Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

শিবসাগর: অসমের ইতিহাস, আহোম রাজত্ব আর অপূর্ব জলাশয়ের শহর।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অসম রাজ্যে এমন একটি শহর রয়েছে, যেখানে ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় আটকে নেই; ছড়িয়ে রয়েছে বিশাল জলাশয়ের তীরে, প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্যে, রাজাদের সমাধিক্ষেত্রে এবং শতাব্দীপ্রাচীন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে। সেই শহরের নাম শিবসাগর (Sivasagar)। একসময় আহোম রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই শহর আজ অসমের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক মূল্যবান ভাণ্ডার।

শিবসাগরে বেড়াতে গেলে মনে হয়, সময়ের এক দীর্ঘ সেতু পেরিয়ে অতীতের কাছে পৌঁছে গিয়েছি। কোথাও বিশাল পুকুরের শান্ত জল, কোথাও লালচে ইটের প্রাচীন প্রাসাদ, কোথাও মন্দিরের সুউচ্চ শিখর, আবার কোথাও রাজাদের সমাধিক্ষেত্র নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।

অসমকে অনেকে চা-বাগান, ব্রহ্মপুত্র নদ, কাজিরাঙার গণ্ডার কিংবা সবুজ পাহাড়ের জন্য চেনেন। কিন্তু এই রাজ্যের ইতিহাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে আহোম রাজবংশের সঙ্গে জড়িয়ে। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে অসমের একটি বড় অংশে আহোমদের শাসন চলেছিল। সেই দীর্ঘ ইতিহাসের বহু চিহ্ন আজও শিবসাগর ও তার আশপাশে দেখা যায়।

যাঁরা ইতিহাস ভালোবাসেন, প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে পছন্দ করেন, স্থানীয় সংস্কৃতি জানতে চান কিংবা ভিড়ের বাইরে একটু ভিন্ন ধরনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাঁদের জন্য শিবসাগর একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।

শিবসাগর কোথায় অবস্থিত?

শিবসাগর অসমের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শহর। এটি গুয়াহাটি থেকে বেশ দূরে এবং উচ্চ অসমের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলির সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত।

শহরটির পুরনো নাম ছিল রংপুর। আহোম শাসনামলে রংপুর রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে শিবসাগর নামটি বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে শহরের বিশাল জলাশয় এবং তার তীরে নির্মিত শিবমন্দিরের কারণে।

শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শিবসাগর পুকুর বা শিবসাগর ট্যাঙ্ক এই অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত নিদর্শন। এর আশপাশে রয়েছে শিবদোল, বিষ্ণুদোল এবং দেবীদোলের মতো ঐতিহাসিক মন্দির।

শিবসাগরের বিশেষত্ব হলো, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা শহরের মধ্যে বা তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা করে ভ্রমণ করলে একাধিক দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব।

আহোম রাজবংশের ইতিহাস

শিবসাগরকে বুঝতে হলে প্রথমে আহোম রাজবংশের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জানা দরকার।

১৩শ শতকে সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিক থেকে সুইকাফা নামের এক শাসক ও তাঁর অনুসারীরা বর্তমান অসম অঞ্চলে প্রবেশ করেন। ১২২৮ সালকে সাধারণত অসমে আহোম রাজ্যের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ধীরে ধীরে আহোমরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

আহোম রাজত্বের ইতিহাস দীর্ঘ এবং পরিবর্তনশীল। এই সময়ে প্রশাসন, কৃষি, সামরিক ব্যবস্থা, স্থাপত্য, ধর্মীয় জীবন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে নানা পরিবর্তন ঘটে।

আহোম শাসকেরা স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসমের সমাজ ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠেন। তাঁদের শাসনামলে নির্মিত দুর্গ, প্রাসাদ, মন্দির, জলাশয় ও সমাধিসৌধ আজও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

আহোম রাজ্যকে শুধু একটি রাজবংশের ইতিহাস হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি অসমের রাজনৈতিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

শিবসাগরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরলে এই দীর্ঘ সময়ের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

শিবসাগর পুকুর: শহরের প্রাণকেন্দ্র

শিবসাগরের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলির একটি হলো বিশাল শিবসাগর পুকুর।

শহরের মাঝখানে অবস্থিত এই জলাশয়টি শুধু জল সংরক্ষণের স্থান নয়; এটি শহরের ইতিহাস ও পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুকুরের চারপাশে প্রাচীন স্থাপত্যের উপস্থিতি জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

শান্ত জলের উপর আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে। চারপাশের গাছপালা এবং ঐতিহাসিক মন্দিরের দৃশ্য মিলিয়ে এখানে একটি মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়।

সকালের দিকে পুকুরের ধারে গেলে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ উপভোগ করা যায়। বিকেলেও এখানে আলো-ছায়ার সুন্দর খেলা দেখা যায়।

জলাশয়ের চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়, প্রাচীনকালে বড় জলাধার নির্মাণ শুধু সৌন্দর্যের জন্য ছিল না। জল সংরক্ষণ, ধর্মীয় কার্যকলাপ এবং নগরজীবনের সঙ্গে এমন জলাশয়ের গভীর সম্পর্ক ছিল।

শিবদোল: শিবসাগরের অন্যতম প্রতীক

শিবসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির মধ্যে শিবদোল (Sivadol) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শিবসাগর পুকুরের তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি আহোম স্থাপত্যের পরিচিত নিদর্শনগুলির একটি। অষ্টাদশ শতকে আহোম শাসনামলে এর নির্মাণের সঙ্গে রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক রয়েছে।

মন্দিরের সুউচ্চ শিখর দূর থেকেই নজর কাড়ে। এর স্থাপত্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের বিভিন্ন প্রভাব দেখা যায়।

মন্দিরের চারপাশের পরিবেশও বেশ সুন্দর। একদিকে বিস্তৃত জলাশয়, অন্যদিকে প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য—এই সমন্বয় শিবদোলকে শিবসাগরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান করে তুলেছে।

ধর্মীয় উৎসব বা বিশেষ পূজার সময় এখানে ভক্তদের সমাগম হতে পারে। সে সময় ভ্রমণকারীদের মন্দিরের নিয়ম মেনে চলা এবং উপাসনায় ব্যস্ত মানুষদের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।

শিবদোল শুধু ধর্মীয় স্থান নয়; এটি অসমের স্থাপত্য ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনও।

বিষ্ণুদোল ও দেবীদোল

শিবসাগর পুকুরের আশপাশে অবস্থিত আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মন্দির হলো বিষ্ণুদোল (Vishnudol) এবং দেবীদোল (Devidol)।

এই মন্দিরগুলি আহোম রাজত্বের ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে। রাজপরিবারের উদ্যোগে নির্মিত ধর্মীয় স্থাপনাগুলি সে সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

বিষ্ণুদোলের সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর উপাসনার সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে দেবীদোল দেবী উপাসনার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

তিনটি মন্দির একই অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় পর্যটকেরা একসঙ্গে এগুলি ঘুরে দেখতে পারেন। স্থাপত্যের নকশা, শিখরের গঠন এবং আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করলে মন্দিরগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়।

প্রাচীন মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, নির্মাণকৌশল, শিল্পরুচি এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাসও মনে পড়ে।

রংঘর: আহোম রাজাদের ঐতিহাসিক ক্রীড়া মঞ্চ

শিবসাগরের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপত্য হলো রংঘর (Rang Ghar)। এটি আহোম যুগের একটি ঐতিহাসিক প্যাভিলিয়ন, যা রাজপরিবারের সদস্য ও অভিজাতদের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

রংঘরকে প্রায়ই এশিয়ার প্রাচীনতম টিকে থাকা অ্যাম্ফিথিয়েটার-ধাঁচের স্থাপনাগুলির একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে এর ব্যবহার ও স্থাপত্যের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা বুঝতে হলে আহোম রাজদরবারের প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।

এই স্থাপনার বিশেষত্ব হলো এর ছাদের আকৃতি এবং ইটের নির্মাণশৈলী। ছাদটি নৌকার উল্টানো আকৃতির মতো বলে অনেকের কাছে মনে হয়। স্থাপনাটির গঠন অসমের আঞ্চলিক স্থাপত্যধারার পরিচয় বহন করে।

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, রাজপরিবারের সদস্যরা এখানে বসে বিভিন্ন ক্রীড়া ও উৎসব দেখতেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী মহিষের লড়াই এবং অন্যান্য প্রদর্শনী রাজকীয় বিনোদনের অংশ ছিল।

আজ রংঘর ইতিহাসপ্রেমী, স্থাপত্যপ্রেমী এবং ফটোগ্রাফারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

এর সামনে দাঁড়িয়ে ভাবা যায়, একসময় এখানে রাজদরবারের মানুষজন সমবেত হতেন, আর আশপাশের মাঠে চলত বিভিন্ন অনুষ্ঠান।

তলাতল ঘৰ: মাটির নিচে ইতিহাস

শিবসাগরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো তলাতল ঘৰ (Talatal Ghar)।

এটি আহোম যুগের একটি রাজকীয় স্থাপত্য, যা সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর নির্মাণে একাধিক তলা এবং ভূগর্ভস্থ অংশের বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত।

তলাতল ঘরের গঠন রংঘরের তুলনায় ভিন্ন। এখানে রাজকীয় বসবাসের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত ব্যবহারের সম্ভাবনাও ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে।

স্থাপনাটির কিছু অংশ বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত বা সীমিতভাবে সংরক্ষিত। তাই সব অংশে প্রবেশের সুযোগ নাও থাকতে পারে। কোথায় যাওয়া যাবে এবং কোন অংশ বন্ধ রয়েছে, তা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

তলাতল ঘরের ইটের দেওয়াল, প্রাচীন কাঠামো এবং স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশ আহোমদের নির্মাণকৌশল সম্পর্কে ধারণা দেয়।

এখানে ঘুরতে গেলে মনে হয়, প্রাচীন স্থাপত্য শুধু রাজাদের বাসস্থান ছিল না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রতিরক্ষা এবং দৈনন্দিন রাজকীয় জীবনের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

কারেং ঘৰ: রাজপ্রাসাদের স্মৃতি

কারেং ঘৰ (Kareng Ghar) নামটি আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত। এটি গড়গাঁও অঞ্চলে অবস্থিত এবং শিবসাগর ভ্রমণের বিস্তৃত ঐতিহাসিক পরিসরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

কারেং ঘরের বর্তমান কাঠামো এবং তার ইতিহাস আহোম রাজত্বের রাজকীয় জীবন সম্পর্কে ধারণা দেয়। অতীতে রাজপরিবারের বাসস্থান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং রাজদরবারের নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই ধরনের প্রাসাদ যুক্ত ছিল।

শিবসাগর শহর থেকে গড়গাঁও অঞ্চলে যাওয়ার জন্য আলাদা যাতায়াতের পরিকল্পনা করতে হবে। তাই একদিনে সব স্থান ঘোরার চেষ্টা না করে সময় হাতে রাখা ভালো।

প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ দেখার সময় স্থাপত্যের গঠন, দেওয়ালের নির্মাণকৌশল এবং চারপাশের ভূপ্রকৃতি লক্ষ করলে অতীতের নগরপরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

চড়াইদেও: আহোম সমাধিসৌধের ঐতিহ্য

শিবসাগর ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত করা যায় আরেকটি ঐতিহাসিক অঞ্চল—চড়াইদেও (Charaideo)।

এখানে আহোম রাজপরিবার ও অভিজাতদের সমাধিসৌধ বা মৈদাম (Moidam) রয়েছে। এগুলি আহোমদের মৃত্যুসংক্রান্ত আচার, রাজকীয় ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

মৈদামগুলির গঠন অনেক সময় মাটির ঢিবির মতো দেখায়। কিন্তু এগুলির ভিতরে সমাধি-সংক্রান্ত কাঠামো থাকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে।

আহোম রাজপরিবারের সদস্যদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত এই সমাধিক্ষেত্রগুলি অসমের ঐতিহাসিক পরিচয়ের এক বিশেষ অংশ।

চড়াইদেওর মৈদামগুলিকে ২০২৪ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই স্বীকৃতি আহোম সমাধি-ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

এখানে ভ্রমণের সময় স্থানটিকে শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে না দেখে ঐতিহাসিক সমাধিক্ষেত্র হিসেবে সম্মান করা জরুরি। সংরক্ষিত অংশে ওঠা, কাঠামো স্পর্শ করা বা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করা উচিত নয়।

চড়াইদেও শিবসাগর শহরের বাইরে হওয়ায় সেখানে যাওয়ার জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ রাখা ভালো।

আহোমদের জলব্যবস্থা ও নগরপরিকল্পনা

শিবসাগরের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানে ইতিহাসের সঙ্গে জলব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা যায়।

বড় বড় পুকুর, জলাধার এবং জলাশয়ের পাশে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের ঐতিহ্য আহোম যুগের নগরপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

এই জলাশয়গুলি কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নির্মিত হয়নি। পানীয় জল, দৈনন্দিন ব্যবহার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে জলাধারের সম্পর্ক ছিল।

শিবসাগরের মতো অঞ্চলে প্রাচীন জলাশয়গুলি আজও শহরের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। গরমের দিনে জলাশয়ের আশপাশে তুলনামূলক খোলা ও শান্ত পরিবেশ অনুভব করা যায়।

জলাধার ও ঐতিহাসিক স্থাপনা একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, অতীতের শাসকেরা নগরজীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনকে কীভাবে স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

শিবসাগরের সংস্কৃতি

শিবসাগরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে অসমীয়া ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, উৎসব এবং স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি গভীরভাবে জড়িত।

অসমের বিহু উৎসব এখানকার মানুষের জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিহুর বিভিন্ন রূপের সঙ্গে কৃষি, ঋতুচক্র, সংগীত এবং সামাজিক আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে।

স্থানীয় উৎসবের সময় শিবসাগরে গেলে অসমীয়া সংস্কৃতির প্রাণবন্ত দিক অনুভব করা যেতে পারে। তবে উৎসবের নির্দিষ্ট তারিখ ও অনুষ্ঠানসূচি আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

শহরের বাজার, খাবারের দোকান এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যবেক্ষণ করলেও এখানকার সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ভ্রমণকালে স্থানীয় ভাষা ও রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখানো, ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া এবং ধর্মীয় স্থানে উপযুক্ত আচরণ বজায় রাখা উচিত।

শিবসাগরের খাবার

অসমের খাবারের নিজস্ব স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শিবসাগরে গেলে স্থানীয় অসমীয়া খাবার চেখে দেখা যেতে পারে।

ভাত অসমীয়া খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার সঙ্গে ডাল, শাকসবজি, মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক পদ পরিবেশন করা হয়।

অসমে মাছের নানা পদ জনপ্রিয়। সরষে, স্থানীয় মশলা, টক স্বাদের উপকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ব্যবহার করে রান্না করা হয় নানা খাবার।

এ ছাড়া পিঠা, লারু এবং চাল থেকে তৈরি বিভিন্ন মিষ্টি বা জলখাবার অসমীয়া উৎসব ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত।

চা অসমের পরিচিত পানীয়। শিবসাগরের কোনও স্থানীয় দোকানে বসে এক কাপ অসমীয়া চা পান করলে ভ্রমণের মধ্যে আরামদায়ক বিরতি নেওয়া যায়।

তবে নির্দিষ্ট কোনও খাবার সব জায়গায় পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় রেস্তোরাঁয় মেনু দেখে এবং খাবারের উপকরণ জেনে অর্ডার করা ভালো।

চা-বাগান ও সবুজ প্রকৃতি

অসমের পরিচয়ের সঙ্গে চা-বাগানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। শিবসাগর ও তার আশপাশের বৃহত্তর অঞ্চলেও চা উৎপাদনের ইতিহাস ও চাষের দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

সারিবদ্ধ চা-গাছের সবুজ ঢেউ, দূরে শ্রমিকদের কাজের দৃশ্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ—চা-বাগান পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।

তবে সব চা-বাগান পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে না। কোনও বাগানে প্রবেশ করতে চাইলে মালিকপক্ষ বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া উচিত।

চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় সেখানে কর্মরত মানুষের কাজের পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা প্রয়োজন।

চা উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকলে পাতা তোলা, প্রক্রিয়াকরণ এবং চা তৈরির বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শিবসাগরের বাজার ও স্থানীয় কেনাকাটা

শিবসাগরের স্থানীয় বাজারে গেলে দৈনন্দিন জীবন এবং আঞ্চলিক পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

অসমের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র, গামোছা, স্থানীয় হস্তশিল্প এবং চা ভ্রমণের স্মারক হিসেবে কেনা যেতে পারে।

অসমীয়া গামোছা শুধু কাপড় নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, সম্মান ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত। তাই স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্য কিনলে তার কারিগরি ও সাংস্কৃতিক মূল্য সম্পর্কে জানা ভালো।

কেনাকাটার সময় দাম তুলনা করা এবং পণ্যের উৎস সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।

স্থানীয় শিল্পী বা ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য কিনলে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা সম্ভব।

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য শিবসাগর

শিবসাগর মূলত ঐতিহাসিক শহর হিসেবে পরিচিত হলেও এর আশপাশের সবুজ পরিবেশও আকর্ষণীয়।

শহরের জলাশয়ের ধারে হাঁটা, গাছপালার মধ্যে সময় কাটানো এবং গ্রামীণ এলাকার দৃশ্য দেখা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

শহরের বাইরে গেলে বিস্তৃত সবুজ ভূখণ্ড, কৃষিজমি এবং অসমের গ্রামীণ জীবন চোখে পড়ে। বর্ষাকালে প্রকৃতি আরও সজীব হয়ে উঠতে পারে।

যাঁরা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাঁরা প্রাচীন স্থাপত্যের পাশাপাশি স্থানীয় জীবন, জলাশয়ের প্রতিবিম্ব এবং সবুজ প্রকৃতির ছবিও তুলতে পারেন।

তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে আবর্জনা ফেলা, গাছপালা নষ্ট করা কিংবা অন্যের জমিতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা উচিত নয়।

শিবসাগর ভ্রমণের সেরা সময়

শিবসাগর ভ্রমণের জন্য সাধারণত শীতকাল অনেক পর্যটকের কাছে আরামদায়ক সময়। আবহাওয়া তুলনামূলক ঠান্ডা থাকায় ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখা সহজ হতে পারে।

শীতকাল

শীতকালে দিনের বেলা দর্শনীয় স্থান ঘোরা আরামদায়ক হতে পারে। সকালের দিকে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে, তাই পাতলা গরম পোশাক সঙ্গে রাখা ভালো।

গ্রীষ্মকাল

গ্রীষ্মে দিনের তাপমাত্রা বাড়তে পারে। সকালে বা বিকেলে দর্শনীয় স্থান ঘোরার পরিকল্পনা করলে গরমের কষ্ট কিছুটা কমানো যায়। পানীয় জল সঙ্গে রাখা এবং রোদ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত।

বর্ষাকাল

বর্ষায় অসমের প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে। তবে বৃষ্টি, জল জমা এবং যাতায়াতের সমস্যার সম্ভাবনা থাকে। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও রাস্তার অবস্থা যাচাই করে ভ্রমণ করা ভালো।

ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার জন্য যে সময়ই বেছে নেওয়া হোক, স্থানীয় উৎসব, সরকারি ছুটি এবং দর্শনীয় স্থানের বর্তমান খোলার সময় সম্পর্কে আগে থেকে খোঁজ নেওয়া উচিত।

কীভাবে শিবসাগরে পৌঁছবেন?

রেলপথে

শিবসাগর অঞ্চলে রেল যোগাযোগ রয়েছে। যাত্রার শুরু কোথা থেকে হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে শিবসাগর বা নিকটবর্তী সুবিধাজনক স্টেশন বেছে নেওয়া যায়।

রেল টিকিট কাটার আগে স্টেশনের অবস্থান, ট্রেনের সময়সূচি এবং সেখান থেকে হোটেল বা দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার ব্যবস্থা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

সড়কপথে

অসমের বিভিন্ন শহর থেকে সড়কপথে শিবসাগরে পৌঁছনো যায়। গুয়াহাটি থেকে দীর্ঘ সড়কযাত্রা হতে পারে, তাই পর্যাপ্ত সময় হাতে রাখা ভালো।

ব্যক্তিগত গাড়ি বা ভাড়া করা গাড়িতে গেলে পথে বিরতি নেওয়া এবং আশপাশের অঞ্চল দেখার সুযোগ থাকে।

বিমানপথে

দূরবর্তী স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা প্রথমে অসমের উপযুক্ত বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে শিবসাগরে যেতে পারেন। কোন বিমানবন্দর ব্যবহার করা সুবিধাজনক হবে, তা বিমানের সংযোগ ও সড়কযাত্রার সময়ের উপর নির্ভর করবে।

যাত্রার আগে বিমান, রেল ও সড়ক পরিবহনের সর্বশেষ সময়সূচি দেখে নেওয়া ভালো।

তিন দিনের শিবসাগর ভ্রমণ পরিকল্পনা

প্রথম দিন: শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র

প্রথম দিন শিবসাগর পুকুর, শিবদোল, বিষ্ণুদোল এবং দেবীদোল ঘুরে দেখা যেতে পারে।

সকালে মন্দির ও জলাশয়ের আশপাশ ঘুরে দুপুরে স্থানীয় খাবার খাওয়া যায়। বিকেলে পুকুরের ধারে সময় কাটিয়ে শহরের বাজারে ঘোরা যেতে পারে।

দ্বিতীয় দিন: রংঘর ও তলাতল ঘৰ

দ্বিতীয় দিন রংঘর এবং তলাতল ঘর দেখার জন্য রাখা যায়। এই দুটি স্থাপনা আহোম রাজত্বের স্থাপত্য ও রাজকীয় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।

সময় থাকলে কাছাকাছি অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানও দেখা যেতে পারে। তবে প্রতিটি স্থানের প্রবেশের সময় ও বর্তমান অবস্থা আগে যাচাই করা ভালো।

তৃতীয় দিন: গড়গাঁও বা চড়াইদেও

তৃতীয় দিনে গড়গাঁও অঞ্চলের কারেং ঘৰ অথবা চড়াইদেওর মৈদাম দেখার পরিকল্পনা করা যায়।

দুটি অঞ্চলই ইতিহাসের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তবে যাতায়াতের সময় বিবেচনা করে একটি বেছে নেওয়া যেতে পারে। হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে এবং গাড়ির ব্যবস্থা সুবিধাজনক হলে দুটিই দেখার পরিকল্পনা করা সম্ভব হতে পারে।

পাঁচ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা

পাঁচ দিন সময় থাকলে শিবসাগরকে আরও ধীরে উপভোগ করা যায়।

প্রথম দিন শহরের পুকুর ও মন্দিরগুলি দেখা যেতে পারে। দ্বিতীয় দিন রংঘর ও তলাতল ঘর। তৃতীয় দিন গড়গাঁওয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা। চতুর্থ দিন চড়াইদেওর মৈদাম এবং আশপাশের অঞ্চল। পঞ্চম দিন স্থানীয় বাজার, অসমীয়া খাবার, চা এবং শহরের দৈনন্দিন জীবন উপভোগ করে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

এই পরিকল্পনা অনুসরণ করলে প্রতিদিন তাড়াহুড়ো না করে স্থাপত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার সময় পাওয়া যায়।

পরিবার নিয়ে শিবসাগর ভ্রমণ

শিবসাগর পরিবার নিয়ে বেড়ানোর জন্য উপযোগী হতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে চান।

শিশুদের নিয়ে রংঘর, তলাতল ঘর এবং মন্দিরগুলি ঘুরে দেখলে তাদের কাছে ইতিহাস আরও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রাচীন স্থাপনার সিঁড়ি, অসমতল পথ এবং কিছু জায়গায় সীমিত নিরাপত্তা-ব্যবস্থার কথা মাথায় রাখতে হবে।

বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে গেলে হোটেলের অবস্থান, গাড়ির সুবিধা, হাঁটার দূরত্ব এবং বিশ্রামের সুযোগ বিবেচনা করা ভালো।

এক দিনে অনেক স্থান দেখার চেষ্টা না করে প্রতিটি স্থানে পর্যাপ্ত সময় দিলে ভ্রমণ আরও আরামদায়ক হবে।

ফটোগ্রাফির জন্য শিবসাগর

শিবসাগর ফটোগ্রাফির জন্যও একটি আকর্ষণীয় স্থান। প্রাচীন মন্দিরের শিখর, রংঘরের স্থাপত্য, তলাতল ঘরের ইটের দেওয়াল এবং শিবসাগর পুকুরের জল—সব মিলিয়ে নানা ধরনের ছবি তোলার সুযোগ রয়েছে।

সকালের আলোয় ঐতিহাসিক স্থাপনার গঠন স্পষ্ট দেখা যায়। বিকেলের আলোয় ইটের রং এবং স্থাপত্যের ছায়া ছবিতে সুন্দর আবহ তৈরি করতে পারে।

জলাশয়ের প্রতিবিম্ব, মন্দিরের সামনে মানুষের চলাচল এবং স্থানীয় বাজারের দৃশ্যও ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

ধর্মীয় স্থানে ছবি তোলার আগে নিয়ম জেনে নেওয়া উচিত। কোনও স্থানে ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ থাকলে সেই নির্দেশ মেনে চলা জরুরি।

পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

শিবসাগরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি শুধু পর্যটনের সম্পদ নয়; এগুলি অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রাচীন দেওয়ালে নাম লেখা, ইট বা পাথর তুলে নেওয়া, আবর্জনা ফেলা কিংবা সংরক্ষিত অংশে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা ঐতিহ্যের ক্ষতি করতে পারে।

দর্শনীয় স্থানগুলিতে নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করা, আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং স্থানীয় নির্দেশিকা মেনে চলা উচিত।

মন্দিরে গেলে পোশাক ও আচরণ সম্পর্কে স্থানীয় রীতি সম্মান করা ভালো। সমাধিক্ষেত্র বা ঐতিহাসিক স্মৃতিস্থানে নীরবতা ও মর্যাদা বজায় রাখা জরুরি।

দায়িত্বশীল পর্যটন মানে শুধু নিজের ভ্রমণকে আনন্দময় করা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি অক্ষত রাখতেও সাহায্য করা।

শেষকথা

শিবসাগর এমন একটি শহর, যেখানে অসমের অতীতকে চোখের সামনে দেখা যায়। শিবসাগর পুকুরের শান্ত জল, শিবদোলের সুউচ্চ শিখর, রংঘরের অনন্য স্থাপত্য, তলাতল ঘরের প্রাচীন কাঠামো এবং চড়াইদেওর মৈদাম—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এক মূল্যবান ভ্রমণগন্তব্য।

এখানে বেড়াতে গেলে বোঝা যায়, একটি শহরের পরিচয় শুধু তার বর্তমান জীবনযাত্রা দিয়ে তৈরি হয় না। তার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু শতাব্দীর শাসন, মানুষের বিশ্বাস, স্থাপত্যের বিকাশ এবং সামাজিক পরিবর্তনের গল্প।

শিবসাগরের পথে হাঁটতে হাঁটতে কখনও মনে হবে আপনি এক প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, আবার কখনও জলাশয়ের ধারে বসে বর্তমানের শান্ত জীবন উপভোগ করছেন। এই দুই সময়ের সহাবস্থানই শহরটিকে বিশেষ করে তোলে।

যাঁরা অসম ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য শিবসাগর হতে পারে এমন একটি গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতি ও ইতিহাস একসঙ্গে ধরা দেয়। এখানে প্রতিটি প্রাচীন স্থাপনা একটি গল্প বলে, প্রতিটি জলাশয় অতীতের স্মৃতি বহন করে, আর প্রতিটি ভ্রমণ নতুন করে চিনিয়ে দেয় অসমের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে।

শিবসাগর তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর নয়; এটি আহোম রাজত্বের দীর্ঘ উত্তরাধিকার, অসমীয়া সংস্কৃতির গভীরতা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্ময়কর অতীতের এক জীবন্ত পরিচয়।

==========  শেষ ==========

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

চিখলদারা: মহারাষ্ট্রের পাহাড়ে মেঘ, বন আর নীরব প্রকৃতির এক অপূর্ব ঠিকানা।

ভারতের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে এমন অনেক পাহাড়ি অঞ্চল রয়েছে, যেগুলি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির তুলনায় এখনও কিছুটা নিরিবিলি। মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার চিখলদারা (Chikhaldara) তেমনই একটি মনোমুগ্ধকর গন্তব্য। সাতপুরা পর্বতমালার কোলে অবস্থিত এই পাহাড়ি অঞ্চল তার সবুজ অরণ্য, গভীর উপত্যকা, মেঘে ঢাকা পাহাড়, মনোরম সূর্যোদয় এবং বন্যপ্রাণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

শহরের ব্যস্ততা, যানবাহনের শব্দ এবং প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবন থেকে দূরে কয়েকটি দিন কাটাতে চাইলে চিখলদারা হতে পারে এক সুন্দর বিকল্প। এখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে মেঘ নেমে আসে, অরণ্যের ভিতর দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে যায় দূরের উপত্যকার দিকে, আর ভোরের আলোয় পাহাড়ের সারি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চিখলদারার সৌন্দর্য শুধু কয়েকটি দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই অঞ্চলের প্রকৃতি, ইতিহাস, স্থানীয় জনজীবন, বনভূমি এবং পাহাড়ি আবহাওয়া মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিবেশ। যারা প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখতে ভালোবাসেন, ফটোগ্রাফি করেন, পাহাড়ে হাঁটতে পছন্দ করেন কিংবা পরিবারের সঙ্গে শান্ত পরিবেশে ছুটি কাটাতে চান, তাঁদের জন্য এই স্থানটি আকর্ষণীয় হতে পারে।

চিখলদারা কোথায় অবস্থিত?

চিখলদারা মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলায় অবস্থিত একটি পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র। এটি সাতপুরা পর্বতমালার মেলঘাট অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যথেষ্ট উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া মহারাষ্ট্রের অনেক সমতল এলাকার তুলনায় আলাদা।

চিখলদারার আশপাশে রয়েছে ঘন বন, পাহাড়ি উপত্যকা এবং মেলঘাটের বিস্তৃত প্রাকৃতিক অঞ্চল। এই ভূপ্রকৃতির জন্যই জায়গাটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতী শহর থেকে সড়কপথে চিখলদারায় পৌঁছনো যায়। নিকটবর্তী রেল ও বিমান যোগাযোগের সুবিধা ব্যবহার করে পর্যটকেরা প্রথমে বড় শহরে পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি বা অন্যান্য সড়ক পরিবহনের মাধ্যমে পাহাড়ে যেতে পারেন।

চিখলদারা ভ্রমণের আগে রাস্তার অবস্থা, স্থানীয় পরিবহন, আবহাওয়া এবং থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো। বর্ষাকালে পাহাড়ি রাস্তা কখনও কখনও পিচ্ছিল হতে পারে এবং কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে।

সাতপুরা পাহাড়ের কোলে সবুজের রাজ্য

চিখলদারার প্রধান আকর্ষণ তার পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি। সাতপুরা পর্বতমালার ঢেউখেলানো পাহাড়, গভীর উপত্যকা এবং অরণ্য একে অন্যের সঙ্গে মিশে এমন একটি দৃশ্য তৈরি করেছে, যা একবার দেখলে সহজে ভোলা যায় না।

এখানে পাহাড়ের চূড়া থেকে তাকালে দূরে দূরে বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের সারি দেখা যায়। কোথাও পাহাড়ের ঢাল ঘন গাছে ঢাকা, কোথাও আবার খোলা পাথুরে অংশের পাশে সরু রাস্তা নেমে গেছে উপত্যকার দিকে।

বর্ষাকালে প্রকৃতি বিশেষভাবে সজীব হয়ে ওঠে। বৃষ্টির জলে গাছের পাতা ধুয়ে ঝকঝকে হয়ে ওঠে, পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ রং ছড়িয়ে পড়ে এবং মেঘ কখনও পাহাড়ের চূড়া ঢেকে দেয়, কখনও আবার হঠাৎ সরে গিয়ে দূরের দৃশ্য প্রকাশ করে।

শীতকালে আবহাওয়া তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে। পরিষ্কার দিনে দূরের পাহাড় ও উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যেতে পারে। গ্রীষ্মের সময়ও চিখলদারা আশপাশের সমতল এলাকার তুলনায় অনেকের কাছে আরামদায়ক মনে হতে পারে।

তবে পাহাড়ি আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে পারে। তাই ভ্রমণের সময় হালকা গরম পোশাক, বৃষ্টির উপযোগী সামগ্রী এবং আরামদায়ক জুতো সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

ভীমকুণ্ড: ইতিহাস ও কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থান

চিখলদারার পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে ভীমকুণ্ড (Bhimkund) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই স্থানকে ঘিরে স্থানীয় লোককথা ও মহাভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে।

লোকবিশ্বাস অনুসারে, পাণ্ডবদের বনবাসের সময় ভীমের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই সূত্রেই স্থানটির নাম ভীমকুণ্ড হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এই ধরনের কাহিনিকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে না দেখে স্থানীয় ঐতিহ্য ও জনশ্রুতির অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

ভীমকুণ্ডের আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, পাথুরে অংশ এবং চারপাশের সবুজ দৃশ্য এখানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে অন্য মাত্রা দেয়।

এ ধরনের স্থানে ঘোরার সময় স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশ মেনে চলা জরুরি। পাথরের উপর ওঠা, অজানা পথে নামা বা বিপজ্জনক প্রান্তের কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।

মেলঘাট টাইগার রিজার্ভ: বন্যপ্রাণের বিস্তৃত আবাস

চিখলদারার কাছাকাছি মেলঘাট অঞ্চল তার বনভূমি ও বন্যপ্রাণের জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকার একটি হলো Melghat Tiger Reserve।

সাতপুরা পর্বতমালার অংশজুড়ে বিস্তৃত এই অরণ্য বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণ, পাখি, সরীসৃপ এবং উদ্ভিদের আবাসস্থল। বাঘ এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। এ ছাড়াও এখানে চিতাবাঘ, হরিণ, বুনো শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির বানর এবং অসংখ্য পাখি দেখা যেতে পারে।

তবে বন্যপ্রাণ দেখার বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। পর্যটন সফরে গেলেই বাঘ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

মেলঘাটের অরণ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রবেশপথ, নির্দিষ্ট সাফারি ব্যবস্থা এবং বনবিভাগের নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সংরক্ষিত অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা, প্রাণীদের খাবার দেওয়া, জোরে শব্দ করা বা বন্যপ্রাণের খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।

বন্যপ্রাণ দেখার আনন্দ শুধু বড় প্রাণী খুঁজে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অরণ্যের গাছপালা, পাখির ডাক, মাটির গন্ধ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের নীরবতাও এই ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গাওয়িলগড় দুর্গ: পাহাড়ের ইতিহাস

চিখলদারার ঐতিহাসিক আকর্ষণগুলির মধ্যে গাওয়িলগড় দুর্গ (Gawilgarh Fort) অন্যতম। সাতপুরা পাহাড়ের দুর্গম ভূপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত এই দুর্গের ইতিহাস মধ্যযুগীয় দাক্ষিণাত্য ও বিদর্ভ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দুর্গটি একসময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাহাড়ি অবস্থান, উঁচু প্রাচীর এবং আশপাশের ভূপ্রকৃতি প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সুবিধা দিত।

দুর্গের অবশিষ্ট কাঠামো, প্রবেশপথ এবং প্রাচীন স্থাপত্যের চিহ্ন অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাসপ্রেমীরা এখানে এসে কল্পনা করতে পারেন, একসময় এই পাহাড়ি দুর্গকে কেন্দ্র করে কীভাবে সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ পরিচালিত হতো।

দুর্গের মতো ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণের সময় স্থাপত্যের ক্ষতি না করা, দেওয়ালে কিছু না লেখা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অংশ থেকে পাথর বা অন্য বস্তু তুলে না নেওয়া উচিত।

এখানে যাওয়ার আগে বর্তমান প্রবেশের নিয়ম, রাস্তার অবস্থা এবং স্থানীয় গাইডের প্রয়োজন আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।

ভিউ পয়েন্ট: পাহাড়কে নতুন চোখে দেখা

চিখলদারার বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট থেকে পাহাড় ও উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। এগুলি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়, কারণ অল্প সময়ে পাহাড়ি অঞ্চলের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ মেলে।

হারিকেন পয়েন্ট

হারিকেন পয়েন্ট চিখলদারার পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলির একটি। এখান থেকে পাহাড়ের ঢাল, গভীর উপত্যকা এবং দূরের সবুজ ভূখণ্ড দেখা যায়।

আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে দৃশ্যের বিস্তার বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়। আবার বর্ষাকালে মেঘের আনাগোনা দৃশ্যকে নাটকীয় করে তুলতে পারে।

ডেভিলস পয়েন্ট

ডেভিলস পয়েন্ট নামের এই স্থানটি তার পাহাড়ি অবস্থান ও উপত্যকার দৃশ্যের জন্য পরিচিত। এখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রকৃতি দেখা যায় এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুভব করা যায়।

পাহাড়ের প্রান্তে ছবি তোলার সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। পাথর ভেজা থাকলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

প্রস্পেক্ট পয়েন্ট

প্রস্পেক্ট পয়েন্ট থেকেও পাহাড় ও উপত্যকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়। যাঁরা শান্তভাবে প্রকৃতি দেখতে চান, তাঁদের জন্য এমন স্থানগুলি বেশ উপযোগী।

দিনের বিভিন্ন সময়ে আলো বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই পাহাড়ের রংও বদলে যায়। সকালবেলার কোমল আলো, দুপুরের উজ্জ্বলতা এবং বিকেলের সোনালি আভা—প্রতিটি সময়ে দৃশ্যের আলাদা বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।

তবে ভিউ পয়েন্টগুলির নাম, প্রবেশের অবস্থা ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে যাচাই করে নেওয়া ভালো, কারণ কিছু স্থানে রক্ষণাবেক্ষণ বা প্রবেশের নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে।

সূর্যোদয়ের মুহূর্ত

পাহাড়ি ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা হলো সূর্যোদয় দেখা। চিখলদারায় ভোরের আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের উপর ছড়িয়ে পড়লে প্রকৃতি যেন নতুন করে জেগে ওঠে।

প্রথমে দূরের পাহাড়গুলি অন্ধকার ছায়ার মতো দেখা যায়। তারপর আকাশের রং বদলাতে শুরু করে। কমলা ও সোনালি আলো পাহাড়ের গায়ে পড়লে সবুজ অরণ্যের রং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভোরের বাতাসে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। চারপাশে মানুষের ভিড় কম থাকলে পাখির ডাক এবং প্রকৃতির অন্যান্য শব্দ আরও ভালোভাবে শোনা যায়।

সূর্যোদয় দেখতে চাইলে আগের দিনই স্থানীয়দের কাছ থেকে উপযুক্ত জায়গা ও যাত্রার সময় জেনে নেওয়া উচিত। অন্ধকারে অচেনা পাহাড়ি পথে একা হাঁটা বা অনুমতি ছাড়া নির্জন স্থানে যাওয়া নিরাপদ নয়।

বর্ষাকালে চিখলদারা

বর্ষা চিখলদারাকে এক ভিন্ন রূপ দেয়। বৃষ্টির জলে পাহাড়ের ঢাল সবুজ হয়ে ওঠে, মেঘ নেমে আসে উপত্যকায় এবং গাছপালা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।

এই সময়ে প্রকৃতির রং সবচেয়ে উজ্জ্বল মনে হতে পারে। পাহাড়ের গায়ে মেঘের ছায়া চলতে থাকে, কখনও দৃশ্য পরিষ্কার হয়, আবার কখনও চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে যায়।

ফটোগ্রাফির জন্য বর্ষাকাল আকর্ষণীয় হলেও কিছু অসুবিধাও রয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল হতে পারে, দৃশ্যমানতা কমতে পারে এবং কিছু প্রাকৃতিক স্থানে পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তাই বর্ষায় ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা, দিনের আলো থাকতে যাতায়াত করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা জরুরি।

যাঁরা আরামদায়ক ভ্রমণ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য বর্ষার ঠিক পরের সময়ও ভালো বিকল্প হতে পারে। তখন প্রকৃতি সবুজ থাকে, অথচ আবহাওয়া কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শীতের চিখলদারা

শীতকালে চিখলদারার পরিবেশ অনেকের কাছে বিশেষ মনোরম। ভোর ও রাতের দিকে তাপমাত্রা কমতে পারে। তাই গরম পোশাক সঙ্গে রাখা দরকার।

এই সময়ে পরিষ্কার আকাশের সম্ভাবনা থাকলে পাহাড় ও উপত্যকার দৃশ্য ভালোভাবে দেখা যায়। পাহাড়ি পথে হাঁটা, ভিউ পয়েন্টে সময় কাটানো এবং আশপাশের ঐতিহাসিক স্থান ঘোরার জন্য আবহাওয়া অনেক সময় অনুকূল থাকে।

শীতের সকালের কুয়াশা পাহাড়কে রহস্যময় করে তোলে। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা সরে গেলে দূরের পাহাড়ের সারি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রকৃতির এই পরিবর্তন দেখতে চাইলে খুব তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে ভ্রমণ করা ভালো।

চিখলদারার স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতি

চিখলদারা শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি স্থানীয় মানুষের বসবাস, কাজকর্ম এবং সংস্কৃতিরও একটি অংশ।

মেলঘাট অঞ্চলে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তাঁদের জীবনযাত্রা, ভাষা, খাদ্যসংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্থানীয় মানুষের জীবনকে কাছ থেকে জানতে চাইলে তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাঁদের ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখা জরুরি। কারও ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া উচিত। স্থানীয় রীতি বা বিশ্বাস সম্পর্কে কৌতূহল থাকলে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করা ভালো।

স্থানীয় দোকান থেকে খাবার বা হস্তশিল্প কিনলে এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখা যায়। তবে আদিবাসী সংস্কৃতিকে কেবল পর্যটনের প্রদর্শনী হিসেবে না দেখে তার স্বতন্ত্র পরিচয় ও মর্যাদাকে সম্মান করা প্রয়োজন।

চিখলদারার খাবার

চিখলদারায় ভ্রমণের সময় মহারাষ্ট্রের আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। এখানে স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি সাধারণ ভারতীয় খাবারও পাওয়া যায়।

মহারাষ্ট্রের পরিচিত খাবারের মধ্যে পোহা, ভাকরি, পিঠলা, ভাজি এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল ও সবজির পদ উল্লেখযোগ্য। তবে নির্দিষ্ট খাবার সব রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সকালের নাশতায় পোহা বা উপমার মতো খাবার, দুপুরে রুটি বা ভাকরির সঙ্গে সবজি কিংবা ডালের পদ এবং সন্ধ্যায় গরম চা—পাহাড়ি ভ্রমণের ক্লান্তি কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

খাবারের দোকান বেছে নেওয়ার সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া ভালো। পানীয় জলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে সিল করা বোতলের জল ব্যবহার করা উচিত।

যাঁদের নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস বা অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের খাবার অর্ডার করার আগে উপকরণ সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।

চিখলদারায় থাকার ব্যবস্থা

চিখলদারায় পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে। বাজেট অনুযায়ী সাধারণ হোটেল, পর্যটন আবাসন এবং তুলনামূলক আরামদায়ক থাকার জায়গা বেছে নেওয়া সম্ভব।

পরিবার নিয়ে গেলে পরিষ্কার ঘর, নিরাপদ পরিবেশ, গরম জল, খাবারের সুবিধা এবং গাড়ি রাখার জায়গা আছে কি না, তা আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার ইচ্ছা থাকলে এমন আবাসন বেছে নেওয়া যায়, যেখান থেকে পাহাড় বা সবুজ পরিবেশ দেখা যায়। তবে অরণ্যের খুব কাছে থাকা মানেই বন্যপ্রাণ দেখার নিশ্চয়তা নয়।

ছুটির দিন, দীর্ঘ সপ্তাহান্ত এবং পর্যটনের ব্যস্ত মরসুমে ঘরের চাহিদা বাড়তে পারে। তাই আগে থেকে বুকিং করলে সুবিধা হয়।

বুকিংয়ের আগে সাম্প্রতিক পর্যালোচনা, অবস্থান, যাতায়াতের সুবিধা এবং বাতিলের নিয়ম যাচাই করে নেওয়া উচিত।

কীভাবে পৌঁছবেন?

রেলপথে

চিখলদারায় যেতে প্রথমে অমরাবতী অঞ্চলের উপযুক্ত রেল সংযোগ ব্যবহার করা যেতে পারে। যাত্রার শুরু কোথা থেকে হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে অন্য নিকটবর্তী রেলস্টেশনও সুবিধাজনক হতে পারে।

রেলস্টেশন থেকে চিখলদারায় পৌঁছনোর জন্য গাড়ি বা স্থানীয় সড়ক পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। টিকিট কাটার আগে রেলপথ, সংযোগ এবং শেষ পর্যায়ের যাত্রার সময় যাচাই করা জরুরি।

সড়কপথে

অমরাবতী ও মহারাষ্ট্রের অন্যান্য শহর থেকে সড়কপথে চিখলদারায় যাওয়া যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি বা ভাড়া করা গাড়ি ব্যবহার করলে পথে থামা, ছবি তোলা এবং নিজের সুবিধামতো দর্শনীয় স্থান ঘোরার সুযোগ থাকে।

পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং কুয়াশা বা বৃষ্টির মধ্যে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা দরকার।

বিমানপথে

দূরবর্তী শহর থেকে আসা পর্যটকেরা প্রথমে উপযুক্ত বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে চিখলদারায় যেতে পারেন। কোন বিমানবন্দর সবচেয়ে সুবিধাজনক হবে, তা বিমানের সংযোগ, যাত্রার সময় এবং সড়কপথের অবস্থার উপর নির্ভর করে।

ভ্রমণের আগে বিমানবন্দর থেকে চিখলদারা পর্যন্ত গাড়ির ব্যবস্থা এবং আনুমানিক যাত্রাসময় যাচাই করে নেওয়া উচিত।

তিন দিনের চিখলদারা ভ্রমণ পরিকল্পনা

চিখলদারার প্রধান আকর্ষণগুলি দেখতে তিন দিনের একটি পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

প্রথম দিন: পাহাড়ি শহরের সঙ্গে পরিচয়

সকালে পৌঁছে হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে কাছাকাছি ভিউ পয়েন্ট ঘুরে দেখা যেতে পারে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে সূর্যাস্তের সময় পাহাড় ও উপত্যকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

রাতের খাবারের পর পরের দিনের পরিকল্পনা করে বিশ্রাম নেওয়া ভালো।

দ্বিতীয় দিন: প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ

সকালে মেলঘাট অঞ্চলের অনুমোদিত প্রাকৃতিক ভ্রমণ বা সাফারির ব্যবস্থা থাকলে তাতে অংশ নেওয়া যেতে পারে। এরপর স্থানীয় দর্শনীয় স্থান এবং নিরাপদ ভিউ পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়।

বন্যপ্রাণ দেখার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই প্রবেশের নিয়ম, বুকিং এবং সময় সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি।

তৃতীয় দিন: ইতিহাস ও স্থানীয় জীবন

তৃতীয় দিনে গাওয়িলগড় দুর্গ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখা যেতে পারে, যদি সেগুলিতে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকে। সময় থাকলে স্থানীয় বাজারে ঘুরে আঞ্চলিক খাবার বা হস্তশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

এই পরিকল্পনা আবহাওয়া, যাতায়াতের সুবিধা এবং দর্শনীয় স্থানগুলির বর্তমান প্রবেশব্যবস্থার উপর নির্ভর করে বদলে নেওয়া উচিত।

পাঁচ দিনের ভ্রমণে আরও গভীর অভিজ্ঞতা

পাঁচ দিন হাতে থাকলে চিখলদারাকে আরও ধীরে উপভোগ করা যায়।

প্রথম দিন পাহাড়ি শহর ও কাছাকাছি ভিউ পয়েন্ট দেখা যেতে পারে। দ্বিতীয় দিন মেলঘাটের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণের জন্য রাখা যায়। তৃতীয় দিন গাওয়িলগড় দুর্গ ও ঐতিহাসিক স্থান ঘোরা যেতে পারে। চতুর্থ দিন স্থানীয় জীবন, বাজার এবং প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো যায়। পঞ্চম দিন আবহাওয়া ভালো থাকলে আবার কোনো পছন্দের ভিউ পয়েন্টে গিয়ে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত উপভোগ করে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

তবে প্রতিদিন অনেকগুলি স্থান ঘোরার চেষ্টা না করাই ভালো। পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতে সময় লাগে, আর আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে পরিকল্পনা বদলাতে হতে পারে।

পরিবার ও শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ

পরিবারের সঙ্গে চিখলদারা ভ্রমণ করা সম্ভব। পাহাড়, বনভূমি ও প্রাকৃতিক দৃশ্য শিশুদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

তবে শিশুদের নিয়ে পাহাড়ি ভিউ পয়েন্টে গেলে সব সময় নজর রাখা জরুরি। খাড়া প্রান্ত, পিচ্ছিল পাথর এবং অচেনা পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।

বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে গেলে হোটেলের অবস্থান, সিঁড়ি ব্যবহারের প্রয়োজন, গাড়ির সুবিধা এবং চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকে খোঁজ নেওয়া ভালো।

যাঁদের হাঁটাচলায় অসুবিধা রয়েছে, তাঁদের জন্য সব দর্শনীয় স্থান সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে প্রতিটি স্থানে পৌঁছনোর পথ এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা জেনে নেওয়া উচিত।

ফটোগ্রাফির জন্য চিখলদারা

প্রকৃতিপ্রেমী ফটোগ্রাফারদের জন্য চিখলদারা আকর্ষণীয় একটি স্থান। পাহাড়ের সারি, মেঘের চলাচল, সবুজ বনভূমি, পুরনো দুর্গ এবং ভোরের আলো—বিভিন্ন ধরনের ছবি তোলার সুযোগ রয়েছে।

ভোরের আলোয় পাহাড়ের রং তুলনামূলক কোমল থাকে। বিকেলের আলোয় উপত্যকার উপর ছায়া তৈরি হয়, যা ছবিতে গভীরতা এনে দিতে পারে।

বর্ষাকালে মেঘের মধ্যে পাহাড়ের আংশিক দৃশ্য বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে ক্যামেরা বা মোবাইল ফোনকে জল থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা রাখা দরকার।

বন্যপ্রাণের ছবি তুলতে গেলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। প্রাণীকে কাছে আনার জন্য খাবার দেওয়া, শব্দ করা বা তাদের স্বাভাবিক আচরণে বাধা দেওয়া কখনওই ঠিক নয়।

পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকের ভূমিকা

চিখলদারার মতো পাহাড়ি ও বনাঞ্চলসমৃদ্ধ স্থানের সৌন্দর্য রক্ষা করা পর্যটক, স্থানীয় প্রশাসন এবং বাসিন্দাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট বা অন্য আবর্জনা যেখানে-সেখানে ফেলে আসা উচিত নয়। সম্ভব হলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল ব্যবহার করা এবং আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা ভালো।

অরণ্যে উচ্চস্বরে গান বাজানো বা গাড়ির হর্ন অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যবহার করা বন্যপ্রাণ ও অন্যান্য পর্যটকদের বিরক্ত করতে পারে।

গাছপালা নষ্ট করা, ফুল ছেঁড়া, পাথরে নাম লেখা বা প্রাকৃতিক জলাশয় দূষিত করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

বনাঞ্চলে আগুনের ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনুমোদিত স্থান ছাড়া আগুন জ্বালানো উচিত নয় এবং জ্বলন্ত দেশলাই বা সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কখনও অরণ্যে ফেলে আসা উচিত নয়।

প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি তাকে অক্ষত রেখে আসাই দায়িত্বশীল পর্যটনের মূল কথা।

ভ্রমণের সেরা সময়

চিখলদারা ভ্রমণের উপযুক্ত সময় নির্ভর করে আপনি কী ধরনের অভিজ্ঞতা চান তার উপর।

বর্ষাকাল: সবুজ পাহাড়, মেঘ এবং বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি দেখতে ভালো লাগলে বর্ষা আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে ভারী বৃষ্টি, পিচ্ছিল রাস্তা এবং কম দৃশ্যমানতার সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হবে।

শীতকাল: তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া, পাহাড়ি পথে ঘোরাঘুরি এবং পরিষ্কার দিনে উপত্যকার দৃশ্য উপভোগ করতে শীতকাল অনেকের কাছে ভালো সময়।

গ্রীষ্মকাল: সমতল এলাকার গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পাহাড়ি অঞ্চলে যাওয়া যেতে পারে। তবে দিনের আবহাওয়া, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং রোদ থেকে সুরক্ষার দিকে নজর রাখা জরুরি।

যাত্রার আগে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলির বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করলে অপ্রত্যাশিত সমস্যার সম্ভাবনা কমে।

যাওয়ার আগে কয়েকটি জরুরি পরামর্শ

চিখলদারা ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা ভালো।

  • পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার উপযোগী জুতো সঙ্গে রাখুন।
  • বর্ষাকালে রেইনকোট বা ছাতা এবং জলরোধী ব্যাগ ব্যবহার করুন।
  • শীতকালে গরম পোশাক নিন।
  • পরিচয়পত্র, হোটেল বুকিংয়ের তথ্য এবং জরুরি যোগাযোগ নম্বর সঙ্গে রাখুন।
  • বনাঞ্চলে প্রবেশের আগে অনুমতি ও সাফারির নিয়ম জেনে নিন।
  • স্থানীয় নির্দেশিকা ছাড়া অচেনা বনপথে প্রবেশ করবেন না।
  • সূর্যাস্তের পর অপরিচিত পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
  • যাত্রার আগে গাড়ি, রেল ও বিমান যোগাযোগের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করুন।

শেষকথা

চিখলদারা এমন এক পাহাড়ি গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, ইতিহাস এবং নিরিবিলি পরিবেশ একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। সাতপুরার সবুজ পাহাড়, মেলঘাটের অরণ্য, গাওয়িলগড় দুর্গের অতীত, ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখা বিস্তৃত উপত্যকা এবং ভোরের আলোয় জেগে ওঠা প্রকৃতি—সব মিলিয়ে জায়গাটি ভ্রমণকারীর মনে আলাদা ছাপ ফেলতে পারে।

এখানে বেড়াতে যাওয়ার অর্থ শুধু একের পর এক দর্শনীয় স্থান দেখা নয়। কখনও পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে নীরবে বসে থাকা, কখনও অরণ্যের শব্দ শোনা, কখনও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া, আবার কখনও পুরনো দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের কথা ভাবা—এই ছোট ছোট মুহূর্তই ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তোলে।

যাঁরা মহারাষ্ট্রকে শুধু মুম্বই, পুনে কিংবা জনপ্রিয় নগরকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেন, তাঁদের কাছে চিখলদারা রাজ্যের আরেকটি ভিন্ন রূপ তুলে ধরতে পারে। এখানে শহরের কোলাহলের পরিবর্তে রয়েছে পাহাড়ের নীরবতা, কংক্রিটের বিস্তারের পরিবর্তে সবুজ অরণ্য, আর ব্যস্ততার পরিবর্তে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ।

তাই সুযোগ পেলে চিখলদারাকে ভ্রমণতালিকায় রাখা যেতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিরাপত্তার দিকে নজর রেখে এই পাহাড়ি অঞ্চল ঘুরে দেখলে প্রকৃতির সঙ্গে এক সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। চিখলদারার পাহাড়, মেঘ ও অরণ্য তখন শুধু ছবির স্মৃতি হয়ে থাকবে না—মনে থেকে যাবে এক শান্ত, সবুজ ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা হিসেবে।

==========  শেষ ==========

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

চোপতা ও তুঙ্গনাথ: উত্তরাখণ্ডের মিনি সুইজারল্যান্ড, মেঘপাহাড় ও হিমালয়ের এক অপূর্ব তীর্থপথ।

ভূমিকা: যেখানে সবুজ পাহাড়ের গায়ে মেঘ নেমে আসে

ভারতের হিমালয় অঞ্চলে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন শান্ত হয়ে যায়। চারদিকে সবুজ পাহাড়, দূরে বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ, ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ ঢাল, ঘন বনের মধ্যে সরু পথ এবং পাহাড়ের গায়ে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ—এই সবকিছুর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে উত্তরাখণ্ডের এক অসাধারণ গন্তব্য, চোপতা ও তুঙ্গনাথ।

চোপতা এমন একটি পাহাড়ি অঞ্চল, যেখানে পৌঁছলে মনে হয় শহরের ব্যস্ততা যেন বহু দূরে হারিয়ে গেছে। গাড়ির হর্ন, যানজট কিংবা বহুতল ভবনের বদলে এখানে চোখে পড়ে বনভূমি, পাহাড়ি তৃণভূমি, ছোট ছোট বসতি এবং দূরের হিমালয়। আর চোপতা থেকে পাহাড়ি পথে এগিয়ে গেলে পৌঁছনো যায় তুঙ্গনাথে—বিশ্বের উচ্চতম শিবমন্দিরগুলির অন্যতম বলে পরিচিত এক প্রাচীন তীর্থস্থানে।

এই ভ্রমণের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, পাহাড়ে হাঁটার রোমাঞ্চ, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ। যাঁরা পাহাড় ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে চোপতা এক স্বপ্নের গন্তব্য। আবার যাঁরা ধর্মীয় ইতিহাস, প্রাচীন মন্দির ও হিমালয়ের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চান, তাঁদের জন্য তুঙ্গনাথ এক বিশেষ আকর্ষণ।

চোপতা ও তুঙ্গনাথের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে ভ্রমণের আনন্দ শুধু গন্তব্যে পৌঁছনোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ি পথে ধীরে ধীরে হাঁটা, বাতাসের শব্দ শোনা, দূরের শৃঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং প্রকৃতির পরিবর্তন অনুভব করাও এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চোপতা কোথায় অবস্থিত?

চোপতা ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার অন্তর্গত একটি পাহাড়ি অঞ্চল। এটি গাড়ওয়াল হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এবং তুঙ্গনাথ মন্দিরে যাওয়ার অন্যতম পরিচিত প্রবেশপথ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চোপতা তার সবুজ তৃণভূমি, বনভূমি এবং হিমালয়ের দৃশ্যের জন্য পরিচিত। এখানকার ভূপ্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। কোথাও ঘন বন, কোথাও খোলা পাহাড়ি ঢাল, আবার কোথাও দূরে দেখা যায় তুষারাবৃত পর্বতশ্রেণি।

চোপতার আশপাশে ওক, রডোডেনড্রনসহ বিভিন্ন পাহাড়ি উদ্ভিদ দেখা যায়। বসন্তকালে রডোডেনড্রনের ফুল পাহাড়ের দৃশ্যকে আরও রঙিন করে তোলে। গ্রীষ্মে তৃণভূমি সবুজ হয়ে ওঠে, আর শীতকালে তুষারপাত হলে গোটা অঞ্চল এক অন্য রূপ ধারণ করতে পারে।

চোপতা থেকে তুঙ্গনাথের দিকে যাওয়ার পথটি পাহাড়ি ট্রেকিংয়ের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একদিকে দেখা যায় গভীর উপত্যকা, অন্যদিকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয়ের বিশাল শৃঙ্গ।

চোপতাকে কেন মিনি সুইজারল্যান্ড বলা হয়?

চোপতাকে অনেক পর্যটনবিষয়ক লেখায় ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে উল্লেখ করা হয়। এই নামের পিছনে রয়েছে এখানকার বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি, ঢেউখেলানো পাহাড়, ঘন বন এবং দূরের তুষারশৃঙ্গের মনোরম দৃশ্য।

তবে এই উপমা মূলত পর্যটনভিত্তিক পরিচিতি। চোপতার নিজস্ব প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা না করেও উপভোগ করা যায়।

চোপতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর খোলা পাহাড়ি পরিবেশ। অনেক পাহাড়ি শহরে যেখানে হোটেল, দোকান ও যানবাহনের ভিড় বেশি, সেখানে চোপতার কিছু অংশে এখনও প্রকৃতির বিস্তৃত উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

সকালে সূর্যের আলো পাহাড়ের গায়ে পড়লে সবুজ ঢাল উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মেঘ নেমে এলে কখনও পুরো উপত্যকা ঢেকে যায়, আবার কিছুক্ষণ পর বাতাসে মেঘ সরে গিয়ে দূরের পর্বতশৃঙ্গ দেখা যায়।

এই পরিবর্তনশীল দৃশ্যই চোপতাকে ফটোগ্রাফার, প্রকৃতিপ্রেমী এবং পাহাড়ে হাঁটতে ভালোবাসা মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তুঙ্গনাথ মন্দির: মেঘের দেশে মহাদেবের আবাস

চোপতা থেকে পাহাড়ি পথে প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ কিলোমিটার ট্রেক করে পৌঁছনো যায় তুঙ্গনাথ মন্দিরে। উচ্চতা প্রায় ৩,৬৮০ মিটার বা ১২,০০০ ফুটের কাছাকাছি হওয়ায় এটি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।

তুঙ্গনাথ মন্দির পঞ্চকেদারের অন্যতম। পঞ্চকেদার হলো উত্তরাখণ্ডের গাড়ওয়াল অঞ্চলে অবস্থিত পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী শিবমন্দিরের সমষ্টি—কেদারনাথ, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, মধ্যমহেশ্বর এবং কল্পেশ্বর।

স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, মহাভারতের পাণ্ডবদের সঙ্গে এই মন্দিরগুলির প্রতিষ্ঠার কাহিনি যুক্ত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা পাপমোচনের জন্য শিবের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। শিব তাঁদের এড়াতে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন বলে লোককথায় বলা হয়। পঞ্চকেদারের সঙ্গে সেই কাহিনির নানা অংশ যুক্ত রয়েছে।

তুঙ্গনাথ মন্দিরের স্থাপত্যে পাথরের ব্যবহার এবং প্রাচীন পাহাড়ি নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। চারপাশে উঁচু পাহাড়, খোলা আকাশ এবং দূরের তুষারশৃঙ্গ মন্দিরটির পরিবেশকে বিশেষভাবে সুন্দর করে তুলেছে।

মন্দিরে পৌঁছনোর পর অনেক ভ্রমণকারী প্রথমে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন। দীর্ঘ পথ হাঁটার পর পাহাড়ের কোলে প্রাচীন মন্দিরের উপস্থিতি এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়।

তবে তুঙ্গনাথ শুধু পর্যটনের স্থান নয়; এটি একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান। তাই দর্শনের সময় স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা এবং ধর্মীয় পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।

তুঙ্গনাথে পৌঁছনোর ট্রেকিং পথ

চোপতা থেকে তুঙ্গনাথের ট্রেকটি উত্তরাখণ্ডের পরিচিত পাহাড়ি পদযাত্রাগুলির মধ্যে অন্যতম। দূরত্ব তুলনামূলক কম হলেও পথটি উঁচুতে ওঠে এবং উচ্চতার কারণে হাঁটা কঠিন মনে হতে পারে।

সাধারণত পাকা বা পাথর বসানো পাহাড়ি পথ ধরে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে হয়। পথের দুই পাশে কোথাও তৃণভূমি, কোথাও ঝোপঝাড়, আবার কোথাও ঘন বনভূমির দৃশ্য দেখা যায়।

শুরুতে পথটি সহজ মনে হলেও ক্রমশ উচ্চতা বাড়তে থাকায় শ্বাসের গতি বেড়ে যেতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো না করে নিজের স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা ভালো।

পথে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কিছু জায়গা পাওয়া যেতে পারে। তবে দোকান, খাবার বা পানীয় জলের ব্যবস্থা সব সময় একই রকম থাকবে—এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। সঙ্গে পানীয় জল, হালকা খাবার এবং আবহাওয়া অনুযায়ী পোশাক রাখা দরকার।

ট্রেকিংয়ের সময় আরামদায়ক, ভালো গ্রিপযুক্ত জুতো ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি বা তুষারপাত হলে পথ পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে।

শারীরিক অসুস্থতা, উচ্চতাজনিত সমস্যা বা হাঁটাচলায় অসুবিধা থাকলে যাত্রার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। পথে মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে হাঁটা বন্ধ করে প্রয়োজনীয় সাহায্য নিতে হবে।

চন্দ্রশিলা: আকাশের কাছাকাছি এক পাহাড়চূড়া

তুঙ্গনাথ থেকে আরও ওপরে একটি পরিচিত পাহাড়ি গন্তব্য হলো চন্দ্রশিলা (Chandrashila)। এটি তুঙ্গনাথ ট্রেকের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে জনপ্রিয়।

চন্দ্রশিলার উচ্চতা প্রায় ৪,০০০ মিটারেরও বেশি। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে হিমালয়ের বিস্তৃত পর্বতশ্রেণির দৃশ্য দেখা যেতে পারে। নন্দাদেবী, চৌখাম্বা এবং আশপাশের অন্যান্য শৃঙ্গের দৃশ্য এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ, যদিও দৃশ্যমানতা আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে।

চন্দ্রশিলায় পৌঁছনোর শেষ অংশ তুলনামূলক খাড়া হতে পারে। তুঙ্গনাথ পর্যন্ত হাঁটার পর আবার ওপরে ওঠার জন্য অতিরিক্ত সময় ও শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয়।

তাই চন্দ্রশিলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবহাওয়া, দিনের আলো, নিজের শারীরিক সক্ষমতা এবং স্থানীয় গাইডের পরামর্শ বিবেচনা করা উচিত।

শীতকালে বরফ জমে পথ বিপজ্জনক হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ গাইড ছাড়া বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়া ট্রেক করা উচিত নয়।

চন্দ্রশিলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিশাল হিমালয়কে কাছ থেকে দেখার অনুভূতি। পরিষ্কার আকাশের নিচে একের পর এক পর্বতশৃঙ্গ চোখের সামনে উঠে এলে পাহাড়ের বিশালতা নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়।

দেবরিয়া তাল: পাহাড়ের জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি

চোপতা অঞ্চলের কাছাকাছি আরেকটি জনপ্রিয় প্রাকৃতিক গন্তব্য হলো দেবরিয়া তাল (Deoria Tal)। এটি উত্তরাখণ্ডের উখিমঠ অঞ্চলের কাছে অবস্থিত একটি সুন্দর পাহাড়ি হ্রদ।

হ্রদের জলে আশপাশের পাহাড় ও বনভূমির প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরের পর্বতশৃঙ্গের প্রতিচ্ছবিও জলে ফুটে ওঠে।

দেবরিয়া তালের আশপাশের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত। এখানে পৌঁছে হ্রদের ধারে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা, ছবি তোলা এবং বনভূমির দৃশ্য দেখা যায়।

হ্রদের কাছে যাওয়ার জন্য সাধারণত উখিমঠ অঞ্চলের সারি গ্রাম থেকে ট্রেক করতে হয়। দূরত্ব খুব বেশি না হলেও পথ পাহাড়ি এবং কিছু অংশে চড়াই রয়েছে।

বর্ষাকালে কাদা ও পিচ্ছিল পথের সমস্যা হতে পারে। শীতকালে ঠান্ডা ও বরফের কারণে হাঁটা কঠিন হতে পারে। তাই যাত্রার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি।

দেবরিয়া তালকে পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হ্রদে বর্জ্য ফেলা, প্লাস্টিক ফেলে রাখা কিংবা জলজ পরিবেশের ক্ষতি করা উচিত নয়।

উখিমঠ: শীতের দিনগুলিতে দেবতার আবাস

চোপতা ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো উখিমঠ (Ukhimath)। এটি রুদ্রপ্রয়াগ জেলার একটি পাহাড়ি জনপদ এবং ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য পরিচিত।

কেদারনাথ মন্দির শীতকালে বন্ধ থাকলে শীতকালীন পূজার সঙ্গে যুক্ত কিছু ধর্মীয় আচার উখিমঠের ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে এই জনপদের সঙ্গে কেদারনাথের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে।

উখিমঠে পাহাড়ি শহরের তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ দেখা যায়। এখানে মন্দির দর্শন, স্থানীয় বাজার ঘোরা এবং আশপাশের পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করা যেতে পারে।

যাঁরা চোপতা ও তুঙ্গনাথ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাঁরা উখিমঠকে যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

উখিমঠের আশপাশের অঞ্চল থেকে হিমালয়ের দৃশ্য দেখা যায়, তবে দৃশ্যমানতা আবহাওয়া ও ঋতুর উপর নির্ভর করে।

মন্দাকিনী উপত্যকা ও পাহাড়ি নদীর গল্প

উত্তরাখণ্ডের গাড়ওয়াল অঞ্চলে নদী শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়; মানুষের জীবন, কৃষিকাজ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও বসতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

চোপতা ও তার আশপাশের অঞ্চলে পাহাড়ি জলধারা, নদী এবং ছোট ছোট উপত্যকা ভূপ্রকৃতিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। দূরের পাহাড় থেকে নেমে আসা জল নিচু অঞ্চলের নদীপ্রবাহকে সমৃদ্ধ করে।

পাহাড়ি নদীর জলের রং ও প্রবাহ ঋতু অনুযায়ী বদলে যায়। বরফ গলা বা ভারী বৃষ্টির সময় জলপ্রবাহ বেড়ে যেতে পারে। তাই নদীর ধারে ঘোরার সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।

এই অঞ্চলের নদী ও জলধারার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন গভীরভাবে যুক্ত। পানীয় জল, কৃষিকাজ এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন প্রয়োজনে জল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পর্যটক হিসেবে নদী ও জলধারাকে পরিষ্কার রাখা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি না করা আমাদের দায়িত্ব।

রডোডেনড্রনের বন: বসন্তের রঙিন উপহার

চোপতা ও আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো রডোডেনড্রনের বন। বসন্তকালে এই গাছের ফুল পাহাড়ের দৃশ্যকে রঙিন করে তোলে।

রডোডেনড্রনের ফুল সাধারণত লাল, গোলাপি বা বিভিন্ন আভায় দেখা যেতে পারে। ফুল ফোটার সময় বনভূমি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে।

ফুল দেখতে গিয়ে অনেক পর্যটক ছবি তোলেন। তবে ফুল ছিঁড়ে নেওয়া বা গাছের ডাল ভাঙা উচিত নয়। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় উপভোগ করাই ভালো।

বসন্তের সময় আবহাওয়া পরিবর্তনশীল হতে পারে। কখনও রোদ, কখনও মেঘ, আবার কখনও হালকা বৃষ্টি দেখা যায়। তাই হালকা জলরোধী পোশাক সঙ্গে রাখা উপকারী।

পাখি ও বন্যপ্রাণী

চোপতা ও আশপাশের বনভূমি বিভিন্ন পাহাড়ি পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। বনভূমির বৈচিত্র্য এবং উচ্চতার পরিবর্তনের কারণে এখানে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতি দেখা যায়।

পাখি দেখতে ভালোবাসেন এমন ভ্রমণকারীরা ভোরের দিকে বনভূমির কাছে সময় কাটাতে পারেন। তবে পাখি বা বন্যপ্রাণী দেখার নিশ্চয়তা নেই; তাদের উপস্থিতি ঋতু, আবহাওয়া এবং স্বাভাবিক চলাচলের উপর নির্ভর করে।

বন্যপ্রাণী দেখতে গেলে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। প্রাণীকে খাবার দেওয়া, জোরে শব্দ করা কিংবা তাদের পিছু নেওয়া উচিত নয়।

প্রকৃতির মধ্যে হাঁটার সময় নির্ধারিত পথ ব্যবহার করা এবং স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

চোপতার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত

চোপতার অন্যতম আকর্ষণ হলো ভোর ও সন্ধ্যার আলো। সূর্যোদয়ের সময় পাহাড়ের গায়ে প্রথম আলো পড়লে দৃশ্যের রং ধীরে ধীরে বদলে যায়।

সকালের নরম আলোয় সবুজ তৃণভূমি, দূরের শৃঙ্গ এবং উপত্যকার মেঘ এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরের বরফঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় সোনালি আলো দেখা যেতে পারে।

সূর্যাস্তের সময় পাহাড়ের ঢালে ছায়া দীর্ঘ হয়। আকাশের রং বদলে কখনও কমলা, কখনও গোলাপি, আবার কখনও বেগুনি আভা তৈরি হয়।

তবে সূর্যোদয় দেখার জন্য খুব ভোরে বের হলে তাপমাত্রা ও রাস্তার অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। অন্ধকারে অচেনা পাহাড়ি পথে একা হাঁটা এড়িয়ে চলা উচিত।

চোপতার খাবার

চোপতা ও আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলে সাধারণ উত্তর ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি স্থানীয় গাড়ওয়ালি রান্নার প্রভাবও দেখা যায়।

ভাত, ডাল, রুটি, সবজি এবং বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি পদ সাধারণত খাবারের অংশ হতে পারে। স্থানীয় রান্নায় ডাল, শাকসবজি, ডালজাতীয় উপকরণ এবং পাহাড়ি পরিবেশে উৎপন্ন খাদ্যশস্যের ব্যবহার দেখা যায়।

উত্তরাখণ্ডের পরিচিত খাবারের মধ্যে মণ্ডুয়ার রুটি, ঝাংগোরার খির এবং বিভিন্ন ধরনের ডালভিত্তিক পদ উল্লেখযোগ্য। তবে প্রতিটি খাবার সব হোটেল বা অতিথিশালায় পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম চা, স্যুপ বা সহজপাচ্য গরম খাবার ভ্রমণের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

দূরবর্তী এলাকায় খাবারের বিকল্প সীমিত হতে পারে। তাই বিশেষ খাদ্যাভ্যাস থাকলে আগে থেকে থাকার জায়গার সঙ্গে কথা বলে নেওয়া ভালো।

কোথায় থাকবেন?

চোপতা ও আশপাশে ছোট হোটেল, অতিথিশালা, হোমস্টে এবং মৌসুমি ক্যাম্পের ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে। তবে সুবিধা, মান ও প্রাপ্যতা ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

চোপতার কাছে থাকার ব্যবস্থা বেছে নিলে তুঙ্গনাথ ট্রেক শুরু করা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, উখিমঠ বা আশপাশের বড় জনপদে থাকলে বাজার ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

থাকার জায়গা বুক করার আগে গরম জলের ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, খাবার, হিটার ব্যবহারের নিয়ম, গাড়ি রাখার সুবিধা এবং ট্রেকের শুরুস্থল থেকে দূরত্ব সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।

শীতকালে গেলে গরম রাখার ব্যবস্থা আছে কি না, তা বিশেষভাবে নিশ্চিত করা দরকার। বরফপাত বা খারাপ আবহাওয়ার সময় কিছু মৌসুমি থাকার ব্যবস্থা বন্ধ থাকতে পারে।

কীভাবে চোপতা পৌঁছবেন?

চোপতায় পৌঁছনোর জন্য সাধারণত রেল বা বিমানপথে উত্তর ভারতের কোনো প্রধান যোগাযোগকেন্দ্রে এসে সড়কপথে যাত্রা করতে হয়।

বিমানপথে: দেরাদুনের জলি গ্রান্ট বিমানবন্দর উত্তরাখণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগকেন্দ্র। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে বা অন্যান্য সড়ক পরিবহন ব্যবহার করে চোপতার দিকে যাওয়া যায়।

রেলপথে: হরিদ্বার ও ঋষিকেশ অঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবহার করে পরে সড়কপথে যাত্রা করা যেতে পারে। কোন স্টেশন সুবিধাজনক হবে, তা ট্রেনের সময়সূচি ও যাত্রার পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে।

সড়কপথে: ঋষিকেশ, দেবপ্রয়াগ, শ্রীনগর, রুদ্রপ্রয়াগ, উখিমঠ এবং চোপতার দিকে যাওয়ার বিভিন্ন সড়কপথ রয়েছে। রাস্তার অবস্থা, যানবাহনের ধরন এবং আবহাওয়ার উপর যাত্রার সময় নির্ভর করে।

পাহাড়ি রাস্তায় যাত্রার সময় অভিজ্ঞ চালক ব্যবহার করা ভালো। বর্ষাকালে ভূমিধস এবং শীতকালে তুষারপাতের কারণে যাত্রা ব্যাহত হতে পারে।

ভ্রমণের সেরা সময়

চোপতা ও তুঙ্গনাথের সৌন্দর্য ঋতু অনুযায়ী বদলে যায়। তাই কোন সময় ভ্রমণ করবেন, তা নির্ভর করবে আপনার পছন্দের অভিজ্ঞতার উপর।

বসন্ত

বসন্তকালে রডোডেনড্রনের ফুল এবং নতুন সবুজ প্রকৃতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। তবে উচ্চতায় ঠান্ডা থাকতে পারে এবং আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে পারে।

গ্রীষ্ম

গ্রীষ্মে চোপতার আবহাওয়া অনেকের কাছে আরামদায়ক হতে পারে। তুঙ্গনাথের দিকে ট্রেকিং এবং আশপাশের পাহাড় ঘুরে দেখার জন্য এই সময় জনপ্রিয়।

তবে ট্রেকিংয়ের আগে মন্দির খোলা আছে কি না এবং স্থানীয় পরিস্থিতি অনুকূল কি না, তা জেনে নেওয়া জরুরি।

বর্ষা

বর্ষাকালে পাহাড় সবুজ হয়ে ওঠে, কিন্তু ভারী বৃষ্টি, কাদা, পিচ্ছিল পথ ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই এই সময়ে বিশেষ সতর্কতা দরকার।

শরৎ

বর্ষার পর আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরের হিমালয়ের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর হতে পারে। ফটোগ্রাফি ও পাহাড়ি পদযাত্রার জন্য এটি আকর্ষণীয় সময় হতে পারে।

শীত

শীতকালে তুষারপাত হলে চোপতা বরফে ঢাকা দৃশ্য ধারণ করতে পারে। তবে তুঙ্গনাথ মন্দিরের শীতকালীন বন্ধের সময়সূচি এবং ট্রেকের পরিস্থিতি আগে যাচাই করা দরকার।

বরফে ঢাকা পথে অভিজ্ঞতা ও উপযুক্ত সরঞ্জাম ছাড়া হাঁটা বিপজ্জনক হতে পারে।

চোপতা ভ্রমণে কী কী সঙ্গে রাখবেন?

পাহাড়ি আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

  • গরম জ্যাকেট, সোয়েটার ও অতিরিক্ত মোজা।
  • ভালো গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতো।
  • জলরোধী জ্যাকেট বা রেইনকোট।
  • টুপি, গ্লাভস ও সানস্ক্রিন।
  • পানীয় জলের বোতল ও হালকা খাবার।
  • ব্যক্তিগত ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম।
  • পরিচয়পত্র, বুকিংয়ের তথ্য ও জরুরি যোগাযোগের নম্বর।
  • মোবাইল চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক।
  • আবহাওয়া অনুযায়ী অতিরিক্ত পোশাক।

ট্রেকের সময় অপ্রয়োজনীয় ভারী ব্যাগ না নিয়ে হালকা ব্যাগ ব্যবহার করা সুবিধাজনক।

উচ্চতাজনিত অসুস্থতা সম্পর্কে সতর্কতা

তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলার উচ্চতা অনেক পর্যটকের কাছে শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। সমতল অঞ্চল থেকে হঠাৎ উচ্চতায় উঠে গেলে শরীরের মানিয়ে নিতে সময় লাগে।

মাথাব্যথা, বমিভাব, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

ধীরে হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং শরীরের সংকেত বোঝা জরুরি। গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে আরও ওপরে ওঠা বন্ধ করে নিচু উচ্চতায় নামতে হবে এবং চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।

শিশু, বয়স্ক মানুষ বা আগে থেকে শারীরিক অসুস্থতা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ট্রেকের পরিকল্পনা আরও সতর্কভাবে করা উচিত।

তিন দিনের চোপতা ভ্রমণ পরিকল্পনা

প্রথম দিন: চোপতায় পৌঁছে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয়

সকালে ঋষিকেশ বা অন্য কোনো উপযুক্ত শহর থেকে যাত্রা শুরু করে চোপতার দিকে যাওয়া যেতে পারে। পাহাড়ি রাস্তার জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা জরুরি।

চোপতায় পৌঁছে থাকার জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে আশপাশের নিরাপদ এলাকা ঘুরে দেখা যেতে পারে। সন্ধ্যায় আবহাওয়া অনুকূল থাকলে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

দ্বিতীয় দিন: তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা

সকালে আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে তুঙ্গনাথের দিকে ট্রেক শুরু করা যেতে পারে। মন্দির দর্শনের পর শারীরিক সক্ষমতা, আবহাওয়া এবং দিনের আলো যথেষ্ট থাকলে চন্দ্রশিলার দিকে এগোনোর কথা বিবেচনা করা যায়।

চন্দ্রশিলা পর্যন্ত যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। ক্লান্তি বা আবহাওয়ার অবনতি হলে তুঙ্গনাথ থেকে ফিরে আসাই নিরাপদ।

তৃতীয় দিন: দেবরিয়া তাল বা উখিমঠ

তৃতীয় দিন দেবরিয়া তাল কিংবা উখিমঠ ঘুরে দেখা যেতে পারে। কোনটি বেছে নেবেন, তা সময়, পরিবহন এবং রাস্তার অবস্থার উপর নির্ভর করবে।

এরপর যাত্রার সময়সূচি অনুযায়ী পরবর্তী গন্তব্যে ফিরে যাওয়া যেতে পারে।

পাঁচ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা

পাঁচ দিন হাতে থাকলে চোপতা ও আশপাশের অঞ্চল আরও ধীরে উপভোগ করা যায়।

প্রথম দিন ঋষিকেশ থেকে যাত্রা করে মাঝপথে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় দিন চোপতায় পৌঁছে স্থানীয় পরিবেশ ও পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যায়।

তৃতীয় দিন তুঙ্গনাথ ট্রেক এবং আবহাওয়া অনুকূল থাকলে চন্দ্রশিলা ভ্রমণের জন্য রাখা যেতে পারে।

চতুর্থ দিন দেবরিয়া তাল ও উখিমঠের মতো গন্তব্য ঘুরে দেখা যায়।

পঞ্চম দিন ফেরার যাত্রা শুরু করা যেতে পারে।

এই পরিকল্পনা নমনীয় রাখা জরুরি। পাহাড়ি আবহাওয়া, রাস্তার অবস্থা ও শারীরিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে সময়সূচি বদলাতে হতে পারে।

আনুমানিক ভ্রমণ বাজেট

চোপতা ভ্রমণের খরচ নির্ভর করে যাত্রার শহর, পরিবহনের ধরন, থাকার মান, খাবার, ভ্রমণের দিনসংখ্যা এবং ট্রেকিংয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর।

দূরপাল্লার ট্রেন বা বিমানের ভাড়া, পাহাড়ি পথে গাড়ি ভাড়া এবং থাকার খরচ বাজেটের বড় অংশ হতে পারে। কম খরচে ভ্রমণ করতে চাইলে আগে থেকে টিকিট বুক করা, উপযুক্ত বাজেটের হোটেল বা হোমস্টে বেছে নেওয়া এবং একাধিক পর্যটক মিলে গাড়ি ভাগ করে নেওয়া যায়।

তবে পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপদ পরিবহন, উপযুক্ত জুতো, গরম পোশাক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আপস করা উচিত নয়।

যাত্রার আগে থাকার জায়গা, পরিবহন ও খাবারের বর্তমান মূল্য যাচাই করে বাজেট তৈরি করা ভালো।

দায়িত্বশীল পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণ

চোপতা ও তুঙ্গনাথের মতো পাহাড়ি অঞ্চলের সৌন্দর্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটনের প্রসার স্থানীয় মানুষের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু অসচেতন আচরণ পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।

পাহাড়ে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট কিংবা অন্য বর্জ্য ফেলে রাখা উচিত নয়। নিজের বর্জ্য সঙ্গে ফিরিয়ে আনা ভালো।

বনভূমিতে নির্ধারিত পথ ছেড়ে অকারণে হাঁটলে উদ্ভিদ ও মাটির ক্ষতি হতে পারে। বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা বা খাবার দেওয়াও উচিত নয়।

ধর্মীয় স্থানে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা, নীরবতা বজায় রাখা এবং অনুমতি ছাড়া ছবি না তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় হোমস্টে, গাইড, দোকান ও পরিবহন পরিষেবা ব্যবহার করলে এলাকার মানুষের জীবিকায় সহায়তা করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, খারাপ আবহাওয়া বা নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা থাকলে ট্রেক স্থগিত করা। পাহাড়ে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোই নিরাপদ ভ্রমণের প্রথম শর্ত।

শেষকথা: পাহাড়ের পথে নিজেকে খুঁজে পাওয়া

চোপতা ও তুঙ্গনাথ এমন একটি ভ্রমণগন্তব্য, যেখানে প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং পাহাড়ি জীবনের সৌন্দর্য একসঙ্গে অনুভব করা যায়।

চোপতার সবুজ তৃণভূমি, রডোডেনড্রনের বন, তুঙ্গনাথ মন্দিরের প্রাচীন স্থাপত্য, চন্দ্রশিলার বিস্তৃত হিমালয় দৃশ্য এবং দেবরিয়া তালের শান্ত জল—প্রতিটি স্থান ভ্রমণকারীর মনে আলাদা ছাপ রেখে যেতে পারে।

এই ভ্রমণ শেখায় যে পাহাড়ের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়; তাকে অনুভব করতে হয়। কখনও ধীরে ধীরে ট্রেক করতে করতে, কখনও মন্দিরের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে, কখনও পাহাড়ের গায়ে মেঘের চলাচল দেখতে দেখতে কিংবা কোনো হ্রদের ধারে বসে প্রকৃতির শব্দ শুনতে শুনতে।

তুঙ্গনাথের পথে হাঁটার সময় বোঝা যায়, গন্তব্যে পৌঁছনোর আনন্দের পাশাপাশি যাত্রার প্রতিটি ধাপও মূল্যবান। আর চোপতার খোলা পাহাড়ি পরিবেশ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তির এক সুন্দর উপায় হতে পারে।

তবে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে প্রস্তুতি, নিরাপত্তা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা জরুরি। আবহাওয়া ও নিজের শারীরিক সক্ষমতা বুঝে ভ্রমণ করলে অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর হয়।

যাঁরা ভারতের মধ্যে এমন একটি স্থান খুঁজছেন, যেখানে সবুজ পাহাড়, তুষারশৃঙ্গ, প্রাচীন মন্দির ও ট্রেকিংয়ের আনন্দ একসঙ্গে পাওয়া যায়, তাঁদের ভ্রমণতালিকায় চোপতা ও তুঙ্গনাথ বিশেষ স্থান পেতে পারে।

চোপতা শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়, আর তুঙ্গনাথ শুধু একটি মন্দির নয়—দুটি মিলে তৈরি করে প্রকৃতি, বিশ্বাস ও আত্ম-অনুসন্ধানের এক অনন্য যাত্রা।

==========  শেষ ==========

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের অভিশাপ (তৃতীয় পর্ব: রক্তের পরিচয়)।

“তোমাদের মধ্যে কে আসল অরিত্র?”

মায়ের মুখ থেকে কথাটা শোনার পর ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।

অরিত্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে, চুলে পাক ধরেছে, চোখের কোলে গভীর ক্লান্তি। তবু সেই চোখ দুটো চিনতে ভুল হলো না। ছোটবেলায় যে চোখের দিকে তাকিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ত, সেই চোখই আজ তার সামনে।

“মা!”

অরিত্র ছুটে গেল। কিন্তু মধুমিতা হাত তুলে তাকে থামালেন।

“একটু দাঁড়া।”

“কেন? এত বছর পর তোমাকে পেলাম। তুমি বেঁচে আছ, অথচ আমাদের কাছে ফিরে আসোনি কেন?”

মধুমিতার চোখ ভিজে উঠল।

“আমি ফিরতে চেয়েছিলাম, অরিত্র। অনেকবার চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের কাছে ফিরলে তোমাদের দুজনেরই জীবন বিপন্ন হতো।”

অরিত্রর গলায় কান্না জমে উঠল।

“তুমি কি জানো, আমি কত বছর তোমাকে মৃত ভেবে কাটিয়েছি?”

মধুমিতা চোখ নামিয়ে নিলেন।

“জানি। প্রতিটি বছর, প্রতিটি দিন আমি সেই অপরাধের বোঝা নিয়ে বেঁচেছি।”

“কিন্তু তুমি আমাকে ফোন করেছিলে। বলেছিলে, নীলকুঠিতে না আসতে। তাহলে এখন সামনে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

“কারণ এবার আর পালানোর সময় নেই।”

অরিত্র মায়ের পাশে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে তাকাল। তার মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। যেন সে একই সঙ্গে অরিত্রর পরিচিত এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত।

যুবকটি বলল, “মা, আর দেরি কোরো না। সব সত্যি আজই বলতে হবে।”

দেবব্রত তখনও সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে ধরা রিভলভার কাঁপছে।

ঋতম সতর্ক গলায় বলল, “বন্দুকটা নামিয়ে রাখুন। এখানে কেউ আপনাকে আক্রমণ করতে আসেনি।”

দেবব্রত যেন কথাটা শুনতেই পেলেন না। তাঁর চোখ আটকে আছে মধুমিতার দিকে।

“তুমি বেঁচে আছ?”

মধুমিতা ঠান্ডা গলায় বললেন, “এই প্রশ্নটা তুমি আমাকে করছ, দেবব্রত? সতেরো বছর ধরে আমি কোথায় ছিলাম, সেটা জানার চেষ্টা একবারও করোনি। আজ আমাকে দেখে অবাক হচ্ছ?”

“আমি ভেবেছিলাম, তুমি…”

“মরে গেছি?”

দেবব্রত মাথা নিচু করলেন।

“তুমি নিজেই তো সবাইকে বিশ্বাস করিয়েছিলে যে আমি নদীতে পড়ে মারা গেছি। পুলিশকে মিথ্যে বলেছিলে। আমার ছেলেকে মিথ্যে বলেছিলে। নিজের বিবেককেও মিথ্যে বুঝিয়েছিলে। এখন আর কী বলার আছে?”

দেবব্রতর হাত থেকে রিভলভারটা মেঝেতে পড়ে গেল।

অরিত্র মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে একটা কথার উত্তর দাও। আমি কে?”

মধুমিতা তার দিকে তাকালেন।

“তুই আমার ছেলে।”

“সেটা তো জানি। কিন্তু আমি কি অরিত্র? নাকি অরুণ?”

প্রশ্নটা শুনে মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন। যেন এই প্রশ্নের জন্যই তিনি সতেরো বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

“তুই অরিত্র। কিন্তু তোর নামের সঙ্গে এমন একটা মিথ্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যার সত্যিটা জানতে পারলে তোর নিজের জীবনকেই নতুন করে চিনতে হবে।”

“কী মিথ্যে?”

মধুমিতা উত্তর দেওয়ার আগেই যুবকটি এগিয়ে এল।

“আমি বলছি।”

সে টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনটা তুলে নিজের মুখের কাছে ধরল। আলোয় তার ডান গালের কাটা দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল।

“আমার নাম অরুণ। জন্মের সময় আমার নামও অন্য কিছু ছিল। আমাদের দুজনের জন্মের রাতে হাসপাতালের নথিতে তিনটি শিশুর নাম ওঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই তিনটি শিশুর মধ্যে একজনের কোনও পরিচয় ছিল না।”

অরিত্র অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“তিনটি শিশু কেন? মা তো যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল!”

অরুণ বলল, “সেটাই আমাদের শেখানো গল্প। কিন্তু জন্মের রাতের হাসপাতালের আসল নথি অন্য কথা বলে।”

সে নিজের পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল।

“এটা হাসপাতালের মূল রেজিস্টারের অনুলিপি। অনেক কষ্টে সংগ্রহ করেছি। এখানে দেখ—তিনটি এন্ট্রি।”

অরিত্র কাগজটা হাতে নিল। কাগজ পুরোনো, প্রান্ত ছেঁড়া, কিন্তু লেখাগুলো স্পষ্ট।

প্রথম এন্ট্রি—অরিত্র মজুমদার।

দ্বিতীয় এন্ট্রি—অরুণ মজুমদার।

তৃতীয় এন্ট্রি—পরিচয় অজ্ঞাত, পুরুষ শিশু।

তৃতীয় নামের পাশে লাল কালিতে লেখা—

‘বিশেষ নির্দেশে স্থানান্তর।’

অরিত্রর মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল।

“এটা কীভাবে সম্ভব? মা কি তিনটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিল?”

মধুমিতা ধীরে ধীরে বললেন, “আমি যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলাম। তৃতীয় শিশুটি জন্মেছিল একই হাসপাতালে, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে। তার মাকে তখন মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। শিশুটিকে অনাথ বলে নথিভুক্ত করা হয়।”

ঋতম প্রশ্ন করল, “তাহলে তিনটি শিশুর নথি একই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হলো কীভাবে?”

মধুমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ তৃতীয় শিশুটির জন্মের সঙ্গে এমন একটি অপরাধ জড়িয়ে ছিল, যা আড়াল করতে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী নথি বদলে দিয়েছিল। আর সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন একজন, যাকে আমি নিজের ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতাম।”

“কে সে?” অরিত্র জিজ্ঞেস করল।

মধুমিতা উত্তর দিলেন না। বরং পাশে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে তাকালেন।

যুবকটি বলল, “আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকাও।”

অরিত্র তাকাল।

“তুমি দেখতে আমার মতো। কিন্তু আমার থেকে আলাদা। তোমার চোখের ওপরের বাঁ দিকের ভ্রুতে ছোট একটা দাগ আছে। আমার নেই। তোমার ডান হাতের কবজিতে জন্মদাগ আছে। আমারও নেই।”

অরিত্র নিজের কবজির দিকে তাকাল। জন্মদাগটা সে ছোটবেলা থেকেই দেখেছে।

অরুণ বলল, “আমাদের মধ্যে একজনের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুধু আমাদের দুজনের নয়, তৃতীয় শিশুটির পরিচয়ও বদলানো হয়েছিল। আর সেই শিশুটি আজও বেঁচে আছে।”

“তুমি জানো সে কে?”

“জানি না। তবে জানি, সে আমাদের খুব কাছেই আছে।”


ঘরের নীরবতা ভাঙল ঋতম।

“একটা কথা বুঝতে পারছি না। যদি তৃতীয় শিশুটির পরিচয় বদলে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে অরিত্র আর অরুণের সম্পর্ক কী?”

মধুমিতা বললেন, “সম্পর্কটা রক্তের নয়, অপরাধের। ওই শিশুটির মা মারা যাওয়ার আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই নথি প্রমাণ করত, হাসপাতালের কিছু মানুষ নবজাতক শিশুদের পরিচয় বদলে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছে। তার বিনিময়ে টাকা নেওয়া হতো।”

ঋতম চমকে উঠল।

“শিশু পাচার?”

“হ্যাঁ। কিন্তু শুধু টাকা নয়। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের পরিচয় বদলানো হতো সম্পত্তি দখল করার জন্য। কোনও পরিবারে উত্তরাধিকারী না থাকলে, সেই পরিবারের মৃত শিশুর জায়গায় অন্য শিশুকে বসিয়ে দেওয়া হতো। পরে সমস্ত নথি পাল্টে সেই শিশুকেই বৈধ উত্তরাধিকারী দেখানো হতো।”

অরিত্রর চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“তাহলে কি আমার পরিচয়ও বদলানো হয়েছিল?”

মধুমিতা তার হাত ধরলেন।

“তোর জন্মের পরিচয় বদলানো হয়নি। কিন্তু তোর ভাইকে তোর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আর তৃতীয় শিশুটিকে এমন একটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যারা নিজেদের মৃত সন্তানকে ফিরিয়ে পেতে চেয়েছিল।”

অরিত্র ধীরে ধীরে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করল।

“তাহলে আমার বাবা এই ঘটনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত?”

দেবব্রত এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি মাথা তুললেন।

“আমি প্রথমে কিছুই জানতাম না। মধুমিতার প্রসবের পর হাসপাতালের এক কর্মচারী আমাকে বলেছিল, একটি শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক। পরে জানানো হয়, সে মারা গেছে। আমি অন্য শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। কয়েক মাস পর জানতে পারি, অরুণ বেঁচে আছে।”

“তখন তাকে ফিরিয়ে আনোনি কেন?”

দেবব্রত চোখ মুছলেন।

“কারণ ততদিনে আমি এমন একটি কাগজে স্বাক্ষর করে ফেলেছিলাম, যার মাধ্যমে আমি নিজের ছেলের পরিচয় সম্পর্কে মিথ্যে স্বীকার করেছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, সব চুপচাপ মেনে নিলে অরিত্র নিরাপদ থাকবে। কিন্তু আমি বুঝিনি, আমার নীরবতা আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে।”

অরুণ তীব্র গলায় বলল, “তুমি নিজের নিরাপত্তার জন্য আমাকে অনাথ আশ্রমে ফেলে রেখেছিলে!”

“আমি জানতাম না তোকে কোথায় রাখা হয়েছে!”

“কিন্তু মা জানত। মা আমাকে খুঁজে পেয়েছিল। আর তারপর কী হয়েছিল, সেটা তুমি জানো।”

দেবব্রত মুখ ঢেকে ফেললেন।

অরিত্র বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর কী হয়েছিল?”

দেবব্রত কাঁপা গলায় বললেন, “সেদিন মধুমিতা প্রমাণ নিয়ে নীলকুঠিতে এসেছিল। সে চেয়েছিল, সব নথি পুলিশের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু এখানে আসার আগেই কেউ তার ওপর হামলা করে। আমি যখন পৌঁছই, তখন সে আহত অবস্থায় পড়েছিল। আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।”

মধুমিতা বললেন, “কিন্তু তুমি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওনি।”

দেবব্রত মাথা নিচু করলেন।

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। যারা এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা আমাকে হুমকি দিয়েছিল। তারা বলেছিল, আমি যদি মুখ খুলি, তাহলে অরিত্রকে মেরে ফেলবে।”

“তাই তুমি আমাকে মৃত বলে ঘোষণা করলে?” মধুমিতা জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।”

“কীভাবে?”

দেবব্রত কোনও উত্তর দিলেন না।

মধুমিতা এবার অরিত্রর দিকে তাকালেন।

“আমি সেদিন মারা যাইনি। আমাকে এই বাড়ির পেছনের একটি গোপন ঘরে রাখা হয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ পর এক বৃদ্ধা পরিচারিকা আমাকে উদ্ধার করেন। তিনি আমাকে অন্য একটি গ্রামে নিয়ে যান। আমি পুলিশের কাছে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার কাছে থাকা মূল নথিগুলো তখন আর আমার কাছে ছিল না। আর যারা অপরাধ করেছিল, তারা আগেই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রমাণ তৈরি করে রেখেছিল।”

“তাহলে তুমি এত বছর পরে ফিরে এলে কেন?”

“কারণ কয়েক মাস আগে আমি জানতে পারি, অরুণকে খুঁজে পাওয়া গেছে। সে নীলকুঠিতে ফিরে এসেছে। আমি বুঝেছিলাম, এবার হয়তো সত্যিটা প্রকাশ করা সম্ভব হবে।”

অরিত্র মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।

“তুমি আমাকে একবারও খুঁজতে পারতে।”

মধুমিতা কেঁদে ফেললেন।

“খুঁজেছি, অরিত্র। তোর স্কুলের সামনে গিয়েছি। তোর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। দূর থেকে তোকে দেখেছি। কিন্তু তোর কাছে যেতে পারিনি। যারা তোকে নজরে রাখত, তারা আমার প্রতিটি পদক্ষেপ জানত।”

অরিত্রর চোখে জল এসে গেল।

“আমি তোমাকে ঘৃণা করতাম না, মা। আমি শুধু ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ।”

মধুমিতা তাকে বুকে টেনে নিলেন।

দীর্ঘ সতেরো বছর পর মা ও ছেলের আলিঙ্গনে জমে থাকা অভিমান কিছুটা গলে গেল। কিন্তু সত্যের শেষ দরজা তখনও বন্ধ।


ঋতম হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা নথিগুলোর মধ্যে একটা কাগজ দেখতে পেল।

কাগজে একটি বাড়ির ঠিকানা লেখা।

ঠিকানাটা কলকাতার এক অভিজাত আবাসনের।

তার নিচে নাম—

‘ডা. অনির্বাণ সেনগুপ্ত।’

ঋতম নামটা পড়েই চমকে উঠল।

“এই মানুষটাকে আমি চিনি।”

অরিত্র তাকাল।

“কে?”

“ডা. অনির্বাণ সেনগুপ্ত। শহরের নামী শিশু বিশেষজ্ঞ। একাধিক হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা ছিলেন সেই সময়ের একজন চিকিৎসক, যাঁর বিরুদ্ধে শিশুদের পরিচয় বদলের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু কখনও প্রমাণ হয়নি।”

মধুমিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“অনির্বাণ সেই তৃতীয় শিশুটি।”

ঘরে নেমে এল নীরবতা।

অরিত্র বলল, “তুমি নিশ্চিত?”

“আমি নিজে তাকে ছোটবেলায় দেখেছি। তার আসল মা মারা যাওয়ার পর তাকে অন্য একটি পরিবারে তুলে দেওয়া হয়। সেই পরিবারের কাছে সে নিজের সন্তান হিসেবেই বড় হয়েছে। তার বর্তমান পরিচয় তৈরি হয়েছিল সেই রাতের ঘটনার পর।”

ঋতম বলল, “কিন্তু যদি সে জানেই না যে তার পরিচয় বদলানো হয়েছিল, তাহলে তাকে অপরাধী বলা যায় না।”

“আমি তাকে অপরাধী বলছি না,” মধুমিতা উত্তর দিলেন। “আমি বলছি, সে সত্যিটা জানার অধিকার রাখে।”

অরিত্র কাগজটা হাতে নিল।

“তাহলে আমাদের তার সঙ্গে দেখা করতে হবে।”

অরুণ এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে বলল, “সেটা এত সহজ হবে না।”

“কেন?”

“কারণ অনির্বাণ শুধু একজন চিকিৎসক নয়। সে জানে, তার জন্মের নথিতে কী বদল করা হয়েছিল। সে অনেক বছর ধরে এই ঘটনার সূত্র খুঁজেছে। কিন্তু সে কখনও চায়নি সত্যিটা প্রকাশ পাক।”

ঋতম বলল, “তুমি তার সঙ্গে দেখা করেছ?”

অরুণ উত্তর দিল না।

অরিত্র তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এত কিছু জানো, অথচ আমাদের কিছু বলোনি কেন?”

অরুণের চোখে ক্ষোভ ফুটে উঠল।

“কারণ তোমরা কেউই আমার জায়গায় দাঁড়াওনি। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন প্রতিদিন অন্য শিশুদের সঙ্গে আশ্রমে ঘুমাতাম। আমার জন্মদিনে কেউ আসত না। স্কুলে কেউ আমাকে নিতে আসত না। অসুস্থ হলে মাথায় হাত রাখার মতো কেউ ছিল না। আর তুমি নিজের বাড়িতে বড় হয়েছ, নিজের নামে স্কুলে পড়েছ, নিজের মায়ের সঙ্গে থেকেছ।”

“আমি তো জানতামই না তোমার কথা!”

“আমি জানি। কিন্তু অজানা থাকার সুবিধেটাও তোমার ছিল।”

অরিত্র চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর অরুণের গলা নরম হলো।

“আমি তোমাকে দোষ দিতে চাই না। কিন্তু এত বছর ধরে আমি একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি—আমাকে কেন ফেলে রাখা হয়েছিল? মা কি আমাকে চাইতেন না? বাবা কি আমাকে অস্বীকার করেছিলেন? নাকি আমি এমন কোনও অপরাধের সাক্ষী ছিলাম, যার জন্য আমাকে আড়াল করা দরকার ছিল?”

মধুমিতা এগিয়ে এসে অরুণের মুখে হাত রাখলেন।

“তুই কোনও অপরাধ করিসনি। তোকে আমি কোনও দিন ছেড়ে যাইনি।”

অরুণ মায়ের হাত সরিয়ে দিল না। কিন্তু তার চোখের জলও মুছল না।

“তাহলে প্রমাণ দাও, মা। আমাদের জন্মের রাতের আসল নথি কোথায়?”

মধুমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “মূল নথি আমার কাছে নেই। কিন্তু তার একটি অংশ আছে। সেটি এমন একজনের কাছে রাখা, যে এই বাড়ির অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।”

“কে সে?”

“তোমাদের ছোটবেলার স্কুলের প্রধান শিক্ষক—সুধাংশু রায়।”

অরিত্র অবাক হয়ে গেল।

“আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক?”

“হ্যাঁ। তিনি তখন হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সব ছেড়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনিই আমাকে নথির একটি অনুলিপি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, নথিটা এমন জায়গায় রেখেছেন, যেখানে অপরাধীরা কোনও দিন খুঁজে পাবে না।”

ঋতম বলল, “সেই জায়গাটা কী?”

মধুমিতা উত্তর দিলেন, “আমি জানি না। শুধু জানি, তিনি একটি কবিতার মধ্যে তার সংকেত রেখে গিয়েছিলেন।”

“কী কবিতা?”

মধুমিতা স্মৃতি থেকে বলতে লাগলেন—

“যেখানে শিশুরা প্রথম অক্ষর শেখে, যেখানে ঘণ্টা বাজে দিনের শেষে, যেখানে নাম মুছে যায় কালো বোর্ডে, সত্যি ঘুমিয়ে আছে তারই দেশে।”

অরিত্রর মনে পড়ল, তাদের পুরোনো স্কুলের একটি ঘর ছিল যেখানে বহু পুরোনো বই রাখা থাকত। প্রধান শিক্ষক বলতেন, ওই ঘরে স্কুলের ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে।

“স্কুলের পুরোনো গ্রন্থাগার,” অরিত্র বলল।

ঋতম মাথা নাড়ল।

“হতে পারে। কিন্তু আমাদের আগে জানতে হবে, ওই নথি এখনও সেখানে আছে কি না।”

ঠিক তখনই দেবব্রত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“তোমরা সেখানে যেতে পারবে না।”

অরিত্র বাবার দিকে ঘুরে তাকাল।

“কেন?”

“কারণ সুধাংশু রায়ের মৃত্যুর পর ওই ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার কয়েক মাস পর স্কুলের এক কর্মচারী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়।”

ঋতম বলল, “আপনি এত কিছু জানেন, অথচ এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”

দেবব্রতর চোখে অসহায়তা।

“কারণ আমি জানতাম, অপরাধের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলো এখনও ক্ষমতাশালী। আমি ভেবেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সব চাপা পড়ে যাবে।”

অরুণ তিক্ত হেসে বলল, “অপরাধ কখনও চাপা পড়ে না, বাবা। শুধু তার শিকাররা চুপ করে থাকে।”


রাত তখন প্রায় তিনটে।

নীলকুঠির বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। অরিত্র, অরুণ, মধুমিতা এবং ঋতম বাড়ি থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দেবব্রতকে সঙ্গে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দিল।

অরিত্র বলল, “বাবা আমাদের সঙ্গে যাবেন।”

অরুণ আপত্তি করল।

“যে মানুষ এত বছর সত্যি লুকিয়েছে, তাকে বিশ্বাস করা যায় না।”

অরিত্র শান্ত গলায় বলল, “বিশ্বাস আর বিচার এক জিনিস নয়। ওঁর অপরাধের বিচার হবে। কিন্তু সত্যিটা জানতে হলে ওঁকেও আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।”

মধুমিতা বললেন, “অরিত্র ঠিক বলেছে। এবার কেউ পালাবে না।”

দেবব্রত কোনও প্রতিবাদ করলেন না।

বাড়ির প্রধান দরজা পেরিয়ে তারা উঠোনে এসে দাঁড়াতেই অরিত্রর ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

সে কল ধরল।

ওপাশ থেকে একজন পুরুষকণ্ঠ বলল, “তুমি নীলকুঠিতে গিয়েছিলে?”

অরিত্র সতর্ক হয়ে উত্তর দিল, “কে বলছেন?”

“যে সত্যিটা তোমার জানার কথা ছিল না।”

“আপনি কে?”

“আমার নাম অনির্বাণ সেনগুপ্ত।”

অরিত্র চমকে উঠল।

“আপনি কীভাবে আমার নম্বর পেলেন?”

“ওসব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তুমি যে নথি খুঁজছ, সেটা পাবে না।”

“কেন?”

“কারণ সেই নথিতে শুধু আমার জন্মের সত্যি নেই। তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্যিও আছে।”

অরিত্রর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“আমার মা বেঁচে আছেন।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর অনির্বাণ বলল, “তাহলে তিনি তোমাকে সব বলেননি।”

অরিত্র মায়ের দিকে তাকাল।

মধুমিতা ফোনের ওপাশের কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু অরিত্রর মুখ দেখে তাঁর চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।

অরিত্র বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন?”

অনির্বাণের গলা এবার আরও নিচু।

“২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর নীলকুঠিতে একজন মহিলা নিখোঁজ হননি। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। আর সেই ঘটনার পর যাকে জীবিত অবস্থায় অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে তোমার মা নয়।”

অরিত্রর হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“আপনি মিথ্যে বলছেন!”

“আমি মিথ্যে বলছি কি না, সেটা জানতে চাইলে আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় আমার হাসপাতালে এসো। একা আসবে। সঙ্গে তোমার মায়ের ডায়েরিটা আনবে।”

“আপনি জানেন ডায়েরি আমার কাছে আছে কীভাবে?”

“কারণ ডায়েরিটা আমিই তোমার বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম।”

অরিত্রর চোখ বড় হয়ে গেল।

“নীল খামগুলোও আপনি পাঠিয়েছেন?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

অনির্বাণের উত্তর এল ধীরে ধীরে।

“কারণ তোমাদের পরিবারে যে মানুষটাকে সবাই মৃত ভেবেছে, সে ফিরে এসেছে ঠিকই। কিন্তু সে তোমাদের মা কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি।”

কল কেটে গেল।

অরিত্র ফোনটা নামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।

মধুমিতার মুখে কোনও রং নেই।

অরিত্র ধীরে ধীরে বলল, “মা, অনির্বাণ বলছে, তুমি আমার মা নও।”

মধুমিতা যেন কথাটা শুনেও শুনলেন না। তিনি কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। তাঁর চোখে এমন ভয়, যা অরিত্র আগে কখনও দেখেনি।

অরুণ এগিয়ে এসে বলল, “মা?”

মধুমিতা কাঁপা গলায় বললেন, “না… না, এটা হতে পারে না।”

অরিত্র তাঁর হাত ধরল।

“আমাকে সত্যিটা বলো।”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন—

“অরিত্র, আমি তোকে জন্ম দিয়েছি। কিন্তু তোকে যে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম, সে শিশুটি…”

তিনি বাকিটা বলতে পারলেন না।

দূরে নীলকুঠির ভেতরে হঠাৎ একটা বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো।

সবাই ঘুরে তাকাল।

দোতলার একটি জানলা দিয়ে আগুনের আলো বেরিয়ে আসছে।

ঋতম চিৎকার করে বলল, “আগুন!”

অরুণ ছুটে বাড়ির দিকে গেল। অরিত্র মাকে ধরে বাইরে টেনে আনল। দেবব্রতও তাদের পেছনে এলেন।

কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল কাঠের ছাদে। ধোঁয়ায় ঢেকে গেল জানলা, করিডর, সিঁড়ি।

ঋতম পুলিশ ও দমকলে ফোন করতে লাগল।

অরিত্রর চোখ তখনও দোতলার জানলায় আটকে। আগুনের ভেতরে সে যেন কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।

একজন মহিলা।

তার হাতে একটি নীল খাম।

মহিলাটি জানলার কাছে এসে অরিত্রর দিকে তাকালেন। তারপর ঠোঁট নাড়লেন।

দূরত্বের কারণে শব্দ শোনা গেল না। কিন্তু অরিত্র স্পষ্ট বুঝতে পারল, তিনি একটি কথাই বলছেন—

‘বিশ্বাস করিস না।’

পরক্ষণেই ছাদের একটা অংশ ভেঙে পড়ল। আগুনের শিখা জানলা ঢেকে দিল।

অরিত্র চিৎকার করে উঠল, “ভেতরে কেউ আছে!”

অরুণ তাকে ধরে পিছিয়ে আনল।

“ওখানে গেলে তুইও মরবি!”

অরিত্র ছটফট করতে লাগল।

“ওই মহিলা কে? মা কি ভেতরে রয়ে গেছে?”

মধুমিতা তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। কিন্তু তাঁর চোখে আতঙ্কের পাশাপাশি এমন এক অপরাধবোধ ছিল, যা অরিত্রর সমস্ত প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলল।

সেই রাতেই নীলকুঠির আগুনে পুড়ে গেল বহু পুরোনো নথি, ছবি, চিঠি আর স্মৃতির শেষ আশ্রয়।

কিন্তু অরিত্রর পকেটে তখনও ছিল একটি জিনিস।

মায়ের ডায়েরির ছেঁড়া পাতা।

আগুন লাগার আগে সে সেখানে একটি লাইন পড়েছিল, যা এতক্ষণ তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।

‘যদি কোনও দিন আমার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হয়, তবে মনে রেখো—যে তোমাকে জন্ম দেয়, সে-ই সব সময় তোমার মা হয় না; আর যে তোমাকে বড় করে, সে-ও সব সময় তোমার বাবা হয় না।’

অরিত্র আকাশের দিকে তাকাল।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর পাওয়ার বদলে সে আরও গভীর অন্ধকারে প্রবেশ করেছে।

তার মা বেঁচে আছেন—কিন্তু তিনি কি সত্যিই তার মা?

তার যমজ ভাই অরুণ—কিন্তু তাদের মধ্যে কার পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল?

আর ডা. অনির্বাণ সেনগুপ্ত—তৃতীয় শিশুটি—কেন তাদের পরিবারের অতীত নিয়ে এত কিছু জানেন?

সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অরিত্রকে এবার যেতে হবে সেই হাসপাতালে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।

কিন্তু সে জানত না, পরদিন বিকেল পাঁচটায় হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে ঢোকার পর তার জন্য অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর এক সত্য।

কারণ হাসপাতালের পুরোনো রেজিস্টারে শুধু তিনটি শিশুর নাম ছিল না।

ছিল চতুর্থ একটি নামও।

আর সেই নামের পাশে লেখা ছিল—

‘মৃত্যুর কারণ: নথিভুক্ত নয়।’

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের অভিশাপ (দ্বিতীয় পর্ব: নীলকুঠির বন্ধ দরজা)।

শুক্রবার রাত এগারোটা চল্লিশ।

আকাশে চাঁদ নেই। মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে সরু রাস্তাটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাস্তার দুপাশে ধানখেত, মাঝেমধ্যে পরিত্যক্ত বাড়ি আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা পুরোনো গাছ। অরিত্রর গাড়ির হেডলাইট ছাড়া চারপাশে আলোর কোনও চিহ্ন নেই।

সামনের সিটে বসে অরিত্র বারবার ঘড়ি দেখছিল।

তার পাশে ঋতম। বন্ধুর মুখেও আজ আর কোনও কৌতুক নেই। অরিত্রর কাছ থেকে সমস্ত ঘটনা শোনার পর সে নিজের মতো করে কিছু খোঁজখবর করেছে। কিন্তু যত তথ্য জোগাড় করেছে, রহস্য ততই গভীর হয়েছে।

ঋতম বলল, “আর পাঁচ মিনিট। তারপর আমরা নীলকুঠিতে পৌঁছে যাব।”

অরিত্র উত্তর দিল না।

তার পকেটে মায়ের ডায়েরি থেকে ছেঁড়া একটি পাতা, নীল খাম, যমজ ভাইয়ের ছবি এবং পুরোনো ক্যাসেট। যাওয়ার আগে সে বাবাকে অনেকবার ফোন করেছিল। ফোন বন্ধ। থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করার কথাও ভেবেছিল, কিন্তু বাবার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে নীলকুঠির সম্পর্ক আছে কি না, তা না জেনে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

ঋতম অবশ্য তাকে বারবার সতর্ক করেছে।

“একটা কথা মনে রাখিস, অরিত্র। যে লোক তোকে এই বাড়িতে ডাকছে, সে তোর বন্ধু নাও হতে পারে। আমরা কোনও কিছু না বুঝে আলাদা হয়ে যাব না।”

অরিত্র বলেছিল, “আমি শুধু আমার মাকে আর ভাইকে খুঁজতে চাই।”

ঋতম গম্ভীরভাবে উত্তর দিয়েছিল, “আর আমি চাই, তুই জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরিস।”

গাড়ি একটা ভাঙা সেতুর কাছে এসে থামল। তার পরের রাস্তা এতটাই সরু যে গাড়ি নিয়ে এগোনো সম্ভব নয়।

দুজন নেমে পড়ল।

দূরে অন্ধকারের মধ্যে নীলকুঠির ভাঙা চূড়া দেখা যাচ্ছে। গাছের ডালপালা বাড়িটার বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রেখেছে। একসময় যে বাড়ি বিশাল জমিদারির গৌরব ছিল, এখন তার দেওয়ালে শ্যাওলা, ছাদে বুনো ঘাস, আর জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে অন্ধকার।

গেটের কাছে পৌঁছে অরিত্র থমকে দাঁড়াল।

লোহার গেটের ওপর সাদা রঙে লেখা—

‘মধুমিতা শিশু নিবাস।’

নীচে আরও ছোট অক্ষরে—

‘প্রতিষ্ঠিত ১৯৮৭।’

ঋতম মোবাইলের আলো ফেলে লেখাটা দেখল।

“তোর মা কি এই অনাথ আশ্রমে কাজ করতেন?”

“আমি জানি না।”

“তাহলে তোর মায়ের নাম এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কেন?”

অরিত্র কোনও উত্তর দিল না। গেটের পাশে একটা ছোট ঘণ্টা ঝুলছিল। সে একবার টানল।

ভেতর থেকে কোনও সাড়া এল না।

দ্বিতীয়বার টানতেই বাড়ির ভেতরে কোথাও একটা দরজা খোলার শব্দ হলো।

তারপর ধীরে ধীরে গেটটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ঋতম ফিসফিস করে বলল, “হাওয়ায় খুলে গেল নাকি?”

অরিত্র গেটের কবজার দিকে তাকাল। জং ধরা লোহার গেটটা এত ভারী যে সামান্য হাওয়ায় খোলার কথা নয়।

ভেতরে ঢুকে তারা একটা পাথরের পথ ধরে এগোতে লাগল। বাড়ির সামনে পৌঁছতেই অরিত্র দেখল, প্রধান দরজার পাশে একটা কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলছে।

দরজায় ঝুলছে একটি নীল খাম।

তার ওপর লেখা—

‘অরিত্রর জন্য।’

অরিত্র খামটা খুলল। ভেতরে একটি ছোট চাবি এবং কাগজের টুকরো।

‘দোতলার সতেরো নম্বর ঘর। সেখানে যা আছে, তা তোমার জন্মের আগের সত্যি।’

ঋতম কাগজটা পড়ে বলল, “আমরা একসঙ্গে যাব। তুই আগে, আমি পেছনে।”

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা পুরোনো গন্ধ নাকে এল। ধুলো, স্যাঁতসেঁতে কাঠ আর বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের গন্ধ। দেওয়ালে সারি সারি ছবি। ছোট ছোট শিশুদের ছবি। প্রত্যেকের ছবির নিচে একটি করে নাম ও তারিখ লেখা।

অরিত্র ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা ছবির সামনে এসে থেমে গেল।

ছবিতে সাত বছরের একটি ছেলে। পরনে সাদা জামা, কালো হাফপ্যান্ট। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত।

ছবির নিচে লেখা—

‘অরুণ মজুমদার। জন্ম: ১৪ নভেম্বর ১৯৯২।’

অরিত্রর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

তার যমজ ভাইয়ের ছবি এই বাড়ির দেওয়ালে কেন?

ছবির পাশে আরেকটি ছবি। সেখানে এক মহিলার কোলে দুটি শিশু। মহিলার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তাঁর গলার রুপোর লকেটটা অরিত্র চিনতে পারল।

সেটা তার মায়ের লকেট।

ছবির নিচে লেখা—

‘মধুমিতা মজুমদার। পরিচর্যাকারী।’

ঋতম বলল, “তোর মা এখানে কাজ করতেন। কিন্তু তোর পরিবার তো কখনও বলেনি।”

অরিত্র ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে শুধু বলা হয়েছিল, মা বাড়িতে থাকতেন। বিয়ের পর কোথাও চাকরি করেননি।”

“তাহলে কেউ একজন তোকে ইচ্ছা করে অনেক কিছু জানতে দেয়নি।”

ঠিক সেই সময় দোতলার ওপর থেকে একটা শিশুর হাসির শব্দ ভেসে এল।

দুজনেই মাথা তুলে তাকাল।

হাসিটা আবার শোনা গেল।

তারপর একটা কণ্ঠ বলল, “দাদা, এত দেরি করলে কেন?”

অরিত্রর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঋতম তার হাত চেপে ধরল।

“শুনেছিস?”

অরিত্র মাথা নাড়ল।

দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তাদের মনে হচ্ছিল, বাড়িটা যেন প্রতিটি পদক্ষেপ গুনছে। সতেরো নম্বর ঘরের দরজাটা করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে।

দরজায় তালা ঝুলছে।

অরিত্র নীল খামের ভেতর পাওয়া চাবিটা বের করল। চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাতেই তালাটা খুলে গেল।

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে তারা দেখল, ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের টেবিল। তার ওপর পুরোনো টেপ রেকর্ডার, একটা ফাইল, কয়েকটি চিঠি এবং একটি ছোট আয়না।

দেওয়ালে কালো রঙে লেখা—

‘একটি শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকটি শিশুর পরিচয় মুছে দেওয়া হয়েছিল।’

ঋতম ফাইলটা খুলল। ভেতরে হাসপাতালের কাগজপত্র, শিশুদের নামের তালিকা এবং কয়েকটি হাতে লেখা রিপোর্ট।

একটি রিপোর্টের তারিখ ১৪ নভেম্বর ১৯৯২।

অরিত্র দ্রুত পড়তে লাগল।

সেখানে লেখা ছিল, একই রাতে দুইটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। দুই শিশুর মা মধুমিতা মজুমদার। কিন্তু হাসপাতালের রেজিস্টারে একটি শিশুর নামের পাশে লাল কালিতে লেখা—

‘স্থানান্তরিত।’

অন্য শিশুর নামের পাশে—

‘অভিভাবকের কাছে হস্তান্তরিত।’

কোন শিশুকে কোথায় পাঠানো হয়েছিল, তার উল্লেখ নেই।

ঋতম বলল, “এখানে হাসপাতালের সিল আছে। কিন্তু নথির শেষ পাতাটা ছেঁড়া।”

অরিত্র ফাইলের ভেতর থেকে একটি চিঠি বের করল।

চিঠিটা লেখা দেবব্রত মজুমদারের নামে।

‘আপনি যে শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন, তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। বিনিময়ে অন্য শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আপনি যদি চুক্তি ভঙ্গ করেন, তবে দুজনের জীবনই বিপন্ন হবে।’

চিঠির শেষে কোনও স্বাক্ষর নেই।

শুধু একটি প্রতীক—একটি নীল বৃত্তের মধ্যে কালো ত্রিভুজ।

ঋতম প্রতীকটা দেখে চমকে উঠল।

“এই চিহ্নটা আমি আগে দেখেছি।”

“কোথায়?”

“পুরোনো সংবাদপত্রের একটা ছবিতে। প্রায় তিরিশ বছর আগে একটা শিশু পাচার চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছিল। কয়েকজন হাসপাতালকর্মী আর আশ্রমের কর্মচারীর নাম উঠে এসেছিল। কিন্তু তদন্ত হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।”

অরিত্রর গলা শুকিয়ে এল।

“তাহলে কি আমার ভাইকে পাচার করা হয়েছিল?”

“এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে নথিগুলো স্বাভাবিক নয়।”

হঠাৎ টেপ রেকর্ডারটা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

খসখসে শব্দের পর একটা পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“যদি এই রেকর্ডিং কেউ শুনে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর নিরাপদে নেই।”

অরিত্র কণ্ঠটা চিনতে পারল।

তার বাবা।

রেকর্ডিংয়ে দেবব্রত বলছেন, “আমার নাম দেবব্রত মজুমদার। ১৯৯২ সালের ১৪ নভেম্বর আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী মধুমিতা যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম এক সন্তানকে নিয়ে। অন্য সন্তানকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটা আমি জানতাম না—অন্তত প্রথমে জানতাম না।”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর আবার কণ্ঠ ভেসে এল।

“যে মানুষটি আমাকে বলেছিল অন্য শিশুটি মারা গেছে, সে মিথ্যে বলেছিল। আমি অনেক বছর পর জানতে পারি, শিশুটি বেঁচে আছে। তাকে এই আশ্রমে রাখা হয়েছিল। মধুমিতা তাকে খুঁজে পেয়েছিল। তারপর থেকেই সবকিছু বদলে যায়।”

অরিত্রর চোখে জল চলে এল।

রেকর্ডিংয়ে বাবা বলছেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, সত্যি প্রকাশ করলে অরিত্রকে হারাব। আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে ক্ষমা করেনি। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর সে নীলকুঠিতে ফিরে আসে। তারপর…”

হঠাৎ রেকর্ডিং থেমে গেল।

ঋতম টেপ রেকর্ডারটা পরীক্ষা করল।

“ক্যাসেটের ফিতা জ্যাম হয়ে গেছে।”

অরিত্র বলল, “বাকিটা শুনতেই হবে।”

সে ক্যাসেটটা বের করে যত্ন করে রাখল। ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়ালে একটা শব্দ হলো।

টক।

তারপর আবার—

টক। টক।

দুজনেই ঘুরে তাকাল।

দেওয়ালের এক পাশে একটা পুরোনো কাঠের আলমারি। আলমারির দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে। ভেতর থেকে যেন কেউ আঙুল দিয়ে কাঠে টোকা মারছে।

ঋতম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

“ভেতরে কেউ আছ?”

কোনও উত্তর নেই।

সে আলমারির দরজা খুলতেই ভেতর থেকে একটা পুরোনো পুতুল মেঝেতে পড়ে গেল। পুতুলটার চোখে কালো বোতাম, গায়ে নীল জামা।

পুতুলটার সঙ্গে বাঁধা একটি কাগজ।

অরিত্র কাগজটা খুলল।

‘দাদা, তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে আসো, তাহলে মনে রেখো—আমি তোমার শত্রু নই। কিন্তু তুমি যাকে বাবা বলে জানো, সে আমার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।’

নীচে লেখা—

‘অরুণ।’


রাত বারোটা পেরিয়ে গিয়েছিল।

অরিত্র আর ঋতম ঘরের প্রতিটি কাগজ পরীক্ষা করছিল। এমন সময় করিডরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

এবার শব্দটা স্পষ্ট।

কেউ একজন ধীরে ধীরে সতেরো নম্বর ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

ঋতম দরজার পাশে দাঁড়াল। অরিত্র টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনটা তুলে নিল।

পায়ের শব্দ দরজার সামনে এসে থেমে গেল।

তারপর বাইরে থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ বলল, “অরিত্র।”

কণ্ঠটা তার বাবার।

অরিত্র দরজার দিকে ছুটে গেল।

“বাবা!”

দরজা খুলতেই সে দেখল, দেবব্রত মজুমদার দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর জামাকাপড় ভেজা, কপালে কাটা দাগ, চোখের নিচে কালচে ছাপ।

অরিত্র বাবাকে জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু দেবব্রত হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।

“আমাকে ছুঁস না।”

“কী হয়েছে তোমার? কোথায় ছিলে?”

দেবব্রত ঘরের ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকালেন। তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হলো, তিনি সবকিছু আগেই জানতেন।

ঋতম বলল, “আপনি জানতেন এই বাড়িতে কী আছে?”

দেবব্রত তার দিকে তাকালেন।

“তুমি কে?”

“আমি অরিত্রর বন্ধু।”

“তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি।”

অরিত্র বাবার হাত ধরে বলল, “আমার যমজ ভাই কোথায়?”

দেবব্রত চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি জানি না।”

“মিথ্যে বলছ! তোমার রেকর্ডিং শুনেছি। তুমি জানো অরুণ বেঁচে আছে।”

“আমি জানতাম সে বেঁচে আছে। কিন্তু কোথায় আছে, জানতাম না।”

“তাহলে এত বছর আমাদের কাছ থেকে সব লুকিয়েছ কেন?”

দেবব্রত চুপ করে রইলেন।

অরিত্র এবার চিৎকার করে বলল, “মা কোথায়?”

প্রশ্নটা শুনে দেবব্রত যেন হঠাৎ ভেঙে পড়লেন। তিনি চেয়ারে বসে মুখে হাত দিলেন।

“তোর মা আমাকে কখনও ক্ষমা করেনি। আমি তাকে বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু পারিনি।”

“কী হয়েছিল সেদিন?”

দেবব্রত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর মধুমিতা এখানে এসেছিল অরুণকে নিয়ে যেতে। সে জানতে পেরেছিল, অরুণকে অন্য নামে বড় করা হচ্ছে। তার কাছে প্রমাণ ছিল। কিন্তু আশ্রমের যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা তাকে আটকে দেয়। আমি খবর পেয়ে এখানে এসেছিলাম। তোর মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।”

“তারপর?”

“আমরা ঝগড়া করেছিলাম। সে বলেছিল, আমি যদি সত্যি প্রকাশ না করি, তাহলে সে নিজেই সব জানাবে। আমি তাকে থামাতে পারিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির পেছনের দিক থেকে চিৎকার শুনতে পাই। দৌড়ে গিয়ে দেখি, মধুমিতা নেই।”

“তুমি পুলিশকে বলেছিলে, মা নদীতে পড়ে মারা গেছেন।”

দেবব্রত মাথা নিচু করলেন।

“আমাকে তাই বলতে বলা হয়েছিল।”

“কারা বলেছিল?”

দেবব্রত মুখ খুললেন, কিন্তু শব্দ বেরোল না।

ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারে কেউ একজন হাসল।

একটি যুবক কণ্ঠ।

“বাবা, এত বছর পরেও তুমি সত্যিটা বলতে পারলে না?”

দরজার কাছে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল।

ঋতম মোবাইলের আলো জ্বালল।

আলোর বৃত্তে দেখা গেল একজন যুবক। কালো জামা, ভেজা চুল, ডান গালে লম্বা কাটা দাগ।

অরিত্র ছবির যুবকটিকে চিনতে পারল।

অরুণ।

তার যমজ ভাই।

অরিত্র এক পা এগিয়ে গেল।

“তুমি অরুণ?”

যুবকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তুমি আমাকে খুঁজতে এসেছ, নাকি নিজের পরিচয় বাঁচাতে?”

অরিত্রর গলা কেঁপে উঠল।

“আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই।”

অরুণ হেসে উঠল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ।

“সত্যি? সত্যিটা খুব সহজ, দাদা। আমাদের জন্মের রাতে একজন শিশুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্যজনকে এমন জায়গায় পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তার নাম, পরিচয়, সবকিছু বদলে দেওয়া হয়। আর সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমাদের বাবা।”

দেবব্রত উঠে দাঁড়ালেন।

“অরুণ, আমি যা করেছি, ভয়ে করেছি।”

“ভয়? তুমি আমাকে একবারও খুঁজতে আসোনি। মা যখন আমাকে খুঁজে পেয়েছিল, তখনও তুমি তাকে সাহায্য করোনি।”

অরুণের চোখ লাল হয়ে উঠেছিল।

অরিত্র বলল, “কিন্তু মা কোথায়? তুমি জানো?”

অরুণ তার দিকে তাকাল।

“মা বেঁচে আছে।”

অরিত্রর বুকের ভেতর যেন আলো জ্বলে উঠল।

“কোথায়?”

অরুণ উত্তর দেওয়ার আগে পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করল। চাবিটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, “এই বাড়ির নীচে একটা ঘর আছে। সেই ঘরে মায়ের শেষ চিঠি রাখা। চিঠিতে সব লেখা আছে।”

ঋতম বলল, “তাহলে আমাদের সেখানে নিয়ে চলো।”

অরুণ মাথা নাড়ল।

“আমি কাউকে কোথাও নিয়ে যাব না। তোমরা নিজেরাই খুঁজে নাও।”

অরিত্র চাবিটা হাতে নিল।

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে না?”

অরুণ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে ছোটবেলা থেকেই মিথ্যে দিয়ে বড় করা হয়েছে। অন্যজনকে বড় করা হয়েছে ঘৃণা দিয়ে। তুমি জানো না, তোমার জন্য কতজনের জীবন নষ্ট হয়েছে।”

“আমি তো কিছুই জানতাম না!”

“সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল।”

অরুণ ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

অরিত্র তার পেছনে ছুটল।

“দাঁড়াও! অন্তত একবার আমার সঙ্গে কথা বলো!”

অরুণ থামল না।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে অন্ধকার করিডরে মিলিয়ে গেল।

অরিত্র দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি, বারান্দা, উঠোন—কোথাও কেউ নেই।

গেটের কাছে পৌঁছে সে দেখল, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু ভেজা মাটিতে কোনও পায়ের ছাপ নেই।

যেন অরুণ কখনও এই বাড়িতে আসেইনি।


দেবব্রত তখনও সতেরো নম্বর ঘরে বসে ছিলেন।

অরিত্র ফিরে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল।

“নীচের ঘরটা কোথায়?”

দেবব্রত ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“ওই ঘর খুলিস না।”

“কেন?”

“কারণ তোর মা সেখানে নেই।”

“তুমি কীভাবে জানো?”

দেবব্রত উত্তর দিলেন না।

অরিত্র চাবিটা শক্ত করে ধরে বলল, “আমি আর মিথ্যে শুনব না।”

সে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। প্রধান দরজার পাশের দেওয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে একটা সরু কাঠের দরজা খুঁজে পেল। দরজাটা বাইরে থেকে দেওয়ালের রঙে ঢেকে রাখা হয়েছিল। তালার গায়ে মরচে পড়ে আছে।

অরিত্র চাবিটা ঢোকাল।

তালা খুলে গেল।

দরজার ওপারে সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। অরিত্র মোবাইলের আলো জ্বেলে নামতে লাগল। পেছনে ঋতমও এল।

সিঁড়ির শেষে একটা ছোট ঘর।

ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল। তার ওপর একটি টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ফাইল এবং একটি লাল কাপড়ে মোড়া বাক্স।

দেওয়ালে টাঙানো ছিল মধুমিতার একটি ছবি।

ছবির নিচে লেখা—

‘আমি হারিয়ে যাইনি। আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

অরিত্র ছবির সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বাক্সটা খুলল।

ভেতরে একটি চিঠি।

মায়ের হাতের লেখা।

‘অরিত্র ও অরুণ,

যদি তোমরা দুজন এই চিঠি একসঙ্গে পড়তে পারো, তবে বুঝব আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে। তোমাদের আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল এমন একটি অপরাধ ঢাকতে, যার সঙ্গে তোমাদের কোনও সম্পর্ক ছিল না।

তোমাদের জন্মের রাতে আমি শুধু দুই সন্তানের মা হইনি। আমি এমন একটি সত্যের সাক্ষী হয়েছিলাম, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন ক্ষমতাবান মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যেত।

আমি জানতাম, তোমাদের একজনকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তাই আমি প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিলাম।

কিন্তু যে মানুষটিকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম, সে-ই আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

তোমাদের বাবা আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল কি না, তা নিয়ে আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। কারণ সে সত্যের পাশে দাঁড়ায়নি।

তবে মনে রেখো, তোমাদের জন্মের রহস্য শুধু তোমাদের পরিচয়ের রহস্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি শিশুর জীবন।

সেই শিশুটি এখনও জানে না, তার প্রকৃত বাবা-মা কারা।’

চিঠির শেষ অংশটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

অরিত্র আর ঋতম একে অপরের দিকে তাকাল।

ঋতম বলল, “আরও একটি শিশু?”

অরিত্র চিঠিটা আলোয় তুলে ধরল। ছেঁড়া অংশের নিচে খুব হালকা কালির দাগ দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ ওপরের লেখা মুছে ফেলেছে। সে আঙুল দিয়ে কাগজটা স্পর্শ করল।

হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডার চালু হয়ে গেল।

এবার মায়ের কণ্ঠ।

“অরিত্র, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারছি না। তোর ভাইকে খুঁজে পেলে তাকে বলিস, আমি তাকে কোনও দিন ছেড়ে যাইনি। আর দেবব্রতকে বলিস, সে যেন নিজের অপরাধের শাস্তি মেনে নেয়।”

একটু বিরতি।

তারপর মায়ের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।

“কিন্তু সবথেকে ভয়ংকর সত্যিটা এখনও বলা হয়নি। যে মানুষটি তোদের দুজনকে আলাদা করেছিল, সে তোদের পরিবারেরই একজন।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

ঘরের ভেতরে নেমে এল গভীর নীরবতা।

অরিত্র ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন দেবব্রত।

তাঁর হাতে একটি রিভলভার।

অরিত্রর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

দেবব্রত কাঁপা গলায় বললেন, “চিঠিটা আমাকে দে।”

“কেন?”

“কারণ ওটা তোর মায়ের লেখা শেষ চিঠি নয়।”

“তাহলে শেষ চিঠিটা কোথায়?”

দেবব্রত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—

“যে মানুষটাকে তুই এতক্ষণ ধরে খুঁজছিস, সে শুধু তোর ভাই নয়।”

অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

দেবব্রতর চোখে জল এসে গেছে।

“সে-ই তোদের মাকে শেষবার দেখেছিল। আর সে-ই জানে, তোর জন্মের রাতে তৃতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

“তৃতীয় শিশু?”

দেবব্রত মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ, অরিত্র। তোদের জন্মের রাতে হাসপাতালে দুটো নয়, তিনটি শিশু ছিল।”

ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়ালে একটা ভারী শব্দ হলো।

দেওয়ালের একটা অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।

অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল—

“দেবব্রত, আর মিথ্যে বলো না।”

অরিত্রর হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।

কণ্ঠটা তার পরিচিত।

সেই কণ্ঠ সে ফোনে শুনেছিল।

সেই কণ্ঠ তার শৈশবের ঘুমপাড়ানি গানের মধ্যে ছিল।

তার মা।

অন্ধকারের মধ্যে একটি ছায়ামূর্তি এগিয়ে এল।

আর সেই ছায়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন—যার মুখ অরিত্রর মতো, অরুণের মতো, অথচ দুজনের কারও মতো নয়।

মহিলা ধীরে ধীরে বললেন—

“তোমাদের দুজনের জন্যই এত বছর অপেক্ষা করেছি। কিন্তু তোমরা এখনও জানো না, তোমাদের মধ্যে কে আসল অরিত্র।”

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের অভিশাপ (প্রথম পর্ব: যে চিঠি কখনও লেখা হয়নি)।

রাত তখন ১টা ১৭ মিনিট।

কলকাতার উত্তর শহরতলির পুরোনো বাড়িটায় সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। শুধু দোতলার শেষ ঘরটায় জ্বলছিল একটি টেবিল ল্যাম্প। জানলার বাইরে বৃষ্টির শব্দ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ঘড়িটার একটানা টিকটিক শব্দ—সব মিলিয়ে বাড়িটাকে যেন পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে আলাদা করে রেখেছিল।

ঘরের মাঝখানে বসে ছিল অরিত্র মজুমদার। বয়স ছত্রিশ। পেশায় পেশাদার ফটোগ্রাফার। পুরোনো বাড়ি, পরিত্যক্ত কারখানা, ভেঙে পড়া জমিদারবাড়ি—এইসব জায়গার ছবি তোলাই তার নেশা। মানুষের ভিড় থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসত সে। কিন্তু গত কয়েক মাসে তার জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার ব্যাখ্যা সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছিল না।

তার সামনে রাখা ছিল একটি নীল রঙের খাম।

খামটা এসেছিল বিকেলে। কোনও ডাকটিকিট নেই, প্রেরকের নাম নেই, এমনকি খামের ওপর অরিত্রর ঠিকানাও লেখা ছিল না। তবু বাড়ির পুরোনো দারোয়ান নিতাই কাকা দাবি করেছিলেন, একজন অচেনা মহিলা এসে খামটা তাঁর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “অরিত্রবাবুকে দেবেন। উনি জানেন, এটা কীসের চিঠি।”

অরিত্র জানত না।

খাম খুলে ভেতর থেকে সে পেয়েছিল একটি সাদা কাগজ। কাগজে মাত্র তিনটি লাইন লেখা।

‘তুমি যাকে মৃত বলে জানো, সে মৃত নয়।

যে মানুষটি তোমার বাড়িতে থাকে, সে তোমার আত্মীয় নয়।

আগামী শুক্রবার রাত বারোটার আগে পুরোনো নীলকুঠিতে এসো। একা।’

নিচে কোনও নাম নেই। শুধু একটি তারিখ।

সতেরো বছর আগের তারিখ।

২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর।

অরিত্র কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারিখটা দেখেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠেছিল। কারণ ওই দিনই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। তার মা, মধুমিতা মজুমদার, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি।

পুলিশ বলেছিল, নদীতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। কয়েক দিন পর নদীর ধারে একটি শাড়ির ছেঁড়া অংশ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কোনও দেহ পাওয়া যায়নি।

অরিত্রর বাবা তখন বলেছিলেন, “তোর মা আর ফিরবে না।”

তারপর থেকে বাড়িতে মায়ের কথা বলা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু চিঠিতে লেখা ছিল—যাকে মৃত বলে জানো, সে মৃত নয়।

তাহলে কি মা বেঁচে আছেন?

আর দ্বিতীয় লাইনটা?

‘যে মানুষটি তোমার বাড়িতে থাকে, সে তোমার আত্মীয় নয়।’

অরিত্রর বাড়িতে এখন মাত্র দুজন মানুষ থাকত—সে নিজে এবং তার বাবা, দেবব্রত মজুমদার। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। শরীর দুর্বল, হাঁটাচলা ধীর, কিন্তু স্মৃতিশক্তি এখনও আশ্চর্য রকম ভালো।

তাহলে কি চিঠিটা তার বাবাকে নিয়ে?

অরিত্র মাথা নাড়ল। অসম্ভব।

তবু মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি জমে উঠল। সে চিঠিটা আবার ভাঁজ করে খামের মধ্যে রাখল। ঠিক তখনই নিচের তলা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।

ঠক।

তারপর আবার—

ঠক। ঠক।

যেন কেউ সদর দরজায় ধীরে ধীরে আঘাত করছে।

অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত একটা বেজে সতেরো মিনিট। এই সময়ে কে আসতে পারে?

সে টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে দরজার কাছে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তার মনে হলো, বাড়ির ভেতরে যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা। জানলা বন্ধ, দরজা বন্ধ, তবু কোথা থেকে একটা ভেজা মাটির গন্ধ আসছে।

সদর দরজার কাছে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “কে?”

কোনও উত্তর এল না।

আবার তিনটে আঘাত।

ঠক। ঠক। ঠক।

অরিত্র দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু বারান্দার মেঝেতে পড়ে রয়েছে আরেকটি নীল খাম।

এবার খামের ওপর কালো কালিতে লেখা—

‘প্রথম চিঠিটা পড়েছ। এবার সত্যিটা পড়ো।’

অরিত্র খামটা তুলে নিল। হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। সে দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালল। খামের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি।

ছবিতে একটি বাড়ি। বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনজন মানুষ—একজন মহিলা, একজন পুরুষ এবং একটি ছোট ছেলে।

মহিলাটিকে চিনতে অরিত্রর এক মুহূর্তও লাগল না।

তার মা।

পুরুষটি তার বাবা দেবব্রত।

কিন্তু ছোট ছেলেটি কে?

ছবিতে ছেলেটির বয়স সাত-আট বছরের বেশি নয়। পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে সাদা জামা। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত। অরিত্র ছবিটা নিজের মুখের কাছে তুলে ধরল।

ছেলেটির মুখ তার নিজের ছোটবেলার ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

কিন্তু একটা সমস্যা ছিল।

অরিত্রর শৈশবের কোনও ছবিতেই তাকে ওই পোশাকে দেখা যায়নি। আর ছবির পেছনে লেখা তারিখ অনুযায়ী, ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর—যে দিন তার মা নিখোঁজ হয়েছিলেন।

ছবির পেছনে আরও একটি বাক্য লেখা ছিল।

‘তুমি সেদিন একা ছিলে না।’


পরদিন সকালে অরিত্র কোনও কাজ করতে পারল না।

সকালের চা ঠান্ডা হয়ে গেল, ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জে বসানো রইল, অথচ তার সমস্ত মন পড়ে রইল ছবিটার ওপর। সে বারবার ছবিটা পরীক্ষা করল। কাগজের গুণমান, পুরোনো হয়ে যাওয়া প্রান্ত, ছবির পেছনের লেখা—সবই সত্যিকারের পুরোনো ছবির মতো। কোনও ডিজিটাল কারসাজির চিহ্ন সে খুঁজে পেল না।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল বাড়িটা।

ছবির পেছনে একটি ছোট ফলক দেখা যাচ্ছিল। সেখানে অস্পষ্টভাবে লেখা—‘নীলকুঠি’।

এই নাম সে আগে শুনেছে।

শহর থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে, একসময় নীল চাষের জন্য বিখ্যাত একটি গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত নীলকুঠি। বহু বছর ধরে বাড়িটা বন্ধ। স্থানীয় মানুষজনের দাবি, সেখানে কেউ থাকে না। সন্ধের পর বাড়িটার কাছাকাছি গেলেও নাকি অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়।

অরিত্র একবার সেখানে ছবি তুলতে গিয়েছিল। প্রায় পাঁচ বছর আগে। বাড়ির ভাঙা দেওয়াল, শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি আর লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া জানলা তার ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল। কিন্তু একটি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সে ছবি তুলতে পারেনি।

কারণ সেই ঘরের দরজার গায়ে তার মায়ের নাম লেখা ছিল।

‘মধুমিতা।’

সেদিন সে ভেবেছিল, হয়তো কারও পুরোনো নামের ফলক। কিন্তু বাড়ি ফিরে ছবিগুলো দেখার সময় সে অবাক হয়ে দেখেছিল, ওই দরজার ছবি ক্যামেরায় আসেনি। যতবারই সে ছবি তুলেছে, ওই নির্দিষ্ট অংশটি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।

এরপর সে আর কখনও নীলকুঠিতে যায়নি।

সকাল দশটার দিকে অরিত্র বাবার ঘরে গেল।

দেবব্রতবাবু জানলার পাশে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পাশে আধখাওয়া চায়ের কাপ।

অরিত্র বলল, “বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

দেবব্রত কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “বল।”

“মা নিখোঁজ হওয়ার দিন আমি কোথায় ছিলাম?”

খবরের কাগজটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলেন দেবব্রত।

“কী প্রশ্ন করছিস?”

“সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম, না তোমার সঙ্গে কোথাও গিয়েছিলাম?”

“বাড়িতেই ছিলি। কেন?”

অরিত্র পকেট থেকে ছবিটা বের করে বাবার সামনে রাখল।

দেবব্রত ছবিটার দিকে তাকালেন।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

তারপর তাঁর হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেল। মেঝেতে কাপ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চা।

অরিত্র ছুটে গিয়ে বাবাকে ধরল।

“কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”

দেবব্রত ছবিটার দিকে আঙুল তুলে বললেন, “এটা কোথায় পেলি?”

“একটা চিঠির সঙ্গে এসেছে।”

“কে দিয়েছে?”

“জানি না।”

দেবব্রত উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। তাঁর মুখের রং ফ্যাকাশে। তিনি ছবিটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন, তারপর হঠাৎ সেটাকে ছিঁড়ে ফেলতে গেলেন।

অরিত্র তাঁর হাত চেপে ধরল।

“ছিঁড়ছ কেন?”

“এটা মিথ্যে! সব মিথ্যে!”

“ছবিটা তো সত্যি। ওই ছেলেটা কে?”

দেবব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, “তোর কোনও দরকার নেই এসব জানার।”

“কিন্তু আমার ছোটবেলার ছবি বলে মনে হচ্ছে। অথচ আমি এমন পোশাক কখনও পরেছি বলে মনে পড়ে না।”

“অনেক কিছুই মনে নেই তোর।”

“কী মনে নেই?”

দেবব্রত এবার অরিত্রর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে ভয়, রাগ আর এমন এক অসহায়তা, যা অরিত্র আগে কখনও দেখেনি।

“কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো, অরিত্র। সব দরজা খুলতে নেই।”

“আর যদি সেই দরজার ওপারে আমার মা থাকেন?”

প্রশ্নটা শুনে দেবব্রত যেন পাথর হয়ে গেলেন।

অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, “তোর মা মারা গেছেন।”

“তাহলে ছবিতে তিনি কেন আছেন?”

“ছবিটা পুরোনো।”

“সেদিনের তারিখ লেখা আছে পেছনে।”

দেবব্রত হঠাৎ ছেলের হাত ছেড়ে দিলেন। ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার কাছে গিয়ে থেমে বললেন, “শুক্রবার রাতে কোথাও যাবি না।”

অরিত্র চমকে উঠল।

“শুক্রবার?”

দেবব্রত আর কোনও কথা বললেন না। দরজা বন্ধ করে দিলেন।

অরিত্র দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। সে তো বাবাকে শুক্রবারের কথা এখনও বলেনি।

তাহলে বাবা জানলেন কীভাবে?


বিকেলের দিকে অরিত্র তার পুরোনো বন্ধু ঋতমকে ফোন করল। ঋতম পেশায় সাংবাদিক। রহস্য, অপরাধ এবং পুরোনো ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে ভালোবাসে।

সব শুনে ঋতম প্রথমে হেসে উঠল।

“তোর সঙ্গে কেউ মজা করছে। পুরোনো বাড়ির ছবি, রহস্যময় চিঠি—এসব দিয়ে এখন অনেকেই মানুষকে বোকা বানায়।”

অরিত্র বলল, “আমার বাবার প্রতিক্রিয়াটা দেখলে তুই হাসতে পারতিস না।”

“ছবিটা পাঠা।”

অরিত্র ছবির দুটো দিকের ছবি তুলে পাঠিয়ে দিল।

কয়েক মিনিট পরে ঋতম ফোন করল।

এবার তার গলায় হাসি নেই।

“শোন, ছবির পেছনের তারিখটা ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ।”

“নীলকুঠির ছবি তুই কবে তুলেছিলি?”

“পাঁচ বছর আগে।”

“তখন কি তুই একা গিয়েছিলি?”

“হ্যাঁ।”

“নিশ্চিত?”

অরিত্র বিরক্ত হয়ে বলল, “এই প্রশ্নটা সবাই করছে কেন?”

ঋতম একটু থেমে বলল, “কারণ পাঁচ বছর আগে নীলকুঠিতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এক স্থানীয় গাইড সেখানে গিয়ে নিখোঁজ হয়। পরে তার ক্যামেরা পাওয়া যায়, কিন্তু লোকটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ কেসটা বন্ধ করে দেয়।”

“তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?”

“সেটা জানি না। তবে তুই যে ছবিটা পাঠিয়েছিস, তার পেছনের বাড়িটা আমি চিনি। ওটা শুধু নীলকুঠি নয়। আগে ওখানে একটা অনাথ আশ্রম ছিল।”

অরিত্রর বুকের মধ্যে কেমন একটা শব্দ হলো।

“অনাথ আশ্রম?”

“হ্যাঁ। আশির দশকের শেষ দিকে। পরে আগুন লাগে। কয়েকজন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু আশ্রমের নথিপত্র আর শিশুদের তালিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। কেউ বলত, আগুনের রাতে কয়েকজন শিশুকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কেউ বলত, আসলে কোনও শিশুই মারা যায়নি।”

অরিত্র চুপ করে রইল।

ঋতম বলল, “আমি পুরোনো খবরের কাগজ ঘেঁটে দেখব। তুই ছবিটা যত্ন করে রাখিস। আর শুক্রবার সেখানে যাওয়ার আগে আমাকে জানাবি।”

“তুই আমার সঙ্গে যাবি?”

“অবশ্যই। তবে তার আগে একটা কাজ কর।”

“কী?”

“তোর জন্মের কাগজপত্র খুঁজে দেখ। জন্মের শংসাপত্র, হাসপাতালের নথি, পুরোনো ডায়েরি—যা আছে।”

ফোন কেটে যাওয়ার পর অরিত্র সোজা চলে গেল বাড়ির পুরোনো স্টোররুমে।

ঘরটা বহুদিন পরিষ্কার করা হয়নি। একদিকে ভাঙা চেয়ার, অন্যদিকে পুরোনো ট্রাঙ্ক, কাঠের বাক্স আর খবরের কাগজের স্তূপ। ধুলোয় নাক চুলকোতে লাগল। ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর সে একটা লোহার ট্রাঙ্ক পেল। ট্রাঙ্কের গায়ে ছোট করে লেখা—‘মধুমিতা’।

চাবি ছিল না।

অরিত্র একটা পুরোনো স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে তালাটা খোলার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর তালা ভেঙে গেল।

ভেতরে ছিল কয়েকটি শাড়ি, কিছু চিঠি, একটি ডায়েরি এবং কাপড়ে মোড়া ছোট্ট একটি কাঠের বাক্স।

ডায়েরিটা খুলতেই প্রথম পাতায় মায়ের হাতের লেখা চোখে পড়ল।

‘যদি কখনও আমার ছেলে এই ডায়েরি পড়ে, তবে তাকে বলো—আমি তাকে ফেলে যাইনি।’

অরিত্রর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

সে পরের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।

কিছু পাতা ছিল সাধারণ সংসারের কথা নিয়ে। বাজারের হিসেব, আত্মীয়দের নাম, স্কুলে অরিত্রর প্রথম দিনের বর্ণনা। কিন্তু ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসের পাতাগুলোতে এসে লেখা বদলে গেল। অক্ষরগুলো তাড়াহুড়ো করে লেখা, কোথাও কোথাও কালি ছড়িয়ে গেছে।

১০ নভেম্বর—

‘আজ আবার ফোন এসেছিল। তারা বলেছে, আমি যদি চুপ না করি, তাহলে অরিত্রকে নিয়ে যাবে।’

১১ নভেম্বর—

‘দেবব্রত সব জানে। অথচ সে মুখ খুলছে না। আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।’

১২ নভেম্বর—

‘আজ ছেলেটাকে দেখলাম। অরিত্রর মতোই দেখতে। কিন্তু সে আমার ছেলে নয়। তা হলে কে?’

অরিত্রর হাত কেঁপে উঠল।

১৩ নভেম্বর—

‘আগামীকাল সব শেষ করব। সত্যিটা জানতেই হবে। ওরা বলছে, আমার স্মৃতি ভুল। কিন্তু আমি জানি, সেদিন রাতে দুটো শিশু ছিল।’

১৪ নভেম্বরের পাতাটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

তারপরের পাতায় মাত্র একটি বাক্য—

‘আমি ফিরে আসব। তবে যে আমাকে খুঁজবে, সে যেন নিজের মুখটাকেও চিনে নিতে পারে।’

অরিত্র ডায়েরিটা বন্ধ করল।

ঘরের বাইরে তখন সন্ধে নেমেছে।

সে কাঠের বাক্সটা খুলল। ভেতরে ছিল একটি রুপোর লকেট, একটি ছোট্ট শিশুর হাসপাতালের পরিচয়-ফিতা এবং একটি পুরোনো অডিও ক্যাসেট।

পরিচয়-ফিতায় লেখা—

‘শিশু: অরিত্র মজুমদার।

জন্মতারিখ: ১৪ নভেম্বর ১৯৯২।

অভিভাবক: মধুমিতা মজুমদার।’

অরিত্রর জন্মতারিখ ১৪ নভেম্বর ১৯৯২—এটা সে জানত। কিন্তু ফিতার পেছনে লাল কালিতে আরও একটি নাম লেখা ছিল।

‘শিশু নং ২—অরুণ।’

অরিত্রর যমজ ভাই ছিল?

কেউ কখনও তাকে এ কথা বলেনি।

ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে সে বাক্সের তলায় আরও কিছু খুঁজল। সেখানে একটি ছোট কাগজ ভাঁজ করা ছিল। কাগজে হাসপাতালের নাম এবং একটি ঘরের নম্বর লেখা—

‘শিশু বিভাগ, ঘর ১৭।’

তার নিচে মায়ের হাতের লেখায়—

‘একজনকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। অন্যজনকে কোথায় নিয়ে গেল, কেউ বলতে চায় না।’

অরিত্রর মনে হলো, ঘরের মেঝে যেন হঠাৎ দুলে উঠেছে।

সে একা বড় হয়েছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবেই নিজেকে জেনেছে। কোনও ভাই নেই, বোন নেই—এই কথাই শুনে এসেছে সারা জীবন।

তাহলে অরুণ কে?

আর যদি সত্যিই তার যমজ ভাই থেকে থাকে, তবে সে কোথায়?


রাত ন’টার দিকে বাড়িতে ফিরে অরিত্র দেখল, বাবা নিজের ঘরে নেই। খাবার টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া আছে, কিন্তু দেবব্রতবাবুর ওষুধের বাক্সটা খোলা পড়ে রয়েছে।

“বাবা?”

কোনও উত্তর নেই।

সে একতলা, দোতলা, ছাদ—সব জায়গায় খুঁজল। বাবাকে কোথাও পাওয়া গেল না।

সদর দরজার ছিটকিনি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানলাগুলোও বন্ধ। বাড়ির পেছনের ছোট দরজাটা অবশ্য আধখোলা।

অরিত্র দরজার বাইরে বেরিয়ে দেখল, ভেজা মাটির ওপর পায়ের ছাপ। পায়ের ছাপগুলো বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ফিরে আসার কোনও চিহ্ন নেই।

মাটিতে পড়ে রয়েছে বাবার চশমা।

অরিত্র চশমাটা তুলে নিল। তার বুকের ভেতরে এবার সত্যিকারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

সে ফোন বের করে বাবাকে কল করল।

ফোনের রিংটোন ভেসে এল বাড়ির ভেতর থেকেই।

দেবব্রতবাবুর মোবাইল ফোনটা পড়ে ছিল তাঁর বিছানার ওপর।

অরিত্র পুলিশে খবর দেওয়ার কথা ভাবছিল। ঠিক তখনই তার নিজের ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।

‘বাবাকে খুঁজতে চাইলে শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করো। নীলকুঠিতে আসবে। সঙ্গে ক্যাসেটটা আনবে।’

বার্তার নিচে আরও একটি লাইন—

‘কিন্তু সাবধান। তোমার বাবা তোমাকে যা বলেছেন, তার অর্ধেকও সত্যি নয়।’

অরিত্র সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে ফোন করল।

নম্বরটি বন্ধ।

সে বাবার ঘরে ঢুকে আলমারি, ড্রয়ার, টেবিল—সব খুঁজতে লাগল। কোনও চিরকুট, কোনও সূত্র পাওয়া গেল না। কিন্তু বিছানার পাশের ছোট ড্রয়ার খুলতেই একটা পুরোনো ছবি পেল।

ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন একটি হাসপাতালের সামনে। পাশে এক মহিলা—মধুমিতা। তাঁদের কোলে দুটি শিশু।

ছবির পেছনে লেখা—

‘১৪ নভেম্বর ১৯৯২। আমরা দুজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরব।’

তার নিচে অন্য হাতের লেখায় একটি বাক্য—

‘কিন্তু বাড়ি ফিরেছিল একজন।’


রাত বাড়তে লাগল।

অরিত্র বুঝতে পারছিল, এতদিন যে জীবনকে সে নিজের বলে জেনেছে, তার ভিতটাই হয়তো মিথ্যে দিয়ে তৈরি। তার মা নিখোঁজ হওয়ার দিন কী ঘটেছিল? তার যমজ ভাই কোথায়? বাবা কেন ছবিটা দেখে ভয় পেয়েছিলেন? আর কে বা কারা তাকে নীলকুঠিতে ডেকে পাঠাচ্ছে?

সে ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে বসে রইল। বাড়িতে পুরোনো ক্যাসেট চালানোর যন্ত্র ছিল না। কিন্তু তার স্টুডিওতে একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার রয়েছে। সে ঠিক করল, পরদিন সকালে স্টুডিওতে গিয়ে ক্যাসেটটা শুনবে।

হঠাৎ দোতলার করিডরে পায়ের শব্দ হলো।

ধীর, ভারী পায়ের শব্দ।

অরিত্র দরজার দিকে তাকাল।

“কে?”

কোনও উত্তর নেই।

তারপর দরজার নিচ দিয়ে একটা কাগজ ঘরের ভেতরে ঢুকে এল।

অরিত্র ধীরে ধীরে কাগজটা তুলে নিল।

সেখানে মাত্র একটি বাক্য লেখা—

‘তোমার ভাই এখনও বেঁচে আছে।’

তার নিচে একটি ছবি।

ছবিতে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার ঘরে। মুখের অর্ধেক আলোয়, অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। তার চোখ, নাক, ঠোঁট—সবকিছু অরিত্রর মুখের মতো।

শুধু যুবকটির ডান গালে একটি লম্বা কাটা দাগ।

ছবির পেছনে লেখা—

‘শুক্রবার রাত বারোটা। নীলকুঠি। দেরি করলে দ্বিতীয়বার কাউকে হারাবে।’

অরিত্র ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

দূরে কোথাও একটা কুকুর একটানা ডেকে চলেছে। আর বাড়ির পুরোনো ঘড়িতে তখন রাত বারোটা বাজতে শুরু করেছে।

ঢং।

ঢং।

ঢং।

বারোটা বাজার শেষ শব্দটা মিলিয়ে যেতেই অরিত্রর ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে কোনও নম্বর নেই।

শুধু লেখা—

‘মা কলিং।’

অরিত্রর হাত অবশ হয়ে গেল।

সতেরো বছর ধরে মৃত বলে জেনে আসা মায়ের নাম ফোনের পর্দায় জ্বলছে।

সে কাঁপা হাতে কলটা ধরল।

ওপাশে প্রথমে কোনও শব্দ নেই। তারপর খুব ধীরে, কান্নাভেজা এক নারীকণ্ঠ বলল—

“অরিত্র… তুই কি এখনও আমাকে চিনতে পারিস?”

অরিত্রর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“মা?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মহিলা ফিসফিস করে বললেন—

“শুক্রবার নীলকুঠিতে যাস না। ওখানে তোর ভাই অপেক্ষা করছে ঠিকই, কিন্তু সে তোকে খুঁজছে না…”

“তাহলে কাকে খুঁজছে?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“সে খুঁজছে সেই মানুষটাকে, যে আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে মেরে ফেলেছিল।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

অরিত্র স্থির হয়ে বসে রইল।

তার সামনে পড়ে রয়েছে তিনটি জিনিস—নীল খাম, যমজ ভাইয়ের ছবি এবং মায়ের ডায়েরি।

এবার তার আর কোনও সন্দেহ রইল না।

শুক্রবার তাকে নীলকুঠিতে যেতেই হবে।

কিন্তু তার আগে জানতে হবে, তার নিজের জন্মের রাতেই যদি একটি শিশু হারিয়ে গিয়ে থাকে, তবে সেই শিশুর পরিচয় নিয়ে এত বছর ধরে মিথ্যে বলেছে কে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

যদি ফোনের ওপাশে সত্যিই তার মা কথা বলে থাকেন, তবে এত বছর ধরে তিনি কোথায় ছিলেন?

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: শেষ কামরার মা)।

শেষ পর্ব

দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।

“মিঠি, দরজাটা খোলো।”

অদিতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত কাঁপছে। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটিকে খুঁজছিল, তাঁর সম্পর্কে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। বাবা কি সত্যিই তার বাবা নন? যে মাকে সে স্মৃতিতে দেখে এসেছে, তিনি কি সত্যিই তার মা? আর জন্মের রাতে যে দ্বিতীয় শিশুটির কথা বলা হচ্ছে, সেই শিশুটিই বা কে?

প্রশ্নগুলো যেন তার মাথার মধ্যে একসঙ্গে চিৎকার করছে।

হরিপদ পিছন থেকে বললেন, “দরজা খোলার আগে একটা কথা মনে রাখবেন। এই ট্রেনের সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যেটা কখনও অপরিচিত মানুষের মুখে আসে না। সেটা আসে পরিচিত মানুষের কণ্ঠে।”

অদিতি ঘুরে তাকাল।

“আপনি সব জানেন। তা হলে আমাকে এতক্ষণ ধরে সত্যিটা বলছেন না কেন?”

“কারণ সত্যিটা আমার মুখ থেকে শুনলে আপনি বিশ্বাস করবেন না। নিজের চোখে দেখতে হবে।”

“আপনি কি আমার বাবাকে চিনতেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি শুধু আপনার বাবাকে চিনতাম না, তাঁর শেষ যাত্রার সাক্ষীও ছিলাম।”

“তাহলে তিনি কোথায়?”

“শেষ কামরায়।”

অদিতি দরজার হাতলে হাত রাখল।

দরজাটা খুলে গেল।

ভেতরে কোনও আসন নেই, কোনও জানালা নেই। একটা ছোট্ট ঘর। মাঝখানে কাঠের চেয়ার। চেয়ারে বসে আছেন একজন মহিলা। তাঁর কোলে সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটি শিশু।

মহিলার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা কাটা দাগ। চুলের মধ্যে পাক ধরেছে।

অদিতি তাঁকে আগে কখনও দেখেনি।

তবু মহিলার চোখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা উঠল।

মহিলাটি বললেন, “এসেছ, মিঠি?”

অদিতি এবার দৃঢ় গলায় বলল, “আমাকে ওই নামে ডাকবেন না। আমার নাম অদিতি সেন।”

মহিলা মৃদু হাসলেন।

“তোমার নাম অদিতি। কিন্তু জন্মের সময় তোমাকে অন্য নামে ডাকা হয়েছিল।”

“কোন নামে?”

“মেঘলা।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“আমি এই নাম কখনও শুনিনি।”

“শোনার কথা নয়। তোমার জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নামটা কাগজ থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল।”

“আপনি কে?”

মহিলা শিশুটির মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে দিলেন। শিশুটি ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে কোনও বিশেষ চিহ্ন নেই, কিন্তু তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটি অস্বাভাবিকভাবে সামান্য বাঁকা।

মহিলা বললেন, “আমি মৃণালিনী দত্ত। ১৯৯৭ সালের ১৭ অক্টোবর রাতে কলকাতার একটি ছোট্ট হাসপাতালে আমার মেয়ে জন্মেছিল। সেই রাতেই তোমার মায়েরও সন্তান জন্মায়।”

“আপনি বলতে চাইছেন, আমি আপনার মেয়ে?”

“আমি বলতে চাইছি, তোমার জন্মের কাহিনি তোমাকে যেভাবে বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ নয়।”

অদিতি চেয়ারের সামনে দাঁড়াল।

“সোজা করে বলুন।”

মৃণালিনী গভীর শ্বাস নিলেন।

“সেই রাতে আমার সন্তান জন্মের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা তাকে অন্য ঘরে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর আমাকে জানানো হয়, আমার মেয়ে বাঁচেনি। আমি তার মুখও দেখতে পাইনি। শুধু একটা কাগজে সই করেছিলাম। সেই কাগজে লেখা ছিল, মৃত শিশুটিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে দাহ করা হবে।”

“তারপর?”

“পরদিন সকালে আমি জানতে পারি, আমার মেয়ের মৃত্যুর নথিতে ভুল আছে। সেখানে অন্য একটি শিশুর নাম লেখা। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু হাসপাতাল বলেছিল, সব কাগজ ঠিক আছে। কেউ আমার কথা শুনতে চায়নি।”

মৃণালিনী একটু থামলেন।

“কয়েক মাস পরে অনিরুদ্ধ সেন আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হাসপাতালের নথি বদলে দেওয়া হয়েছে। আমার মেয়ে হয়তো মারা যায়নি। কিন্তু তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন না।”

অদিতির গলা শুকিয়ে গেল।

“আপনি কি আমার বাবা অনিরুদ্ধ সেনের কথা বলছেন?”

“হ্যাঁ। তিনি তোমার বাবার মতোই একজন মানুষ ছিলেন, যে একটা ভুলকে সংশোধন করতে গিয়ে আরও বড় ভুলের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।”

“তাহলে আমি কার মেয়ে?”

মৃণালিনী শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন।

“তোমার জন্মদাত্রী কে, সেটা জানতে হলে তোমাকে আরও একটা সত্যি জানতে হবে। জন্মের রাতে হাসপাতালের দুটি শিশুকে অদলবদল করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অদলবদল কোনও দুর্ঘটনা ছিল না। একজন চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে নথি বদলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুদের পরিচয় বদলে দিলে তাদের ভবিষ্যৎও বদলে দেওয়া যায়।”

অদিতি স্তব্ধ হয়ে শুনছিল।

“সেই চিকিৎসকের নাম?”

মৃণালিনী বললেন, “ডাক্তার সমরেশ রায়।”

নামটা অদিতির কাছে অচেনা।

“তিনি কোথায়?”

“এই ট্রেনেই।”

ঘরের আলো এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল।

আবার জ্বলে উঠতেই অদিতি দেখল, চেয়ারটি খালি।

মৃণালিনী নেই। শিশুটিও নেই।

শুধু চেয়ারের ওপর একটি পুরোনো হাসপাতালের ফাইল পড়ে আছে।

অদিতি ফাইলটি তুলে নিল।

প্রথম পাতায় লেখা—

রাত্রিকালীন প্রসূতি বিভাগ, ১৭ অক্টোবর ১৯৯৭।

নিচে দুটি নাম।

১. মৃণালিনী দত্ত — কন্যাসন্তান।

২. মাধবী সেন — কন্যাসন্তান।

তারপর একটি লাল দাগ টেনে দুটি নামের পাশে লেখা—

পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ।

শেষ পাতায় একটি স্বাক্ষর।

ডা. সমরেশ রায়।

ফাইলের পেছনে পেন্সিলে লেখা আরেকটি বাক্য—

“একটি শিশু বেঁচে থাকবে। অন্যটির পরিচয় হারিয়ে যাবে। কিন্তু দুজনের একজন একদিন ফিরে আসবেই।”

অদিতি ফাইলটা বুকে চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

হরিপদ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“আপনি সব শুনেছেন?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ।”

“এই ডা. সমরেশ রায় কে?”

হরিপদ মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

“একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনকে কাগজের মতো সম্পাদনা করা যায়।”

“তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?”

“আমি জানি না।”

“কিন্তু আপনি বললেন, তিনি এই ট্রেনে আছেন!”

হরিপদ এবার অদিতির চোখের দিকে তাকালেন।

“আমি বলেছিলাম, তাঁর স্মৃতি এই ট্রেনে আছে। মানুষটি কোথায়, তা আমি জানি না।”

অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনারা সবাই কথার মধ্যে ফাঁক রাখেন কেন?”

হরিপদ শান্তভাবে বললেন, “কারণ আমরা সবাই নিজেদের অপরাধের কিছু অংশ লুকিয়ে রাখতে চাই।”

“আপনার অপরাধ কী?”

প্রশ্নটা শুনে হরিপদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি ধীরে ধীরে নিজের কোটের বোতাম খুললেন। ভেতরের পকেট থেকে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করলেন।

“এই ডায়েরিটা আপনার বাবার। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর আমি এটা নিজের কাছে রেখেছিলাম। এত বছর কাউকে দিইনি।”

অদিতি ডায়েরিটা নিয়ে খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতায় রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা, ট্রেনের সময়সূচি, কিছু প্রযুক্তিগত নোট। তারপর একটি পাতায় লেখা—

“১৭ অক্টোবর ১৯৯৭। রাত ১১টা ৪০।

আজ এমন একটা ঘটনা দেখলাম, যা কাউকে বলতে পারব না। ডা. সমরেশ রায় দুটি শিশুর নথি বদলে দিয়েছেন। মাধবীর মেয়ে জীবিত, কিন্তু তার কাগজে অন্য নাম। মৃণালিনীর মেয়ের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়েছে। আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম। করিনি।

কারণ ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন, আমার মেয়ের চিকিৎসার খরচ তিনিই দেবেন।

আমি চুপ করে ছিলাম।

আজ বুঝলাম, মানুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ কখনও কখনও কিছু না করা।”

অদিতি পাতা উল্টে গেল।

পরের লেখাটি ২০০১ সালের।

“১৭ অক্টোবর ২০০১। রাত ১২টা ১৭।

পুরোনো সিগন্যাল ঘরে আবার সেই ট্রেনের দেখা পেলাম। রেলওয়ের কোনও নথিতে তার অস্তিত্ব নেই। তবু ট্রেনটি আসে। কামরায় এমন কিছু মানুষকে দেখেছি, যাদের মৃত্যু আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। তারা আমাকে চিনেছে।

আমি বুঝতে পারছি না, এটি কোনও বাস্তব ট্রেন, নাকি আমার অপরাধবোধের তৈরি দৃশ্য।

কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—ট্রেনটি যতবার আসে, ততবার আমাকে সেই রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়।”

অদিতি ডায়েরি বন্ধ করল।

“আপনি কি আমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“হ্যাঁ।”

“কী করেছিলেন আপনি?”

“২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর রাতে অনিরুদ্ধ এই ট্রেনে উঠেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, এবার তিনি সত্যিটা প্রকাশ করবেন। আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম। কারণ তিনি সত্যিটা প্রকাশ করলে আমার অপরাধও সামনে চলে আসত।”

“তারপর?”

“আমি তাঁকে শেষ কামরায় যেতে সাহায্য করেছিলাম। ভেবেছিলাম, তিনি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তিনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন—‘হরিপদ, একদিন আমার মেয়ে আসবে। তাকে সত্যিটা বলবে।’”

অদিতি চুপ করে রইল।

“তাহলে আপনি এত বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?”

হরিপদ এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

“আমি আপনাকে এখানে নিয়ে আসিনি। আপনি নিজেই এসেছেন। আমি শুধু আপনাকে দরজাগুলো চিনিয়ে দিয়েছি।”


ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

এবার কামরার জানালায় অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল। কোথাও পুরোনো হাসপাতাল, কোথাও নদীর ধারে একটা বাড়ি, কোথাও রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরী।

অদিতি প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে নিজের অতীত খুঁজতে লাগল।

হঠাৎ একটা জানালায় সে দেখল, ছোট্ট একটি মেয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে এক যুবক—অনিরুদ্ধ সেন। যুবকের চোখে জল।

মেয়েটি বলছে, “বাবা, আমি কোথায় যাব?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিচ্ছেন, “তুমি যেখানে থাকবে, আমি তোমাকে খুঁজে নেব।”

দৃশ্যটি মিলিয়ে গেল।

অদিতির মনে হলো, এই কথাটা সে আগে শুনেছে।

কিন্তু কখন?

ছোটবেলায়?

নাকি এই ট্রেনেই?

ঠিক তখনই ট্রেনের দরজার পাশে একটি লাল আলো জ্বলে উঠল। তার নিচে লেখা—

শেষ কামরা: প্রবেশ নিষেধ।

হরিপদ বললেন, “এবার আপনাকে একাই যেতে হবে।”

“আপনি আসবেন না?”

“আমি ওই কামরায় যেতে পারি না।”

“কেন?”

“কারণ সেখানে যে মানুষটি অপেক্ষা করছেন, তিনি আমারও বিচার করবেন।”

অদিতি শেষ কামরার দিকে এগোল।

দরজার সামনে পৌঁছতেই তার কানে বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“মিঠি, আর এগিও না।”

সে থেমে গেল।

দরজার ওপাশে অনিরুদ্ধ সেন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর দুঃখ।

অদিতি এবার পালাল না।

“তুমি কি সত্যিই আমার বাবা?”

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি তোমাকে বড় করেছি। তোমার প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন তোমার হাত ধরে নিয়ে গিয়েছি। তুমি অসুস্থ হলে রাত জেগে তোমার পাশে বসে থেকেছি। তুমি যখন প্রথমবার সংবাদপত্রে নিজের লেখা দেখিয়েছিলে, আমি গোপনে সেই কাগজের দশটা কপি কিনেছিলাম।”

অদিতির চোখে জল এসে গেল।

“কিন্তু আমি তোমার জৈবিক মেয়ে নই?”

অনিরুদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি জানি না।”

“কীভাবে জানো না?”

“কারণ হাসপাতালের নথি বদলে দেওয়া হয়েছিল। আমি তোমাকে নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। পরে জানতে পেরেছিলাম, হয়তো তুমি অন্য কারও সন্তান। কিন্তু তখন তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতেও পারিনি।”

“তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি কেন?”

“ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সত্যিটা জানলে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসার জন্য নয়, আমাকে হারানোর ভয়ে সত্যিটা লুকিয়েছিলে?”

অনিরুদ্ধ মাথা নত করলেন।

“প্রথমে হয়তো তাই। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, তুমি আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছ। তোমার জন্মের পরিচয় যাই হোক, তোমাকে বাবা বলে ডাকার অধিকার আমি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইনি।”

অদিতি দরজার চৌকাঠে বসে পড়ল।

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”

অনিরুদ্ধ তার পাশে বসলেন।

“আমি এই ট্রেনের যাত্রী হয়ে যাইনি, মিঠি। আমি এখনও জীবিত।”

অদিতি চমকে উঠল।

“তাহলে তুমি কোথায়?”

“আমি কলকাতার বাইরে একটা ছোট্ট শহরে থাকি। আমার স্মৃতির অনেকটা হারিয়ে গেছে। অমিয় সেনের লোকেরা আমাকে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল। গত কয়েক মাসে কিছু স্মৃতি ফিরে এসেছে। আমি জানি, এই ট্রেন বাস্তবের কোনও সাধারণ ট্রেন নয়। এটা আমার অপরাধবোধ, আমার ভয়, আমার হারানো স্মৃতি—সব মিলিয়ে তৈরি একটা জগৎ। কিন্তু তোমার কাছে পৌঁছনোর পথ আমি এখানেই খুঁজে পেয়েছি।”

অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“তাহলে এই ট্রেনের যাত্রীরা?”

“কিছু মানুষ বাস্তবে মারা গেছেন। কিছু মানুষ বেঁচে থেকেও নিজেদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছেন। আর কিছু মুখ আমার স্মৃতির ভেতর তৈরি। আমি এত বছর ধরে যে অপরাধবোধ বহন করেছি, সেই অপরাধবোধই তাদের কণ্ঠ দিয়েছে।”

“তুমি কি আমাকে চিঠি পাঠিয়েছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তুমি জানতেই আমি আসব?”

“আমি আশা করেছিলাম। কিন্তু তোমাকে জোর করে আনতে চাইনি। তুমি নিজের সিদ্ধান্তে এসেছ।”

অদিতি বাবার হাত ধরল।

“আমি তোমাকে খুঁজতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি আসলে নিজের পরিচয় খুঁজতে এসেছি।”

অনিরুদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“নিজের পরিচয় জন্মের কাগজে লেখা থাকে না, মিঠি। পরিচয় তৈরি হয় আমরা কী করি, কাকে ভালোবাসি, আর ভুল করার পর কীভাবে সেই ভুলের দায় নিই—তার মধ্যে দিয়ে।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“কিন্তু মৃণালিনী দত্ত? তিনি কি সত্যিই আমার মা?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিলেন, “সম্ভব। আবার নাও হতে পারে। তোমার জন্মের রাতের নথি এতটাই বদলে দেওয়া হয়েছে যে, শুধু কাগজ দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। সত্যি জানতে হলে হাসপাতালের মূল রেকর্ড, চিকিৎসকদের সাক্ষ্য এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা দরকার।”

“আর ডা. সমরেশ রায়?”

“তিনি এই পুরো ঘটনার অন্যতম সাক্ষী। তিনি কোথায় আছেন, তা আমি জানি না। কিন্তু তাঁর পুরোনো নোটের একটা কপি আমি লুকিয়ে রেখেছি।”

অনিরুদ্ধ নিজের পকেট থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করলেন।

সেখানে একটি ঠিকানা লেখা।

বনগাঁ, পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টার, বাড়ি নম্বর ১৭।

নিচে একটি নাম—

সমরেশ রায়।

অদিতি কাগজটা হাতে নিল।

“আমি ওঁকে খুঁজে বের করব।”

অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“খুঁজবে। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে নয়। সত্যিটা জানতে।”

ঠিক তখনই ট্রেনের ঘণ্টা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।

“তোমার নামার সময় হয়েছে।”

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে না?”

“আমি যেতে পারব না। এখনও আমার কিছু হিসাব বাকি আছে।”

অদিতি বাবার হাত শক্ত করে ধরল।

“আবার তোমাকে হারাতে চাই না।”

অনিরুদ্ধ তার মাথায় হাত রাখলেন।

“এইবার তুমি আমাকে হারাবে না। কারণ এইবার তুমি জানো, আমাকে কোথায় খুঁজতে হবে।”

শেষ কামরার দরজা খুলে গেল।

অদিতি দেখল, বাইরে শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।

ডিজিটাল ঘড়িতে সময়—রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

সে দরজার বাইরে পা রাখল।

পিছনে ফিরে তাকাতেই ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জানালার ওপারে অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে। তিনি হাত নাড়লেন।

তারপর ট্রেনটা ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মে কোনও কুয়াশা নেই। কোনও অচেনা যাত্রী নেই। শুধু দূরে একজন রেলকর্মী ঝাড়ু দিচ্ছেন।

অদিতি নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত ১২টা ১৮।

তার ফোন চালু করতেই ব্যাটারিতে দেখা গেল ৬৮ শতাংশ চার্জ। নেটওয়ার্ক ফিরে এসেছে। কোনও অস্বাভাবিক কল বা বার্তা নেই।

তার হাতে শুধু পুরোনো ডায়েরি, হাসপাতালের ফাইল আর সমরেশ রায়ের ঠিকানা।

সে গভীর শ্বাস নিল।

এই রাতের সবকিছু কি বাস্তবে ঘটেছে? নাকি দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা আর অজানা তথ্য মিলিয়ে তার মস্তিষ্ক এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, যার ব্যাখ্যা এখনও সে জানে না?

অদিতি জানত না।

কিন্তু সে জানত, এবার আর কোনও রহস্যকে অন্ধবিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেবে না।


পরদিন সকাল।

অদিতি বনগাঁর উদ্দেশে রওনা দিল।

পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টারের বাড়ি নম্বর ১৭ খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না। বাড়িটি জরাজীর্ণ। উঠোনে আগাছা। দরজায় তালা নেই, শুধু ভেতর থেকে বন্ধ।

অদিতি দরজায় কড়া নাড়ল।

কোনও উত্তর নেই।

আবার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে বৃদ্ধ কণ্ঠ শোনা গেল।

“কে?”

“আমি অদিতি সেন। ডা. সমরেশ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”

ভেতরে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর দরজা খুলল।

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের মুখ দেখে অদিতির বুক কেঁপে উঠল।

এই সেই মানুষ, যার ছবি সে হাসপাতালের ফাইলে দেখেছিল।

সমরেশ রায়।

বৃদ্ধ অদিতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তুমি অবশেষে এসেছ।”

অদিতি অবাক হয়ে গেল।

“আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?”

“গত উনত্রিশ বছর ধরে।”

“কেন?”

সমরেশ ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে গিয়ে একটি পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সের ভেতরে হাসপাতালের আসল নথি, দুটি শিশুর জন্মের রেকর্ড, চিকিৎসকদের স্বাক্ষর এবং একটি ভিডিও ক্যাসেট।

তিনি বললেন, “কারণ তোমাকে সত্যিটা জানানো আমার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম।”

“কী সত্যি?”

সমরেশ বাক্স থেকে দুটি ছবি বের করলেন।

প্রথম ছবিতে নবজাতক একটি মেয়ে।

দ্বিতীয় ছবিতেও নবজাতক একটি মেয়ে।

দুটি ছবির পেছনে লেখা—

শিশু ক — মৃণালিনী দত্তের কন্যা।

শিশু খ — মাধবী সেনের কন্যা।

সমরেশ বললেন, “তোমাকে যে শিশুটির পরিচয়ে বড় করা হয়েছে, সেই শিশুটি অন্য একজনের সন্তান হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যি অন্য জায়গায়।”

অদিতি তাঁর দিকে তাকাল।

“কোথায়?”

বৃদ্ধ ভিডিও ক্যাসেটটি টেবিলের ওপর রাখলেন।

“এই ভিডিওতে তোমার জন্মের রাতের সম্পূর্ণ ঘটনা আছে। সেখানে দেখা যাবে, কে নথি বদলেছিল, কেন বদলেছিল, আর সেই রাতে তৃতীয় একজন মানুষ কেন হাসপাতালে এসেছিল।”

“তৃতীয় একজন?”

সমরেশের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“হ্যাঁ। এমন একজন, যার নাম কোনও নথিতে নেই। অথচ সেই মানুষটিই তোমার বাবাকে বারো বছর আগে শেষ ট্রেনে উঠতে বাধ্য করেছিল।”

অদিতির বুকের মধ্যে আবার সেই পুরোনো ভয় ফিরে এল।

“কে সে?”

সমরেশ উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু ভিডিও ক্যাসেটটি অদিতির হাতে দিয়ে বললেন—

“দেখার আগে একটা কথা মনে রেখো। তোমার বাবা হয়তো তোমার জন্মদাতা নন। কিন্তু যে মানুষটি তোমাকে নিজের মেয়ে বলে বড় করেছে, তার ভালোবাসা কোনও পরীক্ষার ফল দিয়ে মাপা যায় না।”

অদিতি ক্যাসেটটি হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে রেললাইন।

একটা ট্রেন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।

তার জানালার পাশে এক মুহূর্তের জন্য একজন মানুষকে দেখা গেল।

ধূসর পাঞ্জাবি।

চোখে গোল চশমা।

অনিরুদ্ধ সেন।

অদিতি দৌড়ে দরজার কাছে গেল।

কিন্তু ট্রেন ততক্ষণে দূরে চলে গেছে।

তার ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।

অজানা নম্বর।

“শেষ ট্রেনের যাত্রা শেষ হয়েছে। কিন্তু তোমার জীবনের আসল যাত্রা এখন শুরু।”

অদিতি বার্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ভিডিও ক্যাসেটটি ব্যাগে রাখল।

সে জানত, সামনে আরও প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। কিন্তু এবার সে প্রশ্নগুলো থেকে পালাবে না।

কারণ কিছু যাত্রা স্টেশনে শেষ হয় না।

কিছু যাত্রা শুরু হয় নিজের পরিচয়কে প্রশ্ন করার সাহস থেকে।

আর কোনও এক অন্ধকার রাতে, কোনও অচেনা প্ল্যাটফর্মে, শেষ ট্রেন হয়তো আবার আসবে।

কিন্তু এবার অদিতি জানে—ট্রেনে ওঠার আগে তাকে নিজের সত্যিটা যাচাই করে নিতে হবে।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের টিকিট)।

অন্ধকারের মধ্যে অদিতি বুঝতে পারছিল না, তার হাত ধরে থাকা মানুষটি সত্যিই তার বাবা কি না।

স্পর্শটা পরিচিত। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় বাবা ঠিক এভাবেই তার হাত ধরতেন। বিপদ দেখলে আঙুলগুলো আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেন। কিন্তু আজকের স্পর্শে অদ্ভুত একটা শীতলতা।

যেন কোনও জীবিত মানুষের হাত নয়, বরফের তৈরি কিছু।

“বাবা?” অদিতি ফিসফিস করে ডাকল।

অন্ধকারের মধ্যে উত্তর এল, “আমি আছি, মিঠি।”

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”

“তুমি যেখানে আমাকে খুঁজেছ, আমি সেখানে ছিলাম না।”

“তাহলে কোথায় ছিলে?”

“এই ট্রেনেই।”

অদিতি হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল। কিন্তু মানুষটি তার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

“এখনও সময় আছে, মিঠি। আমার সঙ্গে নেমে এসো।”

“কোথায়?”

“বাড়ি।”

“আমাদের বাড়ি তো নেই। মা মারা গেছেন। তুমি বারো বছর ধরে নিখোঁজ।”

কয়েক মুহূর্ত কোনও উত্তর এল না।

তারপর সেই কণ্ঠস্বর বলল, “তোমার মা মারা যাননি।”

অদিতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“কী বললে?”

“তোমার মা এখনও অপেক্ষা করছেন। তুমি শুধু তাঁকে খুঁজে পাওনি।”

“মা তো তিন বছর আগে মারা গেছেন! আমি নিজে তাঁর শেষকৃত্য করেছি!”

“তুমি যাকে শেষকৃত্য করেছিলে, সে তোমার মা ছিল না।”

অদিতির মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।

ঠিক তখনই কামরার সমস্ত আলো জ্বলে উঠল।

সে দেখল, তার সামনে কোনও মানুষ নেই।

তার হাত ধরে আছে প্রবীর ঘোষ।

বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে একটি লাল রঙের টিকিট।

প্রবীর বললেন, “তোমাকে সতর্ক করেছিলাম।”

অদিতি হাত সরিয়ে নিল।

“আপনারা সবাই আমার সঙ্গে কী করছেন? আমার বাবা কোথায়? আমার মা কোথায়? এই ট্রেনটা কী?”

বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না। কখনও কখনও উত্তর পাওয়ার আগে প্রশ্নকারীকে জানতে হয়, সে নিজে কে।”

অদিতি রাগে কাঁপছিল।

“আমাকে ধাঁধা দেবেন না। আমি পুলিশে খবর দেব।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“আপনার ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। এই ট্রেনের বাইরে কোনও পুলিশ আপনাকে শুনতে পাবে না। আর আপনি যদি মনে করেন, ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে চলে যাবেন, তাহলে ভুল করছেন।”

“কেন?”

“কারণ এই ট্রেন এখন আর শিয়ালদহে নেই।”

অদিতি জানালার বাইরে তাকাল।

সত্যিই, বাইরে সেই অচেনা স্টেশন। ভাঙা প্ল্যাটফর্ম, জং ধরা বেঞ্চ, অর্ধেক ভেঙে পড়া সাইনবোর্ড। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো বারবার জ্বলছে আর নিভছে।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।

লাল শাড়ি।

খোলা চুল।

অদিতির মা।

মহিলাটি জানালার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন।

“মিঠি!”

এবার অদিতি স্পষ্ট শুনতে পেল।

তার মা ঠিক এইভাবেই তাকে ডাকতেন। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকার সময়ও এই নামেই ডাকতেন।

অদিতি জানালার কাচে হাত রাখল।

“মা!”

মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “নেমে আয়, মা। আর দেরি করিস না।”

অদিতি দরজার দিকে ছুটল।

বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক তাকে আটকাতে গেলেন না। শুধু বললেন, “একবার নেমে গেলে আর ফিরে আসতে পারবেন না।”

অদিতি থেমে গেল।

“আপনি আমাকে থামাচ্ছেন না কেন?”

“কারণ কাউকে জোর করে বাঁচিয়ে রাখা যায় না।”

“আপনি কি জানেন, আমার মা কোথায়?”

“জানি।”

“আমার বাবা?”

“তাঁর কথাও জানি।”

“তাহলে বলুন!”

বৃদ্ধ নিজের টুপিটা খুললেন।

তাঁর কপালের বাঁ দিকে একটা পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। চোখের নিচে গভীর বলিরেখা। কিন্তু মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেই অদিতির মনে হলো, এই মানুষটিকে সে আগে কোথাও দেখেছে।

অনেক আগে।

একটি পুরোনো ছবিতে।

তার বাবার অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবিতে।

সেখানে রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাঝখানে অনিরুদ্ধ সেন, তাঁর পাশে প্রবীর ঘোষ, আর একেবারে পেছনে এই বৃদ্ধ।

অদিতি ফিসফিস করে বলল, “আপনি কি হরিপদ কাকু?”

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত একটা আলো ফুটল।

“অবশেষে মনে পড়েছে।”

“আপনি তো পঁচিশ বছর আগে মারা গিয়েছিলেন!”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনি এখানে কী করছেন?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“যে ট্রেনে আমি কাজ করতাম, সেই ট্রেনেই আমার শেষ যাত্রা হয়েছিল। আমার মৃত্যুর আগে একটা ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের হিসাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কোথাও যেতে পারিনি।”

“কী ভুল?”

হরিপদ উত্তর দিলেন না। তিনি পকেট থেকে একটি পুরোনো খাম বের করে অদিতির হাতে দিলেন।

“এটা তোমার বাবার লেখা। তুমি একা পড়বে।”

অদিতি খাম খুলল।

ভেতরে এক পাতার চিঠি।

“মিঠি,

তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার কাছে থাকব না। একটা কথা তোমাকে কখনও বলা হয়নি। তোমার জন্মের রাতে তোমাকে নিয়ে আমরা হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তুমি অসুস্থ ছিলে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, তোমাকে বাঁচানো কঠিন।

সেই রাতে হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ডে তোমার নাম লেখা হয়েছিল মৃতদের তালিকায়।

কিন্তু পরদিন সকালে তুমি জীবিত ছিলে।

কেউ বুঝতে পারেনি, রাতের মধ্যে কী ঘটেছিল।

আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। তোমার মা বলেছিলেন, তোমাকে আর কখনও ওই হাসপাতালের কাছে নিয়ে যাবেন না।

তারপর থেকে আমি প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর রাতে সেই ট্রেনে যেতাম। কারণ ওই রাতেই আমি প্রথম বুঝেছিলাম, তোমার জীবনের সঙ্গে এই ট্রেনের একটা সম্পর্ক আছে।

আমি সত্যিটা খুঁজতে গিয়ে এমন একজনের দেখা পাই, যে নিজেকে তোমার ভবিষ্যৎ বলে পরিচয় দিয়েছিল।

আমি জানি, কথাটা বিশ্বাস করা কঠিন।

কিন্তু মনে রেখো, মিঠি—এই ট্রেনে কেউ নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে না।

— বাবা”

চিঠির নিচে একটি তারিখ লেখা।

১৭ অক্টোবর, ১৯৯৭।

অদিতি চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

তার জন্ম ১৯৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর।

অর্থাৎ বাবার চিঠিটি লেখা হয়েছিল তার জন্মের ঠিক আগের রাতে।

কিন্তু বাবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ২০১৪ সালের।

বারো বছর আগে।

তাহলে এত পুরোনো চিঠি এতদিন কোথায় ছিল?

আর বাবা কীভাবে তার জন্মের আগেই তার জীবনের সঙ্গে এই ট্রেনের সম্পর্ক জানতেন?

হরিপদ বললেন, “আপনি যা পড়লেন, সেটা পুরো সত্যি নয়। আপনার বাবা কিছু কথা লিখতে পারেননি।”

“কেন?”

“কারণ তিনি জানতেন, তাঁর লেখা পড়লে আপনি তাঁকে খুঁজতে আসবেন। আর তিনি চাননি আপনি আসুন।”

অদিতি চিঠিটা শক্ত করে ধরে বলল, “আমি এসেছি। এখন আমাকে সব জানতে হবে।”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“তাহলে দ্বিতীয় কামরার শেষ দরজাটা খুলুন।”


দ্বিতীয় কামরার শেষ দরজাটি বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল। তালার গায়ে মরচে জমেছে। দরজার ওপরে সাদা রঙে লেখা—

কামরা ১৩।

অদিতি এর আগে ট্রেনে এমন কোনও কামরা দেখেনি। প্রথম কামরার পর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়। কিন্তু কামরা ১৩-এর অবস্থান যেন ট্রেনের শেষ প্রান্তে নয়, মাঝখানে।

হরিপদ একটি চাবি বের করে তালায় লাগালেন।

দরজা খুলতেই অদিতির নাকে একটা পুরোনো হাসপাতালের গন্ধ এল—ফিনাইল, ওষুধ, স্যাঁতসেঁতে কাপড় আর বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের গন্ধ।

ভেতরে সারি সারি খাট।

প্রতিটি খাটের মাথায় একটি করে নামের ফলক।

প্রথম খাটে লেখা—ঋজু মিত্র।

দ্বিতীয় খাটে—প্রবীর ঘোষ।

তৃতীয় খাটে—হরিপদ পাল।

চতুর্থ খাটে—

অদিতি সেন।

অদিতি পিছিয়ে গেল।

“এটা কী?”

হরিপদ বললেন, “এই ট্রেনের যাত্রীরা নিজেদের সঙ্গে শুধু স্মৃতি নিয়ে আসে না। তারা নিয়ে আসে অসমাপ্ত জীবনের হিসাব। এই কামরায় সেই হিসাব রাখা হয়।”

অদিতি নিজের নামের ফলক ছুঁয়ে দেখল। কাঠের ওপর ধুলো জমেছে। তারিখ লেখা আছে—১৮ অক্টোবর, ১৯৯৭।

তার জন্মদিন।

ফলকের নিচে আরও একটি লাইন—

যাত্রার শেষ: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬।

অদিতি যেন পাথর হয়ে গেল।

“এটা অসম্ভব।”

হরিপদ শান্ত গলায় বললেন, “আপনার জন্য আজ রাতেই শেষ ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছে।”

“কে কেটেছে?”

“আপনার বাবা।”

“কেন?”

“কারণ তিনি চান আপনি সত্যিটা জানুন। কিন্তু সত্যিটা জানার পর আপনি কী করবেন, সেটা তিনি জানেন না।”

অদিতি হরিপদের দিকে তাকাল।

“আপনি বলছেন, আমার বাবা আমাকে এখানে ডেকে এনেছেন। আবার বলছেন, তিনি চাননি আমি আসি। এই দুটো কথা একসঙ্গে সত্যি হতে পারে না।”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“মানুষের ইচ্ছা অনেক সময় পরস্পরবিরোধী হয়। আপনার বাবা আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চেয়েছেন, আপনি তাঁর করা ভুলের বিচার করুন।”

“কী ভুল করেছিলেন তিনি?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগে কামরার একেবারে শেষ দিক থেকে একটা শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

কেউ যেন ভেতর থেকে খাটের কাঠে আঘাত করছে।

অদিতি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

সবচেয়ে শেষ খাটটির ওপর একটি সাদা চাদর ঢাকা।

খাটের মাথায় কোনও নাম নেই।

শুধু একটি কালো দাগ।

অদিতি চাদরটা সরাল।

তার নিজের মুখ।

একটি মেয়ে খাটের ওপর শুয়ে আছে। অদিতির মতোই মুখ, একই চোখ, একই কপাল, একই ঠোঁট। কিন্তু তার গায়ের রং ফ্যাকাশে, ঠোঁট নীলচে, চোখ বন্ধ।

অদিতি চিৎকার করে পিছিয়ে গেল।

“এটা কে?”

হরিপদ ধীরে বললেন, “আপনি।”

“না! এটা আমি নই!”

“আপনার শরীরের মতো দেখতে।”

“আমি বেঁচে আছি!”

“হ্যাঁ। কিন্তু এই ট্রেনের নথিতে আপনার আরেকটি পরিচয় আছে।”

অদিতি মাথা নাড়তে লাগল।

“এটা কোনও খেলা। কেউ আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।”

ঠিক তখনই খাটের ওপর শুয়ে থাকা মেয়েটির চোখ খুলে গেল।

সে উঠে বসল।

অদিতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“তুমি এত দেরি করলে কেন?”

অদিতি এক পা পিছিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি বলল, “আমি সেই অদিতি, যে কখনও বড় হয়নি।”

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

“তুমি যে জীবনটা বেঁচে আছ, সেটা আমার হওয়ার কথা ছিল।”

অদিতির মাথার ভেতর অসংখ্য দৃশ্য ঝলকে উঠল।

হাসপাতালের সাদা ঘর।

একটি নবজাতক শিশুর কান্না।

মায়ের মুখ।

বাবার কাঁপতে থাকা হাত।

তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার।

মেয়েটি বলল, “তুমি জানো, জন্মের রাতে কী হয়েছিল?”

অদিতি কথা বলতে পারল না।

“তুমি জন্মানোর পর কয়েক মিনিট শ্বাস নাওনি। চিকিৎসকেরা তোমাকে মৃত ঘোষণা করেছিল। তোমার বাবা তোমাকে কোলে নিয়ে কাঁদছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তুমি আবার শ্বাস নিতে শুরু করেছিলে। সবাই ভেবেছিল, অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।”

“তারপর?”

“তারপর তোমার বাবা হাসপাতালের রেকর্ড বদলে দিয়েছিলেন।”

অদিতি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

“কেন?”

“কারণ সেই রাতে আরেকটি শিশুও জন্মেছিল। সেই শিশুটি ছিল আমি।”

“তুমি আমার যমজ বোন?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“আমরা একই মায়ের সন্তান নই। একই সময়ে জন্মানো দুটি শিশু। একজনের জন্মের পর মৃত্যু হয়েছিল বলে ঘোষণা করা হয়, আরেকজনের জীবন শুরু হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের পুরোনো নথিতে আমাদের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা বিশ্বাস করতেন, তিনি একটি মৃত শিশুকে জীবিত ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, কেউ যেন তাঁর সেই কাজের কথা জানতে না পারে। কিন্তু সেই পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল আরেকটি পরিবার।”

অদিতির চোখে জল এসে গেল।

“আমার বাবা কি আমাকে চুরি করেছিলেন?”

মেয়েটি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি জানি না। কারণ আমি যে স্মৃতিগুলো মনে করতে পারি, সেগুলোও হয়তো আমার নয়।”

তারপর সে হাত বাড়িয়ে দিল।

“তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে, তাহলে কি আমাকে খুঁজতে আসতে?”

অদিতি উত্তর দিতে পারল না।

কামরার বাইরে ট্রেনের ঘণ্টা বেজে উঠল।

হরিপদ তাড়াতাড়ি বললেন, “সময় শেষ হয়ে আসছে। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

“কী সিদ্ধান্ত?”

“আপনি ট্রেন থেকে নেমে আপনার বাবার কাছে যাবেন, নাকি এখানে থেকে নিজের জন্মের সত্যিটা জানবেন?”

অদিতি মেয়েটির দিকে তাকাল।

“আমি দুটোই করতে চাই।”

মেয়েটি হাসল।

“এই ট্রেনে সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যায় না।”

অদিতি তার হাত ধরতে গেল।

কিন্তু হাত ছোঁয়ার আগেই মেয়েটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল।

খাটের ওপর পড়ে রইল একটি ছোট্ট সাদা কার্ড।

অদিতি সেটা তুলে নিল।

কার্ডে লেখা—

শিশু পরিচয়: ১৭-এ।

অবস্থা: জীবিত।

অভিভাবক: অনিরুদ্ধ সেন।

কার্ডের পেছনে লাল কালিতে লেখা—

“দ্বিতীয় শিশুটির পরিচয় এখনও গোপন রাখা হয়েছে।”


কামরা ১৩ থেকে বেরিয়ে অদিতি দেখল, ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে।

জানালার বাইরে অন্ধকারের বদলে এবার দেখা যাচ্ছে একটি নদী। নদীর ওপরে পুরোনো সেতু। দূরে মৃদু আলোয় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট স্টেশন।

স্টেশনের নাম পড়া যাচ্ছে না।

ট্রেনের ভেতরে ঘোষণা হলো—

“পরবর্তী স্টেশন: স্মৃতিপুর। যেসব যাত্রী নিজেদের অতীতের সাক্ষাৎ পেতে চান, তাঁরা দয়া করে প্রস্তুত থাকুন।”

অদিতি হরিপদের দিকে তাকাল।

“স্মৃতিপুর কোথায়?”

“এমন একটা জায়গা, যেখানে আপনার মনে থাকা প্রতিটি স্মৃতি আবার দেখা যায়।”

“সত্যিকারের স্মৃতি?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কিছু সত্যি। কিছু মিথ্যে। আর কিছু এমন, যেগুলো সত্যি ছিল কি না, তা কেউ আর প্রমাণ করতে পারবে না।”

“আমি সেখানে যেতে চাই।”

“তাহলে সাবধান। সেখানে আপনি যা দেখবেন, তার সবকিছুকে সত্যি বলে বিশ্বাস করবেন না।”

ট্রেন স্টেশনে ঢুকল।

অদিতি জানালা দিয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করছে। এক বৃদ্ধ তাঁর মৃত স্ত্রীর হাত ধরে আছেন। এক তরুণী বারবার একটা শিশুর নাম ধরে ডাকছে। এক কিশোর স্কুলব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখে জল।

সবাই যেন কোনও অসমাপ্ত মুহূর্তের মধ্যে আটকে আছে।

ট্রেন থামতেই দরজাগুলো খুলে গেল।

অদিতি নামল।

প্ল্যাটফর্মে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তার কানে একটা পরিচিত শব্দ এল।

মায়ের গুনগুন করে গান গাওয়ার শব্দ।

ছোটবেলায় মা তাকে ঘুম পাড়ানোর সময় যে গান গাইতেন, সেই গান।

সে শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মের শেষে একটি ছোট্ট বাড়ি। জানালা খোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অদিতি দেখল, তার মা বসে আছেন। কোলে একটি নবজাতক শিশু। পাশে তরুণ অনিরুদ্ধ সেন।

মায়ের মুখে হাসি।

বাবা শিশুটির দিকে তাকিয়ে বলছেন, “মিঠি, আমাদের মেয়েটা একদিন বড় হয়ে অনেক প্রশ্ন করবে।”

মা হেসে বলছেন, “তাহলে সব সত্যি বলে দেবে।”

বাবা মাথা নাড়ছেন।

“সব সত্যি বললে ওকে হারাতে পারি।”

“মিথ্যে বললে?”

বাবা কোনও উত্তর দিচ্ছেন না।

দৃশ্যটা হঠাৎ থেমে গেল।

অদিতি ঘরের ভেতরে ঢুকতে গেল। কিন্তু দরজার সামনে অদৃশ্য একটা বাধা তাকে আটকে দিল।

ভেতরের অনিরুদ্ধ মাথা তুললেন।

সোজা অদিতির দিকে তাকালেন।

“মিঠি, তুমি এসেছ?”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বাবা, আমাকে সত্যিটা বলো।”

অনিরুদ্ধ শিশুটিকে মায়ের কোলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

“তুমি যা জানতে চাও, তার উত্তর এই বাড়িতে নেই।”

“তাহলে কোথায়?”

“শেষ কামরায়।”

“শেষ কামরায় কী আছে?”

অনিরুদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“সেখানে আছে সেই মানুষ, যার জন্য এই ট্রেন প্রথমবার চলেছিল।”

“কে সে?”

অনিরুদ্ধ ঠোঁট নাড়লেন।

কিন্তু কোনও শব্দ শোনা গেল না।

তারপর তিনি কাচের জানালার ওপাশে হাত রাখলেন।

অদিতিও হাত রাখল।

এক মুহূর্তের জন্য তাদের হাতের ছাপ এক হয়ে গেল।

তারপর দৃশ্যটি ভেঙে অন্ধকার হয়ে গেল।

অদিতি আবার ট্রেনের কামরায় ফিরে এল।

হরিপদ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“আপনি কী দেখলেন?”

অদিতি ধীরে বলল, “আমার বাবা আমাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি আমার কাছ থেকে কিছু একটা লুকিয়েছিলেন।”

“হ্যাঁ।”

“আর সেই গোপন সত্যির সঙ্গে আরেকটি শিশুর সম্পর্ক আছে।”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“ঠিক।”

“শেষ কামরায় কে আছে?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগেই ট্রেনের সমস্ত আলো লাল হয়ে উঠল।

দূরে কোথাও ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

তারপর এক অচেনা কণ্ঠ ঘোষণা করল—

“সতর্কীকরণ। শেষ কামরার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। যাত্রী অদিতি সেনকে জানানো যাচ্ছে, তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য একজন যাত্রী অপেক্ষা করছেন।”

অদিতি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“কে অপেক্ষা করছেন?”

হরিপদ এবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আপনার মা।”

অদিতি থমকে গেল।

“কিন্তু আমি তো তাঁকে একটু আগেই দেখলাম!”

হরিপদ ফিসফিস করে বললেন—

“আপনি যে মহিলাকে দেখেছেন, তিনি আপনার স্মৃতির মা। শেষ কামরায় যিনি আছেন, তিনি আপনার জন্মের আগের সত্যিটা জানেন।”

ট্রেনের শেষ প্রান্ত থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল।

একজন মহিলা।

একটি শিশু।

আর এমন এক নাম, যা অদিতি কখনও শোনেনি।

দরজার ওপাশ থেকে মহিলা বললেন—

“মিঠি, তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও তোমার বাবা কে, তাহলে আমার সঙ্গে এসো।”

অদিতি দরজার সামনে দাঁড়াল।

তারপর মহিলাটি আরও একটি কথা বললেন।

“আর একটা কথা মনে রেখো—যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে ডাকছ, তিনি তোমাকে জন্ম দেননি।”

অদিতির হাত থেকে চিঠিটা মেঝেতে পড়ে গেল।

দূরে ট্রেনের ঘড়িতে আবার ১২টা ১৭ বাজল।

আর এই প্রথম অদিতি বুঝতে পারল—সে যে মানুষটিকে খুঁজতে এসেছে, হয়তো সেই মানুষটির পরিচয়ই তার জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (প্রথম পর্ব: যে মানুষটি টিকিট কাটেনি)।

রাত তখন ১২টা ১৭ মিনিট।

শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নম্বর সাতের ওপর ঘন কুয়াশার মতো ধোঁয়া জমে আছে। অক্টোবরের শেষ দিকের রাত। স্টেশনের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ। দু-একজন কুলি বেঞ্চে বসে ঝিমোচ্ছে। দূরে রেললাইনের ওপর দিয়ে একটা মালগাড়ি চলে যাওয়ার পর চারপাশে আবার নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা।

স্টেশনের পুরোনো ঘড়িটা বারোটা সতেরোতেই আটকে আছে।

ঘড়িটা নষ্ট হয়েছে বহুদিন। রেল কর্তৃপক্ষ নতুন ডিজিটাল ঘড়ি লাগিয়েছে, তবু কেউ পুরোনো ঘড়িটা খুলে ফেলেনি। স্টেশনের কর্মচারীদের মধ্যে একটা কথা চালু আছে—রাত বারোটার পর ঘড়িটার দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলে নিজের জীবনের এমন একটা মুহূর্ত মনে পড়বে, যেটা তুমি ভুলে যেতে চেয়েছিলে।

কেউ কথাটা বিশ্বাস করে না।

কিন্তু রাতের শেষ ট্রেনের চালকরা ওই ঘড়ির নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় অকারণে গতি কমিয়ে দেন।

সেই রাতে প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল অদিতি সেন।

বয়স ঊনত্রিশ। পেশায় সংবাদপত্রের প্রতিবেদক। গত ছয় বছর ধরে অপরাধ, নিখোঁজ মানুষ এবং পুরোনো রহস্য নিয়ে কাজ করছে সে। কিন্তু আজ তার হাতে কোনও ক্যামেরা নেই, কাঁধে নেই সংবাদমাধ্যমের ব্যাগ। তার ডান হাতে একটি পুরোনো খাম, বাঁ হাতে ছোট্ট একটি কালো স্যুটকেস।

খামের ওপর লেখা—

অদিতি সেনের হাতে, ১৭ অক্টোবর, রাত বারোটার পরে।

লেখাটা তার বাবার।

সেই বাবা, যিনি বারো বছর আগে একটি ট্রেনে উঠে আর কখনও বাড়ি ফেরেননি।

অদিতির বাবা অনিরুদ্ধ সেন ছিলেন রেলওয়ের সিগন্যাল বিভাগের কর্মী। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার দিনটি ছিল ১৭ অক্টোবর। অফিসের নথি অনুযায়ী, রাত ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি শিয়ালদহ থেকে শেষ লোকাল ট্রেনে উঠেছিলেন। ট্রেনটি গন্তব্যে পৌঁছেছিল, কিন্তু অনিরুদ্ধের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।

তাঁর মৃতদেহ মেলেনি।

কোনও প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি।

পুলিশ প্রথমে নিখোঁজ মামলা করেছিল। ছয় মাস পরে তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।

অদিতির মা সেই ঘটনার তিন বছর পর মারা যান। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর স্বামী একদিন ফিরে আসবেন।

অদিতি কোনও দিন বিশ্বাস করেনি।

বারো বছর ধরে সে বাবাকে খুঁজেছে। রেল পুলিশের পুরোনো নথি ঘেঁটেছে, হাসপাতাল খুঁজেছে, অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহের তালিকা মিলিয়েছে। এমনকি বাবার সহকর্মীদেরও খুঁজে বের করেছে। কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর পেয়েছে—অনিরুদ্ধ সেনের আর কোনও খোঁজ নেই।

গতকাল সন্ধ্যায় অদিতির বাড়ির দরজার নিচ দিয়ে খামটি ঢোকানো হয়।

ভেতরে ছিল মাত্র একটি চিঠি।

“অদিতি,

তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, আমি কোথায় গিয়েছিলাম, তাহলে ১৭ অক্টোবর রাত ১২টা ১৭ মিনিটে শিয়ালদহের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসো।

শেষ ট্রেনটা আসবে।

ওই ট্রেনে উঠবে না।

কারণ আমি সেখানে নেই।

— বাবা”

চিঠির নিচে আরও একটি লাইন ছিল।

“আর যদি ট্রেন থেকে কেউ নেমে তোমাকে তোমার ছোটবেলার নাম ধরে ডাকে, কোনও উত্তর দেবে না।”

অদিতি চিঠিটা বারবার পড়েছিল।

তার ছোটবেলার নাম ছিল মিঠি।

বাবা ছাড়া আর কেউ তাকে এই নামে ডাকত না।

তবু সে এসেছে।

কারণ বারো বছরের প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের সাহস আর অবিশ্বাসের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।

রাত ১২টা ১৬ মিনিটে স্টেশনের ঘোষণাব্যবস্থা থেকে একটা ভাঙা আওয়াজ ভেসে এল।

“যাত্রীদের জানানো হচ্ছে, শেষ ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যে সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে। যাত্রীরা দয়া করে—”

তারপর শব্দ থেমে গেল।

অদিতি মাথা তুলে তাকাল।

স্টেশনের ডিজিটাল বোর্ডে কোনও ট্রেনের নাম নেই। এই সময়ে সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে কোনও ট্রেন আসার কথা নয়। সে রেলওয়ের সময়সূচি ভালো করেই জানে।

দূরে রেললাইনের বাঁক থেকে একটি আলো দেখা গেল।

ট্রেনের হেডলাইট।

অদিতির বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।

ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। পুরোনো নীল-সাদা কামরা। জানালার কাচে ধুলো। দরজার পাশে মরচে। ইঞ্জিনের গায়ে নম্বর লেখা থাকলেও কুয়াশার কারণে তা স্পষ্ট বোঝা গেল না।

ট্রেন থামল।

কোনও ঘোষণা হলো না।

দরজাগুলো খুলে গেল একসঙ্গে।

কিন্তু কোনও যাত্রী নামল না।

অদিতি নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।

১২টা ১৭।

সে ফোন বের করে ছবি তুলতে গেল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল, কিন্তু ক্যামেরা খুলল না। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। ব্যাটারির চার্জও হঠাৎ এক শতাংশ দেখাচ্ছে, যদিও স্টেশনে আসার সময় চার্জ ছিল সত্তর শতাংশের বেশি।

অদিতি ফোনটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখল।

তারপর সে ট্রেনের দিকে এগোল।

প্রথম কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল একজন বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক। কালো কোট, মাথায় পুরোনো ধাঁচের টুপি। তাঁর হাতে একটি ছোট্ট ছিদ্র করার যন্ত্র।

“টিকিট?” বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি উঠব না।”

“তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

“একজনকে খুঁজছি।”

বৃদ্ধ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

“সবাই কাউকে না কাউকে খুঁজতে আসে।”

“আপনি কি অনিরুদ্ধ সেনকে চেনেন?”

প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধের চোখের মণি যেন সামান্য কেঁপে উঠল।

“এই ট্রেনে ওই নামে কেউ নেই।”

“আপনি ট্রেনের নাম বললেন না কেন?”

“এই ট্রেনের নাম জানলে আপনার কোনও লাভ হবে না।”

“কোথা থেকে এসেছে?”

বৃদ্ধ হাতঘড়ি দেখলেন।

“যেখান থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষরা ফেরে।”

অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল, “দেখুন, আমি কোনও গল্প শুনতে আসিনি। আমার বাবা বারো বছর আগে একটা ট্রেনে উঠে নিখোঁজ হয়েছিলেন। তাঁর নামে একটা চিঠি পেয়েছি। তাই এসেছি।”

বৃদ্ধ এবার তার হাতে থাকা খামটার দিকে তাকালেন।

“চিঠিটা কে দিয়েছে?”

“জানি না।”

“চিঠির হাতের লেখা চিনেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনার বাবার কথা বিশ্বাস করেন?”

অদিতি একটু থামল।

“আমি চিঠিটা বিশ্বাস করি। মানুষটাকে নয়।”

বৃদ্ধের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।

“ভালো। তা হলে আপনার এখনও ফেরার সুযোগ আছে।”

তিনি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন।

“কিন্তু মনে রাখবেন, এই ট্রেনের যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্য জানে না। কেউ কেউ জানে না তারা আদৌ জীবিত কি না। আর কেউ কেউ জানে, তবু নামতে পারে না।”

অদিতি কোনও উত্তর দিল না।

সে পাশ কাটিয়ে প্রথম কামরায় উঠল।

ভেতরে ঢুকেই তার মনে হলো, ট্রেনটি যেন অন্য কোনও সময় থেকে এসেছে।

কাঠের আসন। পুরোনো পাখা। জানালার ওপরে বিবর্ণ বিজ্ঞাপন। দেয়ালে ঝুলছে একটি সময়সূচি, যেখানে লেখা আছে—১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাসের ট্রেন চলাচলের তালিকা।

কামরার মাঝখানে বসে আছে এক কিশোর। বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। তার পরনে স্কুলের পোশাক। কাঁধে ব্যাগ। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।

অদিতি কাছে গিয়ে বলল, “এই ট্রেন কোথায় যাচ্ছে?”

ছেলেটি মুখ ফেরাল।

“আপনি কি আমার মাকে দেখেছেন?”

“তোমার মা কোথায়?”

“এই ট্রেনেই উঠেছিলেন।”

“কবে?”

“গতকাল।”

অদিতি অবাক হলো। “গতকাল?”

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

“মা বলেছিল, স্কুল থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাড়ি গিয়ে দেখি মা নেই। তারপর স্টেশনে এলাম। ট্রেনটা দাঁড়িয়ে ছিল। মা ভেতরে বসে ছিল। আমাকে হাত নেড়ে ডাকল।”

“তুমি ট্রেনে উঠলে?”

“না। মা বলেছিল, আমি যেন উঠি না। তারপর ট্রেনটা চলে গেল। আজ আবার এসেছে।”

অদিতি ছেলেটির চোখের দিকে তাকাল। চোখে কোনও ভয় নেই। বরং এমন একটা নিশ্চিন্ত ভাব, যেন এই ঘটনা খুব স্বাভাবিক।

“তোমার নাম কী?”

“ঋজু।”

“বাড়ি কোথায়?”

“বেহালা।”

“তোমার সঙ্গে কেউ আছে?”

ঋজু মাথা নাড়ল।

অদিতি নিজের ব্যাগ থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে ছেলেটির হাতে দিল।

“তুমি এখানে বসে থাকো। আমি অন্য কামরায় দেখে আসছি।”

ছেলেটি বিস্কুট নিল না।

“আপনি কি মিঠি?”

অদিতির শরীরের ভেতর যেন বরফ ঢেলে দিল কেউ।

“কী বললে?”

“মিঠি। আমার মা বলেছে, এই নামের একজন মেয়ে আজ ট্রেনে উঠবে।”

“তোমার মা কে?”

ঋজু উত্তর দিল না। সে শুধু জানালার বাইরে আঙুল তুলে দেখাল।

প্ল্যাটফর্মে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।

লাল শাড়ি। খোলা চুল। মুখটা অস্পষ্ট।

মহিলাটি জানালার কাচের দিকে তাকিয়ে আছে।

তারপর ঠোঁট নাড়ল।

অদিতি শব্দ শুনতে পেল না, কিন্তু কথাটা বুঝতে পারল।

“মিঠি, বাড়ি চলো।”

এটা তার মায়ের কণ্ঠস্বর।

অদিতি তড়িঘড়ি জানালার দিকে এগিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই।

সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল, ঋজুও নেই।

শুধু আসনের ওপর পড়ে আছে একটি স্কুলের পরিচয়পত্র।

অদিতি সেটা তুলে নিল।

ছবিতে ঋজু হাসছে। নিচে নাম লেখা—

ঋজু মিত্র।

জন্ম: ১২ জানুয়ারি, ১৯৮৪।

পরিচয়পত্রের পেছনে লাল কালিতে লেখা—

নিখোঁজ: ১৭ অক্টোবর, ১৯৯৮।

অদিতির হাত কেঁপে উঠল।

এখন ২০২৬ সাল।

যে ছেলেটিকে সে কয়েক মিনিট আগে দেখেছে, সে আটাশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল।

অদিতি কামরা থেকে বেরিয়ে পরের কামরার দিকে এগোল।

দ্বিতীয় কামরায় কয়েকজন যাত্রী বসে আছে। কেউ খবরের কাগজ পড়ছে, কেউ জানালার দিকে তাকিয়ে, কেউ চোখ বন্ধ করে। তাদের পোশাকও আলাদা আলাদা সময়ের—কারও গায়ে আশির দশকের শার্ট, কারও পরনে পুরোনো শাড়ি, কারও হাতে এমন মডেলের মোবাইল, যা বহু বছর আগে বাজার থেকে উঠে গেছে।

অদিতি একজন মধ্যবয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করল, “এই ট্রেন কোথায় যাচ্ছে?”

লোকটি খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল, “শেষ স্টেশন।”

“শেষ স্টেশনের নাম কী?”

“যার যার জন্য আলাদা।”

“আপনার নাম?”

লোকটি এবার মুখ তুলল।

“প্রবীর ঘোষ।”

অদিতি নামটা শুনে চমকে উঠল।

প্রবীর ঘোষ ছিলেন তার বাবার সহকর্মী। বারো বছর আগে তিনিই পুলিশের কাছে বলেছিলেন, অনিরুদ্ধ সেন সেদিন শেষ ট্রেনে উঠেছিলেন।

কিন্তু প্রবীর ঘোষ মারা গিয়েছিলেন সাত বছর আগে।

অদিতি ধীরে ধীরে বলল, “আপনি কি রেলওয়ের সিগন্যাল বিভাগে কাজ করতেন?”

প্রবীর মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। অনিরুদ্ধের সঙ্গে।”

“আমার বাবা কোথায়?”

প্রবীরের মুখের ভাব বদলে গেল।

“তুমি অনিরুদ্ধের মেয়ে?”

“হ্যাঁ।”

প্রবীর কাগজটা ভাঁজ করে রাখলেন।

“তোমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম ১৭ অক্টোবর, ২০১৪ সালে। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে।”

“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, ২০১৪ সালের সেই রাতেই তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন।”

“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”

অদিতি তাঁর সামনে বসে পড়ল।

“কেন?”

প্রবীর জানালার বাইরে তাকালেন।

“কারণ তোমার বাবা ট্রেনে ওঠেননি। তিনি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন।”

“কোথায়?”

“যে স্টেশনের কোনও নাম নেই।”

“এমন কোনও স্টেশন নেই।”

“থাকার কথা নয়। কিন্তু আছে।”

প্রবীর নিজের কোটের পকেট থেকে একটা পুরোনো টিকিট বের করলেন। টিকিটের কাগজ হলদে হয়ে গেছে। তারিখ লেখা—১৭ অক্টোবর, ২০১৪।

গন্তব্যের জায়গায় কালো কালি দিয়ে একটি শব্দ লেখা—

ফেরত।

অদিতি টিকিটটা হাতে নিল।

“আপনি এই ট্রেনে কী করছেন?”

প্রবীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি সেই রাতের সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। তারপর একদিন আমাকেও এই ট্রেনে উঠতে হয়েছে।”

“আপনি মারা যাওয়ার পর?”

“হ্যাঁ।”

অদিতি আর কোনও কথা খুঁজে পেল না।

প্রবীর বললেন, “এই ট্রেন মৃত মানুষদের জন্য নয়, অদিতি। এই ট্রেন তাদের জন্য, যাদের জীবনের কোনও হিসাব শেষ হয়নি। কেউ অপরাধ করেছে, কেউ অপরাধের শিকার হয়েছে, কেউ এমন সত্যি জেনেছে যা কাউকে বলতে পারেনি। তারা সবাই এখানে অপেক্ষা করে।”

“কিসের অপেক্ষা?”

“কেউ তাদের মনে রাখবে—তার।”

অদিতি উঠে দাঁড়াল।

“আমি এসব বিশ্বাস করি না।”

প্রবীর মাথা নাড়লেন।

“তোমার বিশ্বাস করার দরকার নেই। শুধু একটা কথা মনে রেখো—ট্রেন যখন থামবে, তুমি যেন নিজের নাম শুনে দরজার দিকে না যাও।”

“কেন?”

প্রবীর তার চোখের দিকে তাকালেন।

“কারণ এই ট্রেনে তোমার নামে একটা আসন রাখা আছে। আর সেই আসনে যে বসে আছে, সে তোমার বাবার থেকেও অনেক আগে থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”

ঠিক তখনই ট্রেনের ভিতর ঘণ্টা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

জানালার বাইরে প্ল্যাটফর্মের আলো একে একে নিভে গেল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

অদিতি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, শিয়ালদহ স্টেশন পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৃশ্য বদলে গেল। শহরের আলো নেই, বাড়িঘর নেই, রেললাইনের পাশে কোনও গাছ নেই। শুধু অন্ধকার।

তারপর একটা স্টেশন দেখা গেল।

ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম। ভাঙা সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে কোনও নাম লেখা নেই।

ট্রেন থামল।

সব যাত্রী একসঙ্গে মাথা তুলল।

দরজার বাইরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

ধূসর পাঞ্জাবি, কাঁধে পুরোনো ব্যাগ, চোখে গোল চশমা।

অদিতি তার মুখ চিনতে পারল।

বাবা।

অনিরুদ্ধ সেন।

বারো বছর আগের মতোই দেখতে। চুলে পাক ধরেনি, মুখে বয়সের কোনও ছাপ নেই।

তিনি কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদু হাসলেন।

“মিঠি।”

অদিতির চোখে জল চলে এল।

“বাবা!”

সে ছুটে দরজার দিকে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবীর পিছন থেকে তার হাত চেপে ধরলেন।

“না!”

“ছাড়ুন! উনি আমার বাবা!”

“তোমার বাবা তোমাকে কখনও মিঠি বলে ডাকবেন না!”

অদিতি থমকে গেল।

“কেন?”

প্রবীরের মুখ ফ্যাকাশে।

“কারণ তোমার বাবা তোমাকে ওই নামে ডাকতেন শুধু তখনই, যখন তোমার চারপাশে আর কেউ থাকত না। আর এই কামরায় আমরা সবাই আছি।”

দরজার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

সে এবার সোজা অদিতির দিকে তাকাল।

“মিঠি, ওর কথা শুনবে না। ও-ই আমাকে মেরেছে।”

প্রবীর চিৎকার করে উঠলেন, “মিথ্যে!”

বাইরের মানুষটি দরজার হাতল ধরল।

“অদিতি, তোমার হাতে যে চিঠি আছে, সেটা খুলে দেখো। শেষ পাতায় কী লেখা আছে?”

অদিতি কাঁপতে কাঁপতে খাম খুলল।

চিঠির শেষ পাতায় আগে কোনও লেখা ছিল না। এখন সেখানে নতুন করে কয়েকটি লাইন ফুটে উঠেছে।

“যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনবে, সে তোমার বাবা নয়।

যে মানুষটি তোমাকে বাঁচাতে চাইবে, সে-ই তোমাকে এই ট্রেনে এনেছে।

আর যে মানুষটি তোমাকে বারো বছর ধরে খুঁজতে বলেছে, সে আসলে তোমার অপেক্ষায় নেই।

সে অপেক্ষা করছে তোমার মৃত্যুর।”

অদিতি মাথা তুলল।

দরজার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির মুখে এবার আর বাবার চেহারা নেই।

তার মুখের চামড়া যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চোখের নিচে কালো দাগ, ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্ত, কপালে গভীর ক্ষত।

কিন্তু চোখ দুটি এখনও অনিরুদ্ধ সেনের।

লোকটি মৃদুস্বরে বলল—

“এবার বলো, মিঠি। তুমি কি বাড়ি ফিরবে?”

ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে অদিতি অনুভব করল, কেউ তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করছে।

সেই কণ্ঠস্বর তার নিজের।

“বাবাকে খুঁজতে এসেছ? তাহলে আগে নিজের মৃত্যুর দিনটা মনে করো।”

ট্রেনের চাকা হঠাৎ থেমে গেল।

দূরে কোনও এক অদৃশ্য স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হলো—

“যাত্রী অদিতি সেনকে জানানো যাচ্ছে, তাঁর গন্তব্য এসে গেছে। তিনি দয়া করে ট্রেন থেকে নেমে আসুন।”

তারপর ঘোষণা শেষ হওয়ার আগেই আরও একটি কথা শোনা গেল।

“মৃত যাত্রীদের আত্মীয়দের জানানো হচ্ছে—আজ রাতেই তাঁদের একজনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।”

অদিতি বুঝতে পারল না, তার হাত কে ধরে আছে।

কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে সেই হাতের স্পর্শ সে চিনতে পারল।

এটা তার বাবার হাত।

আর সেই হাতের কবজিতে বাঁধা ঘড়িটা থেমে আছে—

রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মৃত মানুষ (তৃতীয় পর্ব: যে মেয়েটি জন্মায়নি)।

শেষ পর্ব

অন্ধকারের মধ্যে নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নন্দিতার মনে হলো, তার বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন হৃৎপিণ্ডটা টেনে বের করে নিতে চাইছে।

“নীলু, দরজাটা খোল। আমি ফিরে এসেছি।”

কথাটা বলেছিল নন্দিতা—অন্তত কণ্ঠস্বরটা তারই। অথচ তার ঠোঁট বন্ধ। সে নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত আটকে রেখেছিল।

সিঁড়ির দিক থেকে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছিল।

একটা পা।

তারপর আরেকটা।

ধীরে, মেপে মেপে।

অনন্যা সেন টর্চ জ্বালানোর চেষ্টা করল। আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। যেন বাড়ির সমস্ত বিদ্যুৎ কেউ বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করছে।

নীলাঞ্জনা নন্দিতার হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “ও এসে গেছে।”

“কে?”

“যে তোমার গলা ধার করে কথা বলে।”

“তুমি আগে বলো, তুমি কে! তোমার কথা একবারও একরকম নয়। কখনও বলছ তুমি আমার বোন, কখনও বলছ তুমি মাধবীর দ্বিতীয় সন্তান। আর এখন বলছ আমার কণ্ঠস্বর অন্য কেউ ব্যবহার করছে। কী হচ্ছে এখানে?”

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল না। অন্ধকারে নন্দিতা অনুভব করল, মেয়েটি তার হাত ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

নন্দিতা ছাড়ল না।

“এবার আর কাউকে পালাতে দেব না।”

ঠিক তখনই অন্ধকারের মধ্যে একটি দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

তারপর নন্দিতার কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল।

“নীলু, ওকে ছেড়ে দাও। ও এখনও জানে না ও কে।”

কণ্ঠস্বরটি এবার একেবারে কাছে।

অনন্যা কোমর থেকে রিভলভার বের করল। “যেই হও, সামনে এসো!”

একটা ক্ষীণ হাসি শোনা গেল।

“পুলিশের মেয়ে! তোমার বাবাও একদিন এই কথাটাই বলেছিল।”

অনন্যার মুখ শক্ত হয়ে গেল। “আমার বাবাকে তুমি চিনতে?”

“চিনতাম? ও তো আমার জন্যই মরেছিল।”

এরপর হঠাৎ একটা ধাক্কায় পাশের আলমারি খুলে গেল। ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ল একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার। যন্ত্রটি মেঝেতে পড়েও চালু হয়ে গেল।

খসখসে শব্দের পর এক মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল।

“নন্দিতা, যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনে থাকো, তাহলে বুঝবে আমি তোমাকে আর সত্যিটা থেকে দূরে রাখতে পারিনি।”

মাধবী।

নন্দিতার মা।

“তোমার জন্মের রাতে এই বাড়িতে দুটি শিশু ছিল না। ছিল একটি শিশু, একটি মৃতদেহ, আর দুজন মানুষ যারা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চেয়েছিল। আমি যা করেছিলাম, তা তোমাকে রক্ষা করার জন্য করেছিলাম—কিন্তু রক্ষা করতে গিয়ে তোমার জীবনটাকেই মিথ্যে বানিয়ে দিয়েছি।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা।

তারপর যন্ত্রটি আবার চলল।

“নন্দিতা, তুমি যাকে তোমার বাবা বলে চিনেছ, সে তোমার বাবা নয়। আর যাকে এতদিন মৃত বলে জানানো হয়েছে, সেও তোমার বাবার পরিচয় নিয়ে বেঁচে নেই। তোমার আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে সেই রাতের মধ্যে, যে রাতের কথা তোমার মনে থাকার কথা নয়।”

টেপের শেষ শব্দটি শোনা গেল—

“আয়নাটা ভেঙো না।”

তারপর রেকর্ডার বন্ধ হয়ে গেল।

নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

করিডরের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল আয়না ছিল। ছোটবেলা থেকে বাড়িতে সেই আয়নাটা দেখে এসেছে সে। কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা ছিল দুটি মুখ—একটি পুরুষের, অন্যটি নারীর। অথচ এত বছরেও সে কখনও খেয়াল করেনি, আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে একটা দরজা দেখা যায়।

বাস্তবে সেখানে কোনও দরজা নেই।

নন্দিতা আয়নার দিকে এগিয়ে গেল।

“থামো!” অনন্যা চিৎকার করল। “ওটাই হয়তো ওদের ফাঁদ!”

কিন্তু নন্দিতা থামল না।

আয়নার কাছে পৌঁছে সে দেখল, তার প্রতিবিম্ব এক মুহূর্ত দেরিতে নড়ছে।

সে ডান হাত তুলল।

প্রতিবিম্ব হাত তুলল একটু পরে।

তারপর প্রতিবিম্বটি হাসল।

নন্দিতা হাসেনি।

প্রতিবিম্বের ঠোঁট নড়ল।

“অবশেষে দেখা হলো।”

নন্দিতা পিছিয়ে এল। “তুমি কে?”

আয়নার ওপারের মুখটি বলল, “তুমি যে নামটা ভুলে গেছ, আমি সেই নাম।”

“তুমি কি আমার যমজ বোন?”

“না।”

“তাহলে?”

“আমি তোমার মুছে দেওয়া স্মৃতি।”

পরক্ষণেই আয়নাটা কেঁপে উঠল। কাঠের ফ্রেমের ভেতর থেকে যেন কেউ ধাক্কা মারছে। অনন্যা নন্দিতাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে আয়নার দিকে রিভলভার তাক করল।

“পিছিয়ে যাও!”

আয়নার ওপারের মুখটি এবার গম্ভীর হয়ে গেল।

“অনন্যা, তোমার বাবাকে যারা মেরেছিল, তারা এখনও বেঁচে আছে। তোমার হাতে বন্দুক আছে, কিন্তু তুমি জানো না কাকে গুলি করতে হবে।”

ঠিক তখনই আয়নার পেছন থেকে একটি যান্ত্রিক শব্দ হলো। ফ্রেমের ডান দিকটা সামান্য সরে গেল। তার ভেতরে দেখা গেল সরু একটি ফাঁক।

নীলাঞ্জনা ছুটে এসে ফ্রেমের নিচে চাপ দিল।

আয়নাটি একদিকে সরে গেল।

পেছনে ছোট্ট একটি ঘর।

ঘরের মধ্যে একটি টেবিল, কয়েকটি পুরোনো ফাইল, রক্তের দাগযুক্ত একটি সাদা পোশাক এবং দেয়ালে ঝোলানো তিনটি ছবি।

প্রথম ছবিতে মাধবী।

দ্বিতীয় ছবিতে শশাঙ্কশেখর রায়।

তৃতীয় ছবিতে এক ব্যক্তি, যার মুখ অবিকল ঋত্বিকের মতো।

ছবির নিচে লেখা—

ড. অমিয় সেন।

অনন্যা ছবিটি হাতে নিয়ে জমে গেল।

“এই লোকটাকে আমি দেখেছি।”

“কোথায়?” নন্দিতা প্রশ্ন করল।

“বাবার পুরোনো ডায়েরিতে। বাবা লিখেছিলেন, অমিয় সেন নামের একজন চিকিৎসককে বহু বছর আগে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর শংসাপত্রটি জাল ছিল।”

নীলাঞ্জনা টেবিলের ওপর রাখা ফাইল খুলল। ভেতরে হাসপাতালের কাগজপত্র, পুরোনো ছবি, হাতের লেখা নোট এবং কয়েকটি জন্মের শংসাপত্র।

একটি কাগজে নন্দিতার চোখ আটকে গেল।

নাম: নন্দিতা রায়।
জন্মতারিখ: ১৮ অক্টোবর, ২০০১।
জন্মের পর অবস্থা: মৃত ঘোষণা।
পরবর্তী নথি: সংশোধিত।

নন্দিতা কাগজটা দুহাতে ধরে রইল।

“আমি মৃত ঘোষণা হয়েছিলাম?”

নীলাঞ্জনা ধীরে মাথা নাড়ল।

“তোমার জন্মের পর শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা তোমাকে মৃত ভেবেছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর তুমি আবার শ্বাস নিতে শুরু করো। সেই সময় তোমার পাশে ছিল অমিয় সেন। সে বুঝেছিল, এই ঘটনাকে ব্যবহার করে সে একটা নতুন পরীক্ষা চালাতে পারবে।”

“কী পরীক্ষা?”

“মানুষের পরিচয় বদলে দেওয়ার পরীক্ষা। স্মৃতি মুছে ফেলা, অন্যের স্মৃতি ঢুকিয়ে দেওয়া, একই মুখের দুটি মানুষকে একে অন্যের জায়গায় দাঁড় করানো। অমিয় বিশ্বাস করত, মানুষের পরিচয় শরীরে নয়—পরিচয়ের গল্পে। যে গল্প মানুষকে বিশ্বাস করানো যায়, সে-ই তার সত্যি হয়ে ওঠে।”

নন্দিতার মাথার ভেতর ঝড় উঠল।

“কিন্তু আমার বাবার কী হয়েছিল?”

নীলাঞ্জনা একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে ঋত্বিক দাঁড়িয়ে আছে মাধবীর পাশে। তাদের পেছনে শশাঙ্কশেখর। ছবির এক কোণে আরেকটি ছোট্ট মেয়ে—নীলাঞ্জনা।

“এই ছবিটা তোলা হয়েছিল তোমার জন্মের কয়েক বছর পর। আমি মাধবীর মেয়ে। তোমার যমজ বোন নই। তোমার জন্মের সময় আমার বয়স ছিল না—আমি তখনও জন্মাইনি। কিন্তু তোমাকে নিয়ে যে গল্পটা তৈরি করা হয়েছিল, সেই গল্পে আমাকে কখনও তোমার বোন, কখনও তোমার ছায়া হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।”

“তাহলে আমার যমজ বোন ছিল না?”

“না। তোমাকে বিভ্রান্ত করার জন্যই সেই কথা বলা হয়েছিল। তোমার স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে অমিয় বারবার তোমার পরিচয় বদলেছে। কখনও তুমি মৃত শিশু, কখনও নিখোঁজ মেয়ে, কখনও এমন একজন, যে নিজের বাবাকে হত্যা করেছে।”

অনন্যা টেবিলের ফাইলগুলো দ্রুত উল্টে দেখছিল।

“এখানে একটা রিপোর্ট আছে। ১৮ অক্টোবর, ২০০১। একজন পুরুষ রোগীকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।”

নন্দিতা ফিসফিস করে বলল, “ঋত্বিক?”

“সম্ভবত।”

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

“ঋত্বিক সত্যিই নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু তাকে কে সরিয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি জানি না। অমিয় তার মুখের ছাঁচ, কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং আর ব্যক্তিগত নথি ব্যবহার করে এমন একজন মানুষ তৈরি করেছিল, যে ঋত্বিকের মতো দেখতে। সে কোনও অলৌকিক সৃষ্টি নয়। একজন জীবিত মানুষ, যার পরিচয়কে পরিকল্পিতভাবে বদলে দেওয়া হয়েছিল। বছরের পর বছর তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, সে-ই ঋত্বিক।”

“তাহলে বারান্দায় যে দাঁড়াত?”

“সে সেই মানুষ। তাকে প্রতি বছর এই রাতেই এখানে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। অমিয় তাকে বলেছিল, তার স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে এই বাড়িতে আসতে হবে। আর তাকে বলা হয়েছিল, তুমি তার মেয়ে—যে একদিন তাকে মেরেছিল।”

নন্দিতার গলা শুকিয়ে গেল।

“আমি কাউকে মারিনি।”

“আমি জানি।”

“কিন্তু ছাদের ঘরে যে মৃতদেহটা পড়ে আছে?”

নীলাঞ্জনা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের বাইরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।

তারপর পরিচিত কণ্ঠ—

“তোমরা খুব বেশি জেনে ফেলেছ।”

দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল সেই মানুষটি, যাকে এতক্ষণ ঋত্বিক বলে মনে হচ্ছিল।

তার হাতে একটি ছোট পিস্তল।

“ফাইলগুলো আমার হাতে দাও,” সে বলল।

অনন্যা বন্দুক তাক করল। “অস্ত্রটা ফেলে দাও!”

লোকটি হাসল।

“তুমি আমাকে গুলি করতে পারবে না। কারণ তুমি জানো না, আমি কে।”

অনন্যা উত্তর দিল, “তুমি যে-ই হও, আমার বাবার মৃত্যুর কথা তুমি জানো। তোমার কাছে তার উত্তর আছে।”

লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তোমার বাবা সত্যের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সে বুঝেছিল, অমিয় সেনের পরীক্ষা শুধু অন্যের স্মৃতি বদলানো নয়—সাক্ষীর স্মৃতিকেও অবিশ্বাস্য করে তোলা। কিন্তু সে ভুল করেছিল একটা জায়গায়। সে ভেবেছিল, সত্যি লিখে রাখলেই সত্যি বেঁচে থাকবে।”

সে পিস্তল তুলে ফাইলের দিকে তাক করল।

“কাগজ পুড়ে গেলে ইতিহাসও পুড়ে যায়।”

নন্দিতা আচমকা টেবিলের ওপর রাখা ধাতব বাতিটা তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল। লোকটির হাত থেকে পিস্তল ছিটকে পড়ল। অনন্যা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মেঝেতে ফেলে দিল।

ধস্তাধস্তির মধ্যে লোকটির মুখে আঁচড় লাগল। গালের চামড়ার এক অংশ উঠে গেল।

তার নিচে দেখা গেল পুরোনো অস্ত্রোপচারের দাগ।

আর সেই দাগের পাশে ছোট্ট একটি তিল।

নন্দিতা থমকে গেল।

ছবিতে ঋত্বিকের গালের ঠিক সেই জায়গায় তিল ছিল।

কিন্তু এই মানুষটির চোখে অন্য এক আতঙ্ক।

“তুমি ঋত্বিক নও,” নন্দিতা বলল।

লোকটি নিঃশ্বাস নিতে নিতে উত্তর দিল, “আমাকে ঋত্বিক হতে বলা হয়েছিল।”

“তোমার নিজের নাম কী?”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “অরিন্দম।”

“অরিন্দম, তুমি আমার বাবাকে কোথায় রেখেছ?”

লোকটি চোখ বন্ধ করল।

“আমি জানি না তোমার বাবা কোথায়। আমি শুধু জানি, যে মানুষটাকে তোমরা এতক্ষণ বাবা ভেবেছ, সে-ও নিজের স্মৃতি বিশ্বাস করতে পারে না। অমিয় আমাদের সবাইকে এমনভাবে তৈরি করেছে, যাতে প্রত্যেকে অন্যের অপরাধ নিজের বলে মনে করে।”

অনন্যা তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল।

“তাহলে ছাদের ঘরে কে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে?”

অরিন্দমের চোখে আতঙ্ক ফিরে এল।

“ওটা কোনও মানুষ নয়।”

“কী বললে?”

“ওটা একটা পুরোনো পরিচয়ের অবশেষ। অমিয় বহু বছর আগে যে মানুষটাকে ঋত্বিক বানিয়েছিল, তার শরীরের ওপরই পরীক্ষাগুলো চালানো হয়েছিল। সেই মানুষটি মারা যাওয়ার পর তার দেহকে ঋত্বিকের পোশাক, আংটি আর পরিচয় দিয়ে সাজানো হয়েছে। কিন্তু আজ রাতে ওই ঘরে আমি কোনও দেহ রাখিনি।”

“তাহলে কে রেখেছে?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে একটি বিকট শব্দ হলো।

সবাই ছুটে বেরিয়ে এল।

ছাদের ঘরের দরজা খোলা। মেঝেতে সাদা চাদর পড়ে আছে। তার ওপর রক্তের দাগ। কিন্তু দেহটি নেই।

শুধু দেয়ালে নতুন করে লেখা হয়েছে—

“যে মৃত, সে-ই সাক্ষী।”

অনন্যা সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেসে খবর পাঠাল। কিন্তু বাড়ির ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, ওয়্যারলেসেও শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।

নন্দিতা জানালার দিকে তাকাল।

বারান্দায় একজন দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চুল, ডান হাতে পুরোনো আংটি।

লোকটি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।

এই মুখ নন্দিতা বহুবার ছবিতে দেখেছে।

তার বাবা, ঋত্বিক রায়।

কিন্তু ছবির ঋত্বিকের বয়স ছিল আটাশ। বারান্দার মানুষটির বয়স অন্তত পঞ্চাশ।

নন্দিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

“বাবা?”

লোকটি কোনও উত্তর দিল না।

“তুমি কি সত্যিই আমার বাবা?”

লোকটি বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অধিকার আমি বহু বছর আগে হারিয়েছি।”

নন্দিতার চোখ ভিজে উঠল।

“তাহলে তুমি কে?”

লোকটি বারান্দা থেকে ঘরে এল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে অদ্ভুত ক্লান্তি। মুখে কোনও নাটকীয়তা নেই। সে নন্দিতার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার নাম ঋত্বিক। অন্তত জন্মের সময় আমাকে এই নামই দেওয়া হয়েছিল।”

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”

“এই বাড়ির মধ্যেই। কখনও দেওয়ালের পেছনে, কখনও হাসপাতালের ঘরে, কখনও এমন একটি কক্ষে, যেখানে দিনের আলো ঢুকত না। অমিয় আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিল, আমার মেয়ে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আবার কখনও বলত, আমার মেয়ে আদৌ বেঁচে নেই।”

“তুমি কি জানতাম আমি বেঁচে আছি?”

ঋত্বিকের চোখে জল জমল।

“শেষ পর্যন্ত জেনেছিলাম। কিন্তু তখন আমার নিজের স্মৃতিই আর আমার ছিল না।”

নন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বাবাকে ছুঁতে চাইল, কিন্তু হাত বাড়াতে পারল না।

ঋত্বিক নিজেই তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

“আমি তোমাকে বাঁচাতে পারিনি, নন্দিতা। তোমার মা তোমাকে নিয়ে পালাতে চেয়েছিল। আমি তাকে সাহায্য করতে পারিনি। অমিয় আমাকে বলেছিল, তোমাকে বাঁচাতে হলে তোমার স্মৃতি নষ্ট করতে হবে। আমি সেই মিথ্যেটা বিশ্বাস করেছিলাম।”

“মা কি তোমাকে গুলি করেছিল?”

ঋত্বিক মাথা নাড়ল।

“না। তোমার মা কাউকে গুলি করেনি। সেই রাতে অমিয়ের একজন সহকারী মারা গিয়েছিল। তার দেহ ব্যবহার করে অমিয় একটা হত্যার গল্প তৈরি করেছিল। সে চেয়েছিল, মাধবী অপরাধবোধে ভুগুক, আমি নিজের স্মৃতিকে সন্দেহ করি, আর তুমি বিশ্বাস করো যে তোমার ছোট্ট হাতেই একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।”

নন্দিতা কাঁদতে শুরু করল।

“মা কেন আমাকে সত্যিটা বলেনি?”

“কারণ অমিয় তাকে শর্ত দিয়েছিল—সে যদি মুখ খোলে, তোমাকে আবার সেই পরীক্ষাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তোমার মা তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য নিজের জীবনটাকেও মিথ্যে বানিয়েছিল।”

নীলাঞ্জনা এগিয়ে এসে বলল, “তাহলে যে লোকটা এতদিন দেওয়ালের পেছনে ছিল, সে কে?”

ঋত্বিক তার দিকে তাকাল।

“শশাঙ্কশেখর রায়।”

“কিন্তু তিনি তো তোমার বাবা!”

“হ্যাঁ। আর তিনি অমিয়ের প্রথম শিকারদের একজন। অমিয় তাঁর স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিল, যাতে তিনি নিজের ছেলেকেই চিনতে না পারেন। তারপর তাঁকে বাড়ির গোপন ঘরে আটকে রেখে সবাইকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, তিনি মারা গেছেন।”

“তাহলে অমিয় সেন এখন কোথায়?”

ঋত্বিক উত্তর দেওয়ার আগেই নিচের তলা থেকে হাততালির শব্দ শোনা গেল।

একবার।

দুবার।

তারপর একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“অসাধারণ! এত বছর পর আমার সব পরীক্ষার ফলাফল এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।”

সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেন এক বৃদ্ধ।

সাদা চুল, মোটা চশমা, হাতে লাঠি। মুখে শান্ত হাসি।

নন্দিতা ছবির দিকে তাকাল।

ড. অমিয় সেন।

ছবির মানুষটির সঙ্গে এই বৃদ্ধের কোনও অমিল নেই।

“আপনি তো মৃত!” অনন্যা চিৎকার করল।

অমিয় মৃদু হাসলেন।

“মৃত্যুর শংসাপত্রও মানুষের পরিচয়ের মতোই। সঠিক মানুষ যদি সঠিক কাগজ তৈরি করে, পৃথিবী তাকে মৃত বলে মেনে নেয়।”

অনন্যা বন্দুক তুলল।

“আপনি গ্রেপ্তার হচ্ছেন।”

অমিয় নির্বিকারভাবে বললেন, “কোন অপরাধে? মৃত মানুষকে বন্দি রাখার অপরাধে? নাকি জীবিত মানুষকে তার নিজের নাম ভুলিয়ে দেওয়ার অপরাধে? আদালতে তোমার সাক্ষীরা নিজেদের কথাই বিশ্বাস করবে না।”

তিনি নন্দিতার দিকে তাকালেন।

“তুমি কেমন আছ, নন্দিতা? অনেক বছর পর তোমার চোখে আবার সেই প্রশ্ন দেখছি।”

নন্দিতা এবার পিছিয়ে গেল না।

“আপনি আমার স্মৃতি বদলে দিয়েছেন।”

“আমি তোমাকে বাঁচিয়েছিলাম।”

“আপনি আমাকে আমার জীবন থেকে চুরি করেছিলেন।”

অমিয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুমি বুঝতে পারছ না। মানুষের স্মৃতি খুব দুর্বল। তুমি যা মনে করো, তার অর্ধেকই অন্যের শেখানো। আমি শুধু তোমাকে একটা নতুন জীবন দিয়েছিলাম।”

“যে জীবন আমার ছিল না।”

“তোমার বাবার কী হয়েছে, মনে আছে? তুমি তো দেখেছিলে—”

“না,” নন্দিতা বাধা দিল। “আমি কিছুই দেখিনি। আপনি আমাকে একটা গল্প বিশ্বাস করিয়েছিলেন। আর আমি এত বছর সেই গল্পের ভেতরে বেঁচে ছিলাম।”

অমিয় ধীরে ধীরে হাততালি দিলেন।

“এটাই তো আমি দেখতে চেয়েছিলাম। স্মৃতি ছাড়া মানুষ কীভাবে নিজের পরিচয় পুনর্গঠন করে। তুমি আমার সবচেয়ে সফল পরীক্ষা।”

“আমি আপনার পরীক্ষা নই।”

“তুমি তাই বলছ, কারণ আমি তোমাকে তাই বলতে শিখিয়েছি।”

নন্দিতা টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো তুলে ধরল।

“এই নথিগুলো আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।”

অমিয় মাথা নাড়লেন।

“নথি? ওই কাগজে যার নাম আছে, সে-ই কি সত্যি? ওই ছবিতে যে মুখ আছে, সে-ই কি সেই মানুষ? তুমি কি প্রমাণ করতে পারবে যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি তোমার বাবা?”

ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।

“আমি আমার মেয়েকে প্রমাণ দিতে আসিনি। আমি শুধু তার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

অমিয়ের চোখে হঠাৎ ক্রোধ দেখা দিল।

“তোমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার নেই!”

তিনি লাঠির হাতল ঘুরিয়ে দিলেন। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ছোট্ট একটি যন্ত্র। ঘরের দেয়ালে লুকোনো স্পিকারগুলো একসঙ্গে চালু হয়ে গেল।

প্রথমে শোনা গেল মাধবীর কণ্ঠ।

তারপর নন্দিতার শৈশবের কান্না।

তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ—

“বাবা, আমি তোমাকে মেরে ফেলেছি।”

নন্দিতা দুহাতে কান চেপে ধরল।

“বন্ধ করুন!”

অমিয় বললেন, “তোমার মস্তিষ্ক এখনও সেই সংকেত চিনতে পারে। তুমি আবার সেই রাতের ভেতরে ফিরে যাচ্ছ।”

নন্দিতার চোখের সামনে দৃশ্য বদলে যেতে লাগল। সে যেন আবার ছোট্ট হয়ে গেছে। সাদা আলোয় ভরা একটি ঘর। মাধবী কাঁদছেন। একজন মানুষ মেঝেতে পড়ে আছেন। তার হাতে রক্ত। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অমিয়।

“তুমি করেছ, নন্দিতা,” অমিয়ের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো। “তুমিই করেছ।”

নন্দিতা মেঝেতে বসে পড়ল।

ঋত্বিক তার দিকে এগোতেই অমিয় চিৎকার করলেন, “এক পা এগোবে না!”

কিন্তু এবার নীলাঞ্জনা সামনে দাঁড়াল।

“আপনি একটা কথা ভুলে গেছেন, ডাক্তারবাবু।”

অমিয় তার দিকে তাকালেন।

“কী কথা?”

“স্মৃতি বদলানো যায়। কিন্তু স্মৃতির সব প্রমাণ মুছে ফেলা যায় না।”

নীলাঞ্জনা নিজের জামার ভেতর থেকে ছোট্ট একটি রেকর্ডিং যন্ত্র বের করল।

“আমি এই বাড়িতে বছরের পর বছর আপনার কথোপকথন রেকর্ড করেছি। আপনি যখন নিজেকে মৃত বলে লুকিয়ে রেখেছিলেন, তখনও আপনি কথা বলতেন। আপনি যখন ঋত্বিককে অন্য পরিচয় দিয়েছিলেন, তখনও কথা বলতেন। আর আজ রাতে যা বলেছেন, তার সবটাই রেকর্ড হয়েছে।”

অমিয় প্রথমবারের মতো বিচলিত হলেন।

“যন্ত্রটা দাও!”

নীলাঞ্জনা পিছিয়ে গেল।

অনন্যা সুযোগ বুঝে অমিয়ের হাত থেকে যন্ত্রটি কেড়ে নিল। দেয়ালের স্পিকারগুলো বন্ধ হয়ে গেল।

ঘর নিস্তব্ধ।

অমিয় এবার অনন্যার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু অনন্যা তাঁকে ঠেলে মেঝেতে ফেলে দিল। রিভলভার তাঁর কপালের কাছে ধরে বলল, “এবার আপনার স্মৃতি আদালতে পরীক্ষা হবে।”

দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।

বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়ি এসে থামল।

অনন্যা তার সহকর্মীদের দরজা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে বাড়িটি পুলিশে ভরে গেল। অমিয় সেনকে হাতকড়া পরানো হলো। তার গোপন কক্ষ থেকে উদ্ধার হলো অসংখ্য ফাইল, রেকর্ডিং, ভুয়ো মৃত্যুর শংসাপত্র এবং পরিচয় বদলের নথি।

কিন্তু নন্দিতা তখনও মেঝেতে বসে ছিল।

ঋত্বিক তার পাশে এসে বসলেন।

“আমাকে চিনতে পারছ?”

নন্দিতা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি জানি না,” সে বলল। “আপনার মুখটা আমার ছবিতে দেখা মুখের মতো। আপনার কণ্ঠস্বরও সেই রকম। কিন্তু আমার ভেতরে যে স্মৃতিগুলো আছে, সেগুলো বিশ্বাস করতে পারছি না।”

ঋত্বিক মাথা নত করলেন।

“তোমাকে আজই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে না। আমি তোমার বাবা কি না, সেটা সময় বলবে। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই—কোনও দাবি নিয়ে নয়।”

নন্দিতা প্রথমবার তাঁর হাত ধরল।

“আমার শুধু একটা প্রশ্ন আছে।”

“করো।”

“আপনি কি আমাকে কখনও সত্যিই ভালোবেসেছিলেন?”

ঋত্বিকের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুমি যখন জন্মেছিলে, তোমার হাতের আঙুল আমার একটা আঙুল আঁকড়ে ধরেছিল। সেই মুহূর্তটা কেউ আমার কাছ থেকে নিতে পারেনি। আমার স্মৃতি নষ্ট হয়েছে, আমার পরিচয় বদলেছে, কিন্তু সেই স্পর্শটা আমি ভুলিনি।”

নন্দিতা ধীরে তাঁর কাঁধে মাথা রাখল।

সেদিন রাতেই শশাঙ্কশেখরকে গোপন ঘর থেকে উদ্ধার করা হলো। বৃদ্ধের শরীর ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু তিনি জীবিত ছিলেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি নন্দিতাকে ডেকে বললেন, “তোমার মা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমি সব সত্যি বলতে পারিনি। অমিয় আমাকে বোঝাত, সত্যি বললে তোমার ক্ষতি হবে। আমি ভয়ে চুপ করে ছিলাম।”

নন্দিতা বলল, “আপনি চুপ ছিলেন বলে আমার জীবন থেকে পঁচিশ বছর হারিয়ে গেছে।”

বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।

“আমি জানি। ক্ষমা চাইবার অধিকারও হয়তো আমার নেই।”

“ক্ষমা আজ দিতে পারব না,” নন্দিতা বলল। “কিন্তু সত্যিটা আর চাপা দেব না।”

পরদিন সকালে খবরের কাগজে বড় শিরোনাম হলো—

“পঁচিশ বছরের রহস্যের পর্দাফাঁস: পরিচয় ও স্মৃতি নিয়ে বেআইনি পরীক্ষার অভিযোগে চিকিৎসক গ্রেপ্তার।”

কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কাছে সব নথি পৌঁছলেও নন্দিতা কোনও সাক্ষাৎকার দিল না। সে জানত, সত্যি প্রকাশ করা আর সত্যিকে বোঝা এক জিনিস নয়।

পরবর্তী কয়েক মাসে তদন্তে উঠে এল আরও অনেক তথ্য। অমিয় সেন দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন মানুষের স্মৃতি ও পরিচয় নিয়ে বেআইনি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। রোগীদের সম্মতি ছাড়াই তাদের পুরোনো নথি বদলে দেওয়া হয়েছিল। একাধিক ব্যক্তিকে ভুয়ো পরিচয়ে বাঁচতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঋত্বিকের নিখোঁজ হওয়া, শশাঙ্কশেখরের মৃত্যুর মিথ্যা খবর এবং নন্দিতার শৈশবের স্মৃতি—সবকিছুর পেছনেই ছিল সেই পরিকল্পনা।

অরিন্দমকে চিকিৎসা ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপদ হেফাজতে রাখা হলো। সে স্বীকার করল, তাকে ছোটবেলা থেকে ঋত্বিকের পরিচয় অনুকরণ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল, তার নিজের কোনও অতীত নেই; তার কাজই তার পরিচয়। সে বহু বছর ধরে এই মিথ্যেটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করেছিল।

অনন্যা তার বাবার পুরোনো ডায়েরি নতুন করে পড়ল। শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু স্মৃতির জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলা যায় না। কেউ না কেউ একদিন প্রশ্ন করবে—আমি আসলে কে?”

অনন্যা ডায়েরিটি নন্দিতার হাতে তুলে দিল।

“আমার বাবা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই মারা গিয়েছিলেন,” সে বলল। “আমি চাই না তাঁর মৃত্যু আরেকটা অজানা গল্প হয়ে থাকুক।”

নন্দিতা ডায়েরিটি বুকে চেপে ধরল।

“এবার থেকে আমরা গল্প নয়, প্রমাণ নিয়ে কথা বলব।”


এক বছর কেটে গেল।

১৭ অক্টোবর।

শান্তিনিকেতন বাড়ির ওপরের বারান্দায় আর কোনও আলো জ্বলত না। বাড়ির একাংশ সংস্কার করা হয়েছে। গোপন ঘরটি সিল করে দেওয়া হয়নি; বরং তদন্তের প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। আয়নার পেছনের ঘরটিতে এখন তালা ঝুলছে।

নন্দিতা সাংবাদিকতার কাজে ফিরে গেছে। সে একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছে—স্মৃতি, পরিচয় এবং মানুষের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে। প্রতিবেদনে কারও সম্পর্কে প্রমাণহীন দাবি নেই। আছে নথি, সাক্ষ্য, চিকিৎসা-রিপোর্ট এবং আদালতে জমা দেওয়া রেকর্ডিং।

নীলাঞ্জনা এখন নন্দিতার সঙ্গেই থাকে। তাদের সম্পর্কের নাম বোনত্ব নয়, রক্তের পরিচয়ও নয়। তারা একে অন্যকে বেছে নিয়েছে—একটি দীর্ঘ অন্ধকারের পর।

শশাঙ্কশেখর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঋত্বিকও চিকিৎসা নিচ্ছেন। নন্দিতা তাঁকে এখনও প্রতিদিন বাবা বলে ডাকে না। কখনও ডাকে, কখনও শুধু নাম ধরে। কিন্তু তাদের মধ্যে আর কোনও বাধ্যতামূলক স্মৃতি নেই, কোনও নির্দেশ দেওয়া কণ্ঠস্বর নেই।

সেদিন সন্ধ্যায় নন্দিতা একা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। আকাশে মেঘ। দূরে ট্রামের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে।

ঘড়িতে ১১টা ৩৯।

তার বুকের ভেতর পুরোনো ভয় ফিরে এল। পঁচিশ বছর ধরে এই সময়ে বাড়ির আলো জ্বলত। দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে বলত—

“বাবা, দরজাটা খোলো। আমি ফিরে এসেছি।”

ঘড়িতে ১১টা ৪০ বাজল।

কোনও আলো জ্বলল না।

কেউ দরজায় কড়া নাড়ল না।

শুধু বাড়ির ভেতরে কোথাও একটা কাঠের শব্দ হলো।

নন্দিতা ঘুরে দাঁড়াল।

করিডরের শেষ প্রান্তে সেই পুরোনো আয়নাটি রাখা। সেটি এখন দেয়ালে আটকানো নয়, মেঝের ওপর ঠেস দিয়ে রাখা। নন্দিতা ধীরে ধীরে তার সামনে গেল।

আয়নায় নিজের মুখ দেখল।

এই প্রথম সে নিজের প্রতিবিম্বকে দেখে ভয় পেল না।

সে হাত তুলল।

প্রতিবিম্বও হাত তুলল।

একই সঙ্গে।

তারপর নন্দিতা মৃদু হাসল।

ঠিক সেই মুহূর্তে আয়নার কাচের ওপর কুয়াশার মতো একটি দাগ জমল। যেন ভেতর থেকে কেউ নিঃশ্বাস ফেলেছে।

দাগের ওপর ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কয়েকটি শব্দ—

“তুমি কি নিশ্চিত, সব সত্যি জেনে গেছ?”

নন্দিতা স্থির হয়ে গেল।

সে হাত বাড়িয়ে কাচ ছুঁল।

শব্দগুলো মিলিয়ে গেল।

তারপর নিজের ফোনে একটি বার্তা এল। অজানা নম্বর থেকে।

“অমিয় সেন একা ছিল না।”

নন্দিতার আঙুল ঠান্ডা হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে অনন্যাকে ফোন করল। কিন্তু কল ধরার আগেই আরেকটি বার্তা এল।

“এইবার তোমার স্মৃতি নয়, তোমার বিশ্বাস পরীক্ষা হবে।”

নন্দিতা জানালার বাইরে তাকাল।

বারান্দার রেলিংয়ের ওপারে অন্ধকারে একজন দাঁড়িয়ে আছে।

মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ডান হাতটা দেখা যাচ্ছে—আঙুলে একটি পুরোনো আংটি।

ঋত্বিকের আংটির মতো।

নন্দিতা দরজার দিকে এগোল। তারপর থেমে গেল।

তার মনে পড়ল মায়ের শেষ সতর্কবাণী—

“তাকে দেখবে না।”

কিন্তু এবার সে পালাল না।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা জোরে বলল, “তুমি কে?”

অন্ধকারের মানুষটি উত্তর দিল না।

নন্দিতা আবার বলল, “তোমার নাম বলো।”

দূর থেকে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“আমি ফিরে এসেছি।”

নন্দিতা দরজার হাতল ছেড়ে দিল।

তারপর ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দিল।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষকে সত্যি ভেবে নেওয়ার দিন শেষ। আর কোনও মুখ, কোনও কণ্ঠস্বর, কোনও স্মৃতিই প্রমাণ ছাড়া তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে না।

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

নন্দিতা ফোনটা হাতে তুলে অনন্যাকে বলল, “আরেকটা তদন্ত শুরু করতে হবে।”

“কী হয়েছে?”

নন্দিতা আয়নার দিকে তাকাল।

“আমরা অমিয় সেনকে ধরেছি। কিন্তু হয়তো আমরা এখনও জানি না, এই গল্পের প্রথম অধ্যায় কে লিখেছিল।”

ফোনের ওপারে অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তাহলে এবার প্রথম অধ্যায় থেকেই শুরু করব।”

নন্দিতা ফোন নামিয়ে রাখল।

বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।

বারান্দায় আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই।

কিন্তু নন্দিতা জানত, কোনও রহস্যের শেষ মানে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নয়। কখনও কখনও শেষ মানে—ভয়কে আর নিজের পরিচয় নির্ধারণ করতে না দেওয়া।

সে জানালাটা খুলে দিল।

দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর শান্তিনিকেতন বাড়িতে সকালের বাতাস ঢুকল।

আর আয়নায় তার প্রতিবিম্ব এবার একটুও দেরি করে নড়ল না।

— সমাপ্ত —

Share This