চৌধুরী।

অরুণ বলছে,

“এটা এখানে রাখুন। অভীককে কিছু জানানো যাবে না।”

হরিপদ বলছে,

“অয়ন যদি সব দেখে থাকে?”

অরুণ—

“ওকে আমি সামলে নেব।”

ভিডিও শেষ।

অভীক চেয়ারে বসে পড়ল।

—কাকা…

অয়ন বলল,

—কাকা খারাপ ছিলেন না।

—তাহলে ভিডিওতে এমন কথা কেন?

—কারণ তিনি তখন আমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।

অভীক তাকাল।

—কীভাবে?

অয়ন বলল,

—দুর্ঘটনার আসল পরিকল্পনাকারী ছিল অন্য একজন।

—কে?

অয়ন চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—যার নাম তুই ছোটবেলায় খুব ভালোবাসা দিয়ে ডাকতিস।

অভীক শিউরে উঠল।

তার মনে একটা মুখ ভেসে উঠল।

একজন মানুষ, যিনি তাদের পরিবারের খুব কাছের ছিলেন।

যিনি অয়নের জন্মদিনে কেক কাটতেন।

যিনি অভীককে স্কুলে নিয়ে যেতেন।

যিনি বাবার বন্ধু ছিলেন।

প্রবীর সেনগুপ্ত।

কিন্তু প্রবীর তো বহু বছর আগে মারা গেছেন!

অয়ন বলল,

—প্রবীর মারা যায়নি।

অভীক উঠে দাঁড়াল।

—তাহলে রণেন কেন বলল—

—রণেন মিথ্যে বলেনি।

—কী?

—প্রবীর নামটা বদলে ফেলেছিল।

অভীক হতভম্ব।

অয়ন বলল,

—প্রবীর সেনগুপ্ত এখন অন্য নামে বেঁচে আছে।

—কোন নামে?

অয়ন ধীরে উত্তর দিল—

—সুশান্ত দে।


অভীক যেন মাথায় আঘাত পেল।

সবকিছু এক মুহূর্তে জুড়ে গেল।

উইল।

বাড়ি।

উত্তরের ঘর।

কাকার ডায়েরি।

সুশান্তের উপস্থিতি।

রহস্যময় চিঠি।

সব।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে গেল।

—তাহলে সে আমাকে এখানে আসতে দিল কেন?

অয়ন বলল,

—কারণ সে জানত, কাকার মৃত্যুর পরে শেষ প্রমাণটা তোর কাছেই আসবে।

—কী প্রমাণ?

অয়ন তাকাল তার হাতে থাকা চাবির দিকে।

—ওই চাবি।

অভীক বুঝতে পারল।


তারা রাতের ট্রেনে মাধবপুরে ফিরল।

চৌধুরী বাড়িতে তখন কেউ নেই।

হরিপদও নেই।

অভীক স্টাডির ঘরে ঢুকল।

অরুণের পুরনো টেবিলের নিচে একটা গোপন ড্রয়ার।

চাবি ঘোরাতেই খুলে গেল।

ভেতরে একটা খাম।

তার মধ্যে তিনটি জিনিস—

একটা পাসপোর্ট।

একটা পুরনো ছবি।

আর একটা হাতে লেখা স্বীকারোক্তি।

অভীক ছবি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

ছবিতে—

অরুণ।

সুব্রত।

রণেন।

আর—

প্রবীর।

পেছনে লেখা—

“প্রবীরের নতুন নাম সুশান্ত।”

স্বীকারোক্তিতে অরুণ লিখেছিল—

“আমি অনেক বছর ধরে জানতাম প্রবীর বেঁচে আছে।

সুব্রত সেটা জানতে পেরেছিল।

তাই সুব্রতকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

অয়ন সব দেখে ফেলেছিল।

আমি ওকে বাঁচানোর জন্য রণেনের সাহায্য নিই।

হরিপদ প্রথমে প্রবীরের লোক ছিল, পরে আমাদের পক্ষে আসে।

সুশান্ত নিজেকে আইনজীবী সাজিয়ে পরিবারের কাছাকাছি থেকে সব প্রমাণ খুঁজছিল।

আমি জানতাম সে একদিন অভীকের কাছে আসবে।

তাই আমি শেষ প্রমাণটা এমন জায়গায় রেখেছি, যেখানে শুধু অভীক পৌঁছতে পারবে।

যদি আমি মারা যাই, অভীককে অয়নের কাছে পাঠিও।

আর তাকে বলো—

কুয়াশা যত ঘনই হোক, মানুষকে তার নিজের ছায়া চিনতে শেখাতে হয়।”

অভীকের চোখ ভিজে গেল।

তারপর সে চিঠির শেষ লাইন পড়ল—

“আমি যদি ভুল করে থাকি, আমাকে ক্ষমা করিস।

আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুই আর অয়ন অন্তত একদিন সত্যিটা জেনে পাশাপাশি দাঁড়াস।”


হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ।

অয়ন জানালার দিকে তাকাল।

—ও এসেছে।

অভীক বলল,

—সুশান্ত?

অয়ন মাথা নাড়ল।

দুজনেই ঘরের আলো নিভিয়ে দিল।

নিচে দরজা খুলল।

পায়ের শব্দ।

তারপর সুশান্তের গলা—

—অভীক?

কোনো উত্তর নেই।

সে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।

অভীক দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে।

সুশান্ত উত্তরের ঘরে ঢুকল।

তার হাতে বন্দুক।

সে টেবিলের ড্রয়ার খুলতে গেল।

ঠিক তখন অভীক আলো জ্বালল।

—খুঁজছেন কী?

সুশান্ত ঘুরে দাঁড়াল।

অভীক বলল,

—প্রবীর সেনগুপ্ত?

সুশান্তের মুখের সমস্ত রং বদলে গেল।

অয়ন পাশে এসে দাঁড়াল।

সুশান্ত কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বন্দুকটা নামিয়ে দিল।

—তোমরা সব জেনে গেছ।

অভীক বলল,

—বাবাকে কেন মেরেছিলেন?

সুশান্ত চুপ।

—কাকাকে কেন?

চুপ।

—আমাকে কেন এত বছর নজরে রেখেছিলেন?

সুশান্তের চোখে ক্লান্তি।

—কারণ তুই ছিলি শেষ সাক্ষী।

—আর অয়ন?

—ও ছিল দ্বিতীয় সাক্ষী।

অয়ন বলল,

—আপনি আমাদের পরিবারটাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন।

সুশান্ত মাথা নাড়ল।

—আমি একা ছিলাম না।

—দেবাশিস?

—হ্যাঁ।

—আর দুর্ঘটনা?

—সব পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

অভীক বলল,

—বাবা?

—তোর বাবা সত্যিটা জেনে গিয়েছিল।

—তাই তাকে?

সুশান্ত চোখ নামিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

ঘরের মধ্যে নীরবতা।

অভীক বলল,

—কাকা?

—সে অনেক বছর চুপ ছিল। পরে সব প্রমাণ জোগাড় করতে শুরু করে। তাই তাকেও থামানো হয়।

অয়ন বলল,

—কিন্তু আপনি পারেননি।

সুশান্ত মৃদু হাসল।

—না।

ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।

অভীক অবাক হয়ে সুশান্তের দিকে তাকাল।

সুশান্ত বলল,

—রণেন সব জানত।

অভীক বুঝতে পারল।

রণেন আগেই পুলিশকে খবর দিয়েছিল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ ঘরে ঢুকল।

সুশান্ত আর পালানোর চেষ্টা করল না।

বন্দুকটা মেঝেতে রেখে হাত বাড়িয়ে দিল।


পরবর্তী কয়েক মাসে পুরনো তদন্ত আবার শুরু হল।

সুব্রত চৌধুরীর মৃত্যুর মামলা।

বাস দুর্ঘটনা।

অবৈধ জমি দখল।

ভুয়ো নথি।

ব্যাংক লেনদেন।

দেবাশিস মল্লিকের পুরনো সহযোগীরা একে একে ধরা পড়ল।

হরিপদ নিজেও আদালতে সাক্ষ্য দিলেন।

রণেন নিজের পুরনো অপরাধ স্বীকার করলেন।

আর অয়ন ফিরে এল নিজের আসল পরিচয়ে।

পনেরো বছর পর মাধবপুরের মানুষ জানতে পারল—

অয়ন মারা যায়নি।

সে বেঁচে ছিল।

অপেক্ষা করছিল।

একদিন তার দাদা ফিরে আসবে বলে।


এক বছর পর চৌধুরী বাড়ির উত্তরের ঘর আর বন্ধ থাকল না।

অভীক সেখানে একটা ছোট পাঠাগার তৈরি করল।

নাম দিল—

“অয়ন-সুব্রত স্মৃতি পাঠাগার।”

দেওয়ালে দুটো ছবি।

একটা সুব্রতের।

আরেকটা অয়নের ছোটবেলার।

পাশে রাখা সেই পুরনো নীল বল।

অয়ন এখন মাধবপুরেই থাকে।

সে শিশুদের পড়ায়।

অভীক কলকাতা আর মাধবপুরের মধ্যে যাতায়াত করে।

তাদের জীবন আগের মতো হয়নি।

বরং আরও সত্যি হয়েছে।

এক সন্ধ্যায় দুজন ভাই বাড়ির বারান্দায় বসেছিল।

অয়ন বলল,

—দাদা।

—হুম?

—তুই কি এখনও কুয়াশাকে ভয় পাস?

অভীক হেসে বলল,

—না।

—কেন?

অভীক নদীর দিকে তাকাল।

সন্ধ্যার আলো জলে পড়েছে।

—কারণ কুয়াশার ওপারে কী আছে, সেটা এখন জানি।

অয়ন হাসল।

দূরে নদীর ওপর ধীরে ধীরে কুয়াশা নামছে।

কিন্তু এবার সেই কুয়াশার মধ্যে কোনো ভয় নেই।

কারণ সত্যি আর লুকিয়ে নেই।

পনেরো বছর ধরে যে বাড়ির উত্তরের জানালা বন্ধ ছিল, সেটাও আজ খোলা।

জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো ঘরে ঢুকছে।

অভীক উঠে গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়াল।

তার মনে হল, অয়ন ঠিকই বলেছিল—

কিছু দরজা বন্ধ থাকে ভয়ের জন্য।

কিছু দরজা বন্ধ থাকে সত্যিকে রক্ষা করার জন্য।

কিন্তু একদিন দরজা খুলতেই হয়।

কারণ মানুষ যতই কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাক,

সত্যি তার পথ খুঁজে নেয়।

অয়ন পিছন থেকে বলল,

—দাদা, চল। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

অভীক ফিরে তাকিয়ে হাসল।

—চল।

দুজন ভাই পাশাপাশি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

পেছনে খোলা রইল উত্তরের জানালা।

বাইরে কুয়াশা ঘন হচ্ছে।

কিন্তু ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে।

আর সেই আলোয়—

পনেরো বছরের হারিয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের ছায়া পাশাপাশি পড়ে আছে।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার বাড়ি – (দ্বিতীয় পর্ব : যে মানুষটি ফিরে এসেছিল)।

দ্বিতীয় পর্ব : যে মানুষটি ফিরে এসেছিল

দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

অভীক আর হরিপদ দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।

বাড়ির ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে।

ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটাও অস্বাভাবিক জোরে শোনা যাচ্ছে।

হরিপদ ফিসফিস করে বললেন,

—দরজা খুলিস না।

অভীক তাকালেন তাঁর দিকে।

—কিন্তু বাইরে কে?

—আমি জানি না।

—আপনি তো বললেন লোকটা এসেছে।

—বলেছি।

—তাহলে কে?

হরিপদ উত্তর দিলেন না।

নিচে আবার কড়া নাড়া হল।

এবার সঙ্গে একটা গলা—

—হরিপদদা, দরজা খুলুন।

হরিপদ হঠাৎ পিছিয়ে গেলেন।

অভীক বুঝতে পারল, এই কণ্ঠস্বর তিনি চেনেন।

—কে?

বাইরে থেকে উত্তর এল,

—আমি রণেন।

হরিপদ ফিসফিস করে বললেন,

—অসম্ভব।

—কেন?

—রণেন তো মারা গেছে।

অভীক চমকে উঠল।

—কত বছর আগে?

—চৌদ্দ বছর।

দুজনের চোখাচোখি হল।

অভীক ধীরে বলল,

—তাহলে বাইরে কে?

কোনো উত্তর নেই।

কিছুক্ষণ পর দরজার নিচ দিয়ে একটা খাম ভেতরে ঢুকে এল।

হরিপদ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অভীক এগিয়ে গিয়ে খামটা তুলে নিল।

সামনে লেখা—

“অভীকের জন্য।”

ভেতরে মাত্র একটা ছবি।

পুরনো নদীর ছবি।

তারিখ—

১৬ নভেম্বর ২০০৯।

ছবির এক পাশে অয়ন দাঁড়িয়ে।

আর তার পাশে একজন পুরুষ।

অভীক ছবিটা হাতে নিয়ে জমে গেল।

পুরুষটিকে সে চিনতে পারল।

রণেন মুখোপাধ্যায়।

অয়নের স্কুলের শিক্ষক।

যিনি নাকি অয়ন নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক বছর পর হৃদরোগে মারা গিয়েছিলেন।

কিন্তু ছবির পেছনে আরও একটা কথা লেখা ছিল—

“যাকে মৃত ভাবছিস, সে মৃত নয়।”


হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

হরিপদ বললেন,

—পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে চল।

অভীক ছবি আর ক্যাসেটগুলো নিয়ে নিল।

দুজনেই বাড়ির পেছনের সরু পথ দিয়ে বেরিয়ে এল।

কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

হরিপদ দ্রুত হাঁটছেন।

অভীক পেছনে তাকিয়ে দেখল—

চৌধুরী বাড়ির বারান্দায় একজন দাঁড়িয়ে।

কালো চাদর।

মাথায় টুপি।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু লোকটা হাত তুলে একটা ইশারা করল।

তারপর কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।


হরিপদের বাড়ি খুব দূরে নয়।

সেখানে পৌঁছে দরজা বন্ধ করেই তিনি একটা পুরনো কাঠের বাক্স বের করলেন।

—এবার তোকে সব বলতে হবে।

অভীক চুপ করে দাঁড়িয়ে।

হরিপদ বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে পুরনো কাগজপত্র।

একটা স্কুলের রেজিস্টার।

কিছু ছবি।

আর একটা ছোট ডায়েরি।

—এগুলো অয়নের।

অভীক ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েক পাতা সাধারণ।

স্কুলের কথা।

বন্ধুদের কথা।

নদীর কথা।

তারপর ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসের একটা লেখা—

“রণেন স্যার আমাকে একটা অদ্ভুত কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, বাবা-মা সবাইকে সব কথা বলা যায় না।”

আরেকটি পাতায়—

“দাদা আমাকে বলেছিল নদীর কাছে না যেতে। কিন্তু রণেন স্যার বললেন, নদীর ওপারে গেলে আমি এমন একটা জিনিস দেখতে পাব, যেটা দেখলে দাদা আর কখনও আমাকে ছোট ভাববে না।”

অভীক থমকে গেল।

—রণেন স্যার অয়নকে নদীর ওপারে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন?

হরিপদ বললেন,

—সম্ভবত।

—তাহলে কাকা?

—তোর কাকা জানতেন।

—কী জানতেন?

হরিপদ মুখ নামিয়ে বললেন,

—রণেনের সঙ্গে অয়নের দেখা করার কথা ছিল।

অভীক হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

—তাহলে কাকা আমাকে এত বছর মিথ্যে বললেন কেন?

—কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন।

—কাকে?

হরিপদ কোনো উত্তর দিলেন না।

অভীক ডায়েরির পাতা উল্টাতে থাকল।

শেষ পাতায় শুধু একটা লাইন।

“দাদা, যদি আমি ফিরে না আসি, তাহলে উত্তরের ঘরে রাখা নীল ফাইলটা খুঁজে নিস।”

অভীক চোখ বন্ধ করল।

নীল ফাইল।

উত্তরের ঘর।

অয়নের ক্যাসেট।

সবকিছু যেন একই জায়গায় এসে মিশছে।


সন্ধ্যার আগেই তারা আবার চৌধুরী বাড়িতে ফিরল।

এইবার অভীক একাই উত্তরের ঘরে ঢুকল।

হরিপদ বাইরে দাঁড়িয়ে।

ঘরের প্রতিটি জিনিস খুঁজতে শুরু করল অভীক।

টেবিল।

আলমারি।

বইয়ের তাক।

খাটের নিচে।

কোথাও নীল ফাইল নেই।

শেষে তার চোখ পড়ল জানালার পাশে কাঠের প্যানেলের দিকে।

প্যানেলটা অন্যগুলোর তুলনায় একটু উঁচু।

সে চাপ দিতেই একটা অংশ খুলে গেল।

ভেতরে ছোট একটা গোপন তাক।

সেখানে সত্যিই একটা নীল ফাইল।

অভীক ফাইলটা বের করল।

ভেতরে ছিল—

জমির নথি।

কিছু ছবি।

ব্যাংকের লেনদেনের কাগজ।

আর একটা টাইপ করা রিপোর্ট।

শিরোনাম—

“মাধবপুর নদীতীর উন্নয়ন প্রকল্প — গোপন আর্থিক নথি।”

অভীক পড়তে শুরু করল।

রূপসাগর নয়, মাধবপুরের নদীর তীরজুড়ে একটা বড় পর্যটন প্রকল্প করার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু প্রকল্পের জন্য যেসব জমি দরকার, সেগুলোর মালিকেরা জমি বিক্রি করতে রাজি ছিলেন না।

তাই কয়েকজন দালাল ভুয়ো কাগজ তৈরি করে জমি দখলের চেষ্টা করছিল।

নথির শেষে কয়েকটি নাম।

দেবাশিস মল্লিক।

রণেন মুখোপাধ্যায়।

আর—

অরুণ চৌধুরী।

অভীক স্তব্ধ।

তার কাকার নামও সেখানে।

কিন্তু পাশে লেখা—

“অভ্যন্তরীণ তথ্য সরবরাহকারী।”

অর্থাৎ কাকা চক্রের সদস্য ছিলেন না।

বরং তাদের বিরুদ্ধে তথ্য দিচ্ছিলেন।

অভীক আরও পড়ল।

একটা নোট—

“রণেন প্রকল্পের হিসাব সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানে। অয়ন ঘটনাটি দেখে ফেলেছে।”

অভীক ফাইলটা শক্ত করে ধরল।

অয়ন কী দেখেছিল?


ঠিক তখনই দরজার বাইরে শব্দ।

হরিপদ বললেন,

—অভীক!

অভীক বাইরে বেরিয়ে এল।

করিডোরের শেষ দিকে একটা ছায়া।

লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

এবার মুখ দেখা গেল।

অভীক স্তব্ধ।

লোকটি বয়স্ক হয়েছে।

চুল পেকে গেছে।

চোখের পাশে বলিরেখা।

কিন্তু মুখটা স্পষ্ট।

রণেন মুখোপাধ্যায়।

হরিপদ পিছিয়ে গেলেন।

—আপনি?

রণেন মৃদু হাসলেন।

—হ্যাঁ।

অভীক এগিয়ে গেল।

—আপনি মারা যাননি?

—না।

—তাহলে সবাইকে কেন বলা হয়েছিল আপনি মারা গেছেন?

রণেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—কারণ আমাকে মৃত থাকতে হয়েছিল।

—কেন?

—বাঁচার জন্য।

অভীক চিৎকার করে উঠল,

—অয়ন কোথায়?

রণেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তোর ভাই বেঁচে আছে।

অভীকের চোখে জল চলে এল।

—কোথায়?

—সেটা আমি এখনই বলতে পারব না।

—কেন?

—কারণ তুই এখনও পুরো সত্যিটা জানিস না।

অভীক রাগে কাঁপছিল।

—পনেরো বছর ধরে আমি একটা মিথ্যের মধ্যে বেঁচে আছি। এখনো আপনি বলছেন পুরো সত্যি জানি না?

রণেন ধীরে বললেন,

—অয়নকে কেউ হত্যা করেনি।

—তাহলে?

—তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

—কে?

রণেনের চোখ হরিপদের দিকে গেল।

—তোর কাকা।

অভীক হরিপদের দিকে তাকাল।

হরিপদ চোখ নামিয়ে ফেললেন।

—কেন?

রণেন বললেন,

—কারণ অয়ন এমন একটা জিনিস দেখে ফেলেছিল, যেটা প্রকাশ হলে অনেক বড় মানুষ জেলে যেত।

—কী জিনিস?

রণেন বললেন,

—একটা দুর্ঘটনা।

অভীক থমকে গেল।

—কোন দুর্ঘটনা?

—তোর বাবার।

অভীক যেন কিছু বুঝতে পারল না।

—আমার বাবা তো বহু বছর আগেই মারা গেছেন।

—আমি জানি।

—তাহলে?

রণেন বললেন,

—তোর বাবা মারা যাওয়ার আগের রাতে একটা বাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

অভীক মনে করার চেষ্টা করল।

কিছুই মনে পড়ল না।

রণেন বললেন,

—সেই বাসে এমন কিছু নথি যাচ্ছিল, যেগুলো মাধবপুরের জমি দখলের চক্রকে ধ্বংস করে দিতে পারত।

—তারপর?

—বাসটা নদীর সেতুর কাছে দুর্ঘটনায় পড়ে।

—কেউ মারা গিয়েছিল?

—তিনজন।

রণেন একটু থামলেন।

—কিন্তু দুর্ঘটনার পরে নথিগুলো আর পাওয়া যায়নি।

অভীক বলল,

—অয়ন সেটা দেখেছিল?

—হ্যাঁ।

—কীভাবে?

—অয়ন সেদিন নদীর ধারে ছিল।

তারপর রণেন ধীরে বললেন,

—আর সে দেখেছিল, দুর্ঘটনার পরে একজন মানুষ বাস থেকে নথির বাক্স বের করে নিয়ে যাচ্ছে।

অভীকের গলা শুকিয়ে গেল।

—কে?

রণেন বললেন,

—তোর কাকা নয়।

—তাহলে?

রণেন তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—যে মানুষটা এখনো তোর পরিবারের সবচেয়ে কাছের একজন বলে পরিচয় দেয়।


অভীক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মাথায় একের পর এক মুখ ভেসে উঠছে।

কিন্তু কোন মুখ?

কাকা?

হরিপদ?

রণেন?

আর কেউ?

রণেন বললেন,

—অয়নকে আমি নদীর ওপার থেকে তুলে এনেছিলাম।

—তারপর?

—আমি বুঝেছিলাম ওকে খুঁজতে লোক আসবে।

—তাই ওকে লুকিয়ে রাখলেন?

—হ্যাঁ।

—কোথায়?

রণেন উত্তর দিলেন না।

—আমি ওকে নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়েছিলাম।

—কোথায়?

রণেন বললেন,

—কলকাতার বাইরে।

অভীক এগিয়ে গেল।

—ও কি জানে আমি ওকে খুঁজছি?

রণেন মাথা নাড়লেন।

—জানে।

—তাহলে আমার কাছে আসছে না কেন?

রণেনের মুখ ভারী হয়ে গেল।

—কারণ ওর একটা শর্ত আছে।

—কী শর্ত?

—তুই যেন আগে সত্যিটা জানতে পারিস।

—কোন সত্যি?

রণেন বললেন,

—তোর কাকার মৃত্যুর সত্যি।

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

অভীক ফিসফিস করে বলল,

—কাকা তো স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন।

রণেন মাথা নাড়লেন।

—না।

—তাহলে?

—ওকে মারা হয়েছে।

হরিপদ হঠাৎ বলে উঠলেন,

—রণেন, আর নয়।

রণেন তার দিকে তাকালেন।

—এত বছর চুপ থেকেছি, হরিপদদা। আর কত?

অভীক ধীরে ধীরে বলল,

—কাকাকে কে মেরেছে?

রণেন উত্তর দিলেন না।

বরং বললেন,

—আজ রাতে তুই ঘুমাবি না।

—কেন?

—কারণ তোর কাকা যে জিনিসটা রেখে গেছে, সেটা খুঁজতে আজ রাতেই লোক আসবে।

অভীক অবাক হয়ে তাকাল।

—কী জিনিস?

রণেন বললেন,

—অয়নের আসল পরিচয়।

অভীক হতভম্ব।

—মানে?

রণেন তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—অয়ন শুধু তোর ভাই নয়।

—তাহলে?

—ও এমন একটা ঘটনার জীবন্ত সাক্ষী, যেটা পনেরো বছর ধরে অনেক মানুষকে ভয় দেখিয়ে রেখেছে।


রণেন চলে যাওয়ার আগে একটা ছোট কাগজ দিলেন।

তাতে একটি ঠিকানা।

মাধবপুর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে।

একটি ছোট পাহাড়ি শহরের নাম।

নবগ্রাম।

আর নিচে একটি নাম—

অর্ক সেন।

অভীক জিজ্ঞেস করল,

—এটা কার নাম?

রণেন বললেন,

—অয়নের নতুন নাম।

অভীক কাগজটা শক্ত করে ধরল।

—আমি কি ওর সঙ্গে দেখা করতে পারব?

—পারবি।

—কখন?

রণেন দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

—আগামীকাল।

তারপর থেমে গেলেন।

—কিন্তু তার আগে আজ রাতটা পার করতে হবে।

রণেন চলে গেলেন।

বাড়িতে আবার নীরবতা।

অভীক জানালার কাছে দাঁড়াল।

বাইরে কুয়াশা।

দূরে নদী দেখা যাচ্ছে না।

হরিপদ ধীরে এসে বললেন,

—তুই সত্যিই ওকে খুঁজতে যাবি?

অভীক বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে একটা কথা মনে রাখিস।

—কী?

—সবাই যে তোকে সাহায্য করছে, এমন ভাবিস না।

অভীক ঘুরে তাকাল।

—আপনিও?

হরিপদ উত্তর দিলেন না।


রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে।

অভীক উত্তরের ঘরে বসে নীল ফাইল পড়ছে।

হঠাৎ নিচতলা থেকে একটা শব্দ এল।

কাঁচ ভাঙার শব্দ।

সে উঠে দাঁড়াল।

তারপর পায়ের শব্দ।

একজন।

না—

দুজন।

অভীক দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

করিডোরে আলো নেই।

নিচে কারা যেন ফিসফিস করছে।

একটা গলা বলল,

—ফাইলটা খুঁজে বের কর।

অন্যজন বলল,

—ছেলেটা কোথায়?

অভীকের বুক ধক করে উঠল।

সে দ্রুত নীল ফাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল।

তারপর জানালার দিকে তাকাল।

জানালাটা বাইরে থেকে বন্ধ।

কিন্তু কাঠের প্যানেলের নিচে একটা সরু ফাঁক।

অভীক সেটা সরাতেই একটা ছোট ধাতব বাক্স বেরিয়ে এল।

বাক্সের ভেতরে—

একটা ছবি।

একটা পুরনো পরিচয়পত্র।

আর একটা চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“দাদা, এবার আমাকে খুঁজে নিস।”

অভীক কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

মাত্র তিনটি লাইন।

“আমি অর্ক নই।

আমি অয়ন।

আর আমি জানি, আমাদের বাবাকে কে মেরেছিল।”

ঠিক সেই মুহূর্তে নিচ থেকে দরজা ভাঙার শব্দ এল।

অভীক জানালার দিকে তাকাল।

কুয়াশার মধ্যে দূরে একজন দাঁড়িয়ে।

সে মুখ তুলে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে।

তার হাতে একটা কালো ব্যাগ।

আর তার কবজিতে—

একটা পুরনো ঘড়ি।

রুপোর চেন।

অভীকের মনে হল, এই ঘড়িটা সে আগে কোথাও দেখেছে।

কিন্তু কোথায়?

তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল—

ছোটবেলার একটা ছবি।

বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ।

আর সেই মানুষটির হাতে ঠিক একই ঘড়ি।

অভীক ফিসফিস করে বলল,

—না…

তারপর ছবিটা হাতে নিয়ে আলোয় ধরল।

ছবির মানুষটির মুখ স্পষ্ট।

রণেন নয়।

হরিপদ নয়।

অরুণ কাকাও নয়।

অভীক মানুষটাকে চিনতে পারল।

তার নিজের পরিবারের একজন।

যাকে সে এখনও সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।

তারপরই বাইরে থেকে একটা গলা ভেসে এল—

—অভীক, দরজা খোল।

সেই কণ্ঠস্বর খুব পরিচিত।

এবং সেই কণ্ঠস্বর শুনেই অভীক বুঝল—

কুয়াশার বাড়ির আসল রহস্য এখনও শুরুই হয়নি।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার বাড়ি (প্রথম পর্ব : বন্ধ জানালার ওপারে)।

প্রথম পর্ব : বন্ধ জানালার ওপারে

শীতের সকাল।

রাস্তাটা যেন কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেছে।

গাড়ির জানালার বাইরে যতদূর চোখ যায়, শুধু ধূসর সাদা পর্দা। মাঝে মাঝে সেই পর্দা ভেদ করে গাছের কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারপর আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

অভীক চৌধুরী জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে বসেছিল।

পনেরো বছর পর সে ফিরছে মাধবপুরে।

এই শহরটা তার কাছে কোনোদিনই খুব বড় ছিল না।

একটা পুরনো বাজার।

একটা নদী।

একটা কলেজ।

রেলস্টেশন।

আর শহরের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল বাড়ি—

চৌধুরী বাড়ি।

সেই বাড়িতেই কেটেছিল তার শৈশব।

কিন্তু আজ সেখানে ফেরার কারণ আনন্দের নয়।

তার কাকা, অরুণ চৌধুরী, মারা গেছেন তিন সপ্তাহ আগে।

অরুণ কাকা ছিলেন তার বাবার ছোট ভাই।

বাবা-মা দুজনেই মারা যাওয়ার পর তিনিই অভীকের অভিভাবক হয়েছিলেন।

কিন্তু মাত্র কয়েক বছর পরেই অভীক মাধবপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়।

তারপর আর ফিরে আসেনি।

কাকা মারা যাওয়ার পর আইনজীবীর কাছ থেকে একটা চিঠি এসেছিল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“বাড়িটি বিক্রি করার আগে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে হবে।”

আর একটা লাইন—

“আপনার কাকার রেখে যাওয়া কিছু নথি আপনাকে নিজে হাতে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।”

এই শেষ লাইনটাই অভীককে ফিরিয়ে এনেছে।

গাড়ি যখন মাধবপুরের পুরনো রাস্তার দিকে ঢুকল, তখন ঘড়িতে সকাল সাড়ে দশটা।

কুয়াশা একটু পাতলা হয়েছে।

দূরে নদী দেখা গেল।

অভীকের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হল।

এই নদীর ধারেই একদিন সে তার ছোট ভাই অয়নকে হারিয়েছিল।

পনেরো বছর আগে।

মাত্র বারো বছর বয়সে।

সেই ঘটনাটার পরই অভীক শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

অয়নের মৃত্যুকে সবাই বলেছিল দুর্ঘটনা।

নদীতে পড়ে গিয়েছিল।

স্রোতে ভেসে গিয়েছিল।

শরীর পাওয়া যায়নি।

কিন্তু অভীক কখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি।

কারণ অয়ন সাঁতার জানত।

আর সেদিন নদীর জল ছিল অস্বাভাবিক শান্ত।


চৌধুরী বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই অভীক কিছুক্ষণ নড়ল না।

বাড়িটা আগের মতোই আছে।

দোতলা পুরনো বাড়ি।

দেওয়ালে শ্যাওলা।

লোহার গেটের ওপর মরচে।

বারান্দার স্তম্ভে ফাটল।

আর দোতলার শেষ ঘরের জানালা—

বন্ধ।

অভীকের চোখ সেখানে আটকে গেল।

ছোটবেলায় ওই ঘরটাকে সবাই বলত—

“উত্তরের ঘর।”

কাকা কখনও কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতেন না।

অয়ন একবার বলেছিল,

“ওই ঘরে কী আছে জানিস?”

অভীক হেসে বলেছিল,

“ভূত।”

অয়ন বলেছিল,

“ভূত নয়। কেউ আছে।”

তখন অভীক হেসেছিল।

আজ সেই কথাটাই হঠাৎ মনে পড়ল।

গেট খুলে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।

অভীক তাঁকে চিনতে একটু সময় নিল।

—হরিপদ কাকা?

বৃদ্ধের চোখ বড় হয়ে গেল।

—অভীক?

—হ্যাঁ।

হরিপদ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তুই অনেক বদলে গেছিস।

অভীক মৃদু হাসল।

—আপনিও।

হরিপদ হাসলেন না।

তিনি শুধু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—বাড়িটা তো বদলায়নি।

তার গলায় এমন একটা সুর ছিল, যেন কথাটার মধ্যে অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।


দুপুরে আইনজীবী এলেন।

নাম সুশান্ত দে।

তিনি কাগজপত্র খুলে বললেন,

—আপনার কাকা বাড়িটা আপনার নামে করে গেছেন।

অভীক অবাক হল।

—আমার নামে?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু কাকা তো জানতেন আমি এখানে থাকব না।

—জানতেন।

—তাহলে?

সুশান্তবাবু একটা খাম বের করলেন।

—এটা আপনার কাকার ব্যক্তিগত চিঠি। উনি বলেছেন, বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এটা আপনাকে পড়তে হবে।

অভীক খামটা নিল।

খামের ওপর লেখা—

“অভীক, একা পড়বে।”

সে খাম খুলল।

ভেতরে মাত্র কয়েক লাইন।

“অভীক,

তুই যদি এই বাড়ি বিক্রি করতে চাস, করিস।

কিন্তু তার আগে উত্তরের ঘরটা খুলবি।

আর একটা কথা মনে রাখিস—

অয়নের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।

তুই যেটা দেখেছিলি, সেটা পুরো সত্যি নয়।

—অরুণ”

অভীকের হাত কেঁপে উঠল।

সে চিঠিটা আবার পড়ল।

তারপর তৃতীয়বার।

অয়নের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।

পনেরো বছর ধরে যে প্রশ্নটা সে নিজের মধ্যে চাপা দিয়ে রেখেছিল, আজ তার কাকা মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটাকে আবার জাগিয়ে দিয়েছেন।

সুশান্তবাবু বললেন,

—আপনি ঠিক আছেন?

অভীক চিঠিটা ভাঁজ করল।

—হ্যাঁ।

তারপর জিজ্ঞেস করল,

—উত্তরের ঘরের চাবি কোথায়?

সুশান্তবাবু হরিপদের দিকে তাকালেন।

হরিপদ নিচু গলায় বললেন,

—চাবি আমার কাছে নেই।

—কোথায়?

—জানি না।

অভীক কিছু বলল না।

হরিপদ এবার ধীরে বললেন,

—তবে একটা কথা বলি।

—কী?

—ওই ঘরটা খোলার দরকার নেই।

অভীক তাকিয়ে রইল।

—কেন?

বৃদ্ধের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—কারণ তোর কাকা পনেরো বছর ধরে ওই ঘরটা বন্ধ রেখেছিলেন।

—আর এখন?

—এখন উনি নেই।

—তাই?

হরিপদ উত্তর দিলেন না।


রাত নামার পর বাড়িটা অন্যরকম হয়ে গেল।

পুরনো কাঠের দরজা বাতাসে শব্দ করছে।

দোতলার করিডোরে পায়ের শব্দের মতো আওয়াজ হচ্ছে।

অভীক নিজের ঘরে বসে পুরনো অ্যালবাম দেখছিল।

একটা ছবিতে সে আর অয়ন।

দুজনেই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে।

অয়নের হাতে একটা ছোট নীল বল।

ছবির পেছনে কাকার হাতের লেখা—

“মাধবপুর, ২০০৯।”

অভীক ছবিটা উল্টে রাখল।

ঠিক তখনই—

ঠক।

দোতলার করিডোরে একটা শব্দ হল।

অভীক দরজা খুলে বাইরে এল।

সব অন্ধকার।

সে মোবাইলের আলো জ্বালল।

করিডোরের শেষ প্রান্তে উত্তরের ঘরের দরজা।

বন্ধ।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে যেন একটা শব্দ এল।

খুব ক্ষীণ।

টুপ।

তারপর আবার।

টুপ।

অভীক দরজায় কান রাখল।

নিঃশব্দ।

হয়তো পুরনো বাড়ির কাঠের শব্দ।

সে ফিরে আসতে যাচ্ছিল।

তখনই ভেতর থেকে একটা শব্দ এল।

একটা শিশুর কণ্ঠ।

খুব আস্তে—

—দাদা…

অভীক জমে গেল।

তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে দরজায় হাত রাখল।

—কে?

কোনো উত্তর নেই।

অভীক আবার বলল,

—কে ওখানে?

কয়েক সেকেন্ড পর ভেতর থেকে শব্দ এল।

—দাদা…

এইবার কণ্ঠটা পরিষ্কার।

অভীক পিছিয়ে গেল।

কারণ সেই কণ্ঠ সে চেনে।

পনেরো বছর ধরে সে সেই কণ্ঠ আর শোনেনি।

অয়ন।


অভীক ছুটে নিচে নেমে এল।

হরিপদ তখন রান্নাঘরের পাশে বসে ছিলেন।

অভীক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—ওই ঘরে কে আছে?

হরিপদ মুখ তুলে তাকালেন।

—কোন ঘর?

—উত্তরের ঘর।

বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল।

—তুই কিছু শুনেছিস?

—হ্যাঁ।

—কী?

অভীক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—অয়নের গলা।

হরিপদ চোখ নামিয়ে ফেললেন।

—অসম্ভব।

—কেন?

—কারণ অয়ন নেই।

—আমি জানি!

অভীক চিৎকার করে উঠল।

—আমি জানি অয়ন নেই। কিন্তু আমি ওর গলা শুনেছি!

হরিপদ উঠে দাঁড়ালেন।

—আজ রাতে ওই দিকটায় যাস না।

—আপনি কী জানেন?

—কিছু না।

—মিথ্যে বলছেন।

হরিপদ তাকালেন তার দিকে।

তার চোখে ভয়।

—তোর কাকা বলেছিলেন, তুই ফিরে এলে যেন তোকে কিছু না বলি।

—কী কিছু?

হরিপদ কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

—সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর।


সেই রাতেই অভীক ঘুমোতে পারল না।

ভোররাতে সে একটা পুরনো কাঠের আলমারি খুলতে গিয়ে একটা ছোট বাক্স পেল।

বাক্সের ওপর লেখা—

“অয়নের জিনিস।”

ভেতরে একটা নীল বল।

একটা ভাঙা ঘড়ি।

আর একটা ছোট কাগজ।

অভীক কাগজটা খুলতেই দেখল—

“দাদা, যদি আমি কখনও হারিয়ে যাই, নদীর দিকে তাকাস না।

উত্তরের ঘরের জানালার দিকে তাকাস।

ওখানেই উত্তর আছে।”

অভীক নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

এই লেখা অয়নের।

সে নিশ্চিত।

কিন্তু তারিখ?

কাগজের নিচে লেখা—

১৭ নভেম্বর ২০০৯।

অয়ন নিখোঁজ হয়েছিল—

১৬ নভেম্বর ২০০৯।

অর্থাৎ এই চিঠি লেখা হয়েছিল অয়ন নিখোঁজ হওয়ার পরের দিন।

অভীকের মাথা ঘুরে উঠল।

কেউ যদি চিঠিটা পরে লিখে থাকে?

অয়ন যদি বেঁচে থেকেও থাকে?

তাহলে এত বছর কোথায় ছিল?


সকালে অভীক প্রথমেই উত্তরের ঘরের সামনে গেল।

দিনের আলোয় দরজাটা আগের চেয়ে আরও পুরনো লাগছিল।

সে হাতল ধরল।

তালা নেই।

অভীক থমকে গেল।

গত রাতে তো দরজায় তালা ছিল।

সে ধীরে দরজা ঠেলে খুলল।

ঘরের ভেতর ধুলো।

একটা পুরনো খাট।

দেওয়ালে বইয়ের তাক।

একটা কাঠের টেবিল।

আর জানালা।

জানালাটা ভেতর থেকে বন্ধ।

অভীক টেবিলের কাছে গেল।

সেখানে একটা পুরনো টেপরেকর্ডার।

তার পাশে তিনটি ক্যাসেট।

প্রথমটির ওপর লেখা—

“অভীক।”

দ্বিতীয়টি—

“অয়ন।”

তৃতীয়টি—

“যেদিন সত্যিটা জানবি।”

অভীক তৃতীয় ক্যাসেটটা হাতে নিল।

তার হাত কাঁপছিল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ধাম!

অভীক ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খুলছে না।

সে জোরে ধাক্কা দিল।

—হরিপদ কাকা!

কোনো উত্তর নেই।

তারপর—

জানালার দিক থেকে একটা শব্দ।

অভীক ধীরে ঘুরে তাকাল।

জানালার কাচের ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে।

কুয়াশায় মুখ দেখা যাচ্ছে না।

শুধু একটা হাত।

হাতটা কাচের ওপর উঠে এল।

তারপর আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা হল—

“দাদা, আমাকে খুঁজিস না।”

অভীক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে টেপরেকর্ডারটা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

খসখসে শব্দের পর একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

অয়নের কণ্ঠ।


“দাদা, যদি তুই এই টেপটা শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি এখনও বেঁচে আছি।”

অভীকের বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ হল।

কণ্ঠটা আবার বলল—

“কিন্তু আমাকে খুঁজতে যাস না। কারণ যারা আমাকে নিয়ে গেছে, তারা জানে তুই একদিন ফিরে আসবি।”

টেপে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর অয়নের কণ্ঠ—

“আর দাদা… কাকাকে বিশ্বাস করিস না।”

টেপ থেমে গেল।

অভীক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে তখন কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে।

জানালার ওপারের সেই মানুষটিও নেই।

কিন্তু কাচের ওপর লেখা কথাটা এখনও স্পষ্ট—

“আমাকে খুঁজিস না।”

অভীক ধীরে টেপরেকর্ডারের দিকে তাকাল।

তারপর দ্বিতীয় ক্যাসেটটা হাতে নিল।

“অয়ন।”

ক্যাসেটটা ঢোকানোর আগেই দরজার বাইরে হরিপদের কণ্ঠ শোনা গেল—

—অভীক, দরজা খোল!

অভীক দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

হরিপদ দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন।

তার চোখ প্রথমেই পড়ল টেপরেকর্ডারের ওপর।

তারপর কাচের লেখার দিকে।

বৃদ্ধের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—তুই টেপটা শুনেছিস?

অভীক বলল,

—হ্যাঁ।

হরিপদ চোখ বন্ধ করলেন।

—তাহলে আর কিছু লুকিয়ে রাখা যাবে না।

অভীক এগিয়ে এল।

—অয়ন কোথায়?

হরিপদ উত্তর দিলেন না।

—কাকা কী করেছিলেন?

বৃদ্ধ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।

—তোর কাকা অয়নকে নদী থেকে উদ্ধার করেননি।

অভীকের বুক কেঁপে উঠল।

—তাহলে?

হরিপদ ফিসফিস করে বললেন,

—অয়নকে নদী থেকে কেউ নিয়ে গিয়েছিল।

—কে?

বৃদ্ধের ঠোঁট কাঁপল।

—যে লোকটাকে তুই পনেরো বছর ধরে মৃত ভেবে এসেছিস…

অভীক তাকিয়ে রইল।

—সে এখনও বেঁচে আছে।

হরিপদ থামলেন।

তারপর বললেন—

—আর সে আজ সকালেই এই বাড়িতে এসেছে।

অভীকের চোখ বড় হয়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে নিচতলার দরজায় তিনবার কড়া নাড়ার শব্দ হল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

দুজনেই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।

বাড়ির ভেতর আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল—

—অভীক…

একটা অপরিচিত পুরুষের গলা।

—অনেক দেরি করে ফেলেছিস।

কুয়াশার বাড়ির দরজা তখন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ বিকেলের আলো (তৃতীয় পর্ব : যে স্মৃতি ফিরে এসেছিল)।

তৃতীয় পর্ব : যে স্মৃতি ফিরে এসেছিল

রাত তখন অনেক।

রূপসাগরের সমুদ্রের শব্দ যেন আরও কাছে চলে এসেছে। জানলার কাঁচে বাতাস ধাক্কা মারছে বারবার। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল, তারপর আবার সব চুপ।

টেবিলের ওপর খোলা পড়ে আছে নীলাদ্রির মায়ের সেই খাম।

খামের ওপর লেখা—

“নীলাদ্রি যখন সত্যিটা জানার জন্য প্রস্তুত হবে।”

নীলাদ্রি অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার পাশে মেঘ।

দুজনেই যেন বুঝতে পারছিল, এই খামের ভেতরে শুধু কয়েকটা কাগজ নেই। আছে পনেরো বছরের নীরবতা। আছে একটা পরিবারের লুকিয়ে রাখা ইতিহাস। আর আছে সেই এক বছর, যে বছরটাকে নীলাদ্রি নিজের জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছিল।

শেষ পর্যন্ত মেঘই বলল,

—খুলবে?

নীলাদ্রি ধীরে মাথা নাড়ল।

খামটা খুলতেই বেরিয়ে এল চার পাতার একটি চিঠি।

মায়ের হাতের লেখা।

নীলাদ্রি পড়তে শুরু করল।


“নীল,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব তুই আর পালিয়ে বেড়াস না।

তোকে আমরা মিথ্যে বলেছিলাম। কিন্তু সেই মিথ্যের কারণ ছিল তোকে বাঁচিয়ে রাখা।

১৯৯৮ সালের ১৭ জুন যা ঘটেছিল, সেটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।

তোকে কেউ জলে ফেলে দিয়েছিল।

তুই বেঁচে গিয়েছিলি।

আর মেঘ তোকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল।

সেদিনের পর থেকে তোর স্মৃতির কিছু অংশ তুই নিজেই হারিয়ে ফেলেছিলি। আমরা সেটা জোর করে ফিরিয়ে আনিনি।

কারণ তুই একটা দৃশ্য দেখেছিলি।

এমন একটা দৃশ্য, যার জন্য একজন মানুষকে ভয় পেতাম আমরা।

প্রবীর সেনগুপ্ত।”

নীলাদ্রির চোখ হঠাৎ থেমে গেল।

নামটা সে চিনত।

প্রবীর কাকা।

বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

ছোটবেলায় যিনি প্রায়ই তাদের বাড়িতে আসতেন। মাকে “বৌদি” বলতেন। নীলাদ্রির জন্মদিনে বই এনে দিতেন।

চিঠির পরের লাইন—

“প্রবীর তোর বাবার বন্ধু ছিল। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে দেবাশিস মল্লিকের সঙ্গে কাজ করত।

রূপসাগর ও আশপাশের জমি নিয়ে একটা বড় চক্র তৈরি হয়েছিল। মানুষের জমি কম দামে কিনে নিয়ে পরে পর্যটন প্রকল্পের নামে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছিল।

তোর বাবা প্রথমে শুধু একটা বাস দুর্ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করছিল।

কিন্তু পরে বুঝতে পারে, ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে জমি দখলের একটা যোগ আছে।

তারপর থেকেই ওকে চাপ দেওয়া শুরু হয়।

তুই সেদিন ভুল করে সেই লোকদের কথোপকথন শুনে ফেলেছিলি।

তাই তোকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়।

তুই জলে পড়ার পর মেঘ তোকে বাঁচিয়ে ফেলেছিল।

কিন্তু মেঘও সব দেখেছিল।

আমরা দুজনেই বুঝেছিলাম, তোমাদের দুজনকে আলাদা না করলে তোমাদের জীবন বিপদে পড়বে।

তাই মেঘকে দূরে পাঠানো হয়।

আর তোকে বলা হয়েছিল, মেঘ চলে গেছে।

আমি তোকে আরও একটা মিথ্যে বলেছিলাম।

আমি বলেছিলাম, তোর বাবা দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

সত্যিটা হলো—ওর মৃত্যুর পেছনেও সেই মানুষগুলোর হাত ছিল।

তুই তখন ছোট।

তোর মনে এসব রেখে দিলে তুই স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারতিস না।

তাই ডাক্তার রমেন মুখার্জির সাহায্যে আমরা তোর সঙ্গে কয়েক মাস কাজ করেছিলাম। তোর স্মৃতির যে অংশগুলো তোকে ভয় দেখাত, সেগুলো তুই নিজেই চাপা দিয়ে ফেলেছিলি।

আমরা শুধু সেই ভুলে যাওয়াটাকে জোর করে ফিরিয়ে দিইনি।

মনে রাখিস—

তুই কোনো অপরাধ করিসনি।

মেঘও করেনি।

তোদের বাঁচানোর জন্যই আমরা তোদের আলাদা করেছিলাম।

আর যদি কোনোদিন সত্যিটা জানতে চাস, তাহলে বাবার ঘড়িটা দেখিস।

ওই ঘড়ির পেছনে উত্তর আছে।”


চিঠি শেষ।

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

তার চোখ আটকে আছে হাতঘড়িটার দিকে।

কালো ডায়াল।

রুপোর চেন।

বাবার ঘড়ি।

হঠাৎ তার মাথার ভেতর যেন একটা দরজা খুলে গেল।

একটা দৃশ্য।

সমুদ্র।

বৃষ্টি।

চিৎকার।

তার ছোট্ট শরীর জলের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।

আর ওপরে—

দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন তার বাবা।

আর একজন—

কালো ডায়ালের ঘড়ি পরা।

রুপোর চেন।

তারপর একটা হাত।

ধাক্কা।

নীলাদ্রির বুক কেঁপে উঠল।

—মেঘ!

মেঘ ছুটে এল।

—কী হয়েছে?

—আমি দেখেছি।

—কী?

—কে আমাকে জলে ফেলেছিল।

মেঘ নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

নীলাদ্রি চোখ বন্ধ করল।

আরও একটা স্মৃতি ফিরে আসছে।


সেদিন বিকেলে সে একা ছিল না।

মেঘ তার সঙ্গে ছিল।

তারা দুজনে সমুদ্রের ধারে খেলছিল।

হঠাৎ মেঘ বলেছিল,

—ওই দেখ, তোমার বাবা কার সঙ্গে কথা বলছে?

দূরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

তার পাশে সুব্রত সেন।

আর প্রবীর সেনগুপ্ত।

দুজনের মধ্যে তর্ক হচ্ছিল।

ছোট্ট নীলাদ্রি দূর থেকে শুনেছিল—

“আমি কাগজগুলো পুলিশের হাতে দেব।”

প্রবীর বলেছিল,

“সুব্রত, তুমি বুঝতে পারছ না তুমি কী করতে যাচ্ছ!”

“মানুষের জমি দখল করে ব্যবসা করা অপরাধ।”

“সবাই করে।”

“আমি সবাই নই।”

তারপর প্রবীর চলে গিয়েছিল।

কিন্তু যাওয়ার আগে সে একবার পিছনে তাকিয়েছিল।

তার চোখ পড়েছিল নীলাদ্রির দিকে।

সেই চোখ।

সেই কালো ঘড়ি।

তারপর—

আরেকটা স্মৃতি।

নীলাদ্রি মেঘকে বলছে,

—চলো বাবাকে বলি।

মেঘ মাথা নাড়ছে।

—না। আগে দেখি উনি কোথায় যান।

তারা দুজনে পেছন পেছন গিয়েছিল।

একটা পুরনো গুদামের কাছে।

সেখানে আরও দুজন লোক ছিল।

তাদের একজনের নাম নীলাদ্রি তখন শুনেছিল—

দেবাশিস মল্লিক।

দেবাশিস বলেছিল,

“ছেলেটা অনেক কিছু দেখে ফেলেছে।”

প্রবীর উত্তর দিয়েছিল,

“আমি সামলে নেব।”

তারপর মেঘ নীলাদ্রির হাত শক্ত করে ধরেছিল।

কিন্তু পিছন থেকে কেউ এসে নীলাদ্রিকে ধরে ফেলেছিল।

তারপর—

সমুদ্র।

অন্ধকার জল।

মেঘের চিৎকার।

আর একটা দৃশ্য—

জলের ধারে দাঁড়িয়ে প্রবীর।

সে ফোনে বলছে,

“ছেলেটা পড়েছে। কিন্তু মেয়েটা সব দেখেছে।”


নীলাদ্রি চোখ খুলল।

তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে।

মেঘ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।

—প্রবীর।

নীলাদ্রি বলল,

—হ্যাঁ।

—আমি জানতাম।

—তুমি জানতেই?

—আমি ওকে দেখেছিলাম।

মেঘ ধীরে বলল,

—সেদিন ওর মুখ আমি দেখেছিলাম। তোমাকে জলে ফেলে দেওয়ার পর ও আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। তোমার বাবা আমাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

নীলাদ্রি তাকিয়ে রইল।

—তারপর?

—তারপর তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, “তুমি যদি নীলাদ্রিকে বাঁচাতে চাও, তাহলে আজকের ঘটনা কাউকে বলবে না।”

—আর তুমি?

—আমি চুপ করেছিলাম।

মেঘের চোখে জল এসে গেল।

—কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।

নীলাদ্রি কিছু বলল না।

শুধু হাত বাড়িয়ে মেঘের হাত ধরল।


পরদিন সকালে তারা গেল অমল সরকারের কাছে।

অমলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে সব শুনলেন।

তারপর আলমারি থেকে একটা পুরনো ফাইল বের করলেন।

—এটা তোমার বাবার কাছে ছিল।

নীলাদ্রি অবাক।

—আপনার কাছে কীভাবে?

—তোমার বাবা মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে আমাকে দিয়েছিলেন।

ফাইল খুলতেই বেরিয়ে এল কয়েকটি নথি।

বাস দুর্ঘটনার রিপোর্ট।

কিছু জমির দলিল।

ব্যাংক লেনদেনের কাগজ।

আর একটি পেনড্রাইভ।

অমলবাবু বললেন,

—তোমার বাবা বুঝেছিলেন, তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তাই মূল নথির কপি আলাদা আলাদা মানুষের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।

—বাস দুর্ঘটনাটা?

—ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছিল।

—কেন?

অমলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—বাসে যারা ছিল, তাদের মধ্যে তিনজন এমন জমির মালিক ছিলেন যারা তাদের জমি বিক্রি করতে রাজি হচ্ছিলেন না। দুর্ঘটনার পরে তাদের একজন মারা যান। বাকি দুজন ভয়ে জমি বিক্রি করে দেন।

মেঘ বলল,

—আর দেবাশিস মল্লিক?

—পুরো চক্রের অর্থনৈতিক সমন্বয়কারী।

—প্রবীর?

অমলবাবু চুপ করলেন।

তারপর বললেন,

—প্রবীর ছিল মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু পরে সে আরও অনেক গভীরে চলে যায়।

নীলাদ্রি বলল,

—আমার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে ওর সম্পর্ক?

অমলবাবু একটা কাগজ সামনে রাখলেন।

—এটা দেখো।

কাগজটা ছিল একটি পুরনো টেলিফোন কলের নোট।

তারিখ—

২৩ আগস্ট ২০০৮।

সুব্রত সেনের মৃত্যুর আগের দিন।

নোটে লেখা—

“প্রবীর আবার ফোন করেছে। বলেছে, ফাইল বন্ধ না করলে এবার পরিবারকে টার্গেট করা হবে।”

নীলাদ্রির বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

—আমার বাবা এটা লিখেছিলেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে পুলিশকে বলেননি কেন?

অমলবাবু মাথা নিচু করলেন।

—ভয় পেয়েছিলাম।

সেই স্বীকারোক্তির মধ্যে কোনো অজুহাত ছিল না।

শুধু দীর্ঘদিনের অপরাধবোধ।


সেদিন বিকেলেই নীলাদ্রি থানায় গেল।

তার হাতে বাবার নথি।

মায়ের চিঠি।

পুরনো ছবি।

আর মেঘের সাক্ষ্য।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পেনড্রাইভ।

তার মধ্যে ছিল একটি ভিডিও।

সুব্রত সেনের রেকর্ড করা।

ভিডিওতে তিনি বলছিলেন—

“যদি এই ভিডিও কেউ দেখে, তাহলে বুঝব আমি আর নেই।

আমি জানি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।

দেবাশিস মল্লিকের সঙ্গে প্রবীর সেনগুপ্তের যোগাযোগের প্রমাণ আমি পেয়েছি।

আর আমি নিশ্চিত, ১৯৯৮ সালের ঘটনাটাও দুর্ঘটনা ছিল না।

আমার ছেলে নীলাদ্রিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

মেঘ সব দেখেছে।

আমি চাই না আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবার আবার বিপদে পড়ুক।

কিন্তু একদিন সত্যিটা প্রকাশ করতেই হবে।”

ভিডিও শেষ হওয়ার আগে সুব্রত একটা কথা বলেছিলেন—

“সত্যিকে যতদিন লুকিয়ে রাখবে, ততদিন তার ছায়া তোমাদের পিছু নেবে।”

স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।


তিন দিন পর খবর এল।

প্রবীর সেনগুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তার সঙ্গে দেবাশিস মল্লিকের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছে।

পুরনো বাস দুর্ঘটনা নতুন করে খোলা হয়েছে।

১৯৯৮ সালের ঘটনাটিও তদন্তের আওতায় এসেছে।

অনেক পুরনো সাক্ষী সামনে এলেন।

কেউ বললেন, তারা সেদিন কালো গাড়ি দেখেছিলেন।

কেউ বললেন, সুব্রতকে মৃত্যুর আগে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

আর একজন বৃদ্ধ জেলে বললেন,

—সেদিন রাতে আমি সমুদ্রের ধারে একটা গাড়ি দেখেছিলাম। গাড়ির পাশে একজন লোক দাঁড়িয়েছিল। তার হাতে কালো ঘড়ি ছিল।

স্মৃতি কখনও কখনও মরে যায় না।

শুধু অপেক্ষা করে।


কয়েক সপ্তাহ পর রূপসাগরের পুরনো বাড়িটা বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিল নীলাদ্রি।

বাড়িটা আর তার কাছে শুধু পুরনো ইট-পাথর নয়।

এখানে তার বাবার কণ্ঠ আছে।

মায়ের ভয় আছে।

মেঘের শৈশব আছে।

আর আছে সেই সত্যি, যেটা এত বছর ধরে অন্ধকারে ছিল।

কমলাদেবী একদিন বাড়িতে এসে বললেন,

—তুই তাহলে বাড়িটা রাখছিস?

নীলাদ্রি হাসল।

—হ্যাঁ।

—কী করবি?

—বাবার ঘরটা একটা ছোট লাইব্রেরি করব।

মেঘ পাশ থেকে বলল,

—শুধু বই থাকবে না। পুরনো নথিগুলোও থাকবে।

কমলাদেবী মৃদু হেসে বললেন,

—তাহলে বাড়িটা এবার সত্যিই বাঁচবে।


একদিন সন্ধ্যায় নীলাদ্রি আর মেঘ আবার গেল সেই বাতিঘরের কাছে।

যেখানে বহু বছর পর তাদের দেখা হয়েছিল।

সূর্য তখন ডুবছে।

আকাশে কমলা আলো।

সমুদ্র শান্ত।

মেঘ বলল,

—মনে আছে, তুমি ছোটবেলায় বলেছিলে সূর্য ডোবার সময় সমুদ্রের ওপারে একটা রাস্তা তৈরি হয়?

নীলাদ্রি হাসল।

—মনে আছে।

—তখন তুমি বলেছিলে, একদিন ওই রাস্তা ধরে চলে যাবে।

—আর তুমি বলেছিলে, আমাকেও নিয়ে যাবে।

মেঘ একটু চুপ করে বলল,

—তুমি তো আমাকে রেখে চলে গিয়েছিলে।

নীলাদ্রি তার দিকে তাকাল।

—এবার আর যাব না।

মেঘ মৃদু হাসল।

দুজনেই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছু সম্পর্ককে নতুন করে নাম দিতে হয় না।

কিছু মানুষকে ফিরে পাওয়া মানেই আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়।

বরং নতুন করে পথ তৈরি করা।


সূর্যের আলো আরও ফিকে হয়ে এল।

নীলাদ্রি বাবার ঘড়িটা হাতে পরল।

কালো ডায়াল।

রুপোর চেন।

একসময় এই ঘড়িটাই ছিল তার কাছে একটা রহস্য।

আজ সেটা শুধু বাবার স্মৃতি।

মেঘ জিজ্ঞেস করল,

—ঘড়িটা রাখবে?

—হ্যাঁ।

—কেন?

নীলাদ্রি বলল,

—কারণ এটা আমাকে একটা কথা শিখিয়েছে।

—কী?

—সময় কিছু মুছে দেয় না। শুধু অপেক্ষা করে।

মেঘ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

নীলাদ্রি আবার বলল,

—আর কিছু সত্যি যত দেরিতেই আসুক, একদিন আলোয় আসবেই।

বাতিঘরের আলো জ্বলে উঠল।

দূরে সমুদ্রের বুকের ওপর শেষ বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আজ নীলাদ্রির মনে কোনো অন্ধকার নেই।

পনেরো বছর পর সে বুঝল—

তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া বছরটা আসলে হারিয়ে যায়নি।

সেটা তার ভেতরেই ছিল।

তার মায়ের নীরবতায়।

তার বাবার অসমাপ্ত তদন্তে।

মেঘের অপেক্ষায়।

আর সেই সমুদ্রের জলে, যেখানে একদিন একটা শিশুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

আজ সেই সমুদ্রই যেন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সত্যি ফিরে এসেছে।

বাবার মৃত্যুর রহস্যের উত্তর এসেছে।

মায়ের মিথ্যের কারণ জানা গেছে।

মেঘ ফিরে এসেছে।

আর নীলাদ্রি নিজের হারানো স্মৃতিকে ফিরে পেয়েছে।

শেষ বিকেলের আলোয় দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল—

জীবনের সব অন্ধকার দূর করতে সূর্যের প্রয়োজন হয় না।

কখনও কখনও একজন মানুষই যথেষ্ট।

যে বলে—

“আমি আছি।”

মেঘ ধীরে তার হাত ধরল।

নীলাদ্রি হাতটা শক্ত করে ধরল।

তারপর দুজনে বাতিঘর থেকে নিচে নামতে শুরু করল।

পেছনে রয়ে গেল সমুদ্র।

রয়ে গেল পুরনো বাড়ি।

রয়ে গেল বহু বছরের গোপন সত্য।

আর সামনে—

একটা নতুন রাস্তা।

শেষ বিকেলের আলো তখন প্রায় নিভে এসেছে।

কিন্তু তাদের সামনে যে পথটা খুলে গেছে, সেখানে অন্ধকার ছিল না।

ছিল আগামী দিনের আলো।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ বিকেলের আলো (দ্বিতীয় পর্ব — মুছে যাওয়া বছর)।

দ্বিতীয় পর্ব — মুছে যাওয়া বছর

সকালে ঘুম ভাঙতেই নীলাদ্রির প্রথম মনে পড়ল রুপোর লকেটটার কথা।

রাতের অন্ধকারে গেটের সামনে যে মহিলা দাঁড়িয়েছিল, সে কে?

মেঘ?

নাকি অন্য কেউ?

বিছানা থেকে উঠে নীলাদ্রি লকেটটা হাতে নিল।

ভেতরের ছবিটা এখনও সেখানে।

ছোট্ট মেয়ে।

চোখে অদ্ভুত এক শান্ত দৃষ্টি।

ছবির পেছনে তারিখ—

১৯৯৮।

নীলাদ্রি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল।

তার শৈশবের স্মৃতি খুব পরিষ্কার নয়।

কিন্তু একটা জায়গার কথা তার মনে আছে।

সমুদ্র।

একটা লাল ছাতা।

আর একটা মেয়ের হাসি।

তারপর—

শূন্যতা।

সে কখনও বুঝতে পারেনি কেন তার শৈশবের একটি বছর যেন কুয়াশার মধ্যে ঢাকা।

আজ প্রথমবার সেই শূন্যতার একটা নাম পেল—

মেঘ।


১

নীলাদ্রি কমলাদেবীর বাড়িতে গেল।

বৃদ্ধা তখন উঠোনে বসে শুকনো কাপড় ভাঁজ করছিলেন।

নীলাদ্রি লকেটটা তাঁর সামনে রাখল।

— এটা কোথায় পেলাম জানেন?

কমলা তাকিয়ে রইলেন।

— জানি।

— আপনি জানতেন?

— জানতাম একদিন এটা তোমার হাতে ফিরবে।

— মেঘ কে?

কমলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

— তোমার ছোটবেলার বন্ধু।

— শুধু বন্ধু?

কমলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— তোমাদের দুজনকে আলাদা করে ভাবাই যেত না।

নীলাদ্রি বসে পড়ল।

— তাহলে আমি ওকে মনে করতে পারি না কেন?

— কারণ তোমার বাবা তোমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন।

— কীভাবে?

— দুর্ঘটনার পর।

নীলাদ্রি চমকে উঠল।

— কোন দুর্ঘটনা?

কমলা বললেন,

— ১৯৯৮ সালের ১৭ জুন।

তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

সেদিন সমুদ্রের ধারে প্রচণ্ড ঝড় উঠেছিল।

নীলাদ্রি আর মেঘ তখন খুব ছোট।

দুজনেই বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

মেঘের হাতে ছিল লাল ছাতা।

সমুদ্রের ধারে একটা পুরনো জেটির কাছে গিয়ে তারা খেলছিল।

হঠাৎ ঝড়ের মধ্যে জেটির একটা অংশ ভেঙে পড়ে।

নীলাদ্রি জলে পড়ে যায়।

মেঘ তাকে বাঁচাতে ঝাঁপ দেয়।

তারপর দুজনেই নিখোঁজ।

কয়েক ঘণ্টা পর নীলাদ্রিকে পাওয়া যায়।

মেঘকে নয়।

নীলাদ্রি বেঁচে গিয়েছিল।

কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর সে কিছুই মনে করতে পারছিল না।

কমলা বললেন,

— তোমার বাবা তখন ডাক্তারদের বলেছিলেন, ও যেন আর কখনও সেই দিনের কথা জানতে না পারে।

নীলাদ্রি ফিসফিস করে বলল,

— কেন?

কমলা বললেন,

— কারণ তিনি জানতেন মেঘ বেঁচে আছে।

নীলাদ্রি চমকে উঠল।

— কী?

— হ্যাঁ।

— তাহলে সবাই বলল না কেন?

কমলা চোখ নামিয়ে বললেন,

— কারণ মেঘকে তোমার বাবাই লুকিয়ে রেখেছিলেন।


২

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

— আমার বাবা কেন মেঘকে লুকিয়ে রাখবেন?

কমলা বললেন,

— কারণ মেঘ সেদিন এমন কিছু দেখেছিল, যা তোমার বাবা চাইছিলেন না কেউ জানুক।

— কী দেখেছিল?

— আমি জানি না।

— আপনি জানেন না?

— তোমার বাবা আমাকে শুধু বলেছিলেন, “মেঘ বেঁচে আছে। কিন্তু ওকে সামনে আনলে নীলাদ্রির জীবন বিপদে পড়বে।”

নীলাদ্রি উঠে দাঁড়াল।

— মেঘ কোথায় ছিল এত বছর?

কমলা বললেন,

— প্রথমে একটা আশ্রমে।

— তারপর?

— তারপর অন্য শহরে।

— এখন?

কমলা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— এখন সে নিজেই তোমার কাছে ফিরে এসেছে।

নীলাদ্রি স্তব্ধ হয়ে গেল।

— তাহলে কাল রাতে যে মহিলা—

— হ্যাঁ।


৩

বিকেল হতে না হতেই নীলাদ্রি বাতিঘরের দিকে রওনা হল।

পুরনো বাতিঘরটা সমুদ্রের একেবারে কিনারে।

চারপাশে বাতাস।

নিচে পাথরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ।

বাতিঘরের পাশে একটা বেঞ্চ।

সেখানে একজন মহিলা বসে ছিল।

সাদা পোশাক।

চুল খোলা।

নীলাদ্রি ধীরে এগিয়ে গেল।

মহিলা মুখ তুলল।

দুজনের চোখাচোখি হল।

নীলাদ্রির বুকের মধ্যে হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল।

যেন এই চোখ সে বহু বছর আগে দেখেছে।

মহিলা বলল,

— অনেক দেরি করেছিস।

নীলাদ্রি থেমে গেল।

— তুমি মেঘ?

মহিলা মৃদু হাসল।

— আমাকে চিনতে পারছিস?

নীলাদ্রি মাথা নাড়ল।

— না।

মেঘ বলল,

— আমি জানতাম।

তারপর পকেট থেকে একটা পুরনো লাল ফিতা বের করল।

— এটা মনে আছে?

নীলাদ্রি ফিতেটা দেখেই চোখ বন্ধ করল।

হঠাৎ তার মাথার ভেতর একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।

সমুদ্র।

বৃষ্টি।

একটা ছোট মেয়ে হাসছে।

সে বলছে—

“নীল, আমাকে ছেড়ে যাস না।”

নীলাদ্রি চোখ খুলল।

মেঘ তার দিকে তাকিয়ে।

— কিছু মনে পড়ল?

— একটু।

— আর মনে পড়বে।


৪

মেঘ তাকে বাতিঘরের নিচের একটা ছোট ঘরে নিয়ে গেল।

ঘরের ভেতর একটা পুরনো কাঠের বাক্স।

মেঘ বলল,

— এটা তোমার বাবার।

অর্কের বদলে নীলাদ্রি নামটা যেন এখানে ভুলভাবে ঢুকে পড়তে পারত, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল—এই বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝল, তার অতীতের আরও একটা দরজা খুলতে চলেছে।

মেঘ বাক্স খুলল।

ভেতরে কিছু কাগজ।

একটি পুরনো ক্যামেরা।

আর একটা ছোট অডিও ক্যাসেট।

মেঘ বলল,

— তোমার বাবা সেদিন সবকিছু রেকর্ড করেছিলেন।

— কী?

— কারণ তিনি আগেই বুঝেছিলেন বিপদ আসছে।

নীলাদ্রি ক্যাসেটটা হাতে নিল।

— এটা কোথায় ছিল?

— আমার কাছে।

— এত বছর?

— হ্যাঁ।

— তাহলে আমাকে এখন দিলে কেন?

মেঘ তার চোখের দিকে তাকাল।

— কারণ এখন আর তোমাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলার দরকার নেই।

অডিও চালু করা হল।

কিছুক্ষণ সমুদ্রের শব্দ।

তারপর সুব্রত সেনের কণ্ঠ—

“মেঘ, যদি তুমি এটা শুনতে পাও, তাহলে বুঝব আমি ব্যর্থ হয়েছি।”

নীলাদ্রি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল।

“আজ রাতে আমি যে লোকটার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, সে জানে ১৭ জুন কী ঘটেছিল।”

একটু বিরতি।

“ও জানে নীলাদ্রিকে কেন জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।”

নীলাদ্রির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে মেঘের দিকে তাকাল।

মেঘের চোখে জল।

রেকর্ডিং চলতে লাগল—

“আমি যদি ফিরে না আসি, মেঘকে নিয়ে দূরে চলে যেও। কারণ বিপদটা দুর্ঘটনা থেকে শুরু হয়নি।”

হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ।

নীলাদ্রি বলল,

— “নীলাদ্রিকে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল”—এর মানে কী?

মেঘ চুপ করে রইল।

— মেঘ!

সে ধীরে বলল,

— সেদিন তুমি নিজে জলে পড়িসনি।

— তাহলে?

— কেউ তোমাকে ধাক্কা দিয়েছিল।


৫

নীলাদ্রির মাথা ঘুরে উঠল।

— কে?

মেঘ বলল,

— আমি জানি না।

— তুমি দেখেছিলে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে বলো!

মেঘ চোখ বন্ধ করল।

— লোকটা তোমার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করছিল।

— আমার বাবা সেখানে ছিলেন?

— ছিলেন।

— তাহলে বাবা আমাকে বাঁচালেন?

— হ্যাঁ।

— আর তুমি?

মেঘ মৃদু হাসল।

— আমি তোকে ছাড়া ফিরিনি।

নীলাদ্রি কিছু বলতে পারল না।

মেঘ বলল,

— তোর বাবা তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

— কোথায়?

— একটা পুরনো বাড়িতে।

— কেন?

— কারণ যে লোকটা তোকে ধাক্কা দিয়েছিল, সে তোমার বাবাকে বলেছিল—যদি সত্যিটা প্রকাশ হয়, তাহলে পরের বার শুধু তোকে নয়, তোমার মাকেও মেরে ফেলবে।

নীলাদ্রি মাথায় হাত রাখল।

এত বছর ধরে সে যে গল্প জানত, তার প্রতিটি অংশ যেন বদলে যাচ্ছে।

তার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।

তার শৈশবের সেই বছরও সাধারণ ছিল না।

আর মেঘ—

মেঘ তার জীবনের এমন একটা অংশ, যাকে ইচ্ছে করে তার কাছ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।


৬

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ।

মেঘ জানলার কাছে গিয়ে তাকাল।

— ওরা এসেছে।

— কারা?

— যারা এত বছর ধরে এই সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছে।

— এখন কী করব?

মেঘ বাক্সটা বন্ধ করে বলল,

— আমাদের এখান থেকে যেতে হবে।

কিন্তু দরজা খোলার আগেই বাইরে থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল—

— মেঘ, এবার আর পালিয়ে লাভ নেই।

মেঘের মুখ সাদা হয়ে গেল।

নীলাদ্রি ফিসফিস করে বলল,

— কে?

মেঘ উত্তর দিল না।

দরজায় আবার কড়া নাড়া হল।

তারপর সেই কণ্ঠ—

— নীলাদ্রি, তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী মানুষটা তোমার খুব কাছের ছিল।

নীলাদ্রি স্থির হয়ে গেল।

— কী বলছেন?

বাইরে থেকে উত্তর এল—

— তোমার নিজের পরিবারে এমন একজন ছিল, যে জানত ১৯৯৮ সালে কী ঘটেছিল।

মেঘ অর্কের দিকে নয়, নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলল,

— দরজা খুলিস না।

বাইরের লোকটি এবার শেষ কথা বলল—

— কারণ তোমার মা যে গল্পটা তোমাকে বলেছিলেন, সেটাও মিথ্যে ছিল।

তারপর গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ।

গাড়ি দূরে সরে গেল।

নীলাদ্রি ধীরে ধীরে মেঘের দিকে তাকাল।

— আমার মা কী লুকিয়েছিলেন?

মেঘ কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বাবার বাক্সের নিচ থেকে আরেকটা খাম বের করল।

খামের ওপর মায়ের হাতের লেখা।

“নীলাদ্রি যখন সত্যিটা জানার জন্য প্রস্তুত হবে।”

নীলাদ্রি খামটা হাতে নিল।

তার আঙুল কাঁপছিল।

কারণ সে বুঝতে পারছিল—

এতদিন যে গল্পটাকে সে নিজের পরিবারের গল্প বলে জানত,

সেটা আসলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

আর সেই মিথ্যের কেন্দ্রে ছিল—

তার বাবা,

তার মা,

মেঘ,

এবং সেই একটা বছর, যেটা তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল।

চলবে…

Share This