Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী ((তৃতীয় পর্ব: যে যাত্রী কখনও মারা যায়নি))।

শেষ পর্ব

রাত ১২টা ১২ মিনিট।

স্মৃতিপুরের আকাশে কোনও চাঁদ নেই। কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে রাস্তা, বাড়িঘর, গাছপালা—এমনকি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অভিশপ্ত নীলচে-কালো ট্রেনটিও। শুধু তার জানালাগুলোয় জ্বলছে অসংখ্য হলুদ আলো। প্রতিটি আলো যেন কোনও এক মৃত মানুষের শেষ স্মৃতি।

অয়ন বসু দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো বসু বাড়ির সদর দরজায়। তার হাতে মোবাইল ফোন। পর্দায় এখনও জ্বলজ্বল করছে সেই বার্তা—

‘দাদা, আমি এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু ট্রেনটা আমাকে খুঁজছে। আমাকে বাঁচাতে হলে, আগামী রাত ১২টা ১৩ মিনিটের আগে তোমাকে নিজের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে হবে।’

অয়নের মাথায় অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরছে।

মেঘলা যদি বেঁচে থাকে, তাহলে সাত বছর আগে কাকে মৃত বলে শনাক্ত করা হয়েছিল? আর সে নিজে যদি বেঁচে থাকে, তাহলে আয়নার ওপারে দাঁড়ানো সেই রক্তাক্ত মানুষটি কে?

ঠিক তখনই পিছন থেকে ধূসর কোট পরা বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল।

“সময় শেষ হয়ে আসছে, অয়নবাবু।”

অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।

“আমি আর কোনও ধাঁধা শুনতে চাই না। আপনি সব জানেন। সত্যিটা বলুন।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সত্যিটা আমি বলতে পারি না। কারণ এই ট্রেন কাউকে সত্যি উপহার দেয় না। সে শুধু মানুষকে তার নিজের স্মৃতির সামনে দাঁড় করায়। স্মৃতি যদি মিথ্যে হয়, সত্যিটা আপনাকেই খুঁজে নিতে হবে।”

“তাহলে আমি কোথায় যাব?”

বৃদ্ধ হাত তুলে ট্রেনটির দিকে দেখালেন।

“শেষ কামরায়। সেখানে এমন একজন অপেক্ষা করছে, যার সঙ্গে আপনার দেখা হওয়ার কথা ছিল সাত বছর আগেই।”


অয়ন ট্রেনে উঠতেই দরজাটি নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।

কামরার মধ্যে এবার আর কোনও অচেনা যাত্রী নেই। সারি সারি আসন খালি পড়ে আছে। জানালার বাইরে ছুটে চলেছে অন্ধকার। দেয়ালের ঘড়িতে সময় ১২টা ১৩ মিনিট।

অয়ন শেষ কামরার দিকে এগিয়ে গেল।

প্রতিটি দরজার ওপরে একটি করে নাম লেখা। কোথাও ‘অপেক্ষা’, কোথাও ‘অনুশোচনা’, কোথাও ‘অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি’। শেষ দরজাটির ওপরে লেখা—

‘যে সত্যি থেকে পালিয়েছিল।’

দরজাটি খুলতেই অয়ন নিজেকে দেখতে পেল একটি হাসপাতালের ঘরে।

সাদা বিছানা। পাশে চিকিৎসার সরঞ্জাম। জানালার বাইরে বৃষ্টি। বিছানায় শুয়ে আছে এক যুবক, যার মুখ অয়নের মতোই। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, শরীরের একাধিক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন।

বিছানার পাশে বসে কাঁদছে মেঘলা।

“দাদা, চোখ খোল। প্লিজ, চোখ খোল!”

অয়ন দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এটি কোনও কল্পনা নয়। তার ভেতরে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতির একটি অংশ।

দৃশ্যের মধ্যে একজন চিকিৎসক এগিয়ে এসে বললেন, “রোগীর অবস্থা এখনও সংকটজনক। মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। জ্ঞান ফিরলেও দুর্ঘটনার আগের স্মৃতি ফিরে পেতে সময় লাগতে পারে।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ডাক্তারবাবু, আমার দাদার কিছু হবে না তো?”

চিকিৎসক কোনও উত্তর দিলেন না।

দৃশ্যটি কেঁপে উঠল। হাসপাতালের আলো নিভে গেল। আবার আলো জ্বলতেই অয়ন দেখল, মেঘলা বিছানার পাশে একা বসে আছে। তার হাতে একটি কাগজ।

সে কাগজে লিখছে—

‘দাদা, তুই যদি কোনও দিন সব ভুলে যাস, তবুও মনে রাখিস, আমি তোকে দোষ দিইনি।’

অয়নের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি হাসপাতালে ছিলাম?” সে বিড়বিড় করে বলল। “তাহলে আমি কীভাবে দুর্ঘটনার পরের সাত বছর কাটালাম?”

পেছন থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ এল।

“কারণ আপনি দুর্ঘটনার পর বেঁচে গিয়েছিলেন, অয়নবাবু। কিন্তু আপনার স্মৃতির একটা অংশ আর কখনও ফিরে আসেনি।”

অয়ন ঘুরে দেখল বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন।

“আর মেঘলা?”

বৃদ্ধের চোখ নেমে গেল।

“সেই রাতের পর মেঘলা নিখোঁজ হয়েছিল। তার মৃত্যুর কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না। কিন্তু সবাই ধরে নিয়েছিল, সে দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আপনার পরিবার, পুলিশ, সংবাদমাধ্যম—সবাই সেই ধারণাকেই সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল।”

অয়নের বুক কেঁপে উঠল।

“কিন্তু আমি তো নিজেই তার মৃত্যুর খবর লিখেছিলাম!”

“আপনি হাসপাতাল থেকে ফিরে সেই খবর লিখেছিলেন। তখন আপনার স্মৃতি অসম্পূর্ণ ছিল। অন্যদের বলা কথাকেই আপনি নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করেছিলেন।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“না… আমি তো সাংবাদিক। আমি প্রমাণ ছাড়া কোনও খবর প্রকাশ করি না।”

বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, “মানুষ যখন নিজের জীবনের সত্যিটাই ভুলে যায়, তখন অন্যের দেওয়া প্রমাণকে বিশ্বাস করা ছাড়া তার আর কী উপায় থাকে?”


হঠাৎ ট্রেনের জানালায় একটি মুখ ভেসে উঠল।

মেঘলা।

কিন্তু এবার তার মুখে কোনও রক্ত নেই। পরনে সাদা পোশাক, চোখে সেই ছোটবেলার পরিচিত মায়া।

সে জানালার ওপার থেকে হাত রাখল কাচে।

“দাদা!”

অয়ন ছুটে গেল।

“মেঘলা! তুই কোথায়? তুই কি সত্যিই বেঁচে আছিস?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“আমি বেঁচে আছি। কিন্তু তোকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাকে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।”

“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলি?”

“সেই রাতের দুর্ঘটনার পর আমি কিছুদিন হাসপাতালে ছিলাম। তারপর আমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার স্মৃতিও পুরোপুরি ঠিক ছিল না। আমি শুধু জানতাম, আমার দাদা বেঁচে আছে। কিন্তু তার কাছে পৌঁছনোর কোনও পথ ছিল না।”

অয়ন কাচের ওপর হাত রাখল।

“আমি তোকে খুঁজিনি কেন?”

মেঘলার চোখে জল জমল।

“কারণ তুই নিজের স্মৃতির কাছে বন্দি ছিলি। তুই বারবার সেই রাতের স্বপ্ন দেখতিস, কিন্তু প্রতিবার ঘুম ভাঙার পর সব ভুলে যেতিস। তোর অবচেতন মন তোকে সেই দুর্ঘটনার কাছে ফিরিয়ে আনতে চাইত। আর তুই ভয়ে পালিয়ে যেতিস।”

“কিন্তু এই ট্রেন? এই স্মৃতিপুর? এগুলো কী?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই ট্রেন বাস্তব আর স্মৃতির মাঝখানের এক অদ্ভুত পথ। এখানে মৃতদের স্মৃতি আছে, জীবিতদের অপরাধবোধ আছে, আর আছে এমন কিছু মানুষ, যারা নিজেদের অতীতকে শেষবারের মতো বুঝতে চায়। তুই এখানে এসেছিস নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে।”

“তাহলে স্টেশনে যে দু’জন তোকে দেখেছিলাম?”

“একজন ছিল আমার স্মৃতি, আর অন্যজন ছিল তোর অপরাধবোধের তৈরি প্রতিচ্ছবি। তুই নিজেই বুঝতে পারছিলি না, কোন স্মৃতিটাকে বিশ্বাস করবি। তাই তোর মনে দুটো মেঘলা তৈরি হয়েছিল।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

সাত বছর ধরে সে ভেবেছিল, বোনের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী। সেই অপরাধবোধ তাকে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

কিন্তু সত্যিটা এখনও অসম্পূর্ণ।

“সেই রাতে আসলে কী হয়েছিল, মেঘলা? গাড়িতে তৃতীয় মানুষটি কে ছিল?”

মেঘলার মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল।

“তুই কি সত্যিই জানতে চাস?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে শেষ দরজাটা খুলে দে। সেখানে তোর সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতি অপেক্ষা করছে।”


ট্রেনের শেষ প্রান্তে একটি কালো দরজা দেখা গেল।

অয়ন কাছে যেতেই দরজায় লাল অক্ষরে ফুটে উঠল—

‘প্রবেশ করলে আর মিথ্যে মনে করা যাবে না।’

অয়ন দরজা খুলল।

পরমুহূর্তে সে ফিরে গেল সাত বছর আগের সেই বর্ষার রাতে।

কলকাতার বাইরে একটি নির্জন রাস্তা। প্রবল বৃষ্টি। রাস্তার ওপর জল জমে আছে। গাড়ির ভেতরে অয়ন স্টিয়ারিং ধরে বসে। পাশের আসনে মেঘলা। পেছনের আসনে একজন পুরুষ।

সেই পুরুষের মুখ দেখতে পেয়ে অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার বাবা।

অয়ন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “বাবা?”

দৃশ্যের মধ্যে বাবা চিৎকার করে বলছেন, “অয়ন, গাড়ি থামা! এভাবে গাড়ি চালাস না!”

মেঘলা কাঁদছে।

“দাদা, তুই শান্ত হ! আমরা বাড়ি ফিরে যাব। আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

কিন্তু তরুণ অয়ন রাগে অন্ধ। সে বলছে, “সবাই আমার কাছ থেকে চলে যেতে চায়! তুইও চলে যাবি, তাই না?”

মেঘলা মাথা নাড়ছে।

“আমি তোকে ছেড়ে যাচ্ছি না, দাদা। আমি শুধু নিজের জীবনটা নিজের মতো করে শুরু করতে চাই।”

“তাহলে আগে আমাকে বলতে পারতিস!”

“আমি বলতেই তো চেয়েছিলাম!”

গাড়ির ভেতরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর পেছনের আসন থেকে বাবা বললেন, “অয়ন, রাগের মাথায় কিছু করিস না। তোর বোনের কথা শোন।”

অয়ন স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দ্রুত গাড়ি চালাতে শুরু করল। বৃষ্টিতে রাস্তা দেখা যাচ্ছে না।

একটি বাঁক।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের আলো।

মেঘলার চিৎকার—

“দাদা, সাবধান!”

তারপর প্রচণ্ড ধাক্কা।

কাচ ভাঙার শব্দ।

লোহার সঙ্গে লোহার সংঘর্ষ।

আর অন্ধকার।

অয়ন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“আমি… আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম…”

বৃদ্ধের কণ্ঠ ভেসে এল, “হ্যাঁ। কিন্তু আপনি একা দায়ী ছিলেন না। দুর্ঘটনায় আপনার বাবা ঘটনাস্থলেই মারা যান। আপনি এবং মেঘলা গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। পরে হাসপাতালে আপনার জ্ঞান ফিরলেও স্মৃতির অনেকটা অংশ হারিয়ে যায়। মেঘলাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।”

অয়ন কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে আমি এতদিন বাবাকেও ভুলে গিয়েছিলাম?”

“আপনি ঘটনাটির কিছু অংশ মনে রেখেছিলেন। কিন্তু নিজের অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে আপনার মন সেই স্মৃতিগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে রেখেছিল। আপনি ভাবতেন, মেঘলার মৃত্যু হয়েছে আপনার জন্য। সেই বিশ্বাসই আপনাকে নিজের জীবন থেকে পালাতে বাধ্য করেছে।”

অয়ন মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।

“আমি বাবাকে মেরেছি… আমি আমার বোনকে হারিয়েছি…”

মেঘলা তার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।

“না, দাদা। তুই ইচ্ছে করে কাউকে মারিসনি। তুই রাগ করেছিলি, ভুল করেছিলি, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালিয়েছিলি। সেই ভুলের ভয়ংকর পরিণতি হয়েছিল। কিন্তু ভুলের জন্য অনুশোচনা করা আর সারাজীবন নিজেকে শাস্তি দেওয়া এক কথা নয়।”

অয়ন তার দিকে তাকাল।

“তুই আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছিস?”

মেঘলা মৃদু হাসল।

“আমি তোকে কোনও দিন ঘৃণা করিনি। কিন্তু তোকে একটা কথা বলার ছিল। তুই যদি নিজেকে ক্ষমা করতে না পারিস, তাহলে আমার কাছে ফিরে আসার সাহসও পাবি না।”

ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, “দ্রুত! সময় শেষ হয়ে আসছে!”

অন্ধকারের মধ্যে একটি বিশাল দরজা খুলে গেল। দরজার ওপারে দেখা গেল সেই প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রথমবার অয়ন ট্রেনে উঠেছিল।

কিন্তু এবার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত যাত্রী অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে।

তাদের চোখে একই প্রশ্ন—

‘তুমি কি ফিরতে চাও?’


অয়ন মেঘলার হাত ধরল।

“চল, আমরা একসঙ্গে ফিরব।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“আমি ফিরব, দাদা। কিন্তু তোর ফেরার পথ আলাদা।”

“কেন?”

“কারণ তুই এখনও জীবিত। এই ট্রেন মৃতদের স্মৃতি আর জীবিতদের অনুশোচনার মধ্যে চলাচল করে। তুই এখানে নিজের অতীতের মুখোমুখি হতে এসেছিলি। এখন তোর সামনে দুটো পথ। এক, তুই এখানেই থেকে যাবি, সেই রাতের স্মৃতিকে বারবার বাঁচতে বাঁচতে। দুই, তুই সত্যিটা মেনে নিয়ে নিজের জীবনে ফিরে যাবি।”

অয়ন জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। ট্রেনের ঘড়িতে সময় বদলেছে।

১২টা ১৪।

১২টা ১৫।

১২টা ১৬।

সাত বছর পর সময় আর থেমে নেই।

“তুই কি আমার সঙ্গে ফিরতে পারবি না?”

মেঘলা তার হাত শক্ত করে ধরল।

“আমি ফিরব। কিন্তু তুই আগে ফিরবি। তোর জীবনে এখনও অনেক কাজ বাকি। বাবার স্মৃতিকে সম্মান করতে হবে, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, আর সত্যিটা লিখতে হবে—যাতে আর কোনও পরিবার অসম্পূর্ণ খবরের আড়ালে হারিয়ে না যায়।”

অয়নের চোখে জল।

“তুই আমাকে আবার ছেড়ে চলে যাবি?”

মেঘলা তার কপালে হাত রাখল।

“কেউ কাউকে সত্যি ভালোবাসলে, সে সব সময় পাশে না থাকলেও তার ভালোবাসা হারিয়ে যায় না।”

ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

বৃদ্ধ এগিয়ে এসে অয়নের হাতে একটি নতুন টিকিট দিলেন।

এবার টিকিটে লেখা—

‘যাত্রী: অয়ন বসু। গন্তব্য: বর্তমান। প্রস্থান: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রাত ১২টা ১৩ মিনিট। ফেরার টিকিট: আছে।’

অয়ন অবাক হয়ে বৃদ্ধের দিকে তাকাল।

“আপনি কে? কেন আমাকে সাহায্য করলেন?”

বৃদ্ধের মুখে এক শান্ত হাসি ফুটল।

“আমি শুধু পথ দেখাই। মানুষকে তার নিজের সত্যির কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার কাজ।”

“আপনিও কি কোনও দিন এই ট্রেনে উঠেছিলেন?”

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকালেন।

“অনেক বছর আগে। আমিও এক অসমাপ্ত প্রশ্ন নিয়ে এসেছিলাম। তারপর বুঝেছিলাম, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব, তার থেকে পালিয়ে থাকা উচিত নয়।”

অয়ন কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বৃদ্ধ ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

শুধু তাঁর লণ্ঠনটি পড়ে রইল প্ল্যাটফর্মে।


অয়ন চোখ খুলল হাসপাতালের বিছানায়।

জানালা দিয়ে সকালের আলো এসে পড়েছে। পাশে একজন নার্স দাঁড়িয়ে। দূরে চিকিৎসক কথা বলছেন।

“অয়নবাবু, শুনতে পাচ্ছেন? আপনি জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন!”

অয়ন কথা বলতে চাইল, কিন্তু গলা শুকিয়ে গেছে। সে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, “আমার বোন… মেঘলা কোথায়?”

চিকিৎসক অবাক হয়ে তাকালেন।

“আপনার বোন? আমরা তো জানতাম, দুর্ঘটনায় আপনার পরিবারের অন্য সদস্য মারা গিয়েছিলেন। আপনি অনেক দিন ধরে অচেতন ছিলেন। আপনার বোনের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও নতুন খবর নেই।”

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

সে কি স্বপ্ন দেখেছিল? সেই ট্রেন, স্মৃতিপুর, বৃদ্ধ, দুই মেঘলা—সবই কি তার আহত মনের তৈরি কল্পনা?

ঠিক তখনই নার্স বললেন, “আপনার জন্য একজন দেখা করতে এসেছেন।”

দরজা খুলে একজন তরুণী ভেতরে এল।

পরনে হালকা নীল পোশাক। চোখে জল। হাতে একটি পুরোনো ছাতা।

অয়ন তাকিয়ে রইল।

“মেঘলা?”

তরুণী ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।

“দাদা।”

অয়নের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুই বেঁচে আছিস!”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আমি বেঁচে আছি।”

“তুই কোথায় ছিলি এতদিন?”

“অন্য শহরে চিকিৎসা চলছিল। পরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে অনেক সময় লেগেছে। তোর খবর পেয়েছিলাম, কিন্তু তোর জ্ঞান ফিরবে কি না জানতাম না। অবশেষে হাসপাতাল থেকে খবর পেলাম।”

অয়ন তার হাত শক্ত করে ধরল।

“আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি বাবার মৃত্যুর জন্য, দুর্ঘটনার জন্য…”

মেঘলা তাকে থামিয়ে দিল।

“আমরা পরে সব কথা বলব। এখন তুই সুস্থ হয়ে ওঠ। তারপর একসঙ্গে বাবার স্মৃতির সামনে দাঁড়াব।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

হাসপাতালের জানালা দিয়ে তখন রোদ এসে পড়েছে। বহু বছরের অন্ধকারের পর তার মনে হলো, পৃথিবীটা আবার নতুন করে শুরু হতে পারে।


কয়েক মাস পর।

অয়ন আবার সাংবাদিকতার কাজে ফিরেছে। কিন্তু এবার তার লেখার ধরন বদলে গেছে। সে শুধু ঘটনার বিবরণ লেখে না, ঘটনার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথাও খোঁজে। কোনও খবর প্রকাশ করার আগে সে প্রতিটি তথ্য যাচাই করে। কারণ সে জানে, অসম্পূর্ণ সত্য কখনও কখনও একটি পরিবারের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দিতে পারে।

মেঘলা এখন তার কাছেই থাকে। দু’জনে মিলে বাবার পুরোনো ছবিগুলো সাজিয়েছে। বসু বাড়ির একটি ঘর নতুন করে তৈরি করেছে। সেখানে রাখা হয়েছে বাবার ছবি, মায়ের ছবি, আর ছোটবেলার অয়ন-মেঘলার একটি পারিবারিক ছবি।

একদিন রাতে অয়ন তার ডায়েরি খুলে লিখতে বসেছিল।

শিরোনাম লিখল—

‘শেষ ট্রেনের যাত্রী: একটি অসমাপ্ত রাতের সত্যি।’

লিখতে লিখতে তার চোখ পড়ল টেবিলের কোণে রাখা পুরোনো কালো টিকিটটির দিকে।

সেটি সে হাসপাতাল থেকে ফিরে নিজের জামার পকেটে পেয়েছিল।

এতদিন টিকিটটি ফাঁকা ছিল।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ তার গায়ে কয়েকটি অক্ষর ফুটে উঠল—

‘যাত্রী: অয়ন বসু। গন্তব্য: বাড়ি। যাত্রা: সম্পূর্ণ।’

অয়ন বিস্ময়ে টিকিটটি হাতে তুলে নিল।

তারপর জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে কোথাও যেন ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

একবার।

তারপর আরেকবার।

অয়ন জানালা খুলে বাইরে তাকাল। রাস্তা ফাঁকা। আকাশে পূর্ণিমার আলো। কোনও ট্রেন নেই, কোনও স্টেশন নেই।

শুধু দূরের অন্ধকারে একটি ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলল, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

অয়ন মৃদু হাসল।

সে বুঝতে পারল, কিছু স্মৃতি কখনও পুরোপুরি মুছে যায় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষকে সারাজীবন খুঁজতে হয়। আর কিছু যাত্রা শেষ হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের অতীতকে অস্বীকার না করে তাকে মেনে নিতে শেখে।

সে ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—

“মৃত্যু সব সময় জীবনের শেষ নয়। কখনও কখনও অপরাধবোধও মানুষকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করে রাখে। আর মুক্তি আসে তখনই, যখন মানুষ সত্যিকে গ্রহণ করে, নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে এবং নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পায়।”

ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মেঘলার কণ্ঠ এল।

“দাদা, ঘুমাবি না?”

অয়ন টিকিটটি ডায়েরির মধ্যে রেখে দিল।

“আসছি।”

সে আলো নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরির শেষ পাতায় তখন আরেকটি বাক্য ফুটে উঠল—

‘শেষ ট্রেনটি আবার আসবে। তবে এবার তার যাত্রী জানে, কোন পথে তাকে ফিরতে হবে।’

বাইরে রাত গভীর হলো। শহর ঘুমিয়ে পড়ল। দূরে রেললাইনের ওপর দিয়ে একটি সাধারণ ট্রেন ছুটে গেল, তার জানালায় মানুষের মুখ, জীবনের ব্যস্ততা, আগামী দিনের আশা।

আর অন্ধকারের অনেক দূরে, এমন এক পথে যার অস্তিত্ব কোনও মানচিত্রে নেই, নীলচে-কালো ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

তার শেষ কামরায় ধূসর কোট পরা বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর সামনে রাখা খাতায় তিনি একটি নাম কেটে দিলেন—

‘অয়ন বসু — যাত্রা সম্পূর্ণ।’

তারপর নতুন একটি নাম লিখলেন।

ট্রেনের ঘড়িতে তখন রাত ১২টা ১৩ মিনিট।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী ((দ্বিতীয় পর্ব: স্মৃতিপুরের দুই মেঘলা))।

স্টেশনজুড়ে তখন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নীলচে-কালো ট্রেনটির প্রতিটি জানালায় যেন অসংখ্য মুখ ভেসে উঠছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, আবার কেউ নিঃশব্দে অয়নের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

অয়নের সামনে দাঁড়িয়ে দু’জন মেঘলা।

একজনের হাতে রক্তের দাগ লাগা ছাতা। তার চোখে আতঙ্ক, মুখে অসহায়তা। অন্যজনের পরনে সেই পরিচিত নীল সালোয়ার-কামিজ, যেটা পরে সাত বছর আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল মেঘলা। তার মুখে শান্ত হাসি।

“দাদা, আমার সঙ্গে চলো!” নীল পোশাকের মেয়েটি বলল। “এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তুমি আর কোনও দিন ফিরতে পারবে না।”

রক্তমাখা ছাতার মেয়েটি চিৎকার করে উঠল, “ওর কথা শুনিস না, অয়নদা! ও তোর স্মৃতি চুরি করতে এসেছে। ও মেঘলা নয়!”

অয়নের মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি মারছিল।

“তোমাদের মধ্যে আসল কে?” সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল।

দু’জনেই একসঙ্গে উত্তর দিল, “আমি!”

তারপর দু’জনেই এমন একটি কথা বলল, যা শুনে অয়নের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

“দাদা, মনে আছে, ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি—কখনও একা ছেড়ে যাবি না?”

এই কথাটি শুধু অয়ন আর মেঘলা জানত। মায়ের মৃত্যুর পর এক বর্ষার রাতে ছোট্ট মেঘলা ভয়ে অয়নের হাত আঁকড়ে ধরেছিল। অয়ন তাকে বুকে টেনে নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, জীবনে যা-ই ঘটুক, সে কখনও বোনকে একা ছেড়ে যাবে না।

দু’জনের চোখেই জল এসে গেল।

অয়ন পিছিয়ে গেল। “তোমরা যদি দু’জনেই সব জানো, তাহলে আমি কাকে বিশ্বাস করব?”

পেছন থেকে বৃদ্ধের কণ্ঠ ভেসে এল।

“যে মানুষকে আপনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তার স্মৃতিই আপনাকে সবচেয়ে সহজে প্রতারিত করতে পারে।”

অয়ন ঘুরে তাকাল। ধূসর কোট পরা বৃদ্ধটি প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটি পুরোনো পিতলের লণ্ঠন।

“আপনি কে?” অয়ন চিৎকার করে উঠল। “কেন আমাকে এখানে এনেছেন? আমার বোনের সঙ্গে কী হয়েছিল, সব খুলে বলুন!”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“আমি কাউকে এখানে আনি না। এই ট্রেন তাদেরই খুঁজে পায়, যারা নিজেদের অতীত থেকে পালিয়ে বেড়ায়। আপনি সাত বছর ধরে একটি রাতকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভুলে যাওয়া আর ক্ষমা পাওয়া এক জিনিস নয়।”

“আমি কী অপরাধ করেছি?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। শুধু অয়নের হাতে থাকা টিকিটটির দিকে তাকালেন।

টিকিটের গায়ে আগুনের মতো লাল অক্ষর ফুটে উঠল—

‘স্মৃতির দরজা খুলতে হলে, প্রথমে নিজের মুখোশ খুলুন।’

পরমুহূর্তেই টিকিটটি নিভে গেল। তার জায়গায় দেখা গেল একটি ছোট্ট কালো চাবি।

অয়ন অবাক হয়ে চাবিটি হাতে নিল।

“ওটা কোথায় নিয়ে যাবে?” সে প্রশ্ন করল।

বৃদ্ধ বললেন, “স্মৃতিপুরের পুরোনো বাড়িতে। যে বাড়িতে আপনার বোন শেষবার আপনার জন্য অপেক্ষা করেছিল।”


স্মৃতিপুর স্টেশন থেকে বেরিয়ে অয়ন দেখল, চারপাশে কুয়াশায় ঢাকা একটি অচেনা শহর। রাস্তার দু’পাশে পুরোনো বাড়ি, বন্ধ দোকান, ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট। অথচ সবকিছুর মধ্যে এমন একটা পরিচিত ভাব ছিল, যেন সে বহুবার এই রাস্তা দিয়ে হেঁটেছে।

দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারগুলিতে একই তারিখ—১৭ নভেম্বর ২০১৯।

প্রতিটি ঘড়িতে রাত ১২টা ১৩ মিনিট।

রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল একটি চায়ের দোকান। দোকানের ভেতরে বসে থাকা বৃদ্ধ চায়ের কাপ হাতে অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনেক দেরি করে ফেলেছেন, বাবু। মেয়েটা এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল।”

“কোন মেয়েটা?”

বৃদ্ধ উত্তর না দিয়ে দোকানের পেছনের দেওয়াল দেখালেন। সেখানে একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটা অংশ আটকে রয়েছে।

শিরোনামটি পড়ে অয়নের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

‘ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় তরুণীর মৃত্যু, নিখোঁজ যুবকের সন্ধান নেই।’

নিচে একটি অস্পষ্ট ছবি। ছবিতে দুর্ঘটনাগ্রস্ত একটি গাড়ি। পাশে পুলিশের ব্যারিকেড। আর ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটির মুখ অয়নের নিজের মুখের মতো।

সে কাগজটি ছিঁড়ে নামিয়ে আনল।

“এটা কী? এই খবর তো আমি কখনও দেখিনি!”

চায়ের দোকানের বৃদ্ধ এবার মুখ তুললেন।

“আপনি কীভাবে দেখবেন, বাবু? খবরের কাগজে যাঁর নিখোঁজ হওয়ার কথা লেখা ছিল, তিনি তো নিজেই নিজের খবর ছাপতে দেননি।”

“কী বলছেন আপনি?”

“সেই রাতে গাড়িতে দু’জন ছিল না। তিনজন ছিল।”

অয়নের হাত থেকে কাগজটি পড়ে গেল।

“তৃতীয় জন কে?”

বৃদ্ধ ঠোঁটে আঙুল রাখলেন।

“এই শহরে মৃতদের কথা জোরে বলতে নেই। তারা শুনে ফেললে নিজেদের স্মৃতি বদলে দেয়।”

কথাটি শেষ হতেই দোকানের আলো নিভে গেল। আবার জ্বলে উঠলে বৃদ্ধ আর সেখানে নেই। টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে তিনটি ভাঙা কাচের টুকরো। প্রতিটি টুকরোয় আলাদা আলাদা মুখের প্রতিবিম্ব।

একটিতে অয়নের মুখ।

একটিতে মেঘলার মুখ।

আর শেষ টুকরোটিতে এমন একজনের মুখ, যাকে অয়ন চিনতে পারল না।

কিন্তু সেই অচেনা মুখটির চোখের পাশে ছিল একটি পুরোনো কাটা দাগ।

কেন যেন দাগটি অয়নের কাছে ভীষণ পরিচিত মনে হলো।


কালো চাবিটি হাতে নিয়ে অয়ন এগিয়ে চলল। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে কিছুটা পথ যাওয়ার পর সে একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়িটির লোহার গেটে মরচে পড়েছে। বারান্দার জানালায় ধুলো জমে রয়েছে। অথচ সদর দরজার সামনে রাখা ফুলদানিতে সদ্য তোলা সাদা ফুল।

গেটের ওপর ছোট্ট একটি ফলকে লেখা—

‘বসু বাড়ি।’

অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল। এই বাড়িটি তাদের পুরোনো বাড়ি। বাবা চাকরির সূত্রে অন্য শহরে চলে যাওয়ার আগে এখানেই তারা থাকত। মেঘলার দুর্ঘটনার পর বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।

তাহলে স্মৃতিপুরে এই বাড়ি এল কীভাবে?

চাবিটি তালায় ঢোকাতেই দরজা খুলে গেল।

ভেতরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে অয়নের নাকে ভেসে এল পুরোনো কাঠ, ধুলো আর মেঘলার প্রিয় রজনীগন্ধার গন্ধ।

দেয়ালে তাদের পরিবারের ছবি। মায়ের কোলে ছোট্ট মেঘলা, পাশে কিশোর অয়ন। ছবিটির কাচে ফাটল ধরেছে। কিন্তু ছবির পেছনে কালো কালি দিয়ে লেখা একটি বাক্য অয়নের চোখে পড়ল—

‘সত্যিটা মনে পড়লে, ওকে ক্ষমা করতে পারবে তো?’

ঠিক তখনই ওপরের ঘর থেকে পায়ের শব্দ এল।

টুপ।

টুপ।

টুপ।

যেন কেউ ভেজা পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে।

অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রক্তমাখা ছাতার মেয়েটি—সেই মেঘলা, যে স্টেশনে তাকে সতর্ক করেছিল।

“দাদা,” সে ফিসফিস করে বলল, “তুই অবশেষে এসেছিস।”

অয়ন এগিয়ে যেতে গিয়েও থেমে গেল।

“তুই যদি আসল মেঘলা হোস, তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দে। দুর্ঘটনার রাতে তুই আমাকে ফোন করেছিলি কেন?”

মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।

“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম, তুই রাগ করবি। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগে তোর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম।”

“আর দুর্ঘটনা?”

মেয়েটি ঠোঁট কামড়ে ধরল।

“দুর্ঘটনাটা যেমন সবাই জানে, তেমন নয়।”

“তাহলে সত্যিটা কী?”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুই সেদিন শুধু আমার ফোন ধরিসনি, দাদা। তুই আমার কাছে এসেছিলি।”

অয়নের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।

“অসম্ভব! আমি তো সেদিন বাড়িতে ছিলাম!”

“তুই বাড়িতে ছিলি—এই কথাটাই তোকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।”

মেঘলা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। তার ভেজা পায়ের ছাপ মেঝেতে রক্তের মতো লাল হয়ে থাকল।

“দুর্ঘটনার আগে তুই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলি। তোর সঙ্গে আর একজন ছিল। তারপর গাড়িটা…”

সে কথা শেষ করতে পারল না। হঠাৎ বাড়ির সব দরজা-জানালা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটি চলতে শুরু করল।

১২টা ১৪।

১২টা ১৫।

১২টা ১৬।

সাত বছর পর প্রথমবার সময় এগোচ্ছে!

মেঘলা আতঙ্কে চিৎকার করল, “না! ও জেগে উঠছে!”

“কে?” অয়ন তার হাত ধরতে গেল।

কিন্তু মেঘলার হাত বরফের মতো ঠান্ডা। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের চামড়ায় ফাটল ধরতে শুরু করল। চোখের মণি কালো হয়ে গেল। সে অয়নের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল—

“দাদা, তুই মনে করতে পারছিস না, কারণ তুই নিজেকেই বাঁচাতে চেয়েছিলি!”

তারপর মেঘলার শরীর কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল।

অয়ন মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার কানে একের পর এক স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল।

বৃষ্টিভেজা রাস্তা।

গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে থাকা দুটো হাত।

পাশের আসনে মেঘলার কান্না।

আর পেছনের আসন থেকে ভেসে আসা এক পুরুষের কণ্ঠ—

“গাড়ি থামাও, অয়ন! তুমি কী করছ?”

অয়ন দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।

“না… না… আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম না…”

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতরের একটি বন্ধ ঘরের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি পুরোনো আয়না। আয়নার সামনে একটি চেয়ার, তার ওপর রাখা অয়নের পুরোনো সাংবাদিক পরিচয়পত্র। পাশে একটি রক্তমাখা মোবাইল ফোন।

ফোনটির পর্দা জ্বলে উঠল।

একটি পুরোনো অডিও রেকর্ডিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হলো।

প্রথমে বৃষ্টির শব্দ। তারপর মেঘলার কণ্ঠ—

“দাদা, প্লিজ গাড়িটা থামা!”

তারপর অয়নের নিজের কণ্ঠ শোনা গেল।

“তুই আমাকে বাধ্য করেছিস, মেঘলা!”

এরপর একটি ধাক্কার শব্দ।

কাচ ভাঙার আওয়াজ।

আর সবশেষে সেই অচেনা পুরুষের কণ্ঠ—

“অয়ন, তুমি ওকে মেরে ফেলেছ!”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

অয়ন অবিশ্বাসের চোখে ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত না এই কণ্ঠ কার। কিন্তু নিজের কণ্ঠ সে চিনতে পেরেছে।

ঠিক তখনই আয়নার ভেতর থেকে আরেকজন অয়ন বেরিয়ে আসার মতো করে সামনে ঝুঁকে পড়ল।

আয়নার ওপারের অয়নের কপালে রক্ত। চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে আছে। সে কাচের ওপার থেকে ফিসফিস করে বলল—

“তুমি সত্যিটা জানতে চাও? তাহলে মনে রাখো, মেঘলা একা মারা যায়নি।”

অয়ন কাঁপতে কাঁপতে আয়নার কাছে এগিয়ে গেল।

“তাহলে আর কে মারা গিয়েছিল?”

আয়নার ওপারের অয়ন ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে বলল—

“যে মানুষটাকে তুমি সাত বছর ধরে মৃত বলে বিশ্বাস করে এসেছ, সে আজও তোমার বাড়িতে ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে।”

হঠাৎ আয়নায় ফাটল ধরল।

ফাটলের ওপারে দেখা গেল সেই নীলচে-কালো ট্রেনের একটি কামরা। কামরার জানালার পাশে বসে রয়েছে ধূসর কোট পরা বৃদ্ধ। তাঁর বিপরীতে একটি খালি আসন।

সেই আসনের ওপর রাখা একটি নামফলকে লেখা—

‘অয়ন বসু।’

আর আসনের নিচে রক্তমাখা অক্ষরে ফুটে উঠল আরেকটি বাক্য—

‘পরবর্তী যাত্রী: যে এখনও বেঁচে আছে।’

বাড়ির বাইরে তখন ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে।

অয়ন জানালার কাছে ছুটে গেল। কুয়াশার মধ্যে সে দেখল, রাস্তার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে নীল পোশাকের সেই মেঘলা। তার পাশে আরেকজন মানুষ।

মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু তার ডান চোখের পাশে রয়েছে একটি পুরোনো কাটা দাগ।

অয়নের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

কারণ সেই দাগটি তার নিজের মুখেও ছিল—শৈশবের এক দুর্ঘটনার স্মৃতি, যা সে কোনও দিন কাউকে বলেনি।

তাহলে ওই মানুষটি কে?

আর যদি সেই মানুষটি অয়ন নিজেই হয়, তাহলে এই বাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা অয়ন কে?

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল।

“এবার বুঝতে পারছেন, অয়নবাবু? স্মৃতিপুরে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি ‘কে মারা গেছে’ নয়।”

অয়ন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

বৃদ্ধের চোখে এবার আর কোনও মমতা নেই।

“সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি হলো—যে আপনার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে, সে আসলে কে?”

বাইরে ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

আর অয়নের মোবাইল ফোনে একটি নতুন বার্তা এসে পৌঁছল।

প্রেরকের নাম দেখে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

প্রেরক: মেঘলা বসু।

বার্তায় লেখা—

‘দাদা, আমি এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু ট্রেনটা আমাকে খুঁজছে। আমাকে বাঁচাতে হলে, আগামী রাত ১২টা ১৩ মিনিটের আগে তোমাকে নিজের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে হবে।’

অয়ন বার্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ ফোনের পর্দা কালো হয়ে গেল।

সেই কালো পর্দায় ভেসে উঠল অয়নের নিজের মুখ।

কিন্তু প্রতিবিম্বটি হাসছিল।

আর অয়ন নিজে কাঁদছিল।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী ((প্রথম পর্ব: যে ট্রেনটি কোনও স্টেশনে থামে না))।

রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

শিয়ালদহ স্টেশনের প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল সাংবাদিক অয়ন বসু। সারাদিনের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অফিস থেকে বেরোতে দেরি হয়ে যাওয়ায় শেষ লোকাল ট্রেনটি ধরতে পারেনি।

স্টেশনের ঘড়িতে মিনিটের কাঁটা এগিয়ে চলেছে। দূরে কয়েকটি দোকান বন্ধ হচ্ছে। চায়ের দোকানের মালিক শেষবারের মতো কেটলি নামিয়ে রাখছেন। ঘোষণার মাইকে ভেসে আসছে অস্পষ্ট কিছু শব্দ।

অয়ন ফোন বের করে দেখল, পরের ট্রেনের জন্য এখনও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন, “বাড়ি ফিরবেন?”

অয়ন ফিরে তাকাল।

বৃদ্ধের পরনে ধূসর রঙের কোট। হাতে একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ। চোখে মোটা কাচের চশমা। বয়স সত্তরের কাছাকাছি হবে।

“হ্যাঁ,” অয়ন বলল। “কিন্তু শেষ ট্রেনটা মিস করেছি।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“সব শেষ ট্রেন মিস করা যায় না, বাবু। কোনও কোনও ট্রেন নিজেই যাত্রী খুঁজে নেয়।”

কথাটার অর্থ বুঝতে না পেরে অয়ন হাসল।

“আপনি কি কোনও বিশেষ ট্রেনের কথা বলছেন?”

বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তের দিকে তাকালেন।

“রাত ১২টা ১৩ মিনিটে একটা ট্রেন আসবে। সেটাতে উঠলে আপনি বাড়ি পৌঁছে যাবেন।”

“কিন্তু এই রুটে তো রাত বারোটার পর আর ট্রেন নেই!”

“সবার জন্য নেই।”

বৃদ্ধ আর কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করলেন। কয়েক পা এগিয়ে থেমে আবার ফিরে তাকালেন।

“একটা কথা মনে রাখবেন। ট্রেনে উঠে কখনও নিজের গন্তব্যের নাম বলবেন না। আর যদি কোনও যাত্রী আপনাকে আপনার মৃত আত্মীয়ের নাম ধরে ডাকে, উত্তর দেবেন না।”

অয়ন কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ ভিড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।


রাত ১২টা ১২ মিনিট।

প্ল্যাটফর্ম প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা। নিরাপত্তারক্ষীও দূরের একটি বেঞ্চে বসে ঝিমোচ্ছেন। অয়ন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল, বৃদ্ধ হয়তো কোনও পাগলাটে ভবঘুরে।

ঠিক তখনই রেললাইনের ওপার থেকে একটি হুইসেল শোনা গেল।

অয়ন চমকে তাকাল।

কুয়াশার মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে একটি ট্রেন এগিয়ে আসছে। পুরোনো ধাঁচের নীল-কালো কামরা। জানালার কাচগুলো ধুলোয় ঢাকা। ইঞ্জিনের সামনে কোনও স্পষ্ট নম্বর নেই।

ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

কোনও ঘোষণা হল না।

কোনও গার্ডের বাঁশি শোনা গেল না।

দরজাগুলো একে একে খুলে গেল।

অয়ন নিজের ঘড়ি দেখল।

১২টা ১৩ মিনিট।

প্রথম কামরায় উঠতেই তার মনে হল, সে যেন অন্য কোনও সময়ে প্রবেশ করেছে। কামরার ভেতরে পুরোনো কাঠের আসন, মাথার ওপর হলুদ আলো, আর জানালার পাশে বসে থাকা কয়েকজন যাত্রী।

একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা কোলে একটি শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। বিপরীত দিকে এক যুবক সংবাদপত্র পড়ছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ, হাতে সেই একই চামড়ার ব্যাগ।

প্ল্যাটফর্মে দেখা বৃদ্ধ!

অয়ন তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।

“আপনি এখানে কীভাবে এলেন?”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু নিজের পাশের আসনটি দেখিয়ে বললেন, “বসুন।”

অয়ন বসে পড়ল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

জানালার বাইরে প্রথমে স্টেশনের আলো দেখা যাচ্ছিল। তারপর দোকানপাট, রাস্তা, বাড়িঘর সব পিছিয়ে যেতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাইরে ঘন অন্ধকার।

অয়ন ফোন বের করল। কোনও নেটওয়ার্ক নেই। সময় দেখাচ্ছে ১২টা ১৩ মিনিট।

সে ভ্রু কুঁচকে আবার ঘড়ির দিকে তাকাল।

সময় একটুও এগোচ্ছে না।

“আপনার ঘড়ি কি বন্ধ হয়ে গেছে?” সে বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করল।

“এই ট্রেনে সময় সবার জন্য একইভাবে চলে না,” বৃদ্ধ বললেন।

“মানে?”

“আপনি যতক্ষণ নিজের গন্তব্যের কথা ভাববেন, ততক্ষণ এই ট্রেন আপনাকে নিয়ে চলবে। কিন্তু আপনি যদি নিজের জীবনের শেষ স্টেশনের কথা মনে করতে পারেন, তাহলে বুঝবেন কেন আপনাকে এখানে উঠতে হয়েছে।”

অয়ন বিরক্ত হয়ে উঠল।

“দেখুন, আমি শুধু বাড়ি ফিরতে চাই। এই ধরনের ধাঁধার কোনও অর্থ আমার কাছে নেই।”

বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, “আপনি কি সত্যিই বাড়ি ফিরতে চান? নাকি এমন একজনের কাছে ফিরতে চান, যার কাছে আপনি সাত বছর ধরে ক্ষমা চাইতে পারেননি?”

অয়নের মুখের রং বদলে গেল।

সাত বছর।

ঠিক সাত বছর আগে তার ছোট বোন মেঘলা মারা গিয়েছিল।

একটি সড়ক দুর্ঘটনায়।

সেই রাতে মেঘলা তাকে ফোন করেছিল। তাদের মধ্যে সামান্য ঝগড়া হয়েছিল। অয়ন রাগের মাথায় ফোন কেটে দিয়েছিল। পরে আর ফোন ধরেনি।

রাতেই দুর্ঘটনা।

তারপর থেকে অয়ন কখনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি।

কিন্তু এই বৃদ্ধ সে কথা জানলেন কীভাবে?

“আপনি কে?” অয়ন কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল।

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার অন্য প্রান্ত থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“দাদা?”

অয়ন যেন পাথর হয়ে গেল।

কণ্ঠটি সে চেনে।

প্রতিদিনের মতো চেনে।

“দাদা, তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?”

অয়ন ধীরে ধীরে মাথা ঘোরাল।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। সাদা সালোয়ার-কামিজ। কাঁধ পর্যন্ত চুল। চোখে পরিচিত দুষ্টুমি মেশানো হাসি।

মেঘলা।

তার মৃত বোন।

অয়নের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

“মেঘলা?”

মেয়েটি এক পা এগিয়ে এল।

“এতদিন পরে আমাকে চিনতে পারলে?”

অয়নের চোখ ভিজে উঠল। সে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও পারল না। যেন পায়ের নিচে মেঝে শক্ত হয়ে গেছে।

“তুই… তুই এখানে কী করে?”

মেঘলা হাসল না। তার চোখে এবার গভীর বিষণ্ণতা।

“তুমি তো সেদিন আমার ফোন ধরোনি, দাদা।”

অয়নের মাথার ভেতর যেন হাজারটা শব্দ একসঙ্গে বাজতে লাগল।

“আমি জানতাম না, তোর সঙ্গে এমন হবে। আমি রাগ করে…”

“আমি জানি,” মেঘলা বলল। “কিন্তু তুমি কি জানো, আমি সেদিন তোমাকে কী বলতে চেয়েছিলাম?”

অয়ন উত্তর দিতে পারল না।

মেঘলা ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

“আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম, আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে নয়। নিজের জীবনের একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে। আমি চেয়েছিলাম, তুমি আমার পাশে থাকো।”

অয়নের বুকের মধ্যে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল।

“কোথায় চলে যাচ্ছিলি?”

“যে শহরে তুমি কখনও যাওনি।”

মেঘলার উত্তর শুনে অয়ন আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল।

“কী বলছিস তুই?”

মেঘলা পকেট থেকে একটি ছোট কাগজ বের করল। তাতে লেখা—

“শেষ ট্রেন। যাত্রার তারিখ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯।”

অয়ন কাগজটির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

সেদিনই তো মেঘলার দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

কিন্তু কাগজের নিচে আরও একটি লাইন ছিল—

“যাত্রী: অয়ন বসু। গন্তব্য: অজ্ঞাত।”

“এটা কী?” অয়ন ফিসফিস করে বলল।

মেঘলা তার চোখের দিকে তাকাল।

“তুমি কি সত্যিই মনে করতে পারছ না, দাদা? দুর্ঘটনার রাতে শুধু আমি একা রাস্তায় ছিলাম না।”

অয়নের মাথার ভেতর হঠাৎ একটি দৃশ্য ঝলসে উঠল।

বৃষ্টিভেজা রাস্তা।

হেডলাইটের তীব্র আলো।

একটি বিকট শব্দ।

আর কারও চিৎকার—

“অয়নদা, সাবধান!”

সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।

“না… না, এটা সত্যি নয়!”

মেঘলা তার কাঁধে হাত রাখল।

“সত্যি কী, সেটা তোমাকে নিজেকেই মনে করতে হবে।”

ঠিক তখন ট্রেনের আলো একবার দপ করে নিভে আবার জ্বলে উঠল।

কামরার সমস্ত যাত্রী একসঙ্গে অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে।

সংবাদপত্র পড়া যুবক ধীরে ধীরে কাগজটি নামাল। তার মুখে চোখ-নাক কিছুই নেই—শুধু মসৃণ ফ্যাকাশে চামড়া।

কোলে শিশুকে নিয়ে বসে থাকা মহিলার শিশুটি চোখ খুলল। তার চোখের মণি নেই, শুধু গভীর কালো দুটি গর্ত।

দরজার কাছে দাঁড়ানো বৃদ্ধ এবার উঠে দাঁড়ালেন।

“সময় হয়ে এসেছে,” তিনি বললেন।

“কিসের সময়?” অয়ন চিৎকার করে উঠল।

বৃদ্ধ নিজের পকেট থেকে একটি পুরোনো টিকিট বের করে অয়নের হাতে দিলেন।

“আপনার নামের টিকিট।”

টিকিটে লেখা—

যাত্রী: অয়ন বসু।

ট্রেন: শেষ যাত্রা।

প্রস্থান: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রাত ১২টা ১৩ মিনিট।

ফেরার টিকিট: নেই।

অয়ন টিকিটটি ছুড়ে ফেলে দিতে গেল, কিন্তু কাগজটি তার হাতের সঙ্গে লেগে রইল।

মেঘলা এবার তার সামনে এসে দাঁড়াল।

“দাদা, তোমার মনে আছে, দুর্ঘটনার পরে সবাই বলেছিল তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছিলে?”

অয়ন ধীরে মাথা নাড়ল।

“কিন্তু সেটা পুরো সত্যি নয়,” মেঘলা বলল। “তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলে ঠিকই। কিন্তু তুমি নিজেও সেই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলে।”

কথাটা শুনে অয়নের চারপাশের পৃথিবী যেন থেমে গেল।

সে পিছিয়ে যেতে যেতে দরজার কাছে পৌঁছল। বাইরে তাকিয়ে দেখল, ট্রেনটি কোনও রেললাইনে চলছে না।

চারদিকে অন্ধকার।

অন্ধকারের মধ্যে ভাসছে অসংখ্য আলো—যেন দূর থেকে কেউ শত শত প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে।

বৃদ্ধ বললেন, “এই ট্রেনে যারা ওঠে, তারা সবাই কোনও না কোনও অসমাপ্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আসে। কেউ শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখতে চায়। কেউ নিজের অপরাধের বিচার চায়। আর কেউ জানতে চায়, মৃত্যুর পরে কী থাকে।”

অয়ন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি কি মৃত?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

মেঘলা তার হাত ধরল।

“তুমি যদি সত্য জানতে চাও, তাহলে পরের স্টেশনে নামতে হবে।”

“কিন্তু পরের স্টেশন কোথায়?”

মেঘলা জানালার বাইরে তাকাল।

অন্ধকারের মধ্যে একটি বোর্ড ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

সেখানে সাদা অক্ষরে লেখা—

‘স্মৃতিপুর—যেখানে মৃতেরা নিজেদের শেষ দিনটি বারবার বাঁচে।’

ট্রেনের গতি কমতে লাগল।

দূরে একটি স্টেশনের আলো ফুটে উঠল।

অয়ন মেঘলার হাত শক্ত করে ধরল।

কিন্তু ঠিক তখনই বৃদ্ধ তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বললেন—

“একটা কথা ভুলবেন না। আপনার বোনকে বিশ্বাস করতে পারেন। কিন্তু তার মুখের আড়ালে যে স্মৃতি লুকিয়ে আছে, তাকে নয়।”

অয়ন ঘুরে তাকাল।

বৃদ্ধের মুখে এবার আর কোনও চোখ নেই।

শুধু দুটি কালো গর্ত।

আর সেই অন্ধকারের গভীর থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ—

“কারণ আপনার বোন সেই রাতে মারা যায়নি।”

ট্রেন থেমে গেল।

দরজা খুলে গেল।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলার মতো দেখতে আরেকজন নারী।

তার হাতে একটি রক্তমাখা ছাতা।

সে অয়নের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল—

“দাদা, ওর সঙ্গে যেও না! আমি আসল মেঘলা!”

আর ঠিক তখনই অয়নের হাতে ধরা টিকিটটি আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত মানুষের শেষ চিঠি ((তৃতীয় ও শেষ পর্ব: যে মানুষটি নিজের মৃত্যুকে ভুলে গিয়েছিল))।

“তোমার জীবনের যে ইতিহাস তুমি এত বছর ধরে জেনে এসেছ, তার প্রতিটি পাতাই হয়তো অন্য কারও লেখা।”

বাবার কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পরও কথাগুলো ঋত্বিকের মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল।

গবেষণাগারের সতেরো নম্বর ঘরে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারছিল না, কোনটা বিশ্বাস করবে। তার শৈশবের স্মৃতি? বাবার ডায়েরি? অনিরুদ্ধের শেষ চিঠি? নাকি সেই ভিডিও, যেখানে আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মুখ তার নিজের মতো?

সে কম্পিউটারের সামনে গিয়ে বসল। পর্দায় এখনও লেখা—তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে আর ২৪ ঘণ্টা বাকি।

“তৃতীয় পর্যায় বলতে কী বোঝায়?” সে স্পিকারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।

কয়েক সেকেন্ড পর বাবার কণ্ঠ ফিরে এল।

“তৃতীয় পর্যায় হল স্মৃতি পুনর্গঠনের শেষ ধাপ। তোমার মস্তিষ্কের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য এই ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তোমাকে কিছু বলার আগে একটা বিষয় বুঝতে হবে—এই ব্যবস্থাটি তোমার বাবার সম্পূর্ণ চেতনা নয়। এটি তাঁর সংরক্ষিত স্মৃতি ও সিদ্ধান্তের একটি সীমিত প্রতিলিপি। আমি সব প্রশ্নের উত্তর জানি না।”

“তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে না?”

“পারব। কিন্তু তোমাকে আমার কথাও যাচাই করতে হবে।”

ঋত্বিক কম্পিউটারের ফাইলগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল। একের পর এক নথি খুলে যেতে লাগল। কোথাও মস্তিষ্কের সংকেতের বিশ্লেষণ, কোথাও পরীক্ষার বিবরণ, কোথাও রোগীদের নাম। তারপর একটি ভিডিও ফাইল তার চোখে পড়ল।

নাম—LAST_NIGHT_11012002।

ভিডিও চালু হতেই একটি হাসপাতালের ঘর দেখা গেল।

বিছানায় শুয়ে রয়েছে ছয় বছরের একটি শিশু। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইনের নল। বিছানার পাশে বসে কাঁদছেন এক মহিলা।

ঋত্বিক মহিলাকে চিনতে পারল।

তার মা মাধবী।

বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুটিও সে নিজেই।

ভিডিওর তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০০২।

ঋত্বিকের জানা ইতিহাস অনুযায়ী, সেদিন তার বাবা মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বাবা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলছেন।

চিকিৎসক বলছেন, “শিশুটির স্মৃতিশক্তি ফিরে আসতে পারে। তবে দুর্ঘটনার মানসিক আঘাতের কারণে কিছু ঘটনা সে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে পারে।”

বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, “যদি সেই স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনা হয়?”

চিকিৎসক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“স্মৃতি ফিরিয়ে আনা আর স্মৃতি বদলে দেওয়া এক জিনিস নয়, মিস্টার মুখার্জি। আপনার ছেলে কী দেখেছে, কী অনুভব করেছে, তা আমরা পুরোপুরি জানি না। কোনও পরীক্ষার মাধ্যমে তার মনে নির্দিষ্ট একটি ইতিহাস বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বিপজ্জনক।”

ভিডিওতে বাবা চুপ করে গেলেন।

তারপর বললেন, “আমি শুধু চাই, ও যেন বেঁচে থাকতে পারে।”

ভিডিও শেষ।

ঋত্বিক দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তাহলে ২০০২ সালে সে হাসপাতালে ছিল। তার বাবা তখনও জীবিত। কিন্তু পরে পরিবারের সবাই বলেছে, বাবা মারা গিয়েছিলেন সেই দিনই।

তাহলে বাবার মৃত্যু নিয়ে মিথ্যে বলা হয়েছিল কেন?

সে অন্য একটি ফাইল খুলল।

সেখানে হাসপাতালের মৃত্যুসনদ, একটি সংবাদপত্রের কাটিং এবং বাবার মৃত্যুর নথি রয়েছে। সব কাগজেই একই তারিখ—১১ জানুয়ারি ২০০২।

কিন্তু ভিডিওতে বাবা জীবিত।

হঠাৎ তার মাথায় একটা সম্ভাবনা এল।

বাবা হয়তো সেই দিনই মারা যাননি। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে প্রচলিত ইতিহাস অন্য কোনও কারণে তৈরি করা হয়েছিল।

স্পিকার থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।

“ঋত্বিক, তুমি এখন যে নথিগুলো দেখছ, সেগুলোর কিছু সত্য, কিছু অসম্পূর্ণ। দুর্ঘটনার পর তোমার বাবা দীর্ঘদিন গবেষণাগারে কাজ করেছিলেন। তিনি তোমার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ২০০৪ সালে একটি পরীক্ষার সময় আগুন লাগে। সেই ঘটনায় গবেষণাগারের কয়েকজন কর্মী মারা যান। তোমার বাবা গুরুতর আহত হন। কিছুদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।”

ঋত্বিক বলল, “তাহলে ২০০২ সালের মৃত্যুসনদ?”

“সেটি তৈরি করা হয়েছিল তোমার পরিচয় ও চিকিৎসার গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য। তোমার বাবা ভুল করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তোমাকে দুর্ঘটনার সত্য থেকে দূরে রাখলে তুমি স্বাভাবিক জীবন পাবে।”

“আর অনিরুদ্ধ?”

“অনিরুদ্ধ তোমার বাবার গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল না প্রথম থেকেই। পরে সে পুরোনো নথি খুঁজে পায়। সে জানতে পারে, তোমার শৈশবের স্মৃতির কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই সে তোমাকে সত্য জানাতে চেয়েছিল।”

ঋত্বিকের চোখে জল এসে গেল।

অনিরুদ্ধ শুধু তার বন্ধু ছিল না। সে এমন একটি সত্যের সন্ধান করছিল, যা ঋত্বিকের নিজের জীবনকে বদলে দিতে পারে।

আর সেই সত্যের জন্যই হয়তো তাকে মরতে হয়েছে।


ঋত্বিক গবেষণাগারের ভেতরে আরও খোঁজ করতে লাগল। একটি লোহার আলমারিতে সে পেল কয়েকটি পুরোনো অডিও ক্যাসেট। প্রতিটি ক্যাসেটের গায়ে তারিখ লেখা। শেষ ক্যাসেটটির গায়ে লেখা—

“রুদ্রের স্মৃতি—সম্পূর্ণ রেকর্ড।”

ঋত্বিক ক্যাসেটটি চালাল।

প্রথমে কিছু অস্পষ্ট শব্দ। তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ।

“দাদা, তুমি দরজা খুলছ না কেন?”

ঋত্বিকের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে কণ্ঠটি চিনতে পেরেছে।

এটি সেই শিশুর কণ্ঠ, যে ভিডিওতে আগুনের ঘরের ভেতরে ছিল।

তারপর আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল। সেটি ঋত্বিকের নিজের শৈশবের কণ্ঠ।

“রুদ্র, ভয় পাস না। আমি বাবাকে ডাকতে যাচ্ছি।”

তারপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

রুদ্র চিৎকার করছে।

“দাদা! দরজা খুলে দাও! দাদা!”

তারপর কাশির শব্দ, ভাঙা কাচের আওয়াজ, এবং হঠাৎ নিস্তব্ধতা।

ঋত্বিক ক্যাসেট থামিয়ে দিল।

তার চোখের সামনে যেন একটি দৃশ্য তৈরি হতে লাগল।

একটি ছোট ঘর। দেওয়ালের পাশে রাখা রাসায়নিকের বোতল। একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। রুদ্র ঘরের ভেতরে আটকে পড়েছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে।

কিন্তু তার মনে পড়ল না, দরজাটি সে কেন বন্ধ করেছিল।

সে কি ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল? নাকি কাউকে বাঁচাতে দরজা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল?

আরও একটি ফাইল খুলতেই উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল।

ফাইলটির নাম—RUDRA_INCIDENT_REPORT।

প্রতিবেদনে লেখা, আগুন লাগার সময় গবেষণাগারের একটি পরীক্ষামূলক কক্ষের দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দরজার তালা আটকে যায়। বাইরে থেকে সেটি খোলা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার সময় ঋত্বিক সেখানে ছিল। তার স্মৃতিতে কিছু অংশ পরস্পরবিরোধীভাবে রয়ে গিয়েছিল। দুর্ঘটনার পর মানসিক আঘাতের কারণে সে দীর্ঘদিন কথা বলতে চাইত না, রাতে চিৎকার করে উঠত, এবং রুদ্রের কথা বললে আতঙ্কিত হয়ে পড়ত।

বাবা তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে স্মৃতির চিকিৎসা করবেন। কিন্তু চিকিৎসার সীমা অতিক্রম করে তিনি পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। তাতে ঋত্বিকের স্মৃতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

রুদ্রের স্মৃতি, ঋত্বিকের অপরাধবোধ এবং গবেষণার যন্ত্রে সংরক্ষিত তথ্য একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।

সেই মিশ্র তথ্য থেকেই তৈরি হয়েছিল রুদ্রের মতো কথা বলা একটি প্রতিক্রিয়া—যা পরে ঋত্বিকের কাছে নিজের ভাইয়ের অস্তিত্বের প্রমাণ বলে মনে হয়।

তবে একটি প্রশ্ন থেকেই গেল।

ঋত্বিক কি সত্যিই রুদ্রকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল?

নাকি সে কোনওভাবে দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে তাকে শেষ ভিডিওটি দেখতে হবে।


ভিডিওর ফাইলটি লুকানো ছিল একটি পাসওয়ার্ডের আড়ালে। ঋত্বিক অনেক চেষ্টা করেও খুলতে পারল না। শেষে তার চোখ পড়ল ছবির পেছনে লেখা তারিখের দিকে—১৭ জুলাই ২০০৪।

সে তারিখটি পাসওয়ার্ড হিসেবে দিল।

ফাইল খুলে গেল।

ভিডিওতে দেখা গেল, অমল মুখার্জি একটি টেবিলের সামনে বসে আছেন। তাঁর মুখ ক্লান্ত, চোখের নিচে কালি। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“আজ ১৭ জুলাই ২০০৪। আমি জানি না, এই রেকর্ড কখনও কেউ দেখবে কি না। যদি ঋত্বিক দেখে, তাহলে আমার কথা মন দিয়ে শুনিস, বাবা।”

অরিত্রের মতো দেখতে নয়, একেবারে তার নিজের বাবার কণ্ঠ।

“রুদ্রের মৃত্যুর জন্য তুই দায়ী নোস। দুর্ঘটনার সময় তুই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইছিলি। দরজাটি তুই বন্ধ করিসনি। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরে সেটি নিজে থেকেই আটকে গিয়েছিল। তুই বারবার দরজা খোলার চেষ্টা করেছিলি। কিন্তু ছোট্ট হাত দিয়ে পারিসনি।”

ঋত্বিকের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

বাবা বলতে থাকলেন—

“তোর মনে সেই দৃশ্য বারবার ফিরে আসত। তুই নিজেকে দোষ দিতিস। আমি তোকে বোঝাতে পারিনি, দুর্ঘটনার জন্য তুই দায়ী নোস। তার বদলে আমি তোর স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা করেছি। আমি ভেবেছিলাম, যন্ত্রণার স্মৃতি মুছে দিলে তুই মুক্তি পাবি। কিন্তু আমি বুঝিনি, স্মৃতি মুছে দেওয়া মানে কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে সত্যকেও মুছে ফেলা।”

বাবা কিছুক্ষণ থামলেন।

“অনিরুদ্ধ যখন সত্যিটা জানতে পারে, তখন আমি তাকে সাহায্য করতে বলেছিলাম। কিন্তু সে আমার পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিল। সে বলেছিল, তোর স্মৃতি তোর নিজের অধিকার। আমি তাকে থামাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত সে তোর কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।”

ভিডিওর শেষে বাবা বললেন—

“ঋত্বিক, রুদ্রকে ফিরিয়ে আনার কোনও যন্ত্র নেই। তার কণ্ঠের প্রতিলিপি তৈরি করা যায়, তার স্মৃতির কিছু অংশ সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু সেগুলো রুদ্র নয়। তুই তাকে ভালোবাসতিস। সে তোকে ভালোবাসত। সেই সত্যটুকু কোনও প্রযুক্তি মুছে দিতে পারবে না।

আর একটা কথা—নিজেকে ক্ষমা করিস। তুই তখন শিশু ছিলি। যা করতে পারিসনি, তার জন্য সারাজীবন নিজেকে শাস্তি দিস না।”

ভিডিও শেষ হওয়ার পর ঋত্বিক অনেকক্ষণ কাঁদল।

এত বছর ধরে সে নিজের অজান্তেই এমন একটি অপরাধের বোঝা বহন করছিল, যে অপরাধ সে করেনি।


কিন্তু রহস্যের শেষ তখনও হয়নি।

কম্পিউটারের পর্দায় হঠাৎ একটি নতুন বার্তা ফুটে উঠল।

“তৃতীয় পর্যায় শুরু করার সময় হয়েছে।”

ঋত্বিক দ্রুত উঠে দাঁড়াল।

“এটা কীভাবে চালু হল?”

স্পিকারে বাবার কণ্ঠ শোনা গেল।

“তৃতীয় পর্যায়ের সময় নির্ধারণ করা ছিল। তুমি সব নথি দেখার পর ব্যবস্থাটি তোমাকে একটি শেষ পরীক্ষা দেখাবে। তুমি চাইলে সেটি বন্ধ করতে পারো।”

“পরীক্ষাটা কী?”

“তোমার সামনে রুদ্রের একটি পূর্ণ স্মৃতি-প্রতিলিপি হাজির করা হবে। সেটি তোমার সঙ্গে কথা বলবে, তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবে। কিন্তু মনে রেখো, সেটি রুদ্র নয়। সেটি সংরক্ষিত তথ্য থেকে তৈরি একটি প্রতিক্রিয়া।”

ঋত্বিক কাচের বাক্সটির দিকে তাকাল।

তার ভেতরে আলো জ্বলে উঠেছে।

একটি ছোট ছেলের অবয়ব ধীরে ধীরে ফুটে উঠল। ছয় বছরের রুদ্র। তার পরনে নীল জামা, মুখে সেই পরিচিত হাসি।

“দাদা?”

ঋত্বিকের বুকের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা যেন এক মুহূর্তে ফিরে এল।

“রুদ্র…”

“তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?” শিশুটি জিজ্ঞাসা করল। “আমি তোমাকে খুঁজছিলাম।”

ঋত্বিক চোখ বন্ধ করল। সে জানে, এই কণ্ঠ তার ভাইয়ের প্রকৃত চেতনা নয়। তবু স্মৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা সেই পরিচিত স্বর তাকে ভেঙে দিচ্ছিল।

“আমি দুঃখিত, রুদ্র,” সে বলল। “আমি তোকে বাঁচাতে পারিনি।”

শিশুটি মাথা নাড়ল।

“তুমি তো চেষ্টা করেছিলে। বাবা বলেছে।”

ঋত্বিক কেঁদে ফেলল।

“তুই কি আমাকে ক্ষমা করেছিস?”

শিশুটি মৃদু হাসল।

“তুমি নিজেকে ক্ষমা করলেই হবে, দাদা।”

কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরটি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তারপর শিশুটির অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করল।

ঋত্বিক হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু কাচের বাক্সের ওপারে কিছুই স্পর্শ করতে পারল না।

“রুদ্র, আর একবার বল—তুই আমাকে ক্ষমা করেছিস।”

কোনও উত্তর এল না।

শুধু পর্দায় একটি শেষ বার্তা দেখা গেল—

“স্মৃতি সংরক্ষণ সম্পূর্ণ। তৃতীয় পর্যায় সমাপ্ত।”

ঋত্বিক কম্পিউটারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিল। গবেষণাগারের সমস্ত যন্ত্র একে একে নিভে গেল।

সে জানত, এই জায়গায় আর ফিরে আসবে না।


পরদিন ঋত্বিক পুলিশের কাছে গেল। অনিরুদ্ধের মৃত্যুর আগে পাওয়া নথি, গবেষণাগারের ভিডিও এবং বাবার রেকর্ডিং জমা দিল। অনিরুদ্ধের মৃত্যুর তদন্ত নতুন করে শুরু হল। তদন্তকারীরা জানতে পারলেন, সে এমন কিছু তথ্য আবিষ্কার করেছিল, যা কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।

ঋত্বিকের বাবার গবেষণার নথিও প্রকাশ্যে এল। সেই গবেষণা থেকে মানুষের স্মৃতি বদলে দেওয়ার যে বিপজ্জনক চেষ্টা হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হল।

তবে রুদ্রকে ফিরিয়ে আনার কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটল না।

রুদ্রের ঘরটি বহু বছর আগেই শূন্য হয়ে গিয়েছিল। তার খেলনাগুলো আর নেই। তার ছোট জামাগুলো নেই। শুধু ঋত্বিকের স্মৃতির ভেতরে রয়ে গেল একটি শিশু, যে তাকে দাদা বলে ডাকত।

কয়েক মাস পর ঋত্বিক বাড়ির পুরোনো আলমারি সরিয়ে সেই গোপন ঘরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিল। কিন্তু ডায়েরিটি ফেলে দিল না। সে সেটি সংরক্ষণ করল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।

অনিরুদ্ধের সমাধিতে একদিন সে একটি চিঠি রেখে এল।

চিঠিতে লিখল—

“তুই সত্যিটা আমাকে জানিয়েছিলি। আমি দেরিতে হলেও তা বুঝেছি। তোর মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার হোক। আর তোর বন্ধুত্বের ঋণ আমি কোনওদিন ভুলব না।”

তারপর সে রুদ্রের সমাধির কাছে গেল।

সেখানে কোনও বড় কথা বলল না। শুধু কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

বহু বছর পর সেদিন রাতে ঋত্বিক প্রথমবার কোনও দুঃস্বপ্ন ছাড়া ঘুমাল।

রাত ৩টা ১৩ মিনিটে তার ফোন একবার বেজে উঠেছিল।

সে ঘুমের মধ্যেই শব্দটি শুনেছিল কি না, সে জানে না। সকালে ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখল, কোনও কল আসেনি।

তবে ফোনের পাশে একটি ছোট কাগজ পড়ে ছিল।

সেখানে শিশুর হাতের লেখার মতো অক্ষরে লেখা—

“দাদা, এবার ভালো থেকো।”

ঋত্বিক কাগজটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।

সে জানত না, কাগজটি কখন সেখানে এল। হয়তো বহুদিন আগে লেখা কোনও পুরোনো কাগজ, যা অ্যালবামের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হয়তো তার নিজের মনের তৈরি একটি শেষ স্মৃতি।

কিন্তু এবার সে আর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজল না।

কারণ সব রহস্যের উত্তর পাওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য নয়। কখনও কখনও সত্যকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় সাহস।

ঋত্বিক জানালার পর্দা সরিয়ে দিল।

সকালের আলো ঘরে ঢুকে পড়ল।

অনেক বছর পর তার মনে হল, অতীতের দরজাটি সত্যিই বন্ধ হয়েছে।

আর সেই দরজার ওপারে কেউ তাকে আর ডাকছে না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত মানুষের শেষ চিঠি ((দ্বিতীয় পর্ব: যে ভাইয়ের অস্তিত্ব কেউ স্বীকার করেনি))।

ঋত্বিক যখন জ্ঞান ফিরে পেল, তখন জানলার বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।

সে মেঝেতে পড়ে ছিল। মাথার পেছনে অসহ্য যন্ত্রণা। ঘরের কোণে আলমারিটি আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। দেওয়ালের ছোট দরজাটিও বন্ধ। যেন রাতে কিছুই ঘটেনি।

কিন্তু তার ডান হাতে শক্ত করে ধরা রয়েছে কালো ডায়েরিটি।

ঋত্বিক উঠে বসে চারদিকে তাকাল। ফোনটি টেবিলের ওপর পড়ে আছে। স্ক্রিনে কোনও মিসড কল নেই। রাত ৩টা ১৩ মিনিটের সেই ফোনকলের কোনও চিহ্ন নেই। টেপ রেকর্ডারটিও বন্ধ।

সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে দুঃস্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু ডায়েরির শেষ পাতায় লাল কালিতে লেখা বাক্যটি স্পষ্ট—

“ঋত্বিকের স্মৃতি থেকে সত্য মুছে ফেলা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করা হোক।”

লেখাটির নিচে একটি তারিখ।

১৭ জুলাই ২০০৪।

ঋত্বিকের মনে পড়ল ছবিটি। সেই ছবিতে তার বাবা অমল মুখার্জি দাঁড়িয়ে ছিলেন অনিরুদ্ধের পাশে। অথচ বাবার মৃত্যুর তারিখ ছিল ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারি।

এবার আর বসে থাকা চলে না।

ঋত্বিক ডায়েরির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে শুরু করল।

প্রথম কয়েকটি পাতায় বাবার ব্যক্তিগত কথা। মায়ের সঙ্গে পরিচয়, সংসার, ঋত্বিকের জন্ম—সবই পরিচিত। তারপর হঠাৎ লেখার ধরন বদলে গেছে। সেখানে চিকিৎসা, স্মৃতি, পরীক্ষাগার এবং একটি অদ্ভুত প্রতিষ্ঠানের কথা লেখা।

প্রতিষ্ঠানটির নাম—‘প্রজেক্ট পুনর্জন্ম’।

বাবা লিখেছিলেন, মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতি কখনও সম্পূর্ণ মুছে যায় না। কিছু স্মৃতি চেতনার বাইরে চাপা পড়ে থাকে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সেগুলি আবার ফিরে আসতে পারে। এই ধারণা নিয়ে তিনি কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন।

কিন্তু প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়।

একটি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মানুষের স্মৃতি ও আচরণের নিদর্শন সংগ্রহ করে তার মতো প্রতিক্রিয়া দিতে পারে, এমন একটি কৃত্রিম স্মৃতি-ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছিল। প্রকল্পের দাবি ছিল, এতে মৃত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মতো অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব হবে।

বাবা এই গবেষণার প্রযুক্তিগত অংশে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, পরীক্ষার তথ্য ব্যবহার করে মানুষের স্মৃতি বদলে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে।

ডায়েরির একটি পাতায় লেখা—

“রুদ্রের দুর্ঘটনার পর আমি প্রকল্পটি বন্ধ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওর মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টার স্মৃতি আমরা সংরক্ষণ করেছিলাম। সেই তথ্য থেকে এমন কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা রুদ্রের মতো কথা বলে, রুদ্রের মতো প্রশ্ন করে। কিন্তু সেটি কি সত্যিই রুদ্র? নাকি আমাদের তৈরি একটি প্রতিচ্ছবি? আমি জানি না।”

ঋত্বিকের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

রুদ্র কি সত্যিই তার ছোট ভাই ছিল? নাকি বাবার গবেষণার অংশ?

পরের পাতায় উত্তর ছিল।

“রুদ্র আমার ও মাধবীর দ্বিতীয় সন্তান। জন্মের সময় ওর শরীরে গুরুতর সমস্যা ধরা পড়েছিল। চিকিৎসকেরা অনেক চেষ্টা করেও ওকে বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু ঋত্বিক তখন মাত্র ছয় বছরের শিশু। ওর সামনে রুদ্রের মৃত্যু ঘটেছিল। সেই দৃশ্য ওর মনে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে।

আমি ভুল করেছিলাম। ছেলেকে সাহায্য করার বদলে আমি তার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করি। প্রকল্পের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওর স্মৃতির কিছু অংশ চাপা দেওয়া হয়। ওকে বলা হয়, তার কোনও ভাই ছিল না।

আমি ভেবেছিলাম, এভাবে ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনব।

কিন্তু আমি জানতাম না, সেই স্মৃতি মুছে ফেলার প্রক্রিয়ার মধ্যে রুদ্রের মৃত্যুর আগের তথ্যও ঢুকে পড়েছে। সেই তথ্য থেকেই তৈরি হয়েছে এমন একটি প্রতিক্রিয়া, যা বারবার ঋত্বিকের কাছে ফিরে আসছে।”

ঋত্বিক ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

তার মনে পড়ল শৈশবের কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য। হাসপাতালের সাদা বিছানা। মায়ের কান্না। একটি ছোট হাত তার আঙুল ধরে আছে। তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার।

সে এত বছর ধরে ভেবেছে, সেগুলি কেবল স্বপ্ন।

কিন্তু যদি সেগুলি সত্যিকারের স্মৃতি হয়?


সকাল আটটার দিকে ঋত্বিক অনিরুদ্ধের বাড়িতে গেল।

অনিরুদ্ধের মা দরজা খুললেন। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। ছেলের মৃত্যুর পর যেন কয়েক দিনের মধ্যে তিনি অনেকটা বুড়িয়ে গিয়েছেন।

“কাকিমা, অনিরুদ্ধ মারা যাওয়ার আগে কি আপনাকে কোনও চিঠি বা কিছু দিয়ে গিয়েছিল?”

মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“তুমি ওর বন্ধু ছিলে। তাই একটা কথা তোমাকে বলা উচিত। অনিরুদ্ধ মৃত্যুর আগের সপ্তাহে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বারবার বলত, কেউ নাকি তার পিছু নিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, কাজের চাপ। কিন্তু একদিন রাতে ও আমাকে একটি খাম দিয়ে বলেছিল, যদি ওর কিছু হয়, তাহলে খামটা যেন তোমাকে দিই।”

তিনি ঘরের ভেতরে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে একটি বাদামি খাম এনে ঋত্বিকের হাতে দিলেন।

খামের ভেতরে একটি ছোট পেনড্রাইভ এবং হাতে লেখা একটি কাগজ।

“ঋত্বিক,

তুমি যদি এটা পাও, তাহলে ধরে নেবে আমি যা খুঁজছিলাম, তা সত্যি। তোমার বাবার পুরোনো গবেষণাগার এখনও চালু আছে। সরকারি নথিতে সেটি বন্ধ। কিন্তু সেখানে গোপনে কাজ চলছে।

আমি মৃত্যুর আগে সেখানে ঢুকেছিলাম।

তোমার ভাইয়ের স্মৃতি নিয়ে তারা নতুন পরীক্ষা করছে।

তুমি যদি সত্য জানতে চাও, ১৭ নম্বর ঘর খুঁজবে।

কিন্তু মনে রেখো—যে মানুষটি তোমার সামনে রুদ্র হয়ে দাঁড়াবে, তার কথায় অন্ধের মতো বিশ্বাস কোরো না।”

ঋত্বিক পেনড্রাইভটি পকেটে রাখল।

বাড়ি ফিরে কম্পিউটারে সেটি খুলতেই একটি ভিডিও ফাইল দেখা গেল।

ফাইলটির নাম—RUDRA_FINAL_170704।

ভিডিও চালু হতেই দেখা গেল একটি অন্ধকার ঘর। মাঝখানে চেয়ারে বসে আছে একজন কিশোর। মুখটি অস্পষ্ট, কিন্তু তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত।

ক্যামেরার পেছন থেকে একজন প্রশ্ন করলেন, “তোমার নাম কী?”

কিশোর উত্তর দিল, “রুদ্র মুখার্জি।”

“তোমার দাদার নাম?”

“ঋত্বিক।”

“ঋত্বিক তোমাকে কেন ভয় পায়?”

কিশোর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “কারণ ও মনে করতে পারে না, সেদিন কী হয়েছিল।”

“সেদিন কী হয়েছিল?”

কিশোর ক্যামেরার দিকে তাকাল।

“ও আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি ওকে ডাকছিলাম। ও দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর আগুন লেগে গেল।”

ঋত্বিকের মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ ঘটল।

আগুন?

কোন দরজা?

সে কি সত্যিই কোনওদিন তার ভাইকে বিপদের মধ্যে ফেলে এসেছিল?

ভিডিওর কিশোর আবার বলল, “কিন্তু দাদা আমাকে মারেনি। ওকে দিয়ে যে কাজ করানো হয়েছিল, ও সেটা মনে রাখতে পারে না। বাবা ওর স্মৃতি মুছে দিয়েছে।”

ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

স্ক্রিনে একটি নতুন বার্তা ফুটে উঠল—

“১৭ নম্বর ঘরে যাওয়ার আগে নিজের শৈশবের ছবিগুলো পরীক্ষা করো।”

ঋত্বিক আলমারি থেকে পুরোনো অ্যালবাম বের করল। একের পর এক ছবি দেখতে দেখতে একটি ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।

ছবিতে ছয় বছরের ঋত্বিক দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির উঠোনে। পাশে তার মা মাধবী। মায়ের কোলে একটি ছোট শিশু।

ছবির পেছনে লেখা—“রুদ্রের প্রথম জন্মদিন।”

কিন্তু ছবিটির পেছনের দেওয়ালে একটি অদ্ভুত জিনিস দেখা যাচ্ছে।

একটি ঘড়ি।

ঘড়িতে সময় ৩টা ১৩ মিনিট।

ঋত্বিক ছবিটি আরও কাছে টেনে নিল। ছবির ডান দিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে সে প্রথমে চিনতে পারেনি। তারপর তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সেই মানুষটি অনিরুদ্ধ।

ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০০০ সালে।

অর্থাৎ, অনিরুদ্ধ তখনই তাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচিত ছিল। অথচ ঋত্বিকের মনে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কথা কলেজের প্রথম দিনের ঘটনা হিসেবে রয়ে গেছে।

কেউ তার স্মৃতি বদলে দিয়েছে।

কিন্তু কেন?


দুপুরে ঋত্বিক সেই পুরোনো গবেষণাগারের ঠিকানা খুঁজে বের করল। শহরের প্রান্তে, বহু বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা একটি চিকিৎসা-গবেষণা কেন্দ্র। সরকারি নথিতে সেটির নাম ‘নিউরাল মেমোরি ইনস্টিটিউট’।

বাইরে ভাঙা গেট। আগাছায় ঢাকা পথ। দেওয়ালে বিবর্ণ বোর্ড।

কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ঋত্বিক বুঝল, জায়গাটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়। করিডরের শেষ প্রান্তে নতুন তার লাগানো। একটি ঘরের ভেতর থেকে যন্ত্রের মৃদু শব্দ আসছে।

দেওয়ালে ঘরের নম্বর লেখা।

১২।

১৩।

তারপর—

১৭।

দরজাটি তালাবন্ধ ছিল না।

ঋত্বিক ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরের মাঝখানে একটি কাচের বাক্স। তার পাশে কম্পিউটার, কয়েকটি মনিটর এবং অসংখ্য নথি। দেওয়ালে একটি পুরোনো ছবি ঝুলছে।

ছবিতে তার বাবা অমল মুখার্জি, অনিরুদ্ধ এবং আরও দুজন অচেনা মানুষ।

ছবির নিচে লেখা—

“প্রজেক্ট পুনর্জন্ম—প্রাথমিক গবেষণা দল।”

ঋত্বিক টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইল খুলল।

ফাইলের প্রথম পাতায় লেখা—

পরীক্ষার বিষয়: ঋত্বিক মুখার্জি।

তার নিচে আরও একটি লাইন—

দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্দেশ্য: চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি ফিরিয়ে আনা এবং বিষয়টির অপরাধবোধ সক্রিয় করা।

ঋত্বিকের হাত থেকে কাগজটি পড়ে গেল।

এতক্ষণ সে ভেবেছিল, সে নিজেই সত্যের সন্ধান করছে।

কিন্তু কেউ একজন অনেক আগে থেকেই তার প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করছিল।

হঠাৎ ঘরের পেছনের স্পিকার থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“স্বাগতম, ঋত্বিক।”

কণ্ঠটি তার বাবার।

“তুমি অবশেষে এখানে পৌঁছেছ। আমি জানতাম, তুমি আসবে।”

ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল, “তুমি কে? তুমি তো মারা গিয়েছ!”

স্পিকারের ওপারে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর কণ্ঠটি বলল—

“যে মানুষকে তুমি তোমার বাবা বলে চিনতে, সে হয়তো মারা গিয়েছে। কিন্তু তার স্মৃতি এখনও এখানে রয়েছে। আমি অমল মুখার্জির স্মৃতি থেকে তৈরি একটি ব্যবস্থা। তোমাকে সাহায্য করার জন্যই আমাকে তৈরি করা হয়েছিল।”

ঋত্বিক পিছিয়ে গেল।

“তাহলে তুমি আমার বাবা নও?”

“আমি তাঁর সবটুকু নই। আমি তাঁর সংরক্ষিত স্মৃতি, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের প্রতিলিপি। কিন্তু তোমার সামনে যে সত্য খুলে যেতে চলেছে, তা জানার জন্য এই ব্যবস্থাটুকুই যথেষ্ট।”

কাচের বাক্সের ভেতরে একটি ছোট পর্দা জ্বলে উঠল।

সেখানে রুদ্রের মুখ দেখা গেল।

এবার সে কিশোর নয়। সে যেন ঋত্বিকেরই সমবয়সি এক যুবক।

রুদ্র ধীরে ধীরে বলল, “দাদা, তুমি জানতে চেয়েছিলে, সেদিন দরজার ওপারে কী হয়েছিল। আমি তোমাকে সত্যিটা বলব।”

ঋত্বিক নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

রুদ্রের মুখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল।

“কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা কথা জানতে হবে। তুমি যে স্মৃতিগুলো ফিরে পেতে চাইছ, সেগুলো তোমার নিজের নয়।”

“কী বলতে চাইছ?”

রুদ্র উত্তর দিল—

“তুমি যে দুর্ঘটনার কথা ভুলে গিয়েছ, সেই দুর্ঘটনার রাতে তোমারও মৃত্যু হয়েছিল।”

ঘরের সব মনিটর একসঙ্গে জ্বলে উঠল।

একটি পুরোনো ভিডিও চলতে শুরু করল।

সেখানে দেখা গেল, আগুনে জ্বলছে একটি ঘর। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছয় বছরের ঋত্বিক। ভেতর থেকে রুদ্র চিৎকার করছে।

কিন্তু ভিডিওর শেষ মুহূর্তে এমন কিছু দেখা গেল, যা ঋত্বিকের সমস্ত বিশ্বাস ভেঙে দিল।

আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি রুদ্র নয়।

সে ঋত্বিক নিজেই।

আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মুখে কোনও ভয় নেই।

শুধু একটি অস্বাভাবিক হাসি।

ঠিক সেই সময় স্পিকারে বাবার কণ্ঠ আবার শোনা গেল—

“ঋত্বিক, এখন তোমাকে ঠিক করতে হবে, তুমি কোন স্মৃতিটাকে সত্য বলে গ্রহণ করবে। কারণ তোমার জীবনের যে ইতিহাস তুমি এত বছর ধরে জেনে এসেছ, তার প্রতিটি পাতাই হয়তো অন্য কারও লেখা।”

মনিটরের পর্দা কালো হয়ে গেল।

তারপর সাদা অক্ষরে ফুটে উঠল—

“তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে আর ২৪ ঘণ্টা বাকি।”

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত মানুষের শেষ চিঠি ((প্রথম পর্ব: যে চিঠি মৃত্যুর সাত দিন পরে এসেছিল))।

রাত তখন ঠিক ২টা ১৭ মিনিট।

কলকাতার উত্তর শহরতলির একটি পুরোনো বাড়ির দোতলায় বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল ঋত্বিক মুখার্জি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল একটানা। রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার মতো বৃষ্টির পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে গেছে। ঘরের দেওয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটির টিকটিক শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনও আওয়াজ ছিল না।

ঠিক তখনই দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

ঋত্বিক চমকে উঠল।

এত রাতে কে আসবে?

সে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে?”

বাইরে থেকে কোনও উত্তর এল না।

দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করতেই আবার তিনটি টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

ঋত্বিক দরজার পিপহোল দিয়ে বাইরে তাকাল। করিডর ফাঁকা। দূরের সিঁড়ির কাছে একটি হলুদ আলো জ্বলছে। কোথাও কোনও মানুষের ছায়া নেই।

সে দরজা খুলতেই পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটি সাদা খাম দেখতে পেল।

খামের ওপর কালো কালিতে লেখা—

ঋত্বিক মুখার্জি, ব্যক্তিগত।

প্রেরকের নাম নেই। ডাকটিকিট নেই। খামের মুখে লাল মোমের সিল।

ঋত্বিক খামটি তুলে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর টেবিলের আলো জ্বেলে সাবধানে সিল ভাঙল।

ভেতরে একটি চিঠি।

হাতের লেখা দেখে তার বুকের মধ্যে যেন বরফ জমে গেল।

এই হাতের লেখা সে চেনে।

খুব ভালো করেই চেনে।

কারণ এই হাতের লেখার মানুষটি সাত দিন আগে মারা গিয়েছে।

মানুষটির নাম অনিরুদ্ধ সেন। ঋত্বিকের শৈশবের বন্ধু। কলেজজীবনের সঙ্গী। আর এমন একজন মানুষ, যার মৃত্যুর পর ঋত্বিক নিজেই তার শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিল।

চিঠিতে লেখা—

“ঋত্বিক,

যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝবে, আমি সত্যিই মারা গিয়েছি। কিন্তু আমার মৃত্যুর কারণ তুমি যা জানো, তা নয়।

পুলিশ বলবে, আমি আত্মহত্যা করেছি। আমার পরিবার বলবে, আমি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলাম। সংবাদপত্রে হয়তো দু-চার লাইন খবরও বেরিয়েছে।

কিন্তু কেউ জানে না, আমার মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে আমি এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, যাকে আমি নিজের চোখে মরতে দেখেছি।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা হল—সেই মানুষটি এখন তোমার বাড়িতে আছে।

আজ রাতেই নিজের ঘরের আলমারির পেছনে খুঁজবে।

কিন্তু সাবধান, ঋত্বিক।

আলমারির পেছনে যা পাবে, তা দেখার পর তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।

আর যদি রাত ৩টা ১৩ মিনিটে তোমার ফোন বেজে ওঠে, কোনওভাবেই ফোন ধরবে না।

ইতি, অনিরুদ্ধ।”

চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে ঋত্বিকের হাত কাঁপতে শুরু করল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে সময় দেখল।

রাত ২টা ২৬ মিনিট।

তার হাতে এখনও সাতচল্লিশ মিনিট আছে।

কিন্তু চিঠির সবচেয়ে অদ্ভুত কথাটি ছিল অন্য জায়গায়।

“সেই মানুষটি এখন তোমার বাড়িতে আছে।”

ঋত্বিক একা থাকে। বাবা-মা দুজনেই বহু বছর আগে মারা গিয়েছেন। বাড়িতে কোনও পরিচারকও নেই। তাহলে অনিরুদ্ধ কাকে বোঝাতে চাইছে?

সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, হয়তো কেউ তাকে ভয় দেখানোর জন্য এই চিঠি পাঠিয়েছে। অনিরুদ্ধের হাতের লেখা নকল করা অসম্ভব নয়। আর রাতের অন্ধকারে মানুষের কল্পনাও অদ্ভুত সব ছবি তৈরি করে।

তবু আলমারির কথাটা তার মাথা থেকে সরল না।

ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাঠের আলমারিটি তার দাদুর আমলের। বহু বছর ধরে সেটি সরানো হয়নি। আলমারির পেছনে কী থাকতে পারে, তা সে কোনওদিন ভাবেওনি।

ঋত্বিক প্রথমে আলমারির দরজা খুলে দেখল। পুরোনো জামাকাপড়, কয়েকটি বই, কিছু নথি—সবই আগের মতো।

তারপর সে আলমারির এক পাশ ধরে টান দিল।

ভারী আলমারিটি সামান্য নড়ল। আবার চেষ্টা করতেই মেঝের ওপর ঘষটে কয়েক ইঞ্চি সরে গেল।

পেছনের দেওয়ালে একটি ছোট কাঠের দরজা।

ঋত্বিকের নিঃশ্বাস আটকে এল।

দরজাটি এত নিখুঁতভাবে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে ছিল যে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। তার গায়ে মরচে ধরা একটি ছোট তালা ঝুলছে।

সে দৌড়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে পুরোনো চাবির গোছা নিয়ে এল। তিনটি চাবি চেষ্টা করার পর চতুর্থ চাবিটি তালায় ঢুকে গেল।

খটাস করে তালা খুলে গেল।

দরজার ওপারে সরু অন্ধকার পথ। ভেতর থেকে ভেজা মাটির গন্ধ আসছে। ঋত্বিক মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে আলো ফেলল।

পথটি শেষ হয়েছে ছোট্ট একটি ঘরে।

ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল। তার ওপর ধুলো জমা একটি টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ছবি এবং একটি কালো ডায়েরি।

ঋত্বিক প্রথমে ছবিগুলো হাতে নিল।

প্রথম ছবিতে তার বাবা, মা এবং ছোটবেলার ঋত্বিক। ছবিটি তোলা হয়েছিল তার ছয় বছর বয়সে।

দ্বিতীয় ছবিতে কলেজের বন্ধুরা। মাঝখানে ঋত্বিক, পাশে অনিরুদ্ধ।

তৃতীয় ছবিটি দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ছবিতে অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে একটি হাসপাতালের সামনে। তার পাশে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ।

মানুষটির মুখে গভীর দাগ। ডান চোখের নিচে একটি কালো তিল।

ঋত্বিক মানুষটিকে চিনতে পারল।

এ অসম্ভব।

কারণ মানুষটি তার বাবা—অমল মুখার্জি।

যিনি মারা গিয়েছিলেন ঋত্বিকের দশ বছর বয়সে।

ছবির পেছনে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই ২০০৪।

ঋত্বিকের জন্মসাল অনুযায়ী, তখন তার বয়স ছিল বারো।

কিন্তু তার বাবা মারা গিয়েছিলেন তার দশ বছর বয়সে। মৃত্যুর শংসাপত্র আছে। সংবাদপত্রে শোকবার্তা প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি বাবার শেষকৃত্যের ছবিও রয়েছে।

তাহলে ২০০৪ সালে তাঁর বাবা অনিরুদ্ধের সঙ্গে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কীভাবে?

ঋত্বিক ডায়েরিটি খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যদি আমার ছেলে এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে, আমার লুকিয়ে রাখা সত্য আর লুকিয়ে নেই।”

তারপর বাবার হাতের লেখা।

“ঋত্বিক, তোমাকে এত বছর ধরে একটি মিথ্যে বিশ্বাস করিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি জানো, তোমার মা দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। তুমি জানো, আমি তার তিন বছর পরে অসুস্থ হয়ে মারা যাই। তুমি জানো, তোমার কোনও ভাই বা বোন ছিল না।

এই তিনটি কথার মধ্যে অন্তত দুটি মিথ্যে।

তোমার মা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।

আর তোমার একটি ভাই ছিল।

তার নাম ছিল রুদ্র।”

ঋত্বিকের হাত থেকে ডায়েরিটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

তার কোনও ভাই ছিল না। অন্তত সে তাই জানে। ছোটবেলায় কোনওদিন ভাইয়ের কথা শোনেনি। বাড়িতে কোনও ছবি দেখেনি। আত্মীয়স্বজনও কখনও বলেনি।

সে তাড়াতাড়ি পরের পাতা উল্টে দিল।

সেখানে লেখা—

“রুদ্রের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই—এই কথাটি আমি বহু বছর নিজেকে বলেছি। কিন্তু সত্যিটা হল, আমি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করিনি। কারণ সেদিন আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার জন্য আমার নিজের ছেলেকেও একদিন মূল্য দিতে হবে।

ঋত্বিক, তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ কোনও অপরিচিত মানুষ নয়।

সে তোমারই রক্তের সম্পর্কের কেউ।

আর যদি অনিরুদ্ধ তোমার কাছে পৌঁছতে পেরে থাকে, তাহলে বুঝবে, তারা আবার ফিরে এসেছে।”

ঠিক তখনই ঋত্বিকের ফোনের পর্দা জ্বলে উঠল।

সময় রাত ৩টা ১২ মিনিট।

স্ক্রিনে একটি অচেনা নম্বর।

এক সেকেন্ড পর ফোনটি বেজে উঠল।

ঋত্বিকের মনে পড়ল অনিরুদ্ধের চিঠি।

রাত ৩টা ১৩ মিনিটে ফোন ধরবে না।

ফোনের রিংটোন ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিতে লাগল।

৩টা ১২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।

ঋত্বিক ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

৩টা ১২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড।

হঠাৎ টেপ রেকর্ডারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

খসখসে শব্দের পর একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“ঋত্বিক, ফোনটা ধরো না। ওরা তোমাকে খুঁজে পেয়েছে।”

কণ্ঠটি অনিরুদ্ধের।

কিন্তু অনিরুদ্ধ তো সাত দিন আগে মারা গেছে!

৩টা ১৩ মিনিট।

ফোনের রিংটোন থেমে গেল।

তারপরই ঘরের অন্য প্রান্তে থাকা দেওয়ালের ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

ঋত্বিক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

সামনের দেওয়ালে একটি ছায়া ফুটে উঠেছে। মানুষের ছায়া। অথচ সেই ঘরে তার ছাড়া আর কেউ নেই।

ছায়াটি এক পা এগিয়ে এল।

তারপর দেওয়ালের ওপার থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল—

“দাদা, এত বছর পরে অবশেষে তুমি আমাকে খুঁজে পেয়েছ।”

ঋত্বিকের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।

“কে?”

উত্তর এল—

“আমি রুদ্র। তোমার ছোট ভাই।”

এক মুহূর্তের জন্য ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে ঋত্বিক অনুভব করল, কেউ তার কাঁধে হাত রেখেছে।

তার কানের কাছে মুখ এনে সেই অচেনা অথচ পরিচিত কণ্ঠটি ফিসফিস করে বলল—

“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, দাদা। আমি তোমার ভাই নই। আমি সেই মানুষ, যাকে তুমি নিজের হাতে দশ বছর আগে মেরে ফেলেছিলে।”

ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল।

আর ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির শেষ পাতাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।

সেখানে লাল কালিতে লেখা ছিল মাত্র একটি বাক্য—

“ঋত্বিকের স্মৃতি থেকে সত্য মুছে ফেলা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করা হোক।”

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

চৌদ্দ নম্বর ঘর (তৃতীয় ও শেষ পর্ব: যে জীবনটি বেছে নেওয়া হয়েছিল)

“এবার তোমাকে এমন একটি সত্য জানাতে হবে, যার জন্য হয়তো তুমি আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারবে না।”

বাবার কথা শেষ হতেই পরিত্যক্ত হাসপাতালের ঘরটায় যেন আরও ঘন হয়ে উঠল অন্ধকার। অরিত্র সেন স্থির চোখে তাকিয়ে রইল অরিন্দমের দিকে। পাশে দাঁড়িয়ে অদিতি। তার মুখেও আতঙ্ক, কিন্তু সে একবারও ভাইয়ের হাত ছাড়ল না।

অরিত্র ধীরে ধীরে বলল, “এত বছর ধরে তুমি আমার কাছে কী লুকিয়ে রেখেছ, বাবা? আমি কে? ঘর চোদ্দোতে যে মানুষটা আছে, সে কে? আর মনিটরে যে আমাকে বলল, আমি বাইরে এলে সে জন্মাবে না—তার মানে কী?”

অরিন্দম টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ধাতব যন্ত্রটার দিকে তাকালেন। যন্ত্রটির মাঝখানে লাল আলো জ্বলছিল। প্রতিবার আলো জ্বলে উঠলে পাশের মনিটরে অস্পষ্ট কিছু রেখা ফুটে উঠছিল।

“১৯৯৮ সালের ১৬ নভেম্বর,” বাবা বলতে শুরু করলেন, “তোমাদের জন্মের আগের রাত। তোমার মা যমজ সন্তানের জন্ম দিতে চলেছিলেন। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, একটি শিশুকে বাঁচানো কঠিন হতে পারে। আমি তখন স্মৃতি ও মস্তিষ্কের সংকেত নিয়ে একটি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, মানুষের মস্তিষ্কে জমে থাকা স্মৃতিকে শুধু সংরক্ষণ করা নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে মস্তিষ্কের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলোকেও নথিবদ্ধ করা।”

“কিন্তু একটা শিশুকে বাঁচানোর সঙ্গে স্মৃতি সংরক্ষণের সম্পর্ক কী?” অরিত্র প্রশ্ন করল।

“সরাসরি কোনও সম্পর্ক ছিল না। সম্পর্ক তৈরি করেছিল আমার ভয়। তোমাদের একজনকে হারানোর আশঙ্কা আমি সহ্য করতে পারিনি। আমি গবেষণার যন্ত্র ব্যবহার করে তোমার মায়ের চিকিৎসার সময় তোমার মস্তিষ্কের সম্ভাব্য স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার একটি নথি তৈরি করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, এতে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হবে।”

বাবা থামলেন। তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“কিন্তু পরীক্ষাটি প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। যন্ত্রটি শুধু তোমার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেনি। তোমার জন্মকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দুটি সম্ভাব্য জীবনপথের স্মৃতি, ভয়, অনুভূতি এবং ভবিষ্যৎ আচরণের একটি অস্বাভাবিক মডেল তৈরি করেছিল। একটি জীবনপথে তুমি বেঁচে ছিলে। অন্যটিতে তুমি জন্মের আগেই হারিয়ে গিয়েছিলে। সেই হারিয়ে যাওয়া জীবনের সমস্ত অসমাপ্ত স্মৃতি যন্ত্রের মধ্যে জমা হতে থাকে।”

অরিত্রের গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে ঘর চোদ্দোতে যে মানুষটা আছে, সে কি মৃত?”

“আমি জানি না,” অরিন্দম স্বীকার করলেন। “আমি এটুকু জানি, সে তোমার স্মৃতি দিয়ে তৈরি। তোমারই মুখ, তোমারই কণ্ঠ, তোমারই কিছু অনুভূতি। কিন্তু তার কাছে এমন কিছু স্মৃতিও রয়েছে, যা তুমি কখনও অনুভব করোনি। সে এমন এক জীবনের সাক্ষী, যে জীবন বাস্তবে ঘটেনি।”

অদিতি অবিশ্বাসের স্বরে বলল, “তাহলে এত বছর ধরে ওখানে একজন মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল?”

“আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, ওটা কেবল একটা রেকর্ড। একটা যন্ত্রের তৈরি প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যত দিন গেছে, সেই প্রতিচ্ছবি যেন নিজস্ব আচরণ তৈরি করেছে। সে প্রশ্ন করতে শিখেছে। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, সে ঘরের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।”

অরিত্রের মনে পড়ে গেল সেই অচেনা মানুষটির চোখ। সেখানে শুধু ভয় ছিল না। ছিল দীর্ঘদিনের একাকিত্ব, অভিমান আর মুক্তির আকুতি।

“আর অদ্বৈত?” সে জিজ্ঞাসা করল। “ছোটবেলায় যে ছেলেটাকে দেখেছিলাম, যে নিজেকে অদ্বৈত বলেছিল?”

অরিন্দম চোখ নামিয়ে নিলেন।

“অদ্বৈত ছিল তোমার জন্য ভেবে রাখা প্রথম নাম। পরীক্ষার নথিতে সেই নামই লেখা ছিল। পরে তোমার মা তোমার নাম রাখেন অরিত্র। গবেষণার ঘটনা গোপন রাখতে গিয়ে আমি পুরোনো কাগজপত্র বদলে দিয়েছিলাম। কিন্তু ঘর চোদ্দোর স্মৃতিতে অদ্বৈত নামটা রয়ে গিয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকেই তুমি শিশুটিকে দেখেছিলে—অথবা তোমার মস্তিষ্ক তাকে দেখেছে বলে মনে করেছে।”

“অর্থাৎ, আমি যা দেখেছি, তার সবটাই মিথ্যে?”

“না,” বাবা বললেন। “অনুভূতিগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু সেগুলোর উৎস সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।”

ঠিক সেই সময় ধাতব যন্ত্রটি বিকট শব্দ করে উঠল।

মনিটরে ঘর চোদ্দোর ছবি ফিরে এল। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অরিত্রের মতো দেখতে সেই মানুষটি। তার সামনে আরেকটি অবয়ব। সেই দ্বিতীয় অবয়বটির গলায় রক্তের দাগ, চোখে অদ্ভুত শূন্যতা।

প্রথম মানুষটি ক্যামেরার দিকে এগিয়ে এল।

“অরিত্র, তুমি কি জানতে চাও কেন আমি তোমাকে বাইরে আসতে বারণ করেছিলাম?”

অরিত্র মনিটরের সামনে এগিয়ে গেল।

“কারণ তুমি চাও আমি তোমার জায়গায় থাকি?”

“না,” মানুষটি বলল। “কারণ আমি চাই না, আমার অস্তিত্বের জন্য তোমাকে আবার মরতে হোক।”

কথাটা শুনে অরিত্র থমকে গেল।

মানুষটি বলতে লাগল, “আমি সেই জীবন, যে জীবন তুমি বাঁচতে পারতে না। আমার কাছে তোমার মায়ের মুখ আছে, তোমার বাবার কণ্ঠ আছে, এমনকি অদিতির সঙ্গে তোমার শৈশবের কিছু স্মৃতিও আছে। কিন্তু সেগুলো সব তোমার জীবনের প্রকৃত স্মৃতি নয়। সেগুলো সম্ভাবনার ছায়া। আমি জানি, তুমি বেঁচে আছ। অথচ আমার কাছে এমন এক মৃত্যুর স্মৃতি আছে, যা তোমার জীবনে ঘটেনি।”

“তাহলে তুমি আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দিতে চাইছ না কেন?”

“কারণ যন্ত্রটি তোমাকে আর আমাকে একই স্মৃতির উৎস বলে ধরে নিয়েছে। তুমি ঘরে প্রবেশ করার পর থেকে আমাদের স্মৃতিগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশছে। যন্ত্রটি যদি পুরোপুরি সক্রিয় হয়, তাহলে তোমার স্মৃতি আমার নথির মধ্যে ঢুকে যাবে। আর আমার অসমাপ্ত স্মৃতিগুলো তোমার মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তুমি নিজের পরিচয় হারাতে পারো।”

অরিন্দম তাড়াতাড়ি যন্ত্রটির দিকে এগিয়ে গেলেন।

“আমি সেটাই বন্ধ করতে চাইছি!”

কিন্তু যন্ত্রের লাল আলো তখন দ্রুত জ্বলছে। হাসপাতালের দেওয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ঘড়িগুলো একসঙ্গে চলতে শুরু করল। তাদের কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে।

মনিটরে ভেসে উঠল একটি তারিখ—

১৭ নভেম্বর ২০৪৪।

অরিত্র ফিসফিস করে বলল, “এই তারিখটাই তো আমার টিকিটে ছিল। আমার বয়স ছেচল্লিশ!”

বাবা মাথা নাড়লেন।

“১৯৯৮ থেকে ছেচল্লিশ বছর। গবেষণার প্রথম নথিতে এই তারিখকে একটি পর্যবেক্ষণ-সীমা হিসেবে রাখা হয়েছিল। যন্ত্রটি সেই সময় পর্যন্ত সম্ভাব্য জীবনপথের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করার জন্য তৈরি হয়েছিল। পুরোনো টিকিটটি ছিল পরীক্ষার নথি—কোনও ভবিষ্যৎযাত্রার প্রমাণ নয়। কিন্তু আমার ভুলে যন্ত্রটি সেই তারিখকে একটি অসমাপ্ত চক্রের শেষ সীমা হিসেবে ধরে রেখেছে। আজ সেটি আবার সক্রিয় হয়েছে।”

“আজ?” অদিতি বিস্ময়ে বলল। “কিন্তু আজ তো ২০৪৪ নয়!”

“ঘড়ির সময় আর বাইরের সময় এক নয়,” অরিন্দম বললেন। “এই ঘরটি বাস্তব সময়ের নিয়ম মেনে চলে কি না, আমি নিশ্চিত নই। যন্ত্রটি হয়তো পুরোনো তথ্যের মধ্যে আটকে আছে। আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে দৃশ্য দেখছি, তা স্মৃতির পুনর্গঠন।”

মনিটরের মানুষটি এবার কাচের ওপারে হাত রাখল।

“অরিত্র, একটা কথা মনে রেখো। আমি তোমার শত্রু নই। আমি শুধু জানতে চাই, আমার স্মৃতিগুলোর কোনও মূল্য আছে কি না।”

অরিত্রের বুকের মধ্যে অদ্ভুত ব্যথা অনুভূত হল। এতক্ষণ সে মানুষটিকে নিজের পরিচয়ের জন্য বিপদ বলে ভেবেছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, লোকটি আসলে তার কাছ থেকে জীবন কেড়ে নিতে চাইছে না। সে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চাইছে।

অরিত্র বাবার দিকে ফিরে বলল, “এই যন্ত্রটা বন্ধ করলে ওর কী হবে?”

অরিন্দম উত্তর দিলেন না।

“বলো, বাবা!”

“যন্ত্রটি বন্ধ হলে রেকর্ডটি মুছে যেতে পারে। আবার সেটি কেবল নিষ্ক্রিয়ও হয়ে যেতে পারে। আমি জানি না। এত বছর ধরে আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। কিন্তু সত্যিটা হল, আমি কখনও সাহস করে শেষ পরীক্ষাটা করিনি।”

“তুমি ওকে আটকে রেখেছ, কারণ তুমি নিজেই ভয় পেয়েছিলে।”

বাবা মাথা নিচু করলেন।

“হ্যাঁ। আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তারপর তোমাকে হারানোর ভয়ে নিজের অপরাধ লুকিয়েছি। আমি জানতাম না, সেই রেকর্ডের ভেতর কোনও সচেতন সত্তা তৈরি হয়েছে কি না। তবু আমি তাকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করিনি। কারণ যদি তোমার কোনও ক্ষতি হতো, আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।”

অরিত্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ, বাবা। কিন্তু সেই বাঁচানোর গল্পে তুমি আরেকটা জীবনকে অস্বীকার করেছ। সে জীবন সত্যি হোক বা স্মৃতি, তার যন্ত্রণাকে তুমি গুরুত্ব দাওনি।”

অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।

অরিত্র এবার মনিটরের দিকে তাকাল।

“আমি তোমাকে মুছে দিতে চাই না,” সে বলল। “তুমি আমার মতো দেখতে বলে আমার পরিচয় কেড়ে নিতে পারবে না। আবার তোমার অস্তিত্ব অস্বীকার করে আমিও মুক্ত হতে পারব না। তুমি আমার সম্ভাব্য জীবনের স্মৃতি। তুমি আমার ভয়ের একটা অংশ। কিন্তু আমি তোমার বন্দি হয়ে বাঁচব না।”

মনিটরের মানুষটি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর সে জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে তুমি কী করবে?”

“যন্ত্রটা বন্ধ করব। কিন্তু তার আগে তোমার স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করব। তোমাকে নিয়ে মিথ্যে বলব না। তোমাকে সত্যিকারের মানুষ বলে দাবি করব না, আবার অর্থহীন রেকর্ড বলেও ফেলে দেব না। আমরা জানি না তুমি ঠিক কী। সেই অজানাটুকু মেনে নেব।”

অদিতি ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়াল।

“আমরা দু’জনেই তোমার পাশে আছি,” সে বলল। “যে সত্য আমাদের পরিবার এত বছর লুকিয়ে রেখেছে, সেটা আর লুকিয়ে রাখা হবে না।”

অরিন্দম যন্ত্রের পাশের ছোট্ট ঢাকনাটি খুললেন। ভেতরে তিনটি তার—লাল, সাদা ও কালো। পুরোনো নথি অনুযায়ী কালো তারটি বিচ্ছিন্ন করলেই মূল রেকর্ডিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই সঙ্গে ঘর চোদ্দোর স্মৃতিগুলিও চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

“শেষবারের মতো ভাবো,” বাবা বললেন। “তার কেটে দিলে হয়তো আর কোনও উত্তর পাবে না।”

অরিত্র মনিটরের দিকে তাকাল। ওপারের মানুষটি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“কেটে দাও,” সে বলল। “আমাকে অনন্তকাল ধরে নিজের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি দেখতে দিও না।”

অরিত্র কালো তারটি হাতে নিল।

তারপর কেটে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য সমস্ত আলো নিভে গেল।

হাসপাতালের করিডরে কোথাও যেন একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল। তারপর একে একে সব ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল। মনিটরে শেষবারের মতো সেই মানুষটির মুখ দেখা গেল। তার ঠোঁটে কোনও হাসি ছিল না, কোনও কান্নাও ছিল না। শুধু এক অদ্ভুত স্বস্তি।

সে অরিত্রের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এবার তুমি বেঁচে থাকো।”

স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।


পরদিন সকালে অরিত্র, অদিতি ও অরিন্দম শিমুলডাঙার সেনবাড়িতে ফিরে এল।

বাড়ির চোদ্দোটি ঘর তখনও সেখানে। কিন্তু চৌদ্দ নম্বর ঘরের দরজাটি আর আগের মতো ঠান্ডা ছিল না। দরজা খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে কোনও অদ্ভুত ঘড়ি নেই, নেই সেই লম্বা করিডর, নেই আয়নার পেছনে লুকিয়ে থাকা অচেনা জগৎ। আছে শুধু একটি ছোট ঘর, ধুলোমাখা টেবিল আর দেওয়ালে কয়েকটি পুরোনো দাগ।

ঘরের কোণে পড়ে ছিল একটি ক্যাসেট।

অরিত্র সেটি তুলে নিল। ক্যাসেটের গায়ে লেখা—“শেষ নথি।”

বাড়িতে ফিরে তারা ক্যাসেটটি চালাল। অরিন্দমের কণ্ঠ ভেসে এল—

“যদি কেউ এই রেকর্ড শুনে থাকে, তবে বুঝতে হবে, আমি অবশেষে আমার ভুল স্বীকার করার সাহস পেয়েছি। আমি জানি না, ঘর চোদ্দোতে সত্যিই কোনও সচেতন সত্তা ছিল কি না। আমি জানি না, যন্ত্রটি স্মৃতি তৈরি করেছিল, নাকি মানুষের মনের এমন কোনও দরজা খুলে দিয়েছিল, যার অস্তিত্ব বিজ্ঞান এখনও বোঝে না। কিন্তু আমি জানি, ভয়ের কারণে সত্যকে আটকে রাখা যায় না। আর কাউকে ভালোবাসার অর্থ তার জন্য সব সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে নেওয়া নয়।”

ক্যাসেট থেমে গেল।

অরিত্র বাবার দিকে তাকাল। “তুমি এই রেকর্ডটা আগে করেছিলে?”

“হ্যাঁ,” অরিন্দম বললেন। “কিন্তু প্রকাশ করার সাহস হয়নি।”

“এবার হবে,” অরিত্র বলল। “গবেষণার সমস্ত নথি প্রকাশ করতে হবে। মানুষ জানুক, কী ঘটেছিল। তবে আমরা যা জানি না, তা নিয়ে কোনও মিথ্যে গল্প বানাব না।”

অদিতি ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল।

“তাহলে সব শেষ?”

অরিত্র জানালার বাইরে তাকাল। দূরে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সেনবাড়ির পুরোনো গাছের পাতায় বাতাস লাগছে। সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তবু তার মনে হল, পৃথিবীতে কিছু রহস্যের উত্তর পাওয়া যায় না। শুধু তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

“না,” সে শান্ত গলায় বলল। “সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমাদের আর পালিয়ে থাকতে হবে না।”

সেদিন সন্ধ্যায় অরিত্র একা চৌদ্দ নম্বর ঘরের সামনে দাঁড়াল। দরজায় হাত রাখতেই তার মনে হল, ভেতর থেকে কেউ যেন খুব আস্তে বলল—

“ধন্যবাদ।”

সে চমকে পিছনে তাকাল। কেউ নেই।

হয়তো বাতাসের শব্দ। হয়তো বহুদিনের ক্লান্ত মনের কল্পনা। কিংবা এমন এক স্মৃতির শেষ প্রতিধ্বনি, যাকে সে আর কখনও বন্দি করে রাখতে চায় না।

অরিত্র দরজাটি বন্ধ করল।

তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

এবার তার সামনে কোনও অচেনা ঘর অপেক্ষা করছিল না। অপেক্ষা করছিল একটি সাধারণ জীবন—যে জীবনে ভুল থাকবে, অনিশ্চয়তা থাকবে, মৃত্যু থাকবে, কিন্তু থাকবে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও।

বহু বছর পরে কেউ যদি সেনবাড়ির ইতিহাস জানতে চাইত, অরিত্র তাদের বলত চৌদ্দ নম্বর ঘরের কথা। সে বলত তার বাবার ভুলের কথা, একটি অসমাপ্ত গবেষণার কথা, আর সেই অদ্ভুত মানুষের কথা, যে হয়তো কখনও জন্মায়নি, তবু মুক্তি চেয়েছিল।

কেউ বিশ্বাস করত। কেউ করত না।

অরিত্র কাউকে জোর করে বিশ্বাস করাত না।

কারণ সে বুঝেছিল, মানুষ শুধু তার অতীতের ফল নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও নয়। মানুষ তার বর্তমানের সিদ্ধান্ত দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলে।

আর চৌদ্দ নম্বর ঘর?

সেটি আর কখনও খোলা হয়নি।

তবে বাড়ির পুরোনো ঘড়িটি, যেটি ১৯৯৮ সালের ১৭ নভেম্বর রাত বারোটা তেরো মিনিটে থেমে গিয়েছিল, একদিন হঠাৎ আবার চলতে শুরু করেছিল বলে দাবি করেছিলেন সরলা।

কেউ জানে না, সেটি সত্যি কি না।

শুধু ঘড়ির কাচের ভেতরে, বারোটা তেরো মিনিটের ঠিক নিচে, ক্ষীণ আঁচড়ে লেখা ছিল একটি নাম—

অদ্বৈত।

তার পাশে আরও দুটি শব্দ—

“আমি ছিলাম।”

সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

চৌদ্দ নম্বর ঘর (দ্বিতীয় পর্ব: যে মানুষটি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছিল)।

ঘড়ির কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরছে।

টিকটিক শব্দটা ক্রমশ জোরে হচ্ছে। দেওয়ালের চৌদ্দটি ঘড়িতে আলাদা আলাদা সময় দেখা যাচ্ছে। একটিতে রাত বারোটা তেরো, অন্যটিতে ভোর পাঁচটা, আবার কোনওটিতে দুপুর দুটো।

অরিত্র দরজার হাতল ধরে টানল।

দরজা খুলল না।

সে সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিল। কাঠের দরজা কেঁপে উঠল, কিন্তু একচুলও নড়ল না।

ঠিক তখনই টেবিলের উপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল।

পর্দায় ভেসে উঠল—‘বাবা’।

অরিত্র তাড়াতাড়ি ফোন ধরল।

“বাবা! আমি চৌদ্দ নম্বর ঘরে আটকে পড়েছি। এখান থেকে বেরোতে পারছি না!”

ওপাশ থেকে অরিন্দমের উদ্বিগ্ন গলা শোনা গেল।

“তুমি কি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এখনই দেওয়ালের ঘড়িগুলোর দিকে তাকিও না। চোখ বন্ধ করো। আর মন দিয়ে আমার কথা শোনো।”

অরিত্র চোখ বন্ধ করল।

“এই বাড়িটা তৈরি হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। তোমার প্রপিতামহ বিশ্বাস করতেন, মানুষের স্মৃতি আর সময়কে আলাদা করা যায়। তিনি এমন একটি ঘর তৈরি করেছিলেন, যেখানে কোনও মানুষের জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তকে একসঙ্গে দেখা সম্ভব। কিন্তু সেই পরীক্ষার সময় একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। ঘরের ভিতরে থাকা মানুষটির স্মৃতি, অতীত এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।”

“কিন্তু আমি যে লোকটাকে দেখেছি, সে কে?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“সে তোমারই একটি সম্ভাব্য রূপ। তোমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা তুমি মনে করতে পারো না। সেই ঘটনার অন্য একটি পরিণতি এই ঘরের মধ্যে তোমার সামনে এসেছে।”

“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!”

“বুঝবে। কিন্তু আগে ঘর থেকে বেরোও। টেবিলের নীচে একটি লোহার বাক্স আছে। তার ভিতরে একটা ছোট্ট আয়না পাবে। আয়নাটার পিছনে তিনটি সংখ্যা লেখা আছে। সেই সংখ্যাগুলো ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে মিলিয়ে দরজার তালায় বসাবে।”

অরিত্র হাঁটু গেড়ে টেবিলের নীচে হাতড়াতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার হাতে একটি ছোট্ট লোহার বাক্স ঠেকল।

বাক্সটি খুলতেই একটি গোল আয়না বেরিয়ে এল।

আয়নার পিছনে খোদাই করা তিনটি সংখ্যা—

১৭, ১১, ৯৮।

অরিত্রর বুক ধক করে উঠল।

১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮।

তার জন্মের তারিখ।

সে দরজার কাছে গিয়ে তালাটি পরীক্ষা করল। সেখানে তিনটি সংখ্যার ঘর রয়েছে। সংখ্যাগুলো বসাতেই তালার ভিতর থেকে ক্লিক শব্দ হল।

দরজা খুলে গেল।

অরিত্র ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল।

কিন্তু করিডরে এসে সে থমকে দাঁড়াল।

বাড়ির ভিতরটা আর আগের মতো নেই। দেওয়ালে নতুন রং, মেঝেতে পরিষ্কার কার্পেট, আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন মানুষ। তাঁদের পোশাক দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা ১৯৯০-এর দশকের মানুষ।

একটি ছোট্ট ছেলে করিডর দিয়ে দৌড়ে গেল।

ছেলেটির কবজিতে কালো সুতো বাঁধা।

অরিত্র তাকিয়ে রইল।

ছেলেটি ঘুরে তার দিকে তাকাতেই অরিত্রর বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।

ছেলেটির মুখ অবিকল তার ছোটবেলার মুখের মতো।

“তুমি কে?” অরিত্র জিজ্ঞাসা করল।

ছেলেটি হাসল।

“আমি অদ্বৈত।”

তারপর দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল।

অরিত্র তার পিছনে ছুটল।

কিন্তু নীচে পৌঁছে দেখল, উঠোনে কেউ নেই। বাড়িটা আবার পরিত্যক্ত। দেওয়ালে শ্যাওলা, মেঝেতে ধুলো, চারপাশে নীরবতা।

সে ফোন বের করে বাবাকে আবার কল করল।

ফোন বন্ধ।

ঠিক তখনই পিছন থেকে সরলার গলা শোনা গেল।

“আপনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু সময় থেকে বেরোতে পারেননি।”

অরিত্র ঘুরে দাঁড়াল।

বৃদ্ধা সরলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।

“আপনি জানতেন, আমার সঙ্গে এমন হবে?”

“জানতাম না। তবে আশঙ্কা করেছিলাম।”

“আমি যে ছেলেটিকে দেখলাম, সে কে?”

সরলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“সেটা আপনার নিজের স্মৃতি। আপনি যখন ছোট ছিলেন, তখন এই বাড়িতে এসেছিলেন। আপনার মনে নেই, কারণ সেই দিনের অনেক ঘটনা আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।”

“আমার বাবা কেন সবকিছু লুকিয়েছেন?”

সরলা উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে তাকালেন।

“কারণ আপনার বাবা আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যেভাবে আপনাকে বাঁচিয়েছেন, তার ফলে আরও একজন মানুষের জীবন বদলে গেছে।”

“কে সেই মানুষ?”

সরলা চোখ নামিয়ে বললেন, “আপনার দিদি অদিতি।”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“অদিতির সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?”

“আপনি যখন জন্মেছিলেন, তখন আপনার যমজ বোন অদিতির জন্মের রেকর্ড নিয়ে বড়সড় গোলমাল হয়েছিল। কিন্তু সেটা শুধু পরিচয় বদলের ঘটনা ছিল না। আপনার বাবা একটি পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি চেষ্টা করেছিলেন, আপনার জীবনের যে মুহূর্তটি হারিয়ে গিয়েছিল, সেটিকে ফিরিয়ে আনতে।”

“কোন মুহূর্ত?”

“আপনার জন্মের আগের রাত।”

সরলা তাঁকে একটি ছোট্ট ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের ভিতরে একটি কাঠের আলমারি। আলমারির ভিতর থেকে তিনি একটি পুরোনো ক্যাসেট বের করলেন।

“এটি আপনার বাবার রেকর্ডিং। এত বছর ধরে আমি এটি লুকিয়ে রেখেছি।”

অরিত্র ক্যাসেটটি হাতে নিল।

“এতে কী আছে?”

“আপনার বাবার স্বীকারোক্তি।”


সেদিন সন্ধ্যায় অরিত্র কলকাতায় ফিরে এল। সারা পথ তার মাথায় ঘুরছিল সরলার কথা। সে সরাসরি বাড়ি না গিয়ে একটি পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ার কিনল। তারপর বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ক্যাসেটটি চালাল।

প্রথমে কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর বাবার কণ্ঠ।

“আজ ১৬ নভেম্বর, ১৯৯৮। আমি জানি না, এই রেকর্ডিং কোনওদিন কেউ শুনবে কি না। কিন্তু যদি অরিত্র শুনে, তবে আমার কথা মন দিয়ে শোনো, বাবা।”

অরিত্রর চোখ ভিজে উঠল।

“তোমার জন্মের আগে তোমার মায়ের গর্ভে দুটি শিশু ছিল। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, একটি শিশুকে বাঁচানো কঠিন হতে পারে। আমি সেই সময় একটি গবেষণাগারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেখানে মানুষের স্মৃতি ও সময় সম্পর্কে কিছু পরীক্ষা চলছিল। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তোমাকে বাঁচানো যাবে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অরিন্দমের গলা আরও ভারী হয়ে উঠল।

“কিন্তু আমি ভুল করেছিলাম। পরীক্ষার সময় তোমার জীবনের দুটি সম্ভাব্য পরিণতি তৈরি হয়েছিল। একটিতে তুমি বেঁচে ছিলে, অন্যটিতে তুমি জন্মের আগেই মারা গিয়েছিলে। আমি তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেই পরীক্ষার ফলে তোমার স্মৃতির কিছু অংশ এমনভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেনি।”

অরিত্র শ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

“আমি তোমার জন্মের তারিখ বদলাইনি, কিন্তু তোমার পরিচয়ের কিছু নথি বদলেছিলাম, যাতে গবেষণার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক গোপন থাকে। পরে যখন বুঝলাম, পরীক্ষাটি বিপজ্জনক, তখন সবকিছু বন্ধ করে দিই। কিন্তু চৌদ্দ নম্বর ঘর বন্ধ করতে পারিনি।”

ক্যাসেটে আচমকা একটা শব্দ হল।

তারপর বাবার কণ্ঠ আবার শোনা গেল।

“সবচেয়ে বড় বিপদ হল, সেই ঘরের মধ্যে তোমার একটি স্মৃতি আটকে আছে। সেই স্মৃতি যদি সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসে, তাহলে তুমি এমন কিছু দেখতে পাবে, যা তোমার বর্তমান জীবনকে বদলে দিতে পারে।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

অরিত্র দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তাহলে চৌদ্দ নম্বর ঘরের যুবকটি কি সত্যিই তার ভবিষ্যৎ নয়? সে কি তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিরই একটি রূপ?

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

অরিত্র দরজা খুলে দেখল, অদিতি দাঁড়িয়ে আছে।

তার মুখে উদ্বেগ।

“দাদা, বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

অরিত্র উঠে দাঁড়াল।

“কখন থেকে?”

“আজ দুপুর থেকে। তাঁর ফোন বন্ধ। তাঁর ঘরে একটা চিঠি পেয়েছি।”

অদিতি একটি ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দিল।

চিঠিতে লেখা—

‘অরিত্র যদি চৌদ্দ নম্বর ঘরে ঢুকে থাকে, তবে আমাকে খুঁজতে এসো না। আমি এমন একটি জায়গায় যাচ্ছি, যেখানে তোমাদের কারও যাওয়া উচিত নয়।’

চিঠির নীচে একটি ঠিকানা।

শিমুলডাঙা নয়।

কলকাতার একটি পুরোনো হাসপাতাল।

অরিত্র ঠিকানাটা পড়েই চিনতে পারল। এই সেই হাসপাতাল, যেখানে তার জন্মের সময় তাকে ভর্তি করা হয়েছিল।

অদিতি বলল, “দাদা, বাবা কি সত্যিই সময় নিয়ে কোনও পরীক্ষা করেছিলেন?”

অরিত্র উত্তর দিল না।

সে শুধু বাবার চিঠিটা পকেটে রাখল।

“আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে।”


রাত সাড়ে দশটা।

হাসপাতালটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। চারপাশে আগাছা, ভাঙা দেওয়াল, মরচে ধরা গেট। কিন্তু ভিতরে ঢুকতেই অরিত্র দেখল, একটি ঘরে আলো জ্বলছে।

ঘরটির দরজায় লেখা—

‘গবেষণা বিভাগ—প্রবেশ নিষেধ।’

দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই তারা দেখল, অরিন্দম একটি টেবিলের সামনে বসে আছেন। তাঁর সামনে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য নথি, পুরোনো ছবি এবং একটি ছোট্ট ধাতব যন্ত্র।

বাবাকে দেখে অরিত্র ছুটে গেল।

“তুমি এখানে কী করছ?”

অরিন্দম মুখ তুললেন।

“তোমাদের এখানে আসার কথা ছিল না।”

অদিতি বলল, “আপনি আমাদের কাছ থেকে আর কত কিছু লুকিয়ে রাখবেন?”

অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি তোমাদের রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, সত্যিটা লুকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।”

তিনি টেবিলের উপর একটি ছবি রাখলেন।

ছবিতে একটি ছোট্ট ছেলে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। তার পাশে একজন চিকিৎসক। ছবির নীচে লেখা—

‘১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮। পরীক্ষার প্রথম পর্যায়।’

অরিত্র ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল।

ছেলেটি তার মতো দেখতে।

কিন্তু ছবির পিছনে একটি অদ্ভুত তথ্য লেখা ছিল—

‘রোগীর বয়স: ০ বছর। পর্যবেক্ষণের সময়: ৪৮ বছর।’

অরিত্রর গলা শুকিয়ে গেল।

“এটা কীভাবে সম্ভব?”

অরিন্দম বললেন, “এটাই চৌদ্দ নম্বর ঘরের প্রকৃত রহস্য। সেখানে সময়কে আটকে রাখা হয়নি। সেখানে মানুষের স্মৃতি আর সম্ভাব্য জীবনের রেকর্ড তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার সময় কিছু রেকর্ড বাস্তব মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।”

“তাহলে ঘরের ভিতরে যে লোকটিকে দেখেছি, সে কি বাস্তব নয়?”

“সে বাস্তবও হতে পারে, আবার তোমার স্মৃতির প্রতিফলনও হতে পারে। আমি এখনও নিশ্চিত নই।”

অরিত্র বাবার দিকে তাকাল।

“তুমি কি জানো, সে আমাকে কী বলেছে?”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

“সে বলেছে, আমার প্রথম জীবন শেষ হয়ে গেছে। আর আমার দ্বিতীয় জীবনও শেষ হতে চলেছে।”

অরিন্দমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“তাহলে সে তোমার কাছে পৌঁছে গেছে।”

“কে?”

বাবা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের পিছনের দেওয়ালে থাকা একটি মনিটর নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।

পর্দায় দেখা গেল চৌদ্দ নম্বর ঘর।

সেই যুবকটি আবার চেয়ারে বসে আছে।

কিন্তু এবার তার সামনে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

অরিত্রর মতো দেখতে সেই যুবকটি মাথা তুলল।

আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি মুখ ঘোরাতেই অরিত্র চিৎকার করে উঠল।

কারণ লোকটি আর কেউ নয়।

অরিত্র নিজেই।

কিন্তু তার মুখে গভীর ক্ষত, চোখের নীচে কালো দাগ, আর গলায় রক্তের চিহ্ন।

মনিটরের ভিতরের অরিত্র ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে তাকাল।

তারপর বলল—

“বাবা, ওকে বলো, চৌদ্দ নম্বর ঘর থেকে যেন আর কখনও বেরোতে না পারে। কারণ ও যদি বাইরে আসে, তাহলে আমি জন্মাব না।”

মনিটর অন্ধকার হয়ে গেল।

অরিত্র বাবার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—

“বাবা… তাহলে আমি কে?”

অরিন্দম কোনও উত্তর দিলেন না।

শুধু টেবিলের উপর রাখা ধাতব যন্ত্রটি তুলে নিয়ে বললেন—

“এবার তোমাকে এমন একটি সত্য জানাতে হবে, যার জন্য হয়তো তুমি আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারবে না।”

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

চৌদ্দ নম্বর ঘর (প্রথম পর্ব: যে ঘরে সময় থেমে আছে)।

রাত বারোটা তেরো মিনিট।

কলকাতার আকাশে তখন ঘন মেঘ। জানলার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে। অরিত্র সেন বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু ঘুম আসছিল না। গত কয়েক সপ্তাহে তার জীবনে এত কিছু ঘটে গেছে যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া তার পক্ষে সহজ হচ্ছিল না।

তেরো নম্বর বাড়ির রহস্যের সমাধান হয়েছে। তার হারিয়ে যাওয়া বোন অদিতি ফিরে এসেছে। বহু বছর ধরে মৃত বলে পরিচিত বাবা অরিন্দম সেনও পরিবারের কাছে ফিরেছেন। আর যে দাদুকে সে একসময় পরিবারের সম্মানিত মানুষ বলে জানত, তাঁর অপরাধের ইতিহাস এখন পুলিশের তদন্তের বিষয়।

সবকিছু যেন শেষ।

অথচ অরিত্রর মনে হচ্ছিল, কোনও অদৃশ্য হাত তাকে এখনও অতীতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ তার ফোনের পর্দা জ্বলে উঠল।

একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এসেছে।

‘তেরো নম্বর দরজা বন্ধ হয়েছে। এবার চৌদ্দ নম্বর ঘর খুলবে। সেখানে তোমার জন্য এমন একজন অপেক্ষা করছে, যাকে তুমি কোনওদিন জন্মাতে দেখনি, অথচ সে তোমার চেয়েও বয়সে বড়।’

অরিত্র বার্তাটি দুবার পড়ল।

তারপর নম্বরটিতে ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

সে বার্তাটির স্ক্রিনশট তুলে বাবাকে পাঠাতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দ্বিতীয় একটি বার্তা এল।

‘এই রহস্যের কথা অরিন্দম সেনকে জানিয়ো না। তিনি জানেন, চৌদ্দ নম্বর ঘরে কী আছে।’

অরিত্রর আঙুল থেমে গেল।

তার বাবা কি তবে আরও কিছু লুকিয়ে রেখেছেন?

পরদিন সকালেই সে বাবার সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু সকালে উঠে দেখল, বাবা বাড়িতে নেই। মৃণালিনী জানালেন, ভোর পাঁচটায় একটি ফোন পাওয়ার পর অরিন্দম বেরিয়ে গেছেন। কোথায় যাচ্ছেন, তা বলেননি।

“কোনও ফোন এসেছিল?” অরিত্র জিজ্ঞাসা করল।

মা মাথা নাড়লেন।

“আমি শুধু শুনেছি, উনি বলছিলেন—‘না, এবার আর কাউকে মরতে দেব না।’ তারপর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন।”

অরিত্রর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

চৌদ্দ নম্বর ঘর।

বাবার গোপন কথা।

আর সেই অচেনা বার্তা।

সবকিছুর মধ্যে কোনও একটা যোগসূত্র রয়েছে।

সে বাবার ঘরে গেল। আলমারি, টেবিল, বইয়ের তাক—সব খুঁজেও কিছু পেল না। অবশেষে টেবিলের নীচের ড্রয়ার খুলতেই একটি পুরোনো খাম চোখে পড়ল।

খামের উপরে লেখা—

‘অরিত্রর জন্য। আমার মৃত্যুর পর।’

কিন্তু অরিন্দম তো জীবিত!

অরিত্র খাম খুলল।

ভিতরে একটি পুরোনো ট্রেনের টিকিট, একটি ছোট্ট চাবি এবং হাতে লেখা একটি ঠিকানা।

স্থান: শিমুলডাঙা, নদিয়ার একটি পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি।

চিঠিতে লেখা—

“অরিত্র,

যদি কখনও চৌদ্দ নম্বর ঘরের কথা জানতে পারো, তবে বুঝবে আমার অতীত আবার তোমার সামনে ফিরে এসেছে।

শিমুলডাঙার বাড়িটিতে একসময় চৌদ্দটি ঘর ছিল। তেরোটি ঘর মানুষের ব্যবহারের জন্য, আর শেষ ঘরটি এমন একটি সত্যকে লুকিয়ে রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, যা জানাজানি হলে আমাদের পরিবারের ইতিহাস বদলে যেত।

আমি তোমাকে সেখানে যেতে নিষেধ করতে পারতাম। কিন্তু এবার আর তোমাকে আটকানোর অধিকার আমার নেই।

তবে একটি কথা মনে রেখো—চৌদ্দ নম্বর ঘরের দরজা খোলার আগে ঘড়ির দিকে তাকাবে। কারণ ওই ঘরে সময়ের হিসাব অন্যরকম।

ইতি, বাবা।”

অরিত্র চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।

সে জানত, তাকে শিমুলডাঙায় যেতেই হবে।


দুপুরের ট্রেনে অরিত্র নদিয়ার উদ্দেশে রওনা দিল।

ট্রেন যখন শহর ছেড়ে গ্রামবাংলার দিকে এগোতে লাগল, জানলার বাইরে ধানখেত, পুকুর, ছোট ছোট স্টেশন পেছনে পড়ে যেতে লাগল। কিন্তু অরিত্রর চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল বাবার দেওয়া পুরোনো টিকিটটির দিকে।

টিকিটে তারিখ লেখা ছিল—১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮।

সেই দিনই তার জন্ম।

কিন্তু টিকিটটি কাটা হয়েছিল তার জন্মের তিন মাস আগে।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, যাত্রীর নামের জায়গায় লেখা—

‘অরিত্র সেন—বয়স ৪৬ বছর।’

অরিত্রর বয়স এখন আটাশ।

কে তার জন্মের আগেই তার নামে টিকিট কেটেছিল?

আর কেনই বা সেখানে তার বয়স ছেচল্লিশ লেখা?

ট্রেনের কামরায় বসে থাকা এক বৃদ্ধ হঠাৎ টিকিটটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কি শিমুলডাঙায় যাচ্ছেন?”

অরিত্র চমকে উঠল।

“হ্যাঁ। আপনি কী করে জানলেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। বরং জানলার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “ওই বাড়িতে যাবেন না। যারা চৌদ্দ নম্বর ঘরে ঢুকেছে, তারা সবাই ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু কেউ আগের মানুষ হয়ে ফেরেনি।”

“আপনি কি কাউকে চেনেন, যিনি ওই ঘরে গিয়েছিলেন?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে অরিত্রর দিকে তাকালেন।

“আমি নিজেই গিয়েছিলাম।”

অরিত্রর গলা শুকিয়ে গেল।

“কবে?”

“১৯৭৮ সালে।”

“তারপর কী হয়েছিল?”

বৃদ্ধ নিজের বাঁ হাতের কবজি দেখালেন। সেখানে একটি পুরোনো ঘড়ি বাঁধা। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে বারোটা তেরো মিনিটে।

“আমি ঘরে ঢোকার সময় আমার বয়স ছিল উনিশ। বেরিয়ে আসার সময় আমার বয়সও ছিল উনিশ। কিন্তু বাইরে ততক্ষণে কেটে গেছে সাতাশ বছর।”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

“এটা কীভাবে সম্ভব?”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তো আপনি যাচ্ছেন।”

পরের স্টেশনে ট্রেন থামতেই বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। নামার আগে তিনি অরিত্রর হাতে একটি কাগজ গুঁজে দিলেন।

“যদি ঘরের ভিতর নিজেরই আরেকটি রূপ দেখতে পান, তার সঙ্গে কথা বলবেন না। আর মনে রাখবেন, যে ঘড়ি বারোটা তেরো মিনিটে থেমে থাকে, সেটি কখনও সময় দেখায় না। সেটি দেখায় মৃত্যুর মুহূর্ত।”

বৃদ্ধ নেমে গেলেন।

অরিত্র জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্মে আর কেউ নেই।

ট্রেন ছাড়ার পর সে কাগজটা খুলল।

সেখানে একটি মাত্র বাক্য লেখা—

‘অরিন্দম সেন তোমার বাবা, কিন্তু তোমার জন্মের সাক্ষী তিনি নন।’


বিকেল চারটে নাগাদ অরিত্র শিমুলডাঙায় পৌঁছল।

স্টেশন থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে জমিদারবাড়ি। চারপাশে ঘন গাছপালা, ভাঙা ইটের পথ, পরিত্যক্ত পুকুর। বাড়িটির সামনে পৌঁছে অরিত্র দেখল, লোহার গেটে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

‘সেনবাড়ি। প্রবেশ নিষেধ।’

গেটের তালায় বাবার দেওয়া চাবিটি লাগাতেই সেটি খুলে গেল।

ভিতরে ঢুকে অরিত্র অবাক হয়ে দেখল, বাড়িটি বাইরে থেকে যতটা জরাজীর্ণ মনে হচ্ছিল, ভিতরে ততটা নয়। উঠোন ঝাঁট দেওয়া, বারান্দায় ধুলো কম, এমনকি একটি ঘরে তাজা ফুল রাখা।

কেউ এখানে নিয়মিত আসে।

দোতলার করিডরে চৌদ্দটি দরজা। প্রথম তেরোটির গায়ে নম্বর লেখা। কিন্তু শেষ দরজাটির গায়ে কোনও নম্বর নেই।

অরিত্র এগিয়ে গিয়ে দরজাটি পরীক্ষা করল।

হাতল ঠান্ডা।

দরজার নীচ দিয়ে হালকা হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একজন বৃদ্ধার কণ্ঠ শোনা গেল।

“আপনি অবশেষে এলেন।”

অরিত্র ঘুরে দাঁড়াল।

সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি ট্রে। ট্রেতে দুটো চায়ের কাপ।

“আপনি কে?” অরিত্র জিজ্ঞাসা করল।

“আমার নাম সরলা। এই বাড়ির দেখাশোনা করি।”

“এখানে তো কেউ থাকে না বলে শুনেছি।”

সরলা মৃদু হাসলেন।

“মানুষ থাকে না। কিন্তু অপেক্ষা তো থাকে।”

“কিসের অপেক্ষা?”

“আপনার।”

অরিত্রর মনে হল, তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে যাচ্ছে।

সরলা ট্রে থেকে একটি কাপ তুলে তার হাতে দিলেন।

“চা খান। তারপর ঘর খুলবেন।”

“আপনি জানেন, ভিতরে কী আছে?”

“জানি। তবে আপনি যা দেখতে যাচ্ছেন, তা দেখার জন্য আপনি এখনও প্রস্তুত নন।”

অরিত্র চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।

“আমি প্রস্তুত কি না, সেটা আমি ঠিক করব।”

সে বাবার দেওয়া ছোট্ট চাবিটা বের করল।

চাবি তালায় ঢুকতেই ভিতর থেকে ঘড়ির শব্দ শোনা গেল।

টিক।

টিক।

টিক।

দরজার ওপাশে যেন অসংখ্য ঘড়ি একসঙ্গে চলছে।

অরিত্র চাবি ঘোরাল।

দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।

ঘরের ভিতরে একটি বড় টেবিল, দেওয়ালে অসংখ্য ঘড়ি, আর মাঝখানে একটি পুরোনো কাঠের চেয়ার।

চেয়ারে বসে আছে একজন যুবক।

তার বয়স আটাশের কাছাকাছি।

পরনে নীল শার্ট, কালো প্যান্ট। চুলের বাঁ দিকে ছোট্ট একটি দাগ। চোখের নীচে একই রকম তিল।

অরিত্রর নিজের মুখের সঙ্গে তার মুখের কোনও পার্থক্য নেই।

যুবকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“অবশেষে তুমি এলে, অদ্বৈত।”

অরিত্রর বুকের ভিতর ধক করে উঠল।

“আমার নাম অরিত্র।”

যুবকটি হাসল।

“তোমাকে এই নামেই বড় করা হয়েছে। কিন্তু তোমার জন্মের সময় যে নাম রাখা হয়েছিল, সেটা আমি জানি।”

“তুমি কে?”

যুবকটি টেবিলের উপর রাখা একটি পুরোনো জন্মসনদ এগিয়ে দিল।

সেখানে দুটি শিশুর নাম লেখা—

‘অদ্বৈত মুখার্জি’ এবং ‘অরিত্র সেন’।

জন্মের তারিখ একই।

কিন্তু নীচের লাইনে এমন একটি তথ্য লেখা ছিল, যা অরিত্রর মাথা ঘুরিয়ে দিল।

দুজনের জন্মের ব্যবধান: ৪৮ বছর।

অরিত্র কাগজটা ফেলে দিল।

“এটা অসম্ভব!”

যুবকটি উঠে দাঁড়াল।

“তোমার কাছে অসম্ভব। কিন্তু এই ঘরে সময় একবারও সোজা পথে চলে না।”

“তুমি কি আমার যমজ ভাই?”

যুবকটি মাথা নাড়ল।

“না। আমি তুমি।”

অরিত্র পিছিয়ে গেল।

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

যুবকটি দেওয়ালের ঘড়িগুলোর দিকে তাকাল। প্রতিটি ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে বারোটা তেরো মিনিটে।

“আমি সেই অরিত্র, যে এই ঘর থেকে বেরোতে পারেনি। আর তুমি সেই অরিত্র, যে এখনও নিজের জীবনের শুরুতেই দাঁড়িয়ে আছে।”

“কিন্তু আমার বয়স আটাশ!”

“তোমার শরীরের বয়স আটাশ। কিন্তু তোমার জীবনের একটি অংশ এখানে আটকে আছে। তুমি জন্মানোর আগেই এই ঘরে তোমার ভবিষ্যৎ লেখা হয়েছিল।”

অরিত্র আর কথা বলতে পারল না।

যুবকটি টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি ছবি বের করল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অরিত্র একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে অরিন্দম সেন। ছবির নীচে তারিখ—

‘১৭ নভেম্বর, ২০৪৪।’

অরিত্রর হাত কাঁপতে লাগল।

“এটা তো ভবিষ্যতের তারিখ!”

যুবকটি মৃদু হাসল।

“হ্যাঁ। কারণ চৌদ্দ নম্বর ঘরে সময় থেমে থাকে না। এখানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ একই দরজার তিনটি দিক।”

ঠিক তখনই ঘরের সব ঘড়ি একসঙ্গে বাজতে শুরু করল।

ঢং!

ঢং!

ঢং!

বারোটা তেরো মিনিট।

যুবকটি অরিত্রর হাত চেপে ধরল।

“শোনো। তোমার বাবা এখন বিপদে। এই ঘর খোলার কথা তিনি কখনও চাননি। কারণ এখানে যে সত্য লুকিয়ে আছে, তা জানলে তুমি তাঁকে আর কখনও ক্ষমা করতে পারবে না।”

অরিত্র চিৎকার করে উঠল, “কী সত্য?”

যুবকটি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

“তোমার বাবা তোমাকে এই পৃথিবীতে আসতে দেননি।”

অরিত্রর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

“কী বললে?”

“তুমি যে জীবন বেঁচে আছ, সেটি আসলে তোমার দ্বিতীয় জীবন। প্রথম জীবনে তুমি জন্মানোর আগেই মারা গিয়েছিলে। আর তোমাকে বাঁচানোর জন্য অরিন্দম এমন একটি কাজ করেছিলেন, যার মূল্য এখনও তাঁকে দিতে হচ্ছে।”

ঘরের আলো হঠাৎ নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে অরিত্র অনুভব করল, কেউ তার হাত থেকে চাবিটা কেড়ে নিচ্ছে।

তারপর সেই পরিচিত কণ্ঠ আবার ভেসে এল।

“এবার তোমার পালা। ঘর থেকে বেরোবে, না কি আমার জায়গায় থেকে যাবে?”

আলো ফিরে আসতেই অরিত্র দেখল, চেয়ারটি খালি।

যুবকটি নেই।

টেবিলের উপর শুধু একটি কাগজ পড়ে আছে।

কাগজে লেখা—

‘যদি সত্য জানতে চাও, তবে ১৭ নভেম্বর, ২০৪৪-এর আগে তোমার বাবাকে খুঁজে বের করো। নইলে তোমার দ্বিতীয় জীবনও শেষ হয়ে যাবে।’

অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকাল।

তার ফোনে তারিখ দেখাচ্ছে—২৪ অক্টোবর, ২০২৬।

অর্থাৎ তার হাতে এখনও আঠারো বছর সময় আছে।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।

প্রেরক—অরিন্দম সেন।

‘অরিত্র, তুমি যদি চৌদ্দ নম্বর ঘরে ঢুকে থাকো, তাহলে মনে রেখো—ওখানে যে মানুষটিকে দেখেছ, সে তোমার ভবিষ্যৎ নয়। সে তোমার প্রথম জীবনের শেষ সাক্ষী।’

বার্তাটির নীচে আরও একটি লাইন—

‘আর সে তোমাকে হত্যা করতে চায়।’

ঠিক তখনই ঘরের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

আর দেওয়ালের ঘড়িগুলোর কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।

Share This
Categories
বিবিধ

১৩০ বছরের প্রাচীন ভান্ডানী পুজোয় মাতল বাইরাগুড়ি, চার হাতের দেবীমূর্তি দেখতে ভিড় দর্শনার্থীদের।

নিজস্ব সংবাদদাতা, আলিপুরদুয়ার:-ঐতিহ্যবাহী ভান্ডানী পূজা অনুষ্ঠিত হলো আলিপুরদুয়ার জেলার বঞ্চুকামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাইরাগুড়ি গ্রামে।মহা ধুমধামে পালিত হয় পূজা।রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিশেষ এই পূজা মা দূর্গার বিদায়ের পর একদশীর দিনে এই পূজা করা হয়। এবারের পূজা ১৩০ বছর পূর্ণ হলো। কমিটির এক সদস্য বলেন,এই পূজার অনেক ইতিহাস রয়েছে,রাজ আমলে দূর্গা পূজায় প্রজারা সেভাবে যেতে পারতোনা রাজবাড়িতে পূজা দেখতে,শেষে মা বিদায়ের পর এক প্রজার স্বপ্নে আসে সয়ং মা দূর্গা। তখন থেকেই চার হাতের মা দূর্গার পূজা হয় সাথে থাকে লক্ষী গনেশ সরস্বতী কার্তিক তবে থাকে না অসুর। সেসময় ভন্ড করে এই পূজা করা হয় তখন থেকেই এই পূজার নাম হয় ভান্ডানী পূজা।তবে এই পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচুর দর্শনার্থীদের ভীড় জমে , নানান পসড়া নিয়ে দোকান বসে এই পূজায় ।একটি মেলার আয়োজন হয়।থাকে বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান। ।

Share This